গুটিবসন্ত বা স্মলপক্স যেভাবে নির্মূল হল পৃথিবী থেকে

ব্রুকলিনে অফিসে আর্নেস্ট চ্যামবন কাউপক্সের উপাদান সংগ্রহ করছেন, তাকে দেখছেন রোগীরা। ছবিটি ফ্র্যাঙ্ক লেজলি'র ইলাস্ট্রেটেড নিউজ থেকে পাওয়া, ৬ এপ্রিল ১৮৭২

গুটিবসন্ত বা স্মলপক্সের সাথে আমরা আজ আর তেমন করে পরিচিত নই। তবে এক সময় সবাই কমবেশি এর সঙ্গে পরিচিত ছিলেন।

অনেক আগে থেকেই উপমহাদেশে বসন্ত বা স্মলপক্সের বড় প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। লোকজ সংস্কৃতিতে ‘শীতলা দেবী’ নামের দেবীর আবির্ভাবই হয় বসন্ত নির্মূল করার জন্যে। এছাড়া, এখনো উনবিংশ বা বিংশ শতকের বাংলা সাহিত্যিকদের গল্প উপন্যাসে অনেক চরিত্রের দেখা পাওয়া যায়, যাদের মুখে বসন্তের দাগ আছে।


ফারহান মাসউদ


স্মলপক্সের উৎপত্তির সঠিক সময় জানা যায় না। তবে ইতিহাসবিদরা মনে করেন, আনুমানিক ১০,০০০ বছর আগে আফ্রিকার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে এই ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ঘটেছিল।

স্মলপক্সের কারণ যে ভাইরাসটি

বুকে ও বাহুতে গুটিবসন্ত। ছবি. উইকিপিডিয়া

গুটিবসন্ত বা স্মলপক্স হলো মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর একটা রোগ। যেটাতে অন্য যেকোনো মহামারির চাইতে বেশি মানুষ মারা গেছে। অন্যান্যগুলির মতই গুটিবসন্তের ভাইরাস মানুষ বাদে অন্য কোনো প্রাণিকে আক্রমণ করত না। এবং মানুষই এর একমাত্র পোষক বা হোস্ট।

ভাইরাসটা খুব সহজেই একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ত। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরের আর্দ্র তরলের মধ্যে এটা থাকত। বিশেষ করে ফুসফুসে গিয়ে দেহজ তরলের মধ্যে বংশবিস্তার করত এটা। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা কথা বলার সময় তার সংস্পর্শে এলে খুব সহজেই যে কেউ আক্রান্ত হয়ে যেত।

‘ভ্যারিওলা’ নামের ভাইরাস গুটিবসন্তের কারণ। অন্যান্য ভাইরাসের তুলনায় ডাম্বেল আকৃতির ভ্যারিওলার আকার যথেষ্ট বড়। বিজ্ঞানীরা সাধারণ মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখেই তা দেখতে পান। আকার বড় হওয়ার কারণ, এই ভাইরাসে জিনোমের সংখ্যা অন্যান্য ভাইরাসের থেকে অনেক বেশি। যেমন, এইচআইভি ভাইরাসে ১০টা জিন থাকে, ইবোলাতে থাকে ৭ টা। তুলনায় ভ্যারিওলা’য় জিন থাকে প্রায় ২০০’র মত।

৩০০০ বছরের পুরনো ফারাও রামোস ৫’ এর মমির মাথায় গুটিবসন্তের চিহ্ন পাওয়া গেছে, তার মৃত্যু ঘটে আনুমানিক ১১৬০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে। ছবি. সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)

ভ্যারিওলা আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বকের কোষ, লসিকাগ্রন্থি, প্লীহা এমনকি হাড়ের মজ্জাতেও আক্রমণ করে। এই রোগের লক্ষণ হিসেবে জ্বর, বমি আর সারা গায়ে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এই ভাইরাস কোথাও ছড়িয়ে পড়লে রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৩০ শতাংশ রোগী আক্রান্ত হওয়ার ২ সপ্তাহের মাথায় মারা যায়। আর যারা বেঁচে থাকে, সারাজীবন এই রোগের চিহ্ন হিসেবে সারা গায়ে ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াতে হয় তাদের। অনেকে চোখের চারপাশের চামড়া আক্রান্ত হওয়ার ফলে অন্ধ হয়ে যায়।

মিশরীয় মমিগুলি বিশ্লেষণ করে কমপক্ষে ৩টি মমি শনাক্ত করা গেছে, যা থেকে ধারণা করা যায়, তারা গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। এই মমিগুলির মধ্যে আছে ফারাও পঞ্চম রামেসিসের মমি।

স্মলপক্সের বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া
খ্রীষ্টপূর্ব ১৩৫০ সালে মিশরীয় সৈন্যদের সাথে হিটাইটদের যুদ্ধের সময় প্রথমবারের মত এশিয়া মাইনরে গুটিবসন্তের প্রাদুর্ভাব ঘটে। মিশরের যুদ্ধবন্দিদের কাছ থেকেই মূলত এই রোগ হিটাইটদের সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে হিটাইটদের রাজাও মারা যায় আর তাদের সাম্রাজ্যে ভয়ঙ্কর দুর্ভোগ নেমে আসে।

