Archive

December 2018

Browsing

আপনারা মদ্যপান করেন তো? প্রশ্নটি করেই ছয়টি এফেস বিয়ারের ক্যান আর একটি বখদু ওয়াইনের স্লিম বোতল ফ্লোরের ওপর সাজিয়ে রাখলেন জাহিদ হায়দার। তার সঙ্গে মদ্যপানের এ-ঘটনাটির মধ্য দিয়েই আমার নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে।

এটি ২০০০ সালের এপ্রিল মাসের ঘটনা, তখন আমরা কসোভোর একটি ছোট্ট শহর, ভিটিনায়।

কবে, কখন কবি জাহিদ হায়দারের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ঠিক মনে নেই। তবে সেই বছরই জানুয়ারির শেষের দিকে টিএসসিতে তাকে দেখেছি জাতীয় কবিতা উৎসবের জন্য মফস্বল থেকে আসা কবিদের কবিতা সম্পাদনা করতে। তখন ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কয়েকটি কথা হয়েছিল বলে মনে পড়ে। এর আগের আর কোনো স্মৃতি মনে পড়ছে না।

এপ্রিলের শেষে আমি যখন কসোভোর আঞ্চলিক শহর জিল্যানে পৌঁছাই তখন অন্যদের চেয়ে আমি একটু বেশিই এক্সাইটেড ছিলাম। কারণ আমি জানতাম এই রিজিয়নেই পোস্টিং হয়েছে জাহিদ হায়দারের। আমাকে আগামী ছয় মাস কবিতার আড্ডাবিহীন কাটাতে হবে না। এই ট্রেইনিং, সেই ট্রেইনিং, ব্রিফিং, মিটিং ইত্যাদি শেষে যখন রাতে আলজেরিয়ান সুন্দরী, রিজিয়নাল কোঅর্ডিনেটর লুলু, আমাদের তুর্কি রেস্তোরাঁ কোনাকুতে খাওয়াতে নিয়ে গেল তখন আমি জিজ্ঞেস করি, জাহিদ হায়দার নামে কোনো বাংলাদেশিকে চেনো?

লুলু ওর গলাটা বাড়িয়ে আমার কানের কাছে মুখ এনে বলে, চিনি, সারাদিন ঘুমায়। আমি চোখ বড় বড় করে লুলুর দিকে তাকালে ও বলে, প্রমাণ চাও? সাথে সাথেই লুলু কোমর থেকে রেডিও খুলে জাহিদের কল সাইন ধরে ডাকাডাকি শুরু করে কিন্তু অপর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায় নি।

পরদিন রকিব মণ্ডলকে এ কথা জিজ্ঞেস করি, রকিব আর জাহিদ একই সাথে, আমাদের চেয়ে দুমাস আগে, কসোভোতে এসেছে জাতিসংঘে কাজ করতে। রকিব হাসতে হাসতে মরে যায়। আরে জাহিদ তো ওর রেডিওর প্যাকেটই খোলে নি। খাটের নিচে রেখে দিয়েছে।

আমরা ভিটিনায় পৌঁছানোর প্রায় বিশ ঘণ্টা পর তিনি আমাদের খোঁজ নিতে আসেন। অথচ তার বাসা থেকে আমাদের বাসা ৫ মিনিটের হাঁটাপথ। জাহিদ হায়দারকে পেয়ে আমার খুব মজার সময় কাটতে লাগল। পরদিন তার বাসায় অনেক রাত অব্দি আড্ডা দিই। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত কে কেমন কবিতা লিখেছে এইসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি। তিনি তার সদ্য লেখা কবিতাগুলো পড়ে শোনান। আমার সাথে কবিতার খাতাটি ছিল না বলে বেশ দুঃখ পেয়েছিলাম। কবিতা ছাড়াও আমরা নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, কসোভোর আলবেনিয়ানদের আমেরিকা-প্রেম, উদ্ভিন্ন যৌবনা নারীদের রূপ-যৌবন কোনো কিছুই বাদ যায় নি।

জাহিদ হায়দার মিতব্যয়ী, সৎ এবং নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন মানুষ। অপ্রয়োজনে একটি পয়সাও যেমন ব্যয় করেন না আবার প্রয়োজনের সময় ব্যয় করতেও কার্পণ্য করেন না। একবার আমরা সবাই মিলে গেলাম আলবেনিয়ার সীমান্ত এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে। পাহাড় থেকে নেমে আসা খরস্রোতা নদীতে জালের বাঁধ দিয়ে ওরা ট্রাউট মাছের চাষ করে। সেই জ্যান্ত মাছ ধরে সাথে সাথে গ্রিল করে লেটুশ, পেপারোনি, টমেটো, পিয়াজ দিয়ে পরিবেশন করে। অসাধারণ স্বাদ। একদিকে উঁচু পাহাড়, অন্যদিকে কল কল করে ছুটে চলা পাহাড়ি নদী। যত দূর চোখ যায় শুধু পাহাড়ের সবুজ ঢেউ আর নীল আকাশ। পরিবেশের কারণেই খাবারের স্বাদ এবং দাম দুটোই বেশি। আমাদের মধ্যে একজন ছিলেন হাড়কিপটে খুরশিদ আনওয়ার। তিনি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা, বলেন, আমি মাছ খাই না। আমরা বুঝতে পারি, দাম বেশি বলেই তার এই অনীহা। খুরশিদের এই কৃপণতা নিয়ে জাহিদ খুব দার্শনিক একটি ব্যাখ্যা দেন। আমরা পয়সা ব্যয় করে আনন্দ কিনছি, ও পয়সা বাঁচিয়ে ঠিক একই আনন্দ পাচ্ছে। ভাববেন না যে ও মাছ না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছে।

জাহিদ হায়দারসহ অন্য সকলেই ২০০০ সালের শেষের দিকে ঢাকায় ফিরে আসে। কিন্তু জাতিসংঘ আমাকে রেখে দেয়। আমি দেশে ফিরি ২০০৩ এর এপ্রিলে।

ভালো কথা, জাহিদ হায়দার কিন্তু একজন হস্তরেখাবিদ। আমার হাত দেখে তিনি যা যা বলেছেন প্রায় সব ঠিক হয়েছে। প্রথম সপ্তাহেই তিনি আমার হাত দেখে বলেন, আপনার তো সারা জীবন বিদেশে বিদেশেই কাটাতে হবে।

আমি দেখেছি মানুষকে সাহায্য করার জন্য সব সময় জাহিদ হায়দারের হাত বাড়ানোই আছে। আমাকে বলেন, আপনি প্রিস্টিনায় গিয়ে ওয়াহাব ভাইয়ের সাথে দেখা করেন। তিনি বড় পদে আছেন, আপনার লাইনের লোক। আমি দেখা করি। এবং এর কিছুদিন পর এক দুপুরে জাহিদ হায়দার আমাকে মিটিং থেকে টেনে বের করে বলেন, আপনার ভালো খবর আছে, ওয়াহাব ভাই আপনাকে দেখা করতে বলেছেন। আমরা সবাই কসোভোর ভোটার অ্যান্ড সিভিল রেজিস্ট্রেশনের কাজ করতাম। অক্টোবরে কাজ শেষ। সবাই দেশে ফিরে যায় কিন্তু আমি কাজ পেয়ে যাই মিশন সদর দফতরের প্রশাসন বিভাগে।

ঢাকায় ফিরে এলে জাহিদ হায়দারের সাথে আমার বন্ধুত্ব আরো সঘন হয়। সপ্তাহে একদিন তো আমাদের দেখা হতোই। কোনো সাহিত্য-আড্ডায় গেলে আমাকে নিয়ে যেতেন। রাইটার্স ক্লাবের এমন এক আড্ডায় পরিচয় হয় কবি মাহবুব হাসানের সাথে। হঠাৎ একদিন তিনি আমাকে বলেন, আমি সারাজীবন আপনার সাথে বন্ধুত্বটা রাখব। তখন আমাদের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, এর মধ্যে এই কথা বলার কারণ কী? তিনি বলেন, আমি জানি আপনার বাসায় সব সময় দামি দামি মদের মজুত থাকবে। আমি হো হো করে হাসি।

২০০৭-এ স্কলার্স পাবলিশার্স আমার ‘সৃষ্টিপুরাণ ও অন্যান্য লোককথা’ বইটি বের করে। এনআরবি কনফারেন্সের অংশ হিসেবে বইটির ওপর এক আলোচনা অনুষ্ঠান হয় শেরাটনে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি আসাদ চৌধুরী, আলোচনা করেন শামসুজ্জামান খানসহ অনেকে। সেই অনুষ্ঠানে জাহিদ হায়দারও ছিলেন, তিনিও আলোচনা করেন। তিনি আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, আমার বউ আমার চেয়ে জহিরকে বেশি পছন্দ করে। সে আমাকে বলে, তুমি জহির ভাইয়ের মত গদ্য লিখতে পারো না।

এরপর জাহিদ বলেন, কাল রাতে, আমার ছোট ছেলে যীশ্নুর ঘরে বাতি জ্বলছে। রাত তখন বারোটা। আমি বলি যীশ্নু ঘুমাচ্ছো না বাবা? ও বলে, এই তো ঘুমাচ্ছি। এর পর দেখি রাত দুটোর সময় বাতি জ্বলে, আমি বলি, এখনো ঘুমাও নি? ও বলে, এই তো ঘুমাচ্ছি বাবা। এরপর তিনটার সময় বাতি জ্বলে। আমি তখন কিছুটা কৌতূহলী হই। এত রাত অব্দি জেগে কী করছে আমার ছেলে। গিয়ে দেখি সে একটি বই পড়ছে। বইয়ের নাম ‘সৃষ্টিপুরাণ ও অন্যান্য লোককথা’। আমাকে ওর ঘরে ঢুকতে দেখে যীশ্নু খাটের ওপর উঠে বসে। এরপর বইটি দেখিয়ে বলে, বাবা শেষ না করে ঘুমুতে পারছি না।

২০০৯-এ প্রেসক্লাবে আমার তিনটি বইয়ের ওপর আলোচনা হয়। সেখানেও জাহিদ হায়দার। আমার সম্পর্কে মজার মজার গল্প বলে মানুষকে হাসান। অনুষ্ঠানের আগে কেউ একজন বলছিল, উনি এতগুলো বই লিখেছেন, অথচ উনার নামও শুনি নি। ওই লোককে তখন কিছু না বললেও, জাহিদ হায়দার মূল আলোচনায় এর জবাব দিয়েছিলেন। আপনারা অনেকেই কাজী জহিরুল ইসলামের নাম শোনেন নি। কারণ আপনারা পড়ালেখা করেন না। জহির নিয়মিত একটি পত্রিকায় লেখেন, যার নাম প্রথম আলো। আপনি যদি পত্রিকা না পড়েন চিনবেন কী করে?

