যে ১১টি অভ্যাস আপনার চোখের ক্ষতি করছে

১. স্মার্টফোনের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকা

দিনের পর দিন না বুঝে যেভাবে চোখের ক্ষতি করে আসছেন তার মধ্যে একটা হল, দীর্ঘসময় ধরে একটানা ফোনের ছোট ছোট লেখাগুলি পড়তে চেষ্টা করা।

বিশেষত দিনের শেষে। এর কারণে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া, চোখ শুকিয়া যাওয়া, মাথা ঘোরা এবং বমি বমি ভাব হতে পারে।

তাই, প্রত্যেক ২০ মিনিট পর ফোনটা রেখে চোখকে রেস্ট দেওয়ার জন্য একটা বিরতি নিন। বা অারো ভাল হয় যদি ফোনের ফন্ট সাইজ বা অক্ষরের সাইজ বড় করে নেন।

২. রাতের বেলা টিভি দেখা

ফোন, ই-রিডার, টেলিভিশন বা কম্পিউটার যা’ই বলেন না কেন, ঘুমানোর  আগে অন্ধকারে যে কোনো ধরনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকাটা আপনার চোখের জন্য ক্ষতিকর।

স্ক্রিনে আলোর লেভেল দ্রুত চেন্জ হয়, এর সঙ্গে অভ্যস্ত হতে আপনার চোখকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়। যে কারণে চোখ ভারি ভারি লাগে, ব্যথা হয়, মাথা ধরে, চোখে শুকনা ভাব দেখা দেয়; এমনকি চোখ লাল হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া, এটা আপনার স্লিপ সাইকেল বা ঘুমের চক্র নষ্ট করে দিতে পারে।

এর বিপরীতে, অল্প আলোতে পড়ার পরামর্শও ঠিক দেয়া যাচ্ছে না। যদিও এর উপর অনেক প্রমাণাদি নাই যে, অল্প আলো চোখের জন্য খারাপ। কিন্তু এর কারণে চোখ ভারি ভারি বোধ হয়। এই বোধ হওয়া পরবর্তীতে চোখকে আরো ক্লান্ত আর লাল করে। চোখে ব্যথা বা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।

তাই, ঘুমানোর আগে কোনো বই পড়তে হলে বিছানার পাশে বাতি জ্বালিয়ে নিন।

৩. লেন্স পরে ঘুমানো

অনেক দেরি হয়ে গেছে বা আপনি অনেক ক্লান্ত—লেন্স না খুলে ঘুমানোর জন্যে এসব কোনো অজুহাত হতে পারে না।

এর কারণে যে শুধু ইনফেকশনের ঝুঁকি তৈরি করছেন চোখের জন্য তা না, বরং কোনো পারমানেন্ট ক্ষতিও হয়ে যেতে পারে।

সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ আমেরিকান শুধুমাত্র কন্ট্যাক্ট লেন্স থেকে হওয়া ইনফেকশনের জন্য চোখের ডাক্তার দেখাতে যায়।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে লেন্স খোলার সময় হাত পরিষ্কার করে নিয়েছেন কিনা খেয়াল করুন এবং বাড়তি কন্ট্যাক্ট সল্যুশন ব্যবহার করুন।

৪. চোখ ঘষা

এই কাজটা হয়ত না করে থাকতে পারেন না, কিন্তু জোরে চোখ ঘষার কারণে চোখের নিচে থাকা রক্তনালী ভেঙে যেতে পারে। তাই, চোখের অস্বস্তি দূর করতে চোখ না ঘষে বরং ঠাণ্ডা ভাপ দিন।

৫. অতিরিক্ত আইড্রপ ব্যবহার করা

আইড্রপ যদিও সাময়িকভাবে চোখের শুকনা ভাব দূর করে, কিন্তু এর অতিরিক্ত ব্যবহার এই সমস্যা আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।

দি আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ ওফথালমোলজি (এএও) বলে, প্রেসক্রিপশন ছাড়া যেই ড্রপ আপনি ব্যবহার করেন তা আাসলে আপনার চোখের কোনো কাজে লাগে না—বড়জোর চোখের লালচে ভাব কমাতে পারে। তাই, খুব অল্প সময়ের জন্যই আইড্রপ ব্যবহার করুন।

প্রেসক্রিপশন আইড্রপ ব্যবহার করলে, তা শুধুমাত্র ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করুন। তাতে যদি চোখে কোনো প্রকারের অস্বস্তি, র‍্যাশ বা অন্য কোনো সাইড ইফেক্ট দেখতে পান তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার করা বন্ধ করে দিন এবং ডাক্তারের কাছে যান।

৬. পুষ্টিকর খাবার না খাওয়া

খাদ্য এবং পুষ্টি চোখের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আসলে, কিছু খাবার চোখের স্বাভাবিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে যেগুলিতে ভিটামিন সি এবং ই, জিংক এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড আছে। এএও পরামর্শ দেয় যতটা সম্ভব লেবু ধরনের ফল, সবজি তেল, বাদাম, শস্যদানা, শাক ও মাছের মতো খাবার নিয়মিত খাদ্য তালিকায় রাখতে।