মিশরীয় ব্যবসায়ীরা এই জীবাণু আশেপাশের অনেক অঞ্চলে বয়ে নিয়ে গেছে। অনেকে মনে করেন, খৃষ্টপূর্ব প্রথম শতকে মিশরীয় ব্যবসায়ীরাই সর্বপ্রথম ভারতবর্ষে গুটিবসন্তের জীবাণু নিয়ে আসে। ষষ্ঠ শতকে কোরিয়া আর চীনের সাথে ব্যবসা বৃদ্ধি পাওয়ায় দ্বীপরাষ্ট্র জাপানে গুটিবসন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

আরো পড়ুন: ভ্যাকসিনের ইতিহাস

সপ্তম শতকে আরবরা দ্রুত গতিতে একের পর এক অঞ্চল জয় করার মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছিল। তখন আরবদের হাত ধরেই গুটিবসন্তের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে উত্তর আফ্রিকা, স্পেন আর পর্তুগালে। এগারো শতকে ক্রুসেডের সময় এই ভাইরাস আবারো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। পনেরো শতকে পর্তুগালের সৈন্যদের মাধ্যমে পশ্চিম আফ্রিকায় ও ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপিয়ানদের আমেরিকা বিজয়ের সময় এই ভাইরাস মধ্য আর দক্ষিণ আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় একই সময় ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলিতেও এই ভাইরাসের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

ইউরোপিয়ানরা আমেরিকায় আসার আগে আমেরিকায় স্মলপক্সের অস্তিত্ব ছিল না। সতেরো শতকে উত্তর আমেরিকায় ইউরোপীয় দেশগুলি, বিশেষ করে ব্রিটেনের বিজয়ের ফলে আদিবাসীদের মধ্যে প্রকটভাবে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। আমেরিকার আদিবাসীদের কাছে ইউরোপিয়ান সেনাবাহিনীর চাইতেও গুটিবসন্ত বেশি ভয়ের কারণ ছিল। আঠারো শতকে ব্রিটিশ নাবিকদের কাছ থেকে স্মলপক্স অস্ট্রেলিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে অস্ট্রেলিয়াতে কখনোই তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি।

“গুটিবসন্ত নির্মূল অভিযান নিয়ে মাইক্রোবায়োলজিস্ট লিজা হেন্সলি যেমন বলেছেন, ভাইরাসঘটিত রোগের চিকিৎসা নিয়ে চিন্তা করলে আপনি আসলে যুদ্ধ নিয়েই চিন্তা করেন।”

ইংল্যান্ডের রানি মেরি দ্য ফার্স্ট, তার স্বামী উইলিয়াম দ্য সেকেন্ড, রানি মেরি দ্য সেকেন্ড, স্পেনের রাজা প্রথম লুই, ফ্রান্সের রাজা লুই দ্য ফিফটিনথ, প্রাচীন আমলের চায়নার সম্রাটরা ছাড়াও ইতিহাসের অনেক শাসক আর কিংবদন্তী গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

১৭৬৭ সালে ১১ বছর বয়সে সুরস্রষ্টা মোজার্ট স্মলপক্সে আক্রান্ত হন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে জর্জ ওয়াশিংটনের একবার গুটিবসন্ত হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থাতেই আব্রাহাম লিঙ্কনের স্মলপক্স হয়েছিল। এমনকি যখন তিনি গেটিসবার্গের ঐতিহাসিক সেই বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, তার শরীরে গুটিবসন্তের প্রাথমিক লক্ষণগুলি ছিল।

পৃথিবীর ইতিহাসে গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে শত শত কোটি মানুষ মারা গেছে। শুধুমাত্র বিংশ শতাব্দীতেই এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৩০ থেকে ৫০ কোটি মানুষ।

‘ভ্যারিওলেশন’ বা স্মলপক্ষের প্রথম চিকিৎসা
যত শক্তিশালীই হোক না কেন, স্মলপক্স অপরাজেয় কোনো অসুখ না। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগ আসার অনেক আগেই ইতিহাসে এর চিকিৎসার উদাহরণ পাওয়া যায়। ১০২২ খৃষ্টাব্দের একটা চীনা লিপিতে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি চায়নার দক্ষিণাঞ্চলের প্রদেশ সিচুয়ানের বিখ্যাত পর্বত ‘ও মেই শান’-এ বাস করতেন। তিনি লক্ষ্য করেন, যারা একবার গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়েছে, তারা দ্বিতীয়বার আর এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে না। সুস্থ মানুষদের শরীরে যাতে বসন্তের সংক্রমণ না হয়, সেজন্য তিনি একটা পদ্ধতি বের করেন। গুটিবসন্তের শুকিয়ে যাওয়া চামড়া গুড়া করে নলের সাহায্যে ফু দিয়ে সুস্থ লোকদের নাকে প্রবেশ করান। চিকিৎসার এই ধরনের পদ্ধতিকে বলা হয় ভ্যারিওলা। তার এই পদ্ধতি কাজে দিয়েছিল।