জাহিদ হায়দার
২০০০ সালের জুন মাস। কসোভো। বাঁ থেকে কাজী জহিরুল ইসলাম, জাহিদ হায়দার এবং খুরশিদ আনওয়ার।

কসোভোতে যখন ছিলাম, একদিন আমার ওপর জাহিদ হায়দার খুব রাগ করেন। বটল ওপেনার খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তিনি দরোজার হুক দিয়ে বিয়ারের বোতল খুলবেন এবং ঘটনাটি আমার শোবার ঘরে। পিঠের ব্যথার জন্য আমি তখন মাটিতে, শক্ত বিছানায়, ঘুমাতাম। আমি তাকে বলি, বোতল ভেঙে ঘর নোংরা হবে, আমার বিছানা ভিজে যাবে, আমাকে দিন, আমি খুলে দেই। তিনি কিছুতেই হার মানবেন না। এবং শেষমেশ তাই হল, বোতল ভেঙে পুরো ঘর নোংরা হল। আমি এতে কিছুটা রেগে যাই। তিনিও রেগেমেগে আমার বাসা থেকে চলে যান। আমি ঘর সাফ করে তার বাসায় যাই। গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করি। তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন।

ভাবির নাম যুথি। যুথি ভাবি জাহিদ ভাইয়ের চেয়ে অনেক বেশি ভালো। চমৎকার রান্না করেন। বেশ অনেকবার ভাবির হাতের রান্না খেয়েছি সিদ্ধেশ্বরীর বাসায়। খাওয়ার সময় পরম মমতায় পাশে বসে বেড়ে বেড়ে খাওয়ান।

আপনারা অনেকেই জানেন জাহিদ হায়দারদের পরিবারের অনেকেই লেখক। জিয়া হায়দার, রশিদ হায়দার, মাকিদ হায়দার, দাউদ হায়দার, জাহিদ হায়দার এরা সবাই সহোদর এবং সবাই ভালো লেখক/কবি। ভাইদের মধ্যে এত চমৎকার মিল আমি খুব কম পরিবারেই দেখেছি। তারা সবাই একে অন্যের বন্ধু, সকল বিষয়ে খোলামেলা আলাপ-আলোচনা করেন এবং ছোটরা বড়দের অসম্ভব শ্রদ্ধা করেন। তারা সব ভাই একসাথে বসে মদ্যপান করেন, নিজেদের বান্ধবী (যাদের আছে) বিষয়ে কথা বলেন। জাহিদ হায়দারকে দেখেছি, ছেলেদের সাথেও তিনি একইরকম বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করেছেন।

২০১৭-র গ্রীষ্মে কোথাও যাওয়ার জন্য ফোন দেই জাহিদ হায়দারকে। বলেন, রশিদ ভাই একটি গল্প লিখেছে এটি তার বাসা থেকে নিয়ে কোনো এক পত্রিকায় পৌঁছে দিতে হবে। কথাটি শুনে আমার যে কী ভালো লেগেছে, ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করছেন ষাটোর্ধ্ব এক তরুণ।

জাহিদ হায়দার
২০০৯ সালে ঢাকার প্রেসক্লাবে মুক্তি জহির, কাজী জহিরুল ইসলাম, মারুফ রায়হান ও জাহিদ হায়দার

জাহিদ হায়দার এখন সারা শহর ঘুরে বেড়ান সাইকেলে চড়ে। পরিবেশ বান্ধব, সাশ্রয়ী এবং দ্রুত পৌঁছে যাওয়া যায়। ঢাকা শহরের আজকের পরিস্থিতি বিবেচনা করে নির্দ্ধিধায় বলা যায় জাহিদ হায়দারের সাইকেলে চলাফেরার সিদ্ধান্ত খুবই উপযুক্ত এবং দূরদর্শী।

অন্য অনেক লেখকের মতোই জাহিদ হায়দারও অতিমাত্রায় সংবেদনশীল। নিজের লেখার সমালোচনা সহ্য করতে পারেন কম।

আমি তার কবিতা নিয়ে লিখেছিলাম। শুধু একটি সমালোচনা ছিল, তার কবিতা রসহীন। এতেই তিনি ক্ষেপে যান। অবশ্য এর পরে তিনি ২/৩ টি কবিতা লিখে আমাকে ইমেইলে পাঠান। এবং জানতে চান এগুলো কেমন লাগছে। অবশ্য টেলিফোনে এবং ইমেইলে তিনি একাধিকবার বলেছেন এই সমালোচনাটি তার খুব কাজে লেগেছে।

তিনি একজন সৎ মানুষ। আমি বিশ্বাস করি তিনি যা বলেছেন, তা মন থেকেই বলেছেন। আমাদের বন্ধুত্ব কিন্তু এখনো অটুট আছে। এ বছর আমার পঞ্চাশ পূর্তিতে যে ‘অর্ধশতকের উপাখ্যান’ বেরুলো, সেই ৪শ পৃষ্ঠার গ্রন্থে মাত্র একটি কবিতা ছাপা হয়েছে। কবিতাটি লিখেছেন কবি জাহিদ হায়দার। সেই কবিতাটি এখানে তুলে দিয়েই লেখাটি শেষ করছি।

***

আমার নামে একটি ফাইল খোলা হয়েছে
জাহিদ হায়দার

(বন্ধুবর কবি কাজী জহিরুল ইসলামের জন্য)

মানুষটা মধ্যরাতে বারান্দায় ব’সে
নক্ষত্রের সমাজ নামে একটি বই পড়ে।
মধ্যদিনে তার বউয়ের মুখ জানলায় কেউ যদি দেখে,
বলে: ‘দেখেছি চাঁদ।’ বিয়ের দশ বছর আগে দুজন
দুজনকে দিয়েছিল ফুল। তার দুই সন্তান দেবশিশুর মতো।
বাড়ি চিত্রা নদীতীরে। উচ্চবিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ায়।
ঢেউ তোলা চুল। দাড়ি নেই। শাদাকালো গোঁফ। অধূমপায়ী।
উচ্চতা পাঁচ ফিট আট ইঞ্চি হবে। জিন্স পছন্দ।
পকেটে চিরুনি রাখে না। কখনো কখনো দারুচিনি খায়।
কোনো কোনো রাতে কারওয়ান বাজারে শব্জির আড়ত দ্যাখে।
মনে হয় না পছন্দ করে চাঁদ। পূর্ণিমা ছিল। তাকায় নি।
একদিন দেখা গেছে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ধরছে।
চোখে-মুখে তখন ছিল আনন্দের ধারা।
পতন ধরার ভেতর কী খোঁজে?
লোকটি মাঝে মাঝে সব ধর্মগৃহে যায়।
তবে নামাজ, গীতা বা বাইবেল পড়ার সময় নয়।
প্যাগোডায়ও দেখা গ্যাছে। এই দেশে সিনাগগ থাকলে
মনে হয় সেখানেও যেত। নামে তো বলে মুসলমান।
মেয়ে মানুষের প্রতি বসন্তের টান আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না।
একদিন পার্কে একটি নারীর সাথে দু’মিনিট কথা বলেছিল।
ওই নারীকে পরে জিজ্ঞেস করা হলে জানা যায়,
লোকটি তার কাছে জানতে চেয়েছিল,
গোলাপ ঝরে পড়ার সময় যে-শব্দ হয়
তা কখনো শুনেছে কি না।
দু’দিন আগে ফুটপাতে একটি ক্ষুধার্ত শিশুর কাছে
নতজানু হয়ে ক্ষমা চেয়েছে।
কোন রাজনীতি করে বোঝা যাচ্ছে না।
একদিন হাতে ছিল চে গুয়েভারার ডায়েরী।
একদিন ত্রিপিটক। অন্যদিন ‘বিশ্বনবী’।
মানুষটা খাঁচার মুখ খুলে দ্যায়। ওড়ায় পাখি।
আকাশে ডানার ঢেউ দেখে প্রসন্ন হাসে।

আরও কিছু রাষ্ট্রবিরোধী প্রবণতা দেখা দিলেই
গ্রেফতার করা হবে।

#

হলিস উড, নিউ ইয়র্ক, ৮ মার্চ ২০১৮

তেঁতুলের ইংরেজি শব্দ ‘Tamarind’ এসেছে আরবি শব্দ  “Tomur Hindi” থেকে, যার অর্থ ইন্ডিয়ান ডেটস বা ইন্ডিয়ান খেজুর।

এটা আফ্রিকার স্থানীয় গাছ—প্রচুর পরিমাণে সুদান, সাউথ সুদান, ক্যামেরুন, নাইজেরিয়া এবং তানজানিয়াতে জন্মাত। পরে আরব বিজনেসম্যানরা তা এশিয়াতে নিয়ে আসে। এখন ইন্ডিয়াতে প্রচুর পরিমাণে চাষ হয় এবং সেখান থেকে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।

তেঁতুলের শরবত যে শুধু স্বাদের জন্য খাওয়া যায় তা না, এর বেশ কিছু স্বাস্থ্যগত উপকারি দিকও আছে।

এতে আছে প্রচুর পরিমাণে টারটারিক অ্যাসিড, ভিটামিন সি, সুগার, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম এবং আয়রন। তেঁতুল শরীরের প্রদাহ কমায়, হজমে সাহায্য করে, ওজন কমাতে সাহায্য করে, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য সারিয়ে তোলে। ফলে নিয়মিত তেঁতুল খাওয়ার মাধ্যমে আপনি এই ধরনের শারীরিক অসুবিধা খুব সহজে এড়িয়ে চলতে পারেন।

