রোগীদের সংস্পর্শে এসে তাদেরকে যারা সেবা দেন, সেই স্বাস্থ্যকর্মীরা কোভিড-১৯ রোগীদের ব্যপারে জটিল একটা সমস্যার কথা বলতে শুরু করেছেন।

অনেকবারই তারা ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছেন, প্রথমে অনেক রোগী খুব সাধারণ লক্ষণ নিয়ে ইমার্জেন্সি রুমে আসেন, যারা বাড়িতেই নিজেদের চিকিৎসা করতে পারেন। তার ২/১ দিন পর সেই রোগীরাই মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় আবার হাসপাতালে আসেন। ইমার্জেন্সি রুমের একজন ডাক্তার এমন পরিস্থিতির বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, প্রথম দিকের লক্ষণগুলি খুবই হালকা ধরনের। এই লক্ষণগুলি থেকেই ধুম করে পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়। মানুষ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে। আর এগুলি দেখাটা সত্যিই ভয়ঙ্কর।

কিছু রোগীও একই রকম অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। প্রথম কিছুদিন তারা কাশি, ক্লান্তি এবং পেশী ব্যথার মত হালকা লক্ষণগুলি দেখেন। তারপরে হঠাৎ করে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, যেন ফুসফুসে বাতাস যাওয়াই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

চিকিৎকরাও লক্ষ্য করেছেন, সপ্তাহ খানেক পরে কিছু রোগী তাদেরকে বলেছেন, আগের চাইতে তাদের কিছুটা ভালো লাগছে। কিন্তু তারা সুস্থ হওয়ার ২/১ দিন পরেই আবার সাঙ্ঘাতিক লক্ষণগুলি নিয়ে ফিরে আসেন। আর তখন তাদেরকে অক্সিজেন দেওয়া অথবা কৃত্রিম শ্বাসনালী স্থাপনের মত হাসপাতালের নিবিড় সেবার প্রয়োজন হয়।

 

কোভিড-১৯ রোগের ব্যপ্তিটা কেমন হতে পারে?

এই পর্যন্ত পাওয়া তথ্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ২৫-৩০% রোগীরা লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগের অবস্থায় থাকতে পারেন। কিংবা তাদের মধ্যে একেবারে কোনো লক্ষণ দেখা নাও যেতে পারে। এভাবে তারা না জেনেও কোভিড-১৯ বহন করে অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে থাকতে পারেন। প্রায় ৮০% মানুষের মধ্যে শুধুমাত্র হালকা থেকে মাঝারি ধরনের অসুস্থতা দেখা যেতে পারে এবং তাদের অবস্থা এই পর্যায় থেকে বেশি খারাপ হয় না। তবে প্রায় ১৬% মানুষের অবস্থা খারাপ দিকে যায় এবং তারা আরও গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন।

কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীদের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা যা দেখছি তাতে করে বলা যায়, ঠাণ্ডা লাগলে যেমন হয়, রোগটির হালকা লক্ষণগুলি তেমনই। আক্রান্ত কেউ সর্দি, কাশি বা গলাব্যথা অনুভব করতে পারেন। মাঝারি-হালকা ধরনের লক্ষণগুলি ফ্লু বা সাধারণ নিউমোনিয়ার মত লক্ষণ আকারে দেখা যেতে পারে। বেশ কয়েক দিন ধরে দুর্বল লাগা, ঘন অথবা শুষ্ক কাশি, জ্বর কিংবা শ্বাসকষ্টের মত লক্ষণ এই পর্যায়ে স্বাভাবিক। এই লক্ষণগুলি কাটিয়ে উঠতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে, এমনকি হাসপাতালেও ভর্তি হওয়া লাগতে পারে। গুরুতর রোগীদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, বাতাসের অভাব বোধ হওয়া বা প্রচুর কাশি দেখা যেতে পারে। তাদেরকে অতিসত্বর হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন। চিকিৎসার জন্যে অক্সিজেন দেওয়া, আইসিইউ-তে রাখা কিংবা ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন হতে পারে তাদের। এবং তারা সাধারণত মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে থাকেন।

এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, সম্ভাব্য লক্ষণগুলির মধ্যে জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্ট ছাড়াও অন্যান্য লক্ষণ দেখা যেতে পারে। যেমন মাথাব্যথা, সর্দি, গলাব্যথা, দুর্বলতা, অবসন্নতা, গা-গোলানো ভাব, পেশী ব্যথা, বমি বমি ভাব, পেট খারাপ, ডায়রিয়া, স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতি হ্রাস কিংবা চোখ লাল হয়ে যাওয়া।

 

লক্ষণ খারাপ হওয়ার ক্ষেত্রে কারা বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছেন?

