ডায়াবেটিস থাকলে পায়ের ব্যাপারে যেসব সাবধানতা অবলম্বন করবেন

ডায়াবেটিস রোগীদের শরীরের অন্যতম সংবেদনশীল অঙ্গ হলো পা। নার্ভ ড্যামেজ বা নিউরোপ্যাথি হলে তারা পায়ে ব্যথা অনুভব করেন না। রক্ত চলাচলের গতি ধীর হয়ে যাওয়ার ফলে কোথাও ক্ষতের সৃষ্টি হলে তাও দ্রুত সারে না। ফলে তারা প্রতিমুহূর্তেই ইনফেকশনের ঝুঁকিতে থাকেন। তাই পায়ের পরিপূর্ণ খেয়াল না রাখলে ইনফেকশন থেকে ফুট আলসার পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। আবার না জানার ফলে পায়ের যত্ন নিতে গিয়ে অনেকের হিতে বিপরীত হয়। যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের পায়ের যত্ন নিতে কী কী করা উচিৎ বা অনুচিত, তা নিয়ে কয়েকটি পয়েন্ট।

১. অতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডা তাপমাত্রায় খালি পায়ে থাকবেন না

পা গরম করার জন্য হিটপ্যাড, হেয়ারড্রায়ার কিংবা গরম পানিতে ভেজানো জলপট্টি ব্যবহার করবেন না। একইভাবে আইসপ্যাক অথবা ঠাণ্ডা পানিতে ভেজানো জলপট্টিও ব্যবহার করা থেকে দূরে থাকবেন। এসবের ব্যবহার আপনার চামড়ার প্রদাহের কারণ হতে পারে।

কেন?

ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে পায়ের সংবেদনশীলতা হারানো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। যখন এমনটা হয়, সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের পায়ে গরম বা ঠাণ্ডার পার্থক্য অনেক কম অনুভূত হয়। এসময় হিটপ্যাড, হেয়ারড্রায়ার কিংবা লাইট থেরাপি নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কেননা এসবের ব্যবহারে তাদের পায়ে স্কিনবার্ন দেখা দিতে পারে।

একইভাবে চিকিৎসকরা আইসপ্যাক কিংবা ঠাণ্ডা পানিতে ভেজানো জলপট্টি ব্যবহার থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা তাপমাত্রার সংস্পর্শে এলে আমাদের স্কিনটিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি বেশি সময় ঠাণ্ডা থাকলে পায়ের চামড়ায় আইসবার্ন হতে পারে।

বেশি সময় ধরে পা ভিজিয়ে রাখবেন না। এর ফলে আপনার চামড়া কুঁচকে অথবা ফেটে যেতে পারে। পা ডুবিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত ফুট বেসিনগুলিতেও অনেক জীবাণু থাকে। যা আপনার পায়ের সূক্ষ্ম ফাটলে ঢুকে ইনফেকশনের সৃষ্টি করতে পারে।

এর পরিবর্তে কী করতে পারেন?

পায়ে যদি অনেক বেশি ঠাণ্ডা অনুভূত হয়, তাহলে পুরু একজোড়া সুতির মোজা পরে থাকুন। পা ভিজিয়ে রাখার আগে হাতের কনুই দিয়ে পানির তাপমাত্রা পরীক্ষা করে নিন। অথবা অন্য কাউকে পানির তাপমাত্রা নির্ণয়ে সাহায্য করতে বলুন।

২. খালি পায়ে কিংবা স্লিপার পায়ে দিয়ে বাইরে বের হবেন না

খালিপায়ে কিংবা স্যান্ডেল পরে চলাফেরা করলে পায়ের বেশিরভাগ অংশই খোলা থাকে। ফলে ঘরের বাইরে বহু জায়গায় ছড়িয়ে থাকা ধারালো বস্তুর সাথে লেগে আপনার পা কেটে কিংবা ছড়ে যেতে পারে। আর ক্ষতস্থান দিয়ে জীবাণু প্রবেশ করে ইনফেকশনের সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে পায়ের সংবেদনশীলতা হারানোর ফলে ডায়াবেটিস রোগীরা কেটে যাওয়া স্থানে ব্যাথা অনুভব নাও করতে পারেন। আর অধিক সময় ধরে খেয়াল না করার ফলে সেই ক্ষত ভবিষ্যতে ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিতে পারে।

এর পরিবর্তে কী করতে পারেন?