তেঁতুলের শরবত যেভাবে বানাবেন

উপকরণ: খোসা এবং বীজ ফেলে দেওয়া তেঁতুল (প্রয়োজন মতো), পানি (প্রয়োজন মতো), লবণ, চিনি (প্রয়োজন মতো, তবে যতটা কম ব্যবহার করা যায়)

তেঁতুল এর শরবত অনেক ভাবেই বানাতে পারেন, পানিতে তেঁতুল সিদ্ধ করে, দীর্ঘসময় পানিতে ভিজিয়ে রেখে, অথবা ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে।

তেঁতুল সিদ্ধ করে বানাতে চাইলে, পাত্রে গরম পানি করুন। পানি ফুটলে তাতে খোসা ছাড়ানো তেঁতুল দিয়ে দিন এবং কয়েক মিনিট সিদ্ধ করুন। তারপর নামিয়ে ঠাণ্ডা হতে দিন। চাইলে পাত্রে পানিতে থাকা তেঁতুল কিছুটা কচলে নিতে পারেন। তারপর তাতে স্বাদমতো লবণ এবং চিনি যোগ করুন। তেঁতুলের শরবত রেডি।

পানিয়ে ভিজিয়ে রাখা পদ্ধতির ক্ষেত্রে পরিমাণ মতো তেঁতুল নিয়ে ভালো পানিতে অন্তত কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন। চাইলে আগের রাত্রেও ভিজিয়ে রাখতে পারেন। এইবার রসটুকু নিয়ে তাতে লবণ এবং চিনি যোগ করে আপনার তেঁতুলের শরবত পরিবেশন করুন।

শরবত বানানোর সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হচ্ছে ব্লেন্ড করে বানানো। তেঁতুলের ক্ষেত্রে পরিমাণ মতো পানি, তেঁতুল, চিনি, লবণ সব কিছু দিয়ে ফুল স্পিডে কিছুক্ষণ ব্লেন্ড করুন। তারপর পাত্রে ঢেলে পরিবেশন করুন, স্বাস্থ্যকর তেঁতুলের শরবত। চাইলে বরফ মিশিয়ে নিতে পারেন।

এইবারের ব্যালন ডি’অর বিজয়ী ফুটবলার লুকা মদ্রিচ বলেছেন, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি ফুটবলে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় এবং তাদের স্থান অন্য লেভেলে।

ফুটবলের সম্মানজনক পুরস্কার ব্যালন ডি’অর এর গত ১০ বছরের রেকর্ড ভেঙে এবার পুরস্কার জিতেছেন লুকা মদ্রিচ। গত ১০ বছরে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লিওনেল মেসি দুজনে ৫ বার করে এই পুরস্কার জিতেছেন। ১০ বছরে কেউ তাদের পুরস্কারে ভাগ বসাতে পারে নি।

এবার সেই ধারাবাহিকতা শেষ হল লুকা মদ্রিচের ব্যালন ডি’অর জয়ের মাধ্যমে। লুকা মদ্রিচ ক্রোয়েশিয়া জাতীয় দল ও রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাবের হয়ে মিডফিল্ডার পজিশনে খেলেন। নিজের দেশ ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে নিয়ে যাওয়ায় ও ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি জেতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় মদ্রিচকে এই পুরস্কার দেওয়া হল।

মদ্রিচ
ফুটবলের সম্মানজনক পুরস্কার ব্যালন ডি’অর এর গত ১০ বছরের রেকর্ড ভেঙে এবার পুরস্কার জিতেছেন লুকা মদ্রিচ।

এবার ব্যালন ডি’অর পুরস্কারের তালিকায় মদ্রিচের পরে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন ফ্রান্সের আতোয়ান গ্রিজম্যান। আর লিওনেল মেসির অবস্থান ৫ নাম্বারে।

ব্যালন ডি’অর ছাড়াও মদ্রিচ বিশ্বকাপ ফুটবলের প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট ও ফিফা’র সেরা পুরুষ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছেন এই বছর।

ব্যালন ডি’অর জেতার পরে একটি সাক্ষাৎকারে মদ্রিচ মেসি ও রোনালদোকে নিয়ে তার মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন।

মদ্রিচ বলেন, ইতিহাসে কেউ তাদের সাথে তুলনীয় হতে পারে না। এই খেলায় তারা সবার সেরা, তারা অন্য লেভেলের। তারা এখনো তাদের খেলা শেষ করে নি। আমার ব্যালন ডি’অর-কে সব সময় চিহ্নিত করা হবে তাদের পরে জেতা পুরস্কার হিসাবে। আমি ছোট্ট ক্রোয়েশিয়ার একজন খেলোয়াড় মাত্র।

মদ্রিচ
ফ্রান্সের বিরুদ্ধে খেলে ক্রোয়াশিয়াকে ফাইনালে নিয়ে আসেন মদ্রিচ।

মদ্রিচ এই সাক্ষাৎকারে ফ্রান্সের সাবেক গ্রেট খেলোয়াড় ও রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক কোচ জিনেদিন জিদানের কথাও বলেছেন। মদ্রিচ জানিয়েছেন যে জিদান তাকে বলেছিলেন সে এই বছর গোল্ডেন বল জিতবে।

মদ্রিচের কথায়, আমার নিজেকে দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসাবে মনে করার প্রয়োজন ছিল, তার সাথে আমরা আসলেই ভালো ফুটবল খেলেছি। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে একদিন আমি গোল্ডেন বল জিতব। জিদানের গল্প এটাই বলে যে, তিনি আপনাকে আত্মবিশ্বাস দেন। আমি তার প্রশংসা করি এবং একজন খেলোয়াড় হিসাবে তাকে সম্মান করেছি।

মানুষের কিভাবে ঘুমানো উচিৎ? প্রতিরাতে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ৮ ঘণ্টা? নাকি এই ৮ ঘণ্টা সময়কে ভাগ করা উচিৎ দুইভাগে? অথবা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৬ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমালেই চলবে?

আমরা জানি মানুষের ঘুমের অভ্যাস গত কয়েক হাজার বছর ধরে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি না কিভাবে এই পরিবর্তন মানব চৈতন্য, সমাজ এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত। আমাদের এটাও জানা নেই এই পরিবর্তনগুলো মানুষের বিশ্রামের ‘ন্যাচারাল মুড’ বা ‘স্বাভাবিক ধরন’ বিষয়ে কি ঈঙ্গিত করে।

সঠিকভাবে ঘুমের আয়োজন করা ও উপভোগ করার পদ্ধতি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক চলছেই। এক্ষেত্রে দুইটি প্রধান চিন্তাধারা বিতর্কটির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে। প্রথম চিন্তাধারার সমর্থনকারী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘স্বাভাবিক’ বিশ্রাম সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণাটি, অর্থাৎ রাত থেকে ভোর পর্যন্ত একটানা ঘুমের ধারণাটি আসলে আধুনিকতার একটা বাইপ্রোডাক্ট এবং মানুষের বিবর্তনের রাস্তায় নেয়া একটি ভুল মোড়।

অন্য মতের সমর্থকরা বলেন, আমরা পূর্বপুরুষদের ঘুম নিয়ে জল্পনাকল্পনা করা বন্ধ রাখি। কারণ এটা স্পষ্ট নয় যে উজ্জ্বল আলো ও ‘বিগ টেক’ বা বৃহৎ প্রযুক্তিগুলো থেকে দূরে থাকলেই আমরা ‘বাইফেসিক স্লিপ’ বা দিনে দুইবার ঘুমানোর অভ্যাস পুনরুদ্ধার করতে পারব কি না।

গবেষকরা নিজেদের অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন রকমের প্রমাণ ব্যবহার করেন। বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ঘুমের মধ্যে পার্থক্যগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। বিশেষ করে গ্রেট এপস (আকা হমিনিডস) হিসেবে শ্রেণীভুক্ত ছয়টি প্রজাতির সাথে মানুষের ঘুমের পার্থক্যের উপরে তাঁরা বেশি জোর দেন।

অন্যান্য গবেষকেরা সমকালীন শিকারী-সংগ্রহকারী (হান্টার-গেদারার) গোত্রগুলোর ঘুমের ধরণকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। আবার অন্য একদল গবেষক মানুষের ঘুমের ঐতিহাসিক দলিল নিয়ে ঘাটাঘাটি করেন। তাঁদের লক্ষ্য হলো কিভাবে সামাজিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন মানুষের বিশ্রামের সময়কে প্রভাবিত করেছে তা খুঁজে বের করা। স্বাভাবিকভাবেই, একেক গবেষণা পদ্ধতির ফলাফল হয়েছে একেক রকম।

প্রতিটি পক্ষেরই বিশ্বাসযোগ্য প্রবক্তা এবং শক্তপোক্ত প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু কারোর কাছেই একদম শতভাগ নিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ডিউক ইউনিভার্সিটির একদল এনথ্রোপোলজিস্ট এবং সাইকিয়াট্রিস্ট এই বিতর্কের সারমর্ম তুলে ধরেন। এতে ঘুমের বিবর্তন সম্পর্কিত সব মতবাদই উঠে এসেছে।

প্রায় দুই মিলিয়িন বছর আগে হোমো ইরেকটাস গোত্রটি শারীরিকভাবে এতটাই বেড়ে ওঠে যে এদের পক্ষে গাছের উপর ঘুমানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে এরা মাটিতে ঘুমানো শুরু করে। গাছের ডাল থেকে মাটিতে নেমে আসার এই পরিবর্তনকে মানুষের চেতনা ও সামাজিক উন্নয়নের একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিচেবচনা করা হয়। ডিউক প্রতিবেদনের সহ-রচয়িতা চার্লস নান, ডেভিড স্যামসন এবং এনড্রু ক্রিস্টাল এই বিষয়ে লিখেন, “গাছের উপর ঘুমানোর অসুবিধাগুলো থেকে মুক্ত হওয়ার ফলে তারা আরো দীর্ঘমেয়াদী ও উচ্চমানের ঘুম অর্জন করলো, যা হয়ত তাঁদের জাগ্রত চৈতন্যকে উন্নত করবে”।

