দিনে কত ঘণ্টা ঘুমানো স্বাভাবিক?

মানুষের কিভাবে ঘুমানো উচিৎ? প্রতিরাতে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ৮ ঘণ্টা? নাকি এই ৮ ঘণ্টা সময়কে ভাগ করা উচিৎ দুইভাগে? অথবা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৬ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমালেই চলবে?

আমরা জানি মানুষের ঘুমের অভ্যাস গত কয়েক হাজার বছর ধরে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি না কিভাবে এই পরিবর্তন মানব চৈতন্য, সমাজ এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত। আমাদের এটাও জানা নেই এই পরিবর্তনগুলো মানুষের বিশ্রামের ‘ন্যাচারাল মুড’ বা ‘স্বাভাবিক ধরন’ বিষয়ে কি ঈঙ্গিত করে।

সঠিকভাবে ঘুমের আয়োজন করা ও উপভোগ করার পদ্ধতি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক চলছেই। এক্ষেত্রে দুইটি প্রধান চিন্তাধারা বিতর্কটির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে। প্রথম চিন্তাধারার সমর্থনকারী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘স্বাভাবিক’ বিশ্রাম সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণাটি, অর্থাৎ রাত থেকে ভোর পর্যন্ত একটানা ঘুমের ধারণাটি আসলে আধুনিকতার একটা বাইপ্রোডাক্ট এবং মানুষের বিবর্তনের রাস্তায় নেয়া একটি ভুল মোড়।

অন্য মতের সমর্থকরা বলেন, আমরা পূর্বপুরুষদের ঘুম নিয়ে জল্পনাকল্পনা করা বন্ধ রাখি। কারণ এটা স্পষ্ট নয় যে উজ্জ্বল আলো ও ‘বিগ টেক’ বা বৃহৎ প্রযুক্তিগুলো থেকে দূরে থাকলেই আমরা ‘বাইফেসিক স্লিপ’ বা দিনে দুইবার ঘুমানোর অভ্যাস পুনরুদ্ধার করতে পারব কি না।

গবেষকরা নিজেদের অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন রকমের প্রমাণ ব্যবহার করেন। বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ঘুমের মধ্যে পার্থক্যগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। বিশেষ করে গ্রেট এপস (আকা হমিনিডস) হিসেবে শ্রেণীভুক্ত ছয়টি প্রজাতির সাথে মানুষের ঘুমের পার্থক্যের উপরে তাঁরা বেশি জোর দেন।

অন্যান্য গবেষকেরা সমকালীন শিকারী-সংগ্রহকারী (হান্টার-গেদারার) গোত্রগুলোর ঘুমের ধরণকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। আবার অন্য একদল গবেষক মানুষের ঘুমের ঐতিহাসিক দলিল নিয়ে ঘাটাঘাটি করেন। তাঁদের লক্ষ্য হলো কিভাবে সামাজিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন মানুষের বিশ্রামের সময়কে প্রভাবিত করেছে তা খুঁজে বের করা। স্বাভাবিকভাবেই, একেক গবেষণা পদ্ধতির ফলাফল হয়েছে একেক রকম।

প্রতিটি পক্ষেরই বিশ্বাসযোগ্য প্রবক্তা এবং শক্তপোক্ত প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু কারোর কাছেই একদম শতভাগ নিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ডিউক ইউনিভার্সিটির একদল এনথ্রোপোলজিস্ট এবং সাইকিয়াট্রিস্ট এই বিতর্কের সারমর্ম তুলে ধরেন। এতে ঘুমের বিবর্তন সম্পর্কিত সব মতবাদই উঠে এসেছে।

প্রায় দুই মিলিয়িন বছর আগে হোমো ইরেকটাস গোত্রটি শারীরিকভাবে এতটাই বেড়ে ওঠে যে এদের পক্ষে গাছের উপর ঘুমানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে এরা মাটিতে ঘুমানো শুরু করে। গাছের ডাল থেকে মাটিতে নেমে আসার এই পরিবর্তনকে মানুষের চেতনা ও সামাজিক উন্নয়নের একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিচেবচনা করা হয়। ডিউক প্রতিবেদনের সহ-রচয়িতা চার্লস নান, ডেভিড স্যামসন এবং এনড্রু ক্রিস্টাল এই বিষয়ে লিখেন, “গাছের উপর ঘুমানোর অসুবিধাগুলো থেকে মুক্ত হওয়ার ফলে তারা আরো দীর্ঘমেয়াদী ও উচ্চমানের ঘুম অর্জন করলো, যা হয়ত তাঁদের জাগ্রত চৈতন্যকে উন্নত করবে”।

মানুষের সাথে অন্যান্য গ্রেট এপসদের ঘুমের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে। ইভল্যুশনারি এনথ্রোপোলোজির দাবী অনুযায়ী, এই প্রজাতিটি মানুষের সবচেয়ে নিকটবর্তী পূর্বপুরুষ যারা ১৪ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে বিচরন করত। তো, এদের সাথে মানুষের ঘুমের মিলের ব্যাপারে একটি উদারহরণ দেয়া যাক। পৃথিবীতে মানুষেরাই একমাত্র প্রাণী যারা ঘুমানোর সময় মাথার নিচে বালিশ দেয়। কিন্তু আমরাই একমাত্র প্রজাতি নই যারা ঘুমানোর জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করি। গ্রেট এপস প্রজাতির সবগুলো প্রাণীই ঘুমানোর জন্য উপযুক্ত জায়গা বাছাই করে নিত এবং প্ল্যাটফর্মের মত কিছু একটা তৈরি করত ঘুমানোর জন্য। এই অভ্যাসটি সম্ভব্ত চৌদ্দ থেকে আঠারো মিলিয়ন বছর আগেই শুরু হয়েছিল।

কিন্তু কিছু দিক দিয়ে মানুষের ঘুম অন্যান্য প্রাণীদের থেকে স্বতন্ত্র। সব মানুষই ভূমিতে ঘুমায়। কিন্তু অন্যান্য গ্রেট এপসদের মধ্যে পুরুষেরা তখনই ঘুমানোর জন্যে মাটিতে নামে যখন অন্যের শিকারে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

স্লিপ আর্কিটেকচারের অনুযায়ীও মানুষের ঘুম অন্যদের তুলনায় বিশিষ্ট। স্লিপ আর্কিটেকচার বলতে বুঝায় ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ের গঠন ও বিন্যাস। অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের তুলনায় মানুষ অনেক কম সময় ঘুমায়। তাদের বিশ্রামের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে থাকে রেম (REM: রেপিড আই মুভমেন্ট)। রেম হলো ঘুমের একটা নির্দিষ্ট পর্যায় যখন মানুষ স্বপ্নের সবচেয়ে স্পষ্ট অংশটুকু দেখতে পায়।

সকল গ্রেট এপসদের ঘুমের ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিবর্তন এসেছে মানুষের ঘুমেই। আমরা এটা জানি কারণ বিজ্ঞানীরা একটা গোত্রের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে তুলনা করে দেখাতে পারেন যে এদের মধ্যে কোনো একটি প্রজাতি অন্যান্যগুলোর চাইতে বিশেষভাবে বিবর্তিত হয়েছে কি না। উদাহরণস্বরূপ, মানুষেরা গ্রেট এপস গোত্রের প্রাণী। আবার অন্যান গ্রেট এপসদের তুলনায় মানুষের ঘুমের বিবর্তন ঘটেছে অনেক বেশি। বিবর্তনের উপর ভিত্তি করে তাই মানুষের ঘুম নিয়ে সঠিক ভবিষ্যতবাণী করা যায় না।

অন্যভাবে বলা যায়, গত কয়েক শত বছর ধরে শিম্পাঞ্জিদের ঘুমের ক্ষেত্রে যেসব পরিবর্তন এসেছে তার উপর ভিত্তি করে কি আমরা মানুষের ঘুমকে যাচাই করতে পারি? অবশ্যই পারি না। তার কারণ মানুষের ঘুমের বিবর্তন ঘটেছে অনেক বেশি স্বতন্ত্রভাবে, যা অন্যদের সাথে খাপ খায় না।

আমরা জানি শারীরিক আকৃতি, সামাজিক কাঠামো, জীবনধারণের পরিবেশ এবং অন্যান্য আচরণ ও বৈশিষ্ট্যের সাথে সাথে মানুষের ঘুমেরও বিবর্তন ঘটেছে ব্যাপকভাবে। এখন আমরা বড় একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। মানুষের ঘুম কি এতটা বিবর্তিত হওয়ার কথা ছিল? আমরা কি ইতিহাসের এমন একটি পর্যায়কে চিহ্নিত করতে পারি যখন মানুষেরা সেভাবেই ঘুমিয়েছে যেভাবে আমাদের আসলেই ঘুমানো ‘উচিৎ’?