বাইরে বের হওয়ার আগে একজোড়া মোজা পায়ে দিয়ে বের হতে চেষ্টা করুন। ঘাম শোষিত হতে পারে যাতে এজন্য জুতা পায়ে দেয়ার আগে সুতি মোজা পরে নিন। জীবাণুর বিস্তার ঠেকাতে প্রতিবার ব্যবহারের পরে মোজা পাল্টান। বাসায় থাকা অবস্থায় পা সুরক্ষিত রাখার জন্য নরম স্লিপার ব্যবহার করুন। তাছাড়াও নিয়মিত আয়নার সাহায্যে পা পরীক্ষা করে দেখুন, সেখানে নতুন কোনো ক্ষত কিংবা আঘাতের চিহ্ন আছে কিনা।

৩. নুড়ি বিছানো পথে হাঁটবেন না এবং ফুট রিফ্লেক্সোলজি ম্যাসাজ নিবেন না

গরমের দিনে নুড়ি পাথর বিছানো ফুট রিফ্লেক্সোলজির পথগুলো অনেক উষ্ণ হয়ে থাকে। এই ধরনের ম্যাসাজ আপনার পায়ে তীব্র প্রদাহ কিংবা ইনফেকশনের কারণ হতে পারে। ফুট রিফ্লেক্সোলজির অমসৃণ পথ অথবা নুড়ি পাথরের মাঝখানে লুকিয়ে থাকা কোনো ধারালো বস্তুতেও আপনার পা কেটে যেতে পারে। এমনকি এই ধরনের ম্যাসাজ গ্রহণের সময় পায়ের ওপর যেই পরিমাণ চাপ পড়ে, তাও আপনার পা আহত করতে পারে।

৪. সমুদ্রের পানিতে পায়ের ক্ষত পরিষ্কার কিংবা ফিশ-স্পা থেরাপি গ্রহণ করবেন না

সমুদ্রের পানি অথবা ফিশ-স্পা, কোনোটার পানিই জীবাণুমুক্ত না। সমুদ্রের পানি দিয়ে পা পরিষ্কার করলে পায়ে ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। আর ফিশ-স্পা’গুলোতে একই মাছ একাধিক লোকের পায়ের মৃত চামড়া খুঁটে খুঁটে খায়। এভাবে একজন মানুষের শরীরের জীবাণু আরেকজনের শরীরে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এর পরিবর্তে কী করতে পারেন?

ড্রেসিং করা কিংবা পট্টি বাঁধার আগে পায়ের ক্ষত জীবাণুমুক্ত পানি কিংবা স্যালাইন দিয়ে পরিষ্কার করে নিন।

৫. ক্ষত কিংবা কাটাছেঁড়া স্থান খোলা বাতাসে শুকাতে দিবেন না

এভাবে ক্ষতস্থানে জীবাণুর সংক্রমণ হয়। সেখানে মাছিও বসতে পারে। আর ফ্যান অথবা হেয়ার ড্রায়ারের সাহায্যে ক্ষত শুকানোর চেষ্টা বাস্তবে খুব একটা ফলদায়ক হয় না। পরিবর্তে সেখান থেকে নানারকম জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। বরং যত বেশি সময় ধরে ক্ষতস্থান খোলা অবস্থায় থাকবে, ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা ততই বাড়বে।

এর পরিবর্তে কী করতে পারেন আপনি?