মানুষের সাথে অন্যান্য গ্রেট এপসদের ঘুমের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে। ইভল্যুশনারি এনথ্রোপোলোজির দাবী অনুযায়ী, এই প্রজাতিটি মানুষের সবচেয়ে নিকটবর্তী পূর্বপুরুষ যারা ১৪ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে বিচরন করত। তো, এদের সাথে মানুষের ঘুমের মিলের ব্যাপারে একটি উদারহরণ দেয়া যাক। পৃথিবীতে মানুষেরাই একমাত্র প্রাণী যারা ঘুমানোর সময় মাথার নিচে বালিশ দেয়। কিন্তু আমরাই একমাত্র প্রজাতি নই যারা ঘুমানোর জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করি। গ্রেট এপস প্রজাতির সবগুলো প্রাণীই ঘুমানোর জন্য উপযুক্ত জায়গা বাছাই করে নিত এবং প্ল্যাটফর্মের মত কিছু একটা তৈরি করত ঘুমানোর জন্য। এই অভ্যাসটি সম্ভব্ত চৌদ্দ থেকে আঠারো মিলিয়ন বছর আগেই শুরু হয়েছিল।

কিন্তু কিছু দিক দিয়ে মানুষের ঘুম অন্যান্য প্রাণীদের থেকে স্বতন্ত্র। সব মানুষই ভূমিতে ঘুমায়। কিন্তু অন্যান্য গ্রেট এপসদের মধ্যে পুরুষেরা তখনই ঘুমানোর জন্যে মাটিতে নামে যখন অন্যের শিকারে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

স্লিপ আর্কিটেকচারের অনুযায়ীও মানুষের ঘুম অন্যদের তুলনায় বিশিষ্ট। স্লিপ আর্কিটেকচার বলতে বুঝায় ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ের গঠন ও বিন্যাস। অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের তুলনায় মানুষ অনেক কম সময় ঘুমায়। তাদের বিশ্রামের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে থাকে রেম (REM: রেপিড আই মুভমেন্ট)। রেম হলো ঘুমের একটা নির্দিষ্ট পর্যায় যখন মানুষ স্বপ্নের সবচেয়ে স্পষ্ট অংশটুকু দেখতে পায়।

সকল গ্রেট এপসদের ঘুমের ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিবর্তন এসেছে মানুষের ঘুমেই। আমরা এটা জানি কারণ বিজ্ঞানীরা একটা গোত্রের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে তুলনা করে দেখাতে পারেন যে এদের মধ্যে কোনো একটি প্রজাতি অন্যান্যগুলোর চাইতে বিশেষভাবে বিবর্তিত হয়েছে কি না। উদাহরণস্বরূপ, মানুষেরা গ্রেট এপস গোত্রের প্রাণী। আবার অন্যান গ্রেট এপসদের তুলনায় মানুষের ঘুমের বিবর্তন ঘটেছে অনেক বেশি। বিবর্তনের উপর ভিত্তি করে তাই মানুষের ঘুম নিয়ে সঠিক ভবিষ্যতবাণী করা যায় না।

অন্যভাবে বলা যায়, গত কয়েক শত বছর ধরে শিম্পাঞ্জিদের ঘুমের ক্ষেত্রে যেসব পরিবর্তন এসেছে তার উপর ভিত্তি করে কি আমরা মানুষের ঘুমকে যাচাই করতে পারি? অবশ্যই পারি না। তার কারণ মানুষের ঘুমের বিবর্তন ঘটেছে অনেক বেশি স্বতন্ত্রভাবে, যা অন্যদের সাথে খাপ খায় না।

আমরা জানি শারীরিক আকৃতি, সামাজিক কাঠামো, জীবনধারণের পরিবেশ এবং অন্যান্য আচরণ ও বৈশিষ্ট্যের সাথে সাথে মানুষের ঘুমেরও বিবর্তন ঘটেছে ব্যাপকভাবে। এখন আমরা বড় একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। মানুষের ঘুম কি এতটা বিবর্তিত হওয়ার কথা ছিল? আমরা কি ইতিহাসের এমন একটি পর্যায়কে চিহ্নিত করতে পারি যখন মানুষেরা সেভাবেই ঘুমিয়েছে যেভাবে আমাদের আসলেই ঘুমানো ‘উচিৎ’?

ইতিহাসবিদ ই. রজার এরিক ২০০৫ সালে এই বিষয়ে একটি থিয়োরি প্রদান করেন। তাঁর মতে, বাইফেসিক অথবা দিনে দুইটি পর্যায়ে বিভক্ত ঘুমই ‘ন্যাচারাল’। কৃত্রিম আলো মানুষের বাইফেসিক ঘুমের অভ্যাসকে নষ্ট করেছে। মানব সভ্যতার কোনো একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে আমাদের পূর্বপুরুষেরা বাইফেসিক ঘুমের নিয়ম মেনে চলতেন। তাঁরা রাত নটা’র দিকে ঘুমাতে যেতেন আর মাঝরাতের দিকে উঠে পড়তেন। কয়েকঘণ্টা এই কাজ সেই কাজ করে আবার দ্বিতীয়বার ঘুমাতে যেতেন। বাইফেসিক ঘুম বিলুপ্ত হয় শিল্প বিপ্লবের সময়ে, যখন কৃত্রিম আলো সস্তা ও সহজলভ্য হয়ে ওঠে।

বাইফেসিক ঘুম কিভাবে বিলুপ্ত হলো সে বিষয়ে আমরা ইতিহাস থেকে স্পষ্ট ধারণা পাই। কিন্তু কিভাবে এটির উৎপত্তি হলো তা এখনো স্পষ্ট নয়। এটা নিশ্চিত যে মেশিন টুলস এর আবির্ভাবের আগে দুইটি পর্যায়ে বিভক্ত ঘুমের প্রচলন ছিল। কিন্তু এর আগে কি ছিল? এমনটা মনে করার মত যথেষ্ট কারণ কি আমাদের রয়েছে যে প্রাচীন যুগে মানুষের ঘুম দিনে একাধিক পর্যায়ে বিভক্ত ছিল? বিববর্তনবাদী বৈজ্ঞানিকেরা এই বিষয়ে এখনো ততটা নিশ্চিত নন।

এক্ষেত্রে আরো একটি তত্ত্বের উল্লেখ করা যেতে পারে যা বিবর্তনবাদীদের চোখে বেশি সমর্থনযোগ্য এবং যা প্রাচীন ও আধুনিক সমাজের মধ্যে তুলনার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক আলো আবিষ্কৃত হওয়ার আগেও মানুষ প্রতি রাতে একটানা প্রায় ৭ ঘণ্টা ঘুমাতো, ঠিক যেমন এখনকার দিনের মানুষেরা ঘুমায়। কয়েকবছর আগে প্রকাশিত ইউ সি এল এ গবেষণায় উঠে এসেছে এই তত্ত্বটি।

সাইকিয়াট্রিস্ট ও ঘুম বিশেষজ্ঞ জেরোমি সিয়েগেল এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় আধুনিক যুগের তিনটি শিকারী-সংগ্রহকারী (হান্টার-গেদারার) গোত্রের মানুষের মধ্যে তুলনা করা হয়েছে যারা ‘টেক-ফ্রি’ বা ‘শিল্প-বিযুক্ত’ জীবন কাটাতো যা প্রাক শিল্পায়ন যুগের মানুষদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। গবেষোণায় উঠে এসেছে যে, তিনটি গোত্রের মানুষেরা আজকের দিনের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের মতই প্রতি রাতে প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমাতো।

আমরা যদি এই তত্ত্ব গ্রহণ করি, তাহলে প্রাক শিল্পায়ন যুগের বাইফেসিক ঘুমের বাতিক সম্পর্কে আমরা কি বলব? দুটি পর্যায়ে বিভক্ত ঘুম সম্ভবত এসেছে বিষুবীয় অঞ্চল থেকে মানুষের অভিপ্রয়াণের ফলে। কারণ এই অভিপ্রয়াণের ফলে মানুষ পৃথিবীর এমন প্রান্তে এসে হাজির হয় যেখানে দিনের চাইতে রাত দীর্ঘতর। এই বিষয়ে ২০১৫ সালে সিয়েগেল দ্য আটলান্টিক কে বলেন, “রাত দীর্ঘ হওয়ার ফলেই ঘুমের এই বিশেষ ধরণ তৈরি হয়েছিল। আবার বৈদ্যুতিক বাতির আবির্ভাবের ফলে মানুষ প্রাচীন অভ্যাস পুনরুদ্ধার করে নিয়েছে”।

এই তত্ত্বের সমর্থনে আরো কিছু যুক্তি হাজির করা যাক। ডিউক টিম “স্লিপ ইনটেনসিটি হাইপোথিসিস” এর কথা বলে, যেখানে দাবী করা হয় যে প্রাচীন মানুষেরা যখন ঘুমানোর জন্য ভূমিকে বেছে নেয় তখন তাঁদের ঘুমের পরিমাণ কমে যায়।

ভূমিতে বসবাস করার ফলে মানুষ নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, যেমন নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা, শিকারী পশুদের সাথে মোকাবিলা ইত্যাদি। এরফলে তাঁদের বেশিক্ষণ জেগে থাকার এবং উন্নত মস্তিষ্কের প্রয়োজন পড়ে এবং গভীর ঘুম তাঁদের সামাজিক ও চৈতন্যগত উন্নয়নকে অব্যাহত রাখে। তাই তাঁরা পূর্বপুরুষদের সাত ঘণ্টার “মনোফেসিক স্লিপ” বা নিরবিচ্ছিন্ন ঘুমকে বিবর্তনের একটি অত্যাবশ্যকীয় ধাপ হিসেবে বিবেচনা করে।

যাহোক, যেসব গবেষকেরা মনে করেন যে আধুনিক যুগের মনোফেসিক ঘুমের পিছনে কোনো যুক্তি সঙ্গত ব্যাখ্যা রয়েছে, তাঁরা হয়ত এই ধারণাকে বাতিল করে দিবেন যে কৃত্রিম আলো আমাদের স্বাভাবিক ঘুমের অভ্যাসকে ব্যাহত করেছে। কিন্তু তাঁরা ঠিকই লক্ষ্য করছেন কিভাবে প্রযুক্তিগত ও সামাজিক উন্নয়ন আমাদের ঘুমের উপর প্রভাব বিস্তার করছে। ডিউক প্রতিবেদনে গবেষকেরা তিনটি পূর্বানুমান উপস্থাপন করেছিলেন। এর মধ্যে দ্বিতীয়টি ছিল, উন্নত বিশ্বে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার বৃদ্ধি, পৃথক বেডরুমের প্রচলন এবং দিনের বেলা ঘুমের পরিমাণ কমে যাওয়াকে আমরা ঘুমের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটানোর জন্য দায়ী করতে পারি।