ইতিহাসবিদ ই. রজার এরিক ২০০৫ সালে এই বিষয়ে একটি থিয়োরি প্রদান করেন। তাঁর মতে, বাইফেসিক অথবা দিনে দুইটি পর্যায়ে বিভক্ত ঘুমই ‘ন্যাচারাল’। কৃত্রিম আলো মানুষের বাইফেসিক ঘুমের অভ্যাসকে নষ্ট করেছে। মানব সভ্যতার কোনো একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে আমাদের পূর্বপুরুষেরা বাইফেসিক ঘুমের নিয়ম মেনে চলতেন। তাঁরা রাত নটা’র দিকে ঘুমাতে যেতেন আর মাঝরাতের দিকে উঠে পড়তেন। কয়েকঘণ্টা এই কাজ সেই কাজ করে আবার দ্বিতীয়বার ঘুমাতে যেতেন। বাইফেসিক ঘুম বিলুপ্ত হয় শিল্প বিপ্লবের সময়ে, যখন কৃত্রিম আলো সস্তা ও সহজলভ্য হয়ে ওঠে।

বাইফেসিক ঘুম কিভাবে বিলুপ্ত হলো সে বিষয়ে আমরা ইতিহাস থেকে স্পষ্ট ধারণা পাই। কিন্তু কিভাবে এটির উৎপত্তি হলো তা এখনো স্পষ্ট নয়। এটা নিশ্চিত যে মেশিন টুলস এর আবির্ভাবের আগে দুইটি পর্যায়ে বিভক্ত ঘুমের প্রচলন ছিল। কিন্তু এর আগে কি ছিল? এমনটা মনে করার মত যথেষ্ট কারণ কি আমাদের রয়েছে যে প্রাচীন যুগে মানুষের ঘুম দিনে একাধিক পর্যায়ে বিভক্ত ছিল? বিববর্তনবাদী বৈজ্ঞানিকেরা এই বিষয়ে এখনো ততটা নিশ্চিত নন।

এক্ষেত্রে আরো একটি তত্ত্বের উল্লেখ করা যেতে পারে যা বিবর্তনবাদীদের চোখে বেশি সমর্থনযোগ্য এবং যা প্রাচীন ও আধুনিক সমাজের মধ্যে তুলনার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক আলো আবিষ্কৃত হওয়ার আগেও মানুষ প্রতি রাতে একটানা প্রায় ৭ ঘণ্টা ঘুমাতো, ঠিক যেমন এখনকার দিনের মানুষেরা ঘুমায়। কয়েকবছর আগে প্রকাশিত ইউ সি এল এ গবেষণায় উঠে এসেছে এই তত্ত্বটি।

সাইকিয়াট্রিস্ট ও ঘুম বিশেষজ্ঞ জেরোমি সিয়েগেল এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় আধুনিক যুগের তিনটি শিকারী-সংগ্রহকারী (হান্টার-গেদারার) গোত্রের মানুষের মধ্যে তুলনা করা হয়েছে যারা ‘টেক-ফ্রি’ বা ‘শিল্প-বিযুক্ত’ জীবন কাটাতো যা প্রাক শিল্পায়ন যুগের মানুষদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। গবেষোণায় উঠে এসেছে যে, তিনটি গোত্রের মানুষেরা আজকের দিনের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের মতই প্রতি রাতে প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমাতো।

আমরা যদি এই তত্ত্ব গ্রহণ করি, তাহলে প্রাক শিল্পায়ন যুগের বাইফেসিক ঘুমের বাতিক সম্পর্কে আমরা কি বলব? দুটি পর্যায়ে বিভক্ত ঘুম সম্ভবত এসেছে বিষুবীয় অঞ্চল থেকে মানুষের অভিপ্রয়াণের ফলে। কারণ এই অভিপ্রয়াণের ফলে মানুষ পৃথিবীর এমন প্রান্তে এসে হাজির হয় যেখানে দিনের চাইতে রাত দীর্ঘতর। এই বিষয়ে ২০১৫ সালে সিয়েগেল দ্য আটলান্টিক কে বলেন, “রাত দীর্ঘ হওয়ার ফলেই ঘুমের এই বিশেষ ধরণ তৈরি হয়েছিল। আবার বৈদ্যুতিক বাতির আবির্ভাবের ফলে মানুষ প্রাচীন অভ্যাস পুনরুদ্ধার করে নিয়েছে”।

এই তত্ত্বের সমর্থনে আরো কিছু যুক্তি হাজির করা যাক। ডিউক টিম “স্লিপ ইনটেনসিটি হাইপোথিসিস” এর কথা বলে, যেখানে দাবী করা হয় যে প্রাচীন মানুষেরা যখন ঘুমানোর জন্য ভূমিকে বেছে নেয় তখন তাঁদের ঘুমের পরিমাণ কমে যায়।

ভূমিতে বসবাস করার ফলে মানুষ নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, যেমন নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা, শিকারী পশুদের সাথে মোকাবিলা ইত্যাদি। এরফলে তাঁদের বেশিক্ষণ জেগে থাকার এবং উন্নত মস্তিষ্কের প্রয়োজন পড়ে এবং গভীর ঘুম তাঁদের সামাজিক ও চৈতন্যগত উন্নয়নকে অব্যাহত রাখে। তাই তাঁরা পূর্বপুরুষদের সাত ঘণ্টার “মনোফেসিক স্লিপ” বা নিরবিচ্ছিন্ন ঘুমকে বিবর্তনের একটি অত্যাবশ্যকীয় ধাপ হিসেবে বিবেচনা করে।

যাহোক, যেসব গবেষকেরা মনে করেন যে আধুনিক যুগের মনোফেসিক ঘুমের পিছনে কোনো যুক্তি সঙ্গত ব্যাখ্যা রয়েছে, তাঁরা হয়ত এই ধারণাকে বাতিল করে দিবেন যে কৃত্রিম আলো আমাদের স্বাভাবিক ঘুমের অভ্যাসকে ব্যাহত করেছে। কিন্তু তাঁরা ঠিকই লক্ষ্য করছেন কিভাবে প্রযুক্তিগত ও সামাজিক উন্নয়ন আমাদের ঘুমের উপর প্রভাব বিস্তার করছে। ডিউক প্রতিবেদনে গবেষকেরা তিনটি পূর্বানুমান উপস্থাপন করেছিলেন। এর মধ্যে দ্বিতীয়টি ছিল, উন্নত বিশ্বে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার বৃদ্ধি, পৃথক বেডরুমের প্রচলন এবং দিনের বেলা ঘুমের পরিমাণ কমে যাওয়াকে আমরা ঘুমের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটানোর জন্য দায়ী করতে পারি।

একটি মধ্যবর্তী অবস্থান অবশ্য রয়েছে যা বিভিন্ন সমাজ ও গোত্রের মানুষের ঘুমের ঐতিহাসিক দলিল ও সাম্প্রতিক ঘুমের নিদর্শনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই মতবাদ অনুযায়ী, ঘুমের ক্ষেত্রে মানুষ অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের চাইতে অনেক বেশি নমনীয় (ফ্লেক্সিবল)। একটু আগে উল্লেখ করা ইউ সি এল এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আধুনিক যুগের তিনটি শিকারী-সংগ্রহকারী সমাজের কথা। কিন্তু প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন সব সামাজিক গোত্রই এই সাত ঘণ্টা ঘুমের নিয়ম মেনে চলে না। যেমন, পিরাহা নামক উত্তর আমেরিকার শিকারী-সংগ্রহকারী গোত্র। এই গোত্রের মানুষেরা দিনে ও রাতে দুইবার ঘুমায় এবং তাঁদের দৈনন্দিন কাজ সাধারণত রাতেই করে থাকে। গবেষণায় আরো উঠে এসেছে যে, পেনসিলভানিয়া ওল্ডার অ্যামিশ গোত্রের লোকেদের অর্ধেকের বেশিই সপ্তাহে অন্তত একদিন দিনের বেলা ঘুমায়।

