পেটে যখন বাচ্চা আসে তখন সব মেয়েরাই উদ্ভট কিছু স্বপ্ন দেখে। আমার মাও দেখত। সে দেখত সাতজন মৌলানা তার ঘরে ঢুকে পায়চারি করতেছে আর দোয়া কালাম পড়তেছে।

প্রত্যেক মৌলানার গালে একইরকম কালো চাপ-দাড়ি, প্রত্যেকের দাঁত ঝিকঝিক করতেছে। স্বপ্নে সেই মৌলানারা ঘরের মেঝেতে মিলাদ পড়ত, একসময় এক এক করে চলে যাইত। এই স্বপ্ন দেখার পর আম্মু খুবই ভয় পাইত, কারণ স্বপ্নের মৌলানারা তার পেটের দিকে তাকায়ে থাকত।

মৌলানা ভয় পাওয়ার আরেকটা কারণও আছে তার, সেইটার শুরু তার কিশোরী অবস্থায়। আমার নানা তখন ট্রান্সফার হইছিলেন মৌলভীবাজার, সেইখানে একটা রুমে তিনটা চকিতে আমার মা-মামাদের ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হইছিল।

আমার মিলন মামা খেয়াল করল চকিতে আমার আম্মু (ডাক নাম খুকী) ঘুমের মধ্যে পুরাটা জিহ্বা বের করে কাঁপতে থাকে আর পশুর মতো গোঙায়। মিলন মামা সবাইরে ডাক দিয়া দেখাইল। আমার নানুমণিও আসলো।

নানুমণি আম্মুকে ডাক দিয়া তুলল, জিজ্ঞেস করল―খুকী, তুই কী স্বপ্ন দেখতেছিলি এইমাত্র?

আম্মু বলতে শুরু করার সাথে সাথে নানুমণি থামায়ে দিলো, কারণ রাতে সে স্বপ্ন শুনবে না।

সকাল হইতেই আম্মু জানাইল, মৌলভীবাজার আসার পর থেকেই সে একজন অল্পবয়সী মৌলানারে স্বপ্নে দেখে। মৌলানার মাথায় যে পাগড়ি―তা সাপের মতো প্যাঁচানো আর শরীরে জোব্বা। স্বপ্নের সেই মৌলানা শুয়ে আছে একটা কবরে, কিন্তু সে মৃত না।

আমার বড় আম্মা (নানুমণির মা) দুই একদিন পর মৌলভীবাজার আসলেন, তারে এই ঘটনা বলা হইল। সেই রাতে বড়আম্মা আমার আম্মুর চকিতে শুইলেন এবং স্বপ্ন দেখলেন (যেইটা সে পুরাপুরি খুইলা কাউরে বলেন নাই)। সকালে ঘুম থেকে উঠার পর উনি বললেন―ওই, তরা খুকীর চকিটা ধইরা ঐদিকে সরায়ে দে!

চকিটা সরায়ে দেওয়ার পর আম্মু সেই স্বপ্নও দেখত না, আর ঘুমে জিহ্বা বের হওয়া বা অন্য অসুবিধা হইত না। কিন্তু, অনেকদিন পর যখন আম্মু বি.এ. পরীক্ষা দিতেছিল তখন একবার দেখল, স্বপ্নের সেই মৌলানা বৃদ্ধ অবস্থায় মারা গেছেন কিন্তু কবরে তার প্যাঁচানো পাগড়িটা আগের মতই সুন্দর, নতুন।

যাই হোক, আমি পেটে আসার পর নতুনভাবে এই সাতজন মৌলানার আগমনে আম্মু একটু ভয় পাইলো। আমার নানুমণি সামনের দরবারের দাদুর থেকে জালের কাঠি-পড়া নিয়া আসলেন, আর আম্মুর কোমরে বেন্ধে দিলেন। কিন্তু কোনো লাভ হইল না।

একসময় আমি হইলাম। সেইরাত্রে আম্মু স্বপ্নে দেখল (যদিও আম্মু এখনো বলে ঐটা স্বপ্ন ছিল না, বাস্তব), সেই সাতজন মৌলানা নাজিম মঞ্জিলের সর্বদক্ষিণের কোঠায় (আম্মুর ছডি-ঘর) উপস্থিত। একজন মৌলানা মশারি ঘেইষা খাটের পাশে বসল। আম্মুর শরীরের সাথে তার শরীর লাইগা আছে… সে তাকায়ে আছে আমার দিকে। মৌলানা দোয়াকালাম পড়তে পড়তে আমারে কোলে নিবে, এই সময় আম্মু চিৎকার শুরু করে দিলো―আম্মা! তাড়াতাড়ি আসেন, ওরা আমার বাচ্চা নিয়া গেল।

আমার নানুমণি আর মেঝোখালা দৌড়ায়ে আসলো, দেখলো কেউ নাই।

তারপরেও আম্মু বলতেছিল―এই যে দেখেন চলে যাইতেছে, সাতজন মৌলানা―জানালার গ্রিল দিয়ে চালে নামতেছে ওই যে―এক, দুই, তিন…