ইনফেকশন থেকে বাঁচতে ক্ষতস্থান সবসময় জীবাণুমুক্ত ড্রেসিংয়ের মাধ্যমে ঢেকে রাখুন।

৬. প্রচলিত প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে দূরে  থাকুন

বাজারে প্রচলিত মলম বা অয়েন্টমেন্ট ক্ষত সারানোর পক্ষে উপকারী এমন দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এমনকি প্রচলিত এসব ওষুধে ব্যবহৃত অনেক উপাদান ক্ষতস্থানের অবস্থা আরো খারাপ দিকে নিয়ে যেতে পারে। ফলে এসব থেকে দূরে থাকুন।

এর পরিবর্তে কী করতে পারেন?

শরীরের কোথাও কাটাছেঁড়া হলে আগে আয়োডিন দিয়ে তা পরিষ্কার করুন। এরপর জীবাণুমুক্ত পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ক্ষতস্থান ড্রেসিং করুন। ক্ষত যদি না শুকায় বা খারাপের দিকে যায় তাহলে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

দাঁত দিয়ে নখ কাটেন?—৪ ধরনের সমস্যা হতে পারে আপনার

ওনিকোফেজিয়া বা দাঁত দিয়ে নখ কাটা খুব কমন একটি অভ্যাস। পরিসংখ্যান মোতাবেক, বিশ্বের প্রায় ২০-৩০ শতাংশ মানুষ দাঁত দিয়ে নখ কাটে।

এই অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসটির পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমন অস্থিরতা, দুঃশ্চিন্তা, চাপ কিংবা খুঁতখুঁতে স্বভাব। আবার অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিজর্ডার (ওসিডি) থেকেও অনেকের নখ কামড়ানো শুরু হয়।

দাঁত দিয়ে নখ কাটার কারণে শরীরে ব্যাকটেরিয়া আর ফাংগাস যেমন প্রবেশ করতে পারে, তেমনি এটা রোজকার সেসব ক্ষতিকর অভ্যাসগুলির একটা যাতে আপনার স্বাভাবিক আয়ু কমে যাবার আশঙ্কা থাকে।

১. নখের মধ্যে রয়েছে ক্ষতিকর সব ব্যাকটেরিয়া

ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া আমাদের পাকস্থলীতে বিভিন্ন ধরনের রোগের উপদ্রব ঘটায়৷ গবেষণা থেকে জানা গেছে, যারা নখ কামড়ান, তাদের মুখের লালায় এ ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ অন্যদের চাইতে প্রায় তিন গুণ বেশি থাকে।

একবার ভেবে দেখুন, নখের নিচে ময়লা জমলে খালি চোখেই ওই জায়গা কতটা নোংরা মনে হয়। অথবা নেইলকাটার দিয়ে নখ কাটার পর কাটা নখগুলি একসাথে জড়ো করলেও সেসব ময়লার তীব্রতা বুঝতে পারবেন৷ তাহলেই চিন্তা করুন, আপনি দেখতে পারছেন না, এমন কত ধরনের জীবাণু সেখানে থাকতে পারে!

যে ব্যাকটেরিয়াগুলি সাধারণত চামড়ার ফাঁক দিয়ে আমাদের শরীরে ঢুকে পড়ে, সেগুলি আপনার দাঁত দিয়ে নখ কাটার কারণে সহজেই মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশের রাস্তা পেয়ে যায়।

শুধু তাই না, নখ কামড়ানোর এই ইচ্ছাও আপনি বোধ করেন এক প্রকার ডার্মাটোফাইটিক ফাংগাসের কারণে, যা চর্মরোগ ঘটায়।

২. নখ কামড়ানো ঠাণ্ডা লাগার অন্যতম কারণ

আমাদের চারপাশে সবসময় প্রায় ২০০টি ভিন্ন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া ঘুরে বেড়ায় যা আপনার ঠাণ্ডা লাগার কারণ হতে পারে। যদিও এটা নির্ভর করছে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিংবা অসুস্থ কারো সংস্পর্শে থাকা-না থাকার ওপর, তারপরও হাতগুলি মুখ থেকে যতটা সম্ভব দূরে রেখে আপনি ঠাণ্ডা লাগার সমস্যা থেকে আরো বেশি নিরাপদ থাকতে পারবেন।

