সুখী মানুষেরা কী করে

পজেটিভ সাইকোলজির জনক মার্টিন সেলিগম্যান (জন্ম. নিউ ইয়র্ক, ১৯৪২)

যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী মার্টিন সেলিগম্যানকে পজেটিভ সাইকোলজির জনক ধরা হয়। তার তত্ত্ব অনুসারে আমাদের সুখের ৬০ শতাংশ নির্ভর করে শরীরের ভেতরের জিন আর আশেপাশের পরিবেশের ওপরে। আর বাকি ৪০ শতাংশ আমাদের নিজেদের ওপরে।

২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক মিডিয়া সংস্থা টেড টকের একটা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সময় সেলিগম্যান সুখী মানুষের ৩টি ধরনের কথা জানান।

তার মতে, একধরনের মানুষ আছে যারা আনন্দে জীবন কাটায়। যতটা পারা যায় আনন্দ উপভোগ করার চেষ্টা করে। 

আরেক ধরনের মানুষ আছে, যারা পরিবারের মধ্যে সুখ খুঁজে পায়। তারা নিজেদের পেশা, বাচ্চাকাচ্চা বড় করে তোলা, প্রেম কিংবা অবসরের মধ্য দিয়ে সুখী থাকে। 

আর তৃতীয় ধরনের সুখী মানুষ হলো, যারা নিজেদের জীবনের অর্থ খোঁজার চেষ্টা করে। তারা মূলত নিজেদের ভালো দিকটা খোঁজার চেষ্টা করে। পরে কাজে লাগিয়ে বড় কোনো লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করে।

মানুষ কীভাবে অনেক সুখী হওয়ার চেষ্টা করে, তা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে সেলিগম্যান অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি গবেষণায় দেখেছেন, সুখ বা আনন্দের পেছনে ছোটা খুব কম মানুষই যতটুকু সুখী হতে চায় ততটুকু হতে পারে।

তার মতে, সুখ হলো একটা কেকের ওপরে থাকা ক্রিম আর চেরিফলের মতো। যারা জীবনের অর্থ খোঁজার চেষ্টা করে ও সম্পর্কে জড়ায়, ক্রিমের মতোই সুখ তাদের জীবনকে আরো কিছুটা মিষ্টি করে তোলে।

জীবনের অর্থ খোঁজা বা সম্পর্ক করার বিষয়টা একেকজনের কাছে একেকরকম। কিন্তু চাইলে সুখে থাকার জন্য আপনি একটা সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন। সুখী মানুষদের নির্দিষ্ট কিছু অভ্যাস রয়েছে। সেইসব অভ্যাস জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে তাদেরকে সাহায্য করে। দেখা যাক, সুখী মানুষেরা কী করে?

