সিনেমার ‘দেবী’

সিনেপ্লেক্সে ১টা ৪০ এর শো’তে পরিচালক অনম বিশ্বাসের দেবী দেইখা অাসছি গতকাল ৩০ অক্টোবর। হলে ঢুকতে মিনিট দশেক লেট হইছে তবে তাতে কিছু মিস হইছে বইলা মনে হয় নাই।

গিয়া যা পাইছি, নীলু (শবনম ফারিয়া) তাদের গাড়িতে কইরা ভার্সিটিতে যাবে। আর রানু (জয়া অাহসান) বের হইছে বাজার করতে। রানু গাড়িতে বসা নীলুকে দেইখা ভার্সিটিতে যাইতে নিষেধ করল। কারণ তার ধারণা গাড়িতে গেলে নীলুর বিপদ হইতে পারে। নীলু তাতে একটু অবাক হইল, এবং গাড়ি ছাইড়া রিকশা নিয়া ভার্সিটিতে গেল। আর রানু গেল বাজারে।

শবনম ফারিয়ার মধ্যে নীলুকে পাওয়া গেছে। তিনি রানুর নিষেধাজ্ঞায় কিছুটা ইতস্তত হইয়া নিজের অংশ সুন্দর মতই শেষ করছেন, অ্যাকটিং পুরা সিনেমাতেই ভাল ছিল, বাড়তি কিছু করেন নাই, চরিত্রের মত থাকছেন। তবে সিনেমার শেষ সিনে বিশেষ ভাল করেন নাই।

কিন্তু, নীলুর সঙ্গে গাড়ির সিনে জয়া অাহসান ওভার অ্যাকটিং করলেন। ওই সিন থেকেই মনে হইল সিনেমায় উনার চরিত্র কেমন তার বদলে রানু চরিত্রের যে অলৌকিকতা এবং জয়া অাহসানের নিজস্ব অভিনয় রীতি তাই এইখানে মুখ্য বিষয়।

খালি এখানেই না, পুরা সিনেমাতে তিনি এরকমই ছিলেন। তা তো রানু না। রানু তার সমস্যার বাইরেও যেভাবে সবকিছু দেখতে পারে তা সিনেমায় অানা হয় নাই। এর বাইরে বেশিরভাগ সময় রানু চরিত্রের অন্যমনস্কতা এবং পাওয়ার দেখাইতে জয়া আহসান দুলতেছিলেন, কিছুটা মাদকাসক্তের মত বা খুব ধীরে ধীরে মুভ করতেছিলেন, মাথা নাড়াইতেছিলেন। তাতে রানুর চরিত্র বিকৃত হইছে।

এইটা অামার নির্দেশকের সমস্যা বইলা মনে হইছে। নির্দেশক চাইলে একজন সাধারণ অভিনেতাকে দিয়াও অনেক সাবলীল অভিনয় করায়া নিতে পারেন। অার এই সিনেমায় অাছেন দেশের বিখ্যাত অভিনেতারা এবং একজন বাদে প্রত্যেকেই খারাপ অভিনয় করছেন!

দেবী
‘দেবী’ সিনেমার পোস্টার

চঞ্চল চৌধুরীর অভিনয় এর অাগে অামি মনপুরাতে এবং টিভি নাটকে কিছু দেখছি, খারাপও লাগে নাই ভালোও লাগে নাই। তবে উনার অভিনয়ের মধ্যে একজন অভিনেতাকে অতিক্রম কইরা শিল্পী হইতে চাওয়ার চেষ্টাটা থাকে, মানে একটা থিয়েটারধর্মী ব্যাপার থাকে। যার কারণে জিনিসটা ক্লিশে হইয়া দাঁড়ায়। মিসির আলি করতে গিয়া উনি এই সমস্যার বাইরে অারো কিছু সমস্যা করছেন। যেমন, চঞ্চল উনার চরিত্রটাই বোঝেন নাই। মিসির আলি চরিত্রের যে সরল গাম্ভীর্য, বুদ্ধিমত্তা, এবং তা যে সকল প্রকার বাহুল্যের বাইরে তা উনার অ্যাকটিং-এ অাসে নাই। বরং তার বদলে খুব সাধারণ একটা খেয়ালী এবং মাঝে মাঝে কৌতূহলী একজন প্রফেসরের চরিত্র দেবীতে নতুন যোগ করা হইছে বইলা মনে হইছে। উনার মধ্যে মিসির অালিকে পাই নাই।

ইরেশ জাকেরও প্রথম দুই একটা সিন বাদে বাকি সব জায়গায় বাজে অভিনয় করছেন। ভালোগুলি বলতে নীলুর সঙ্গে প্রথমবার যখন দেখা করতে আসেন উনি, তা অবশ্য মোটামুটি বলা যায়। তবে তার চরিত্রটা স্পেসিফিকভাবে বোঝা ওই সিনটায়, উনি যখন নীলুর হাতে ফুলের মালা পরাইয়া দেন এবং নীলুর সেইটা কড়া লাগতেছে বইলা রেস্টোরেন্ট বা ক্যাফের মধ্যেই মালাটা ছুঁইড়া ফালায়া দেন।

এর বাইরে বাদবাকিদের অভিনয় মোটামুটি হইছে, কারণ সবাই কমবেশি ওভার অ্যাকটিং করছে। তাতে সিম্পল চরিত্রগুলিও সৌন্দর্য হারায়া একটা রিপিটেশনের মধ্য দিয়া ঘুরপাক খাইছে।

দেবী
অবসর প্রকাশিত ‘দেবী’

গল্পের কথা বলতে গেলে, তারা উপন্যাস পুরাপুরি অনুসরণ করে নাই। বানানেওয়ালার অালগা মাতব্বরিতে মূল গল্পের যে বিস্তৃতি এবং রহস্যময়তা অাছে তা সিনেমায় অাসে নাই। দেইখা মনে হবে, সিনেমাটা ভৌতিক হইতে চাইয়া শেষ পর্যন্ত তা হইয়া উঠতে পারে নাই।

সিনেমার মাঝখানে মিসির অালি জালালউদ্দিনের খোঁজে যখন রানুদের গ্রামে যান সেই অংশে গল্প কিছুটা কাঠামো নিতে শুরু করছিল। কিন্তু, গ্রামবাসীদের পুরা এক্সপ্রেশনরে হাস্যরস বানায়া ফেলার কারণে তা অাবার পূর্বের জায়গায় ফেরত গেছে। তাদেরকে দিয়া জালালউদ্দীনের ব্যাপারে বলানোর বেশিরভাগ এক্সপ্রেশন টিটকারিমূলক—এই অাধুনিকতা কই দেবী  উপন্যাসে?

সবচেয়ে বড় সমস্যা হইল পুরা সিনেমার একটা সিঙ্গেল অংশও দেবীর যে সময়, বাস্তবতা তা ধরতে পারে নাই বা বলা উচিত ইচ্ছাকৃতভাবে তা বাদ দেওয়া হইছে। উপন্যাসে মিসির অালি থাকেন খুব সাধারণ একটা বাসাতে, ফার্নিচার বলতে না হইলেই না এমন জিনিসপত্র কিছু আছে তার, বাসাটা খোলামেলা বা প্রচুর আলো বাতাস এমন কোনো ব্যাপার নাই। যেইটা অাসলে তার চরিত্রের রিফ্লেকশন। তিনি বাহুল্য নিয়া চলেন না, সংসারী লোক না এবং প্রয়োজনীয় জিনিসে ফোকাসড থাকতে পছন্দ করেন। অার দেবী সিনেমায় মিসির আলি থাকেন হাতির ঝিল লাগোয়া একটা সৌখিন খোলামেলা চিলেকোঠা ধরনের জায়গায়, চারপাশ খোলা, ঝড়ের মত বাতাস আসতে থাকে, প্রচুর আলো। সেইখানে অাবার বিবিধ গাছ লাগাইছেন তিনি। মিসির অালীকে কিছু জায়গায় ইতস্ততও দেখাইতে চাইছেন ডিরেক্টর, সে নিজের পরিচয় দিতে গিয়া এক জায়গায় সংকোচ করতেছিলেন। জিনিসটা হাস্যকর। চরিত্রই নাই কইরা দেওয়া হইছে সিনেমার খাতিরে।

এই একই জিনিস তারা রানুর ক্ষেত্রেও করছেন। উপন্যাসে রানুর বয়স ১৬/১৭। মানে, সে একজন কিশোরী। কিন্তু সিনেমায় বলা হইল রানুর বয়স ২৫। কিশোরী রানুর যে চাঞ্চল্য, সরলতা—তা ২৫ বছরের রানুকে দিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হইছে। ঘটনা ছাড়া গল্প অাগায় না ঠিক, কিন্তু ঘটনাগুলি তো আবর্তিত হয় চরিত্রকে কেন্দ্র কইরা। এখন সেই চরিত্রগুলি আপনি বদলাইয়া দিলেন। তাতে কী হয়? গল্পের চরিত্রকে বদলাইয়া দেওয়া মানে আসলে চরিত্রটাকে বিলুপ্তই কইরা দেওয়া। ফলে, নতুন চরিত্র দিয়া যে পুরান গল্প চালাইতেছেন তা অাসলে চরিত্রহীন গল্প অাকারেই আগাইতেছে।

এর বাইরে, নীলুকে স্পেস না দিয়া পুরা ব্যাপারটা রানুকেন্দ্রিক কইরা ফেলা হইছে। এমনকি উপন্যাসের মূল চরিত্র মিসির অালি দেবী সিনেমায় অাইসা আর মূল চরিত্র থাকে নাই, সেই জায়গা নিছেন রানু চরিত্রে অভিনয় করা জয়া অাহসান। তা কেন? তিনি একই সঙ্গে সিনেমার প্রযোজক বইলা এমন হয় নাই তো?

সংলাপের ক্ষেত্রেও তাদের বহুত পাকনামি ছিল। যেইটার কারণে, সিগনিফিকেন্ট পয়েন্টগুলিতে জিনিসপাতি চেইঞ্জ হওয়ায় চরিত্রগুলা চিপ হয়ে গেছে। এর ফলে যেইটা হইছে যে, সব মিলাইয়া সিনেমাটা গল্পহীনভাবে খালি রানুর অলৌকিকতা এবং ছায়ানির্ভর টানা-হ্যাঁচড়া ও গোঙানির মধ্য দিয়া কোনোভাবে শেষ হইছে।

গান প্রসঙ্গে বলতে গেলে অনুপম রায়ের একটা গান আছে এই সিনেমায়। সেইটা অযথা। অনুপম রায়কে দিয়া গাওয়ানোটা বেশ একটা রোমান্টিসিজম হইছে সিনেমায়। এই সিনেমার সঙ্গে এমন সৌখিনতা যায় না। অ্যামেচারের বিষয় তো না এই সিনেমা। এমন হইলে এইটা একটা বাজারি সিনেমাই হইতে পারত, দেবী উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমা না হইয়া। এছাড়া পুরা টাইমটা অলৌকিকতা ধইরা রাখতে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ব্যবহার করছেন তারা, তা গল্পের ফ্লো নষ্ট করছে!

দেবী
হুমায়ূন আহমেদ

এছাড়া নির্দেশনায় বেশ দুর্বলতা দেখতে পাই। নির্দেশনার একটা ক্যালকুলেটিভ সাইকোলজি অাছে, যেখান থেকে নির্দেশক কী করবেন, কোনটার পর কোনটা করবেন, চরিত্রদের দিয়া কী করাবেন তা বোঝেন। যেমন ধরেন খুব ছোট একটা বিষয়, সিনেমাতে যতবার চা খাইতে দেখানো হইছে, প্রত্যেকটা জায়গার চায়ের কালার এক, কেন? এই জিনিস আমারে ধরাইয়া দিছেন আমার লগে যাওয়া বন্ধু। দেখলাম, সে ঠিকই বলছে। তা তো হওয়ার কথা না। প্রত্যেক বাড়ির চায়ের নিজস্ব রঙ অাছে। তা সেটের চায়ের রঙ কীরূপ তা দিয়া নির্ধারিত হবে না। এইটা নির্দেশকের কম বোঝার সমস্যা।

আরো পড়ুন: সময় নিয়ে

সেকেন্ড যেই সমস্যাটা নির্দেশককে ভোগাইছেন তা হইল, সিংক্রোনাইজেশন। এক দৃশ্যের সঙ্গে পরবর্তী দৃশ্যের যে সম্পৃক্ততা তা খুব কমই তৈরি করতে পারছেন তিনি। বেশিরভাগই খাপ ছাড়া খাপ ছাড়া। সিনেমা নির্দেশনার এই ক্যালকুলেশনগুলিতে গিয়া মূল ধরাটা খাইছে। ফলে, চরিত্রগুলি ডেভেলপ করে নাই, গল্প দাঁড়ায় নাই। সব মিলাইয়া দেবী সিনেমাকে অত ভাল বলা যায় না। সিনেমাটা ভাল লাগে নাই আমার!