ভ্যারিওলা নামটা স্মলপক্সের ভাইরাস ভ্যারিওলা থেকে এসেছে। পদ্ধতিটা সময়ের সাথে সাথে উন্নত হতে থাকে। আঠারো শতকের চিকিৎসকরা গুটিবসন্তে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবাণু নিয়ে ধারালো যন্ত্রের সাহায্যে সুস্থ ব্যক্তির বাহুতে ৩ থেকে ৪টা আঁচড় দিতেন। এই পদ্ধতি মোটামুটিভাবে কাজে দিলেও শতভাগ কাজ হত না। কারণ এভাবে ভ্যারিওলেশন করার পরেও প্রায় ৩ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হত। তাছাড়া ভ্যারিওলেশন করার ফলে অনেকেই অসুস্থ হয়ে যেত। বসন্তের লক্ষণ তাদের মধ্যেও দেখা যেত। তবে ভ্যারিওলেশন করার পরে আবার স্মলপক্স হলে, সাধারণ সময়ের চেয়ে মুত্যুঝুঁকি কম থাকত।

ভ্যাকসিন আবিষ্কার
ভ্যারিওলেশনের সাথে ভ্যাকসিনেশন বা টিকার পার্থক্য আছে। ভ্যাকসিনেশন শুরু হয় অ্যাডওয়ার্ড জেনারের হাত ধরে। জেনার ছিলেন ইংল্যান্ডের গ্লস্টারশায়ারের চিকিৎসক। ছোটবেলায় তিনি যখন শিক্ষানবিশ হিসেবে একজন শল্যচিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে কাজ করছিলেন, স্মলপক্সের ব্যাপারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস লক্ষ্য করেন। ১৩ বছর বয়সেই ব্রিস্টলের কাছে সডবেরিতে চিকিৎসার কাজে যান। সেখানে দেখেন, স্থানীয় গোয়ালিনী নারীরা পরস্পর বলাবলি করছে, তাদের যেহেতু কাউপক্স হয়েছে একবার, স্মলপক্স আর হবে না। কাউপক্স হলো গরুর স্তনে সংক্রমিত একটা রোগ।

অ্যাডওয়ার্ড জেনার (১৭৪৯-১৮২৩)। ছবি. ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ মেডিসিন

জেনার পেশাগতভাবে চিকিৎসক হওয়ার পর ব্যপারটা খতিয়ে দেখলেন। তিনি দেখেন, কথা সত্য, যাদের একবার কাউপক্স হয়েছে তাদের স্মলপক্স হচ্ছে না। আসলে স্মলপক্স আর কাউপক্সের ভাইরাস একই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। তাই যখন কারো শরীরে একবার কাউপক্সের ভাইরাস সংক্রমিত হয়, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা একই ধরনের স্মলপক্সের ভাইরাসকেও মোকাবেলা করতে পারে। তাছাড়া স্মলপক্সের তুলনায় কাউপক্স অনেক কম প্রাণঘাতী, এর লক্ষণগুলিও ততটা সাঙ্ঘাতিক না। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ভ্যারিওলেশনের মত একই পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনি কাউপক্সের জীবাণু মানুষের শরীরে ঢুকিয়ে পরীক্ষা করবেন।

১৭৯৬ সালে মে’র ১৪ তারিখে তিনি যথারীতি কাউপক্সে আক্রান্ত রোগী খুঁজে বের করেন। সারাহ নেলমস নামের একজন গোয়ালিনীর শরীরে তখন কাউপক্সের ফুসকুঁড়ি দেখা দিয়েছে। সারাহ যেই গরুর কাছ থেকে আক্রান্ত হয়েছিল, সেই গরুর নাম ব্লসম।

মজার ব্যাপার হলো, ভ্যাকসিনেশন শব্দটার উৎপত্তিও ল্যাটিন শব্দ ভ্যাকা (vacca) থেকে, যার অর্থ গাভি।

জেনার গোয়ালিনীর শরীরের ফুসকুঁড়ি থেকে খানিকটা তরল সংগ্রহ করেন। তারপর তার বাগানের মালির ৮ বছরের শিশুর বাহুতে আঁচড় দিয়ে (ধারালো যন্ত্রের মাধ্যমে) সেখানে সংগ্রহ করা তরলের মাধ্যমে তার শরীরে জীবাণু প্রবেশ করান। শিশুটির নাম ছিলো জেমস ফিপস। জেমসের শরীরের যেখানে আঁচড় দেয়া হয়েছিল, সেখানে একটা ফুসকুড়ি দেখা দেয়। যদিও জেমস খুব দ্রুতই সুস্থ হয়ে ওঠে। জুলাই মাসের ১ তারিখে তিনি আবার জেমসের শরীরে স্মলপক্সের জীবাণু প্রবেশ করান। কিন্তু দেখা যায়, তার শরীরে বসন্তের কোনো চিহ্নই নেই।

এরপরে জেনার আরো অনেকজনের উপর এই পরীক্ষা করেন এবং সফল হন। প্রথমদিকে চিকিৎসকরা জেনারের এই পদ্ধতির সমালোচনা করলেও ধীরে ধীরে ভ্যারিওলেশন ব্যবহার কমে গিয়ে ভ্যকসিনেশনের ব্যবহার বাড়তে থাকে। এর মধ্যেই বিভিন্ন দেশ ভ্যারিওলেশন নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে থাকে। ১৮০৫ সালে রাশিয়া প্রথম ভ্যারিওলেশন নিষিদ্ধ করে।

জেনারের এই পদ্ধতি অনুসারেই পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীরা একে একে পোলিও, হুপিং কাশি, হাম, টিটেনাস, পীতজ্বর, টাইফাস এবং হেপাটাইটিস-বি সহ বেশ কিছু প্রাণঘাতী রোগের টিকা আবিষ্কার করেন।

সে টিকা এতই আতঙ্কের ছিল মানুষের যে ব্রিটিশ স্যাটায়ারিস্ট জেমস গিলরে ১৮০২ সালে এই কার্টুনটি আঁকেন। যার শিরোনাম ছিল ‘The Cow Pock, or the Wonderful Effects of the New Inoculation- the Publication of the Anti Vaccine Society.’