স্কুল-কলেজের সেরা শিক্ষার্থীরা কেন কম ধনী ও বিখ্যাত হয়

ত্যিকারের সফল হয় তারাই যারা সবকিছুকে জোরে একটা ঝাঁকি দিতে পারে।
বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কারেন আর্নল্ড বলেন, “আপসকারী আর সিস্টেমকে মেনে নেয়াদেরকেই কিন্তু আমরা সাফল্যের স্বীকৃতি দিচ্ছি।”
মানে, সেরা রেজাল্ট করা শিক্ষার্থীরা আসলে শিক্ষকরা কী চায় তা ধরে ফেলতে পেরেছিল এবং সেটাই তারা নিয়মিত পরীক্ষার খাতায় দিয়ে যাচ্ছিল। এ কারণেই তারা সফল হতে পেরেছিল।
কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী চিন্তক ও নেতাদের বিশেষত্ব হলো তারা কিছু রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক সমস্যার অভূতপূর্ব সমাধান এনে দিয়েছিল। যে জিনিসটা অলরেডি ঠিকঠাকভাবে কাজ করছিল এমন কোনো কিছুকে পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে কেউ কখনই বিখ্যাত হতে পারবে না।
বার্কার বলেন, “স্কুলে নিয়মকানুন একদম নির্দিষ্ট করে দেয়া। কিন্তু বাস্তব জীবনে নিয়মকানুনের ঠিকঠিকানা থাকে না। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো বদ্ধ একটা সিস্টেম থেকে বের হওয়ার পর আসলে অল্পস্বল্প নিয়ম-না-মানারাই ভালো করতে পারে।”
২. জেনারেলিস্টরাই স্কুল কলেজে ভালো করে, কিন্তু বাস্তব জীবনে ভালো করে প্যাশনেট আর নির্দিষ্ট এক বিষয়ে দক্ষরা।
বার্কার বলেন, স্কুল বা কলেজে থাকাকালীন কেউ যদি ইতিহাস বিষয়ে খুব আগ্রহী হয়, তবু সে সবকিছু ছেড়ে কেবল ইউরোপিয়ান রেনেসাঁ নিয়ে পড়ে থাকতে পারবে না। আগ্রহ থাকুক বা না থাকুক, একসময় তাকে ম্যাথ হোমওয়ার্ক নিয়ে বসতে হবেই।
কিন্তু বাস্তব জীবনে তার উল্টোটা। আপনাকে কোনো এক নির্দিষ্ট বিষয় বা ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠতে হবে। এবং অন্যান্য জ্ঞান বা দক্ষতা তখন খুব একটা কাজে লাগে না।
এবং সবচেয়ে বড় চমকটা হলো: আর্নল্ড তার গবেষণায় এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে ইন্টেলেকচুয়াল শিক্ষার্থীরা, যারা কোনোকিছু শিখার ব্যাপারে সত্যিকারের আগ্রহী, স্কুল কলেজে ভালো করতে পারে না।
পুরো গবেষণাটি সামারাইজ করে বার্কার বলেন, “স্কুল কলেজের সেরা রেজাল্ট করা শিক্ষার্থীরা মূলত প্রচলিত সিস্টেমকে সাপোর্ট করে এমন সব কাজে ভালো করে। তারা প্রচলিত সিস্টেমেরই অংশ হয়ে ওঠে। কিন্তু তারা এই সিস্টেম ছুঁড়ে ফেলতে পারে না বা তাতে কোনো নতুন পরিবর্তন আনতে পারে না।”
তবে এর মানে এই নয় যে আপনি যদি স্কুল কলেজের সেরা রেজাল্টকারীদের একজন হয়ে থাকেন, আপনি কখনই বড় কোনো সাফল্য পাবেন না। আপনিও তেমন সফল হতেই পারেন।
কিন্তু সেক্ষেত্রে আপনাকে মাথায় রাখতে হবে যে প্রচলিত ও প্রত্যাশিত নিয়ম সবসময় মেনে চললে বাস্তব জীবনে সাফল্য পাওয়া যাবে না। ঝুঁকি নেয়া ও স্রোতের বিপরীতে সাঁতরে যাওয়া কঠিন বটে, কিন্তু কেবল এভাবেই আপনি যেতে পারবেন বহুদূর।

অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করতে ধনীরা যেভাবে ভূমিকা রাখছে

অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পদ ও আয়ের ভারসাম্যহীনতার সমস্যা আমেরিকায় দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এই গবেষণাগুলির ফল হতে পারে আমেরিকার অর্থনৈতিক উন্নতি ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। অথচ অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার ব্যাপারে ফেডারেল সরকারের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। এছাড়াও, অনেক স্টেইট এর তা মোকাবেলা করার মতো অবস্থাও নেই।
কিছু গবেষণায় এও দেখা গেছে, সরকারের উপর প্রভাব সবচেয়ে বেশি আছে ধনীদেরই। অর্থাৎ, এই অসাম্য নিয়ে প্রভাব বিস্তারী কাজ করার ক্ষমতা আছে কেবল ধনীদেরই। অন্যদের পক্ষে তা অসম্ভব। আর অল্প সংখ্যক কিছু ধনী আমেরিকান সত্যিই সেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাদের সময় ও অর্থ দিয়ে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন অর্থনৈতিক এই বৈষম্য দূর করতে।

বাড়তে থাকা বৈষম্য

সর্বশেষ ২০১৩ সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ধনীরা (মোট জনগণের যারা মাত্র ১০%) পুরো দেশের ৭৬% সম্পদের মালিক। অর্থাৎ, প্রতি ১০ ডলারে ৭.৬০ ডলারেরই মালিক তারা এবং বাকি ৯০% জনগণের জন্য রয়েছে মাত্র ২.৪০ ডলার। এবং সম্পদের এই ভারসাম্যহীনতা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। অথচ ১৯৮৯ সালে ১০% ধনী ব্যক্তিদের কাছে ছিল দেশের ৬৭% সম্পদ।

তবে কিছু ধনী ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় নীতি ও কর্পরোরেশনগুলিকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে বাড়তে থাকা এই বৈষম্য মোকাবেলা করতে এগিয়ে আসা শুরু করেছেন। তেমনই একজন হলেন ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম ‘ব্ল্যাকরক’ এর সাবেক ম্যানেজিং ডিরেক্টর মরিস পার্ল। মরিস ‘ক্যারিড ইন্টারেস্ট’ নামক কর ফাঁকি দেয়ার একটি উপায় আইনি সহায়তায় বাতিল করেন। ‘ক্যারিড ইন্টারেস্ট’ এর মাধ্যমে অসংখ্য ফিনানশিয়াল ম্যানেজার তাদের করের পরিমাণ কমিয়ে ফেলত। আরেক উদাহরণ হলেন ‘চবানি ইয়োগার্ট’ এর প্রতিষ্ঠাতা হামদি উলুকায়া। তিনি তার কোম্পানিটি বিক্রি করে দেয়ার আগে সব এমপ্লয়িদেরকে কোম্পানিটির একটি ওউনারশিপ স্টেইক দিয়ে দেন। অথচ এটি না করলে তিনি একা অনেক লাভ করতে পারতেন।

আয়নায় তাকানো

এই অল্পসংখ্যক মানুষদের আরেক উদারণ টি. জে. জ্লোৎনিৎস্কি। সবার প্রথমে তিনি নিজে একটি টেক কোম্পানি গড়ে তুলে নিজেকে ধনীদের কাতারে তোলেন। এরপর তিনি দাবি তোলেন যেন কোম্পানিগুলি কর্মীদের বেতন বাড়ায় এবং সরকার যেন ধনীদের ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। জ্লোৎনিৎস্কি নিজে অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার চেষ্টায় থাকা ধনীদের একটি সংস্থা ‘পেট্রিওটিক মিলিওনেয়ার’ এর সদস্য। একটি ব্লগ পোস্টে তিনি বলেন:
“আমার পরিবার যে সমস্ত সুযোগ ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাদি পেয়েছে সেগুলি কেবল আমেরিকাতেই সম্ভব, আর এইগুলি ছাড়া আমার এই গল্প ছিল অসম্ভব।”

