সেরে ওঠা করোনা রোগীর রক্তের প্লাজমা নতুন রোগীদের চিকিৎসায় বিরাট ভূমিকা রাখছে

করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের শরীরে তৈরি হয় ভাইরাস প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি। সেই অ্যান্টিবডি রয়ে যায় তাদের রক্তের প্লাজমায়। সুস্থদের প্লাজমাতে থাকা অ্যান্টিবডি আলাদা করে আক্রান্তদের শরীরে প্রয়োগ করা হয়।

এ পদ্ধতিতে ইউকে’তে অন্তত ১০ জন ক্রিটিকাল রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে খুব ভালো ফলাফল পাওয়া গেছে। তাদের ৪২ বছরের একজন রোগী যে ভেন্টিলেটর ছাড়া শ্বাস নিতে পারতেন না, তিনি এখন নিজে নিজে শ্বাস নিতে পারছেন।

ভ্যাকসিন আসতে যখন আরো কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে, গবেষকরা এই থেরাপি দিয়ে ক্রিটিকাল রোগীদের বাঁচানোর আশা দেখতে পাচ্ছেন। আরো বেশ কয়েকটি দেশ দাবি করছে প্লাজমা থেরাপির সফল প্রয়োগের।

থেরাপিটির পূর্ণ নাম ‘Convalescent Plasma Therapy’। ‘Convalescent’ অর্থ সুস্থ হয়ে ওঠা রোগী। এটি বেশ পুরোনো থেরাপি। ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লু’র সময় প্রথম এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। এর পর ষাটের দশকের ফ্লু, গত দশকের সার্স, ইবোলা ভাইরাসের প্রকোপ মোকাবেলা করতেও থেরাপিটির প্রয়োগ হয়েছিল।

তবে এই থেরাপি বড় পরিসরে করতে যাওয়ার আগে সতর্ক থাকতে হবে বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ ফার্মালজিকাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট স্যার মুনির পির মোহাম্মেদ। তিনি বলেন, আমরা র‍্যান্ডমলি রোগীদের ওপর এই ট্রিটমেন্ট চালিয়েছি ভাবলে ভুল হবে। এই রোগীদের অন্যান্য সব চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল, আমরা তাদেরকে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ Remdesivir-ও দিয়েছিলাম, এছাড়া যা যা ব্যবস্থা নেওয়ার সবই করেছি।

Remdesivir মূলত ফ্লু ভাইরাসের ওষুধ যা সম্প্রতি খুব আলোচিত হচ্ছে করোনার প্রতিষেধক হিসেবে।

চীনের উহানেও এই থেরাপি রোগীদের উপর সফলভাবে কাজ করেছে বলে দাবি করেছেন সেখানকার চিকিৎসকরা।

দুটি পাইলট স্টাডিতে পৃথকভাবে ২৫ জনকে প্লাজমা থেরাপি দেওয়া হয়। ৩ দিনের মধ্যে অধিকাংশের গলাব্যথা ও শ্বাসকষ্ট কমে যায়। ভেন্টিলেটরের সাহায্য ছাড়াই স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস চালাতে সমর্থ হন কয়েকজন রোগী।

অন্যান্য জায়গা থেকেও ভালো সংবাদ আসছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সেভের‍্যান্স হসপিটাল দুজন বয়স্ক রোগীকে প্লাজমা থেরাপি দিয়ে সুস্থ করেছে বলে জানিয়েছে। তাদের একজনের বয়স ৭১। ১২ দিন ভাইরাসের সংক্রমণে তার মারাত্মক নিউমোনিয়া হয়। অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ কাজ করছিল না তার ওপর। করোনা থেকে সম্পূর্ণ সেরে ওঠা এক সুস্থ তরুণের প্লাজমা তাকে দেওয়া হয়, তাতে তার অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটে। ৩ দিনের মাথায় তার ভাইরাস রেজাল্ট নেগেটিভ আসে।

নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালও ব্যাপকভাবে রোগীদের ওপর প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগের খবর জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘National COVID-19 Convalescent Plasma Project’ নামে কনসোর্টিয়াম গঠন করে তাদের ২২টি রাজ্যের ৪০টি সেরা মেডিকেল ইনস্টিটিউটে বিষয়টির ওপর একসাথে কাজ করছে। তাদের উদ্দেশ্য প্লাজমা থেরাপি দিয়ে ক্রিটিকাল রোগীদের জীবন বাঁচানো এবং একই সাথে যারা ফ্রন্টলাইনে আছে অর্থাৎ ডাক্তার-নার্স বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি দিয়ে আগে থেকেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করা।

তাদের উদ্দেশ্য প্লাজমা থেরাপি দিয়ে ক্রিটিকাল রোগীদের জীবন বাঁচানো এবং একই সাথে যারা ফ্রন্টলাইনে আছে অর্থাৎ ডাক্তার-নার্স বা অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি দিয়ে আগে থেকেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করা।

মাউন্ট সিনাই হসপিটালের ক্লিনিকাল ল্যাবরেটরি ও ট্রান্সফিউশন বিভাগের মেডিকেল ডিরেক্টর ড. জেফরি ঝ্যাং বলেন, আমাদের অনেক রোগী আছে যাদের অবস্থা খুবই খারাপ, প্রাণপণে চাচ্ছি যেন এই ট্রিটমেন্ট তাদের ওপর কাজ করে।

Convalescent Plasma থেরাপিতে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীর শরীর থেকে প্লাজমা বা রক্তরস সংগ্রহ করে সেখানে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য পরীক্ষা করা হয়। মাইক্রোবায়োলজিস্ট ড. ফ্লোরিয়ান ক্র্যামারের নেতৃত্বে মাউন্ট সিনাই হসপিটালে অ্যান্টিবডি টেস্টিংয়ে একটা দল কাজ করছে। এ ব্যাপারে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।

ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর জেফরি ঝ্যাং জানান, আগে টেস্ট দিয়ে রক্তে অ্যান্টিবডি আছে কিনা কেবল তা জানা যেত। আমরা এখন রক্তে অ্যান্টিবডির পরিমাণ কতটুকু তা বের করা উপায় শনাক্ত করেছি। কাজটা খুবই জরুরি ছিল। কারণ যাদের শরীরে বেশি অ্যান্টিবডি তাদের প্লাজমা ব্যবহার করলে আরো ভালো ফলাফল নিশ্চিত করা যায়।

আমরা এখন রক্তে অ্যান্টিবডির পরিমাণ কতটুকু তা বের করা উপায় শনাক্ত করেছি। কাজটা খুবই জরুরি ছিল। কারণ যাদের শরীরে বেশি অ্যান্টিবডি তাদের প্লাজমা ব্যবহার করলে আরো ভালো ফলাফল নিশ্চিত করা যায়।

তারা আপাতত FDA এর কাছ থেকে ইমার্জেন্সি অনুমোদন নিয়ে কাজ করছে। FDA গত শুক্রবার একটা গাইডলাইন করে এ বিষয়ে। সেখানে বলা ছিল, প্লাজমা থেরাপি ব্যাপকভাবে শুরু করতে হলে রুটিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে আগাতে হবে চিকিৎসকদের।

তবে বড় ক্লিনিকাল ট্রায়াল করার পথে প্রধান সমস্যা হলো আরোগ্য হওয়া ডোনারদের শনাক্ত করা। শুধু শনাক্ত করলেই হচ্ছে না, তাদের শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে কিনা সেটাও পরীক্ষা করে দেখতে হচ্ছে।

যোগ্য ডোনারদের কাছ থেকে ৪ ডোজ পরিমাণ প্লাজমা সংগ্রহের প্রয়োজন হয়। মাউন্ট সিনাই হসপিটাল তাদের ডাটাবেজ থেকে ৪০,০০০ সম্ভাব্য ডোনারকে ই-মেইল পাঠিয়ে ১০,০০০ ডোনার পেয়েছে। যাদের একজন ড্যানি রাইমার। রাইমার বলেন, আমরা যারা করোনার হাত থেকে বেঁচে গেছি তারা ভাবতাম আমরা কী করে মানুষের কাজে লাগতে পারি। আমার কাছে মনে হয়েছে এটাই আমাদের অবদান রাখার সুযোগ।

ড্যানি ও তার স্ত্রী শিরা রাইমার গতমাসে (মার্চ ২০২০) একটা নোটিশ পায় যে তাদের পরিচিত একজনের করোনা পজিটিভ এসেছে। সুতরাং তারা যেন কোয়ারেন্টিনে থাকে এবং কোনো জ্বর-সর্দির-শ্বাসকষ্টের লক্ষণ দেখা দিলে যেন সাথে সাথে হেলথ ডিপার্টমেন্টকে জানায়। কয়েকদিন পর ঠিকই তাদের ওই লক্ষণগুলি দেখা দেয়। তবে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়নি। বাসায় থেকেই তারা সুস্থ হয়েছেন।

রাইমার ফ্যামিলি তাদের এক বন্ধুর কাছ থেকে মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের প্লাজমা থেরাপির কথা জানতে পারে। কোয়ারেন্টিন শেষ হওয়ার দিনই তারা প্লাজমা ডোনেট করতে হাসপাতালে চলে যায়। তবে ডাক্তাররা প্লাজমা কেবল ড্যানি রাইমারেরটা নেয়, যেহেতু তার প্লাজমায় ভালো পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল। তিনি বলেন, বিষয়টা খুবই সোজা। ডাক্তাররা বাহুতে একটা সুই দেয়, তারপর মেশিনই বাকি কাজ করে। আমার কাজ ছিল রিল্যাক্স হয়ে বসে থাকা।

তিনি বলেন, বিষয়টা খুবই সোজা। ডাক্তাররা বাহুতে একটা সুই দেয়, তারপর মেশিনই বাকি কাজ করে। আমার কাজ ছিল রিল্যাক্স হয়ে বসে থাকা।

কনসোর্টিয়ামের অন্যতম প্রজেক্ট ডিরেক্টর অ্যানেস্থেশিওলজিস্ট ড. মাইকেল জয়নার বলেন, কোন ডোনারদের প্লাজমা বেশি ইফেক্টিভ হবে সেটা নিয়ে আমরা এখন বেশি কাজ করছি। সাধারণত আমরা দেখে এসেছি, যত আগে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করা হয় তত এর সাকসেস রেট বাড়ে। এজন্য ফ্রন্টলাইনে থাকা হেলথ কেয়ার সার্ভিসের লোকেদের আগে প্লাজমা থেরাপি দেওয়া যৌক্তিক হবে বলে আমি মনে করি।

ড. জয়নার আরো বলেন, এখন আমরা রেকর্ড স্পিডে আগাচ্ছি। আগে এই কাজগুলি পুরোপুরি শেষ করতে ১৮ মাস লেগে যেত। কারণ তখন একটা কাজ শেষ করে আরেকটা করতে হত। কিন্ত এখন যখন আমরা সবাই একসাথে কাজ করছি আমরা পুরো প্রসেসটাকে মাত্র ১৮ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে পারছি।

সূত্র. দ্য টেলিগ্রাফএনবিসি নিউজ
অনুবাদ. আমিন আল রাজী