এক কথায় বললে, এর উত্তর আমরা এখনো জানি না।

এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ, হঠাৎ কার অবস্থা খারাপের দিকে যাবে, আমরা তা এখনো জানি না। রোগটা ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের পাশাপাশি বয়স্কদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। এমন লোকরাও আক্রান্ত হচ্ছেন যাদের আগ থেকেই অনেক অসুখ ছিল। আবার এমন অনেকে আছেন, যারা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার আগে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন।

রোগীদের সংস্পর্শে আসা প্রথম সারির স্বাস্থ্যকর্মীদের থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, রোগটির বিস্তারের প্রথম দিকে যেসব প্রবণতা আমরা দেখেছি, তাতে করে বলা যায় হালকা লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া বেশিরভাগ রোগীর মধ্যে ৩ থেকে ৫ দিনের মাথায় লক্ষণগুলি প্রকাশ পায়। আর তারা প্রায় ১ সপ্তাহের মধ্যে সুস্থতার লক্ষণ দেখাতে শুরু করে। এবং প্রায় ২ সপ্তাহের মধ্যেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে। আবার, যারা আরো মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাদের মধ্যে ৫ দিন থেকে শুরু করে আক্রান্ত হওয়ার ২য় সপ্তাহ, অর্থাৎ ৭-১০ দিনের মধ্যে লক্ষণগুলি খারাপ হওয়া শুরু করে।

আরো কিছু তথ্য থেকে দেখা যায়, যাদের মধ্যে গুরুতর অবসন্নতা, মাথাব্যথা, পেটে ব্যথা এবং শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা যায় সেগুলি সাধারণত তাদের অতীত রোগেরই উপসর্গ। বিশেষ করে যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি এবং যাদের হার্ট, ফুসফুস, কিডনির রোগ, ক্যান্সার অথবা শরীরের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল, তাদেরই এমনটা হয়ে থাকে।

আরেকটা তথ্য বলছে, যদি বিশ্রাম নেওয়ার সময় দেখেন আপনার শ্বাস-প্রশ্বাসের হার (মিনিটে শ্বাসের সংখ্যা) ২৪ এর বেশি, তার মানে হতে পারে আপনি কোভিড-১৯ এ মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। কিন্তু যদি ২০ বারের কম শ্বাস নেন, তাহলে কম ঝুঁকির মধ্যে আছেন।

মনে রাখা দরকার, এই সিদ্ধান্তগুলি সব প্রাথমিক পর্যায়ের সীমিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে।

 

নিজেকে রক্ষার জন্য তাহলে আপনার কী করা উচিত?

যেহেতু রোগটির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যের অবস্থা হঠাৎ খারাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে, আপনার মধ্যে কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে বাসার অন্যদের থেকে আলাদা হয়ে যান। ঝুঁকি না নিতে চাইলে রোগের লক্ষণগুলি দিনে একাধিকবার পরীক্ষা করুন। বার বার শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করুন, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার চেক করুন, কাশি পর্যবেক্ষণ করুন এবং শ্বাসকষ্ট বাড়ছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখুন।

পরীক্ষায় ধরা পড়ুক বা না পড়ুক, আপনার মধ্যে যদি কোভিড-১৯ এর উপসর্গ থাকে, তাহলে নিজেকে খুব সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করুন। আর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তারকে জানান।

হঠাৎ করে শ্বাসকষ্ট হওয়া, নিয়ন্ত্রণহীন কাশি, মাথা ঘোরা, বুকে অস্বস্তি হওয়ার মত লক্ষণগুলির অর্থ হল আপনার জরুরি সেবার প্রয়োজন। সুতরাং, যদি আপনার মধ্যে এই লক্ষণগুলি দেখা যায়, তাহলে অবিলম্বে হাসপাতালে যান।

সূত্র. ওয়েব এমডি

অনুবাদ. ফারহান মাসুদ

Write A Comment