আজ আমরা ঐতিহ্য নিয়ে ভাবব, বন্ধুগণ। ঐতিহ্য প্রসঙ্গ এলেই আপনাদের অনেকের যেমন কান্নামাখা গলাভেজা জাতীয়তাবোধ জাগরুক হয়, সেটা মেহেরবানি করে খানিকক্ষণের জন্য অব্যাহতি দিন। নাহলে এই হারিয়ে যাওয়া বিষয়ক আজকের বোঝাবুঝিতে ভেজাল বাধবে। তবে আমাদের আলোচ্য বিষয় খাদ্যবস্তু বিধায় জাতীয়তাবোধের সঙ্গে আপনাদের লোভও জাগতে পারে।

ধরা যাক রুমালি রুটি, কিংবা বাঙ্গির হালুয়া। না ধরুন, বাখরখানি; এটাই ফাইনাল। বাখরখানি অবশ্য আপনার অত্যন্ত নরম ডেলিকেট হাতে ধরতে হবে। এটা ‘পুরান ঢাকা’র ‘ঐতিহ্য’ ইত্যাদি নিয়ে নানান কথা আপনি বলতেই পারেন। তবে সবচেয়ে ভাল হয় খাবার সময় এসব আলোচনা না-করা। এটা খুবই নাজুক ও ডেলিকেট বস্তু। আপনার আলাপের সময় আধচিবানো বাখরখানি ধুলিময় হয়ে আপনার প্রিয়তম, কিংবা বসের মুখে গিয়ে পড়তে পারে।

তো, এটা এখনো ‘বিলুপ্ত’ ঐতিহ্য নয়। তবে ধারণা বা আশঙ্কা করা যেতে পারে এর অবলোপের। এই বস্তুটার পরতে পরতে লেয়ারে লেয়ারে এমন কেয়ার থাকে, ধরলেই বুঝতে পারবেন যে এর কারিগরের নিষ্ঠার সঙ্গে তা শিখতে হয়। কারিগরের ওস্তাদ থাকেন, তাঁর ওস্তাদ থাকেন, তাঁরও ওস্তাদ থেকেছিলেন। পরম্পরা যাকে বলে, ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে যা অতীব প্রাসঙ্গিক। এর আটা-ময়দাও, আন্দাজ করা যায় বিশেষ পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করা লাগে। এর চুলাও যে কোনো চুলা নয় যে টু-বার্নার একটা জায়গামতো লাগিয়ে নিলেন।

তো এই লেয়ারসম্পন্ন কেয়ারজাত বস্তুটা তো বানাতে হবে! ধরা যাক একটি কারখানাতে ২টা চুলায় ৪ জন কারিগর ২৪ ঘণ্টায় ২০০০ বাখরখানি বানানো যায়। এটা কাল্পনিক সংখ্যা মাত্র। অন্য সময়ে আমরা গিয়ে জেনে আসতে পারব।

কারিগরের বেতন ও মালিকের আয় বিষয়ক একটা আলাপ আমাদের এখন করা লাগতে পারে। যদি আমরা ধরে নিই যে বাখরখানি-কারিগর ব্যাংকের সেকন্ড অফিসারের থেকে কিংবা কলেজের প্রভাষকের থেকে কিংবা টিভির উপস্থাপকের থেকে কম বেতন পান, তাহলে আমাদের সেই ধরে-নেয়া একদম ঠিক আছে। কিন্তু, যদি আমরা ধরে নিই, বাখরখানি-কারিগর বাড়ির সামনে সালামপ্রহরীর চাইতে বেশি বেতন পান, তাহলে আমাদের ঠিক হবার সম্ভাবনা বেশ কম থাকতে পারে।

মানস চৌধুরী, ছবি. ফাতেমা সুলতানা শুভ্রা ২০১৯

একইভাবে, যদি মালিকদের আলাপও করি! ধরুন দুইচুলার বাখরখানির কারখানা মালিক তিনচাকার একটা রিকশার মালিকের তুলনায় বেশি আয় করেন ধরে নিলে অবশ্যই আমরা সঠিক হতেও পারি। কিন্তু তিনি দুই ভবন বিশিষ্ট গার্মেন্ট কারখানার মালিকের থেকেও বেশি আয় করেন ধরে নিলে আমাদের ভুল হবার সম্ভাবনাই বেশি, তা তিনি যতই না কেন (বাখরখানি) শিল্পপতি হয়ে থাকুন।

