সিভিক টেকনোলজি বা নাগরিক প্রযুক্তি যেভাবে প্যানডেমিক থামাতে সাহায্য করে

করোনাভাইরাস মহামারিতে পৃথিবীর প্রায় সব দেশই আতঙ্কিত ও বিপর্যস্ত। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মত শক্তিধর দেশও ভাইরাস ও মহামারি মোকাবিলা করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। ইতালি, স্পেন ও জার্মানির মত ইউরোপের প্রধান দেশগুলিও এই মহামারি মোকাবিলায় বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তুলনামূলকভাবে, মহামারির উৎপত্তিস্থল চীনের প্রতিবেশী ও এশিয়ার ছোট একটি দেশ তাইওয়ানের অবস্থা অনেক অনেক ভাল। তাইওয়ানের ভাইরাস ও মহামারি মোকাবিলা করার পদ্ধতি নিয়ে একটা চমৎকার আর্টিকেল লিখেছেন জ্যারন ল্যানিয়ার ও ই গ্লেন উয়েল। তারা বলছেন তাইওয়ানের পারফরম্যান্স বিশ্বের মধ্যে বেস্ট। ‘হাউ সিভিক টেকনোলজি ক্যান হেল্প স্টপ এ প্যানডেমিক’ নামের আর্টিকেলটি ফরেন অ্যাফেয়ার্স এ প্রকাশিত হয়েছে। তাইওয়ান কীভাবে টেকনোলজি ও ডেমোক্রেসির সমন্বয়ে সুষ্ঠুভাবে এই সংকট মোকাবিলা করছে সেটা দেখিয়ে কম্পিউটার সায়েন্টিস জ্যারন ল্যানিয়ার ও ইকোনমিস্ট ই গ্লেন ওয়েল বলছেন তাইওয়ানের প্রাথমিক সফলতাই বাকি বিশ্বের জন্য একটা মডেল  হতে পারে। সেই আর্টিকেল অবলম্বনে দুই পর্বের এই লেখা। এখানে প্রথম পর্ব।

১.

নভেল করোনা ভাইরাসের সারাবিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়া ও এর কারণে তৈরি হওয়া কোভিড-১৯ এর মহামারি আমাদের পৃথিবীর সমাজ ব্যবস্থা ও শাসন ব্যবস্থার একটা শক্ত পরীক্ষা নিয়ে নিচ্ছে। এই ব্যাপারটাকে মোকাবিলা করার পদ্ধতি বিচার করলে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুই শক্তিধর রাষ্ট্র চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে, একজনের থেকে আরেকজনকে আলাদা করা যাচ্ছে না। শুরুর দিকে চীন প্রথমে রাজনৈতিকভাবে এই ভাইরাসকে অস্বীকার করার মাধ্যমে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ ধরে ভাইরাসটাকে ছড়াতে সাহায্য করেছে। যদিও পরবর্তীতে চীনের গৃহীত কিছু পদক্ষেপ আসলেই কাজে লেগেছে। তবে ততদিনে এই ভাইরাস যতটা সম্ভব ততটাই ছড়িয়ে পড়েছে, প্রথমে অভ্যন্তরীণভাবে ছড়িয়েছে, আর পরে সারা বিশ্ব জুড়ে।

(যেহেতু আগেও চীনে অন্য প্রাণিদেহ থেকে মানবদেহে বিভিন্ন ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা অনেকবারই ঘটেছে, তাই চীনের উচিৎ ছিল এই বিষয়টা নিয়ে আগে থেকেই আরো ভালো ভাবে প্রস্তুত থাকা।) যুক্তরাষ্ট্রও চীনের পথেই হেঁটেছে, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং নীতি আরোপ করার আগে প্রথমে তারা এটাকে রাজনৈতিকভাবে অস্বীকার করেছে। এমনকি এই সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং নীতি আরোপ করার পরেও, এই ভাইরাস ও মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে যে পাবলিক হেলথ বা জনস্বাস্থ্যে তাদের বিনিয়োগ কত কম এবং এই ধরনের জরুরি পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতি কত দুর্বল।


