শরীরে হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে আয়রন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হিমোগ্লোবিন একধরনের প্রোটিন। এটি রক্তের লোহিত কণিকাকে সারা শরীরে অক্সিজেন ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। হিমোগ্লোবিন কম থাকলে শরীরে এর প্রভাব পড়ে এবং অ্যানিমিয়া দেখা দেয়। অ্যানিমিয়ায় রক্তে লোহিত কণিকার সংখ্যা বা হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায়। শরীরে আয়রনের ঘাটতি দেখা দিলে তা লক্ষণ দেখে অনুমান করতে পারবেন।

১. আপনি সব সময় ক্লান্ত থাকেন

শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকার খুব সাধারণ একটি লক্ষণ ক্লান্তি। মেয়েদের মধ্যে এ লক্ষণটি বেশি দেখা যায়। আয়রনের অভাব হলে দেহ কোষে দরকারী অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। যাদের আয়রনের অভাব থেকে অ্যানিমিয়া হয় তারা অবসন্ন বা ক্লান্ত বোধ করতে থাকে। আয়রনের অভাবে দুর্বলতা, বিরক্তি ও অমনোযোগ দেখা দেয়।

২. মেয়েদের পিরিয়ডে বেশি রক্ত যায়

মেয়েদের ক্ষেত্রে আয়রনের অভাব ঘটার বড় কারণ পিরিয়ড বা মাসিক। মাসিকের সময় শরীর থেকে এত রক্ত বের হয়ে যায় যে তারা এর অর্ধেক পূরণ করতে করতেই পরের মাসে আবার পিরিয়ড শুরু হয়ে যায়। সেজন্য মেয়েদের আয়রন রিচ খাবারের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত।

৩. আপনি বিবর্ণ

হিমোগ্লোবিনের কারণে রক্ত লাল হয়ে থাকে এবং ত্বকে লাল আভা থাকে। তার মানে শরীরে প্রোটিনের অভাব থাকলে সরাসরি ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যায়। ঠোঁটের ভেতরে, মাড়িতে এবং চোখের নিচের পাতায় লালচে ভাব স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকলে বুঝবেন আয়রনের অভাব আছে।

৪. আপনার তাড়াতাড়ি দম ফুরিয়ে যায়

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে বা প্রতিদিনের নিয়মিত কাজকর্ম করতে গিয়ে যদি দেখেন আগের মত আর দম পাচ্ছেন না তাহলে হতে পারে এটা আয়রনের অভাব থেকে হচ্ছে।

৫. হার্টবিটের সময় জোরে শব্দ হয়

আপনার হার্ট যদি বেশি পরিশ্রম করে তাহলে অনিয়মিত হার্টবিট, হার্টবিটের সময় জোরে শব্দ এমনকি হার্ট ফেইলিওর হতে পারে। আপনি যদি জানেন আপনার হার্টে সমস্যা রয়েছে তাহলে শরীরের আয়রনের পরিমাণ পরীক্ষা করানো উচিৎ। কারণ আয়রনের অভাবে হার্টে আরো মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়।

৬. আপনার পা নাড়ানোর অভ্যাস

আপনি কি সবসময় স্নায়বিক অস্থিরতায় থাকেন? শতকরা ১৫ ভাগ মানুষ আয়রনের অভাবে সবসময় পা নাড়াতে থাকে। আয়রনের পরিমাণ শরীরে যত কম হয়, এই লক্ষণটি তত তীব্র হতে থাকে।

৭. আপনার মাথা ব্যথা করে

শরীরে আয়রনের অভাব থাকলে শরীর অন্যান্য টিস্যুতে অক্সিজেন সরবরাহের চেয়ে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু তারপরও আপনার মস্তিষ্ক প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পায় না। এতে ব্রেইনের ধমনী প্রসারিত হয়। ফলে মাথাব্যথা হয়।

৮. আপনি মাটি, হাবিজাবি জিনিস ও বরফ কামড়ান

খাওয়ার জিনিস নয় এমন জিনিস আপনি খেতে থাকলে তা আয়রনের অভাবের লক্ষণ হতে পারে। যাদের আয়রনের অভাব রয়েছে তারা চক, মাটি, কাগজ এইসব জিনিসের প্রতি প্রলুব্ধ হয়। মেয়েরা বরফ বেছে নেয় এক্ষেত্রে।

৯. আপনি কোনো কারণ ছাড়াই উদ্বিগ্ন হয়ে যান

অক্সিজেনের অভাব শরীরের সিমপ্যাথেটিক স্নায়ু সিস্টেম উত্তেজিত করে। আয়রনের অভাব হলে হার্টবিটও বেড়ে যায়। ফলে আপনার যখন মানসিকভাবে শান্ত থাকার সবরকম কারণই আছে তখনও আপনি উদ্বিগ্ন বা অস্থির থাকেন।