তার মতো আরও ধনী ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানার জন্য কিছু সাক্ষাৎকারের আয়োজন করা হয়েছিল। এই সাক্ষাৎকারগুলি নেয়া হয়েছিল সারা দেশের ২০ জন ব্যক্তির যারা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার চেষ্টায় নিয়োজিত অলাভজনক কিছু প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। প্রতিষ্ঠানগুলির নাম তারা প্রকাশ করতে চান নি। এই ২০ জনের প্রত্যেকেই নিজেদেরকে ‘ধনী বন্ধু’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। তাদের দাবী, তারা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে স্বল্প আয়ের মানুষদের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। এই ২০ জন ব্যক্তি আমেরিকার ধনী ব্যক্তিদের উজ্জ্বলতম উদাহরণ। তাদের বেশিরভাগই সাদা চামড়ার এবং পুরুষ। বয়সের দিক থেকে তারা সব প্রজন্মকেই প্রতিনিধিত্ব করেন। কেউ কেউ উত্তরাধিকারসূত্রেই ধনী। আবার কেউ কেউ স্বল্প আয়ের পরিবারে জন্ম নিলেও সময়ের সাথে সাথে নিজেই গড়ে নিয়েছেন নিজের ভাগ্য।
জ্লোৎনিৎস্কির মতো বাকিরাও বলেছেন যে এই ব্যাপারে কাজ করতে গিয়ে তারা সবার আগে এক ধরণের গভীর উপলব্ধির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য ছিল আর্থিক বৈষম্য দূর করতে গিয়ে নিজেদের মর্যাদা ও অবস্থানের কারণে তারা যে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন তা চিহ্নিত করা।

প্রথমত, তারা এটা মেনে নেন যে তাদের সম্পদের জন্য তারা অংশত ঋণী এমন এক সিস্টেমের কাছে যে সিস্টেম তাদের যোগ্যতা ও চেষ্টার বাইরেও তাদেরই অনুকূলে ছিল। বিশাল সম্পদের জন্য সিস্টেমের এই সহায়ক ভূমিকা বা ভাগ্যের কাছে ঋণী থাকার এই উপলব্ধি সহজ কোনো কাজ নয়। কারণ ‘যেটা যার প্রাপ্য সেটাই সবাই পায়’ এমন একটা প্রচলিত ধারণা সবার মনেই গেঁথে আছে। ‘বর্ন অন থার্ড বেইজ’ নামক স্মৃতিকথায় চাক কলিন্স এমনই এক আত্মোপলব্ধির গল্প বলেছেন। অস্কার মায়ের এর সম্পত্তির উত্তরাধিকার হয়েছিলেন চাক কলিন্স যা তিনি গ্রহণ না করে দান করে দিয়েছিলেন। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের আগে আরোপিত কর ‘এস্টেট ট্যাক্স’ সংরক্ষণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন এখন কলিন্স। একই সাথে তিনি অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যাপারে আরো গবেষণা করে যাচ্ছেন।

পরের ধাপটি হচ্ছে লজ্জ্বাকে দূর করা। বাড়তি সুবিধা পাওয়ার ব্যাপারটা উপলব্ধি করার ফলে ২০ জন ধনী ব্যক্তির অনেকেই লজ্জ্বিত হয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় একজন বাইসেক্সুয়াল নারীর কথা যিনি ২১ বছর বয়সেই প্রায় ১ মিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েছিলেন। তিনি বলেন, তার বন্ধুদের কাছে একজন লেসবিয়ান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করাটা তার কাছে বরং সহজই ছিল। সে তুলনায় নিজেকে মিলিয়নেয়ার হিসেবে পরিচয় দেয়াটা তার জন্য বেশি কঠিন ছিল। ধনী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয়ার ব্যাপারটা অস্বস্তিকর — সাক্ষাৎকার দেয়া ২০ জনের মধ্যে অনেকের কাছ থেকেই এই রকম প্রতিক্রিয়া পাওয়াটা বেশ অবাক করা ব্যাপার ছিল। কারণ বেশিরভাগ আমেরিকানদের কাছেই তাদের সম্পদের পরিমাণ তাদের যোগ্যতার পরিচয়।
অপরাধবোধ আর লজ্জ্বা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি এই ‘ধনী বন্ধু’দের একটি ভয় ছিল তাদের প্রতি অন্য ধনী ব্যক্তিদের প্রতিহিংসা। ধনীদের উপর কর আরোপের পক্ষে কাজ করা জাতীয় তাদের কর্মকাণ্ডগুলি অন্য ধনীদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছিল। ফলে তা ছিল অন্য ধনীদের জন্য উদ্বেগের।

তবে সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি হওয়া ২০ জনের মধ্যে সবাই এই বিষয়ে একমত যে ‘ধনী বন্ধু’ হওয়ার জন্য এই কাজগুলি কঠিন হলেও জরুরি ছিল। অনেকেই বলেছেন নৈতিক সমর্থনের জন্য তারা একই মানসিকতার মানুষদের উপর ভরসা করেছেন।

জনসেবা বা ফিলানথ্রোপির সমস্যা

অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কিছু করতে চায় এমন বেশিরভাগ ধনী ব্যক্তিই তাদের কিছু টাকা দান করে দেন। তবে অর্থনীতিবিদ ইন্দ্রনীল দাসগুপ্ত ও রবী কানবুর এর গবেষণা অনুযায়ী, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য ফিলানথ্রোপি আদর্শ উপায় নয়।
ফিলানথ্রোপির ব্যাপারে অন্যান্য ধনী ব্যক্তির তুলনায় সাক্ষাৎকারের ২০ জন ধনী ব্যক্তির ছিল ভিন্ন ধারণা। সবাই তাদের সম্পদের অন্তত কিছু অংশ দান করেছেন। কেউ কেউ এমনকি তাদের অর্জিত পুরো সম্পদই দান করেছেন। কিন্তু বেশিরভাগই তাতেই থেমে না থেকে আরো কিছু কাজ করেছেন। যেমন, ধনীদের উপর কর বাড়ানোর জন্য লবি করা বা কর্মীদের বেতন বাড়ানোর জন্য কর্পোরেট বোর্ডগুলিকে চাপ দেয়া ইত্যাদি। অর্থনৈতিক সাম্যের জন্য যা সম্ভাব্য ২টি সমাধান।

কেউ কেউ বলেন, তাদের মনে হয়েছে তারা যেন আরো কার্যকর ভাবে ফিলানথ্রোপি করার অন্য আরেক পথ খুঁজে পেয়েছেন। যেমন, একজনের মনে হয়েছিল তার টাকা কোথায় খরচ হওয়া উচিত সেটা ঠিক করার জন্য তিনি সঠিক ব্যক্তি নন। প্রথমে তিনি তারই মতো উচ্চমধ্যবিত্তদের সৃষ্ট ও পরিচালিত বিভিন্ন চ্যারিটি সংস্থাসমূহে দান করতেন। তারপর তিনি এমন সংস্থাসমূহে দান করা শুরু করলেন যেগুলির পরিচালনায় রয়েছে গরীবরা নিজেরাই। এইভাবে তিনি তার এলিট ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন গরীবদের কাছে। কারণ তার মনে হয়েছিল নিজেদের উন্নতি কীভাবে করতে হয় সেটা তারা তার চেয়ে ভালো জানে।

এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করতে ‘ধনী বন্ধু’ হতে গেলে এমন প্যারাডাইম শিফট এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সাক্ষাৎকারের ২০ জন ‘ধনী বন্ধু’ বলেন, তাদের কাছে অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় মনে হয়েছে গরীবদের কাছে নিজেদের ক্ষমতা স্বেচ্ছায় হস্তান্তর করা। এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া অনেক ধনীদের জন্যই অস্বস্তিকর ও কঠিন একটা ব্যাপার হবে। কিন্তু তাদের এই চেষ্টা যদি আমেরিকার অর্থনীতি আর গণতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়, তবে তা কঠিন হলেও জরুরি ।

বর্তমানের বিবেচনায় ভবিষ্যৎ অনুমানের সমস্যা—সাইকোলজিস্ট ড্যানিয়েল গিলবার্টের সাক্ষাৎকার

ভবিষ্যতের কোনো ঘটনায়  আপনি কীরকম অনুভব করবেন তা এখনই বোঝার চেষ্টাকে সাইকোলজিস্টরা বলেন ‘এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং ‘বা ‘অনুভূতিমূলক পূর্বাভাস’। তারা মনে করেন, আমরা এই কাজ খুব একটা ভাল পারি না।  ‘বর্তমান’ এর ফিল্টার দিয়ে ‘ভবিষ্যৎ’ দেখতে সমস্যা হয় আমাদের। ফলে  কী আমাদের ভবিষ্যতে সুখের যোগান দিতে পারবে, সে হিসাবে প্রায়ই গড়বড় হয়ে যায়।

এ বিষয়ক গবেষণা ও আবিষ্কার নিয়ে ২০০৬ সালে নিউ ইয়র্কের আলফ্রেড এ. কা’নফ প্রকাশনী থেকে বের হয় আমেরিকান সোশ্যাল সাইকোলজিস্ট ড্যানিয়েল গিলবার্টের বই  স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’। 

১৯৯৬ সাল থেকে আমেরিকার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টে প্রফেসর হিসাবে কাজ করছেন গিলবার্ট। আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস প্রদেশের ক্যামব্রিজ শহরে থাকেন তিনি।

নিচে থাকছে পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউজ ওয়েবসাইটের প্রশ্নোত্তর সেকশনে  প্রকাশিত ‘স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’ বই সম্পর্কিত সাক্ষাৎকারের বাংলা অনুবাদ।

সাইকোলজিস্ট ড্যানিয়েল গিলবার্টের সাক্ষাৎকার

অনুবাদ : আয়মান আসিব স্বাধীন

আপনার কাছে ‘অনুভূতিমূলক পূর্বাভাস’ (এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং) এর সংজ্ঞা কী? বেশ কিছু জায়গায় আপনি বলেছেন, আপনি নাকি সুখ নিয়ে গবেষণা করেন—এ দুইটা বিষয় ঠিক কীভাবে যুক্ত?