কেননা, ঠাণ্ডা লাগা ও বিভিন্ন ফ্লু হবার জন্য দায়ী ভাইরাসগুলি সচরাচর আমাদের চামড়ার ওপরই থাকে।

৩. এমনকি দাঁতও নষ্ট হয়ে যেতে পারে

নখ কামড়ানো দাঁত ও মাড়ি উভয়ের জন্যে ক্ষতিকর। এতে আপনার সামনের পাটির দাঁতগুলি ধীরে ধীরে ক্ষয় হয় ও ফেটে যায়৷ তাছাড়া মাড়ির টিস্যু আঘাতপ্রাপ্ত হয় এতে। যার কারণে নানা জায়গায় ফুলে গিয়ে ব্যথা হতে পারে। কাজেই দেখা যাচ্ছে, আপনার হাসির স্বাভাবিক সৌন্দর্যের ওপরও এই অভ্যাস যথেষ্ট ক্ষতিকর প্রভাব রাখে।

মাউথগার্ড পরে থাকলে নখ কামড়ানোর অভ্যাস প্রতিরোধ করতে পারবেন। এর জন্যে কোনো ডেন্টিস্টের সাথে যোগাযোগ করুন, তার পরামর্শ অনুযায়ী চলুন।

৪. আঙুলে ইনফেকশন হবার ঝুঁকি বাড়ে

অনেকে এমন আছেন শুধু নখ কামড়েই ক্ষান্ত হন না, নখের নিচে ও আশেপাশে থাকা চামড়াও তুলে ফেলেন। নখের আশপাশের চামড়ায় এসব ফাঁকফোকরের কারণে ব্যাকটেরিয়া ভেতরে ঢুকে যায় সহজে, ফলে ইনফেকশন ছড়ানোর আশঙ্কা বাড়ে। ‘ক্রনিক প্যারোনিকিয়া’ নামে পরিচিত চামড়ার এই ইনফেকশন সারাতে অনেক সময় সার্জারিও করতে হয়।

তাছাড়া আঙুলের অনেক গভীর পর্যন্ত নখ কামড়ানোতে আমাদের নখের স্বাভাবিক আকার নষ্ট হয়ে যায়, যা পরবর্তীতে আর কখনোই আগের আকৃতিতে ফিরে আসে না।

যেসব অজানা কারণে আপনার রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে

কিন্তু শুধু লবণ খাওয়া এবং দুঃশ্চিন্তা ও রাগারাগি করাই আপনার রক্তচাপ বাড়ার মূল কারণ না। আরো বেশ কিছু ঘটনা আপনার রক্তচাপ আকস্মিকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
Continue reading

দিনে কত ঘণ্টা ঘুমানো স্বাভাবিক?

মানুষের কিভাবে ঘুমানো উচিৎ? প্রতিরাতে নিরবিচ্ছিন্নভাবে ৮ ঘণ্টা? নাকি এই ৮ ঘণ্টা সময়কে ভাগ করা উচিৎ দুইভাগে? অথবা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৬ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমালেই চলবে?

আমরা জানি মানুষের ঘুমের অভ্যাস গত কয়েক হাজার বছর ধরে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি না কিভাবে এই পরিবর্তন মানব চৈতন্য, সমাজ এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত। আমাদের এটাও জানা নেই এই পরিবর্তনগুলো মানুষের বিশ্রামের ‘ন্যাচারাল মুড’ বা ‘স্বাভাবিক ধরন’ বিষয়ে কি ঈঙ্গিত করে।

সঠিকভাবে ঘুমের আয়োজন করা ও উপভোগ করার পদ্ধতি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক চলছেই। এক্ষেত্রে দুইটি প্রধান চিন্তাধারা বিতর্কটির গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে। প্রথম চিন্তাধারার সমর্থনকারী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘স্বাভাবিক’ বিশ্রাম সম্পর্কে আমাদের বর্তমান ধারণাটি, অর্থাৎ রাত থেকে ভোর পর্যন্ত একটানা ঘুমের ধারণাটি আসলে আধুনিকতার একটা বাইপ্রোডাক্ট এবং মানুষের বিবর্তনের রাস্তায় নেয়া একটি ভুল মোড়।