জেনারের জীবদ্দশাতেই তার অবদানকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। দেশে এবং বিদেশে জেনার নানাভাবে প্রশংসিত এবং পুরস্কৃত হন। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট থেকে তাকে প্রাথমিকভাবে এককালীন ১০ হাজার পাউন্ড উপহার দেয়া হয়। তার প্রায় ৫ বছর পরে তিনি আরো ২০ হাজার পাউন্ড সম্মানী পান।

জেনারকে আজ পর্যন্ত রোগ-প্রতিরোধ বিদ্যা বা ইমিউনোলজি’র জনক বলা হয়ে থাকে। ১৮০১ সালে জেনার প্রকাশ করেন তার গবেষণাগ্রন্থ ‘অন দ্য অরিজিন অফ দ্য ভ্যাকসিন ইনঅকুলেশন’। সেখানে তিনি লেখেন, “মানবজাতির জন্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর রোগ গুটিবসন্তের বিলুপ্তির মাধ্যমেই ভ্যাকসিনেশনের চূড়ান্ত সফলতা আসবে।”

আবার ১৮০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন কৃতজ্ঞতা স্বরূপ জেনারকে একটা চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, “সমগ্র মানবজাতির পক্ষ থেকে আপনাকে শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এর আগে কোনো ওষুধ এত বড় মাপের কার্যকরিতা দেখাতে পারেনি।… আপনি মানবজাতির অন্যতম বড় দুর্দশার একটা কারণ ইতিহাস থেকে মুছে দিতে পেরেছেন।… ভবিষ্যতের পৃথিবী শুধুমাত্র ইতিহাসের পাতা থেকেই জানতে পারবে, একসময় স্মলপক্স নামের একটা জঘন্য রোগের অস্তিত্ব ছিল, আর আপনার মাধ্যমেই সেই রোগ নির্মূল হয়েছে।”

আরো পড়ুন: ‘মহামারি বিদ্যার জনক’ জন স্নো ও কলেরার কারণ আবিষ্কার

তবে জেনারের ব্যক্ত করা চূড়ান্ত সফলতা অথবা জেফারসনের আশাবাদ বাস্তবে পরিণত হয়েছিল প্রথম ভ্যাকসিন আবিষ্কারেরও প্রায় ২০০ বছর পরে। আবিষ্কৃত হওয়ার পরেও তার পদ্ধতি নিয়মিত ব্যবহার করা হত না। প্রায়ই স্মলপক্স মহামারি আকারে হানা দিত। আর শুধু মহামারি হলেই চিকিৎসকরা জেনারের পদ্ধতি অনুসারে মানুষকে টিকা দিত। অনেক সময় মহামারি হলে পর্যাপ্ত টিকাও পাওয়া যেত না। কারণ, ভ্যাকসিন তৈরির জন্য আক্রান্ত মানুষের শরীর থেকেই ভাইরাস সংগ্রহ করতে হতো। এমন লোকের শরীর থেকেই চিকিৎসকরা ভ্যাকসিনের জন্যে ভাইরাস সংগ্রহ করতেন, যাদেরকে সম্প্রতি ভ্যাকসিন দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ভ্যাকসিন তৈরির জন্যে উপযুক্ত মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল।

তাই চিকিৎসকরা ভ্যাকসিনের জন্য ভাইরাস সংগ্রহ করত সেনাবাহিনীর সদস্য বা সৈন্যদের কাছ থেকে। কারণ, একে তারা সংখ্যায় অনেক ছিল। আবার তাদেরকে একই সময়ে টিকা দেয়া হত। কিন্তু সৈন্যরা প্রায়ই একসাথে থাকার কারণে তাদের শরীরে সিফিলিস কিংবা এরিসেপেলেসের মত নানা রোগের জীবাণু ছড়াত। এতে করে ভ্যাকসিন গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে অনেক সময় সুস্থ মানুষও সেইসব রোগে আক্রান্ত হয়ে যেত। যার কারণে মানুষ সহজে ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে চাইত না।

ভ্যারিওলেশন বনাম ভ্যাকসিনেশন

বাঁ দিকে ভ্যারিওলেশন, ডান দিকে ভ্যাকসিনেশন। ১২ ও ১৩তম দিনের অবস্থা। জর্জ কার্টল্যান্ডের পেইন্টিং অবলম্বনে ক্রোমোলিথোগ্রাফ (১৮৯৬)

ইনঅকুলেশন, টিকা কিংবা প্রতিরোধ ব্যবস্থা হলো শরীরে অল্প পরিমাণে ভাইরাস মেশানো পদার্থ প্রবেশ করানো। সাধারণত ত্বকের মধ্য দিয়েই তা প্রবেশ করানো হয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যাতে করে ভাইরাস শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে, সেজন্যে এটা করা হয়। এটা একটা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। রোগের নিরাময় নয়।