আশরাফুল আলম শাওন


এই মহামারির প্রতি আমলাতান্ত্রিক ও টেকনোফোবিক (প্রযুক্তিকে ভয় পায় এমন) ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিক্রিয়া আরো বাজে প্রমাণিত হয়েছে—মহামারির উৎপত্তিস্থল থেকে অনেক অনেক দূরে অবস্থিত ইতালিতে পার ক্যাপিটাতে আক্রান্তের হার চীনের তুলনায় চার গুণ। এবং শৃঙ্খখলার জন্য বিখ্যাত জার্মানির আক্রান্তের হার ইতোমধ্যেই চীনের অর্ধেক। পৃথিবীর অন্যান্য অংশের দেশগুলিতেও, যেমন ইরানের অবস্থাও খুব খারাপ। তথ্য ম্যানিপুলেট করার জন্য ইরানের বদনাম আছে, তারপরেও যা প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে অবস্থা আসলেই ভয়াবহ।

যেসব দেশ খুব বাজেভাবে মোকাবিলা করছে তাদের দিকে ফোকাস করাটা এখন তেমন একটা কাজে লাগবে না। বরং যে দেশটি এখন পর্যন্ত বেশ ভালো ভাবে মোকাবিলা করেছে তার দিকে ফোকাস করাটা গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হল তাইওয়ান। যদিও তাইওয়ানকে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা চীনের অংশ মনে করে, এবং যদিও তারা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় টেস্ট করেছে (এর মানে সংক্রমণের প্রকৃত হার বেশি লুকানো হয় নাই) যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় তাইওয়ানের প্রকাশিত কেস পাঁচ ভাগের এক ভাগ। এবং অন্যদিকে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত সিঙ্গাপুরের তুলনায় দশ ভাগের একভাগ। কিন্তু তারপরেও বলা যায় না, সেখানে সংক্রমণ আবারও বাড়তে পারে, বিশেষ করে এই ভাইরাসের বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার ভেক্টর যখন নির্ভর করছে মানুষের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা ভ্রমণ করার উপরে। তারপরও তাইওয়ানের এই প্রাথমিক সাফল্যের কথা শেয়ার করাটা গুরুত্বপূর্ণ শুধু এই কারণে না যে তারা এই বর্তমান মহামারিটাকে মোকাবিলা করতে পেরেছে, গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এই উপলক্ষ্যে তারা প্রযুক্তি ও গণতন্ত্রের জন্য চ্যালেঞ্জিং বিষয়গুলি চিহ্নিত করে সেগুলি নিয়ে কাজ করেছে।

তাইওয়ানের সফলতার পিছনে ছিল প্রযুক্তি, অ্যাক্টিভিজম ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ। এই তিনটা জিনিসই একসাথে তাইওয়ানের সাফল্যের পিছনে কাজ করেছে। তাইওয়ান ছোট হলেও প্রযুক্তিগতভাবে এখন সর্বোচ্চ আধুনিক ও ভীষণ গণতান্ত্রিক দেশ। চীনের মত একটা সুপার পাওয়ারের ছায়ায় থেকেও, গত কয়েক বছরে তাইওয়ান গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য না, বরং গণতন্ত্রের অগ্রগতির জন্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে পৃথিবীর সবচেয়ে দারুণ একটা রাজনৈতিক কালচার তৈরি করেছে। করোনাভাইরাসের এই মহামারি মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করেছে এই নাগরিক প্রযুক্তির কালচার।

গণতন্ত্রের জন্য প্রযুক্তি
তাইওয়ানের প্রযুক্তি নির্ভর নাগরিক কালচারের গুরুত্ব এই সংকটের সময় খুব ভালো ভাবেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। একদম তলা থেকে ইনফরমেশন শেয়ার করা, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ, ‘হ্যাক্টিভিজম’ (অনলাইন পাবলিক সার্ভিসের জন্য অ্যাক্টিভিজম) এবং এইসব কিছুতে সবাই মিলে অংশগ্রহণ করার কারণেই তাইওয়ানে সর্বসম্মতিমূলক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় করোনাভাইরাসকে মোকাবিলা করা গেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিন তাইওয়ানের ১২৪টা পদক্ষেপ চিহ্নিত করেছে যেগুলি তাইওয়ান মারাত্মক দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন করেছে। এই পদক্ষেপগুলির মধ্যে অনেকগুলিই পাবলিক সেক্টরে বাস্তবায়ন করা হয়েছে আলাদা আলাদা ভাবে একেকটা কম্যুনিটিতে প্রয়োগ করার মাধ্যমে, হ্যাকাথনের মাধ্যমে এবং ভিতাইওয়ান নামের একটা ডিজিটাল ডেমোক্রেসি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে।