৩১ অক্টোবর, ২০১৮

বল টেম্পারিং, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া, ১৪৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন ও ৪২ পরামর্শ

বল টেম্পারিং
  • তদন্তে দেখা গেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার মানসিকতা হল ‘যে কোনো মূল্যে জিততে হবে’
  • তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট ভারসাম্য হারিয়েছে
  • ৪২ পরামর্শের মধ্যে ৩৪টির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া

‘দুর্বিনীত’ ও ‘নিয়ন্ত্রক’ ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া

এ বছর বল টেম্পারিং স্ক্যান্ডালের জন্যও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে আংশিকভাবে দায়ী করা হচ্ছে। স্ক্যান্ডালের পর অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ ও ডেভিড ওয়ার্নারকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

এ বছরের মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় টেস্ট ম্যাচের সময় অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ক্যামেরন ব্যানক্রফট বল টেম্পারিং করেন। এবং সেটা টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। সাম্প্রতিককালে সেই ঘটনা পুনরায় তদন্ত করা হয়। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতির উপর একটা নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন এটা। এই প্রতিবেদনে সেই টেম্পারিং এর সিদ্ধান্তকে বলা হয়েছে ‘শক্তিশালী সিস্টেমেটিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ইনপুট’।

যেই তদন্তকারীরা অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তাদের ইন্টারভিউ নিয়েছেন তারা বলেছেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের গভার্নিং বডি ক্রিকেটারদের মধ্যে অন্য দলের খেলোয়াড়দের ‘বুলি’ করা বা উত্ত্যক্ত করার স্বভাব ঢুকিয়ে দিয়েছে এবং ‘যে কোনো মূল্যে জিততে হবে’ এমন মানসিকতা তৈরি করেছে। এই কারণেই অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের আচরণ এমন।

প্রতিবেদনে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে এমনভাবে সমালোচনা করা হয়েছে যে এখানে প্রচ্ছন্নভাবে স্টিভ স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার ও ক্যামেরন ব্যানক্রফটের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া নিজেদের ছাড়া আর কাউকে সম্মান করে না

বল টেম্পারিং এর ওই ঘটনার পর স্মিথ ও ওয়ার্নারকে ১২ মাস এবং ব্যানক্রফটকে ৯ মাস নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি ওয়ার্নারকে অতিরিক্ত শাস্তি দেওয়া হয়েছে যে সে কোনোদিন জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন হতে পারবে না।

১৪৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে বারবার ‘দুর্বিনীত’ ও ‘নিয়ন্ত্রক’ বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হচ্ছে, সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হল এই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া নিজেদের ছাড়া আর কাউকে সম্মান করে না। খেলোয়াড়দের মনে হবে যেন, তারা পণ্য। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট তার ভারসাম্য হারিয়েছে… এবং খুব বাজেভাবে হোঁচট খেয়েছে। ক্রিকেট খেলার যে সুনাম তা এই পুরুষদের খেলার ক্ষেত্রে কলঙ্কিত হয়েছে। নারীদের বেলায় তা এখনো অক্ষুণ্ণ আছে। দক্ষিণ আফ্রিকার নিউল্যান্ড গ্রাউন্ডে ঘটে যাওয়া বল টেম্পারিং এর ঘটনাকে  নৈতিক ঙ্খলন হিসাবে দেখা যায়… তবে সেভাবে দেখলে ভুল হবে। আমরা প্রমাণ পেয়েছি, এই এলিট ক্রিকেট যে কাঠামোর মধ্যে বেড়ে উঠেছে সেখানে জেতাটাই মুখ্য বিষয়, এর বিনিময়ে কী মূল্য দিতে হবে সেটা বিবেচনা করা হয় না।

অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের অন্য দলের খেলোয়াড়দের প্রতি বাজে আচরণের বিষয়টিরও ব্যাপক সমালোচনা করা হয়েছে এখানে। বলা হয়েছে, জেতার জন্য যে তাড়না দেওয়া হয় তার অর্থই হল খেলোয়াড়দেরকে খেলার পাশাপাশি আচরণগতভাবেও আক্রমণ করার তাগাদা দেওয়া।

ডেভিড পিটারের দায় স্বীকার

ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার চেয়ারম্যান ডেভিড পিটার এই প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় যা হয়েছে তার তিনি দায় স্বীকার করছেন।

পিটারের কথায়, আমরা জানতে চেয়েছি সমস্যা কী ছিল এবং আরো ভালো কী করতে পারতাম। ইচ্ছা করেই এই তদন্ত অনুমোদন করেছি আমরা কারণ আমরা আয়নার দিকে তাকাতে চেয়েছি।

তবে পিটার তার পদত্যাগ করার আহ্বান নাকচ করে দিয়ে বলেছেন তিনি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আগ্রহী হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন।

বদলি অধিনায়ক টিম পেইনের বক্তব্য

অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলে স্মিথের বদলি অধিনায়ক টিম পেইন বলছেন, খেলোয়াড়দের মাঠের ব্যবহার নিয়ে যেসব বিষয় তদন্তে উঠে এসেছে সেগুলি তার কাছে পরিষ্কার। এই জিনিসগুলি এখন এই প্রতিষ্ঠানটিকে খেলোয়াড়দের সাথে একটা চুক্তিতে নিয়ে যাবে। আর এই চুক্তিতে বলা থাকবে অস্ট্রেলিয়ার খেলোয়াড়রা নিজেদের ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে কীভাবে মাঠে খেলবে।

প্রতিবেদনে যে বলা হয়েছে খেলোয়াড়েরা ‘একটা বুদ্বুদের ভিতর বাস করেছে’, সেটা পেইনকে মোটেই অবাক করে নি।

পেইনের বক্তব্য অনুসারে, সত্যিকার অর্থে আমরা নিজেদের গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাপারটাতে একটু আবদ্ধ থাকি। আমরা সৌভাগ্যবান যে আমরা অস্ট্রেলিয়ার জন্য খেলছি। এটা আমাদের ক্রিকেট দল না, এটা অস্ট্রেলিয়ার দল এবং আমার মনে হয় কিছু সময়ের জন্য ব্যাপারটা আমরা ভুলে গেছিলাম।

তবে শেষ পর্যন্ত তার দলের শাস্তি পাওয়া খেলোয়াড়দের পক্ষে সহানুভূতি আদায় করা এই প্রতিবেদনের উচিৎ হবে কিনা সে ব্যাপারে পেন কিছু বলেন নি।

তার কথায়, আমার মনে হয় না কাউকে দোষ দেওয়ার কথা এখানে বলা হচ্ছে। প্রত্যেকেই স্বীকার করেছে গত এক বছরে ভুল হয়েছে। এখানে বসে কাউকে দোষ দেওয়াটা কোনো কাজে আসবে না।

ভাইস ক্যাপ্টেন জশ হ্যাজেলউড অধিনায়ক পেইনের মত একই সুরেই কথা বলেছেন। তার কথায়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদেরকে আবার খেলতে দেখলে আমাদের ভাল লাগবে, কিন্তু এটা আমাদের সিদ্ধান্তের বিষয় না।

অন্যদিকে পিটার জানিয়েছেন ওই তিনজনের উপর এই নিষেধাজ্ঞা জারি থাকবে।

প্রতিবেদনের পরামর্শ বিষয়ে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া

প্রতিবেদনটিতে ৪২টি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এগুলির মধ্যে আছে এথিকস কমিশন তৈরি করা এবং সিনিয়র খেলোয়াড়দের আবশ্যিকভাবে নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দেওয়া।

আরো পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কোনো খেলোয়াড়কে অ্যালান বোর্ডার পদক দেওয়ার ক্ষেত্রে পারফরমেন্সের পাশাপাশি তার চরিত্র ও আচরণও যাতে বিবেচনা করা হয়, এবং দল গঠনের সময়ও নির্বাচকেরা যেন খেলোয়াড়ের দক্ষতার পাশাপাশি তার চরিত্র বিবেচনা করেই তাকে নির্বাচন করেন।

ভাইস ক্যাপ্টেনই যে আপাতভাবে ক্যাপ্টেনসির উত্তরাধিকার সেটা বিবেচনা করেই ভাইস ক্যাপ্টেনের ভূমিকা নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর মৌখিকভাবে আক্রমণ বা স্লেজিং বন্ধ করার জন্য হয়রানি-বিরোধী আইনটাকেও বদলাতে বলা হয়েছে।

এই ৪২ পরামর্শের মধ্যে ৩৪টির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। ৭টি নিয়ে তারা চিন্তা-ভাবনা করছে ও ১টা পরামর্শ পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছে। বাতিল করা পরামর্শটি ছিল, খেলোয়াড়েরা ইচ্ছা করলে আন্তর্জাতিক টি-২০ ম্যাচ না খেলে শেফিল্ড শিল্ড বা গ্রেড ক্রিকেট খেলতে পারবেন।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে সম্পাদনা করা হয়েছে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া অবশ্য জানিয়েছে মানহানির ঝুঁকি এড়ানোর জন্য বাইরের আইনজীবীদের উপদেশেই এটা করা হয়েছে, তবে প্রতিবেদনটির মূল বক্তব্য একই আছে।

বার্সার জয় — ছেলে থিয়াগোর প্রতি মেসির ইনস্টাগ্রাম বার্তা

ক্যাম্প ন্যু স্টেডিয়ামে বার্সা-ইন্টার ম্যাচ চলাকালীন মাঠের বাইরে বসে নিজের ছেলে থিয়াগো ও লুইস সুয়ারেজের ছেলে বেঞ্জামিনকে দেখভাল করছিলেন মেসি।

লিওনেল মেসি এখন ইনজুরিতে। কিন্তু যে কোনো অবস্থাতেই তিনি তার প্রধান দুই ভালবাসা — পরিবার ও বার্সেলোনা ফুটবল দলের পাশে থাকেন।

মেসির অনুপস্থিতিতে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলেন রাফিনহা এবং তিনি শুরুতেই ইন্টারকে ধসিয়ে দিয়েছেন। এই ম্যাচের পরে বার্সেলোনার জন্য চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গ্রুপ বি’র শীর্ষস্থান নিশ্চিত হয়েছে। রাফিনহা ও জর্দি আলবার গোলের মাধ্যমে ইন্টারকে ২-০ গোলে হারিয়েছে বার্সেলোনা।

বার্সেলোনা যখন খেলছিল তখন মেসি ভাঙা হাত নিয়ে সাইডলাইনে ছেলে থিয়াগোর সাথে বসে খেলা উপভোগ করছিলেন।

খেলার পরে মেসি ইন্সটাগ্রামে বার্সেলোনা খেলোয়াড়দের সেলিব্রেটের ছবি ও ছেলে থিয়াগো-র ছবির সাথে সুন্দর একটি মেসেজ পোস্ট করেছেন।

ছেলে থিয়াগো-কে উদ্দেশ্য করে মেসি লিখেছেন, তোমার সাথে বেঁচে থাকা এবং এটা উপভোগ করা কী সুন্দর! এই দারুণ জয়ের জন্য গ্রুপকে অভিনন্দন।

 

View this post on Instagram

 

Que lindo vivirlo y disfrutarlo con vos !!! Felicitaciones al grupo por esta gran victoria 👏👏👏

A post shared by Leo Messi (@leomessi) on

থিয়াগো এবং মেসি শুরু থেকেই সাইডলাইনে বসে চাপা উত্তেজনার সাথে খেলা দেখছিলেন। খেলার প্রতি থিয়াগোর নিবিড় মনোযোগ এবং থিয়াগোকে মেসির আদর করার দৃশ্য বার বার টিভি দর্শকদের নজরে পড়েছে। সাইডলাইনে বসে মেসি থিয়াগোর সাথে লুইস সুয়ারেজের ছেলে বেঞ্জামিনেরও দেখভাল করছিলেন।

রাফিনহা ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির পরে এই প্রথম বার্সেলোনার হয়ে গোল করলেন। গত সিজনের দ্বিতীয়ার্ধ্বে তিনি ধার হিসেবে ইন্টার মিলানের হয়ে খেলেছেন।

২০১০ সালে বার্সা-ইন্টার এর সর্বশেষ ম্যাচে ইন্টার জিতছিল। তবে এই ম্যাচে শুরু থেকেই তারা হিমশিম খেয়েছে। অবশ্য ম্যাচের শুরুর পরে অল্প কিছুক্ষণ ইন্টার ভাল খেলেছিল, কিন্তু বার্সা খুব তাড়াতাড়িই ম্যাচটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

প্রথমে ইন্টার মিলানের ইভান পেরিসিচের পাঠানো বল ইকার্দির কাছে পৌঁছলে ইকার্দি বিপদজনক একটি শট নিয়েছিলেন, কিন্তু বার্সার গোলকিপার স্টেগেন সেটা প্রতিহত করেন। এরপরে স্বাগতিক বার্সেলোনার হয়ে রাফিনহা দুইবার গোলের চেষ্টা করেন কিন্তু ইন্টার মিলানের ডিফেন্ডার সামির হ্যান্দানোভিচ ও লংলেট খুব সহজেই সেগুলি ফিরিয়ে দিয়েছেন।

ম্যাচের ৩২ মিনিটের মাথায় সুয়ারেজের করা অসাধারণ ক্রস থেকে পাওয়া বল কোনোমতে পায়ে ঠেকিয়ে গোলপোস্টে পাঠিয়ে দেন রাফিনহা।

মেসি ও থিয়াগো
ছেলে থিয়াগোর সঙ্গে লিওনেল মেসি; ক্যাম্প ন্যু স্টেডিয়ামে বার্সেলোনা-ইন্টার মিলানের খেলা উপভোগ করছেন।

রাফিনহা যদিও গোলটি সেলিব্রেট করেন নি, কিন্তু এই গোলই বার্সার পরের খেলাকে প্রভাবিত করে। হাফ টাইমের ব্রেকের কিছুক্ষণ আগে বার্সার কৌটিনহো দারুণ একটি গোলের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ইন্টারের স্ক্রিনিয়ারের ডিফেন্সের কারণে বল গোলপোস্টের কোণায় লেগে ফিরে আসে।

দ্বিতীয়ার্ধ্বের খেলা শুরুর পাঁচ মিনিট পরেই ইন্টার প্রায় সমতা ফিরিয়ে এনেছিল, কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়। পলিটানোর একটি ক্রস দুর্দান্ত ভাবে ফিরিয়ে দিয়েছেন বার্সার গোলকিপার স্টেগেন। এরপরে সুয়ারেজ গোল করার অসাধারণ একটি উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু হ্যান্দানোভিচ তা ঠেকিয়ে দেন।

ম্যাচের ১৯ মিনিট বাকি থাকতে, অর্থাৎ ৬৯ মিনিটে বার্সার আরেকটি অসাধারণ চেষ্টা থামিয়ে দিয়েছেন লংলেট। প্রথমে সুয়ারেজের হেডার ঠেকিয়ে দিলে ফিরে আসা বলটিকে ঠিকভাবে কন্ট্রোল করতে পারেন নি রাকিটিচ। রাকিটিচের কাছ থেকে বলটি সরে গেলে কৌটিনহো সেই লুজ বলে শট নিয়েছিলেন, কিন্তু বল আবারও গোলবারে লাগে।

