সিনেমার ‘দেবী’

সিনেপ্লেক্সে ১টা ৪০ এর শো’তে পরিচালক অনম বিশ্বাসের দেবী দেইখা অাসছি গতকাল ৩০ অক্টোবর। হলে ঢুকতে মিনিট দশেক লেট হইছে তবে তাতে কিছু মিস হইছে বইলা মনে হয় নাই।

গিয়া যা পাইছি, নীলু (শবনম ফারিয়া) তাদের গাড়িতে কইরা ভার্সিটিতে যাবে। আর রানু (জয়া অাহসান) বের হইছে বাজার করতে। রানু গাড়িতে বসা নীলুকে দেইখা ভার্সিটিতে যাইতে নিষেধ করল। কারণ তার ধারণা গাড়িতে গেলে নীলুর বিপদ হইতে পারে। নীলু তাতে একটু অবাক হইল, এবং গাড়ি ছাইড়া রিকশা নিয়া ভার্সিটিতে গেল। আর রানু গেল বাজারে।

শবনম ফারিয়ার মধ্যে নীলুকে পাওয়া গেছে। তিনি রানুর নিষেধাজ্ঞায় কিছুটা ইতস্তত হইয়া নিজের অংশ সুন্দর মতই শেষ করছেন, অ্যাকটিং পুরা সিনেমাতেই ভাল ছিল, বাড়তি কিছু করেন নাই, চরিত্রের মত থাকছেন। তবে সিনেমার শেষ সিনে বিশেষ ভাল করেন নাই।

কিন্তু, নীলুর সঙ্গে গাড়ির সিনে জয়া অাহসান ওভার অ্যাকটিং করলেন। ওই সিন থেকেই মনে হইল সিনেমায় উনার চরিত্র কেমন তার বদলে রানু চরিত্রের যে অলৌকিকতা এবং জয়া অাহসানের নিজস্ব অভিনয় রীতি তাই এইখানে মুখ্য বিষয়।

খালি এখানেই না, পুরা সিনেমাতে তিনি এরকমই ছিলেন। তা তো রানু না। রানু তার সমস্যার বাইরেও যেভাবে সবকিছু দেখতে পারে তা সিনেমায় অানা হয় নাই। এর বাইরে বেশিরভাগ সময় রানু চরিত্রের অন্যমনস্কতা এবং পাওয়ার দেখাইতে জয়া আহসান দুলতেছিলেন, কিছুটা মাদকাসক্তের মত বা খুব ধীরে ধীরে মুভ করতেছিলেন, মাথা নাড়াইতেছিলেন। তাতে রানুর চরিত্র বিকৃত হইছে।

এইটা অামার নির্দেশকের সমস্যা বইলা মনে হইছে। নির্দেশক চাইলে একজন সাধারণ অভিনেতাকে দিয়াও অনেক সাবলীল অভিনয় করায়া নিতে পারেন। অার এই সিনেমায় অাছেন দেশের বিখ্যাত অভিনেতারা এবং একজন বাদে প্রত্যেকেই খারাপ অভিনয় করছেন!

দেবী
‘দেবী’ সিনেমার পোস্টার

চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় এর অাগে অামি মনপুরাতে এবং টিভি নাটকে কিছু দেখছি, খারাপও লাগে নাই ভালোও লাগে নাই। তবে উনার অভিনয়ের মধ্যে একজন অভিনেতাকে অতিক্রম কইরা শিল্পী হইতে চাওয়ার চেষ্টাটা থাকে, মানে একটা থিয়েটারধর্মী ব্যাপার থাকে। যার কারণে জিনিসটা ক্লিশে হইয়া দাঁড়ায়। মিসির আলি করতে গিয়া উনি এই সমস্যার বাইরে অারো কিছু সমস্যা করছেন। যেমন, চঞ্চল উনার চরিত্রটাই বোঝেন নাই। মিসির আলি চরিত্রের যে সরল গাম্ভীর্য, বুদ্ধিমত্তা, এবং তা যে সকল প্রকার বাহুল্যের বাইরে তা উনার অ্যাকটিং-এ অাসে নাই। বরং তার বদলে খুব সাধারণ একটা খেয়ালী এবং মাঝে মাঝে কৌতূহলী একজন প্রফেসরের চরিত্র দেবীতে নতুন যোগ করা হইছে বইলা মনে হইছে। উনার মধ্যে মিসির অালিকে পাই নাই।