এর থেকে জরুরি বিষয় হল পানি। অশ্রু তৈরি এবং চোখকে পিচ্ছিল রাখতে হাইড্রেটেড থাকার বা পর্যাপ্ত পানি পানের বিকল্প নাই। এর পাশাপাশি অনেক বেশি সোডিয়াম (লবণ) আছে এমন খাবার পরিহার করুন, এর কারণে শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

৭. গগলস না পরা

এএও’র হিসাব মতে, ৪৫% চোখের ইনজুরি হয় বাসায়। আর সবচেয়ে বেশি ঘটে ক্লিনিং প্রডাক্ট সরাসরি খোলা চোখে কোনো নিরাপত্তা ছাড়া ব্যবহার করার সময় (প্রতিবছর প্রায় ১২৫,০০০ দুর্ঘটনা ঘটে এইসব প্রডাক্টের কারণে) বা রান্নার সময় তেল চর্বি ছিটকে আসার কারণে।

এই সময়গুলিতে চশমা পরে নিন।

৮. আই মেকাপের বেঠিক ব্যবহার

চোখের কাছাকাছি যাই লাগান না কেন, তা বিপজ্জনক। এর মধ্যে আপনার মাসকারা, আইলাইনার, আইশ্যাডো এবং আইক্রিমও আছে। চেষ্টা করুন চোখের পাপড়ি রেখা থেকে দূরে মেকআপ ব্যবহার করতে। যাতে তা পাপড়ির তেল গ্রন্থিগুলি বন্ধ না করতে পারে। নাহলে ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে। এছাড়া, প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর আই মেকআপের জিনিসপত্রগুলি বদলে ফেলুন।

ব্যাকটেরিয়া নোংরা এবং অন্ধকার জায়গাগুলিতে থাকতে পছন্দ করে, ফলে আপনার পছন্দের মাসকারাই হতে পারে বড় রকমের কোনো ইনফেকশনের কারণ।

৯. পর্যাপ্ত না ঘুমানো

পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া ওজন বৃদ্ধি, ডিপ্রেশন এবং হজম ক্ষমতা কমে যাওয়ার মত আরো বিভিন্ন সমস্যা তৈরি করে শরীরে। এর পাশাপাশি তা চোখেরও ক্ষতি করে (যেমন এর লক্ষণগুলি হতে পারে চোখ পিট পিট করা, চোখ শুকিয়ে যাওয়া, ঝাপসা দৃষ্টি এবং ব্যথা)। তাই চেষ্টা করুন, প্রতিরাতে অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমাতে।

১০. চশমা (বা সানগ্লাস) না পরা

কপাল কুঁচকে কোনো কিছু দেখার চেষ্টা করার কারণে চোখে ব্যথা হতে পারে। এর সহজ সমাধান হল, চশমা পরে নিয়ে কাজ করা।

ঘরের বাইরে নিয়মিত সানগ্লাস পরতে চেষ্টা করুন। সানগ্লাস যেটা করে তা হল, সূর্যের ক্ষতিকর ইউভি রশ্মিকে চোখের ক্ষতি করতে দেয় না।

এর বাইরে আপনার যদি ফোটোফোবিয়া বা লাইট সেনসিটিভিটি থাকে তবে সানগ্লাস আলোর তীব্রতা কমিয়ে আপনাকে মাথা ধরা, চোখে ঝাপসা দেখা এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারে।

১১. নিয়মিত চোখের ডাক্তার না দেখানো

আপনার ডাক্তার যে শুধু কোনো লক্ষণ না দেখানো চোখের জটিল সমস্যাগুলিই (যেমন গ্লুকোমা) ধরতে পারেন তা না, বরং অন্যান্য রোগ যে হতে যাচ্ছে (যেমন ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ) তাও বুঝতে পারেন শুধুমাত্র আপনার চোখ দেখে।

সবচে বড় কথা হল, আপনার দৃষ্টিশক্তিকে আপনি যতটা ভাল মনে করেন ততটা নাও হতে পারে। প্রত্যেকটা কাজ করার সময় যদি শুধু চোখ পিট পিটও করেন, সেটাও কোনো সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। তাই, নিয়মিত চোখের ডাক্তার দেখান।

নিজেদের পায়ের শব্দ কেন শুনতে পাই না আমরা

ফাঁকা একটা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আকস্মিক কোনো পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। ধরেই নিলেন কেউ আপনাকে ফলো করছে। এর কারণ, জায়গাটা নীরব হলেও আপনি সাধারণত নিজের পায়ের শব্দ আলাদা করে কখনো শুনতে পান না। তাই পায়ের শব্দ শুনলেই আপনার মনে হয় অন্য কেউ হেঁটে আসছে।