  • মূলত ইনঅকুলেশনের ফলে শরীর কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়ে। কিন্তু এতে করে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

ভ্যারিওলেশন হলো এক ধরনের ইনঅকুলেশন। স্মলপক্সের জীবিত ভাইরাস, ভ্যারিওলা মেজর ব্যবহার করে ভ্যারিওলেশন করা হতো।

  • লেডি মেরি ওয়ার্টলি মন্টেগু এবং য্যাবডিয়েল বয়েলস্টোন ১৭২১ সালে ভ্যারিওলেশনের এই পদ্ধতি পশ্চিমা বিজ্ঞানের নজরে এনেছিলেন। তারা পদ্ধতিটির নাম দিয়েছিলেন ‘ইনঅকুলেশন’ অথবা ‘ইনগ্রাফটিং’।
  • এর আগে এই পদ্ধতি চীন, তুরস্ক এবং পশ্চিম আফ্রিকায় প্রচলিত ছিল।
  • ভ্যারিওলা নামটি ল্যাটিন শব্দ ‘ভেরিয়াস’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘চিহ্নিত’।

সুনির্দিষ্ট অর্থে প্রথম দিকে ‘ভ্যাকসিনেশন’ এর অর্থ ছিল গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে ইনঅকুলেশন কিংবা টিকা দেয়া। কিন্তু এই টিকা দেয়া হত স্মলপক্সের মতোই, তবে এর চাইতে কম বিপজ্জনক ভ্যাকসিনিয়া (বা কাউপক্স) ভাইরাস ব্যবহার করে।

  • ভ্যাকসিনিয়া নামটা ল্যাটিন শব্দ ভ্যাকা থেকে এসেছে। যার অর্থ ‘গাভি’।
  • ভ্যাকসিনেশন শব্দটা তখন থেকেই জেনেরিক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে (জেরক্স, ক্লিনেক্স কিংবা লিভাই’স শব্দের মত)। আর এখন তা যেকোনো রোগের বিরুদ্ধে ইনঅকুলেশন বা টিকা অর্থে ব্যবহৃত হয়।
  • স্মলপক্সের ভ্যাকসিন থেকে কারো স্মলপক্স হয় না। কারণ, ভ্যাকসিনে স্মলপক্সের কোনো ভাইরাস থাকে না।

পার্থক্য

  • প্রতি ১০০ জন ভ্যারিওলেশন গ্রহণ করলে তাদের মধ্যে ১ জন মারা যেত। সেই সময়ে ভ্যারিওলেশনের বিকল্প ছিল শুধুমাত্র মহামারিতে আক্রান্ত হওয়া। যেই মহামারিতে আক্রান্ত প্রতি ৩ জনের মধ্যে ১ জন মারা যেত। এভাবে তুলনা করলে ভ্যারিওলেশনকে ভালোই বলা যায়।
  • স্মলপক্সের আধুনিক ভ্যাকসিনেশন গ্রহণ করার ফলে প্রতি ১০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১ বা ২ জন মারা যায়। বলা যায়, এটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটা বিষ্ময়কর অগ্রগতি।

ভ্যাকসিনের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় যেভাবে
জেনারের আবিষ্কারের প্রায় পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এইসব সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। ১৮৭০ সাল পর্যন্ত সবাই ভাবত, জেনার যেহেতু আক্রান্ত মানুষদের শরীর থেকেই জীবাণু সংগ্রহ করেছে তাদেরও সেটাই করা উচিৎ। যার সমাধান নিয়ে আসেন ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের শহর নেপলসের বাসিন্দা জুসেপি নেগরি। তিনিই প্রথম গবাদি পশুর শরীর থেকে ভ্যাকসিনেশনের জন্য ভাইরাস সংগ্রহ করেন। তার এই সমাধান চিকিৎসকদের সম্মেলনে পেশ করা হয়। কিন্তু তখন তার পদ্ধতিকে তখন খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি।

ফ্রান্সে ১৮৬৪ সালে এই পদ্ধতি গুরুত্ব পাওয়া শুরু করে। সেই বছর জনগণকে ভ্যাকসিন সেবা দেয়ার জন্যে গুস্তাভ ল্যানয় এবং আর্নেস্ট চ্যামবন নেপলস থেকে প্যারিসে কাউপক্সে আক্রান্ত একটা বাছুর নিয়ে আসেন। কয়েক বছরের মধ্যেই সেই দেশের অ্যাকাডেমি অফ মেডিসিনে পশুর দেহ থেকে ভ্যাকসিনের জন্য ভাইরাস সংগ্রহ করা শুরু হয়। এতে করে ভ্যাকসিন আরো সহজলভ্য হতে থাকে। শুধুমাত্র একটা বাছুরের দেহ থেকেই এক সপ্তাহের মধ্যে হাজার হাজার ভ্যাকসিনের ডোজ তৈরি করা যেত। আবার একপাল গরু থেকেই যেকোনো শহরের মহামারি সামাল দেয়ার মতো টিকা তৈরি করা সম্ভব ছিল। একইসাথে টিকার মাধ্যমে মানব শরীরের অন্য কোনো রোগ আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ত না।

বাংলাদেশে একটি আঞ্চলিক উৎপাদন কেন্দ্রে ভ্যাকসিনের মান নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। ছবি. ডব্লিউএইচও-রিজিওনাল অফিস ফর সাউথ-ইস্ট এশিয়া (এসিএআরও) স্মলপক্স ইন বাংলাদেশ