ম্যাচের ৮৩ মিনিটে রাকিটিচের কাছে থেকে আসা বলটিকে জর্দি আলবা দৌড়ে এসে ধরে গোলপোস্টে পাঠিয়ে দেন।

বার্সেলোনা ও ইন্টার মিলান, ৮ বছর পর মুখোমুখি — ম্যাচ প্রিভিউ ও সম্ভাব্য লাইন আপ

বার্সেলোনা ও ইন্টার মিলান
বার্সেলোনার স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ

বার্সেলোনা ও ইন্টার মিলান মুখোমুখি হতে যাচ্ছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের তৃতীয় ম্যাচে, বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর রাত একটায়।

ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় বার্সেলোনা ও ইন্টার মিলানের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। বার্সেলোনা এখন পর্যন্ত মোট ১০ বার ইন্টার মিলানের মুখোমুখি হয়েছে। এই ১০ ম্যাচের ৫টিতে জিতেছে বার্সেলোনা, ৩টি ম্যাচ ড্র হয়েছে এবং বাকি ২টিতে জিতেছে ইন্টার মিলান।

এবার দীর্ঘ ৮ বছর পর মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই দুই দল। এর আগে বার্সেলোনা ও ইন্টার মিলান সর্বশেষ মুখোমুখি হয়েছিল ২০১০ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমি ফাইনালে। তখন ইন্টারের কোচ ছিলেন হোসে মরিনহো। সেই ম্যাচে বার্সেলোনাকে হারিয়ে ইন্টার মিলান ফাইনালে যায় এবং ফাইনালে জার্মানির ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইন্টার মিলান।

লা লিগার গত ম্যাচে সেভিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে আবারও পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে ফিরে এসেছে বার্সেলোনা। কিন্তু বার্সেলোনার দুর্ভাগ্য হল আগামি ৩ সপ্তাহ তারা তাদের সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসিকে পাবে না ইনজুরির কারণে। স্বাভাবিকভাবেই ইন্টার মিলানের বিপক্ষেও মাঠে নামতে পারছেন না মেসি। সুতরাং মেসিকে ছাড়া বার্সেলোনার জন্য একটা কঠিন ম্যাচ হতে যাচ্ছে এটা।

আর অন্যদিকে ইন্টার মিলানের সময়ও খুব ভাল যাচ্ছে। তারা ইতালির সিরি এ লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ

বার্সেলোনা ও ইন্টার মিলান
ইন্টার মিলানের স্ট্রাইকার মাউরো ইকার্দি

মিলিয়ে টানা ৭টি ম্যাচ জিতে খুবই ভাল পজিশনে আছে। তার উপর, সিরি এ লিগের গত ম্যাচে তারা তাদের চির প্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলানকে হারিয়েছে।

তবে বার্সার বিপক্ষে ম্যাচে ইন্টারের দুজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে সম্ভবত তারা পাচ্ছে না। ন্যাইনগোলান ও পেরিসিচ। কিন্তু ইন্টারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্লেয়ার, আর্জেন্টাইন মাউরো ইকার্দিকে তারা পাচ্ছে। এখনকার ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা কিন্তু নিজের প্রতিভার তুলনায় কিছুটা আন্ডাররেটেড ইকার্দি দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন।

বার্সেলোনার সাথে যেহেতু মেসি নেই, তাই বার্সেলোনার অন্যান্য প্লেয়ারদের গতানুগতিকের চেয়ে অনেক বেশি দিতে হবে এই ম্যাচে। তাদেরকে তাদের সেরা পারফরম্যান্স দেখাতে হবে।

মেসিকে ছাড়া বার্সেলোনার জন্য এটা টাফ ম্যাচ হলেও বার্সার যথেষ্ট সেরা খেলোয়াড় আছে যারা ভালভাবেই বার্সাকে এই ম্যাচ পার করে দিতে পারে।

এখন দেখা যাক এই ম্যাচ শেষে কে বিজয়ীর হাসি হাসে।

সম্ভাব্য লাইনআপ
বার্সেলোনা (৪-৩-৩) — টার স্টেগেন। রবার্তো, পিকে, লেংলেট, আলবা। রাকিটিচ, বুসকেটস, আর্থার। ডেম্বেলে, সুয়ারেজ, কৌটিনহো
ইন্টার (৪-২-৩-১) — হ্যান্দানোভিচ। ভারসালিজকো, দে ভ্রিজ, স্ক্রিনিয়ার, আসামোয়াহ। ভেচিনো, ব্রোজোভিচ। ক্যান্দ্রেভা, ভ্যালেরো, কেইটা। ইকার্দি।

কভারের ছবি. ২০১০ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে বার্সেলোনার বিপরীতে ইন্টার মিলানের বিজয় উদযাপন হোসে মোরিনহোর।

ব্রেইননেট: ৩টি ব্রেইনের মধ্যে দূরনিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন বিজ্ঞানীরা

  • টেট্রিস গেইমে বিজ্ঞানীরা তিন ব্যক্তির ব্রেইন টু ব্রেইন যোগাযোগ ঘটিয়েছেন।
  • ব্রেইন সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এ প্রথম পদক্ষেপ ব্রেইননেট এর।
  • ভাবুন, আপনার একান্ত ব্যক্তিগত ভাবনা জেনে ফেলছে অন্য কেউ।
ব্রেইননেট
ব্রেইননেটের মাধ্যমে যুক্ত ৩টি ব্রেইনের ক্ষমতা কি ১টি ব্রেইনের চেয়ে বেশি?

অন্যের সাহায্য লাগে, এমন একটা টেট্রিস গেইম (টাইল ম্যাচ করার পাযেল ভিডিও গেম) খেলেছেন অংশগ্রহণকারীরা। আর এক্ষেত্রে তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের মাধ্যম ছিল শুধু চিন্তা। তারা কোনো ভাষা, অভিব্যক্তি বা শারীরিক ভঙ্গি ব্যবহার করেন নি যোগাযোগের জন্যে।

কয়েকজন বিজ্ঞানী আলাদা আলাদা তিনজন মানুষের ব্রেইনে সংযোগ তৈরি করে তাদের চিন্তা পরস্পরের সাথে শেয়ার করার একটি পদ্ধতি বের করেছেন। সফলভাবে এটার প্রয়োগও ঘটিয়েছেন তারা। ‘টেলিপেথিক্যালি’ যোগাযোগ করে এই তিনজন একটা টেট্রিস গেইম সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।

ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটন ও কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির একটা যৌথ দল তাদের এ সফলতার ব্যাপারে বিবৃতি প্রদান করেছেন। তারা বলেছেন, “আমরা ব্রেইননেট (BrainNet) এর কথা বলছি, আমাদের জানা মতে সম্মিলিতভাবে সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে একাধিক ব্যক্তির মধ্যে ঝুঁকিহীনভাবে ঘটানো এটাই সর্বপ্রথম সরাসরি ব্রেইন-টু-ব্রেইন এর সংযোগ। এই ব্রেইন-টু-ব্রেইন ইন্টারফেসের সাথে যুক্ত আছে ইলেক্ট্রোয়েনসেফালোগ্রাফি (EEG) ও ট্রান্সক্র্যানিয়াল ম্যাগনেটিক সিমুলেশন (TMS) । এই EEG ব্রেইন সিগনাল রেকর্ড করে এবং TMS ব্রেইন সিগনাল পাঠানোর কাজ করে।”

ব্রেইননেট এর মাধ্যমে সংযুক্ত তিনজন অংশগ্রহণকারী কোনো ভাষা ব্যবহার না করে পরস্পর পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করেই একটা টেট্রিস গেম সমাধান করেছেন।

এই পরীক্ষায় দুইজন অংশগ্রহণকারীকে ‘সেন্ডার্স’ বা প্রেরক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই দুইজন প্রেরকের দায়িত্ব ছিল কীভাবে টেট্রিস ব্লক সেট করা হবে সে ব্যাপারে তৃতীয় জনকে নির্দেশনা দেওয়া।

ব্রেইননেট
ব্রেইননেটের ‘টেলিপ্যাথিকালি’ ডেটা পাঠানোর গ্রাফিক চিত্র

প্রেরকেরা EEG ইলেক্ট্রোড কন্ডাকটরের সাথে সংযুক্ত ছিল। তাদের ব্রেইন যে তরঙ্গের ফ্রিকোয়েন্সি বা সিগনাল তৈরি করত সেটা তৃতীয় জনের কাছে পাঠানোর কাজ করত EEG। যেমন, কোনো প্রেরক যদি ১৫ হার্জ এর এলইডি লাইট দেখে, তাহলে ব্রেইন একই ফ্রিকোয়েন্সিতে একটা সিগনাল তৈরি করবে এবং EEG সাথে সাথে সেটা পাঠিয়ে দিবে। প্রেরকেরা টেট্রিস ব্লক কোন দিকে সেট করা হবে সেটার জন্য নির্ধারিত এলইডি লাইট দেখত বা পর্যবেক্ষণ করত। দুটি এলইডি লাইটের মধ্যে একটা লাইটের অর্থ ছিল টেট্রিস ব্লক যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে দেওয়া, এবং আরেকটা ব্লকের অর্থ ছিল টেট্রিস ব্লকটিকে রোটেট করাতে হবে বা ঘুরাতে হবে।

যদি প্রেরকেরা মনে করত রিসিভার বা গ্রহীতার কিছু করার দরকার নেই তাহলে তারা এলইডি লাইটগুলির দিকে তাকাত না, এবং EEG কোনো সিগনালও পাঠাত না। এইভাবে দিকচিহ্ন ও নির্দেশনা হিসেবে লাইট ফ্ল্যাশ ব্যবহার করে তারা ব্রেইন-টু-ব্রেইন যোগাযোগ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।

কী করতে হবে বা কী করতে হবে না সেই ব্যাপারে প্রেরকদের দেওয়া নির্দেশনার সিগনাল গ্রহীতা গ্রহণ করত তার সাথে সংযুক্ত একটা TMS ক্যাপের মাধ্যমে। সায়েন্স অ্যালার্ট পত্রিকা বলছে, রিসিভার বা গ্রহীতা পুরো গেমটা দেখতে পায় নি কিন্তু সে জানত কখন কোন ব্লকটি ঘুরাতে হবে বা হবে না, এটা বুঝতে পারত তার ব্রেইনে আসা সিগনাল আসলে কোন লাইট দেখাচ্ছিল সেটার মাধ্যমে।

তিনজন ব্যক্তির আলাদা আলাদা পাচটি গ্রুপ নিয়ে এই পরীক্ষাটি করা হয়েছে। সবশেষে, বিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে সব মিলিয়ে এই পরীক্ষার গড় ৮১.২৫ শতাংশ নিখুঁত ছিল।

২০১৫ সালের গবেষণায় একই রিসার্চ টিম ১.৫ কিলোমিটার দূর থেকে দুটি ব্রেইনের মধ্যে যোগাযোগ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল। সেই পরীক্ষায় দুইজন অংশগ্রহণকারী একই ধরনের EEG ক্যাপের সাথে সংযুক্ত ছিল এবং তারা ২০ টা প্রশ্নের একটা গেম খেলেছিল। সেই পরীক্ষায়ও ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ উত্তর দেওয়ার জন্য আলাদা আলাদা দুটি এলইডি লাইট ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই পরীক্ষাও সব মিলিয়ে সফল হয়েছে।

ব্রেইননেট
২০১৫ সালের গবেষণায় একই রিসার্চ টিম ১.৫ কিলোমিটার দূর থেকে দুটি ব্রেইনের মধ্যে যোগাযোগ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল।

গবেষকরা আশা করছেন যে এই প্রযুক্তি হয়ত এমন নতুন একটা পদ্ধতির কাছে নিয়ে যাবে যেখানে চিন্তার মাধ্যমে তথ্য পাঠানো যাবে, এবং আবশ্যিকভাবেই একটা নতুন ধরনের সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরি করবে।

তারা বলছেন, আমাদের পরীক্ষার ফলাফল ভবিষ্যতে ব্রেইন-টু-ব্রেইন যোগাযোগের সম্ভাবনা তৈরি করেছে যেটার মাধ্যমে হয়ত ভবিষ্যতে মানুষ ব্রেইনের মাধ্যমে অন্যদের সাথে সাথে যোগাযোগ করে একটা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারবে। এবং সেই সোশ্যাল নেটওয়ার্কে সহযোগিতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করতে পারবে।

মাইকেল পোলানের মতো রান্না করবেন যেভাবে

সম্প্রতি অডানবন ম্যাগাজিনকে দেওয়া একটা সাক্ষাৎকারে মাইকেল পোলান বলেন, কীভাবে একটা কাঁটা চামচ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। মাইকেল পোলান একজন লেখক, সাংবাদিক, আ্যাকটিভিস্ট এবং ইউএস বার্কেলি গ্র্যাজুয়েট স্কুল অভ জার্নালিজমে জার্নালিজমের প্রফেসর।

তিনি বলেন, পরিবেশে প্রতিনিয়ত যে ক্ষতিকর গ্রীন হাউজ গ্যাস তৈরি হচ্ছে তার জন্য অনেকাংশে দায়ী অামাদের ফুড সিস্টেম। এই ব্যাপারে অামরা একটু সচেতন হলেই পানি, বাতাস এবং মাটি দূষণ কমে অাসবে। তার পরিবর্তে প্রকৃতির এই উপাদানগুলোই পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখবে, এখান থেকেই অামরা স্বাস্থ্যকর খাবার উৎপাদন করতে পারব। বাজার করা, সবজি চাষ করা এবং বাজারে কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করা জলবায়ুর পরিবর্তনের দ্রুত প্রক্রিয়াকে অাটকানোর সব থেকে ভালো উপায়। তিনি অারো কিছু সহজ পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেন যেগুলো অামরা সচরাচর এড়িয়ে যাই। কিন্তু, এগুলো থেকেই অামরা অনেক উপকার পেতে পারি-

 

