এই প্রতিবেদনটি দ্য গার্ডিয়ান (২৭ এপ্রিল, ২০২৬) ও ফিউচারিজম (২ মে, ২০২৬)—এই দুটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নিবন্ধ এবং মূল গবেষণাপত্র অবলম্বনে তৈরি। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ফ্রন্টিয়ার্স ইন বিহেভিয়োরাল নিউরোসায়েন্স জার্নালে।
২০২৫ সালে YouGov (ইউগভ)-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন তারা জীবনে অন্তত একটি অতিপ্রাকৃত ঘটনা অনুভব করেছেন। ১৮ শতাংশ বলেছেন তারা এমন বাড়িতে বাস করেছেন যেটাকে ভূতুড়ে মনে হয়েছিল। এই সংখ্যাটা ছোট নয়। কিন্তু এই অনুভূতির পেছনে আসলে কী আছে?

পুরোনো বাড়িতে ঢুকলে মাঝে মাঝে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। ঘরে কেউ নেই, কিছু দেখা যাচ্ছে না, শোনাও যাচ্ছে না—তবু মনে হয় কোথাও কিছু একটা আছে। অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাসীরা এটাকে ভূতের উপস্থিতি বলেন। কিন্তু কানাডার একদল গবেষক বলছেন, এই অনুভূতির পেছনে হয়ত আছে ভবনের পুরোনো পাইপ আর বয়লার।
কারণটা হল ইনফ্রাসাউন্ড। এটি এমন শব্দতরঙ্গ যার কম্পাঙ্ক ২০ হার্টজের নিচে। মানুষের কানের শোনার সীমার বাইরে। পুরোনো ভবনের বায়ু চলাচলের নালি, বয়লার এবং পাইপ থেকে এই ধরনের তরঙ্গ তৈরি হতে পারে। আমরা এটা শুনতে পাই না, কিন্তু শরীর কি তবু টের পায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গবেষণায় নামেন ম্যাকইওয়ান ইউনিভার্সিটির দলটি।
বিষয়টা নিয়ে গবেষণা আগেও হয়েছে, তবে ফলাফল ছিল মিশ্র। কোনো গবেষণায় প্রভাব মিলেছে, কোনোটিতে মেলেনি। দলটির সিনিয়র গবেষক Rodney Schmaltz আগে এডমন্টন শহরের ডেডমন্টন হন্টেড হাউস অ্যাট্রাকশনে একটি পরীক্ষা চালিয়েছিলেন—ইনফ্রাসাউন্ড চালালে মানুষ বেশি ভয় পায় কিনা দেখতে। সেই ফলাফল অনিশ্চিত ছিল। তাই এবার দলটি আরও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
২০২৩ সালের গ্রীষ্মে ৩৬ জন স্বেচ্ছাসেবীকে নিয়ে পরীক্ষাটি চালানো হয়, যাদের তিন-চতুর্থাংশ ছিলেন নারী। প্রত্যেককে আলাদা ঘরে বসিয়ে পাঁচ মিনিট ধরে সংগীত শোনানো হয়। কাউকে শান্ত যন্ত্রসংগীত, কাউকে হরর-ধাঁচের অস্বস্তিকর সুর। এর মধ্যে অর্ধেকের ক্ষেত্রে ঘরের লুকানো সাবউফার স্পিকার থেকে ১৮ হার্টজে ইনফ্রাসাউন্ড চালানো হয়—অংশগ্রহণকারীদের না জানিয়ে।
পরীক্ষার আগে ও পরে সবার লালার নমুনা নেওয়া হয়, যা থেকে কর্টিসলের মাত্রার পরিবর্তন মাপা হয়। কর্টিসল হল শরীরের স্ট্রেস হরমোন।
ফলাফলটা চমকপ্রদ। কেউই বুঝতে পারেননি কখন ইনফ্রাসাউন্ড চলছিল। এমনকি কেউ কেউ মনে করেছিলেন শুনতে পাচ্ছেন, কিন্তু সেই ধারণা তাদের কর্টিসলে কোনো প্রভাব ফেলেনি। প্রভাবটা ছিল সম্পূর্ণ অবচেতন। যাদের ক্ষেত্রে ইনফ্রাসাউন্ড চালু ছিল, তারা বেশি বিরক্ত ও অস্থির অনুভব করেছেন, দুই ধরনের সংগীতকেই বেশি দুঃখজনক মনে করেছেন এবং তাদের লালায় কর্টিসলের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে—পেছনে যে সংগীতই বাজুক না কেন।
গবেষণার মূল লেখক ও ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টার স্নায়ুবিজ্ঞানী Kale Scatterty বলেন, “বিরক্তি বাড়লে কর্টিসল বাড়ে—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু ইনফ্রাসাউন্ড এই দুটি ফলাফলে এমন প্রভাব ফেলেছে, যা স্বাভাবিক সম্পর্কের বাইরে।”
