হার্ড ইমিউনিটি কী? এটা কি করোনাভাইরাসকে থামাতে পারবে?

কোভিড-১৯ কে থামানোর তিনটা উপায় আছে। প্রথমটা হচ্ছে চলাফেরা এবং সমাবেশে অনেক কড়াকড়ি আরোপ করা, সাথে সাথে কোভিড-১৯ টেস্ট করানো, যাতে করে আক্রান্তদের আলাদা করে এর সংক্রমণ সম্পূর্ণভাবে আটকানো যায়। এখন যেটা করা অসম্ভবই, কেননা এর মাঝেই ১০০ এর উপরে দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। দুই নাম্বার উপায় হচ্ছে ভ্যাকসিন, যা সবাইকে বাঁচাতে পারে, কিন্তু তা এখনো আবিষ্কার করা যায় নাই।

তৃতীয় একটা উপায় আছে যেটা কার্যকরী, কিন্তু সেটা ভাবাটাও ভয়ঙ্কর: তা হচ্ছে অনেক মানুষ সংক্রমিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা।

ভাইরাসটাকে যদি ছড়াতে দেয়া হয়, তাহলে অসংখ্য মানুষ এর দ্বারা সংক্রমিত হবে, এবং তারা যদি সারভাইভ করে, তাদের শরীরে এই ভাইরাসের বিপক্ষে প্রতিরোধ তৈরি হবে এবং এই মহামারীটি ক্রমে দুর্বল হবে, কেননা এর জন্য সংক্রমিত হবার মত পোষক কমে আসতে থাকবে। এই বিষয়টিকে হার্ড ইমিউনিটি (herd immunity) বলা হয়।

করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে, অপ্রতিরোধ্য গতিতে, ছড়াচ্ছে। যারা এমন ঘটনার ফলাফল প্রেডিক্ট করেন সেসব বিশেষজ্ঞরা করোনার পরিণতির মডেল করতে সবচেয়ে খারাপ অবস্থাটা বিবেচনায় নিচ্ছেন। তাদের মতে তারা ভাইরাস সম্পর্কে যা জানতে পারছেন, তাতে একবছরের মধ্যে বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ এর দ্বারা সংক্রমিত হতে পারেন।


আন্তনিও রেগালাদো
এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ, ১৭ মার্চ ২০২০


এই সংখ্যাগুলি আন্দাজে ধরে নেওয়া না। এটার জন্য একটা পর্যায় নির্ধারণ করা আছে, মহামারি বিশেষজ্ঞরা যেই পর্যায়ের উপরে কোনো মহামারি চলে গেলে, সেই ভাইরাসের জন্য হার্ড ইমিউনিটির পরামর্শ দেন।

গত সপ্তাহে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এমন ইঙ্গিত করেন যে দেশটির এই বিষয়ে কৌশল হবে সাহসের সাথে সহ্য করা এবং ভাইরাসটিকে ছড়াতে দেয়া। যার ফলে পত্রিকাগুলিতে এই হার্ড ইমিউনিটি হেডলাইন হতে শুরু করে। যুক্তরাজ্য সরকারের প্রধান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা প্যাট্রিয়ার্ক ভ্যালান্স জানান, দেশেটির জন্য “একরকম হার্ড ইমিউনিটি গঠন করা” দরকার, যাতে করে বেশি মানুষ এই রোগ প্রতিরোধে সক্ষম থাকেন, এবং এতে করে সংক্রমণ কমবে।

গতকাল (১৬ মার্চ, ২০২০) নেদারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুট একইরকম একটা কথা বলেছেন “আমরা ভাইরাস ছড়ানোর গতি কমাতে পারি আবার একই সাথে নিয়ন্ত্রিতভাবে নিজেদের মধ্যে এর বিরুদ্ধে ইমিউনিটিও তৈরি করতে পারি।”