একটি মধ্যবর্তী অবস্থান অবশ্য রয়েছে যা বিভিন্ন সমাজ ও গোত্রের মানুষের ঘুমের ঐতিহাসিক দলিল ও সাম্প্রতিক ঘুমের নিদর্শনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই মতবাদ অনুযায়ী, ঘুমের ক্ষেত্রে মানুষ অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের চাইতে অনেক বেশি নমনীয় (ফ্লেক্সিবল)। একটু আগে উল্লেখ করা ইউ সি এল এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আধুনিক যুগের তিনটি শিকারী-সংগ্রহকারী সমাজের কথা। কিন্তু প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন সব সামাজিক গোত্রই এই সাত ঘণ্টা ঘুমের নিয়ম মেনে চলে না। যেমন, পিরাহা নামক উত্তর আমেরিকার শিকারী-সংগ্রহকারী গোত্র। এই গোত্রের মানুষেরা দিনে ও রাতে দুইবার ঘুমায় এবং তাঁদের দৈনন্দিন কাজ সাধারণত রাতেই করে থাকে। গবেষণায় আরো উঠে এসেছে যে, পেনসিলভানিয়া ওল্ডার অ্যামিশ গোত্রের লোকেদের অর্ধেকের বেশিই সপ্তাহে অন্তত একদিন দিনের বেলা ঘুমায়।

ত্যিকারের সফল হয় তারাই যারা সবকিছুকে জোরে একটা ঝাঁকি দিতে পারে।
বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কারেন আর্নল্ড বলেন, “আপসকারী আর সিস্টেমকে মেনে নেয়াদেরকেই কিন্তু আমরা সাফল্যের স্বীকৃতি দিচ্ছি।”
মানে, সেরা রেজাল্ট করা শিক্ষার্থীরা আসলে শিক্ষকরা কী চায় তা ধরে ফেলতে পেরেছিল এবং সেটাই তারা নিয়মিত পরীক্ষার খাতায় দিয়ে যাচ্ছিল। এ কারণেই তারা সফল হতে পেরেছিল।
কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তক ও নেতাদের বিশেষত্ব হলো তারা কিছু রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক সমস্যার অভূতপূর্ব সমাধান এনে দিয়েছিল। যে জিনিসটা অলরেডি ঠিকঠাকভাবে কাজ করছিল এমন কোনো কিছুকে পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে কেউ কখনই বিখ্যাত হতে পারবে না।
বার্কার বলেন, “স্কুলে নিয়মকানুন একদম নির্দিষ্ট করে দেয়া। কিন্তু বাস্তব জীবনে নিয়মকানুনের ঠিকঠিকানা থাকে না। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো বদ্ধ একটা সিস্টেম থেকে বের হওয়ার পর আসলে অল্পস্বল্প নিয়ম-না-মানারাই ভালো করতে পারে।”
২. জেনারেলিস্টরাই স্কুল কলেজে ভালো করে, কিন্তু বাস্তব জীবনে ভালো করে প্যাশনেট আর নির্দিষ্ট এক বিষয়ে দক্ষরা।
বার্কার বলেন, স্কুল বা কলেজে থাকাকালীন কেউ যদি ইতিহাস বিষয়ে খুব আগ্রহী হয়, তবু সে সবকিছু ছেড়ে কেবল ইউরোপিয়ান রেনেসাঁ নিয়ে পড়ে থাকতে পারবে না। আগ্রহ থাকুক বা না থাকুক, একসময় তাকে ম্যাথ হোমওয়ার্ক নিয়ে বসতে হবেই।
কিন্তু বাস্তব জীবনে তার উল্টোটা। আপনাকে কোনো এক নির্দিষ্ট বিষয় বা ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠতে হবে। এবং অন্যান্য জ্ঞান বা দক্ষতা তখন খুব একটা কাজে লাগে না।
এবং সবচেয়ে বড় চমকটা হলো: আর্নল্ড তার গবেষণায় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ইন্টেলেকচুয়াল শিক্ষার্থীরা, যারা কোনোকিছু শিখার ব্যাপারে সত্যিকারের আগ্রহী, স্কুল কলেজে ভালো করতে পারে না।
পুরো গবেষণাটি সামারাইজ করে বার্কার বলেন, “স্কুল কলেজের সেরা রেজাল্ট করা শিক্ষার্থীরা মূলত প্রচলিত সিস্টেমকে সাপোর্ট করে এমন সব কাজে ভালো করে। তারা প্রচলিত সিস্টেমেরই অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু তারা এই সিস্টেম ছুঁড়ে ফেলতে পারে না বা তাতে কোনো নতুন পরিবর্তন আনতে পারে না।”
তবে এর মানে এই নয় যে আপনি যদি স্কুল কলেজের সেরা রেজাল্টকারীদের একজন হয়ে থাকেন, আপনি কখনই বড় কোনো সাফল্য পাবেন না। আপনিও তেমন সফল হতেই পারেন।
কিন্তু সেক্ষেত্রে আপনাকে মাথায় রাখতে হবে যে প্রচলিত ও প্রত্যাশিত নিয়ম সবসময় মেনে চললে বাস্তব জীবনে সাফল্য পাওয়া যাবে না। ঝুঁকি নেয়া ও স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে যাওয়া কঠিন বটে, কিন্তু কেবল এভাবেই আপনি যেতে পারবেন বহুদূর।

অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পদ ও আয়ের ভারসাম্যহীনতার সমস্যা আমেরিকায় দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এই গবেষণাগুলির ফল হতে পারে আমেরিকার অর্থনৈতিক উন্নতি ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। অথচ অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার ব্যাপারে ফেডারেল সরকারের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। এছাড়াও, অনেক স্টেইট এর তা মোকাবেলা করার মতো অবস্থাও নেই।
কিছু গবেষণায় এও দেখা গেছে, সরকারের উপর প্রভাব সবচেয়ে বেশি আছে ধনীদেরই। অর্থাৎ, এই অসাম্য নিয়ে প্রভাব বিস্তারী কাজ করার ক্ষমতা আছে কেবল ধনীদেরই। অন্যদের পক্ষে তা অসম্ভব। আর অল্প সংখ্যক কিছু ধনী আমেরিকান সত্যিই সেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাদের সময় ও অর্থ দিয়ে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন অর্থনৈতিক এই বৈষম্য দূর করতে।

বাড়তে থাকা বৈষম্য

সর্বশেষ ২০১৩ সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ধনীরা (মোট জনগণের যারা মাত্র ১০%) পুরো দেশের ৭৬% সম্পদের মালিক। অর্থাৎ, প্রতি ১০ ডলারে ৭.৬০ ডলারেরই মালিক তারা এবং বাকি ৯০% জনগণের জন্য রয়েছে মাত্র ২.৪০ ডলার। এবং সম্পদের এই ভারসাম্যহীনতা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। অথচ ১৯৮৯ সালে ১০% ধনী ব্যক্তিদের কাছে ছিল দেশের ৬৭% সম্পদ।

তবে কিছু ধনী ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় নীতি ও কর্পরোরেশনগুলিকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে বাড়তে থাকা এই বৈষম্য মোকাবেলা করতে এগিয়ে আসা শুরু করেছেন। তেমনই একজন হলেন ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম ‘ব্ল্যাকরক’ এর সাবেক ম্যানেজিং ডিরেক্টর মরিস পার্ল। মরিস ‘ক্যারিড ইন্টারেস্ট’ নামক কর ফাঁকি দেয়ার একটি উপায় আইনি সহায়তায় বাতিল করেন। ‘ক্যারিড ইন্টারেস্ট’ এর মাধ্যমে অসংখ্য ফিনানশিয়াল ম্যানেজার তাদের করের পরিমাণ কমিয়ে ফেলত। আরেক উদাহরণ হলেন ‘চবানি ইয়োগার্ট’ এর প্রতিষ্ঠাতা হামদি উলুকায়া। তিনি তার কোম্পানিটি বিক্রি করে দেয়ার আগে সব এমপ্লয়িদেরকে কোম্পানিটির একটি ওউনারশিপ স্টেইক দিয়ে দেন। অথচ এটি না করলে তিনি একা অনেক লাভ করতে পারতেন।

আয়নায় তাকানো

এই অল্পসংখ্যক মানুষদের আরেক উদারণ টি. জে. জ্লোৎনিৎস্কি। সবার প্রথমে তিনি নিজে একটি টেক কোম্পানি গড়ে তুলে নিজেকে ধনীদের কাতারে তোলেন। এরপর তিনি দাবি তোলেন যেন কোম্পানিগুলি কর্মীদের বেতন বাড়ায় এবং সরকার যেন ধনীদের ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। জ্লোৎনিৎস্কি নিজে অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার চেষ্টায় থাকা ধনীদের একটি সংস্থা ‘পেট্রিওটিক মিলিওনেয়ার’ এর সদস্য। একটি ব্লগ পোস্টে তিনি বলেন:
“আমার পরিবার যে সমস্ত সুযোগ ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাদি পেয়েছে সেগুলি কেবল আমেরিকাতেই সম্ভব, আর এইগুলি ছাড়া আমার এই গল্প ছিল অসম্ভব।”