১০. আপনার চুল পড়ে যাচ্ছে

অক্সিজেনের অভাব হলে শরীর তখন প্রধান কাজগুলিতে অক্সিজেনকে কাজে লাগায়। শরীরের বাহ্যিক কাজে তখন অক্সিজেন ব্যবহৃত হয় না, ফলে চুল পড়ে যায়। তবে স্বাভাবিকভাবে বেশিরভাগ মানুষের মাথা থেকে ১০০টির মত চুল পড়ে প্রতিদিন।

১১. আপনি নিরামিশাষী

মাংস, পোল্ট্রি উপাদান ও মাছ থেকে পাওয়া যায় যে ‘হেম’ আয়রন তা আপনার শরীর হজম করে। এই ‘হেম’ আয়রন শাক-সবজি থেকে পাওয়া ‘নন-হেম’ আয়রনের চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি কার্যকরী। সবুজ শাক-সবজি, দানাশস্য, শাক সবজিতে প্রচুর আয়রন আছে। ভিটামিন সি আছে যেমন কাঁচা মরিচ, বেরি জাতীয় ফল এবং ব্রকোলির সাথে এগুলি খেলে আপনার শরীর ভালোভাবে আয়রন শোষণ করতে পারে।

১২. আপনার থাইরয়েড কম-কার্যকরী

আয়রনের অভাব হলে শরীরের থাইরয়েডের কাজ ধীরগতির হয়ে যায়। এবং এটি মেটাবলিজম বাড়ানোর কাজ বন্ধ করে দেয়। প্রতি ১০ জন থাইরয়েড রোগীর ৬ জনই জানে না তাদের এই রোগটি আছে। সুতরাং আপনি যদি দেখেন শক্তি কমে যাচ্ছে, ওজন বেড়ে যাচ্ছে অথবা শরীরের তাপমাত্রা কম তাহলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন।

১৩. আপনি গর্ভবতী

অনেক মেয়ের সন্তান জন্মদানের সময় প্রচুর রক্তপাত হয়। এর ফলে আয়রনের পরিমাণ কমে যেতে পারে। যদি আপনি গর্ভবতী হন বা কেবলই সন্তান জন্ম দিয়েছেন অথবা প্রতিদিন সকালে মর্নিং সিকনেসের কারণে বমি করেন তাহলে আপনার আয়রন গ্রহণ বাড়াতে হবে।

১৪. আপনার জিহ্বা অস্বাভাবিক

আয়রনের অভাব হলে আপনার জিহ্বা শুকনা থাকবে। তাছাড়া আয়রনের অভাব মায়োগ্লোবিনের পরিমাণ কমিয়ে ফেলে। মায়োগ্লোবিন লোহিত রক্ত কণিকায় থাকে এমন এক ধরনের প্রোটিন। এই প্রোটিন জিহ্বা গঠনকারী পেশী ঠিক রাখে। ফলে যাদের আয়রনের অভাব রয়েছে তাদের জিহ্বায় ক্ষত থাকে, জ্বলুনি হয় এবং জিহ্বা অস্বাভাবিক মসৃণ হয়ে থাকে।

১৫. আপনার হজমজনিত রোগ আছে

আপনার খাবারের তালিকায় যথেষ্ট আয়রন থাকলেও বদহজমজনিত রোগের কারণে আয়রনসহ অন্যান্য পুষ্টি হজমে সমস্যা হতে পারে। এই অবস্থা আপনার পেটে প্রদাহ বাড়াবে এবং হজম প্রক্রিয়াকে নষ্ট করে দেবে। আপনার যদি এই ধরনের কোনো অসুখ থাকে তাহলে চিকিৎসকের সাথে কথা বলুন কীভাবে আপনি আয়রন হজম বাড়াতে পারেন।

কীভাবে আরো বেশি আয়রন পাওয়া যাবে

সবার জন্য আয়রনের প্রয়োজনীয়তা এক রকম না। বিশেষ করে নারীদের বেলায়। ১৯ থেকে ৫০ বছর বয়সী মেয়েদের প্রতিদিন ১৮ মিলিগ্রাম আয়রন দরকার। আর আপনি যদি গর্ভবতী হন তাহলে এর পরিমাণ ২৭ গ্রাম। আপনি যদি সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান তাহলে আরো ৯ গ্রাম বেশি অর্থাৎ ৩৬ গ্রাম দরকার।

আপনার পিরিয়ডের সময় কী পরিমাণ রক্ত যায় তার ভিত্তিতেও এর পরিমাণ বদলাতে পারে। ৫০ বছরের উপরে যাদের বয়স এবং পিরিয়ড বন্ধ হয়ে গেছে তাদের দরকার মাত্র ৮ গ্রাম আয়রন। মসুরের ডাল, পালং শাক, গরুর মাংস, মুরগী অথবা ছোলা এগুলি খেলেই আপনার প্রয়োজনীয় আয়রন আপনি পেয়ে যাবেন।

আয়রনের অভাবের যেমন সমস্যা আছে, আয়রনের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়ে গেলেও সমস্যা। অতিরিক্ত আয়রন শরীরের ভিতরের কোনো অংশ নষ্ট করে দিতে পারে এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস, হার্ট অ্যাটাক এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

আপনার যতটুকু আয়রন দরকার সেই চাহিদাটুকু পূরণ করার চেষ্টা করুন।