ভিতাইওয়ান নামের এই প্ল্যাটফর্মে তাইওয়ানের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক অংশগ্রহণ করে। এই প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক আকারে হ্যাক্টিভিজম ও নাগরিক আলোচনা চালু আছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যেকোনো পদক্ষেপ খুব সুশৃঙ্খলভাবে ও বড় জনগোষ্ঠীর অনুমোদন নিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়।

এটা কাজে লাগানোর একটা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হল ফেস মাস্ক ম্যাপ। তাইওয়ান সরকারের সাথে কাজ করে এমন কয়েকজন উদ্যোক্তা এই প্রজেক্টটি শুরু করেছিল। আতঙ্কিত জনগোষ্ঠীর ব্যাপক হারে মাস্ক কেনা থামানোর উদ্দেশ্যে এই ফেস মাস্ক ম্যাপ চালু করা হয়। ২০০৩ সালে তাইওয়ানে সার্স ভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এই আতঙ্কিত জনগোষ্ঠীর ফেস মাস্কের জন্য মরীয়া হয়ে উঠার কারণে। তাইওয়ানে এইবার সরকার নিয়ম করে যে প্রতিটা নাগরিকের জন্য প্রতি সপ্তাহে দুইটা ফেস্ক মাস্ক বরাদ্দ থাকবে। তবে শুধু এই বরাদ্দই যে যথেষ্ট না, স্থানীয় ফার্মেসিগুলিতে মানুষ মাস্কের জন্য ভিড় করবে সেটা অনুমান করে সরকার ডিজিটাল মিনিস্ট্রির মাধ্যমে একটা অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) রিলিজ করে। এই এপিআই এর মাধ্যমে পাবলিক জানতে পারে কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় ঠিক ওই সময়ে কী পরিমাণ মাস্ক আছে। অর্থাৎ লোকেশন-স্পেসিফিক রিয়াল টাইম ডাটার মাধ্যমে পাবলিক জানতে পারছিল কোথা থেকে সে সহজে তখন মাস্ক নিতে পারবে।

তাইওয়ানের ডিজিটাল মিনিস্টার অদ্রে ট্যাং সেই উদ্যোক্তাদের ও হ্যাক্টিভিস্টদের সাথে ভিতাইওয়ানের একটা ডিজিটাল চ্যাটরুমে কাজ করা শুরু করেন এবং খুব দ্রুত অনেকগুলি ম্যাপ ও অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেন। এর মাধ্যমে প্রতিটা নাগরিক দেখতে পারছিল কোথায় কী পরিমাণ মাস্ক আছে। তবে ফেস মাস্কের এই অ্যাপ্লিকেশনটা তার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ করেছে। এই অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে জনগণ তার নিজের বরাদ্দে থাকা অংশ অন্যদেরকে ডোনেশন দিতে পারত তাদেরকে যাদের ওই সময়ে প্রয়োজনটা বেশি। এর ফলে এই মহামারিকে কেন্দ্র করে কোনো কালোবাজার বা ব্ল্যাক মার্কেটও তৈরি হয়নি। হ্যাকিং এর জগতে একটা জিনিস প্রায়ই ঘটে যে, কোনো একটা অ্যাপ্লিকেশন চালু করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখ লাখ কুয়েরী (Query) চালানোর কারণে চাপ নিতে না পেরে অ্যাপ্লিকেশনটি ক্র্যাশ করে, এইক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল। কিন্তু তাইওয়ানের সরকার তাতে দমে না গিয়ে আরো উদ্দীপিত হয়ে ওঠে এবং তাইওয়ানের পুরো জনগোষ্ঠী যাতে সহজে অ্যাপ্লিকেশনটি ব্যবহার করতে পারে এমন একটি ভার্সন তৈরি করার জন্য রিসোর্স প্রদান করে। এই অ্যাপ্লিকেশনের ফলে শুধু মাস্ক বিতরণ করার একটা সুষ্ঠু ব্যবস্থাই তৈরি হয়নি, সেইসাথে এটা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কমিয়েছে এবং ব্যাপকভাবে আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে দিয়েছে।