ইরেশ জাকেরও প্রথম দুই একটা সিন বাদে বাকি সব জায়গায় বাজে অভিনয় করছেন। ভালোগুলি বলতে নীলুর সঙ্গে প্রথমবার যখন দেখা করতে আসেন উনি, তা অবশ্য মোটামুটি বলা যায়। তবে তার চরিত্রটা স্পেসিফিকভাবে বোঝা ওই সিনটায়, উনি যখন নীলুর হাতে ফুলের মালা পরাইয়া দেন এবং নীলুর সেইটা কড়া লাগতেছে বইলা রেস্টোরেন্ট বা ক্যাফের মধ্যেই মালাটা ছুঁইড়া ফালায়া দেন।

এর বাইরে বাদবাকিদের অভিনয় মোটামুটি হইছে, কারণ সবাই কমবেশি ওভার অ্যাকটিং করছে। তাতে সিম্পল চরিত্রগুলিও সৌন্দর্য হারায়া একটা রিপিটেশনের মধ্য দিয়া ঘুরপাক খাইছে।

দেবী
অবসর প্রকাশিত ‘দেবী’

গল্পের কথা বলতে গেলে, তারা উপন্যাস পুরাপুরি অনুসরণ করে নাই। বানানেওয়ালার অালগা মাতব্বরিতে মূল গল্পের যে বিস্তৃতি এবং রহস্যময়তা অাছে তা সিনেমায় অাসে নাই। দেইখা মনে হবে, সিনেমাটা ভৌতিক হইতে চাইয়া শেষ পর্যন্ত তা হইয়া উঠতে পারে নাই।

সিনেমার মাঝখানে মিসির অালি জালালউদ্দিনের খোঁজে যখন রানুদের গ্রামে যান সেই অংশে গল্প কিছুটা কাঠামো নিতে শুরু করছিল। কিন্তু, গ্রামবাসীদের পুরা এক্সপ্রেশনরে হাস্যরস বানায়া ফেলার কারণে তা অাবার পূর্বের জায়গায় ফেরত গেছে। তাদেরকে দিয়া জালালউদ্দীনের ব্যাপারে বলানোর বেশিরভাগ এক্সপ্রেশন টিটকারিমূলক—এই অাধুনিকতা কই দেবী  উপন্যাসে?

সবচেয়ে বড় সমস্যা হইল পুরা সিনেমার একটা সিঙ্গেল অংশও দেবীর যে সময়, বাস্তবতা তা ধরতে পারে নাই বা বলা উচিত ইচ্ছাকৃতভাবে তা বাদ দেওয়া হইছে। উপন্যাসে মিসির অালি থাকেন খুব সাধারণ একটা বাসাতে, ফার্নিচার বলতে না হইলেই না এমন জিনিসপত্র কিছু আছে তার, বাসাটা খোলামেলা বা প্রচুর আলো বাতাস এমন কোনো ব্যাপার নাই। যেইটা অাসলে তার চরিত্রের রিফ্লেকশন। তিনি বাহুল্য নিয়া চলেন না, সংসারী লোক না এবং প্রয়োজনীয় জিনিসে ফোকাসড থাকতে পছন্দ করেন। অার দেবী সিনেমায় মিসির আলি থাকেন হাতির ঝিল লাগোয়া একটা সৌখিন খোলামেলা চিলেকোঠা ধরনের জায়গায়, চারপাশ খোলা, ঝড়ের মত বাতাস আসতে থাকে, প্রচুর আলো। সেইখানে অাবার বিবিধ গাছ লাগাইছেন তিনি। মিসির অালীকে কিছু জায়গায় ইতস্ততও দেখাইতে চাইছেন ডিরেক্টর, সে নিজের পরিচয় দিতে গিয়া এক জায়গায় সংকোচ করতেছিলেন। জিনিসটা হাস্যকর। চরিত্রই নাই কইরা দেওয়া হইছে সিনেমার খাতিরে।

