প্রিয়াঙ্কাদের বাসা থেইকা ফিরা আইসা বেশ কিছুদিন আমি বিমর্ষ থাকি। কারো সঙ্গেই কথা টথা তেমন বলি না। মূলত এটা বুঝতে পাইরা যে, ঘুমের আগের ইচ্ছাস্বপ্নের জগতের সঙ্গে বিরাজমান দুনিয়ার একটা বড়সড় গ্যাপ আছে। ইচ্ছাস্বপ্নের প্রিয়াঙ্কা আর দুনিয়াবি প্রিয়াঙ্কার পার্থক্যগুলিই আমারে উক্ত সত্য অনুধাবনে সাহায্য করে।

ঘরপলায়নসমূহ
নাজির রোডে, আমাদের ভাড়া বাসা, নিচতলায়। – ছবি. শুভ নীল পিকলু

প্রিয়াঙ্কাকেন্দ্রিক ওই বেদনা আমার এতই একটা গোপন বিষয় ছিল যে, ঘুম থেইকা উইঠাই আধা কিলোমিটার পথ হাঁইটা—পিকলুদের বাসা, বাপ্পিদের বাসার গলি, তৃষা ভবন, নাবিলদের বাসার গেইট, সুমনদের দরবেশ বাড়ি (সুমনের দাদা ছিল দরবেশ), রিতা আপুদের বাসা, হাজীবাড়ি, ঢংগী সুমী যেই বাসায় থাকতো সেই বাসা এবং সর্বোপরি পুকুরওয়ালা হুজুরবাড়ি পার হইয়া দূরের রেললাইন আর এতক্ষণের বর্ণিত লোকালয়ের মাঝখানে খা খা করতে থাকা মাঠের পরে মাঠের মধ্যে জায়গা কিন্যা তুইলা রাখা ওয়ালের পর ওয়ালে গিয়া বইসা কানতাম আমি। প্রথমে কানতাম এতক্ষণ কানতে না পারার দুঃখে, পরে কানতাম প্রিয়াঙ্কার জন্যে।

কিছুদিনের জন্য ঘরপালানি বন্ধ হয় আমার, কিন্তু তার বদলে এই এক জিনিসের আবির্ভাব ঘটে—পাড়ার বাইরে বাইরে, তুলনামূলক নির্জন জায়গায় গিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা একলা বইসা থাকা। আর, দেখা গেল একপর্যায়ে এমন নির্দোষ কীর্তিও জানাজানির আন্ডারে আইসা পড়ে, এবং ছোটদের এ-জাতীয় আচরণও বড়দের উদ্বেগের কারণ হিসেবে যথেষ্ট বৈধ।

সুমনের-দাদা-দরবেশই একদিন এ সমস্যার পেছনের কারণটা জানাইয়া দেয়—আমার সঙ্গে একটা খারাপ পরীর আছর আছে, আমি পরীটারে দেখি আর পরীটা আমারে যেখানে নিয়া যায় আমি সেখানেই চইলা যাই।

তখন সবাই আমারে জিগাইলো, ঘটনা সত্য কি না, বাট আমি হ্যাঁ কিংবা না কিছুই বললাম না। তবে সুমনের-দাদা-দরবেশ আমার আব্বু আম্মুরে এটাও বইলা দেয় যে, এ ব্যাপারে আমারে কিছু জিগানো অর্থহীন, কারণ কন্ট্রোল ইজ নট আমার হাতে, পরীর ইচ্ছাতেই আমি পরিচালিত‍। আর সুমনের-দাদা-দরবেশের কথা ফেলাইয়া দেওয়ার সাহস তখন কেউই রাখতো না, কেননা প্রায় প্রতিরাতেই তার পোষা গায়েবি রাজহাঁসগুলিরে কেউ না কেউ দেখতে পাইতো। রাজহাঁসগুলি বাতাসের মধ্যে ধূলি হিসেবে চলাচল করতো, হুট কইরা দৃশ্যমান হইতো, আবার হয়তো উধাও—এই রকম।

নাইট শো শেষে রাত কইরা বাসায় ফিরার সময় আব্বুও বহুবার দেখছে হাঁসগুলিরে। বিলাসী সিনেমা হলের ম্যানেজার ছিল আব্বু, ফলে নাইট শো শেষ না কইরা বাসায় ফিরার উপায়ও ছিল না তাঁর। (এ বছরের শুরুতে সিনেমা হলটা ভাইঙ্গা ফেলে মালিকপক্ষ।)