১. হিমায়িত খাবার কিনুন

প্রক্রিয়াজাত খাবার সাধারণত অতটা সস্তা না। তবে কাঁচা উপাদান ব্যবহার করে রান্না করলে খুব অল্প খরচেই খাবার পা‌ওয়া সম্ভব। তিনি  বলেন, হিমায়িত ভেজিটেবল খারাপ না। তা দামেও সস্তা। অাপনি যদি চাষীর কাছ থেকে টাটকা পালংশাক নাও কিনতে পারেন, এক বাক্স হিমায়িত পালংশাক কিনে নিন। জিনিসটা পণ্য হিসেবে যেমন ভালো, তেমনি প্যাকেট করার আগে ধুয়ে নেওয়া হয় বলে ব্যবহারও সুবিধাজনক আর রান্না হতেও বেশি সময় লাগে না।

অামার মনে হয় মানুষের প্রবণতা হচ্ছে, সবসময় ফাস্ট ফুড অার চাষীদের কাছ থেকে কেনা যেকোনো একটা বাছাই করতে চায়। কিন্তু বিষয়টা হওয়া উচিত অাসল অার প্রক্রিয়াজাত খাবারের মধ্যে কোনটা খাবে সেইটা। অাসল খাবার প্রক্রিয়াজাত খাবারের তুলনায় সস্তা। খাবার শুধু চাষীদের কাছ থেকে কিনতে পারলেই সেটা ভালো, এমন না। খাবার বাছাইয়ে ওই ছোট্ট পরিবর্তন এনেও আপনি ভালো খাবার পেতে পারেন।

 

২. কোনো কুকিং শোতে আছেন এমন ভেবে রান্না করবেন না

টাটকা খাবার বানানো আর যতটা সম্ভব প্রসেসড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া যায়-তা’ই খাওয়ার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। পোলান বলেন, কিন্তু অনেকেই এই সামান্য কাজটা করতে হিমশিম খান। হয় তারা রান্না করতে পারে না, নইলে টিভিতে এক্সপার্টদের রান্না করতে দেখে দেখে রান্না বিষয়ে ভয় ঢুকে গেছে তাদের মধ্যে। বা তাদের হাতে হয়ত সময় নেই, বা টিভির কুকিং শোগুলো দেখে তারা ধরেই নিয়েছে রান্না অনেক সময়সাপেক্ষ জিনিস। কিন্তু প্রত্যেক রাতের খাবার রান্নার অর্থ তো একটা পুরো বিয়ে বাড়ির খাবারের অায়োজন করা না। এর পিছনে অাধাঘন্টার বেশি সময় দেওয়ার প্রয়োজন নাই। ভালো খাবার রান্না করার চাইতে অনলাইনে বসে থাকা বা কুকিং শো উপভোগ করাটা স্মার্ট ডিসিশন না। অামাদের দেখতে হবে অামরা অাসলে কোথায় সময় ব্যয় করছি, কোন জিনিসটা অামাদের জন্য বেশি জরুরী।

 

৩. ফ্রিজে কি অাছে দেখুন

কুকিং শো দেখে এক হাজারটা উপকরণ নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা রান্না ঘরে ব্যয় না করে রান্নাঘরে যা আছে তা দিয়ে ঝটপট কিছু একটা বানিয়ে ফেলুন। পোলান বলেন, যেমন আমার ফ্রিজে সবসময় অামি ফ্রোজেন পালংশাক রাখি। সঙ্গে ক্যান করা ওয়াইল্ড স্যামন মাছ অার পাস্তা থাকে। ওই তিনটা উপকরণ দিয়ে আর সাথে হয়তো একটু অলিভ অয়েল, রসুন অার বাগানে যদি ওইসময় পুদিনা পাতা থাকে তা দিয়েই মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে অামি অামার পছন্দের রেসিপি বানিয়ে ফেলি।

পালংশাকগুলো ফ্রিজ থেকে বের করে ডিফ্রস্ট হতে রেখে দেই, পাস্তাটা রাস্তা করি, পালংশাকগুলো পাস্তায় দিয়ে তার সঙ্গে ভেজে নেই, স্যামন মাছের ক্যান খুলে তার উপর দিয়ে দেই। এরপরে হয়তো একটু পুতিনা পাতা দেই বা একটু বাড়তি অলিভ অয়েল ছিটিয়ে দেই, ব্যস অামার খাবার রেডি। এটা স্বাদেও অসাধারণ।

অাসলে রান্নার অভ্যাস থাকলে, ঘরে সবসময়ই কিছু না কিছু থাকবে অাপনার। একটু কৌশলী হলেই ব্যাপারটায় অভ্যাস হয়ে যায়, এর পিছনে অাপনাকে সারা জীবন ব্যয় করতে হবে না।

 

৪. কাজ ভাগ করে নিন

রান্না নিয়ে মূল সমস্যাগুলোর একটা হলো এটা সম্পূর্ণই মহিলাদের দায়িত্ব বলে ধরা হয়। এই কারণেই কাজটা করা এত কঠিন হয়ে দাড়ায়, তার উপর যিনি করছেন তিনি যদি কর্মজীবী হন। তাই, আমার মনে হয় পরিবারের পুরুষ অার বাচ্চাদেরকেও এতে অংশগ্রহণ করানো উচিত। ভাগাভাগি করে করলে কোনো কাজই অার অত কঠিন না।

রান্না নিয়ে মূল সমস্যাটা তৈরি হয়েছে যখন এটাকে অামরা একজন নির্দিষ্ট মানুষের কাজ হিসাবে অালাদা করে দিয়েছি। কিন্তু, অাপনি যদি একবার অাপনার বাচ্চাদের নিয়ে কাজটা করে দেখেন, তাহলে দেখবেন রান্নাটা বরং একটা আনন্দদায়ক কাজ।

২০২০ সালের নির্বাচনে মার্ক জুকারবার্গ কি ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় হুমকি?

ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক এলিয়ট জুকারবার্গ বর্তমানে আমেরিকায় দেশব্যাপী একটি সফরে ব্যস্ত আছেন।

তার ভাষ্যমতে, এই সফরের মুখ্য উদ্দেশ্য “অধিক মানুষের জীবনযাপন, কাজ এবং তাদের ভবিষ্যত ভাবনা সম্বন্ধে জানার ও শোনার চেষ্টা।”

অনেকেই মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসাবে তার আত্মপ্রকাশের উদ্দেশ্যে একটি পরীক্ষামূলক প্রচারণা।

২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি ফেসবুকে মার্ক জানান, “এ বছর আমার ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ হল—বছর শেষে প্রতিটা রাজ্যের মানুষের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ সম্পন্ন করা। ইতোমধ্যে অনেক রাজ্যেই বেশ কিছু সময় কাটানো হয়েছে। তো এই চ্যালেঞ্জ পূর্ণ করার জন্য আরো প্রায় ৩০টি রাজ্য ঘুরে দেখতে হবে।”

এর আগের বছর ডিসেম্বরে মার্ক ফেসবুকের একটি কমেন্টের জবাবে বলেন, একটা সময় পর্যন্ত নাস্তিক থাকলেও বর্তমানে তিনি মনে করেন ধর্ম অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তারও আগে তিনি বলেছিলেন, ফেসবুকের অবকাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যে, তিনি সরাসরি অনুপস্থিত থাকলেও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে তাকে পদত্যাগ করতে হবে না। এসব কিছু তার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবার দিকেই ইঙ্গিত করে বলে মনে করছে ভেঞ্চার বীট পত্রিকা।

কিন্তু বাজফীড নিউজের একটি প্রশ্নের উত্তরে এ রকম সম্ভাবনার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন তিনি।

যদি এমনটা হয়েও থাকে, তবে একটা ব্যাপার অন্তত বেশ ভাল মত বোঝা যাচ্ছে যে—ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে কোনো প্রকার সহায়তা তিনি পাবেন না। কারণ সম্প্রতি মন্টানার গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্কে সফর করার আগে—যে পার্কটিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক বলে মনে করেন অনেকে—ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দেশে সেই সফরে জুকারবার্গকে কোনো প্রকার সহায়তা করা থেকে বিরত থাকতে  বলা হয় পার্কের কর্মীদের। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর কোনো ছবি প্রকাশেও কর্মীদেরকে দেওয়া হয় নিষেধাজ্ঞা।

এর আগে জলবায়ু পরিবর্তনকে ভুয়া বলে দাবি করায় ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন জুকারবার্গ। মাত্র তৃতীয় দেশ হিসাবে প্যারিস চুক্তি থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করেন ট্রাম্প। একই সাথে কয়েকটি ডিপার্টমেন্টকে জলবায়ু পরবির্তন সম্পর্কিত কোনো প্রকার গবেষণা ও বিবৃতি প্রদান করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন তিনি।

প্যারিসের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক চুক্তি থেকে ট্রাম্পের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে জুকারবার্গ ‘পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্যে ক্ষতিকর’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

এ ব্যাপারে গত ২ জুন, ২০১৭ তারিখের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে মার্ক বলেন :

“প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করা পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর এবং তা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিবে।”

“আমাদের দিক থেকে, প্রত্যেকটা নতুন ডাটা সেন্টার যেন ১০০% নবায়নযোগ্য শক্তি দিয়ে চালিত হয়—সে ব্যাপারে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।”

“একটা বৈশ্বিক সঙ্ঘবদ্ধ কমিউনিটি হিসাবেই কেবল জলবায়ু পরিবর্তন রুখে দিতে পারব আমরা। বেশি দেরি হয়ে যাবার আগেই তাই আমাদেরকে কাজে নামতে হবে।”

শুধু জলবায়ু পরিবর্তনে মতপার্থক্য হওয়াতেই যে ট্রাম্প মন্টানার পার্কে জুকারবার্গের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তা নয়। সম্প্রতি এ রকম কথা উঠেছে যে, ট্রাম্পের মত জুকারবার্গও হয়ত কোনো মধ্যপন্থায় না গিয়ে প্রধান নির্বাহীর অবস্থান থেকে সরাসরি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

এপ্রিল মাসের শেষের দিকে এক সপ্তাহে ৪ রাজ্য ঘুরে দেখেন জুকারবার্গ। আর এই ৪টিতেই ট্রাম্প ছিলেন বিজয়ী: ওহাইয়ো, মিশিগান, ইন্ডিয়ানা ও উইসকনসিন।

এখানকার যেসব মানুষ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সাথে ওতপ্রোত জড়িত নয়, তাদের সাথেই বেশি সময় কাটিয়েছেন তিনি। অবশ্য একই সময় এই ট্রাম্পের ৪ রাজ্য ঘোরার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ কাকতালীয়ও হতে পারে; যেহেতু জুকারবার্গের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবার ব্যাপারে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায় নাই।

নিউজউইক এর তথ্য মতে, ট্রাম্পের চাইতে জুকারবার্গের গ্রহনযোগ্যতা বেশি হলেও আমেরিকার মোট জনসংখ্যার ৪৭ শতাংশ তার ব্যাপারে অনিশ্চিত। শতকরা ২৯ ভাগ তার পক্ষে এবং ২৪ ভাগ মানুষ তার বিপক্ষে।

 

ছবি ও ক্যাপশন

 

১.

২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে উইসকনসিনের ব্ল্যানশার্ডভিলে গ্যান্ট পরিবারের খামার ঘুরে দেখেন জুকারবার্গ।

২.

“সামরিক বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার স্ত্রীদের সাথে মধাহ্নভোজের সময় অনেক কিছু শিখলাম আমি”—জুকারবার্গ

৩.

মাদার ইমানুয়েল এএমই চার্চে।

৪.

“Watching the rodeo with Fort Worth Mayor Betsy Price.”

৫.

“My next stop in Texas was meeting with officers from the Dallas Police Department. These officers do such important work, and it meant a lot to me to be able to thank them in person.”

৬.

“Chef Judy, a military veteran herself, started a small business and cooked us lunch at Fort Bragg.”

৭.

“বাছুরটা আমাকে বেশ পছন্দ করে এখন।”—জুকারবার্গ

৮.

৯.

১০.

১১.

১২.

১৩.

১৪.

১৫.

১৬.

১৭.

১৮.

১৯.

 

২০.

“মিশিগান-ডিয়ারবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন মুসলিম শিক্ষার্থীর সাথে আলাপ করলাম। আমেরিকার সবচাইতে বড় ও পুরাতন মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে একটি হল ডিয়ারবর্ন। এর প্রায় ২০ শতাংশ অধিবাসী মুসলিম।”—জুকারবার্গ

২১.

“লুইজিয়ানাতে এসে পৌঁছালাম মাত্র। প্রথমেই ব্যাটন রুজে বার্বিকিউ খাব। আগামী দুইদিন আরো অনেক মানুষের সাথে দেখা করার আশা রাখি।”—জুকারবার্গ

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে জুকারবার্গ বছর শেষে সম্পূর্ণ আমেরিকা সফরের ব্যাপারে যে সঙ্কল্প ব্যক্ত করেছিলেন, তারই বিভিন্ন মুহূর্ত থেকে এই ছবিগুলি তোলা হয়েছে। প্রযুক্তি মহলে তার অবস্থান এবং  “বিশ্বকে সংযুক্ত করা ও সকলকে তাদের মত প্রকাশের সুযোগে করে দেওয়া”র ওপর ভিত্তি করে তার এই যাত্রা শুরু হয়।

কিন্তু কয়েক মাস পার হয়ে যাবার পর তার এই সফরকে কেবল একটি সামাজিক যাত্রার চাইতে বরং একটা পুরাদস্তুর ক্যাম্পেইন বলেই মনে হচ্ছে বেশি।

বই পড়া

ছোটবেলায় আমি বই পড়ায় খুব আগ্রহী ছিলাম। যখন ক্লাস টু’তে পড়ি, তখন আমার বড় ভাইয়ের ক্লাস সেভেনের কৃষিবিজ্ঞান বই পড়ে শেষ করে ফেলি। বড় হয়ে এটা নিয়ে মজা করেছি। আমাদের মুরুব্বীরা রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড চিন্তাভাবনা থেকে শাসাতেন—পরীক্ষার পড়া বাদ দিয়ে খালি বাইরের বই পড়ো, না!

কিন্তু, আমার শুরু হয়েছিল, বাইরের নয়, অগ্রিম বই পড়ে!