এরপর চ্যামবন কিছুদিনের জন্যে যুক্তরাষ্ট্রে যান। তিনি ব্রুকলিনের ফোর্ট গ্রিন প্যালেসে একটা অফিস নেন। তখনকার সময়ে ব্রুকলিন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় জনবহুল শহর। সেখানে তিনি জনপ্রিয় হয়ে যান। ঊনিশ শতকের শেষের দিকে চ্যামবন আমেরিকান চিকিৎসক এবং গুটিবসন্তের বিশেষজ্ঞ হেনরি মার্টিন-সহ অনেকের সাহায্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় অনেকগুলি ‘ভাইরাস ফার্ম’ তৈরি শুরু করেন। সেই ফার্মগুলি থেকে প্রচুর পরিমাণ টিকা উৎপাদিত হতে থাকে। ওই টিকার সাহায্যে ১৮৯৪ সালে ব্রুকলিনের প্রায় আড়াই লক্ষ অধিবাসীকে গুটিবসন্তের টিকা দেয়া হয়। এরপরে ১৯০২ সালে নিউ ইয়র্কের প্রায় আট লক্ষ মানুষকে দেয়া হয় এই টিকা। তবে বিশ্বব্যাপী গুটিবসন্ত নির্মূল হওয়ার জন্যে মানবজাতিকে আরো অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

রিং ভ্যাকসিনেশন
১৯৫৮ সালে সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে রাশিয়া স্মলপক্স নির্মূল করার প্রস্তাব আনে। কিন্তু প্রথম পর্যায়ে পর্যাপ্ত তহবিল, কর্মী এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দেশগুলির সদিচ্ছার অভাবে কাজ আগায়নি। এছাড়া বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে পর্যাপ্ত টিকারও অভাব ছিল।

১৯৬৬ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় গুটিবসন্ত মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে।

গুটিবসন্ত নির্মূল কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা আর ভারতের তত্ত্বাবধানে ছিলেন ডক্টর বিল ফেগি। তিনি সেই সময়কার স্মৃতিচারণ করে বলেন, “১৯৬৬ সালের ডিসেম্বরে আমরা পূর্ব নাইজেরিয়ার বিভিন্ন স্থানে গুটিবসন্তের মহামারির খবর পাই। কিন্তু তখন আমাদের হাতে সেই অঞ্চলের সবাইকে দেয়ার মত টিকা ছিল না। ফলে সেইবার আমরা সবাইকে টিকা দিতে পারিনি। তবে, সংকট মোকাবেলা করতে আমরা দেশটাতে কাজ করা মিশনারিদের সাথে যোগাযোগ করি। তারা আমাদের প্রত্যেক রাতে রেডিওর মাধ্যমে মহামারি আক্রান্ত নতুন নতুন এলাকার খবর দিত। আমরা তখন সামনে থাকা ম্যাপে ছক কেটে কেটে ভাগ করে নেই। এরপরে মিশনারিদের জানাই, তারা যেন গুটিবসন্তে আক্রান্ত প্রতিটা গ্রামে তাদের রানার (দ্রুত সংবাদ বহনকারী) পাঠায়। আর এতে করে তারা নিশ্চিত হয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের আক্রান্ত প্রত্যেকটা গ্রামের সঠিক অবস্থান জানাতে সক্ষম হয়।

গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়েও এই ছেলে শিশুটি সেসময় বেঁচে গিয়েছিল, কিন্তু দাগগুলি কখনোই তার শরীর থেকে যায়নি। ছবি. প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন (পিএএইচও)

ফেগিরা যা করেছিলেন, তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘রিং ভ্যাকসিনেশন’। তারা মহামারি আক্রান্ত গ্রামগুলিতে নিজেরা গিয়ে টিকা দিয়ে আসত, রোগীরা তাদের কাছে আসত না। ফলে আক্রান্ত রোগীদের শরীর থেকে ভাইরাসও আশেপাশের কারো শরীরে ছড়াত পারত না।

টিকা দেয়ার ফলে সবার শরীরেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ফেগি জানান, কাজটা করার সময় নিজেদের কৌশল যে এত কাজে দেবে তা তারা ভেবে দেখেননি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগ
১৯৬৭ সালে নতুনভাবে বিভিন্ন দেশের প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আবারো তাদের কার্যক্রম শুরু করে। এবারের উদ্যোগ সফল করতে বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। যেমন, প্রায়ই স্মলপক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা যায় এমন দেশের ল্যাবগুলিতে কার্যকরী ও উন্নত টিকা সরবরাহ করা হয়। টিকাদানের কার্যক্রমে গতি আনতে ইনজেকশনে ব্যবহারের বাইফার্কেটেড সুঁই উন্নত করা হয়। রোগীদের শনাক্ত করে তদারকি করতে নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়াও জনসাধারণের মধ্যে টিকা বিষয়ক প্রচারণা শুরু করা হয়।