তো বিদ্যমান সমস্যা নিরসনের পথটাও সেক্ষেত্রে তারেই বাতলাইয়া দেওয়া লাগে, অর্থাৎ সুমনের-দাদা-দরবেশরে। সে তখন আমার জন্য ফেনীরই বিরিঞ্চি বইলা এক জায়গায় জনৈক সুপারেন্টেন্ট হুজুররে সাজেস্ট কইরা দেয় এই বইলা যে, খারাপ পরীর আছরমুক্তিতে সুপারেন্টেন্ট হুজুরের তুলনা নাই।

পাশাপাশি সুমনের-দাদা-দরবেশ নিজেও ট্রেসিং পেপারের মতো স্বচ্ছ একধরনের কাগজের মধ্যে লাল রঙের দোয়াত কালিতে আরবি ভাষায় নানাকিছু লিইখা সেই কাগজটারে ভাঁজ কইরা একটা তাবিজের ঠোলের মধ্যে ইন্সটল কইরা তার উপরে গরম তথা তরল মোম ঢাইলা দেয়। ব্যবহার উপযুক্ত হওয়ার পর কাইতন-সহকারে ওইটারে আমার গলায় বাইন্ধা দেওয়া হয়। এতকিছুর পরেও আমি কিন্তু জানি যে, মোটেও কোনো খারাপ পরীর আছর আমার সঙ্গে নাই। তবু আমি যেটা করলাম সেটা হইলো, এর আগে মহানবীর সঙ্গে স্বপ্নে নিজের সম্পর্ক স্থাপনের কল্পনাটারে বেশিদূর আগাইতে না পারার প্রতিশোধ নিলাম। মানে আমি স্বীকার কইরা নিলাম যে, হ্যাঁ একটা পরী তো আমি দেখি ঠিকই, কিন্তু সে ব্যাপারে যে আপনারাও জানেন এ এক বিস্ময়।

/>চাপাইয়া দেওয়া ওই পরীরে মাইনাই যখন নিলাম, তখন ওই পরীর দেখভালের দায়িত্বও আমারেই নিতে হইছিল। নিজেরে পরী-পরিচালিত প্রমাণে উদ্ভট সব কাহিনী শুরু করলাম। একদিন আম্মু ডিম কিন্যা আনতে পাঠাইলো শাহজাহানের দোকানে, ডিম কিন্যা ফিরার সময় মনে হইলো—একটা ডিম আমার পরীরে খাওয়াই না কেন! পলেথিন থেইকা ডিম বাইর কইরা হাজারী আঙ্কেলদের বাসার ওয়ালে ছুঁইড়া মারলাম—মুহূর্তেই ডিম চৌচির হইয়া গেল। আর, যেন আমার এমন মনে হইলো যে, পরী এতে খুশি হইলো, সে একটা ডিম খাইতে পারলো অনেকদিন বাদে। হয়তো আরো খাইতে চায়—এই ভাইবা দেখতে দেখতে পুরা একহালি ডিমই আমি চৌচির কইরা পরীরে খাওয়াইলাম। প্রত্যক্ষদর্শী আর বাসার মেম্বারদেরও ডিম ভাঙার কারণ হিসেবে এটাই আমি বললাম, যে, পরী কাঁচা ডিম খাইতে চাইছে জন্য খাওয়াইছি। সবাই তখন আমার কাছে জানতে চাইতো, পরী দেখতে কেমন। আমি বলতাম, পরী দেখতে সুন্দর, শ্যামলা, একটা ডানায় অসুখ, দুখি পরী। আমার কথা শুইনা প্রত্যেকেই তখন একে অপরের দিকে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতো। আর আব্বু আম্মুরে—দ্রুতই আমারে সুপারেন্টেন্ট হুজুরের কাছে নিয়া যাইতে পরামর্শ দিতো।

ঘরপলায়নসমূহ
সুমনদের দরবেশ বাড়ি। ছাদের উপরের রুমটা এখন বানানো হইছে। – ছবি. শুভ নীল পিকলু