মহল্লার বড় ভাইরা মিলে লাইব্রেরি করেছিলেন। শুনে ছুটে গেলে, শুরুতে আরেকটু বড় হও ভাইয়া, তোমার পড়ার মতো বই তো নেই টাইপ আচরণ করতে গিয়ে উনারা ধরাশায়ী হয়ে যান। দেখা গেল, আমি উনাদের চেয়ে কম গোঁয়ার ও কম পড়ুয়া নই। কিছুদিনের মধ্যেই আমার পড়ার আগ্রহের চেয়েও আমাকে বই পড়তে দিতে উনাদের আগ্রহ যেন বেশি হয়ে দাঁড়ালো।

কিছু বড় ভাই ছিলেন লাইব্রেরিতে অনিয়মিত, কিন্তু আমার খুব সুনাম শুনে আগ্রহ তৈরি হতো বোধহয়, লাইব্রেরিতে বা রাস্তায় দেখা হলে জিজ্ঞাসা করতেন—কোন বই ফেরত দিলে, কীসের উপর এই বই, পড়ে কী বুঝলে?

আমি জবাব দিতাম। উনাদের অবাক হওয়া দেখে আমার উৎসাহ বেড়ে যেত, আরো আরো বলতে থাকতাম।

এই ব্যাপারটায় বড় ভাইদের কারো কারো অবিশ্বাস মিশ্রিত পরীক্ষা করে দেখার ক্ষুদ্রতা কিছুটা ছিল, সেই বয়সেও আমার কাছে সেটা ধরা পড়তো। তবে প্রক্রিয়াটি বেশ হেল্পফুল ছিল—কী পড়লাম, কতটুকু পড়া হলো, নিজেই টের পেতাম। কখনো কোনো ওয়াইজ বড় ভাইয়ের পরামর্শে, কখনো সন্দেহ জাগায় নিজেই ফেরত দিতে আসা বই আবারো পড়তে নিয়ে এসেছি।

বড় ভাইদের সেই পাঠাগারটি উনাদের কোন্দলে একসময় স্থবির হয়ে যায়। মূল উদ্যোক্তা একগাদা অভিযোগ কাঁধে নিয়ে আমেরিকার বোস্টনে পড়তে চলে যান। অবশ্য ততদিনে আমি হাইস্কুলে পড়তে বাড়ির বাইরে একা যাওয়া-আসা করার মতো বড় হয়ে উঠেছি।

যখন হাইস্কুলে ভর্তি হলাম, বাসা থেকে একা একা অন্য মহল্লায় আসা যাওয়ার যে সুযোগ আসলো, তা অচিরেই কাজে লাগাতে শুরু করলাম। স্কুল পার হয়ে কিছুদূর এগুলে এক বড় ভাই সুলভে বই ভাড়া দিতেন। মূলত সেবা প্রকাশনীর বই। আমি ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি, প্রতিদিন দুটো করে কুয়াশা ক্লাসে টেক্সট বইয়ের নিচে চাপা দিয়ে শেষ করেছি। সে সময় মুড়ির ঠোঙ্গাও পড়তাম।

কুয়াশা ১, কাজী আনোয়ার হোসেন
কুয়াশা ১, লেখক, কাজী আনোয়ার হোসেন (বিদ্যুৎ মিত্র ছদ্মনামে লেখা); প্রচ্ছদ, রমেন কুমার সাহা, প্রকাশক, ফরিদা ইয়াসমিন, সেগুনবাগান প্রকাশনী; প্রথম প্রকাশ, জুন, ১৯৬৪; মূল্য, এক টাকা (প্রথম সংস্করণ)

আমাদের স্কুলের লাইব্রেরি ছিল দেখার মতো! পাকিস্তানিদেরকে অনেকে গালি দেয়, কিন্তু কাজে-চেতনায় তাদের সমান হতে দেখলাম না তো! আইয়ুব খান যে স্কুল বানিয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেছে, বাঙ্গাল মুলুকে ঐ রকম স্কুল আর হয় নাই। আমার ধারণা আর পারবেও না। যাই হোক বিশাল লাইব্রেরি রুমে সারি সারি কাঠের আলমারিতে থরে থরে সাজানো বই। পুরো রুম একবার ঘুরে আসতে কোনো স্কুল বয়ের জন্যে অনেক সময় প্রয়োজন।

সবই ঠিক ছিল, শুধু বই পড়াটাই নিয়মে বাঁধা। লাইব্রেরিয়ান স্যার লাইব্রেরি রুমে বসে বই পড়তে দিবেন না। সপ্তাহে একদিন লাইব্রেরি ক্লাস, সেদিন আলমারি থেকে স্যার নিজের পছন্দে কিছু বই বের করে টেবিলে সাজিয়ে রাখবেন, সেগুলো থেকে বেছে নিয়ে স্যারের খাতায় এন্ট্রি করে বাসায় এনে পড়া যাবে।

আমি আলমারি থেকে বেছে বই নিতে চাইলে স্যার শুরুতে আপত্তি, পরে বিরক্ত ও শেষে ধমক পর্যন্ত দিয়েছিলেন।

স্যারের ধমকের জবাবে ভয়ে কাঁদো কাঁদো আমি বলেছিলাম বই পড়তে চাওয়ায় আপনি হেড স্যারের কাছে কমপ্লেইন করতে চান, তা করুন—আমি বেছে নিয়ে বই পড়তে চাই, এটাই তো আমার দোষ? অথচ এসব বই তো আমাদের পড়ার জন্যেই রাখা আছে।

স্যারের সাথে শুরুতে এই অপ্রিয় ঘটনা সত্ত্বেও কিছুদিনের মধ্যেই যেন স্যার আমাকে কিছুটা প্রশ্রয় দিতে শুরু করেন। নিয়ম ছিল লাইব্রেরি থেকে একবারে একটার বেশি বই নেয়া যাবে না, কিন্তু স্যার আমাকে বাড়তি সুযোগ দিয়েছেন, বই বেছে নেয়ার সুযোগও দিয়েছে। তবে মোটা বই যেগুলো বাসায় এনে পড়া কষ্ট, সেগুলো লাইব্রেরি রুমে বসে পড়তে চেয়েছিলাম, সে সুযোগ দেন নাই। পরে স্কাউটিংয়ের সুবাদেও স্যারের সাথে সম্পর্ক গাঢ় হয়েছিল, স্যার এখন আছেন কি না, কেমন আছেন, কে জানে। স্কুল লাইব্রেরি থেকে আমার নেয়া প্রথম বই, ‘ছোটদের নেপোলিয়ন বোনাপার্ট’, পড়ে নেপোলিয়নের খুব ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু বড় হয়ে আসল নেপোলিয়নকে জেনে সেই ভক্তি উবে গেছে।

আমাদের মহল্লার বড়ভাইদের লাইব্রেরিটি স্থবির হয়ে একসময় বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু প্রকৃতি শূন্যতা বরদাশত করে না, বা প্রকৃত আহবানে সাড়া না দিয়ে প্রকৃতি স্থবির থাকতে পারে না। বা, যা-ই বলুন, আমাদের মহল্লার এক বড় ভাই, স্কুলে আমাদের এক বা দুই ক্লাস উপরে পড়তেন, নিজে থেকে ডেকে নিয়ে তার সংগ্রহের বই পড়ার সুযোগ দিলেন।

ছা-পোষা সরকারি চাকুরিজীবীর সন্তান আমি তার বইয়ের সংগ্রহ দেখে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম। উনার কাছ থেকে আনা প্রথম বই ছিল ‘উভচর মানুষ’।

ছা-পোষা সরকারি চাকুরিজীবীর সন্তান আমি তার বইয়ের সংগ্রহ দেখে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম। উনার কাছ থেকে আনা প্রথম বই ছিল ‘উভচর মানুষ’। উনার কালেকশন ছিল ভাল, এবং, ততদিনে আমি বোধহয় আসলে পড়তে শিখছি, তাই এই সহৃদয় স্নেহাত্মক আচরণে খুব উপকার হয়েছে।

উনারা একসময় কোনো অভিজাত এলাকায় চলে যান, সেই থেকে যোগাযোগ আর থাকে নাই। সে বড় ভাই এখন নৌ বাহিনীর বড় কর্মকর্তা, কিন্তু দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে সিএমএইচেই দিন কাটে, এরকম শুনেছি।

এসময় আমদের বাসায় এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলির এক সদস্য থাকতেন। আশ্চর্য এক চিজ। ভীষণ পড়ুয়া, তবে সব আনন্দবাজারের মাল হতে হবে। যাক এই সুবাদে পাঁচ ছয় বছর টানা তাজা ‘দেশ’ পত্রিকা পড়া হয়েছে। আমার আগ্রহ দেখে উনি ‘আনন্দমেলা’ বা আর কী ছিল সেগুলো মাঝে এনেছেন, তেমন জমে নাই।

আমার সবচেয়ে বড় ভাই তার এইচএসসির পর অস্ট্রেলিয়া চলে যান পড়তে। তবে, স্কলারশিপ কোয়ান্টাসের হওয়ায় উনাদের আসা-যাওয়া ছিল নিয়মিত, এবং উনিও পড়ুয়া হওয়ায় এবং লাগেজের ওয়েইট নিয়ে মাথা ঘামাতে না হওয়ায় সিডনিতে বসে যত বই পড়তেন বাসায় আসার সময় সব নিয়ে আসতেন।

বারো রকমের যত বই! সেই সুবাদে কার্ল সেগানের ‘কসমস’ বের হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই আমার পড়ার সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু স্কুল পড়ুয়া আমার বুঝতে অসুবিধা হয়েছিল, এবং সলজ্জভাবে ইদানীং স্বীকার করি, অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্টরা ধাপ্পাবাজ—এই টাইপের ধারণা কীভাবে যেন জন্মে গিয়েছিল। সেই ধারণা কাটতে আমার হাবলের ইমেজ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

যাই হোক, কোয়ান্টাসের ফ্রী ফ্রেইটের সুবাদে আমার মওদুদীর ইসলামের দৃষ্টিতে জন্ম নিয়ন্ত্রণ, গাদ্দাফীর গ্রীন বুক, আফ্রো এশিয়ান কালচার স্টাডিজ নামক এক সিরিজের কিছু বই, মেইকিং অব ম্যানকাইন্ড, ক্লিনিক্যাল হিপনো থেরাপির অনেক বই, হাউ ট্যু চুজ ইয়্যোর পিপল এরকম কত কত বই যে হাতে আসে।

অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্টরা ধাপ্পাবাজ—এই টাইপের ধারণা কীভাবে যেন জন্মে গিয়েছিল। সেই ধারণা কাটতে আমার হাবলের ইমেজ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

পড়েছি, পড়েছি এবং পড়েছি। যদিও সেই সময় প্রায় বইই বুঝি নাই। কিন্তু সেই পড়ে না বোঝাও কাজে লেগেছে। এবং এক সময় বাসায় কলাম্বিয়া এনসাইক্লোপেডিয়া ২৪ খণ্ডের পুরো সেট হাজির হয়! আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে।

যে কোনো কিশোরের জীবনের সেই প্রথম অভিজ্ঞতাটি, আমার বেলায় ঘটে স্কুলের বড় কোনো ক্লাসে পড়ার সময়। পড়ুয়া হিসেব সুনাম থাকায় অন্য স্কুলে পড়া মহল্লার পাগলা দাশু টাইপের বন্ধুটি একদিন কী বলবে বলে খুব আগ্রহ ভরে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলতে গিয়ে দেখি উত্তেজনায় থর থর কাঁপছে। ঘটনা জেনে, আমি আগ্রহী হওয়ার চাইতে নার্ভাস হয়ে গেলাম বেশি। কিন্তু সেটা চেপে রেখে পরামর্শ দিলাম, নিরাপত্তার স্বার্থে মহল্লা থেকে যথেষ্ট দূরে, যথেষ্ট নিরিবিলিতে ফার্মগেটের পার্কে গিয়ে দেখা ও পড়া যাক।

ফার্মগেটের পার্কটিকে নিরিবিলি বলায় আমাকে পাগল মনে করার কোনো কারণ নাই। সেই যুগে আমাদের এই ঢাকা শহর খুবই সুন্দর ও বসবাসযোগ্য একটি শহর ছিল। যাই হোক, ফার্মগেট পার্কে যা দেখা গেল, তা প্রথম অভিজ্ঞতার এক্সাইটমেন্টের কারণে পার পেয়ে গেলেও আমার মনে খচখচ করতে লাগল। একটি ছিল পেন্টহাউস ম্যাগাজিন, কিন্তু ইংরেজি নয়, ইউরোপীয় কোনো ভাষা হবে, তার রঙিন ছবিগুলো দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো, টেক্সট পড়া গেল না। আর ছিল, কলিকাতার সেই বিখ্যাত (!) কুৎসিত ছাপার, কুৎসিততম ভাষার চটি!

আমি এর আগ পর্যন্ত নন ফিকশনের পাঁড় মাতাল পাঠক ছিলাম, কিন্তু ফিকশন পড়ি নাই, এমন তো নয়। প্রণয়ের বর্ণনা এত কুৎসিত হবে কেন, এত অশ্লীল খিস্তি করলে সেটা তো স্রেফ চ’বর্গীয় ব্যাপার হয়ে গেল, তাহলে সুন্দর সঙ্গমের বর্ণনা কোথায় পাওয়া যায়, এই ব্যাপারটা মাথায় ঢোকে।

ইতোমধ্যে কলেজে ভর্তি হয়েছি, দেখি পোলাপান সব চটিতে মেতে আছে। কীভাবে কীভাবে যেন আমি উচ্চ মাধ্যমিক চটি সংকলনের প্রধান সম্পাদক হয়ে গেলাম। সবাই চটি সংগ্রহ করত, আমরা গ্রেডিং করতাম, কিন্তু দিন শেষে আমার হতাশা কাটে না। সেই হতাশার কারণেই, তা জয় করতে নটরডেম কলেজের ক্যান্টিনের বারান্দায় বসে সুউচ্চ কৃষ্ণচূড়া গাছ আর বিশাল মাঠের দিকে তাকিয়ে মুখে মুখে যৌথ উদ্যোগে রচিত হয়েছিল বাংলা সাহিত্যে বিস্ময়কর কিছু অমর চটি। হায়, কালের গর্ভে কত অমূল্য মহাকাব্যই না হারিয়ে যায়!