দ্বিতীয় উদাহরণটি হল এমন একটা প্ল্যাটফর্ম যেটার মাধ্যমে তাইওয়ানের নাগরিকরা সম্মিলিতভাবে ভাইরাসের সংক্রমণ কমানোর জন্য কাজ করেছে। এই প্ল্যাটফর্মটাও কয়েকজন উদ্যোক্তা, তাইওয়ানের ডিজিটাল মিনিস্ট্রি ও হ্যাক্টিভিস্টরা মিলে তৈরি করেছে। ভাইরাস সংক্রমিত অনেক বেশি প্যাসেঞ্জার নিয়ে একটা ক্রুজ শিপ তাইওয়ানে আসার পরে এই প্ল্যাটফর্ম বানানোর কাজটি শুরু হয়। নাগরিকেরা উপসর্গ ও ভাইরাস বিষয়ক বিভিন্ন রিয়াল টাইম রিপোর্ট শেয়ার করার জন্য এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করত। স্মার্টফোন বা ফোনকলের মাধ্যমে তারা তথ্য শেয়ার করে। সেই তথ্য খুব দ্রুত যাচাই বা ভেরিফাই করা হয় এবং সন্নিবেশ করা হয়। এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নাগরিকেরা তাদের স্মার্টফোনের লোকেশন হিস্টোরির মাধ্যমে জানতে পারে তারা ভাইরাস সংক্রমিত কোনো লোকেশনে যাওয়ার মাধ্যমে ভাইরাস এক্সপোজড হয়েছে কিনা। যাদের উপসর্গ আছে এবং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে জানতে পেরেছে তারা ভাইরাস এক্সপোজড হয়েছে, তারা সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য অন্যদের সাথে দূরত্ব তৈরি করে ও মেলামেশা বন্ধ করে দেয়।

এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার ক্ষেত্রে উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ব্যাপার ছিল না। পুরা ব্যাপারটাই ঘটেছে পারস্পাৱরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে। সবার প্রাইভেসি খুব ভালভাবেই রক্ষা করা হয়েছে, কোনো একজনের চলাফেরা বা গতিবিধি অন্য কারো কাছে কখনোই প্রকাশিত হয়নি। সম্পূর্ণ ব্যাপারটার মধ্যেই সামাজিক সহযোগিতার বিষয়টা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যার ফলে ভাইরাসের ট্রান্সমিশন কম হয়েছে। আরেকটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার, সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক প্ল্যাটফর্ম হওয়া সত্ত্বেও এই প্ল্যাটফর্ম থেকে কখনো ভুল খবর বা আতঙ্ক ছড়ায়নি। শুধু কোনো একজনের চলাফেরা বা বিভিন্ন জায়গায় যাতায়াতের সাথে ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাব্য প্যাটার্ন মিলানো হয়েছে, কোনো ব্যক্তির ডিটেইল বা অন্য কোনো ইনফরমেশন রেকর্ড করা হয়নি।

এই সংকটকালীন সময়ে কমার্শিয়াল সোশ্যাল মিডিয়াগুলি যেরকম অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে বা অকার্যকর ভূমিকা পালন করছে, সেটা এড়ানোর জন্য এই সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম থেকে অপ্রাসঙ্গিক সবকিছু বাদ দেওয়া হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্ম এবং এই প্ল্যাটফর্মের ইনফরমেশনগুলির কারণে আরো একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার ঘটেছে, তাইওয়ানের অর্থনীতির উপরে এই ভাইরাসের চাপ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। সংক্রমণ এড়ানোর জন্য যে লকডাউন ও এক্সট্রিম সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং এর প্রয়োজন হয়, এই প্ল্যাটফর্মে সংক্রমণের ইনফরমেশন এভেইলএবেল হওয়ার কারণে সেরকম এক্সট্রিম কিছু অনুসরণ করতে হয়নি। তাইওয়ানের নাগরিকেরা সংক্রমিত এলাকাগুলি বা কম্প্রোমাইজড এলাকাগুলি এড়িয়ে চলেছে, আর যাদেরকে ওইসব এলাকায় যেতে হয়েছে বা যারা গিয়েছে তারা নিজেরাই সেলফ কোয়ারেন্টাইনে চলে গেছে।