এরমধ্যে আরেকদিন, যখন দুপুর শেষ অথচ বিকাল হইয়া সারে নাই—মোমবাতি, ম্যাচ আর একটা পেরেক নিয়া আমি সুমনদের দরবেশ বাড়ির ছাদে উঠি। ছাদের মধ্যে বানাবে ভাইবাও পরে আর বানায় নাই টাইপের একটা রুম ছিল, ওইখানে বইসা আমি অপারেশন শুরু করি। কাইতনসহ তাবিজটারে গলা ও মাথার উপর দিয়া বাইর কইরা পেরেক দিয়া সেটার মোমগুলা তুইলা ফেলতে লাগি। এভাবে মোমের আস্তর সইরা একপর্যায়ে ভাঁজ করা ট্রেসিং পেপারের মতো ব্যাপারটা দৃশ্যমান হয়, আর জোরজবরদস্তি কইরা ওইটারে বাইর করি। লক্ষ্য রাখি যেন তাবিজের ঠোলটা কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়! দ্যান, মোমবাতি জ্বালাইয়া মোটামুটি অক্ষত অথচ শূন্য তাবিজের ঠোলের ভিতর গরম তথা তরল মোমের ফোঁটা ফেলতে ফেলতে ব্যাপারটারে আবার আগের অবস্থানে ফিরাইয়া নিয়া আসি। অপারেশন সাকসেসফুল হয়। এ অপারেশনের মধ্য দিয়া আমি মূলত পরীর সঙ্গে আমার সম্পর্কের ব্যাপারে নিজের কাছেই ক্লিয়ার থাকতে চাইছিলাম, যে, পরীনাশক এই মন্ত্র গলায় নিয়া আমি ঘুরবো না—এটা হইতে পারে না, পরী যদি থাকেই আমার সাথে, থাকুক সে।

এরপর পাড়ার বিভিন্ন বিল্ডিংয়ের ছাদে বইসা পরীর সঙ্গে সত্যিকারের প্রেম শুরু হইলো আমার। আক্ষরিক অর্থেই তার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে শুরু করলাম। যেই যেই গল্প আমি পরীর ব্যাপারে অন্যদের সাথে করবো বইলা ভাবতাম, সেইসব বিষয়েই আলাপ কইরা রাখতাম পরীর সঙ্গে। একদিনের আলাপ:

কাঁচা ডিম খাইতে ভালো লাগে?

কাঁচা ডিম খাইতে কারই বা ভালো লাগে!

আহারে, কিন্তু আম্মু তো তোমার জন্য পোচ কইরা দিবে না।

তোমারে তো দিবে, ওইখান থেকে লুকাইয়া আমারে দিয়া দিবা।

হি হি, তা হয় না। আমি জানি তুমি নাই। ডিমটাই ফালানি যাবে।

তাইলে যে ডিম ভাঙছিলা!

সেগুলা তো তখনো ভাজি বা পোচ হয় নাই।

ভাজি বা পোচ হওয়ার পরে নিজের খাওয়ার লোভটাই বেশি থাকে?

হুঁ।

তাইলে তোমার সুবিধা হয় এমনভাবে আমার খাওয়া দাওয়া সেট করো।

সেটা কি এরকম হইতে পারে যে, আমি যেটা খাবো সেটা তোমারও খাওয়া হয়ে যাবে?

পারে। সেটা আমার সবসময়ের খাবার হবে। কিন্তু মাঝেমাঝে ডিম না ভাঙলে বা এমন কিছু না করলে লোকে কীভাবে বুঝবে যে আমি আছি?

তা ঠিক। আচ্ছা মাঝেমাঝে লোকেরে বুঝানোর জন্য ওইভাবেও খাওয়াবো।

আচ্ছা।

বলা বাহুল্য, ছাদে থেকে ছাদে পরীর সঙ্গে ঘুইরা বেড়ানোর ঘটনাটাও চারদিকে চাউর হইয়া যায়। আমিও মোটামুটি দর্শক টের পাওয়ামাত্র হাত মুখ নাড়াইয়া ফাঁকা অভিব্যক্তির পরিমাণ বাড়াইয়া দিতে শুরু করি। এভাবেই দিন যাচ্ছিল।

ফলে একদিন সিনেমা হল থেইকা পোস্টারিংয়ের রিকশাসহ রিকশাওয়ালারে বাসায় পাঠায় আব্বু, এই নির্দেশ সাপেক্ষে, যেন আমি ও আম্মু দুইজনই রেডি হইয়া ওই রিকশায় উইঠা বসি।