এই লগ্ন বেশিদিন স্থায়ী হয় নাই। কলেজের লাইব্রেরিটা ভাল ছিল, কিন্তু বেশি ভালো, মানে ভালো ভালো বই শুধু, সব রকম বই নাই। এছাড়া গারো-চাকমা পোলাপান কলেজ হোস্টেলে মাগনা খায়-থাকে, কলেজে মাগনা পড়ে, আবার ডগ (ডিরেক্টর অব গাইডেন্স)এর টিকটিকি হিসেবে কাজ করে, কীভাবে যেন ওদের কুনজরে পড়ে গিয়েছিলাম। আমার নামে মিথ্যা (বা অতিরঞ্জিত) অভিযোগও গেছে। আর আমরা ছাত্র ইউনিয়নের কমিটি করছিলাম (আসলে কয়েকটি ডেডিকেইটেড ছেলে করেছিল, আমাকে সাথে ডেকে নিয়েছিল), এসব মিলিয়ে কলেজ লাইব্রেরিতে আমার বেশি সময় দেয়া আর হয়ে উঠল না।

নটরডেম কলেজ ক্যান্টিন
নটরডেম কলেজ ক্যান্টিন

ইংরেজি ক্লাসে একদিন সুশীল স্যার শেক্সপিয়ারের কবিতা পড়াতে গিয়ে বললেন, তোমাদের রবীন্দ্রনাথসহ বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত রচনাগুলো পড়া ফেলা উচিৎ।

আমি ক্লাসের নিয়ম অনুযায়ী কিছু বলার জন্যে অস্থিরভাবে হাত তুললাম, স্যার বললেন, কী হলো?

আমি বললাম, স্যার আমি রবীন্দ্রনাথ পড়েছি, কিন্তু কিছু বুঝি নাই, অযথা প্যাঁচানো একঘেয়েমিতায় পূর্ণ লেখা মনে হয়েছে।

স্যার মৃদু হেসে জানতে চাইলেন কবে, কোনটি?

আমি বললাম নাইনে থাকার সময়, ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসটি।

স্যার বললেন, এখন পড়ো, বুঝবে। কয়েক বছর পরে পড়ে দেখো, আরো নতুন অর্থ বুঝবে। লিটারারি ক্লাসিকগুলোর বৈশিষ্ট এই, জীবনে অভিজ্ঞতায়-জ্ঞানে আমরা যত সমৃদ্ধ হতে থাকি, সেগুলো থেকে তত বেশি অর্থ উদ্ধার করতে পারি।

স্যারের কথাটি খুবই খাঁটি বলে প্রমাণ পেয়েছি। তবে স্যারের বোধহয় রবীন্দ্রনাথে অতিভক্তি ছিল, আমি কিছু ইউরোপীয় সাহিত্যকর্ম নতুন করে পড়লে এর প্রমাণ পাই।

বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরির লোকজন খুব অমায়িক। এক সময় এমন হয়েছে যে আমি কোনো বিষয়ে জানতে চাই, সেটা কোনো বইয়ে পাচ্ছি না, বা পর্যাপ্ত পাচ্ছি না, সাপোর্ট চাইলে উনারা এতটা ব্যাস্ত হয়ে পড়তেন যে বিব্রত হয়ে যেতাম।

এ সময় আমি বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে যেতে শুরু করি। সেটা আমার খুবই পছন্দ হয়ে যায়। এবং একসময় কলেজের ক্লাস বাদ দিয়ে ফুলার রোডে পড়ে থেকেছি।

ক্লাসমেটরা আমাকে ভালবাসতো, ক্লাস ফাঁকি দেয়া আটকাতে টেনে ধরে রাখতে গিয়ে এমনকি একবার আমার শার্ট ছিঁড়ে যায়।

বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরির লোকজন খুব অমায়িক। এক সময় এমন হয়েছে যে আমি কোনো বিষয়ে জানতে চাই, সেটা কোনো বইয়ে পাচ্ছি না, বা পর্যাপ্ত পাচ্ছি না, সাপোর্ট চাইলে উনারা এতটা ব্যাস্ত হয়ে পড়তেন যে বিব্রত হয়ে যেতাম। এমন হয়েছে, জানতে চাওয়ার সপ্তাহ দশদিন পরে কেউ জানিয়েছেন, একটি ম্যাগাজিন এসেছে, সেখানে আমার জানতে চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে একটি লেখা আছে!

তার এই মনে রাখাতেই আমি অভিভূত!

এরপরে আসে, পাবলিক লাইব্রেরির যুগ। তখনও আপুরা এদিক-ওদিক বসে থাকতেন, অবশ্য এখনকার মত অশ্লীল মনে হতো না। তবে অবাক লাগতো, লাইব্রেরিতেই যদি এলেন, ভিতরে গিয়ে বই না পড়ে সিঁড়িতে বসে গল্প করছেন কেন!

এই পাবলিক লাইব্রেরি আমার পছন্দ হতে সময় লেগেছে। তবে, অভ্যাস হয়ে যাওয়ার পর, প্রায় ভাতের মতো গিলেছি।

এই পাবলিক লাইব্রেরি আমার পছন্দ হতে সময় লেগেছে। তবে, অভ্যাস হয়ে যাওয়ার পর, প্রায় ভাতের মতো গিলেছি। একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলে রাখি, এসবের অনেক পরের ঘটনা হলেও, এই পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তন দুটো কারণে আমার স্মৃতিতে ভাস্বর—’মুক্তির গান’ এর প্রিমিয়ার দেখেছিলাম, সেদিন ভীষণ উদ্দীপনা, দেশের বড় বড় নক্ষত্ররা এসেছিলেন, এমনকি রেহমান সোবহান স্যারও এলেন, এবং, লাইনে দাঁড়ালেন। আয়োজকরা এসে তাকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে যেতে চাইলেও উনি লাইনেই থাকলেন! দ্বিতীয়টি ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এর বিশেষ কোনো এক প্রদর্শনী  দেখা। ঢাকায় তখনও সেই কোরিওগ্র্যাফির উপযোগী অন্য কোনো মঞ্চ ছিল না।

মাঝে আবদুল্লাহ  আবু সায়ীদ স্যারের সুনাম শুনে ঢাকা কলেজে উনার ক্লাস করে আসি। এত দূরে শুধু এই কাজে গিয়ে পোষায় নাই; কারণ, আমি মা’র কাছ থেকে শুধু নটরডেমে আসা-যাওয়ার ভাড়া এবং যেদিন প্র্যাকটিকাল আছে  সেদিন লাঞ্চের টাকা পেতাম।

ফুলার রোডে বা ঢাকা কলেজে হেঁটেই যেতে হতো, কারণ তখন সিগারেট ধরেছি, এবং রুচিশীল পারসন হিসেবে আমার ব্র্যান্ড ছিল বেনসন।

বাংলা মটরে স্যারের ওখানে গেলাম, গিয়ে দেখি সব পোলাপান সিরিয়াস, সবাই খুব বড় পণ্ডিত হবে বলে পণ করেছে। অথচ আমি পড়তে ভাল লাগে তাই বই পড়ি। বই খুঁজি, বই পড়ে কী হবে সেটা ভাবিও নাই বুঝিও নাই। এরা বই পড়াকে আরাধনা জ্ঞান করে। এত ভাল ছেলেদের ভিড় আমার ভালো লাগলো না।

এরপর আমার দেশ ছেড়ে যাওয়ার পালা। জাপান বইয়ের দেশ, পড়ুয়াদের দেশ। সেখানের দিনগুলো যেন জলের মাছ জলে ফিরে এলো টাইপ। বাসার কাছেই, একটু হাঁটলে কিনোকুনিয়া শিনজুকু শাখা। সেটার পাঁচ (নাকি ছয় তলায়, এখন আর মনে নাই), ছিল ম্যাগাজিন সেকশন। সেখানে না কিনেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ম্যাগাজিন পড়ার সুযোগ ছিল।

উনিশ বছর বয়সে শতবর্ষ অটুট থাকার নিশ্চয়তার পোলারয়েডে তোলা ছবি। কী ভাবছিলাম? আমি থাকবো না, কিন্তু ছবি টিকে যাবে…।

মজার ব্যাপার, এই সেদিন কথাপ্রসঙ্গে আমেরিকাবাসী এক বন্ধু বলছে, আমেরিকায় সোসাইটিতে-কর্পোরেটে মোরালিটি বলতে কিছু এখন আর নাই। আমি হেসে জবাব দিলাম, সেটা আমি তুই আমেরিকা যাওয়ার আগেই জানি। হ্যাঁ, দ্যা ইকোনোমিস্ট একবার কভার স্টোরি করেছিল, কর্পোরেট এগজিকিউটিভদের মধ্যে মরালিটির প্রশ্নটিই নাই হয়ে গেছে। ওদের সেই কাজটি খুব ভাল হয়েছিল, ওরা প্রিন্সটন, হার্ভার্ডের বিজনেস স্কুলে কী শিখানো হয়, এগজিকিউটিভদের মূল্যায়নে কীরকম প্রসেস প্র্যাকটিস করা হয়, এতে মরালিটি কীভাবে মারা না গিয়ে উপায় নাই, এসব খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছিল। এরকম অনেক কিছুই ঐ অল্প বয়সে আর্থিক সঙ্গতি না থাকা কালে পড়তে পেরেছি, জানতে পেরেছি—হয় লাইব্রেরি থাকায়, নয়তো বইয়ের দোকানে চোখ বুলানোর সুযোগ থাকায়।

বাংলা মটরে স্যারের ওখানে গেলাম, গিয়ে দেখি সব পোলাপান সিরিয়াস, সবাই খুব বড় পণ্ডিত হবে বলে পণ করেছে।

দেশে ফিরে এলে দেখি স্টেডিয়াম মার্কেটে বই এর দোকান একটাও আর নাই, গুলিস্তানের ফুটপাথে বই বিক্রি হয় না, আরো কী কী পরিবর্তন যেন দেখলাম, মন খারাপ হয়ে গেল। এবং বিদেশ ঘুরে আসায়, ঢাকা শহর যে কত নোংরা এবং মানুষ বসবাসের অনুপযুক্ত, এটা প্রতি পদে পদে টের পেতে থাকলাম। এর মধ্যে দেখা গেল বেইলি রোডে বইয়ের দোকান হয়েছে।

একদিন বৃষ্টিতে আটকে গিয়ে এক দোকানে ঢুকে মেজাজটাই খিচরে গেল। মনে হলো, শালা ঢাকা শহরে বইয়ের দোকান খুলেছিস, নাকি এটা কলিকাতার কোনো ভাঙা-নোংরা গলি পেয়েছিস। ঢুকেছি যেহেতু ভদ্রতা রক্ষার্থে নেহেরুর ‘গ্লিম্পসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্টোরি’র বাংলা অনুবাদ পেলে নিয়ে যাই ভেবে পাওয়া যাবে কি না জিজ্ঞাসা করায় মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেল। সেলসম্যান আমাকে কলিকাতা শহর চেনানো শুরু করে নন স্টপ লেকচার ঝাড়ছেন, আমি যা চেয়েছি সেটা নাই, তবে, সুনীলের ওমুক বইটি পড়েছি কি না, সমরেশ মজুমদারের ওমুক বই এখন ‘কালচার্ড’ লোকজন সবাই কিনে পড়ছে, শীর্ষেন্দুর ওমুক ওমুক বই না পড়লে বাংলা সাহিত্য পড়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি! আল্লাহ্‌র শোকর, হুমায়ূন আহমেদ আমাদের বইয়ের দোকানের তাকে আমাদের বইয়ের জায়গা উদ্ধার করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কলিকাতায় ছিলেন, সেই হ্যাংওভার কাটে নাই ভেবে, বলব না বলব না করেও, ক্যাশে বসা গলায় অস্বাভাবিক রকম মোটা স্বর্ণের চেইন পরা সেই বিখ্যাত আঙ্কেলকে মনের ক্ষোভ পুরোটা ঢেলে না দিলেও বললাম, আঙ্কেল, বইয়ের তাকের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে কলিকাতার কোনো গলিতে ঢুকে গেছি।

বড় আমুদে, গাল্পিক সেই ব্যাক্তিত্ব কিছুক্ষণ আগ্রহ জমিয়ে গল্প করে ‘নকশালদের শেষ সূর্য’ আর ‘আমি বিজয় দেখেছি’ ধরিয়ে দিলেন! কিছু লোকের সাথে রাস্তায় ধাক্কা খেয়েও আপনি উপলদ্ধি করবেন, মার্কেটিং এক বিরাট আর্ট!