অন্য মতের সমর্থকরা বলেন, আমরা পূর্বপুরুষদের ঘুম নিয়ে জল্পনাকল্পনা করা বন্ধ রাখি। কারণ এটা স্পষ্ট নয় যে উজ্জ্বল আলো ও ‘বিগ টেক’ বা বৃহৎ প্রযুক্তিগুলো থেকে দূরে থাকলেই আমরা ‘বাইফেসিক স্লিপ’ বা দিনে দুইবার ঘুমানোর অভ্যাস পুনরুদ্ধার করতে পারব কি না।

গবেষকরা নিজেদের অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন রকমের প্রমাণ ব্যবহার করেন। বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ঘুমের মধ্যে পার্থক্যগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। বিশেষ করে গ্রেট এপস (আকা হমিনিডস) হিসেবে শ্রেণীভুক্ত ছয়টি প্রজাতির সাথে মানুষের ঘুমের পার্থক্যের উপরে তাঁরা বেশি জোর দেন।

অন্যান্য গবেষকেরা সমকালীন শিকারী-সংগ্রহকারী (হান্টার-গেদারার) গোত্রগুলোর ঘুমের ধরণকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। আবার অন্য একদল গবেষক মানুষের ঘুমের ঐতিহাসিক দলিল নিয়ে ঘাটাঘাটি করেন। তাঁদের লক্ষ্য হলো কিভাবে সামাজিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন মানুষের বিশ্রামের সময়কে প্রভাবিত করেছে তা খুঁজে বের করা। স্বাভাবিকভাবেই, একেক গবেষণা পদ্ধতির ফলাফল হয়েছে একেক রকম।

প্রতিটি পক্ষেরই বিশ্বাসযোগ্য প্রবক্তা এবং শক্তপোক্ত প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু কারোর কাছেই একদম শতভাগ নিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ডিউক ইউনিভার্সিটির একদল এনথ্রোপোলজিস্ট এবং সাইকিয়াট্রিস্ট এই বিতর্কের সারমর্ম তুলে ধরেন। এতে ঘুমের বিবর্তন সম্পর্কিত সব মতবাদই উঠে এসেছে।

প্রায় দুই মিলিয়িন বছর আগে হোমো ইরেকটাস গোত্রটি শারীরিকভাবে এতটাই বেড়ে ওঠে যে এদের পক্ষে গাছের উপর ঘুমানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে এরা মাটিতে ঘুমানো শুরু করে। গাছের ডাল থেকে মাটিতে নেমে আসার এই পরিবর্তনকে মানুষের চেতনা ও সামাজিক উন্নয়নের একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিচেবচনা করা হয়। ডিউক প্রতিবেদনের সহ-রচয়িতা চার্লস নান, ডেভিড স্যামসন এবং এনড্রু ক্রিস্টাল এই বিষয়ে লিখেন, “গাছের উপর ঘুমানোর অসুবিধাগুলো থেকে মুক্ত হওয়ার ফলে তারা আরো দীর্ঘমেয়াদী ও উচ্চমানের ঘুম অর্জন করলো, যা হয়ত তাঁদের জাগ্রত চৈতন্যকে উন্নত করবে”।

মানুষের সাথে অন্যান্য গ্রেট এপসদের ঘুমের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে। ইভল্যুশনারি এনথ্রোপোলোজির দাবী অনুযায়ী, এই প্রজাতিটি মানুষের সবচেয়ে নিকটবর্তী পূর্বপুরুষ যারা ১৪ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে বিচরন করত। তো, এদের সাথে মানুষের ঘুমের মিলের ব্যাপারে একটি উদারহরণ দেয়া যাক। পৃথিবীতে মানুষেরাই একমাত্র প্রাণী যারা ঘুমানোর সময় মাথার নিচে বালিশ দেয়। কিন্তু আমরাই একমাত্র প্রজাতি নই যারা ঘুমানোর জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করি। গ্রেট এপস প্রজাতির সবগুলো প্রাণীই ঘুমানোর জন্য উপযুক্ত জায়গা বাছাই করে নিত এবং প্ল্যাটফর্মের মত কিছু একটা তৈরি করত ঘুমানোর জন্য। এই অভ্যাসটি সম্ভব্ত চৌদ্দ থেকে আঠারো মিলিয়ন বছর আগেই শুরু হয়েছিল।