কিন্তু নতুন যে মডেল এসেছে, সেটা দিয়ে যদি আমরা হার্ড ইমিউনিটির অপশনটা বিবেচনা করি আমরা একটা ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাই। কেননা এর ফলে অসংখ্য মানুষ মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বে, এবং তাদের মেডিক্যাল সাহায্য দরকার হবার কারণে হাসপাতালে চাপ বাড়বে। যুক্তরাজ্য এই সপ্তাহে অবশ্য বলছে তারা ভাইরাসের ছড়িয়ে পরা রোধ করতে বরং বেশি আগ্রহী, তারা জমায়েতকে নিরুৎসাহিত করছেন। এটা ছড়ানো কমানোর মানে হচ্ছে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে তার বর্তমান যে রিসোর্স আছে তার মধ্যে ঠিকভাবে চিকিৎসা দেবার সুযোগ করে দেওয়া। এতে করে অনেক জীবন বাঁচবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিন্তু ব্যাপারটা একই দাঁড়াবে। কেননা যদি এই ভাইরাস আরও বেশি সময় স্থায়ী হয়, এটাকে থামাতে শেষমেশ হার্ড ইমিউনিটিরই দরকার হবে।

যদিও অনেক সমালোচনার পরে যুক্তরাজ্যের সেক্রেটারি ফর হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল কেয়ার ম্যাট হ্যানকক পরিষ্কার করে জানিয়েছেন, “হার্ড ইমিউনিটি আমাদের লক্ষ্য কিংবা নীতি না, এটা কেবল একটা বৈজ্ঞানিক কনসেপ্ট মাত্র।”

 

কিন্তু আসলেই হার্ড ইমিউনিটি কী?

কোনো পপুলেশনের একটা বড় অংশ যখন কোনো জীবাণুতে প্রতিরোধী হয়, তখন স্বাভাবিকভাবে জীবাণুর সংক্রমণ বন্ধ হতে থাকে। কেননা এটা ছড়ানোর জন্য বেশি মানুষ আর বাকি থাকে না। যেহেতু যে জীবাণুর সংস্পর্শে এসে সংক্রমিত হচ্ছে না, সে জীবাণুটা বহন করছে না। অর্থাৎ হার্ড বা দঙ্গল ভাইরাস প্রতিরোধী হয়ে ওঠেছে। যদিও এর মাঝে অনেক ব্যক্তি হয়তো তখনো ভাইরাসে প্রতিরোধী নন।

বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে এটা কল্পনা করাই ভয়াবহ, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার ১% (এবং এটা খুব নিশ্চিত কিছু না, এছাড়াও হাসপাতালে সুবিধা পাবার পরও যে মৃত্যুহার সেটা কিন্তু বেশি)। কাছাকাছি সময়ের যে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে তাতে এই হার্ড ইমিউনিটির প্রমাণ পাওয়া যায়।

 

যেভাবে হার্ড ইমিউনিটি একটি ভাইরাসকে থামায়

প্রাদুর্ভাবের একটা সরল মডেল, প্রতিটা আক্রান্ত ব্যক্তি দুটি নতুন আক্রান্ত ব্যক্তি তৈরি করে। এভাবে একটা এক্সপোনেনশিয়াল বৃদ্ধি ঘটে রোগ আক্রান্তদের। কিন্তু এর মধ্যে যদি অর্ধেক মানুষ এই রোগে ভুগে সেরে ওঠে, তাহলে এর দ্বারা আক্রান্তের সংখ্যা আর বাড়ে না।

২০১৫ সালের জিকা ভাইরাসের ব্যাপারটা ধরা যেতে পারে, মশার মাধ্যমে সৃষ্ট ভাইরাসটি মহামারী ভীতির জন্ম দিয়েছিল, যেহেতু এর সাথে নবজাতক শিশুদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বিভিন্ন অস্বাভাবিকতাও সম্পৃক্ত ছিল।

কিন্তু ২০১৭ সালে, মাত্র দুই বছর পর এ নিয়ে দুঃশ্চিন্তা কমে এসেছিল। ব্রাজিলের একটা সমীক্ষায় দেখা যায়, সালভাদরের নর্থইস্টার্ন বিচ এলাকার ৬৩% মানুষের রক্তের নমুনায় দেখা যায় যে তারা জিকা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। রিসার্চাররা ধারণা করেন, এই প্রাদুর্ভাব হার্ড ইমিউনিটি থামিয়েছিল।

ভ্যাকসিনও কিন্তু হার্ড ইমিউনিটি তৈরি করে। ভ্যাকসিন ব্যাপকভাবে দেয়া হয়, আবার নতুন ভাইরাসের সময় ছোট ছোট গ্রুপের মাঝে দেয়া হয়। এভাবেই গুঁটি বসন্ত নির্মুল হয়েছে, এবং পোলিও নির্মুল হওয়ার পথে। করোনা ভাইরাসের জন্যে বিভিন্ন ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ চলছে, কিন্তু তা প্রস্তুত হতে একবছরের বেশি সময় লাগবে।

