সন্তান যতটুকু পুরুষের, তার চাইতে অধিক নারীর। সন্তান বাবার সঙ্গে যুক্ত হয় মানসিক ও অভ্যাসগতভাবে।

কিন্তু মা, সে তার সন্তানের সঙ্গে শারীরিকভাবে যুক্ত। নাড়ির মধ্য দিয়া তারা একটা দীর্ঘ সময় এক শরীর আকারেই থাকে। ফলে সন্তানকে মায়েরা যেইভাবে বুঝবে, মায়েরা যেইভাবে পালবে—বাবারা তা পারবে না। বায়োলজিকাল কারণেই না।

এখন যিনি সন্তান পালন করবেন তিনি একই সঙ্গে সামাজিক কিংবা অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপে সহজে যুক্ত হইতে পারবেন না স্বাভাবিকভাবেই। ফলে, পুরুষের জন্যে সন্তানের সঙ্গে কম যুক্ত ‘অর্থনৈতিক’ কাজের দায়িত্ব নেওয়া সেই দিক থেকে ঠিক আছে।

এবং যিনি অর্থনৈতিক কাজ দেখবেন তিনি অর্থনীতি রিলেটেড কাজও দেখবেন। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান, কর্ম এবং অন্যান্য লিগ্যাল ক্ষেত্র। ফলে, বাচ্চার সার্টিফিকেট এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বাবার নাম বাধ্যতামূলক থাকা এবং কিছু ক্ষেত্রে মায়ের নাম না থাকাও ঘটনাক্রমে আসে। তাতে নারীর বা মায়ের মহান চরিত্রের অসম্মান ঘটে না।

বরং, অর্থনীতিতে না থাকলেও মা’কে কেন নেওয়া হইল না সার্টিফিকেটে, তা নিয়া দুঃখ করার প্রবণতা আমি মনে করি পুরা ‘মা’ নামক বড় চরিত্রটাকে ছোট কইরা দেখারই প্রবণতা। এর অবসান ঘটা দরকার।

মা কী এবং কেমন তার জন্যে প্রমাণের দরকার নাই। যেমন বাবার ক্ষেত্রে লাগতেছে না। এখন সার্টিফিকেটে নাম থাকাকে আপনি প্রমাণ বলবেন কিনা? তা প্রমাণ বটে, তবে বাচ্চার বাবার উপস্থিতির প্রমাণ, তার শ্রম কিংবা মহত্ত্বের না। সার্টিফিকেট পলিটিক্যালি অতি তুচ্ছ জিনিস। তা দিয়া যেহেতু মা-বাবার গুরুত্ব তৈরি হয় না সমাজে।

এখন পুরুষতন্ত্র যেইটা করে, পালনের সমস্ত দায়িত্ব মা’কে দিয়া ‘মায়ের বাচ্চাকে’ই তারা ‘বাবার বাচ্চা’ বানায়া রাখে। এবং এইটা দিয়াই সে নারীকে ছোট করে।

বাচ্চা তো বাবার না, বাচ্চা মায়ের। এই চিন্তায় নারীবাদও ঢুকতে পারতেছে না। তারাও একরকম এখন বাচ্চা পালনেও বাবার অংশগ্রহণ দিয়া বাচ্চা যে বাবারও তা জাস্টিফাই করতে চায়। তা জাস্টিফাই করতে হবে কেন? বাচ্চা তো বাবার আছেই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে।

বরং বাবাকে এই প্রক্রিয়ায় সমান সমান যুক্ত করতে চাওয়ার অর্থ ডিম্বাণু-শুক্রাণুর মিলনের মত অতি স্বাভাবিক ঘটনাকে লেবার পেইন এবং মাসের পর মাসের বাচ্চাকে গর্ভে ধারণের চাইতে বড় কইরা দেখা।

ফলে, সব কিছুর পরেও সমাজে মায়ের চরিত্রের এই ছোট হইয়া থাকার অবসান ঘটতে পারে যদি সন্তানকে মায়ের আয়ত্ত্বে আনা যায়। তা সম্ভব মা যদি বাবার প্যারালালি কোনো অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হইতে পারেন।

সেইক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কাজ এইখানে সবচেয়ে বেশি। কারণ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, অর্থনীতি-সমাজ-রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পরিচালক তাদেরকে তৈরি করে দিতেছে এই মায়েরাই।

সরকার যেই ৩টা কাজ করতে পারে এইক্ষেত্রে:

১. মাতৃত্বকালীন ভাতার ব্যবস্থা করতে পারে
২. সন্তান হয়ে যাবার পরও মা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভাতা পাবে
৩. সন্তান পালন করার পর মা যখন স্বাভাবিকভাবে কাজ করার অবস্থায় আসবে, চাকরি ও কাজের ক্ষেত্রে সে অগ্রাধিকার পাবে

এই ৩টা জিনিস আমি মনে করি এখন হওয়া খুব দরকার। যদি মায়েদের প্রাপ্য সামাজিক অবস্থান নিশ্চিত করতে হয়, উপরন্তু নারীর ক্ষমতায়ণ ঘটাইতে হয়।

১২ ডিসেম্বর ২০১৯

Recommended Posts