উপরে উল্লেখিত দুইটি ব্যাপার শুধু উদাহরণ মাত্র। এরকম আরো অনেকগুলি কম্যুনিটি-ক্রিয়েটেড অ্যাপ্লিকেশন ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেছে তাইওয়ানের নাগরিকেরা। এর ফলে সরকারের প্রয়োগ করা বা সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের আড়ম্বর সেখানে অনেক অনেক কম ছিল। এবং এই অ্যাপ্লিকেশন ও প্ল্যাটফর্মগুলির কারণেই করোনা ভাইরাসের এই মহামারির প্রতি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে ভালো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পেরেছে তাইওয়ান।

ইউরোপ, আমেরিকা এবং পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় করোনা ভাইরাস মোকাবিলা করার চরিত্র নির্ধারিত হয়েছে যে কয়েকটা জিনিস দিয়ে সেগুলি হল সমন্বয়হীনতা, টেস্ট ও কিট সাপ্লাইয়ের অব্যবস্থাপনা, এবং চীনকে অনুসরণ করে গোপনীয়তা অবলম্বন করা ও কেন্দ্র থেকে হায়ারার্কিকাল সিস্টেমে এই মহামারি মোকাবিলা করার চেষ্টা করা।

প্রাসঙ্গিক পোস্ট: কীভাবে করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে—বিশ্বে তার দৃষ্টান্ত তৈরি করলো তাইওয়ান

এই অ্যাপ্লিকেশন ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার ফলে তাইওয়ান এই সবগুলিকেই এড়িয়ে যেতে পেরেছে।  স্বাস্থ্যখাতের এই সংকট তারা কীভাবে মোকাবিলা করছেন সেটা নিয়ে জনগণের কাছে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মন্ত্রী ট্যাং তার প্রতিটা মিটিং-ই লাইভস্ট্রিম করেছেন। এতে জনগণের মধ্যেও একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। সরকার যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, সেগুলি নিয়ে বাড়াবাড়ি রকমের আত্মবিশ্বাস না দেখিয়ে তারা ডিসেন্ট্রালাইজড পদ্ধতিতে এগিয়েছে। আলাদা আলাদা এলাকা ভাগ করে দিয়ে, অফিশিয়াল তথ্যের উপরে তাদেরকে তাদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকার নির্দিষ্ট বিষয়ে সমাধান দিতে বলা হয়েছে। এর ফলে, কম্যুনিটি থেকে প্রাপ্ত ডাটা দেখে কোনো একটা নির্দিষ্ট এলাকা বা সেই এলাকার কোনো কার্যক্রম ঝুকিপূর্ণ মনে হলে, দ্রুত ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়েছে। আর সেই ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়েছে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না করে, রাজনৈতিক বিভাজন ও আতঙ্ক তৈরি না করেই।

লেখক পরিচিতি

জ্যারন ল্যানিয়ারজ্যারন ল্যানিয়ার একজন বিখ্যাত কম্পিউটার সায়েন্টিস্ট ও কম্পিউটার ফিলোসফি রাইটার। তার জন্ম ১৯৬০ সালের ৩ মে, নিউ ইয়র্কে। ল্যানিয়ারকে ভার্চুয়াল রিয়ালিটির ফাউন্ডিং ফাদার মনে করা হয়। তাকে বর্তমানে বলা হয় মাইক্রোসফট অক্টোপাস। OCTOPUS এর পুরো অর্থ হল Office of the Chief Technology Officer Prime Unifying Scientist. তিনি ক্লাসিক্যাল মিউজিক কম্পোজও করেন। তার কয়েকটি বইয়ের নাম: ‘ডন অব দ্য নিউ এভ্রিথিং’; ‘ইউ আর নট এ গেজেট’; ‘এ ম্যানিফেস্টো’; ‘টেন আর্গুমেন্টস ফর ডিলেটিং ইয়োর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টস রাইট নাউ’।

ই গ্লেন ওয়েল – ই গ্লেন ওয়েল একজন বিখ্যাত ইকোনমিস্ট। তার জন্ম ১৯৮৫ সালের ৬ মে। তিনি RadicalxChange Foundation এর প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে তাকে বলা হয় মাইক্রোসফট অক্টোপেস্ট। OCTOPEST এর অর্থ হল Office of the Chief Technology Officer Political Economist and Social Technologist। ই গ্লেন ম্যাকওয়েলের বিখ্যাত বই ‘র‍্যাডিক্যাল মার্কেটস: আপরুটিং ক্যাপিটালিজম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ফর এ জাস্ট সোসাইটি’।