তার মতো আরও ধনী ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানার জন্য কিছু সাক্ষাৎকারের আয়োজন করা হয়েছিল। এই সাক্ষাৎকারগুলি নেয়া হয়েছিল সারা দেশের ২০ জন ব্যক্তির যারা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার চেষ্টায় নিয়োজিত অলাভজনক কিছু প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। প্রতিষ্ঠানগুলির নাম তারা প্রকাশ করতে চান নি। এই ২০ জনের প্রত্যেকেই নিজেদেরকে ‘ধনী বন্ধু’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। তাদের দাবী, তারা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে স্বল্প আয়ের মানুষদের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। এই ২০ জন ব্যক্তি আমেরিকার ধনী ব্যক্তিদের উজ্জ্বলতম উদাহরণ। তাদের বেশিরভাগই সাদা চামড়ার এবং পুরুষ। বয়সের দিক থেকে তারা সব প্রজন্মকেই প্রতিনিধিত্ব করেন। কেউ কেউ উত্তরাধিকারসূত্রেই ধনী। আবার কেউ কেউ স্বল্প আয়ের পরিবারে জন্ম নিলেও সময়ের সাথে সাথে নিজেই গড়ে নিয়েছেন নিজের ভাগ্য।
জ্লোৎনিৎস্কির মতো বাকিরাও বলেছেন যে এই ব্যাপারে কাজ করতে গিয়ে তারা সবার আগে এক ধরণের গভীর উপলব্ধির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য ছিল আর্থিক বৈষম্য দূর করতে গিয়ে নিজেদের মর্যাদা ও অবস্থানের কারণে তারা যে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন তা চিহ্নিত করা।

প্রথমত, তারা এটা মেনে নেন যে তাদের সম্পদের জন্য তারা অংশত ঋণী এমন এক সিস্টেমের কাছে যে সিস্টেম তাদের যোগ্যতা ও চেষ্টার বাইরেও তাদেরই অনুকূলে ছিল। বিশাল সম্পদের জন্য সিস্টেমের এই সহায়ক ভূমিকা বা ভাগ্যের কাছে ঋণী থাকার এই উপলব্ধি সহজ কোনো কাজ নয়। কারণ ‘যেটা যার প্রাপ্য সেটাই সবাই পায়’ এমন একটা প্রচলিত ধারণা সবার মনেই গেঁথে আছে। ‘বর্ন অন থার্ড বেইজ’ নামক স্মৃতিকথায় চাক কলিন্স এমনই এক আত্মোপলব্ধির গল্প বলেছেন। অস্কার মায়ের এর সম্পত্তির উত্তরাধিকার হয়েছিলেন চাক কলিন্স যা তিনি গ্রহণ না করে দান করে দিয়েছিলেন। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের আগে আরোপিত কর ‘এস্টেট ট্যাক্স’ সংরক্ষণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন এখন কলিন্স। একই সাথে তিনি অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যাপারে আরো গবেষণা করে যাচ্ছেন।

পরের ধাপটি হচ্ছে লজ্জ্বাকে দূর করা। বাড়তি সুবিধা পাওয়ার ব্যাপারটা উপলব্ধি করার ফলে ২০ জন ধনী ব্যক্তির অনেকেই লজ্জ্বিত হয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় একজন বাইসেক্সুয়াল নারীর কথা যিনি ২১ বছর বয়সেই প্রায় ১ মিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েছিলেন। তিনি বলেন, তার বন্ধুদের কাছে একজন লেসবিয়ান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করাটা তার কাছে বরং সহজই ছিল। সে তুলনায় নিজেকে মিলিয়নেয়ার হিসেবে পরিচয় দেয়াটা তার জন্য বেশি কঠিন ছিল। ধনী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয়ার ব্যাপারটা অস্বস্তিকর — সাক্ষাৎকার দেয়া ২০ জনের মধ্যে অনেকের কাছ থেকেই এই রকম প্রতিক্রিয়া পাওয়াটা বেশ অবাক করা ব্যাপার ছিল। কারণ বেশিরভাগ আমেরিকানদের কাছেই তাদের সম্পদের পরিমাণ তাদের যোগ্যতার পরিচয়।
অপরাধবোধ আর লজ্জ্বা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি এই ‘ধনী বন্ধু’দের একটি ভয় ছিল তাদের প্রতি অন্য ধনী ব্যক্তিদের প্রতিহিংসা। ধনীদের উপর কর আরোপের পক্ষে কাজ করা জাতীয় তাদের কর্মকাণ্ডগুলি অন্য ধনীদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছিল। ফলে তা ছিল অন্য ধনীদের জন্য উদ্বেগের।

তবে সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি হওয়া ২০ জনের মধ্যে সবাই এই বিষয়ে একমত যে ‘ধনী বন্ধু’ হওয়ার জন্য এই কাজগুলি কঠিন হলেও জরুরি ছিল। অনেকেই বলেছেন নৈতিক সমর্থনের জন্য তারা একই মানসিকতার মানুষদের উপর ভরসা করেছেন।

জনসেবা বা ফিলানথ্রোপির সমস্যা

অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কিছু করতে চায় এমন বেশিরভাগ ধনী ব্যক্তিই তাদের কিছু টাকা দান করে দেন। তবে অর্থনীতিবিদ ইন্দ্রনীল দাসগুপ্ত ও রবী কানবুর এর গবেষণা অনুযায়ী, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য ফিলানথ্রোপি আদর্শ উপায় নয়।
ফিলানথ্রোপির ব্যাপারে অন্যান্য ধনী ব্যক্তির তুলনায় সাক্ষাৎকারের ২০ জন ধনী ব্যক্তির ছিল ভিন্ন ধারণা। সবাই তাদের সম্পদের অন্তত কিছু অংশ দান করেছেন। কেউ কেউ এমনকি তাদের অর্জিত পুরো সম্পদই দান করেছেন। কিন্তু বেশিরভাগই তাতেই থেমে না থেকে আরো কিছু কাজ করেছেন। যেমন, ধনীদের উপর কর বাড়ানোর জন্য লবি করা বা কর্মীদের বেতন বাড়ানোর জন্য কর্পোরেট বোর্ডগুলিকে চাপ দেয়া ইত্যাদি। অর্থনৈতিক সাম্যের জন্য যা সম্ভাব্য ২টি সমাধান।

কেউ কেউ বলেন, তাদের মনে হয়েছে তারা যেন আরো কার্যকর ভাবে ফিলানথ্রোপি করার অন্য আরেক পথ খুঁজে পেয়েছেন। যেমন, একজনের মনে হয়েছিল তার টাকা কোথায় খরচ হওয়া উচিত সেটা ঠিক করার জন্য তিনি সঠিক ব্যক্তি নন। প্রথমে তিনি তারই মতো উচ্চমধ্যবিত্তদের সৃষ্ট ও পরিচালিত বিভিন্ন চ্যারিটি সংস্থাসমূহে দান করতেন। তারপর তিনি এমন সংস্থাসমূহে দান করা শুরু করলেন যেগুলির পরিচালনায় রয়েছে গরীবরা নিজেরাই। এইভাবে তিনি তার এলিট ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন গরীবদের কাছে। কারণ তার মনে হয়েছিল নিজেদের উন্নতি কীভাবে করতে হয় সেটা তারা তার চেয়ে ভালো জানে।

এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করতে ‘ধনী বন্ধু’ হতে গেলে এমন প্যারাডাইম শিফট এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সাক্ষাৎকারের ২০ জন ‘ধনী বন্ধু’ বলেন, তাদের কাছে অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় মনে হয়েছে গরীবদের কাছে নিজেদের ক্ষমতা স্বেচ্ছায় হস্তান্তর করা। এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া অনেক ধনীদের জন্যই অস্বস্তিকর ও কঠিন একটা ব্যাপার হবে। কিন্তু তাদের এই চেষ্টা যদি আমেরিকার অর্থনীতি আর গণতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়, তবে তা কঠিন হলেও জরুরি ।

পানিকে আর্সেনিক মুক্ত করার ক্ষমতাসম্পন্ন এক ধরনের মস আবিষ্কার করেছেন সুইডেনের স্টকহোম ইউনিভার্সিটির গবেষকরা। এই মস প্রয়োগ করার মাত্র এক ঘন্টার মধ্যেই পানিতে থাকা আর্সেনিকের মাত্রা এত কমে যায় যে সেই পানি আর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর থাকে না। “এনভায়রনমেন্টাল পল্যুশন” নামের একটি জার্নালে এই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

Warnstofia fluitans নামের জলজ এই মস উত্তর সুইডেনে পাওয়া যায়। এটি খুব দ্রুত পানি থেকে আর্সেনিক শুষে নিতে পারে। নতুন এ আবিষ্কারের ফলে পরিবেশবান্ধব উপায়ে আর্সেনিক দূর করা সম্ভব হবে৷ সেক্ষেত্রে যেসব জলপ্রণালী বা খালে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি, সেখানে এই মস উৎপাদন করা যেতে পারে। গবেষণা দলটির রিসার্চ অ্যাসিস্টেন্ট আরিফিন সান্ধি বলেন, পানি থেকে প্রায় ৮০ ভাগ আর্সেনিক দূর করতে মসটির এক ঘন্টার বেশি লাগে না।

সুইডেনে ২০০৪ সালে কাঠের তৈরি পণ্যে আর্সেনিক কম্পাউন্ডের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু তারপরও নানা রকম খনন কাজের কারণে আর্সেনিক ভূপৃষ্ঠ ও পানির উৎস পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কারণ সুইডেনের কিছু অঞ্চলের মাটি ও এর ঠিক নিচের স্তরে প্রাকৃতিকভাবেই আর্সেনিক থাকে। ফলে খাবার পানি ও ফসল উৎপাদনের জন্য সেচ কাজে ব্যবহার করা পানিতে অনেক বেশি পরিমাণে আর্সেনিক সংক্রমিত হয় । তাছাড়া গাছও মাটি থেকে আর্সেনিক শোষণ করে নেয়, যা শেষ পর্যন্ত খাবারে ছড়িয়ে পড়ে।

সুইডেনে বিভিন্ন মূল জাতীয় সবজি, শাক ও গমে উচ্চ মাত্রার আর্সেনিক রয়েছে। আর অন্যান্য দেশে খাবারের মধ্যে চালে আর্সেনিকের প্রকোপ বেশি দেখা যায়।

সুইডেনের গবেষণা দলটির প্রধান স্টকহোম ইউনিভার্সিটির ইকোলজি ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক মারিয়া গ্রেগার জানান, তারা উদ্ভিদ ভিত্তিক জলাভূমি তৈরির পরিকল্পনা করছেন। এতে পানি খাবার উপযোগী হওয়ার আগেই সেখান থেকে আর্সেনিক ফিল্টার করে অালাদা করা যাবে।