মানুষজন যখন এমন আন্দাজ করার চেষ্টা করে, ভবিষ্যতে ঠিক কোন জিনিসগুলি তাদেরকে সুখী করে তুলতে পারবে, তখন তাদের হিসাবে ভুল হয়। এ প্রক্রিয়াকেই টিম উইলসন এবং আমি ‘এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং’ বলেছি। “আমার মনে হয় আমি ভ্যানিলার চাইতে বরং চকলেট বেশি প্রেফার করব” অথবা “ব্যাঞ্জোবাদক হওয়ার চাইতে আইনজীবী হওয়ার ইচ্ছা বেশি আমার”—যিনি জীবনে কখনো এমন কিছু বলেছেন, তিনি আসলে ‘এফেক্টিভ ফোরকাস্ট’ই করেছেন। এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং করার পর তাদেরকে কখনো কখনো কষ্ট করে বুঝে নিতে হয় যে তাদের ভুল হয়েছিল। ‘স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’ বইয়ে এটাই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে যে কেন এবং কীভাবে আমাদের মস্তিষ্কের কাঠামো এধরনের ভুল করার জন্যই গঠিত, আর এক্ষেত্রে কী কী করার আছে আমাদের।

এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন কীভাবে? এ বিষয়ে কোন জিনিসটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী করে?

দশ বা পনেরো বছর আগে যখন আমার ডিভোর্সের কাজ চলছিল, তখন হুট করেই আমার গুরু মারা গেলেন। আমার টিনএজ ছেলেটাও ভাল সমস্যায় পড়েছে তখন, আর আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে সম্পর্কও বেশ খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু আমার অবস্থা… খুব একটা খারাপ ছিল না আসলে। এসব ঘটনার এক বছর আগে যদি আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন, এর মধ্য থেকে যেকোনো একটা ঘটনার মুখোমুখি হলেও আমার কী হাল হবে, আমি হয়ত বলতাম খুবই লম্বা সময়ের জন্য একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ব আমি। তেমনটা কিন্তু হয় নাই। আমি অবশ্যই খুব উচ্ছ্বসিত ছিলাম না, তবে যতটা বিচলিত হয়ে পড়ব বলে মনে করতাম তার ধারেকাছেও কিছু হয় নি। আর তখনই আমি চিন্তা করা শুরু করলাম যে, এ ধরনের দুর্ঘটনার আবেগজাত ফলাফল নিয়ে আমার আগের ধারণায় যে ভুল হত, তা কি কেবল আমারই হয় নাকি অন্যরাও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। এরপর আমি আর মনোবিদ টিম উইলসন একসাথে কাজ করা শুরু করি।

বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা করলাম দু’জনে মিলে। যা জানতে পারলাম তা রীতিমত হতবুদ্ধি করে দিল আমাদের। ভবিষ্যতের ঘটনাবলির প্রতি তাদের আবেগী অবস্থান কী রকম হবে, সে সম্বন্ধে নিয়মিতই মানুষ নাটকীয় সব ভুল ধারণা করে থাকে। এসব ফলাফল থেকে একটা নির্দিষ্ট ধারার অনুসন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়ি আমি, যা এখনো শেষ হয় নাই। আর ‘স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’ হল এ ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত যা জানতে পেরেছি তার রিপোর্ট। আমি যে প্রশ্নটা নিজের কাছে করেছিলাম, তার উত্তর খুঁজে পেতে আমার পনেরো বছর লেগেছে। সামনে যে লোকটা এই প্রশ্ন করবেন, তিনি যেন একটু তাড়াতাড়ি এর উত্তর খুঁজে পান সেজন্যেই বইটা লিখেছি আমি।

এই ফিল্ডে আপনার গবেষণা দিয়ে ঠিক কী ধরনের অর্জন আশা করছেন আপনি? আপনি কি মনে করেন এ বিষয়ে উত্তরোত্তর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগুলি মানুষের ওপর কীরকম প্রভাব রাখবে তা নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা যাবে?

আমি বরং বলব যে, আমরা এফেক্টিভ ফোরকাস্টিংয়ের ভুলগুলিকে বোঝার চেষ্টা করছি। যাতে এসব ভ্রান্তি দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় খুঁজে বের করা সম্ভব হয়। কিন্তু সমস্যা হল ফোরকাস্টিং বা পূর্বাভাসজনিত ভ্রান্তি ঠিক কোনো ‘অসুস্থতা’ না যার ‘নিরাময়’ খুঁজে বের করতে হবে। অনেকে মনে করেন, আন্দাজে এসব ভুল হওয়া হয়ত আমাদের জীবনে দরকারি ভূমিকা রাখে। সবকিছু ঠিকঠাক মত হলে আমাদের কতটা ভাল লাগবে অথবা বিপদের সময় আমরা কতটা খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাব—তার মাত্রা যদি আমরা বাস্তবের চাইতে বেশি ধরে রাখি, তাহলে দুর্ঘটনা এড়িয়ে সবকিছু ঠিকমত করার জন্য আরো বেশি জোর দিব আমরা।

উদ্বেগ ও ভয় খুবই প্রয়োজনীয় দু’টি অনুভূতি, যা আমাদেরকে গরম চুলায় হাত দেওয়া, পরকীয়া করা বা আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে খোলা রাস্তায় খেলতে দেওয়া থেকে বিরত রাখে। সন্তানসন্ততি ও টাকা-পয়সা যে শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে প্রচন্ড রকমের খুশি করতে পারে না কিংবা ডিভোর্স আর রোগবালাই যে আমাদেরকে দুঃখের চোটে একেবারে বেপরোয়া করে তোলে না, সে খবর আগে থেকেই পেয়ে গেলে কী আমাদের জন্য ভাল হবে? হতে পারে… আবার নাও হতে পারে।

তবে আমার দৃঢ় ধারণা, সবকিছু বিবেচনা করে দেখলে, ভবিষ্যতের কোনো বিব্রতকর ও পীড়াদায়ক পরিস্থিতি আর ট্র‍্যাজেডি আমাদের আবেগে কীরকম প্রভাব ফেলবে তা আগে থেকে সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হলে আমাদের উপকারই হবে বেশি। ধরেন, আপনি পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন; আকাশে প্রচন্ড বিদ্যুৎ চমক আর ঝড় হচ্ছে চারিদিকে। এখন আপনার যাত্রী জানতে চাইলেন, এ অবস্থায় গাড়ির ওয়াইপার ঘোরানো বন্ধ করে দিলে কোনো লাভ হবে কিনা। এটা কিন্তু ঠিক, ওয়াইপার বন্ধ করলে কিছু সুবিধা অবশ্যই পাওয়া যাবে। যেমন, ওয়াইপারের বিরক্তিকর ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটা তো অন্তত আর হবে না। তবে এটাও জোর গলায় বলা যায় যে, ওয়াইপার বন্ধ করায় সুবিধার চাইতে বরং ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ গাড়ি চালানোর সময় আপনি ঠিক কোথায় যাচ্ছেন সেটা দেখে নেওয়া সাধারণত ভাল একটা আইডিয়া—আর ওয়াইপার চালু থাকার এ সুবিধাটা তো আমাদের কাছে খুবই পরিষ্কার।

যাই হোক, গাড়ি চালানোর মত করে আমরা সবাই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। তাই আমার মাথায়ও একই যুক্তি কাজ করে। এফেক্টিভ ফোরকাস্টিংয়ের যদি কোনো গুপ্ত সুবিধা থেকেও থাকে, তার সাথে সংশ্লিষ্ট সব ঝুঁকির পরিমাণ সেসব সুবিধাকে সহজেই বাতিল করে দিবে।

আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, আমার গবেষণাকাজ দিয়ে ঠিক কী অর্জন করার আশা করছি আমি। এর একটা বাস্তবিক পরিণতির কথা তো বললামই। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, ভিতরে ভিতরে আমি এমন একজন লোক যে কিনা হিউম্যান নেচার নিয়ে অনেক বেশি কৌতূহলী। আমার রিসার্চ থেকে আমি আসলে আরো গভীরভাবে বুঝতে চাই, আমরা কারা এবং আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী। এই গবেষণা থেকে যদি ব্যবহারিক কোনো সুফল পাওয়া যায়, আমি খুশি। না পাওয়া গেলেও বিন্দুমাত্র দুঃশ্চিন্তা নাই আমার। আচ্ছা, ইউনিভার্স কীভাবে শুরু হয়েছিল তা জানতে পারা বা কোনো শূককীটের বিবর্তন বুঝতে পারার প্রায়োগিক উপকারিতা কী? আমার মনে হয় আমাদের একটা ভুল ধারণা আছে যে, কোনো জ্ঞান কতটুকু মূল্যবান তা নির্ভর করে আমাদের জীবনে তাৎক্ষণিক কোনো বাস্তবিক উন্নয়ন ঘটাতে সেই জ্ঞান কতটা কাজে আসছে তার উপর। অথচ জ্ঞানই হল চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, উদ্দেশ্য হাসিলের পন্থা না।

এই গবেষণা ক্ষেত্র আগামী দশ বছরে কোথায় পৌঁছাতে পারে বলে ভাবছেন আপনি? এমন সাম্প্রতিক বা নতুন কোনো আবিষ্কার আছে কি যা আমাদের সাথে শেয়ার করতে চান?

বিজ্ঞানের মজার ব্যাপার হল, কেউ জানে না সামনে তা কোথায় নিয়ে যাবে আমাদেরকে। বিজ্ঞান হল এমন এক ববস্লেজ গাড়ি যার স্টিয়ারিংয়ে কেউ বসে নেই। আমরা যদি বলতেই পারতাম যে আগামী দশকে আমরা কী আবিষ্কার করতে পারব, তাহলে অলরেডি তা আবিষ্কার করে ফেলতাম আমরা। তবে শুধু একটা ব্যাপার আমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি যে, আপনি বা আমি কেউই এই গবেষণাক্ষেত্রের গতিবিধির ব্যাপারে আপনার প্রশ্নের জবাব একদম সঠিকভাবে দিতে পারব না। বিজ্ঞানের গল্প সবসময় অতীতের দিকে তাকিয়েই বলা হয়।

তবে সাম্প্রতিক আবিষ্কারের কথা বললে… খুবই প্রতিভাবান একজন সহকর্মী আছেন আমার (ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়া’র টিমোথি উইলসন)। আমাদের দু’জনেরই ল্যাবরেটরি ভর্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রছাত্রী আছেন। তার মানে প্রতি মাসেই আমরা এমন নতুন কিছু আবিষ্কার করি যা দেখে খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে যাই আমরা (অবশ্য যতটা উচ্ছ্বাস কাজ করবে বলে ভেবে রাখি, ততটা না হলেও প্রত্যাশিত পরিমাণের খুব কাছাকাছি যায়)। উদাহরণ হিসাবে কয়েকদিন আগে করা আমাদের একটা গবেষণার কথা বলা যায়।

সেখান থেকে জানা গেল যে, অতীতে ঘটে যাওয়া প্রায় যেকোনো কিছুর চাইতে বরং ভবিষ্যতে ঘটতে যাওয়া ঘটনাকেই বেশি দাম দেয় মানুষ। ধরেন, দুর্ঘটনায় আক্রান্ত একজন মহিলা ৬ মাস ধরে যন্ত্রণা ও কষ্টের মাঝে ছিলেন। এরকম কারো চাইতে বরং যে ভিক্টিম ‘আগামী’ ৬ মাস কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাবেন— তাকেই কিন্তু বেশি পরিমাণে ইন্স্যুরেন্সের টাকা দেওয়ার রায় দিবেন জুরিবোর্ডের সদস্যরা। একইভাবে, ধরেন আপনি কোনো বন্ধুর ভ্যাকেশন হোমে ছুটি কাটানোর জন্য তাকে এক বোতল ওয়াইন গিফট করতে চান। গিফটটা ছুটি কাটানোর আগেও দিতে পারেন, পরেও দিতে পারেন। কিন্তু তার ভ্যাকেশন হোমে ছুটি কাটানোর আগে যে ওয়াইন দিবেন, ছুটি কাটানোর পরে দেওয়া ওয়াইনের তুলনায় সেটার দাম হবে বেশি। আবার, করা হয়ে গেছে এমন কাজের চাইতে ভবিষ্যতে যে কাজ করতে হবে তার জন্য বেশি পারিশ্রমিক চায় মানুষ। এরকম আরো উদাহরণ আছে। এটা বেশ শক্তিশালী ও অস্বাভাবিক এক ধরনের ‘টেম্পোরাল অ্যাসিমেট্রি’। এরকম হবার কারণ কী তা এখনো কেউ ঠিকমত বুঝে উঠতে পারেন নি। তবে এ ব্যাপারে আমাদের বেশকিছু হাইপোথিসিস আছে। সেগুলি ঘেঁটে দেখছি আমরা। চোখ-কান খোলা রেখে তাই অপেক্ষা করতে থাকেন।

আপনাদের গবেষণাপত্রের ধরণ শুধু বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভরযোগ্যই না, একরকম মজাও পাওয়া যায় সেগুলি থেকে—বেশ ভাল এক সেন্স অফ হিউমার নিয়ে বিষয়গুলি অ্যাপ্রোচ করা হয়েছে। আপনাদের এসব পরীক্ষার ডিজাইন তৈরি করেন কীভাবে? ‘গিলবার্ট পদ্ধতি’ বা এ জাতীয় বিশেষ কোনো তরিকা আছে নাকি এর জন্য?

বিজ্ঞান আপনাকে এক মুহূর্তের ভাললাগা বা আবিষ্কারের আনন্দ দেওয়ার আগে কয়েক হাজার ঘন্টা খাটিয়ে নেয়। কাজেই কোনো আইডিয়া নিয়ে গবেষণা করার আগে তাকে মন দিয়ে ভালবাসতে হবে। কোনো জিনিসের কথা শুধু চিন্তা করলেই যদি একটা তৃপ্তির সুড়সুড়ি না পাই, দমবন্ধ না লাগে আমার—তাহলে ওই বিষয়ে কোনো গবেষণা করি না আমি। এটাই আমার গবেষণার পদ্ধতিগত প্রথম নিয়ম। যখন এমন কিছু খুঁজে পাই যা নিয়ে আমার সত্যিই গবেষণা করার আগ্রহ আছে, তখন মাথা খাটিয়ে এক ইন্টারেস্টিং পরীক্ষার আয়োজন করি আমি, যেখানে একই সাথে বিশ্লেষণী কঠোরতা ও বুদ্ধিদীপ্ত রেটোরিক আছে। এর জন্য অবশ্য পদ্ধতিগত দ্বিতীয় নিয়মটি অনুসরণ করতে হয় আমার। আর তা হল টিম উইলসনকে খবর দেওয়া।

আচ্ছা, এবার তাহলে ট্রিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেনটা করেই ফেলি : ঠিক কী করলে সুখ খুঁজে পাব আমি?

এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আশা দেখিয়ে প্রায় দুই হাজার বছর ধরে বই লিখে আসছে মানুষ। তাতে শুধু অসুখী লোকজন এবং মরা গাছের সংখ্যা বাড়া ছাড়া আর কিছু হয় নাই। আমার বইটা একদিক থেকে আলাদা কারণ এখানে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টাও করা হয় নি। ‘স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’ কোনো নির্দেশনামূলক লেখা না যেখানে “সুখী হবার চারটি সহজ ও একটি কঠিন উপায়” বর্ণনা করা আছে। সেলফ-হেল্প ঘরানার বই না এটা। এ বই পড়লে যে আপনি আরো সুন্দর চুলের স্টাইলসহ নতুন কোনো দালাই লামা হয়ে যাবেন তা না। বরং আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিতে মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক কীভাবে ও কতটা সফলতার সাথে তার ভবিষ্যত সম্ভাবনাগুলির কথা চিন্তা করতে পারে তা নিয়ে আমার বই কিছু বলার চেষ্টা করেছে। একই সাথে, এসব সম্ভাবনা থেকে কোনগুলি তাকে সবচেয়ে সুখী করতে পারবে তা সঠিকভাবে অনুমান করার প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।