ভ্যাকসিন আবিষ্কার হবার আগে যে সময়টা এর মাঝেই কিন্তু হার্ড ইমিউনিটি প্রাকৃতিক সংক্রমণের মাধ্যমে ঘটে যেতে পারে। এই রকম ঘটনা ঘটেছিল ২০১৭ সালে, ওষুধ উৎপাদক সানোফি জিকার ভ্যাকসিন তৈরির প্রকল্প নিরবে বাদ দিয়ে দিয়েছিল। তাদের বিনিয়োগের তুলনায় বাজারের আকার অনেক ছোট হয়ে পড়েছিল, যেহেতু জিকার জন্য হার্ড ইমিউনিটি ডেভেলপ করেছে।

কিন্তু করোনাভাইরাস একদম নতুন, এবং কেউ এটা প্রতিরোধী কিনা তা জানা যায় নি। যার কারণে এটাকে ছড়াতে দেয়া বেশ কিছু মানুষের জন্য ভয়াবহ বিপদ নিয়ে আসতে পারে।

হার্ড ইমিউনিটি আসতে হলে, মানুষের শরীরকে অবশ্যই প্রথম সংক্রমণের পর এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হতে হবে। এটা অনেক জীবাণুর ক্ষেত্রে ঘটে, যারা সংক্রমিত হয় এবং সেরে ওঠে, এবং পুনরায় এই রোগে আক্রান্ত হয় না। কেননা তাদের ইমিউন সিস্টেমে এই রোগকে প্রতিরোধ করার অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে আছে।

এর মাঝে আশি হাজার লোক করোনাভাইরাস থেকে সেরে উঠেছে, এবং সম্ভবত এরা এখন এই ভাইরাস প্রতিরোধী, কিন্তু তাদের প্রতিরোধের মাত্রাটা এখনো অজানা। “আমি বিস্মিত হব, আবার বিস্মিত হবোও না ঠিক; যদি মানুষ এই ভাইরাস প্রতিরোধী না হয়”—ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ডের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মাইরন লেভিন জানাচ্ছেন। কিছু ভাইরাস, যেমন ফ্লু, এরা কোনো না কোনো ভাবে পরিবর্তিত হতেই থাকে। যার কারণে এমন মৌসুমী জীবাণুর ক্ষেত্রে পুরোপুরো প্রতিরোধী হওয়া হয় না।

 

আমরা কখন ইমিউনিটিতে পৌঁছাই?

যেই পয়েন্টটাকে আমরা হার্ড ইমিউনিটি বলি, সেটা গাণিতিক ভাবে জীবাণুটার ছড়িয়ে পড়ার হারের সাথে জড়িত। এটাকে ধরা হয় R0। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে এই R0 এর মান হচ্ছে ২ থেকে ২.৫ এর মধ্যে, এর অর্থ দাঁড়ায় এটা একজন মানুষের দ্বারা নতুন দুইজনের মধ্যে ছড়ায়।

করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে একটা পপুলেশনের মাঝে এটা ছড়ায় ১, ২, ৪, ৮, ১৬ এভাবে। এখন যদি অর্ধেক মানুষ এটা প্রতিরোধী হয় তাহলে অর্ধেক সংখ্যক ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ ঘটবে না, তার মানে একজন কেবল আর একজনকে সংক্রমিত করতে পারবে, সেক্ষেত্রে সায়েন্স মিডিয়া সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী ধারাটি হবে ১, ১, ১, ১…। এবং এই প্রাদুর্ভাব থেমে যাবে যখন এই ছড়ানোর হারটা ১ এর নিচে নেমে আসবে। মানে একজন সংক্রমিত ব্যক্তি একের কম ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারছে।