সূত্র. ইউরেকা অ্যালার্ট

রোজী আপার সাথে আমার বয়সের পার্থক্যটা আমি কোনোদিন বুঝতেই পারি নি। আমি যখন ত্রিশ বছরের যুবক, নব্বুইয়ের দশকে, তখন যে গতিতে ছুটতাম, রোজী আপার গতি এর চেয়ে একটুও কম ছিল না। আজ এই সভায়, কাল ওই সভায়, অথবা ফোন করে বললাম, রোজী আপা চলেন, গাজীপুর থেকে ঘুরে আসি, কবিতার আড্ডা হবে, তিনি সাথেই সাথেই রাজী।

এই তো সেদিন, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে, ফোন করে বলি, রোজী আপা দীপনপুর-এ আসুন, আড্ডা দেব। তিনি শুধু জিজ্ঞেস করলেন, কয়টায়? আমি বলি, পাঁচটায়। গিয়ে দেখি রোজী আপা আমার আগেই পৌঁছে গেছেন, সাড়ে চারটায়।

এই হলো কাজী রোজী। খুব বিপদে না পড়ে গেলে কখনো কোথাও বিলম্বে পৌঁছান না, আর কোনো কিছুতেই তার না নেই। অসম্ভব ইতিবাচক এবং প্রাণশক্তিতে ভরা এক মানুষ।

‘ভাত দিবার পারস না ভাতার হবার চাস’ লিখে তিনি চপেটাঘাত করেন মরদগিরির শেকড়ে। তখন, সেই নব্বুইয়ের দশকেই, সাংবাদিক দুলাল খান কানের কাছে সব সময় কাজী রোজী, কাজী রোজী করতেন। তার অফুরন্ত প্রাণশক্তিই দুলালকে আপ্লুত করেছিল। আরো একটি কারণ ছিল, রোজী আপা ক্যান্সার সারভাইবার।

১৯৯৪ সালে ধরা পড়ে তার দেহে বাসা বেঁধেছে কর্কট রোগ, স্তনকর্কট। চিকিৎসা শুরু হয়, কেমো চলে, মাথার চুল চলে যায়, কিন্তু তার মনোবল যায় না। অটুট মনোবল তাকে উজ্জীবিত রাখে সারাক্ষণ। তিনি বলেন, এই ক্যান্সার, ওই ঘরের মধ্যেই থাকো, আমি দরোজা বন্ধ করে দিলাম। আমার এখনো অনেক কাজ বাকি। কাজ শেষ হোক তখন দরোজা খুলে দেব, তখন তুমি আমাকে যেখানে নিয়ে যেতে চাও, নিয়ে যেও। এই হলো রোজী আপা।

কাজী রোজী
নিউ ইয়র্কে লেখকের স্ত্রী মুক্তি জহিরের সাথে কাজী রোজী

ক্যান্সারকে এক ধমক দিয়ে বসিয়ে রেখেছেন আর তিনি ছুটছেন, কাজে, জাতীয় কবিতা উৎসবে, সেন্সর বোর্ডে, সর্বত্র। কবি কাজী রোজী হাজারো কর্কট রোগীর কাছে হয়ে ওঠেন দৃঢ় মনোবলের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রোগযন্ত্রণাকে উড়িয়ে দিয়ে, ভয়কে জয় করে তিনি এগিয়ে চলেছেন, ছুটে চলেছেন, নির্মাণ করে চলেছেন নির্ভয়-সড়ক সতীর্থদের জন্য, উত্তর প্রজন্মের জন্য। বাড়ির সবাই, বন্ধুরা, অবাক, বলে কী এই মেয়ে!

তার সাথে আমার পরিচয় ঘটে পাবলিক লাইব্রেরিতে। কী অনুষ্ঠান ছিল সেটা মনে নেই, তবে সম্ভবত সুকান্ত পরিষদের কোনো অনুষ্ঠান হবে। তিনি আলোচক ছিলেন, আমিও বক্তৃতা করি। অনুষ্ঠান শেষে, আমি না, রোজী আপাই এগিয়ে আসেন এবং আমার সাথে আলাপ জমিয়ে তোলেন।

অনুজপ্রতিম কোনো কবির সঙ্গে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে চাওয়ার মত উদার মানসিকতাসম্পন্ন লেখক/কবি আমাদের সমাজে খুব বেশি নেই। রোজী আপা খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলেন। এত সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারা, নারী লেখক শুধু নয়, লেখকের সংখ্যাই বাংলা সাহিত্যে বিরল। আমি তার কথার জাদুতে মুগ্ধ হই। তিনি ফোন নাম্বার দেন, আমিও নাম্বার দেই। ব্যাস, সেই থেকেই রোজী আপার সাথে আমার এবং আমার পরিবারের একটি নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে।

তখন তিনি চাকরিতে, ডিএফপি’র মাসিক প্রকাশনা সচিত্র বাংলাদেশ-এর সম্পাদক। আমাকে বলেন, লেখা দাও। একদিন লেখা নিয়ে যাই, কবিতা। তিনি ছাপেন। এরপর বলেন, বিল নিয়ে যাও, আবার একদিন যাই, বিল নিয়ে আসি। এভাবে আমাদের বন্ধুত্ব ক্রমশ নিবিড় হতে থাকে। রোজী আপাকে আমার স্ত্রী মুক্তিও ভীষণ পছন্দ করেন। খুব ঘরোয়া, পারিবারিক কোনো অনুষ্ঠান, আর কাউকে না বললেও, আমরা রোজী আপাকে বলি। রোজী আপা সানন্দে তাতে যোগ দেন। কখনো তার মধ্যে এই অনীহা দেখি নি, ওটা তো শিল্প-সাহিত্যের কিছু না, আমি কেন যাব?

আমার কোনো বই বেরুলে আমি যেমন রোজী আপাকে দেই, রোজী আপাও তার বই বেরুলে আমাকে দেন। এখন যতটা মন দিয়ে কবিতা পড়ি, ঢাকায় থাকতে ততটা মন দিয়ে পড়তাম না, পড়ার চেয়ে লিখতেই বেশি ব্যস্ত থাকতাম। যেন সব শিখে ফেলেছি, আর পড়তে হবে না। আমার সেই মূর্খতার কথা মনে করে এখন খুব লজ্জা পাই। তাই সেই সময়ে রোজী আপা আমাকে যে বইগুলো দিয়েছেন তা শুধু শেলফেই শোভা পেয়েছে, হয়তো খুলে, বইটি যখন পেয়েছি তখনই, একটি দুটি কবিতা পড়েছি। ব্যাস ওইটুকুই। তাই তার কাব্যপ্রতিভা নিয়ে তেমন কিছুই আমার লেখা হয়ে ওঠে নি।

গত গ্রীস্মে তিনি কাজী রোজীর কবিতা আমাকে দ্বিতীয়বারের মত দেন। আমি বইটি পড়ি। বেশ মনযোগ দিয়েই পড়ি। কবিতা লিখতে গিয়ে তিনি ছন্দের শৃঙ্খলে খুব বেশি বন্দি থাকেন নি। তবে যে কয়টা স্বরবৃত্ত বা মাত্রাবৃত্তের কবিতা লিখেছেন তা লিখেছেন নিখুঁত ছন্দেই। বাংলা কবিতার প্রচলিত ছন্দগুলো যে তিনি ভালো করেই জানেন, তা আমাদের দ্বিপাক্ষিক অনেক আড্ডাতেই নিশ্চিত হয়েছি, যখন আমরা অন্য অনেকের কবিতার ব্যবচ্ছেদ করেছি একসঙ্গে বসে।

তিনি খুব সহজ কথায় সমাজের অসঙ্গতিগুলো তার কবিতায় তুলে এনেছেন। সব সময় অবস্থান নিয়েছেন সুবিধাবঞ্চিত হতদরিদ্র মানুষের পাশে। কাজী রোজীর অনেক কবিতায় আমি দেখেছি তিনি একটি বিষয়কে কবিতার কেন্দ্রে রাখেন, সেই বিষয়কে কেন্দ্র করে কবিতাটি আবর্তিত হয়। তাই পুরো কবিতাটির মধ্যে একটি সুগভীর পারম্পর্য তৈরি হয়।

আধুনিক কবিরা এই পারম্পর্যটিকেই ভাঙতে চেয়েছেন। কবিতায় তিনি যে জীবনের জয়গান করেছেন, তার একটি মূল্য অবশ্যই আছে। তিনি যখন ঝড় নিয়ে কবিতা লেখেন, ঝড়ের নেতিবাচক প্রভাবে গৃহ ভাঙে, পশুপাখি মারা যায়, মানুষের জীবনে-সংসারে রূপকল্পেও ঝড়কে উপস্থাপন করেন, তবে তিনি ঝড়কে দূরে রেখে পঙ্ক্তি‌ নির্মাণ করেন না। এটি তার কবিতার অনেক বৈশিষ্ট্যের একটি মাত্র।

তিনি প্রেমের, বিরহের, আধ্যাত্মিকতার কবিতা লিখেছেন যদিও, কিন্তু তার কবিতার প্রধান সুর হচ্ছে বিপ্লব। তার কবিতায় নারীর অধিকার, সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার তীব্র ও জোরালোভাবে এসেছে। এই যে যুদ্ধ, এই যে সংগ্রাম তার কবিতার কেন্দ্রে, এটি কোনো ধার করা বিষয় নয়, বিষয়টি তিনি তুলে এনেছেন তার জীবন থেকে।

ঊনিশ বছরের তরুণী নিজের চেয়ে ত্রিশ বছরের বড় ফুপাত ভাই কবি সিকান্দার আবু জাফরকে বিয়ে করে ফেলেন। মাত্র ৪/৫ বছরের সংসার। ১৯৭৫ সালে যখন সিকান্দার আবু জাফর মারা যান তখন রোজী আপার কোলে সুমী, তিন বছরের শিশু। এই শিশুটিকে কোলে নিয়ে তিনি নেমে পড়েন জীবন যুদ্ধে। রোজী এবং সুমীর জন্য কিছুই রেখে যান নি সিকান্দার আবু জাফর, তাই সর্বাগ্রে জীবিকার জন্যেই তাকে পথে নামতে হয়।