পত্রিকায় ‘দর্শন পাঠচক্রের’ বিজ্ঞাপন দেখে নতুন করে আবার বাংলা মটরে স্যারের ওখানে যাওয়ার প্ল্যান করলাম। ভাল লাগলো, স্যার প্রথম দিনই যখন জানালেন, ছাত্রাবস্থায় উনারা বন্ধুরা মিলে পাঠচক্র করতেন, এবং উনাদের প্রথম পাঠচক্র ছিল, দর্শন পাঠচক্র। কিন্তু আমাদের পাঠচক্র জমল না, এবং দিনে দিনে মেম্বার এক এক করে ঝরে যাওয়ায় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলেন। শেষদিন, স্যার ডেকে নিয়ে গেলেন নিচে উন্মুক্ত স্থানে অন্য পাঠচক্রের লেকচারে। সেখানে দেশবিখ্যাত এক ব্যাক্তিত্ব লেকচার দিচ্ছেন, বিষয় ‘নন্দনতত্ত্ব’। উনার বানানো পাপেট এবং মিশুক দেখে খুব বিরক্ত ছিলাম; কিন্তু এই লেকচার শুনে আমার যেন নবজন্ম হলো! বিষয়টি প্রকাশ করা কঠিন, বাংলায় এসথেটিকস নিয়ে এই মানের লেকচার দেয়া সম্ভব, সেটা ততদিন পর্যন্ত আমার জানা ছিল না। আমি মুগ্ধ বিস্মিত হয়ে স্যারকে বললাম, পাঠচক্র ভেঙে গেছে কিছু করার নাই, কিন্তু এই এক লেকচারে আমার আফসোস দূর হয়ে গেছে। বিদায়ের সময় স্যার আমাকে বাংলা ক্লাসিক্যাল ফিকশনগুলো পড়ে ফেলতে বললেন।

পারিবারিকভাবে আমার জন্যে ঢাকার বাইরে সবচেয়ে কাছের শহর হচ্ছে লন্ডন। বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘অটোবায়োগ্রাফি’ আর ‘হিস্টোরি অব ওয়েস্টার্ন ফিলসফি’ আর কীসব বই লন্ডন থেকে আনানো।

আমি হাইস্কুলে পড়ার সময়, সদরঘাটে, মানে আসলে বাহাদুর শাহ্‌ পার্কের ওখানে খেলার জন্যে চুম্বক কিনতে যেতাম। দেশে ফিরে সেই পার্কের পাশে পুরোনো বইয়ের দোকান খুঁজে পেলাম। যথারীতি এক দোকানির সাথে খাতির হয়ে গেল। কত অদ্ভুত অদ্ভুত রকম বই যে কিনেছি, প্রায় বিনামূল্যে। এছাড়া ‘দেশ’ পত্রিকার কয়েক বছরের প্রায় সবগুলো সংখ্যা, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো কাভার করা Time ও Newsweek এর সংখ্যাগুলো, নবপরিণীতার জন্যে সানন্দার সংসার ও ক্যারিয়ার নিয়ে বিশেষ সংখ্যা, ঋতুচক্র বিষয়ে বিশেষ সংখ্যা, মা হওয়ার প্রস্তুতি বিষয়ে বিশেষ সংখ্যা, এমনকি ৫৫রকম ব্লাউজ, ৭৭রকম শাড়ি পরা, ৯৯ চুল বাঁধা, ১১০রকম ভর্তা, এসব বেছে বেছে মন ভরে কিনেছি ওখান থেকে।

সেই সময় আজিজ মার্কেট হয়েছে, জমেছে। হাঁটাহাঁটি করলেও ভাল লাগে। পাঠক সমাবেশ আসলেই খুব কাজের দোকান ছিল, আজ ওটা এমনি এমনি এত বড় হয় নি। একটি বই খোঁজ করলে তাদের কাছে থাকুক বা না থাকুক, যে রেসপন্সটা পাওয়া যেত, সেটা এই দেশে বিক্রেতাদের মধ্যে দুর্লভ; অতি স্বাভাবিকভাবেই সেই রেসপন্স আপনাকে পরের বইটি খোঁজ করতে সেখানে নিয়ে যাবে। কোনো বই ওপার থেকে এনে দেয়ার কথা দিলে বিজু সেটা রাখতেন, স্বল্পমূল্যের অপ্রচলিত বই হলেও। তার প্রফেশনালিজম অনুকরণীয়।

তক্ষশীলা নামে এক দোকান ছিল। দুয়েকদিন ঢুকে ভয় পেয়েছি, আরে, এরা তো ভীষণ কুলীন পণ্ডিত, বই বিক্রি করে এই গণ্ডমূর্খের দেশকে উদ্ধার করে ফেলছে! আর জীবনে ঢুকি নি। পরে এক বন্ধু বলেছে আয় তোকে পরিচয় করিয়ে দেই, আমাদের ওমুকের তমুক; আমি মাফ চেয়েছি।

আমি সবচাইতে বেশি সময় কাটিয়েছি, এবং সবচাইতে বেশি বই কিনেছি বিদিত থেকে। যতটুকুই হোক স্পেস আছে, এবং সময় নিয়ে তাক থেকে একটির পর একটি বই দেখতে থাকলে কেউ জ্ঞান দিতে এসে বিরক্ত করবে না, কিন্তু প্রশ্ন করলে ভাল রেসপন্স পাওয়া যাবে। বিদিত থেকে আমি বাংলা ইংরেজি দুই ভাষার বইই কিনেছি। আমার মেয়েরা মোট তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ল, প্রত্যেকটির প্রধানকে আমি বার্ট্রান্ড রাসেলের “On Education” উপহার দিয়েছি। এছাড়া, এক সময় বিভিন্নজনকে বিভিন্ন উপলক্ষে বার্ট্রান্ড রাসেলের “Conquest of Happiness” উপহার দিয়ে এসেছি। ইদানীং বিদিতের ব্যবসা আগের মতো নাই। শেষবার Happiness কিনতে হয়েছে প্রথমা থেকে, এদেরকে আমি এড়িয়ে চলতে চাই।

আজিজে আমি থিতু হয়েছিলাম এক আঙ্কেলের দোকানে। উনাকে কথাবার্তায় আচরণে ঠিক দোকানি মনে হতো না, উনার তাকও এলোমেলো থাকতো, পরে ঘনিষ্ঠতা হবার পর আমি গেলে তার তাক ঠিকঠাক করে দিতাম। আজিজের অনেক গল্প শুনেছি উনার কাছ থেকে। অনেকদিন পরে, আলাপে জানা গেল, উনি আমার এক স্কুলবন্ধুর ভগ্নীপতি, বন্ধু যেমন খুব ঘনিষ্ঠ, উনার সাথেও সম্পর্ক তখন এমন পর্যায়ে যে সেটাকে ঝেড়ে ফেলা সহজ না। আমি জানিয়ে দিলাম, আপনাকে আমি ভাই ডাকতে পারবো না।

তবে, আজিজেই প্রথম দেখা গেল, বই পড়া বা পড়ার ভান করাও একটি ফ্যাশন।

তবে, আজিজেই প্রথম দেখা গেল, বই পড়া বা পড়ার ভান করাও একটি ফ্যাশন। এই ফ্যাশন করতে কিছু উল্লুক টাইপ আজিজে এদিক-ওদিক আড্ডা বসাতো, গাঁজা টানতো, সন্ধ্যার সময় জিন আর টি শার্ট পরে অহেতুক মাথা ঝাঁকিয়ে চুল যে তার বয়কাট সেটা দেখিয়ে সিগারেট টানতো। কেউ বাংলা মদ খাক, কিংবা কোন্যিয়াক, গাঁজা টানুক, কিংবা সিগারেট—কোনোটাতেই আমার আসলে আপত্তি নাই, যতক্ষণ পাবলিক ন্যুইসেন্স না ছড়াচ্ছে। তবে, কোনো কাজ করাতে আপত্তি না থাকলেও, সেটা করার ভান করায় প্রায়ই আপত্তি তৈরি হয়ে যায়। মাঝে মাঝে সিঁড়িতে গাঁজাখোরদেরকে, বা সন্ধ্যায় পাছা দোলাতে দোলাতে পাঠক সমাবেশের সামনের ফুটপাথে সিগারেট টানা ‘আধুনিকা’দেরকে বেখেয়ালে পায়ে পাড়া-টারা দিয়ে থাকতে পারি!

কবি নজরুল যখন পিজি হাসপাতালে, তখন আমাদের এক আত্মীয় পিজিতে চিকিৎসাধীন, তাকে দেখতে গেলে আত্মীয় বা পরিচিত কে একজন যেন পিজিরই লোক নজরুলকে দেখার সুযোগ করে দিলো। সুযোগ মানে বিশ্রী এক উপায়, ভুল করে দরজা খুলে ফেলেছি ভঙ্গিতে নজরুলের কেবিনের দরজা খুলে ধরে রাখলে, আমরা প্রাণীটিকে দেখলাম! ছোটবেলায় জানতাম উনি বিদ্রোহী কবি, সেই ইমেজটাই মাথায় ছিল, কিন্তু হায়, আমার বাস্তবে দেখা নজরুল ভয়ার্ত বিপন্ন এক প্রাণীর মতো, যেন ভুল করে লোকালয়ে এসে ধরা পড়ে খাঁচায় বন্দি আছে, নিজ জগৎ ছেড়ে অন্য অচেনা জগতে আটকে পড়ে যথেষ্ট দুর্বলও হয়ে গেছে!

বইয়ের আলাপে অসুস্থ নজরুল আসলেন, আসলে ছফা ভাইয়ের কারণে। দোতলায় তার উত্থানপর্বে প্রথম একদিন তাকে বসে থাকতে দেখে আমার পিজিতে দেখা কাজী নজরুল ইসলামের কথা মনে পড়ে যায়। যে সুঠাম সুপুরুষ আমার মানসে আঁকা ছিলেন, তার স্থলে দেখি এক শীর্ণ, ক্লান্ত, বিষণ্ণ অবয়ব!

আমার বই পড়া এখন খুব কমে গেছে। সময় কম, নেশাও কেটে গেছে। বাসায় রাখার জায়গাও নাই। তিনবছর আগে মেলা থেকে কেনা বই এখনও পড়ে দেখা হয় নাই। এখন ইন্টারনেট আলাদিনের চেরাগ হাতে প্রস্তুত। আগে জানার সোর্স ছিল কম, এখন নেটে এত বেশি সোর্স যে সমুদ্র মন্থনে অমৃত সিঞ্চনের কৌশল রপ্ত রাখতে হয়। তারপরেও, নেট ঘাঁটা মানে যেন জিস্ট টুকে নেয়া, সারাংশ জেনে সন্তুষ্ট থেকে যাওয়া!

এক সময় টাকা ছিল না, নটরডেম কলেজ থেকে হেঁটে বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়তাম। তোকিও মেট্রোপলিসের কত রকম মনোহারি ডাক উপেক্ষা করে বইয়ের দোকানে ঢু মারতাম। নতুন বিয়ে করেছি, ঘরে বাজার নাই, কারো কাছ থেকে পাওনা টাকা উদ্ধার করেছি, না যেন ধার করেছি—কিন্তু পকেটে টাকা এসেছে, নিজের অজান্তে আজিজে গিয়ে বইয়ের জগতে ঘুরে-ফিরে বই কিনে টাকা খরচ করে হুঁশ হয়েছে, আরে বাসায় বাজার না নিয়ে গেলে না সমস্যা!

আমার বই পড়ার গল্প আপাতত শেষ।

দেশে এখন বই পড়া নিয়ে অনেক কথা চালাচালি হচ্ছে, বেশ মজাদার ব্যাপার। আমরা অনেকেই খেয়াল করি না, আমরা যা বলি, তাতে কিন্তু আমাদের ভেতরের অনেক কিছু স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়ে যায়!

আমি বরং, পড়ুয়াদের সম্পর্কে কিছু বলি। একদল পড়ুয়া, এবং পড়ুয়াদের প্রায় সবাই এরাই, তারা ট্রেনের ড্রাইভারের মতন। ছুটতে পারেন, স্টেশনের পর স্টেশন পার হয়ে যান, কিন্তু ট্র্যাকের বাইরে যাওয়ার সামর্থ্য তাদের একটুও নেই। বইয়ের লেখক জগৎ যেটুকু দেখিয়েছেন, পড়ুয়া সেটুকুই বড়জোর দেখেন। এর একটুও এদিক-ওদিক দেখার সামর্থ্য তাদের নাই, বরং এদিক-ওদিক করতে চাইলেও তাদের সিস্টেম কলাপ্স করবে। এদের জ্ঞান—জ্ঞান কথাটি আসলে এক্ষেত্রে খাটে না—বিদ্যার দৌড় কাগজে কালির ছোপে যেটুকু হরফ, সেটুকু পর্যন্তই।

আরেকদল সংখ্যায় অতি স্বল্পসংখ্যক পড়ুয়া আছেন, যারা অনেকটা সাইকেল চালকের মতো। তারা যাত্রাপথে সামনে পিছনে ডাইনে বাঁয়ে দেখতে পারেন, থামতে পারেন, প্রয়োজনে ট্র্যাক বদলাতে পারেন, শর্টকাট মারতে পারেন, এমনকি প্রয়োজনে বাহন কাঁধে তুলে যেখানে পথ নেই সেটুকু সাঁতরে পাড়ি দিতে পারেন। এরা কোনো বইয়ের দুই মলাটের মাঝে যেটুকু কালির ছাপ, তার চাইতে অনেক বেশি নির্যাস আয়ত্ত করতে পারেন। খর্ববুদ্ধির বাঙ্গাল এদেরকে প্রশংসা করতে পারে নাই, তাই ব্যাঙ্গ করে বলে, এরা ক বললে কলিকাতা বুঝেন, আমি বলি এরা ক শুনলেই যদি কিংকর্তব্যবিমূঢ়ও বুঝে ফেলতে পারেন, তাতে ঈর্ষা করার কী হলো?

আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে, পড়ুয়া যদি ট্রেনের ড্রাইভার প্রকৃতির হয়ে থাকেন, তবে তাকে সারা জীবন বই পড়ে যেতেই হবে, এবং বই পড়া তাদের জন্য অতি মূল্যবান।

আর যদি পড়ুয়া নির্যাস ছাঁকতে জানেন, সেটার সুরভি ছড়াতে জানেন, তবে বই পড়া ইটসেলফ তার জন্যে উঠতে বসতে জপ করার অতি জরুরি কোনো বিষয় নয়, সেটা এদের অনায়াসেই হচ্ছে!