মোটের উপর, তার ওই ২০০০ বাখরখানি হলো গিয়ে, ভাঙাটাঙা সমেত, চারজন কারিগর, দুইটা চুলার কাঠ, কারখানার ভাড়া ও নিজের মালিকগিরি সামলানোর, দৈনিক রসদ। এখন প্রথমত, আপনি যতই ৫টাকায় একখানা বাখরখানি কিনতে ইচ্ছুক থাকুক না কেন, দিনে ২০০০ বাখরখানি তিনি কিছুতেই দশ হাজার টাকায় খালাস করতে পারেন না। দ্বিতীয়ত, তা তিনি পারলেও তাঁর কর্মচারিকে (তথা ঐতিহ্যের সম্মানিত কারিগরকে) ব্যাংকের ক্যাশিয়ার কিংবা কলেজের লাইব্রেরিয়ান কিংবা এমনকি লেগুনার ড্রাইভারের মতো সমান তালে বেতন দিতে পারবেন না।

তো এভাবে চলতে চলতে, কারিগর যদি ২০২৪ সালে কারোর বাড়ির সামনে গিয়ে সালাম দেবার চাকরিটা নিয়ে নেন, তখন ঐতিহ্য খোয়ানোর জন্য সেই বাড়ির মালিক বা এই চুলার মালিক কিংবা সালামওয়ালা সাবেক বাখরখানিওয়ালা কাউকেই আপনি দায়ী করতে পারবেন না। আপনি বড়জোর একটা মায়াকান্নামূলক বিলাপ বা রচনা লিখতে পারবেন। অবশ্যই ঐতিহ্য বিষয়ক।

তারপর বর্তমানের ওই কারিগর যখন ভবিষ্যতে উর্দি-পরে সালাম দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, বা ধরুন লন্ড্রির ইস্ত্রি চালাচ্ছেন, তখন তাঁর কাছে ‘ঐতিহ্যে’র লোভে কেউ বাখরখানি বানানো শিখতে যাবারও উপায় থাকে না।

তাছাড়া তিনি তখন ওই বিদ্যা আর নিজেও ঘোষণা দিতে না-চাইতে পারেন। তারও কিছুকাল পরে তিনি নিজেও ভুলে যেতে পারেন। আর বাখরখানিবিদ্যাধারীর ইস্তিরি চালানো দেখে আপনিও হয়তো আর বাখরখানি বানাতে শিখতে না চাইতে পারেন।

এভাবে ‘ঐতিহ্য’ হারিয়ে যেতে পারে। এই পর্যন্ত পাঠ করে যদি লুপ্তিসম্ভাবনাময় বাখরখানি ঐতিহ্যের জন্য আপনার মনভার হয়, এখন আপনি কাঁদতে পারেন অবশ্যই। তবে সত্যি সত্যিই বাখরখানি মুখে পুরে সেটা করবেন না। ওটা আসলেই খুব ডেলিকেট।

আদাবর, ১০ আগস্ট ২০২০

Author

নৃবিজ্ঞানে সবেতন মাস্টারি করি। তবে নিমন্ত্রণ পেলে বক্তৃতা দিতে থাকি জ্ঞাত-আধাজ্ঞাত-অজ্ঞাত নানান বিষয়ে। বচন/কথনকে বিস্তারসাপেক্ষ ভাবি আমি, জ্ঞানসাপেক্ষ নয়। গল্পের বই পাঁচটি প্রকাশিত, একটি গল্প সংকলনও, তবে পাঠক তেমন নেই। কাকগৃহ, পাঠসূত্র, ঢাকা, ২০০৮ ময়নাতদন্তহীন একটি মৃত্যু, বাঙলায়ন, ঢাকা, ২০১০ পুনর্প্রকাশ, সৃষ্টিসুখ, কোলকাতা, ২০১৪ আয়নাতে নিজের মুখটা, বাঙলায়ন, ঢাকা, ২০১০ পানশালা কিংবা প্রেম থেকে পলায়ন, শুদ্ধস্বর, ঢাকা, ২০১৪ জলপরী আর জলাতঙ্ক, পরানকথা, ঢাকা, ২০২০ মানস চৌধুরীর নিকৃষ্ট গল্প, বায়ান্নো, ঢাকা, ২০২০ এর বাইরে দুটো অপাঠ্য কবিতার বই অনলাইনে প্রকাশ করেছিল সৃষ্টিসুখ। আরো খান দশেক গ্রন্থ প্রকাশিত আছে আমার যাকে হয়তো 'বিদ্যায়তনিক' এবং/বা 'প্রবন্ধ' বলা যেতে পারবে।

Write A Comment