কিন্তু কিছু দিক দিয়ে মানুষের ঘুম অন্যান্য প্রাণীদের থেকে স্বতন্ত্র। সব মানুষই ভূমিতে ঘুমায়। কিন্তু অন্যান্য গ্রেট এপসদের মধ্যে পুরুষেরা তখনই ঘুমানোর জন্যে মাটিতে নামে যখন অন্যের শিকারে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

স্লিপ আর্কিটেকচারের অনুযায়ীও মানুষের ঘুম অন্যদের তুলনায় বিশিষ্ট। স্লিপ আর্কিটেকচার বলতে বুঝায় ঘুমের বিভিন্ন পর্যায়ের গঠন ও বিন্যাস। অন্যান্য স্তন্যপায়ীদের তুলনায় মানুষ অনেক কম সময় ঘুমায়। তাদের বিশ্রামের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে থাকে রেম (REM: রেপিড আই মুভমেন্ট)। রেম হলো ঘুমের একটা নির্দিষ্ট পর্যায় যখন মানুষ স্বপ্নের সবচেয়ে স্পষ্ট অংশটুকু দেখতে পায়।

সকল গ্রেট এপসদের ঘুমের ক্ষেত্রেই পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিবর্তন এসেছে মানুষের ঘুমেই। আমরা এটা জানি কারণ বিজ্ঞানীরা একটা গোত্রের বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে তুলনা করে দেখাতে পারেন যে এদের মধ্যে কোনো একটি প্রজাতি অন্যান্যগুলোর চাইতে বিশেষভাবে বিবর্তিত হয়েছে কি না। উদাহরণস্বরূপ, মানুষেরা গ্রেট এপস গোত্রের প্রাণী। আবার অন্যান গ্রেট এপসদের তুলনায় মানুষের ঘুমের বিবর্তন ঘটেছে অনেক বেশি। বিবর্তনের উপর ভিত্তি করে তাই মানুষের ঘুম নিয়ে সঠিক ভবিষ্যতবাণী করা যায় না।

অন্যভাবে বলা যায়, গত কয়েক শত বছর ধরে শিম্পাঞ্জিদের ঘুমের ক্ষেত্রে যেসব পরিবর্তন এসেছে তার উপর ভিত্তি করে কি আমরা মানুষের ঘুমকে যাচাই করতে পারি? অবশ্যই পারি না। তার কারণ মানুষের ঘুমের বিবর্তন ঘটেছে অনেক বেশি স্বতন্ত্রভাবে, যা অন্যদের সাথে খাপ খায় না।

আমরা জানি শারীরিক আকৃতি, সামাজিক কাঠামো, জীবনধারণের পরিবেশ এবং অন্যান্য আচরণ ও বৈশিষ্ট্যের সাথে সাথে মানুষের ঘুমেরও বিবর্তন ঘটেছে ব্যাপকভাবে। এখন আমরা বড় একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। মানুষের ঘুম কি এতটা বিবর্তিত হওয়ার কথা ছিল? আমরা কি ইতিহাসের এমন একটি পর্যায়কে চিহ্নিত করতে পারি যখন মানুষেরা সেভাবেই ঘুমিয়েছে যেভাবে আমাদের আসলেই ঘুমানো ‘উচিৎ’?