কাজ পান রেডিওতে, ক্যাজুয়াল আর্টিস্ট। চেকটা পেয়েই ছোটেন দুধ কিনতে, তার শিশু কন্যার জন্য। এরপর চাকরি পান তথ্য মন্ত্রণালয়ে, পরে পিআইডিতে, এরপর ডিএফপি, এরপর ন্যাম, এরপর অবসর। আসলেই কি অবসর আছে তার? না নেই, কত কত সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত, কবিতা যুদ্ধে, রাজপথের যুদ্ধে, নারীর অধিকার আদায়ের যুদ্ধে কাজী রোজী এক বীর যোদ্ধা।

এবার একটি মজার ঘটনা বলি। কবি আল মাহমুদ চাকরি করতেন দৈনিক ইত্তেফাকে। রোজী আপার আব্বা কাজী শহিদুল ইসলাম ছিলেন মাহমুদ ভাইয়ের বস। রোজী আপার প্রতি মাহমুদ ভাইয়ের দুর্বলতা ছিল, হয়ত দুজনের প্রতিই দুজনের দুর্বলতা ছিল। কিন্তু একদিন রোজী আপার আব্বা বিষয়টি টের পেয়ে মাহমুদ ভাইকে আচ্ছা করে শাসান, “বামন হয়ে চাঁদে হাত দিতে চাও” বলে তাকে ভর্ৎসনা করেন। এই দুঃখ মাহমুদ ভাইয়ের বুকের ভেতর সারা জীবন ছিল। প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার দুঃখ না, অপমানিত হওয়ার দুঃখ। গল্পটি আমি মাহমুদ ভাই এবং রোজী আপা দুজনের মুখে দুই রকমভাবে শুনেছি। তবে ঘটনা যে কিছু একটা ছিল তা আমি টের পেয়েছি।

২০০৩ সালে আমার বাসায়, এক আড্ডায়, দুজনই আসেন। তারা দুজন ঘরের আড্ডা ফেলে বারান্দায় গিয়ে নিভৃতে দীর্ঘ সময় কাটান। তাদের দুজনের মুখেই সেই সময়ে খানিকটা রোমান্টিকতার আভাস ছিল বৈকি। এ নিয়ে আমি মাহমুদ ভাইকে পরে অনেক খেপিয়েছিও। তিনি শুধু হো হো করে হেসেছেন।

কাজী রোজী
লেখকের নিকেতনের ফ্ল্যাটে বাঁ থেকে জাহিদ হায়দার, কাজী জহিরুল ইসলাম, কাজী রোজী ও আল মাহমুদ। ছবি. কাজী বিটন, ডিসেম্বর ২০০৩

২০১৮-র মার্চ মাসে রোজী আপা নিউ ইয়র্কে এলে কথাটি আবার তুলি। তিনি বলেন, মাহমুদ ভাই আমাদের বাড়িতে আসতেন আমাকে কবিতা লেখা শেখাতে। তিনি আমাকে ছন্দ, উপমা-উৎপ্রেক্ষা, পয়ার, অমিত্রাক্ষর, বাংলা কবিতার ইতিহাস এসব শেখাতেন। আমি বাজে কবিতা লিখলেও মাহমুদ ভাই বলতেন, ভালো হয়েছে, খুব এনকারেজ করতেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমরা এক সাথে কাজ করেছি। খুব বড় মনের একজন মানুষ কবি আল মাহমুদ। তবে একটা কথা তোমাকে বলি, তিনি যে আমাকে কবিতা শেখাতেন, এই শেখানোটাই সব নয়, এর ভেতরে আরো কিছু ছিল যা কেউ জানে না, আমি জানাতেও চাই না। থাক না কিছু কথা গোপন।

আমি বলি, আপনার আম্মা নাকি মাহমুদ ভাইকে খুব পছন্দ করতেন, জামাই-আদরে যত্ন করে খাওয়াতেন? আমার একথা শুনে রোজী আপা হাসেন। সেই হাসিতে আমি দেখি অনেক দূরে ফেলে আসা এক নদীর ঢেউ। নিউ ইয়র্কে একটি রাত তিনি আমাদের বাসায় কাটান। সেই সন্ধ্যায় মুক্তি এবং আমি রোজী আপার জন্যে একটি আড্ডার আয়োজন করি। নিউ ইয়র্কের শিল্প-সাহিত্যের কিছু প্রিয় মুখ যোগ দেন, তাদের মধ্যে তাজুল ইমাম, নজরুল কবীর, স্বপ্না ইমাম, নার্গিস আহমেদ, উইলি মুক্তি, মোস্তাক আহমেদ, নুসরাত এলিন, ওবায়েদুল্লাহ মামুন প্রমুখ ছিলেন।

কাজী রোজী
নিউ ইয়র্কে পাঠকের পাতার অনুষ্ঠানে সাবিনা নীরু, কাজী জহিরুল ইসলাম ও ওবায়েদুল্লাহ মামুনের সঙ্গে কাজী রোজী। ছবি. মুক্তি জহির, মার্চ ২০১৮

পরদিন কুইন্স লাইব্রেরিতে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠান হয়। এতেও তিনি যোগ দেন। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, তার জন্ম না হলে বাংলাদেশ হত না।

২০০৭-এ প্রেসক্লাবে আমার তিনটি বইয়ের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠান হয়। ‘কাকাওয়ের দেশে’ বইটির ওপর আলোচনা করেন নাসির আহমেদ, ‘আকাশের স্ট্রিটে হাঁটে ডিজিটাল নারদ’ গ্রন্থের ওপর আলোচনা করেন জাহিদ হায়দার এবং ‘কসোভোর পথে প্রান্তরে’ বইটির ওপর আলোচনা করেন কাজী রোজী। রোজী আপা লিখিত বক্তব্য দেন, তিনি বলেন, “কবি কাজী জহিরুল ইসলামের কসোভোর পথে-প্রান্তরে পড়তে পড়তে আমার মনন-ভ্রমণ হয়ে গেল। স্থলপথে জলপথে কিংবা আকাশপথে নয় — মনের দৃষ্টি মেলে কসোভোতে হারিয়ে গেলাম আমি। নীরবে নিভৃতে মুহূর্তে ভৌগলিক সীমারেখা অতিক্রম করে আমার মন আশ্রয় নিল কসোভোর মানুষ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক ঘটনাবহুল নান্দনিকতার অবস্থানে। সাথে ছিলেন ঘুরে ফিরে সেই অদৃশ্য মানুষ যার নাম কাজী জহিরুল ইসলাম।

কাজী জহিরুল ইসলামের কবিতা পড়েছি, আলোচনাও করেছি, সেখানে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছি। কিন্তু গদ্য — এ যে ভীষণ অন্য জগত! তার ওপর এখানে-সেখানে নিকট ও দূরের খবরাখবর মিশ্রিত গদ্য।”

দীর্ঘ রচনাটি থেকে এইটুকু এখানে তুলে দিলাম।

কাজী রোজী একজন স্বতঃস্ফূর্ত কবি, সাবলীল কবি, প্রাকৃতিক কবি। কবিতা লেখার জন্যে তার কোনো প্রস্তুতি দরকার হয় না। অথবা বলা যায় তিনি সব সময় প্রস্তুত হয়েই আছেন। একবার আমরা গাজীপুরের কাজীর গাঁ থেকে ফিরছি। সাথে রোজী আপা। তিনি ফিরে এসে কাজীর গাঁয়ের ওপর একটি কলাম লিখেন দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায়। গাড়িতে বসে রোজী আপাকে বলি, আপা আজ অগ্নির জন্মদিন, গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে বসে আমরা একসাথে খাওয়া-দাওয়া করব। রেস্টুরেন্টে পৌঁছাতেই রোজী আপা বলেন, অগ্নির জন্য আমি একটি কবিতা লিখেছি, তিনি কবিতাটি পড়ে শোনান। সেটিই, সন্দেহ নেই, অগ্নির জন্মদিনের সবচেয়ে দামি উপহার হয়ে উঠেছিল।

কাজী রোজী
কাজীর গাঁয়ে কাজী রোজী ও লেখক-পুত্র কাজী আবরার জহির। ছবি. কাজী জহিরুল ইসলাম, ২০০৭

রোজী আপা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, নানান ভাবে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্যে সাক্ষী দিয়ে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেন। তিনি সংরক্ষিত নারী আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত একজন সাংসদ। গত আগস্টে যখন দেখা হয়, তিনি আমাকে বলেন, জহির, আমার আত্মতৃপ্তিটা কী জানো, আমি যখন মরে যাবো, জাতীয় পতাকা দিয়ে আমার মৃতদেহটাকে মুড়িয়ে দেয়া হবে। দেশপ্রেম রোজী আপার ধমণীর প্রতি শিরায় শিরায় বহমান। তার সঙ্গে কথা বললে আমার শুধু এই কথাই মনে হয়, “সবার ওপর বাংলাদেশ সত্য তাহার ওপরে নাই।”

কবি কাজী রোজীর সেই বিখ্যাত কবিতাটি দিয়েই তাকে নিয়ে লেখা আড্ডার গল্প শেষ করছি।

ভাত দিবার পারস না ভাতার হবার চাস
কেমন মরদ তুই হারামজাদা
নিত্যি রাইতে ক্যান গতরে গতর চাস
পরাণ না রয় যদি পরাণে বাঁধা।
যে জন বাঁচতে চায় তারেই লড়তে হয়
তামাম দুইন্যা জুড়ে বুঝছে এখন
নিঠুর জঠর জ্বালা সইতে পারে না বলে
সবাই সহ্য করে সব জ্বালাতন।
কৃষক লড়াই করে জমিনে ফসল ভরে
সাত পুরুষের ভিটে আগলে রাখে
কানাকড়ি মূল্যের সে ভিটের দাম দিতে
কোটি টাকার মহাজন আড়ালে ডাকে।
ছাওয়াল কানলি পরে পোড়া এ গতরডারে
মাঝির বৈঠ্যা ভেবে দাঁড়ে দেই টান
হায়রে সোয়ামী তোরে ছুঁইয়া কইতে পারি
খরায় জমিন পোড়ে পোড়ে না পরাণ
এটটু ভাতের লাগি এটটু ত্যানার লাগি
গল্পের মতো এই গতর দিলাম
ভাত দিতি পারলিনে তবুও ভাতার হলি
হায়রে সোয়ামী তুই-ই ডাকলি নিলাম।

হলিসউড, নিউ ইয়র্ক, ৭ মার্চ ২০১৮

আড্ডার সব গল্প >>