ওকে দূর থেকে একটি গাছই মনে হবে

0
60

এখন শোবার ঘরে বসেই পৃথিবীময় ঘুরে বেড়াই, কথা বলি, পড়ি, দেখি, পড়াই, ফিল্ম বানাই, ফিল্ম দেখি, ফিল্ম দেখাই।

বিশ্বময় বিচরণ। প্রতিদিন, সারাবেলা। চারপাশে চারটি দেয়াল। উপরে ছাদ। নিচে মেঝে। ছয় দেয়ালের মধ্যিখানে আমি। মাঝে মধ্যে দম আটকে আসে। আমি তাই হাঁটতে যাই।

সেদিন ছিল শনিবার ১৮ জুলাই, ২০২০। শ্রাবণের পাঁচ তারিখ। ভরা ব‍র্ষা। বিকেলে হঠাৎ মেঘ গুড় গুড়। ঝড়ো বাতাস। তারপর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি!

ওই বৃষ্টির মধ্যেই বেরুলাম। ছাতা মাথায়, মুখে মাস্ক। পথে লোকজন কম। গণভবনের কোণায় গিয়ে চন্দ্রিমা উদ্যানের চওড়া পথে পা ফেলতেই মনটা চনমনে হয়ে উঠল।

তখনও প্রবল বৃষ্টি। উদ্যানের মুখে ছাতা মাথায় মুখে মুখোশ পরে দাঁড়িয়ে আছে নাসরিন সিরাজ এ্যানি।
আমরা একসাথে হাঁটবো। চন্দ্রিমা উদ্যানে ঢুকে গেলাম।

গাছ, লতা-গুল্ম সব সবুজে সয়লাব। ইট বিছানো হাঁটা পথগুলোতেও সবুজ শ্যাওলা। করোনার আতঙ্ক মন জুড়ে। পরস্পর থেকে দূরে দূরে হাঁটছি। তবে কথা বলছি, নি‍র্ভার মনে! মাথার উপরে নাম না জানা পাখিরা উড়ছে।

ঘরে থেকে থেকে বুকের মধ্যে জমে থাকা বদ্ধ ভাবটা মিলিয়ে গেল!

ক্রমে বৃষ্টি ধরে এলো। ছাতা গুটিয়ে ফেলা গেল। খোলা আকাশটাকে আরো বেশি করে দেখতে পেলাম। মন আরো বেশি চনমনিয়ে উঠল। শরীরও ফুরফরে লাগতে লাগল।

এদিক সেদিক নানাদিকে চলে যাওয়া পথ ধরে হাঁটতেই থাকলাম আমরা।

চোখে পড়ল একটি গাছ। বেশ বড়। পাতা দেখে তাকে চিনতে পারলাম না। ওর একটি ডাল ভেঙে গেছে।উল্টাভাবে কাণ্ডের সাথে লটকে আছে। পাতাগুলো তখনো টলটলে সবুজ। ভূমি ছুঁই ছুঁই ঝুলন্ত ওকে দূর থেকে একটি গাছই মনে হবে। গা ঘেষে চলে যাওয়া হাঁটা পথ বন্ধ করেনি। শ্যাওলা ধরা ভেজা ইট বিছানো পথটি দূরে চলে গেছে। ওই দেখে ওর কাছে গেলাম।

ছবি তুলতে ইচ্ছে হলো। মুঠোফোনের ক্যামেরায় ছবি তুললাম। কেন মানুষ স্মৃতি রাখতে চায়? কেন সেই স্মৃতি- সেইসব ছবি অন্যকে দেখাতে চায়?

অদ্ভুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা ভাঙা ডাল দেখেই ওর কাছে গিয়েছি। ছবি তোলার সময়ও মাথার ভিতরে ছিল ওই ডালটিই। কিন্তু তুলেছি আসলে রাস্তার ছবি। কেন?

ভেঙে পড়া ডালটির মধ্যে হেরে যাওয়া আছে। পরাজয়ের ছবি তুলতে চাইনি আমি?

মুচড়ে গিয়েও উল্টাে হয়ে লটকে থাকা ঘন সবুজ টসটসে পাতাগুলোর মধ্যে বিভ্রম ছিল। আমি কি তবে নৈকট্যের বিভ্রমও চাইনি ছবিতে? নাকি এটা আলসেমি?

ওইখানে দাঁড়িয়ে সদ্য ভেঙে পড়া ডালের সবুজ পাতা আর সার সার কাণ্ডের মধ্যিখান দিয়ে চলে যাওয়া ওই ভেজা পথটির ছবিই সহজে তোলা গেল?

এই কম্পোজিশনে গন্তব্য নয়—আছে দূরের ডাক। পথে পথে চলুক তবে পথচলা।

মাগরিবের আজান শুরু হল। দিনের আলো ফুরিয়ে গেল। কথা বলতে তখনো ভালো লাগছে। কিন্তু আমরা আর থাকলাম না ওখানে। পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যাওয়ার আগে চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে বেরিয়ে এলাম।

আমাদের মন তখন নি‍র্ভার, শরীরও। মনে হল, খোলা জায়গায় যাওয়া দরকার মানুষের। আর কিছু নয়—just
to experience the vastness of our surroundings.

বাড়ির পথে হাঁটার সময় ভাবছিলাম, সূ‍র্য ডুবে গেলে পা‍র্ক থেকে বেরুনোর এমন তাড়া ছেলেদের থাকে?

সদ্য বৃষ্টিতে ভেজা ইট বিছানো ওই রাস্তার এই ছবিটা না তুললে কি হতো?

কিছুই না। বিশাল ব্রহ্মাণ্ডে স্মৃতি-বিস্মৃতি, ছবি-না-ছবি কোনোকিছুতে কোনোকিছু যায় আসে না।

দমকা বাতাসে আচমকা ওই ডালটি ভেঙে গেলেও গাছটি দিব্যি আছে!

মোহাম্মদপুর, ২১ জুলাই, ২০২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here