বর্তমান জীবাণুটার ছড়ানোর হার কিন্তু অন্যান্য সাধারণ ফ্লুর চেয়ে বেশি, কিন্তু ১৯১৮ সালে যে ফ্লু ছড়িয়েছিল পৃথিবীতে সেটার সাথে এর মিল আছে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এপিডেমিওলজিস্ট মার্ক লিপসইচ বিশেষজ্ঞদের এক সভায় ভিডিও কলের মাধ্যমে বলেন, “এটা ১৯১৮ সালের প্যানডেমিক ফ্লুর মতই, যার মানে এই মহামারী থামতে জনসংখ্যার ৫০% কে এই ভাইরাস প্রতিরোধী হতে হবে, সেটা ভ্যাকসিন দিয়েই হোক—আর ভ্যাকসিন তো এখনো আমাদের জন্য লভ্য হয় নাই, আবার প্রাকৃতিক সংক্রমণের মধ্যে দিয়েই ঘটুক।”

ভাইরাস যত ছোঁয়াচে কিংবা সংক্রামক, হার্ড ইমিউনিটি লাভ করতে সেই হারে মানুষকে সংক্রমিত হতে হবে। মিজলজ, সবচেয়ে ছোঁয়াচে রোগের একটি, যার R0 এর মান হচ্ছে ১২, এবং এটার হাড ইমিউনিটি লাভ করতে হলে ৯০% জনসংখ্যাকে আক্রান্ত হয়ে সেরে ওঠতে হবে। এবং কেবল সেক্ষেত্রে হয়তো বাকিরা সংক্রমিত না হয়ে থাকতে পারবেন। যার কারণে মিজলজ এর ক্ষেত্রে অল্প কিছু মানুষ ভ্যাকসিন না নিলেই এর প্রাদুর্ভাব শুরু হতে পারে।

একই ভাবে, যদি বিশেষজ্ঞরা যেমন ভাবছেন করোনা তার থেকে আরও দ্রুত ছড়ায়, তাহলে অনেক মানুষকে এর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সেরে ওঠতে হবে হার্ড ইমিউনিটি লেভেলে পৌঁছাতে গেলে। R0 যখন ৩, ৬৬% মানুষকে প্রতিরোধী হতে হবে হার্ড ইমিউনিটির জন্য—সাধারণ মডেলিং এমনই পূর্বাভাস দিচ্ছে।

এটা ৫০%, ৬০%, কিংবা ৮০% হোক, এর ফলে আমরা যে সংখ্যা পাই, তাতে কয়েক বিলিয়ন আক্রান্ত এবং কয়েক মিলিয়ন মৃত মানুষের হিসাব আছে। তার থেকে কোভিড-১৯ ছড়ানো আটকানোটা আমাদের জন্য “বেটার চান্স” তৈরি করতে পারে। এটার ছড়িয়ে পড়ার গতি যদি আমরা সামাজিক দূরত্ব, জমায়েত ইত্যাদির মাধ্যমে কমিয়ে আনতে পারি, তাতে মৃত্যু এবুং আক্রান্তের হার কম হবে। এর মাঝে আমরা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি কিংবা ভ্যাকসিনের প্রত্যাশা করতে পারি।

যুক্তরাজ্যে যে নতুন এপিডেমিওলজিকাল মডেল এসেছে, তাতে ভাইরাস ছড়ানো একদম কমিয়ে আনার জন্য কড়াকড়ি পদক্ষেপ নিতে বলেছে। এটার প্রধান কৌশল হচ্ছে আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা করে ফেলা, সামাজিক মেলামেশা ৭৫% ভাগের মত কমিয়ে আনা, এবং স্কুল বন্ধ করে দেওয়া। অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্থ করলেও এই পদক্ষেপগুলি কমপক্ষে কয়েক মাস ধরে চালাতে হবে।

আরো পড়ুন: জার্মানিতে করোনায় মৃত্যুহার এত কম কেন?

“ছড়ানো বন্ধ করলেই যে হার্ড ইমিউনিটি থেমে থাকবে ব্যাপারটা এমন না”—নিউ মডেল অফ আউটব্রেকের প্রধান এপিডেমিওলজিস্ট ইম্পেরিকাল কলেজ লন্ডনের আজরা ঘানি তাই মনে করেন। তিনি সাফল্যের ট্রেড-অফ নিয়ে বলেন, “আমরা যেহেতু এটাকে খুবই কম ছড়াতে দিতে চাই, তার কারণে আমাদের এসব পদক্ষেপ নিতেই হবে।”

অনুবাদ. ফারুক আব্দুল্লাহ