বসার পর আমাদেরকে নিয়া রিকশা চইলা গেল সোজা বিরিঞ্চি—সুপারেন্টেন্ট হুজুরের চেম্বারে। আগে থেইকাই আব্বু ছিল ওইখানে। আমাদেরকে দেইখা ত্রস্ত ভঙ্গিতে জানাইলো আর চার পাঁচজনের পরেই আমার সিরিয়াল! সন্ধ্যার আগে আগে টিন, বেড়া ও তক্তার সমন্বয়ে বানানো ওই চেম্বারকাম বাড়িটা (সুপারেন্টেন্ট হুজুরের বাড়ি) ফার্নিচারের নতুন বার্নিশের গন্ধে মো মো করতেছিল বইলা স্পষ্ট মনে পড়ে। অল্প আলো ছিল চেম্বারের বাইরের ওয়েটিং রুমে—বাইরের আলো পুরাপুরি না নিভে যাওয়ায় আর সেই সাপেক্ষে ঘরের আলো জ্বলবে কি জ্বলবে না-জনিত দ্বিধার সমন্বয়ে গঠিত একধরনের আলোয় আম্মুর হাত ধইরা অন্যান্য রোগীদের (!) সাথে সোফায় বইসা থাকি। আম্মু ও আব্বু দুইজনেই হুজুরের সব ধরনের প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব দিতে অনুরোধ করে—আমিও সম্মতিসূচক মাথা নাড়াই।

ঘরপলায়নসমূহ
নাজির রোডে, আমাদের ভাড়া বাসা, নিচতলায়। – ছবি. শুভ নীল পিকলু

জ্বীন পরীর সমস্যা বিষয়ে কনসাল্ট করাটা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার নিঃসন্দেহে, একেকজন পেশেন্ট চেম্বারের ভিতর ঢুকে তো ঢুকেই—বাইর হওয়ার আর নামগন্ধও থাকে না। ফলে অপেক্ষারত অভিভাবকশ্রেণী নিজ নিজ পেশেন্টের সমস্যাগুলি নিয়া উপস্থিত অন্যান্যদের সঙ্গে কথা চালাচালি করে। একইসঙ্গে জ্বীন-ভূত আক্রান্তরাও নানানভাবে নিজ নিজ সমস্যার পক্ষে আচার আচরণ চালাইয়া যায়—কেউ হয়তো চোখ মুখ উল্টায়ে রাখছে, কেউ অপ্রকৃতিস্থের মতো হাসতেছে, একজন একটা হাজী গামছা বিচরাইতেছিল ফাঁস দিবে জন্য। আমাদের কাছে আইসাও সে তার দুঃখের বর্ণনা করলো; সে স্বপ্নে দেখছে হাজী গামছায় ফাঁস দিয়া মরামাত্রই সে জান্নাতুল ফেরদাউসে চইলা যাবে—কিন্তু কেউই তারে হাজী গামছা তো দেয়ই না, বরং সময়ে অসময়ে বাইন্ধা রাখে।

তো তখন হচ্ছে যে, বাকিরাও আব্বু আম্মুর কাছে জানতে চায়—আমার কী সমস্যা, জ্বীনের আছর নাকি পরীর আছর ইত্যাদি। কিন্তু ব্যাপার হলো উভয়েই তারা আগ্রহের এই অ্যাঙ্গেল নাকচ কইরা দিয়া আগ্রহীদের জানায়, “না না, ওইসব কিছু না, লেখাপড়ায় মন নাই—তাই হুজুরের দোয়া নিতে আসছি।” মানে তারা বুঝতে পারছিল আমার সমস্যা—সমস্যা হইলেও তা তত সমস্যা না, যত সমস্যা সত্যিকারের সমস্যায় পড়াদের। কিংবা হয়তো আমার যে আছর আছে তা স্বীকার কইরা নেওয়ায় তাদের স্টেটাস সংক্রান্ত কোনো ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল ওইখানে। কেননা উপস্থিত অন্যান্যদের তুলনায় একমাত্র আমাদেরকেই ওইখানে তুলনামূলক শিক্ষিত, ভদ্রস্থ ও রুচিশীল দেখাইতেছিল।