ইতিহাসবিদ ই. রজার এরিক ২০০৫ সালে এই বিষয়ে একটি থিয়োরি প্রদান করেন। তাঁর মতে, বাইফেসিক অথবা দিনে দুইটি পর্যায়ে বিভক্ত ঘুমই ‘ন্যাচারাল’। কৃত্রিম আলো মানুষের বাইফেসিক ঘুমের অভ্যাসকে নষ্ট করেছে। মানব সভ্যতার কোনো একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে আমাদের পূর্বপুরুষেরা বাইফেসিক ঘুমের নিয়ম মেনে চলতেন। তাঁরা রাত নটা’র দিকে ঘুমাতে যেতেন আর মাঝরাতের দিকে উঠে পড়তেন। কয়েকঘণ্টা এই কাজ সেই কাজ করে আবার দ্বিতীয়বার ঘুমাতে যেতেন। বাইফেসিক ঘুম বিলুপ্ত হয় শিল্প বিপ্লবের সময়ে, যখন কৃত্রিম আলো সস্তা ও সহজলভ্য হয়ে ওঠে।

বাইফেসিক ঘুম কিভাবে বিলুপ্ত হলো সে বিষয়ে আমরা ইতিহাস থেকে স্পষ্ট ধারণা পাই। কিন্তু কিভাবে এটির উৎপত্তি হলো তা এখনো স্পষ্ট নয়। এটা নিশ্চিত যে মেশিন টুলস এর আবির্ভাবের আগে দুইটি পর্যায়ে বিভক্ত ঘুমের প্রচলন ছিল। কিন্তু এর আগে কি ছিল? এমনটা মনে করার মত যথেষ্ট কারণ কি আমাদের রয়েছে যে প্রাচীন যুগে মানুষের ঘুম দিনে একাধিক পর্যায়ে বিভক্ত ছিল? বিববর্তনবাদী বৈজ্ঞানিকেরা এই বিষয়ে এখনো ততটা নিশ্চিত নন।

এক্ষেত্রে আরো একটি তত্ত্বের উল্লেখ করা যেতে পারে যা বিবর্তনবাদীদের চোখে বেশি সমর্থনযোগ্য এবং যা প্রাচীন ও আধুনিক সমাজের মধ্যে তুলনার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। বৈদ্যুতিক আলো আবিষ্কৃত হওয়ার আগেও মানুষ প্রতি রাতে একটানা প্রায় ৭ ঘণ্টা ঘুমাতো, ঠিক যেমন এখনকার দিনের মানুষেরা ঘুমায়। কয়েকবছর আগে প্রকাশিত ইউ সি এল এ গবেষণায় উঠে এসেছে এই তত্ত্বটি।

সাইকিয়াট্রিস্ট ও ঘুম বিশেষজ্ঞ জেরোমি সিয়েগেল এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় আধুনিক যুগের তিনটি শিকারী-সংগ্রহকারী (হান্টার-গেদারার) গোত্রের মানুষের মধ্যে তুলনা করা হয়েছে যারা ‘টেক-ফ্রি’ বা ‘শিল্প-বিযুক্ত’ জীবন কাটাতো যা প্রাক শিল্পায়ন যুগের মানুষদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। গবেষোণায় উঠে এসেছে যে, তিনটি গোত্রের মানুষেরা আজকের দিনের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের মতই প্রতি রাতে প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমাতো।

আমরা যদি এই তত্ত্ব গ্রহণ করি, তাহলে প্রাক শিল্পায়ন যুগের বাইফেসিক ঘুমের বাতিক সম্পর্কে আমরা কি বলব? দুটি পর্যায়ে বিভক্ত ঘুম সম্ভবত এসেছে বিষুবীয় অঞ্চল থেকে মানুষের অভিপ্রয়াণের ফলে। কারণ এই অভিপ্রয়াণের ফলে মানুষ পৃথিবীর এমন প্রান্তে এসে হাজির হয় যেখানে দিনের চাইতে রাত দীর্ঘতর। এই বিষয়ে ২০১৫ সালে সিয়েগেল দ্য আটলান্টিক কে বলেন, “রাত দীর্ঘ হওয়ার ফলেই ঘুমের এই বিশেষ ধরণ তৈরি হয়েছিল। আবার বৈদ্যুতিক বাতির আবির্ভাবের ফলে মানুষ প্রাচীন অভ্যাস পুনরুদ্ধার করে নিয়েছে”।