মুক্তাগাছার আটআনি জমিদার বাড়ি

আটআনি জমিদার বাড়ি — সবাই চিনে ‘মুক্তাগাছা রাজবাড়ি’ নামে। মুক্তাগাছা নামকরণেরও একটা গল্প আছে।

মুক্তাগাছার পুরানো নাম ছিল বিনোদবাড়ি। এখানে যে জমিদার বাস করতেন আচার্য্য চৌধুরী, তারা এখানকার স্থানীয় ছিলেন না। বগুড়া থেকে নৌকায় ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে ময়মনসিংহ আসেন তারা। এলাকার লোকজন তখন জমিদারদের নানা উপহার দিয়ে খুশি করার চেষ্টা করেন। একজন ছিলেন মুক্তারাম কর্মকার। তিনি জমিদার আচার্য্য চৌধুরীকে মুক্তার তৈরি একটি মূল্যবান গাছা উপহার দেন। এতে জমিদার খুশি হয়ে এলাকার নাম রাখেন মুক্তাগাছা।

আচার্য্য চৌধুরীর বংশের মাধ্যমেই মুক্তাগাছা শহরের গোড়াপত্তন হয়। তারা ময়মনসিংহ জুড়ে ১৬ হিস্যার জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। তার মধ্যে আটআনি জমিদার বাড়ি ছিল মুক্তাগাছার এই জমিদার বাড়ি।

ময়মনসিংহে থেকেও অনেক পরেই গেছি মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি দেখতে। ছোট থেকে শুনে আসছি সেখানে একটা জমিদার বাড়ি আছে। তার আগে অবশ্য আব্বার কাছ থেকে মুক্তাগাছার নাম শুনেছি। মুক্তাগাছায় হাট বসে বিকেলে। গরু ছাগলের হাট। প্রত্যেক বছর বাপ-চাচারা সেই হাট থেকে কোরবানির গরু কিনে আনেন। গরু দেখেশুনে কিনতে কিনতে রাত হইয়া যায়। ছোটবেলায় আম্মা ঘুম থেকে ডেকে তুলত গরু দেখার জন্য।

একদিন জমিদার বাড়ি দেখার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সাথে আমার ফুপাত ভাই ছামাদ ও তার বান্ধবী আর আমার বান্ধবী ও তার বোন।

টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে করে মুক্তাগাছা নামলাম আমরা। ময়মনসিংহ সদর থেকে ১৫/১৬ কিমি দূর। টাঙ্গাইল ও জামালপুর যাওয়ার রাস্তা ওইটা। মুক্তাগাছা নেমে বাজারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। মেইনরোড থেকে ১ কিলোমিটার ভেতরে।

দুইটা জিনিসের টানে লোকজন ওখানে যায়। এক মণ্ডা, দুই জমিদার বাড়ি।

মণ্ডা কী জিনিস বুঝতাম না। আব্বা একদিন কিনে আনলেন। চারকোনা সাদা ছানার মত দানাদার। আমি স্বাভাবিক একটা খেতে পারি। জোর করে হলে দুইটা। মিষ্টির চেয়েও মিষ্টি লাগে আমার কাছে। এখানকার মণ্ডা ওই আমলে নাকি জমিদাররাই খেতো।

জমিদার বাড়ির কাছে আসতেই বড় একটা গেট দেখতে পেলাম। গেটে লোক দাঁড়ানো ছিলো। আশপাশে দেখলাম কিছু টং দোকান, একটা মন্দির ও মাঠ। মূল ফটকের সামনেই সাত ঘাটের পুকুর। প্রতিটা ঘাটই বাঁধানো। তাছাড়া অনেক জায়গায় মঠ ও মন্দির আছে। সিংহ দরজা মানে প্রধান গেট পার হয়ে সামনে অাগালেই কিছু খোলা জায়গা, বাড়ির আঙিনার মত।

সিংহ দরজা বলার কারণ আছে। যেই করিডোর দিয়ে ঢুকতে হয় তার দুই পাশে নিচের খোপে ছিল হাতির ছয়টি মাথার মূর্তি, আর ওপরে থাকত শিকার করা বাঘের নমুনা।

জমিদার বাড়িটি ১০০ একর জায়গা নিয়ে। চুনসুরকি উঠে গিয়ে স্থাপনাগুলির করুণ অবস্থা। ইটের গায়ে ঘাস জন্মাচ্ছে। ভেঙে পড়ছে ছাদ।

যা অবশিষ্ট আছে তাতে বোঝা যায় আগে অনেক সুন্দর ছিল বাড়িটি। জমিদার বাড়ির কিছু স্থাপনায় এখন শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বসানো হয়েছে। এমনকি মন্দিরের পাশের একটা ছোট স্থাপনাকে এটিএম বুথ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

আটআনি জমিদার বাড়িটি এখন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আন্ডারে। এর সংস্কার কাজ চলছে। ভেতরে বড় ক্যামেরা নিয়া ঢুকতে দেওয়া হয় না। তবে মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ছবি তুলতে দেওয়া হয়।

বাজবাড়িতে এসে আমার কাছে ভাল লেগেছে টিন ও কাঠ দিয়ে তৈরি একটি দোতলা বাড়ি।

ভেতরে বড় বড় আম গাছ, লিচু গাছ আছে। কিছু দরজায় তালা দেওয়া। জমিদার বাড়িটি দেখাশোনার জন্যে আছে ৪ জন কর্মচারী। একজন জানালেন ভেতরে একটা রেস্ট হাউজ নাকি বানানো হবে। দূর থেকে লোকজন গেলে বিশ্রাম নিতে পারবে, এবং থাকতেও পারবে।

প্রধান গেইট
মন্দির
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প এর গলি, ওইটাও জমিদার বাড়ির একটা অংশ ছিল।
মঠ
করিডোরের দুই পাশের খোপগুলিতে ছিল বড় বড় ছয়টা হাতির মাথা।
৪ জন কর্মচারী বসে গল্প করছে
বিভিন্ন ঘর
রাজেশ্বরী মন্দির, এখানে শুধু রাজা-রাণী পূজা করত
জমিদার বাড়ির ভেতরের অংশ
আটআনি জমিদার বাড়ির ভিতরের অংশ
সবুজ ঘাসের অংশটুকু অন্ধকুপ ছিল, বিচারে সাজাপ্রাপ্তদের মেরে এর ভেতরে ফেলা হত। ব্রহ্মপুত্র নদের সাথে এর সংযোগ ছিল।
মন্দিরের ভেতরে পারিবারিক পূজার আসন
মূল স্থাপনা নষ্ট হয়ে গেছে, আছে শুধু কাঠামো
লিচু গাছ
জমিদার বাড়ির ভিতরের অংশ
গোল পিলার
জমিদার বাড়ির ভিতরের অংশ
আমগাছ
পেছনের দিকে
ঘরের ছাদ নাই, আছে লোহার বিম
কুয়া এবং একটি স্থাপনা
এটা নতুন ভাবে তৈরি করা মণ্ডার দোকান, পুরনোটা ভেঙে ফেলা হয়েছে

ছবি তোলার আগেই ছবিকে পারফেক্ট বানিয়ে দিবে গুগলের নতুন অ্যালগরিদম

ভালো ছবি তোলা এক জিনিস-সেটাকে এডিট করা আরেক জিনিস। এখন আমরা প্রায় সবাই সোশয়াল মিডিয়া, ইনস্টাগ্রামে কমবেশি ছবি আপলোড করে থাকি। আর ছবি আপলোড দেওয়ার আগে আমরা সেটাকে ফিল্টার করি, স্যাচুরেশন কমিয়ে দেই–তারপরে পোস্ট দেই। ছবিটাকে সুন্দর দেখাবে – যদি আসলেই এমন কিছু আমরা চাই তাহলে একজন প্রফেশনাল এডিটর সেই কাজ করে দিতে পারে। এখন হয়ত ছবি তোলার সময়ে একটা স্মার্ট অ্যালগরিদম সেই কাজ করে দিবে।

এমআইটি বা ম্যাসাচুয়েটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং গুগল নতুন একটি মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম বের করেছে, এই অ্যালগরিদম ছবি তোলার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বা নিজেই নিজেই একজন প্রফেশনাল ফটোগ্রাফারের মত ছবির সবকিছু ঠিক করে দিবে। অর্থাৎ, আপনি একটা ছবি তুললেন, আর আপনার ডিভাইসে চালু থাকা নিউরাল নেটওয়ার্ক নির্ধারণ করবে ছবিটিকে কিভাবে দেখতে সুন্দর করা যায় – প্রয়োজনমত কন্ট্রাস্ট বাড়িয়ে দিবে, ব্রাইটনেস হয়ত কমিয়ে দিবে- এবং যাই করুক, সবকিছু করবে মাত্র ২০ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে।

এই রিসার্চের প্রধান লেখক এবং এমআইটির ডক্টোরাল স্টুডেন্ট মাইকেল ঘারিব বলেছেন, এই সময়টুকু এক সেকেন্ডের পঞ্চাশ ভাগ। ঘারিবের এই অ্যালগরিদমটি এত দ্রুত আপনার ছবিটিকে পালটে দিবে যে আপনি ছবিটিকে তোলার আগেই এর এডিটেড ভার্সন দেখতে পাবেন।

নিউরাল নেটওয়ার্ক কিভাবে নির্দিষ্ট ফটোগ্রাফিক স্টাইলগুলিকে শিখতে পারে সেটা আবিষ্কার করার জন্য ঘারবি গত বছর গুগলের গবেষকদের সাথে কাজ শুরু করেন। একই ধরনের কাজ ২০১৫ সালে জার্মান গবেষকরাও করেছিল। তারা একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক বানিয়েছিল যেটা যেকোনো ছবি তোলার সময় ভ্যান গগ ও পিকাসোর স্টাইলকে অনুসরণ করতে পারে।

ঘারবি জানিয়েছেন এই অ্যালগরিদমের উদ্দেশ্য হল কোনো এডিটিং অ্যাপ্লিকেশন ওপেন না করেই প্রফেশনাল ধরনের ছবি তোলা। এই অ্যালগরিদম একটা অটোমেটিক ফিল্টারের কাজ করে এবং এর কাজ অনেক বেশি সূক্ষ্ম। বেশিরভাগ এডিটিং ফিল্টার সম্পূর্ণ ছবিটাকেই একই রকমভাবে এডিট করে, যদি ছবিটির সব জায়গায় একইরকমভাবে এডিট করার প্রয়োজন নাও থাকে তবুও বেশিরভাগ ছবি পুরো ছবিটিকেই একরকমভাবে এডিট করে। ঘারবি’র অ্যালগরিদমে আলাদা আলাদা অনেক ফিচার থাকছে যেগুলি একই ছবির যেখানে যেটা প্রয়োজন তাই করবে। এবং প্রয়োজন অনুসারে সঠিক জায়গায় পরিবর্তন ঘটাবে।

ঘারবি বলেছেন, সাধারণত প্রতিটা পিক্সেলকে একইভাবে বদলে দেওয়া হয়। যখন আপনার ছবিগুলির নির্দিষ্ট জায়গায় প্রয়োজনমত পরিবর্তন করা হয়, সেটা বেশি ইন্টারেস্টিং।

এই অ্যালগরিদম নিজে নিজে শিখতেও পারে। যেমন, কোনো সেলফিতে উজ্জ্বল ব্যাকগ্রাউন্ড থাকলে ছবিতে থাকা চেহারা-কে উজ্জ্বল করে দিবে। পানির ছবি নেওয়ার সময় সেই অংশের স্যাচুরেশন বাড়িয়ে দিবে অথবা কোনো ল্যান্ডস্কেপ ছবিতে গাছের সবুজ রঙ বাড়িয়ে দিবে।

ঘারিবের এই অ্যালগরিদম এই কাজ করতে পারেছে কারণ ঘারিব অনেকগুলি ম্যানুয়ালি এডিট করা ছবি দিয়ে এই অ্যালগরিদমকে ভিজ্যুয়াল সূক্ষ্মতার ব্যাপারে ট্রেনিং দিয়েছেন। এই নিউরাল নেটওয়ার্কটিতে গবেষকরা ৫০০০ এডিটেড ছবি ঢুকিয়েছেন। এই ছবিগুলির মাধ্যমে এই অ্যালগরিদমটি ছবি এডিট করার নিয়মগুলি শিখেছে। এখন আপনি যদি এই নিউরাল নেটওয়ার্কে আপয়ান্র এডিটেড ছবিগুলি ঢুকান, এটা আপনার নিজস্ব ফটোগ্রাফিক স্টাইল শিখে নিতে পারবে।

আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল, এই সফটওয়্যার এতই হাল্কা যে এটা মোবাইল ফোনেও চলবে। ঘারিব বলেছেন, এটাকে দ্রুতগতিতে বাস্তবে চালানোর ক্ষেত্রে মূল ব্যাপারটি হল একটা ছবির সবগুলি পিক্সেলকে প্রসেস করতে হয় না।  একটা ছবির লাখ লাখ পিক্সেলকে প্রসেস করার বদলে, ঘারিবের অ্যালগরিদমটি ছবিটির একটা কম-রেজ্যুলেশন ভার্সন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় কোন কোন অংশ ঠিক করতে হবে। নিউরাল নেটওয়ার্কে থাকা নিয়মগুলির মাধ্যমে অ্যালগরিদমটি ডিসিশন নেয় ছবির কোন অংশের জন্য কিরকম কনট্রাস্ট, কিরকম উজ্জ্বলতা, কিরকম কালার ও কিরকম স্যাচুরেশন রাখতে হবে। এরপরে প্রয়োজনমত ছবিটির পরিবর্তন ঘটিয়ে ছবিটিকে আবার হাই-রেজ্যুলেশনে কনভার্ট করে। যেহেতু সম্পূর্ণ ছবিকে প্রসেস করতে হয় না, তাই খুবই দ্রুত কাজ করতে পারে।

এই অটো-এডিটিং ফিচারটি এখনো গবেষণার অধীনে আছে। তবে প্র্যাকটিকালভাবেই এই জিনিসটি ক্যামেরা ফিচারগুলিকে আরো দ্রুতগতির ও দক্ষ করে তুলবে। ঘারবি জানিয়েছেন অ্যালগরিদমটি এইচডিআর ফটো এত দ্রুত প্রসেস করে যে আপনাকে হাই ডেফিনেশন ছবির জন্য আধা সেকেন্ডও অপেক্ষা করতে হবে না। এই প্রজেক্টের সম্ভাবনা ও গভীরতা বিবেচয়ান করেই গুগল এর সাথে জড়িত হয়েছে। অ্যান্ড্রয়েডের আগামী ভার্সনগুলিতে এই ফিচারটি থাকবে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত করে ঘারবি কিছু বলেননি, তবে জানিয়েছেন যে আমরা আশা করতে পারি।