১৯৬৭ সালে এই কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই ১৯৫২ সালে উত্তর আমেরিকা এবং ১৯৫৩ সালে ইউরোপকে গুটিবসন্ত-মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল। ডক্টর ডোনাল্ড হপকিন্স বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই স্মলপক্স নির্মূল অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি জানান, যখন এই অভিযান শুরু হয়, তখন সারা বিশ্বের মোট ৫টা অঞ্চলে স্মলপক্সের প্রাদুর্ভাব ছিল। অঞ্চলগুলি হল দক্ষিণ আমেরিকা, পশ্চিম আর মধ্য আফ্রিকা, পূর্ব আর দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশ ও ইন্দোনেশিয়া। দক্ষিণ আমেরিকায় মূলত ব্রাজিলে এই রোগ সবচেয়ে বেশি দেখা যেত। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় কাজ করাটা সবচেয়ে কঠিন ছিল। কারণ অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় জনসংখ্যার ঘনত্ব সেখানে বেশি ছিল। সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা আর অবকাঠামোও ছিল খারাপ।

গ্লোবাল স্মলপক্স ইরাডিকেশন ম্যাপ। ছবি. সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)

কোনো রোগ নির্মূল করার জন্যে এত বড় কার্যক্রম এর আগে কখনো ঘটেনি। প্রথমে আফ্রিকার যেই দেশগুলিতে স্মলপক্সের প্রাদুর্ভাব বেশি, এমন ২৩টা দেশে টিকার কার্যক্রম শুরু হয়। বিল ফেগি তাদের কার্যক্রম নিয়ে বলেন, আমাদের লক্ষ্য ছিল, প্রতিটা মানুষকে এই ভাইরাসের টিকা দেয়া। প্রতিটা মানুষ বলতে আমরা কোটি কোটি মানুষের কথা বলছি। এমনও সময় গেছে, আমরা একইসাথে ৬৮০০ ভিন্ন ভিন্ন জায়গার মহামারি মোকাবেলা করেছি। প্রতিটি মহামারিতে গড়ে ১০০ জনের মত রোগী আক্রান্ত হত। এখনো অতীতের কথা ভাবলে আমার মনে হয়, ৬৮০০ জায়গায় মহামারি সামাল দেয়া অসম্ভব একটা কাজ। কিন্তু তখন আমাদের বিশ্বাস ছিল, আমরা পারব। এই রোগের কার্যকরী টিকা আমাদের হাতে ছিল। আর কেউ আক্রান্ত হলে লুকানোর কোনো সুযোগ ছিল না। আমরা সহজেই রোগীদের খুঁজে বের ফেলতে পারতাম।”

গুটিবসন্ত নির্মূল অভিযান নিয়ে মাইক্রোবায়োলজিস্ট লিজা হেন্সলি যেমন বলেছেন, ভাইরাসঘটিত রোগের চিকিৎসা নিয়ে চিন্তা করলে আপনি আসলে যুদ্ধ নিয়েই চিন্তা করেন। এই যুদ্ধে কে এগিয়ে থাকবে। একটা পদক্ষেপ আর পাল্টা পদক্ষেপের উপর নির্ভর করে পুরো যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি।

স্মলপক্সের ভ্যাকসিনেশন ব্যাপকভাবে চালাতে এধরনের গান ব্যবহার করা হত। এটি ব্যবহার করে ঘণ্টায় ১ হাজার জনকে নিরাপদে ভ্যাকসিন দেয়া যেত।  ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন রিজিওনাল অফিস ফর আফ্রিকা’র (ডব্লিউএইচও/এএফআরও) কার্যক্রমের একটি ছবি, ছবিসূত্র. ডব্লিউএইচও

ফেগি জানান, এভাবে ধীরে ধীরে ভাইরাসটির বিস্তার থামানোর জন্যে অন্যান্য দেশও এগিয়ে আসে। আর ১৯৭৩ সালের মধ্যে ভারতই ছিল একমাত্র দেশ, যারা গুটিবসন্তের সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। ১৯৭৪ সালে ভারতের জনসংখ্যা ছিল প্রায় অর্ধেক বিলিয়ন বা ৫০ কোটি। আর এই মানুষেরা ২১টি রাজ্যের ৫ লক্ষ গ্রামের ১২ কোটি পরিবারে বসবাস করত। ভারত থেকে গুটিবসন্ত নির্মূল করার মানে হল, প্রতিটি পরিবারের কাছে গিয়ে টিকা দিয়ে আসা। কার্যক্রমের তত্ত্বাবধায়নে থাকা আরেকজন কর্মকর্তা ডক্টর ল্যারি ব্রিলিয়ান্ট বলেন, আমরা তা-ই করেছিলাম। ২০ মাস ধরে একে একে প্রতিটা পরিবারের সদস্যদের টিকা দেই আমরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই কার্যক্রম মানব ইতিহাসে ঘটা অন্যতম মহান একটা ঘটনা। যেখানে বিশ্বব্যাপী মানুষের বুদ্ধিমত্তা আর সদিচ্ছা একসাথে কাজ করেছে। মেডিকেল হিস্টোরিয়ান ডক্টর গ্যারেথ উইলিয়ামস বলেছেন, বিংশ শতাব্দীর চিকিৎসার ইতিহাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে স্মলপক্স নির্মূল অভিযানের গল্পটা সবচেয়ে বিস্ময়কর আর প্রেরণাদায়ক একটা অধ্যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেন ডক্টর ডি. এ. হেন্ডারসন। তার মতে, ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমি বিলের (বিল ফেগি) সাথে একমত হই, আমরা আসলেই রোগটা নির্মূল করতে পারব। এর আগে প্রতি বছর গুটিবসন্তে সারাবিশ্বে ১ কোটি মানুষ আক্রান্ত হত। তাদের মধ্যে ২০ লক্ষ মানুষ মারা যেত। মাত্র ১০ বছরের মধ্যে আমরা আক্রান্তের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে পেরেছি।