ওই দিনই শেষ দেখা। আর আসে নাই তারা পরে। কিন্তু তার এই অভিজ্ঞতার কথা সবাই জানে, শুনতে শুনতে আমারও মুখস্থ।

২০১৪ সালে তার প্রিয় রঙের শাড়িতে

ছোটবেলা থেকে এই ঘটনা শুনতে শুনতে, আমার মনে হইত―সেই সাতজন আবার আসবে, কোথাও না কোথাও তাদের আমি পাবোই। কিন্তু সেইরকম কিছু হয় নাই আমার সাথে।

জাবিতে ভর্তি হবার পর একবার আমার সাথে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য রওনা দিছি সকাল ছয়টায়। আমাদের পরিচিত রিক্সাওয়ালা, নাম মোহন। মোহন মামা বলতেছিলেন―আম্মা এই কুয়াশায় লঞ্চে উঠার কোনো মানে হয় না। চলেন ফিরত যাই।

আমি তার কথা না শুইনা লঞ্চঘাটে নামলাম, সকাল এগারেটা ত্রিশে টিউটোরিয়াল।

কুয়াশায় এক হাত সামনের মানুষও দেখা যাইতেছে না। আমি ওয়েটিং রুমে ঢুকলাম, এইখানেও কুয়াশা। আমার ঠিক বিপরীত বেঞ্চে একজন মানুষ আবছা দেখা যায়, আস্তে আস্তে সে স্পষ্ট হইতে শুরু করলো। তার চোখে সুরমা, এর আগে এত সুন্দর চোখ দেখি নাই বলে আমার বিশ্বাস।

সে আমার দিকে তাকায়ে আছে, পরনে ঘিয়া রঙের আলখাল্লা আর মাথায় পাঁকানো পাগড়f। সে হাসল, দাঁত ঝিকমিক করতেছে―দাড়ির পাশগুলি কুয়াশায় ভেজা।

আমি হঠাৎ কী মনে করে বাইরে দৌড় দিলাম, এক দৌড়ে মেইন রাস্তায়।

মোহন মামা তখন ডাকতেছে―ওই আম্মা, কইছিলাম না, লঞ্চ আইবো না। চলেন চলেন, বাইত যাইগা।

আমি সেইদিন ভয়ে দৌড় দিছিলাম, এইটা পুরাপুরি সত্য না। একটু ভালোও লাগতেছিল, আবার একটু লজ্জাও পাইতেছিলাম। রিকশায় ফেরত আসতে আসতে মনে হইতেছিল, আরেকবার যাই, গিয়া দেখি তো আছে কিনা!

এরপরে অনেক মৌলানা দেখছি। তাদের সাথে কথা হইছে আমার। আমার মায়ের স্বপ্নের কথাও শেয়ার করছি। তারা অনেকেই বলছে, আমার জন্ম তাৎপর্যপূর্ণ। তারা সবাই আমারে পর্দা করার উপদেশ দিছে। তাদের মধ্যে একজন বলছে, আমি নাকি সুফি পর্যায়ে চলে যাব। কিন্তু তাদের কথা অত গুরুত্ব দেই নাই।

আম্মুরে গত রাতেও সেই স্বপ্নের কথা জিজ্ঞেস করছিলাম। আম্মু একই ভাবে বলল, বলতে বলতে তার গায়ে কাঁটা দিতেছিল। সে হাতের তালু দিয়া বাহুর জায়গাগুলি (যেইখানে কাঁটা দেয়) মালিশ করলো। মৌলানাগুলির দাঁতের কথা বলতে গিয়া নিজের আঙুল দিয়া নিজের দাঁত ঘষতে ঘষতে বলল―দাঁতগুলি মিছিল, আঁকাবাঁকা নাই।

আমি অবাক হইলাম, মানুষের কিছু অনুভূতি আর স্বপ্নরে বয়স বা বার্ধক্য শিথিল করতে পারে না। কিছু অনুভূতি নতুন চাকুর মতই তীক্ষ্ণ আর তীব্র।

আমি এখনও জানি না, এই স্বপ্নের তাৎপর্য কী। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই মনে হয়, আমি স্বপ্নের সাতজন মৌলানারে একদিন দেখতে পাবো। তারা কবে আসবে? হয়তো আমার মৃত্যুর সময়…।

(বি.দ্র. আমার এই লেখাটা আম্মুর মারা যাওয়ার আগের। আম্মু একটা সময় স্বপ্নে দেখত, মৌলানা কবরের ভিতরে জিন্দা আছে। আর আমি এখন প্রায়ই স্বপ্নে দেখি আম্মা কবরে, কিন্ত বলতেছে, দেখ! আমি মরি নাই। কেন আমি এমন দেখি, তা জানি না।)

Author

জন্ম. মুন্সীগঞ্জ, ১৯ জুলাই, ১৯৮২। দর্শন নিয়ে পড়াশুনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবিতার বই 'ঊনসপ্ততি' ও 'দ্বৈপ'। প্রকাশক. বৈভব।

Write A Comment