এই একই জিনিস তারা রানুর ক্ষেত্রেও করছেন। উপন্যাসে রানুর বয়স ১৬/১৭। মানে, সে একজন কিশোরী। কিন্তু সিনেমায় বলা হইল রানুর বয়স ২৫। কিশোরী রানুর যে চাঞ্চল্য, সরলতা—তা ২৫ বছরের রানুকে দিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হইছে। ঘটনা ছাড়া গল্প অাগায় না ঠিক, কিন্তু ঘটনাগুলি তো আবর্তিত হয় চরিত্রকে কেন্দ্র কইরা। এখন সেই চরিত্রগুলি আপনি বদলাইয়া দিলেন। তাতে কী হয়? গল্পের চরিত্রকে বদলাইয়া দেওয়া মানে আসলে চরিত্রটাকে বিলুপ্তই কইরা দেওয়া। ফলে, নতুন চরিত্র দিয়া যে পুরান গল্প চালাইতেছেন তা অাসলে চরিত্রহীন গল্প অাকারেই আগাইতেছে।

এর বাইরে, নীলুকে স্পেস না দিয়া পুরা ব্যাপারটা রানুকেন্দ্রিক কইরা ফেলা হইছে। এমনকি উপন্যাসের মূল চরিত্র মিসির অালি দেবী সিনেমায় অাইসা আর মূল চরিত্র থাকে নাই, সেই জায়গা নিছেন রানু চরিত্রে অভিনয় করা জয়া অাহসান। তা কেন? তিনি একই সঙ্গে সিনেমার প্রযোজক বইলা এমন হয় নাই তো?

সংলাপের ক্ষেত্রেও তাদের বহুত পাকনামি ছিল। যেইটার কারণে, সিগনিফিকেন্ট পয়েন্টগুলিতে জিনিসপাতি চেইঞ্জ হওয়ায় চরিত্রগুলা চিপ হয়ে গেছে। এর ফলে যেইটা হইছে যে, সব মিলাইয়া সিনেমাটা গল্পহীনভাবে খালি রানুর অলৌকিকতা এবং ছায়ানির্ভর টানা-হ্যাঁচড়া ও গোঙানির মধ্য দিয়া কোনোভাবে শেষ হইছে।

গান প্রসঙ্গে বলতে গেলে অনুপম রায়ের একটা গান আছে এই সিনেমায়। সেইটা অযথা। অনুপম রায়কে দিয়া গাওয়ানোটা বেশ একটা রোমান্টিসিজম হইছে সিনেমায়। এই সিনেমার সঙ্গে এমন সৌখিনতা যায় না। অ্যামেচারের বিষয় তো না এই সিনেমা। এমন হইলে এইটা একটা বাজারি সিনেমাই হইতে পারত, দেবী উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমা না হইয়া। এছাড়া পুরা টাইমটা অলৌকিকতা ধইরা রাখতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার করছেন তারা, তা গল্পের ফ্লো নষ্ট করছে!

দেবী
হুমায়ূন আহমেদ

এছাড়া নির্দেশনায় বেশ দুর্বলতা দেখতে পাই। নির্দেশনার একটা ক্যালকুলেটিভ সাইকোলজি অাছে, যেখান থেকে নির্দেশক কী করবেন, কোনটার পর কোনটা করবেন, চরিত্রদের দিয়া কী করাবেন তা বোঝেন। যেমন ধরেন খুব ছোট একটা বিষয়, সিনেমাতে যতবার চা খাইতে দেখানো হইছে, প্রত্যেকটা জায়গার চায়ের কালার এক, কেন? এই জিনিস আমারে ধরাইয়া দিছেন আমার লগে যাওয়া বন্ধু। দেখলাম, সে ঠিকই বলছে। তা তো হওয়ার কথা না। প্রত্যেক বাড়ির চায়ের নিজস্ব রঙ অাছে। তা সেটের চায়ের রঙ কীরূপ তা দিয়া নির্ধারিত হবে না। এইটা নির্দেশকের কম বোঝার সমস্যা।

আরো পড়ুন: সময় নিয়ে

সেকেন্ড যেই সমস্যাটা নির্দেশককে ভোগাইছেন তা হইল, সিংক্রোনাইজেশন। এক দৃশ্যের সঙ্গে পরবর্তী দৃশ্যের যে সম্পৃক্ততা তা খুব কমই তৈরি করতে পারছেন তিনি। বেশিরভাগই খাপ ছাড়া খাপ ছাড়া। সিনেমা নির্দেশনার এই ক্যালকুলেশনগুলিতে গিয়া মূল ধরাটা খাইছে। ফলে, চরিত্রগুলি ডেভেলপ করে নাই, গল্প দাঁড়ায় নাই। সব মিলাইয়া দেবী সিনেমাকে অত ভাল বলা যায় না। সিনেমাটা ভাল লাগে নাই আমার!

৩১ অক্টোবর, ২০১৮