সুস্বাস্থ্যের জন্য কি সত্যিই দৈনিক ১০,০০০ কদম হাঁটা উচিত?

নতুন এক গবেষণা বলছে, উপকার পেতে আপনার হয়তো এতটা হাঁটতে হবে না।

আপনি যদি ফিটনেস ট্র্যাকার ব্যবহার করে থাকেন তবে সুস্বাস্থ্যের জন্য দিনে ১০,০০০ কদম হাঁটার কথা শুনে থাকবেন। যদি এতটা হাঁটা আপনার কাছে কঠিন মনে হয়, তাহলে আপনার জন্যে  সুখবর আছে: অনলাইনে ২০১৯ এর মে’তে প্রকাশিত জামা ইন্টারনাল মেডিসিনের একটি গবেষণা বলছে, প্রতিদিন এর অর্ধেক কদম হাঁটলেও আপনার স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।

গবেষকদের অভিমত, বয়স্ক নারী যারা দিনে ৪,৪০০ কদম হাঁটেন তাদের মৃত্যুঝুঁকি ২৫০০ কদম বা তার চেয়ে কম হাঁটা  নারীদের চেয়ে ৪১% পর্যন্ত কমে যায়।

এই গবেষণার মুখ্য গবেষক, হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অফ পাবলিক হেলথ-এর এপিডেমিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. আই-মিন লি বলছেন, “আমি দিনে ১০,০০০ কদম হাঁটতে নিষেধ করছি না, বরং প্রতিদিন ১০,০০০ কদম পর্যন্ত হাঁটতে পারা চমৎকার। কিন্তু বয়স্ক নারীরা যে ভাবেন বেশি হাঁটলেই স্বাস্থ্য লাভবান হবে তা সত্যি আশ্চর্যের ব্যপার।”

 

কেনো ১০,০০০ কদম

আপনি হয়তো ভাবছেন, প্রতিদিন ১০,০০০ কদম হাঁটার প্রথা কোথা থেকে আসলো। এই প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো উত্তর নাই। ড. লি বলছেন, “এই সংখ্যাটির উদ্ভব হয়েছে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। ১৯৬৫ সালে একটি জাপানি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ইয়ামাসা ক্লক অ্যান্ড ইনস্ট্রুমেন্ট কোম্পানি “ম্যানপো-কেই” নামের একটি পেডোমিটার (জাপানিজ অর্থ “মিটারে ১০,০০০ ধাপ হাঁটা”) বিক্রি করে। জাপানি ১০,০০০ সংখ্যাটি দেখলে মনে হয় একজন ব্যক্তি হাঁটছেন। প্রতিষ্ঠানটি হয়তো সেই কারণেই এই সংখ্যাটিকে তাদের ব্যবসার স্বার্থে বেছে নিয়েছে।”

১০,০০০ সংখ্যাটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হলেও এর পেছনে সত্যিই কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ছিল না। যার ফলে ড. লি এবং তার সহকর্মীরা এ সম্পর্কে আরো জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তারা ১৬,৭৪১ জন (গড় বয়স ৭২) মহিলাদের নিয়ে একটি স্বাস্থ্য গবেষণা করেন। ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত, প্রতি নারীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য ৭ দিন একটি ডিভাইস সাথে রাখতে দেয়া হতো। গবেষকরা যে দু’টি প্রধান প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন তা হলো:

১. দীর্ঘ জীবনের জন্য দৈনিক কত কদম হাঁটা জরুরি?
২. অতিরিক্ত হাঁটা কি আসলেই লাভজনক?

 

পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ এবং জীবন

গবেষকরা ২০১৭ সালের ডিসেম্বর  মাসে পরিবারের সদস্যদের বা পোস্টাল রেকর্ডের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে মৃত্যু পর্যবেক্ষণ করে গবেষণা করেন, এবং তারপর মৃত্যু সনদ বা জাতীয় মৃত্যুসূচকের মাধ্যমে তাদের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। ডক্টর লি এর মতে, তারা এই গবেষণায় দেখতে পান যারা কম নড়াচড়া করেন বা হাঁটেন তাদের মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি কিন্তু এর মধ্যে সবচেয়ে কম হার ছিল যারা নিয়মিত অন্তত ৪,৪০০ কদম হাঁটতেন। যারা দিনে এরচেয়েও বেশি অন্তত ৭,৫০০ কদম পর্যন্ত হাঁটেন তাদের মৃত্যুহার কমতে দেখা গেছে, এবং তারচেয়েও বেশি কদম হাঁটা মানুষের মৃত্যুর হার একেবারেই নিচের দিকে।

ড. লি বলেছেন, “অধিকাংশ নারীরই দৈনিক ৪,৪০০ কদম হাঁটতে পারার কথা। ষাটোর্ধ নারীরা দৈনিক প্রায় ৪,০০০ কদম হাঁটতে পারেন, তাই ৪,৪০০ কদম হাঁটা খুব কঠিন কিছু নয়।” তিনি বলেন, “আমাদের গবেষণায় সবচেয়ে নিষ্ক্রিয় নারীরাও দৈনিক প্রায় ২,৭০০ কদম হাঁটতে পারেন।”

এর মানে হল, একদম কম হাঁটাচলা করা নারীরাও দৈনিক আরো প্রায় ২,০০০ ধাপ (আনুমানিক এক মাইল) বেশি হেঁটে এই লক্ষ্য পূরণ করতে পারেন।

 

ফলাফল কাজে লাগানো

শেষ পর্যন্ত ড. লি বলেছেন, নারীরা এই গবেষণা থেকে দুটি শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন:

১. আপনার প্রতিদিনের খুব অল্প গতিবিধিও আপনার স্বাস্থের জন্য লাভজনক। “দৈনিক যদি খুব সামান্য, ধরুন, অতিরিক্ত ২০০০ কদমও হাঁটা যায় তবে তা স্বাস্থের জন্য খুব উপকারি। এর জন্য দৈনিক ১০,০০০ কদম হাঁটার কোনো প্রয়োজন নেই”, জানান ড. লি।

২. যে কোনো ধরনের গতিবিধিই গোনায় ধরা যায়। তাই এই অতিরিক্ত ২,০০০ কদম আপনি দৈনন্দিন জীবনের কাজ থেকেই সম্পন্ন হয়ে যাবে। এর জন্য অতিরিক্ত ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই। ঘর পরিষ্কার করুন, শপিং মলে ঘুরে বেড়ান, নয়তো ট্রেডমিলে চটজলদি হেঁটে নিন। দেখবেন, বাড়তি কয়েক কদম হাঁটা প্রতিদিনের অভ্যাস বদলানোর মতোই সহজ মনে হবে।