বইটার মূল উদ্দেশ্য হল আমাদের দুর্বলতা দেখানো, ভবিষ্যতে কোন জিনিসটা আমাদেরকে সুখী করতে পারবে তা অনুমান করায় আমরা কতটা অদক্ষ সেটা বোঝানো।… আধুনিক মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা হিসাব করার ক্ষমতাকে চিরাচরিত বলে ধরে নিয়েছে। অথচ এই ক্ষমতা কিন্তু আমাদের প্রজাতি একেবারে সম্প্রতি পেয়েছে, মাত্র তিন মিলিয়ন বছরের মত হল। কাজেই আমাদের ব্রেইনের যে অংশ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তা প্রকৃতির একদম নতুন উদ্ভাবনগুলির মাঝে একটা। এত নতুন একটা ক্ষমতা ব্যবহার করে ভবিষ্যত গণনা করতে গেলে কিছু আনাড়ি ভুল হওয়াটা তো স্বাভাবিক। তবে এসব ভুলের তিনটা প্রাথমিক ধরন আছে। আর এ বইয়ে সেগুলি নিয়েই কথা বলা হয়েছে। বইটা শেষ হয় সুখের উৎস সম্বন্ধে পূর্বাভাস পাওয়ার একটা বিকল্প পদ্ধতি দিয়ে। কিন্তু আয়রনি হল, গবেষণা থেকে জানা গেছে, এই বিকল্প পন্থা অনেক বেশি নিখুঁত পূর্বাভাস দিলেও বেশিরভাগ মানুষ পদ্ধতিটা ব্যবহার করতে চান না।

যমজদের উদাহরণ দিয়ে আপনি দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে সুখের অভিজ্ঞতা একেবারে ভিন্ন ভিন্ন—কিন্তু আবার গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, সুখের ব্যাপারে সব মানুষের ভ্রান্তধারণাগুলি একই। ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত এক প্যারাডক্স মনে হয় না?

বইয়ে যেমনটা বলেছি, সুখের সংজ্ঞা দেওয়া বা সুখ পরিমাপ করা বেশ দুরূহ ব্যাপার। এই কাজ করতে গেলে যেসব সমস্যা, বিপদ-আপদ আর প্যারাডক্সের মুখোমুখি হতে হবে সেগুলি নিয়ে পাঠকদেরকে ধারণা দেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু সমস্যা তো রীতিমত মাথা খারাপ করে দেওয়ার মত। ওগুলি সহজে ব্যাখ্যা করার জন্য সায়েন্স ফিকশন গল্প থেকে শুরু করে তাসের যাদু দিয়েও বোঝানোর চেষ্টা করেছি আমি। শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্তে এসেছি যে, একদম নির্ভুলভাবে সুখ সংজ্ঞায়িত করা বা মাপা সম্ভব না হলেও অতটুকু অন্তত করা যায় যার সাহায্যে আপনি বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতে পারবেন। ফলে অনেক কিছু জানার সুযোগ পাচ্ছেন আপনি। সবাই যে খালি বলে, অনুভূতি পরিমাপ করা সম্ভব না, এ ধারণা একদমই ভুল। আপনি যখন আপনার সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করেন, “আমি এই কাজটা করলে তোমার কেমন লাগে?” তখনই তো আপনি আসলে তার অনুভূতির মাত্রা বোঝার চেষ্টা করছেন। বিজ্ঞানীরা অবশ্য আরো সূক্ষ্ম ও জটিল প্রক্রিয়ায় এই কাজ করেন। কিন্তু মূলভাব একই। মানুষ সাধারণত জানে কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে সে কতটা সুখে আছে, কেউ জিজ্ঞেস করলে তাই সহজে বলে দিতে পারে সে। আপনি যদি তার উত্তর পরিমাপ করতে পারেন, তাহলে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সুখ নিয়ে অনুসন্ধানও করতে পারবেন (আমরা এই দু’ধরনের কাজই করে থাকি)।

আজকালকার বেশিরভাগ লোকের মত আমিও হতাশাবাদী। আমি মনে করি, একটা পরিস্থিতিতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকলে তা ঘটবেই। এই যে এত এত মানুষ এভাবে দীর্ঘকালীন উদ্বেগে ভুগেন, তাদেরকে নিয়ে আপনার বই কী বলে?

আমরা হয়ত এমন মনে করি যে জীবনের প্রতি মুহূর্তে পারফেক্টলি সুখী থাকতে পারলে সবচেয়ে ভাল হত। কিন্তু যেসব প্রাণি কোনো যন্ত্রণা, উদ্বেগ, ভীতি বা কষ্ট অনুভব করে না, তাদের একটা আলাদা নাম আছে— বিলুপ্ত। নেগেটিভ চিন্তা ও অনুভূতি আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ মানুষ যখন চিন্তা করে দেখে কোনো জিনিস কতটা তীব্রভাবে তাদের বিপক্ষে যেতে পারে, তখন তারা এমন সব কাজ করার চেষ্টা করে যাতে জিনিসটা তীব্রভাবে তাদের পক্ষে যায়।

আমাদের ছেলেমেয়ে কিংবা কর্মচারীদেরকে আমরা কোনো নির্দিষ্ট কাজের জন্য শোচনীয় ফল ভোগ করার ভয় দেখিয়ে যেমন সতর্ক করে দেই, তেমনি শোচনীয় পরিণতির কথা কল্পনা করে নিজেদেরকেও নিয়ন্ত্রণ করি আমরা। হ্যাঁ, মাঝে মাঝে উদ্বেগ বেশি হয়ে গেলে মানুষকে তা দুর্বল করে দিতে পারে। সেটা একেবারে এক্সট্রিম কেস। কিন্তু বেশিরভাগ লোকের জন্যই উদ্বেগ অনেক কাজে আসে।… কেউ যদি আপনাকে এরকম কোনো ওষুধ দেয় যেটা খাওয়ার পর আপনি সারাজীবনের জন্য সুখী থাকতে পারবেন, তাহলে আপনার প্রতি আমার পরামর্শ হবে সাথে সাথে দৌঁড় দিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যাওয়া। আবেগ একটা কম্পাস, যা আমাদেরকে বলে দেয় কখন কী করতে হবে। কিন্তু যে কম্পাসের কাঁটা শুধু উত্তর দিকে মুখ করে থাকে, সেই কম্পাসের কোনো দাম নাই।

এমন কী কী জিনিস আছে যেগুলি আমাদেরকে সুখী করতে পারবে বলে আমরা মনে করি, কিন্তু আসলে তা হয় না? কেন আমাদের এখনো মনে হয় যে এই জিনিসগুলিই আমাদের সুখী হবার মূলে?

সমাজের সদস্য যারা, তাদেরকে সুখের উৎসের ব্যাপারে ভুল ধারণা দেওয়ার পেছনে সমাজের একটা কায়েমি স্বার্থ আছে। আমার বইয়ে যেসব আইডিয়া নিয়ে কিছু দূর পর্যন্ত আলোচনা করা হয়েছে তার মধ্যে এটা একটা। চলমান ও সক্রিয় থাকার জন্য সমাজের অনেক কিছু নিশ্চিত করা লাগে। যেমন: মানুষদেরকে একে অন্যের পণ্য ও সেবা কিনতে হয়, বাচ্চা জন্ম দিয়ে তাদেরকে লালনপালন করতে হয়; এরকম আরো অনেক কিছু। আমরা নিশ্চয়ই এসব কাজ সমাজের ভালর জন্য করব না, কারণ মানুষের বৈশিষ্ট্য হল শুধু নিজের ভালর জন্যই কাজ করতে আগ্রহী হওয়া। এজন্য একেকটা সমাজ দরকারি কিছু মিথ তৈরি করে— “টাকা-পয়সা আপনাকে সুখ এনে দিবে” বা “আপনার সন্তানসন্ততি আপনাকে সুখী করে তুলবে”। এসব মিথ সমাজের সদস্যদেরকে সেই কাজগুলি করতে প্রণোদিত করে যেগুলি আদতে সমাজের জন্য প্রয়োজনীয়। গবেষণার ফলাফল বলছে, এ দুইটার একটাও মানুষকে বিশেষ সুখী করতে পারে না। সুখের ওপর টাকা-পয়সার প্রভাব নিতান্তই গৌণ; এ প্রভাব সহজেই ফুরিয়ে যায়। আর বাবা-মা’রাও সাধারণত বাচ্চাদের সাথে সময় কাটানোর চাইতে টিভি দেখতে বা ঘরের কাজ করতেই পছন্দ করেন বেশি (সরি, বাচ্চারা, কিন্তু তথ্য-উপাত্ত সেরকমই বলে!)।