  • সুখী মানুষদের নিয়ে প্রায় ২০ বছরের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের আশেপাশে সুখী মানুষ থাকে, ভবিষ্যতে তাদের সুখে থাকার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। 
  • শুধুমাত্র হাসার মতো কিছু হলেই তারা হাসে। ২০১১ সালে অ্যাকাডেমি অফ ম্যানেজমেন্ট জার্নালে একটা গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে দেখা গেছে, মন বা মেজাজ খারাপ থাকলেও যদি কেউ জোর করে হাসতে থাকে, তাহলে তার মানসিক অবস্থা আরো খারাপের দিকে যেতে পারে। 
  • সহজেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে তারা। মনোবিজ্ঞানী পিটার ক্রেমারের মতে, ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতার বিপরীত কিছু থেকে থাকলেও সেটা সুখ না। বরং ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রেরণাই ডিপ্রেশন মোকাবেলা করতে সাহায্য করে।
  • তারা সুখে থাকার চেষ্টা করে। সাম্প্রতিক সময়ে মনোবিজ্ঞান বিষয়ক দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, শুধুমাত্র চেষ্টা করার মাধ্যমেই নিজের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব। 
  • সব ধরনের ভালো বিষয়কেই তারা গুরুত্ব দেয়। অনেকদিনের চেষ্টা বা সাধনার পরে ভালো কোনো ফলাফল এলে অনেকেই তা উদযাপন করার চেষ্টা করে। তবে সুখী মানুষ নিজেদের ছোটখাটো সব অর্জনই গুরুত্বের সাথে নেয়।
  • ছোটখাটো আনন্দের মুহূর্তও তারা উপভোগ করে। রঙ-বেরঙের আইসক্রিম বা হাসতে থাকা শিশুকে দেখলেও তাদের ভালো লাগে। 
  • অন্যদের সাহায্য করতে তারা সময় ব্যয় করে। একটা গবেষণায় দেখা গেছে, যারা স্বেচ্ছাসেবা বা ভলান্টিয়ারিংয়ের কাজ করে, শারীরিক আর মানসিকভাবে তারা সুস্থ থাকে। 
  • মাঝে মধ্যে তারা সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। চ্যালেঞ্জিং, আকর্ষণীয় ও অর্থবহ কাজ করার সময় আমরা ‘ফ্লো’ নামের একধরনের মানসিক অবস্থার মধ্যে চলে যাই। এই অবস্থায় গেলে সাধারণত সময়ের হিসাব থাকে না। আর সুখী মানুষরা সহজেই এই অবস্থায় চলে যেতে পারে।
  • গভীর বিষয় নিয়ে আলাপ করার জন্য তারা তুচ্ছ বিষয়গুলি বাদ দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে যারা ছোটখাটো বিষয় বাদ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলাপ করে, তারা সাধারণত অন্যদের চাইতে বেশি সন্তুষ্ট থাকে।
  • তারা অন্যদের পেছনে টাকা খরচ করে। সায়েন্স ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটা আর্টিকেলে দেখা গেছে, নিজের জন্যে খরচ করার চাইতে অন্যদের পিছনে টাকা খরচ করলে বেশি আনন্দ পাওয়া যায়।
  • অন্যদের কথা শোনার জন্য তারা কারণ তৈরি করে। অন্যদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারাটাও সুখী থাকার একটা লক্ষণ।
  • তারা সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করে। বর্তমানে প্রযুক্তির এই যুগে টেক্সট মেসেজ বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কারো সাথে যোগাযোগ করা অনেক সহজ। তবে সুখী মানুষরা কষ্ট করে হলেও কাছের মানুষদের সাথে নিজে গিয়ে দেখা করে।
  • তারা সবক্ষেত্রেই আশাবাদী। যেকোনো পরিস্থিতিতেই ভালো দিকটা বিবেচনা করার শারীরিক আর মানসিক, দুই ধরনের উপকার রয়েছে। এতে করে যেমন দুশ্চিন্তা কমে, তেমনভাবে কোথাও ব্যাথা পেলে সহ্য করার ক্ষমতা তৈরি হয়।
  • তারা গান উপভোগ করে। গান শুনলে খুব সহজেই দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
  • তারা মাঝে মাঝে প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকে। বেশি সময় ধরে সেলফোন কিংবা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। এছাড়াও এতে করে মানসিকভাবে দুশ্চিন্তা বাড়ে। তাই নিয়ম করে কিছুটা সময় ডিভাইস থেকে দূরে থাকলে এই সমস্যাগুলি কমে যাবে। 
  • দান, ধ্যান, দয়া, অন্যের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধের মতো বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সুখে থাকার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
  • ব্যায়ামকে তারা গুরুত্বের সাথে নেয়। ব্যায়াম করার ফলে আমাদের শরীরে এন্ডোরফিন নামের হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোনের কারণে আমরা আনন্দিত হই।
  • তারা বাইরে বের হয়। মুক্ত বাতাসে কিছুক্ষণ থাকলে মন এমনিই ভালো হয়ে যায়। তাই সুখী মানুষরা যতটা সম্ভব, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে।
  • তারা পর্যাপ্ত ঘুমায়। একটা ভালো ঘুম দিয়ে উঠলে অবসাদ আর ক্লান্তি অনেকটাই কেটে যায়। যাদের পরিমিত ঘুম হয়, তাদের দুশ্চিন্তা কম থাকে।
  • তারা মন খুলে হাসে। অনেক মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রেই হাসি সবচেয়ে ভালো ওষুধ। মন খুলে হাসলে শারীরিক ব্যথা কিংবা মানসিক দুশ্চিন্তার সাথে সহজেই মানিয়ে নেয়া যায়।
  • তারা হাঁটার মতো করেই হাঁটে। এক গবেষণায় দেখা গেছে সুখী মানুষরা যখন হাঁটে, তখন পায়ের তালে তালে তাদের হাতও দুলতে থাকে। এছাড়া হাঁটার সময় তাদের মাথাও সোজা থাকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here