ভদ্রগোছের পেশেন্ট হিসেবে সুপারেন্টেন্ট হুজুরও আমাদের খাতির করলো, বাড়ির ভিতর থেইকা চা পানি আনাইয়া আপ্যায়ন করলো। সমস্যা রেফারেন্স ইত্যাদি শুইনা প্রথমেই সে সুমনের-দাদা-দরবেশের দেওয়া তাবিজটা খুইলা ফেলতে এবং এ বিষয়ে তারে কিছু না জানাইতে বললো। বিনিময়ে সেই ট্রেসিং পেপার জাতীয় পাতলা কাগজগুলিতেই সেও তার লেখালেখি শুরু করে, আশ্চর্য যে পরবর্তী প্রায় আধাঘণ্টা ওই লেখালেখিই অব্যাহত থাকে—পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা শেষ হয়। লিখতে ফাঁকেই আমারে এই-সেই নানান প্রশ্ন করে সে।

‘পরী ডিম ভাঙতে বললো?’

হুম।

‘কীভাবে বললো?’

বললো যে ডিম খাবে।

‘ওয়ালে ছুঁইড়া মারতে সে বললো?’

না, আমি বুদ্ধি কইরা সেটা করলাম।

‘তারপর কী দেখলা, পরী সেই ডিম খাইলো?’

খাইলো, কিন্তু সে পোচ ডিম খাইতে চায়।

‘তোমারে বললো?’

মানে পরে বলছে, কাঁচা ডিম খাইতে ভালো লাগে না।

‘পোচ ডিম খাওয়াইছো তারে?’

না।

‘কেন?’

আম্মু তো পরীর জন্য পোচ করবে না।

‘বলছিলা আম্মুরে পোচ কইরা দিতে?’

না।

‘পরীর ডানায় অসুখ?’

হু, উড়তে গিয়া ব্যথা পাইছে।

‘তাইলে তো চিকিৎসা দরকার!’

জ্বী, আপনার কাছে ডানা ঠিক করার ওষুধ আছে? থাকলে দেন, পরীরে খাওয়াবো।

পরীর ডানা ঠিক করার ওষুধের ব্যাপারে নিজের অপারগতা প্রকাশ করার মধ্য দিয়া সুপারেন্টেন্ট হুজুরের লেখালেখি শেষ হয়। এরপর বড়, ছোট ও মাঝারি—নানান সাইজের ঠোলের মধ্যে সেগুলা ঢুকাইতে থাকে সে। পাশাপাশি কোনটা কোনটা গলায় আর কোনটা হাতে লাগাইতে হবে তা আব্বু আম্মুরে বুঝাইয়া দেয়, চেম্বারে কাইতন না থাকার কারণে দুঃখ প্রকাশ করে। এবং একটা কাগজ সে ঠোলের মধ্যে না ঢুকাইয়া, কোলবালিশের মতো ভাঁজ কইরা সুতা দিয়া বাইন্ধা দেয়—এটা হচ্ছে পানিপড়া। পানির মধ্যে চুবাইয়া রাখতে হবে, চুবানো মাত্রই দোয়াতের কালিতে পানি লাল হইয়া যাবে, আল্লাহপাকের পবিত্র দোয়া সুরা সেই কালির মাধ্যমে পানির সাথে একীভূত হইয়া যাবে। দ্যান হচ্ছে যে সকাল সন্ধ্যা সেই পানি খাইতে হবে। এই হলো ট্রিটমেন্ট।

চেম্বার থেইকা বাইর হইয়া পোস্টারিংয়ের ওই রিকশায় চইড়া আমরা বাসায় ফিরতে থাকি, নাজির রোডে। হায়, রিকশায় আম্মু আব্বুর মাঝখানেই কত অনায়াসে আমি বইসা থাকতে পারতাম তখন! বিরিঞ্চির ওই অংশে খানিকটা ছিল কাঁচা রাস্তা, সেই রাস্তা পার হইতেছি, একটু সামনে থেকেই আবার পাকা রাস্তা শুরু হবে—আসতে সময়ের অভিজ্ঞতা দিয়া সেই তথ্য আমার জানা। আব্বু জিগাইলো, “কী রে, পরী আছে নি এখনো লগে?”

আছে।

“কই?”

রিকশাতেই।

“পরী কী কয়?”

পরী কয় শক্ত কইরা ধইরা বসতে, সামনে নাকি ঝাঁকুনি খাইতে হবে!

 

কিছুক্ষণের মধ্যে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়া রিকশা পাকা রাস্তায় ওঠে।