আমাদের ব্যক্তিগত শব্দগুলি মস্তিষ্ক সচরাচর আলাদা করে রেজিস্টার করে না। বিজ্ঞানীরা বরাবরই এই বিষয়টা জানতেন। কিন্তু মস্তিষ্ক ঠিক কীভাবে এই কাজটা করে থাকে তা সঠিকভাবে এখন পর্যন্ত অজানা ছিল। সম্প্রতি ‘নেচার’ পত্রিকার একটা গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়, যেখানে বিজ্ঞানীরা পায়ের শব্দের ওপর ভিত্তি করে মস্তিষ্কের শব্দ “ফিল্টার” করার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করেন।

ব্রেইনের প্রতিটা আলাদা আলাদা স্নায়ুকোষ অর্থাৎ নিউরনগুলি এই উদ্দেশ্যে কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে তা জানার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটার সিমুলেশন ব্যবহার করে একটা “অগমেন্টেড রিয়্যালিটি” নির্মাণ করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে ইঁদুরদের ওপর পরীক্ষা চালানো হয় এবং হাঁটার সময় ইঁদুররা কীরকম শব্দ শুনতে পাবে সেটা তারা পরীক্ষামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন।

দেখা যায়, ইঁদুরগুলি নিজেদের হাঁটার শব্দে অভ্যস্ত হয়ে যাবার পর তাদের মস্তিষ্কের অডিটরি কর্টেক্সের সব নিউরন সে শব্দে প্রতিক্রিয়া জানানো বন্ধ করে দেয়। আর অডিটরি কর্টেক্সই হলো আমাদের মস্তিষ্কের অন্যতম প্রধান শ্রবণ কেন্দ্র।

কোনো ইঁদুর যখন তার পায়ের শব্দ শুনে, তখন অডিটরি কর্টেক্সের ‘ইনহিবিটরি নিউরন’গুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। নিজের পায়ের শব্দে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া ইঁদুরের ধারণা অনুযায়ী এসব নিউরনের একটা গ্রুপ সেই শব্দের একটা ফটো-নেগেটিভ তৈরি করে রাখে। ফলে হাঁটার সময় আসলেই যখন ইঁদুরটি সেই শব্দ শুনতে পায়, ফটো-নেগেটিভ শব্দটিকে তখন বাতিল করে দেয়।

অন্যদিকে, কোনো অপ্রত্যাশিত শব্দ শুনতে পেলে অডিটরি কর্টেক্সের নিউরনে খুবই জোরালো প্রতিক্রিয়া হয়। শারীরবৃত্তিক এ প্রবণতা কেবল পায়ের শব্দেই সীমাবদ্ধ না। আমরা যখন কীবোর্ডে টাইপ করি, কীস্ট্রোকের শব্দ আমাদের কানে এলেও আমরা বিরক্ত হই না। কিন্তু পাশে বসে থাকা অন্য কারো টাইপ করার শব্দ সহজেই আমাদের বিরক্তি উদ্রেক করে।

যেসকল প্রাণি নিয়মিত শিকারের হাত থেকে নিজদের রক্ষা করে চলে, যেমন ইঁদুর, তাদের জন্য এই প্রক্রিয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজেস্ব স্বতঃস্ফূর্ত শব্দ থেকে পারিপার্শ্বিক শব্দ আলাদা করার তাৎক্ষণিক ক্ষমতা তাদেরকে সমূহ বিপদের হাত থেকে বাঁচায়।

তাছাড়া আমরা যখন কথা বলি, গান গাই কিংবা কোনো যন্ত্রে সুর তুলি– তখনও এটা কাজে আসে। যেমন, গিটার বাজাতে বসলে আমাদের একটা পূর্বধারণা থাকে– ঠিক কোন ধরনের সুর তুলব আমরা। কিন্তু প্র্যাক্টিস করার সময় অনেক ভুল হয় আমাদের। ব্রেইনের সেই মেকানিজম একটা ভুল নোট শুনলেই সাথে সাথে আমাদেরকে তা জানান দিয়ে দেয়। ফলে আমরা ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাই।

বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে বোঝার চেষ্টা করবেন কীভাবে এসকল “এরর সিগনাল” আমাদের ভাষা শিক্ষা ও সঙ্গীতচর্চায় ভূমিকা রাখে। তাছাড়া এ গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে গবেষকরা স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ব্যাপারে আরো অনেক কিছু জানতে পারবেন বলে আশা করছেন। কারণ স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগীরা প্রায়ই স্পষ্টভাবে কিছু কাল্পনিক শব্দ শুনতে পান। হতে পারে, ব্রেইনের যেসকল সার্কিট শব্দ উপেক্ষা ও শনাক্ত করে থাকে, সেগুলি এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

সূত্র. হাও স্টাফ ওয়ার্কস/সায়েন্স