এই তত্ত্বের সমর্থনে আরো কিছু যুক্তি হাজির করা যাক। ডিউক টিম “স্লিপ ইনটেনসিটি হাইপোথিসিস” এর কথা বলে, যেখানে দাবী করা হয় যে প্রাচীন মানুষেরা যখন ঘুমানোর জন্য ভূমিকে বেছে নেয় তখন তাঁদের ঘুমের পরিমাণ কমে যায়।

ভূমিতে বসবাস করার ফলে মানুষ নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়, যেমন নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা, শিকারী পশুদের সাথে মোকাবিলা ইত্যাদি। এরফলে তাঁদের বেশিক্ষণ জেগে থাকার এবং উন্নত মস্তিষ্কের প্রয়োজন পড়ে এবং গভীর ঘুম তাঁদের সামাজিক ও চৈতন্যগত উন্নয়নকে অব্যাহত রাখে। তাই তাঁরা পূর্বপুরুষদের সাত ঘণ্টার “মনোফেসিক স্লিপ” বা নিরবিচ্ছিন্ন ঘুমকে বিবর্তনের একটি অত্যাবশ্যকীয় ধাপ হিসেবে বিবেচনা করে।

যাহোক, যেসব গবেষকেরা মনে করেন যে আধুনিক যুগের মনোফেসিক ঘুমের পিছনে কোনো যুক্তি সঙ্গত ব্যাখ্যা রয়েছে, তাঁরা হয়ত এই ধারণাকে বাতিল করে দিবেন যে কৃত্রিম আলো আমাদের স্বাভাবিক ঘুমের অভ্যাসকে ব্যাহত করেছে। কিন্তু তাঁরা ঠিকই লক্ষ্য করছেন কিভাবে প্রযুক্তিগত ও সামাজিক উন্নয়ন আমাদের ঘুমের উপর প্রভাব বিস্তার করছে। ডিউক প্রতিবেদনে গবেষকেরা তিনটি পূর্বানুমান উপস্থাপন করেছিলেন। এর মধ্যে দ্বিতীয়টি ছিল, উন্নত বিশ্বে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার বৃদ্ধি, পৃথক বেডরুমের প্রচলন এবং দিনের বেলা ঘুমের পরিমাণ কমে যাওয়াকে আমরা ঘুমের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটানোর জন্য দায়ী করতে পারি।

একটি মধ্যবর্তী অবস্থান অবশ্য রয়েছে যা বিভিন্ন সমাজ ও গোত্রের মানুষের ঘুমের ঐতিহাসিক দলিল ও সাম্প্রতিক ঘুমের নিদর্শনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই মতবাদ অনুযায়ী, ঘুমের ক্ষেত্রে মানুষ অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের চাইতে অনেক বেশি নমনীয় (ফ্লেক্সিবল)। একটু আগে উল্লেখ করা ইউ সি এল এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আধুনিক যুগের তিনটি শিকারী-সংগ্রহকারী সমাজের কথা। কিন্তু প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন সব সামাজিক গোত্রই এই সাত ঘণ্টা ঘুমের নিয়ম মেনে চলে না। যেমন, পিরাহা নামক উত্তর আমেরিকার শিকারী-সংগ্রহকারী গোত্র। এই গোত্রের মানুষেরা দিনে ও রাতে দুইবার ঘুমায় এবং তাঁদের দৈনন্দিন কাজ সাধারণত রাতেই করে থাকে। গবেষণায় আরো উঠে এসেছে যে, পেনসিলভানিয়া ওল্ডার অ্যামিশ গোত্রের লোকেদের অর্ধেকের বেশিই সপ্তাহে অন্তত একদিন দিনের বেলা ঘুমায়।

প্রতিদিন সকালে অরেন্জ জুস স্কিন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়!

কুরেশি বলেন, ফলের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন ধরনের আলোকসংবেদী যৌগ থাকে। সুতরাং মেলানোমা ঝুঁকির ক্ষেত্রে সব সাইট্রাস ফল এক রকম না।

Continue reading