যাই হোক, এটা আপনার প্রশ্নের একটা উত্তর। তবে এর আরো উত্তর আছে। বইয়ে একটা গবেষণার কথা বলেছি যেখান থেকে জানা যায়, অতীতে একজন মানুষ কতটা সুখী ছিল সেই স্মৃতি প্রায়ই সে গুলিয়ে ফেলে। যেমন ডেমোক্র‍্যাটরা একবার এরকম মনে করলেন যে, বুশ  ইলেকশন জিতলে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়বেন তারা। কিন্তু বুশ জেতার পর তার ধারেকাছেও কিছু হয় নাই তাদের (আমি জানি, কারণ আমি নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি তারা মানসিকভাবে কতটা বিধ্বস্ত হয়েছিলেন)। অথচ এর কয়েক মাস পর তারা আবার মনে করা শুরু করলেন, তাদের আন্দাজ ঠিকই ছিল—নিজেদের মানসিক দুর্দশার ব্যাপারে তারা যেমনটা ভেবে রেখেছিলেন ঠিক তেমনটাই নাকি হয়েছিল। জানা গেল, মানুষের স্মৃতিজনিত বিভ্রান্তির খুবই সাধারণ প্যাটার্ন এটা। যদি মনেই না থাকে, তাহলে নিজেদের ভুল ভবিষ্যদ্বাণী থেকে আমরা শিক্ষা নিব কীভাবে?

আপনার বইটা পড়ার আগে মনে করতাম, জীবনের প্রধান আকর্ষণ হল বৈচিত্র‍্য। কিন্তু প্রতিবার ডোনাট শপে গিয়ে শুধু গ্লেজড ডোনাট খাওয়াই কি ঠিক হবে? গ্লেজড আমার প্রিয় ডোনাট হলেও— কেবল একই রকম ডোনাট খেতে গিয়ে আরো ভাল কিছু থেকে যদি বঞ্চিত হই?

…যতটুকু উচিত তার চাইতে বেশিই বৈচিত্র‍্য খুঁজতে যায় মানুষ— গবেষণা তাই বলছে। আমাদের মনে হতে পারে, প্রতিবার ডোনাট শপে গিয়ে হয়ত আলাদা আলাদা টাইপের ডোনাট খেয়ে দেখা উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হল, ডোনাট শপে গিয়ে বারবার নিজের পছন্দের ডোনাট খেতে পারলেই বরং মানুষ সুখী থাকে বেশি, যদি প্রতিবার যাওয়ার মাঝে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিরতি থাকে। এই বিরতির সময়টা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। খুব কম সময়ের মধ্যে চারটা ডোনাট খাওয়া হলে একেকবার একেকরকম ডোনাট নিলেই আপনার ভাল লাগবে বেশি। এক্ষেত্রে বৈচিত্র‍্য আসলেই আপনার অভিজ্ঞতাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। কিন্তু আবার চার দিনে চারটা ডোনাট খাওয়ার বেলায় বৈচিত্র‍্য আপনার উপভোগের মাত্রা কমিয়ে আনবে। সময়কালের ব্যাপারে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করা মানুষের ব্রেইনের জন্য প্রচণ্ড সমস্যাজনক। তাই কয়েক মাস বা কয়েক মিনিট—বিরতি যতটুকুই হোক, ডোনাট খেতে গিয়ে আমরা অযথাই ভ্যারাইটি খুঁজি।

আপনার বইয়ে এত শেকসপিয়ারের উদ্ধৃতি কেন? আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন যে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করার চাইতে বরং শিল্প থেকেই আমরা নিজেদের সম্বন্ধে আরো বেশি জানতে পারব?

আমি প্রতি অধ্যায় একটা করে শেকসপিয়ারের উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করেছি। এর কারণ দুইটা। প্রথমত, ইতিহাসজুড়ে এমন অনেক চমৎকার অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন যারা আমাদের চিন্তাভঙ্গি সম্পর্কে তুখোড় সব অনুমান করে গেছেন। আধুনিক বিজ্ঞান আমাদেরকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে যাতে আমরা বাছাই করতে পারি, সেই অনুমানগুলির মাঝে কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল ছিল। সঠিক অনুমানের ক্ষেত্রে শেকসপিয়ারের রেকর্ড ভাল। তাই তার হাতেই প্রতি চ্যাপ্টার শুরু করার দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলাম। আর দ্বিতীয় কারণ হল, আমি খুবই সাধারণ রুচির মানুষ, যে কিনা সনেট পড়ার চাইতে অ্যাকশন মুভি দেখতে বা প্যাটের চাইতে টেটার টটস খেতেই বেশি পছন্দ করে। কিন্তু আমাকে প্রতিদিন একজন হার্ভার্ড প্রফেসরের ভান করে থাকতে হয়। আমার শুধু খুঁতখুঁত লাগে আর ভাবি, এই ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য আমাকে হয়ত একজন সুশীল নাক-উঁচা ব্যক্তি সাজতে হবে, যিনি ক্রাস্ট ছাড়া মিনি স্যান্ডউইচ খেতে খেতে শেকসপিয়ার পড়েন। কিন্তু আমি তো আসলে এরকম না। তবে আপনি যদি এই তথ্য ফাঁস না করেন, তাহলে ওইসব উদ্ধৃতি দিয়ে সবাইকে বোকা বানানো যাবে।

এখন কি তাহলে চারিদিকের বহু সম্ভাবনার কারণে আমাদের জীবন এতটাই জটিল হয়ে গেছে যে আমরা আদিম এক অজ্ঞতা হারিয়ে ফেলেছি, যে অজ্ঞতার কারণে অনেক জিনিস আমাদের অজানাই থাকত, ফলে সুখে থাকতে পারতাম আমরা? তাহলে কি কিছু জিনিস শেষ পর্যন্ত না জানলেই বরং সুখী থাকা যাবে? তাই যদি হয়, তাহলে গভীর বনের কোনো কুঠুরিতে গিয়ে বসবাস শুরু করলে লাভ হবে কি?

না, না, না। প্রতিটা প্রজন্ম এই ভ্রমের মধ্যে থাকে যে অতীতে হয়ত সবকিছু সহজ, সরল আর অনেক ভাল ছিল। পুরাদমে ভুল ধারণা। ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানেই আমরা সবচাইতে ভাল আছি। আমরা যে একে অন্যের মাথায় লাঠি দিয়ে ঠুকাঠুকি করি, তা আমাদের আদিম অজ্ঞতার কারণেই। এই অজ্ঞতা আমাদেরকে মোনালিসা আঁকতে বা স্পেস শাটল বানাতে কোনো সাহায্য করে না। আমাদের সুবিশাল ও উন্নত এক মস্তিষ্ক আছে যা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখতে পায়। অন্য কোনো প্রাণি তা পারে না। এমনকি আমাদের প্রজাতিও মাত্র কয়েক মিলিয়ন বছর আগ পর্যন্ত তা পারত না। হ্যাঁ, আমাদের ভবিষ্যতের দৃষ্টি তেমন স্পষ্ট না, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে হয়ত একেবারে অন্ধকার। তবে এই দূরদৃষ্টি আমাদের যেকোনো সিদ্ধান্তের দীর্ঘকালীন পরিণতি সম্বন্ধে আভাস দিতে পারে। ফলে আমরা প্রয়োজনমাফিক ব্যবস্থা নিয়ে খারাপ ফলাফল এড়িয়ে ভাল গন্তব্যগুলিকে তুলে ধরতে পারি।“যে আদিম অজ্ঞতার কারণে আমরা সুখে থাকতে পারতাম” সেই অজ্ঞতাই স্থূল স্বাস্থ্য আর গ্লোবাল ওয়ার্মিং বাড়ার কারণ। মাইলস ডেভিসের মত প্রতিভা বা ম্যাগনা কার্টার মত চুক্তি এই অজ্ঞতা থেকে আসত না কখনো। আগামী কয়েক হাজার বছরে মানবজাতি যদি উন্নয়নে ফুলেফেঁপে উঠে, তাহলে তা যুক্তি ও জ্ঞান অর্জন দিয়েই সম্ভব হবে। যে জগত কখনো ছিলই না সে জগতে ফিরে যাওয়ার ফ্যান্টাসিতে বুঁদ হয়ে থাকলে তা আর কখনো হবে না।

রিস বোয়েনের গুপ্তশিশু

গল্পের গতিময়তা এত স্বাচ্ছন্দ্যময় যে মনে হবে যেন এখনও ওই জলপাই বনগুলিতে জার্মানরা হামলা করার জন্য ওৎ পেতে
আছে।

Continue reading