ছবিতে ভ্যারিওলা। পৃথিবীর খুব অল্পসংখ্যক ল্যাবরেটরিতেই এখন ভাইরাসটি সংরক্ষিত আছে। ছবি. প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন (পিএএইচও)

গুটিবসন্তের জন্য দায়ী ভ্যারিওলা ভাইরাসের দুইটা প্রকার ছিল। একটা হল ভ্যারিওলা মেজর এবং আরেকটা ভ্যারিওলা মাইনর। ভ্যারিওলা মেজর ছিল বেশি ভয়ানক আর প্রাণঘাতি। সারাবিশ্বে যখন গুটিবসন্ত নির্মূল হওয়ার পথে, তখনো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল না। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ব্যাপক টিকাদান কার্যক্রম আর সচেতনতার ফলে ততদিনে দেশে বসন্তে আক্রান্ত রোগী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে গিয়েছিল। আবার, যদি নতুন আক্রান্ত একজন রোগীও পাওয়া যায়, তাহলেই যেকোনো সময় মহামারি শুরু হয়ে যেতে পারে। তাই গুটিবসন্তে আক্রান্ত রোগীদের খুঁজে বের করার জন্যে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ উদ্যোগে একটা কৌশল বেছে নেয়া হয়। ঘোষণা দেয়া হয়, গুটিবসন্তের রোগী খুঁজে এনে দিতে পারলেই ৫০ টাকা পুরস্কার।

ছবিতে মায়ের কোলে ৩ বছর বয়সী রহিমা বানু, পৃথিবীর সর্বশেষ গুটিবসন্তে আক্রান্ত রোগী। ছবি. সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)

এই কৌশলে কাজ হলো। নতুন করে অনেক রোগীর সন্ধান পাওয়া গেল। তবে ধীরে ধীরে রোগী খুঁজে পাওয়া দুর্লভ হতে থাকল। আর এতে করে পুরস্কারের মূল্যমানও বাড়তে থাকল। বাড়তে বাড়তে সেটা একসময় ২৫০ টাকায় এসে ঠেকল।

১৯৭৫ সালের অক্টোবরের ১৬ তারিখে বিলকিস উন নাহার নামের ৮ বছর বয়সী এক শিশু, স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদেরকে একজন রোগীর খোঁজ জানাল।

ভোলার কুড়ালিয়া গ্রামের সেই রোগীর নাম রহিমা বানু, বয়স ৩ বছর। রহিমা বানুই ছিল ভ্যারিওলা মেজর ভাইরাসে আক্রান্ত পৃথিবীর সর্বশেষ রোগী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মীদের সেবায় রহিমা বানু সুস্থ হয়ে ওঠে। এছাড়া এর দুই বছর পরে সোমালিয়ায় ধরা পড়ে ভ্যারিওলা মাইনরে আক্রান্ত পৃথিবীর সর্বশেষ রোগী।

১৯৭৯ সালের অক্টোবরের ২৬ তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে ঘোষণা করা হয়, পৃথিবীতে নতুন করে কেউ গুটিবসন্তে আক্রান্ত হচ্ছে না। স্মলপক্স নির্মূল ঘোষণাকে আন্তর্জাতিকভাবে জনস্বাস্থ্য ক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে ধরা হয়।

স্মলপক্স নির্মূলের আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেট

বর্তমানে পৃথিবীতে দুইটি জায়গায় গবেষণার স্বার্থে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নজরদারিতে ভ্যারিওলা ভাইরাস সংরক্ষণ করা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের রাজধানী আটলান্টায় অবস্থিত ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’-এ এবং রাশিয়ার কলতসোভো অঞ্চলে অবস্থিত ‘স্টেট রিসার্চ সেন্টার অফ ভাইরোলজি অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি’তে।

অনেকেই এভাবে ভাইরাস সংরক্ষণে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ দেখতে পান। তারা মনে করেন, ভাইরাসের উপর দখল থাকার ফলে অসৎ উদ্দেশ্যে যেকোনো মানুষ বায়োটেরোরিজম শুরু করতে পারেন। আবার অনেকে জোর দেন নতুন ভাইরাস আবিষ্কারের দিকে। যেমন, মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের অধ্যাপক ডক্টর হোসে এসপারযা বলেন, অনেকে মনে করেন, আমরা প্রকৃতিতে বিদ্যমান ভাইরাসগুলির ১ শতাংশেরও কম আবিষ্কার করতে পেরেছি। গুটিবসন্ত নির্মূল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সারাবিশ্ব এখনো ভাইরাস দিয়ে ভর্তি। এই ভাইরাসগুলি আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে।

এদিক থেকে বিবেচনা করলে বলাই যায়, গুটিবসন্ত নির্মূল হওয়াটা ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধের সূচনা ছিল। তবে যেই যুদ্ধে সম্পূর্ণ বিজয়ী হতে আমাদেরকে এখনো বহুদূর যেতে হবে।