Schmaltz বলেন, “ইনফ্রাসাউন্ড শরীরে একটা অব্যাখ্যাত অস্বস্তি তৈরি করে। মানুষ জানে না এটা কী, কিন্তু তাদের বলা আছে জায়গাটা ভূতুড়ে—তাই সেই বিরক্তি বা অস্বস্তিকে তারা ভূতের কাজ ভাবেন, বেজমেন্টের পাইপের নিচু গুমগুম নয়।” তিনি স্পষ্ট করেন, “ইনফ্রাসাউন্ড মানুষকে ভূত দেখায় না। যে ভূতে বিশ্বাস করে না, সে একই অনুভূতিকে পুরোনো, দমবন্ধ ভবনের স্বাভাবিক পরিবেশ ভাববে। কিন্তু যে আগে থেকেই ওই ধারণায় ঝুঁকে আছে, তার কাছে এটা কোনো আত্মার প্রমাণ হয়ে উঠতে পারে।”
এখানে একটা সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা ভয় পাননি—বরং বিরক্ত হয়েছেন, আগ্রহ হারিয়েছেন, সবকিছু বেশি দুঃখজনক মনে হয়েছে। “ভূতুড়ে” জায়গায় মানুষ সাধারণত যে ভূত দেখার কথা বলে, ইনফ্রাসাউন্ড সেই অনুভূতি সরাসরি তৈরি করে না। এটা বরং একটা অদৃশ্য বিরক্তির মত কাজ করে—ঘরটাকে অস্বস্তিকর করে তোলে, কিন্তু সরাসরি ভয় জাগায় না। Schmaltz বলেছেন, “আমরা নিশ্চিতভাবে বলছি না যে ভূতুড়ে অনুভূতির রহস্য সমাধান হয়ে গেছে। তবে কিছু পুরোনো ভবনে নিচু গর্জনকারী পাইপ থেকে ইনফ্রাসাউন্ড তৈরি হতে পারে, আর কেউ যদি আগে থেকেই ভয় পাওয়ার মানসিকতায় থাকেন, ইনফ্রাসাউন্ড সেটা একটু বাড়িয়ে দিতে পারে।”
গবেষণাটি নিয়ে স্বাধীন মন্তব্য করেছেন লন্ডনের গোল্ডস্মিথস বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস মনোবিজ্ঞানী Chris French, যিনি দীর্ঘদিন ধরে অতিপ্রাকৃত দাবিগুলির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজে এসেছেন—ভূত বা পরাশক্তিতে তিনি বিশ্বাস করেন না, বরং মানুষ কেন করে সেটা নিয়েই তার কাজ।
১৯৭৭ সালে উত্তর লন্ডনের এনফিল্ড-এ Hodgson পরিবারের বাড়িতে কথিত পোলটারগাইস্ট ঘটনা—যা পরে The Conjuring 2 সিনেমার ভিত্তি হয়েছিল—সেটিও তিনি তদন্ত করেছেন এবং কিশোরী বোনদের কৌতুক বলে চিহ্নিত করেছেন। সেই French-ই বলছেন, এই গবেষণার ধারণাটি “সম্ভাব্য”, তবে এর বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না। তার মতে, “পোলটারগাইস্ট কার্যকলাপ—যেমন তাক থেকে জিনিস উড়ে যাওয়া বা আসবাব নিজে থেকে নড়ে ওঠা—ইনফ্রাসাউন্ড দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চাওয়াটা বাড়াবাড়ি।” ইনফ্রাসাউন্ড চোখের গোলা কাঁপিয়ে দৃষ্টিভ্রম তৈরি করে বলে যে দাবি কখনও কখনও করা হয়, তাও প্রমাণহীন বলে তিনি জানান।
গবেষকরা স্বীকার করছেন, এটি প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। নমুনা ছোট ছিল, মাত্র একটি ফ্রিকোয়েন্সি পরীক্ষা করা হয়েছে। Scatterty মনে করেন, অন্য ফ্রিকোয়েন্সিগুলিও পরীক্ষা করা দরকার। Schmaltz-এর আগ্রহ দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে—যানজটে বসে থাকলে মানুষ যে বিরক্তি অনুভব করেন, তার পেছনেও হয়ত নিম্নকম্পাঙ্কের শব্দদূষণ কাজ করছে। ভবন নির্মাণের নকশা বা শব্দ নিয়ন্ত্রণের নীতিমালায়ও এই গবেষণার প্রভাব পড়তে পারে ভবিষ্যতে।
পুরোনো বাড়ির সেই অদ্ভুত অনুভূতির পেছনে তাহলে কি শুধুই পাইপের নিচু শব্দই? হয়ত সবটা নয়। তবে অন্তত কিছুটা যে হতে পারে—এই গবেষণা সেটুকু বলছে।
সূত্র. দ্য গার্ডিয়ান ও ফিউচারিজম; লেখা তৈরি. এআই; সম্পাদনা.সাম্প্রতিক ডেস্ক
বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভূত দেখার কারণ তারা বের করে ফেলেছেন

