অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করতে ধনীরা যেভাবে ভূমিকা রাখছে

অসংখ্য গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পদ ও আয়ের ভারসাম্যহীনতার সমস্যা আমেরিকায় দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এই গবেষণাগুলির ফল হতে পারে আমেরিকার অর্থনৈতিক উন্নতি ও গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। অথচ অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার ব্যাপারে ফেডারেল সরকারের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। এছাড়াও, অনেক স্টেইট এর তা মোকাবেলা করার মতো অবস্থাও নেই।
কিছু গবেষণায় এও দেখা গেছে, সরকারের উপর প্রভাব সবচেয়ে বেশি আছে ধনীদেরই। অর্থাৎ, এই অসাম্য নিয়ে প্রভাব বিস্তারী কাজ করার ক্ষমতা আছে কেবল ধনীদেরই। অন্যদের পক্ষে তা অসম্ভব। আর অল্প সংখ্যক কিছু ধনী আমেরিকান সত্যিই সেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাদের সময় ও অর্থ দিয়ে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন অর্থনৈতিক এই বৈষম্য দূর করতে।

বাড়তে থাকা বৈষম্য

সর্বশেষ ২০১৩ সালের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ধনীরা (মোট জনগণের যারা মাত্র ১০%) পুরো দেশের ৭৬% সম্পদের মালিক। অর্থাৎ, প্রতি ১০ ডলারে ৭.৬০ ডলারেরই মালিক তারা এবং বাকি ৯০% জনগণের জন্য রয়েছে মাত্র ২.৪০ ডলার। এবং সম্পদের এই ভারসাম্যহীনতা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। অথচ ১৯৮৯ সালে ১০% ধনী ব্যক্তিদের কাছে ছিল দেশের ৬৭% সম্পদ।

তবে কিছু ধনী ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় নীতি ও কর্পরোরেশনগুলিকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে বাড়তে থাকা এই বৈষম্য মোকাবেলা করতে এগিয়ে আসা শুরু করেছেন। তেমনই একজন হলেন ইনভেস্টমেন্ট ফার্ম ‘ব্ল্যাকরক’ এর সাবেক ম্যানেজিং ডিরেক্টর মরিস পার্ল। মরিস ‘ক্যারিড ইন্টারেস্ট’ নামক কর ফাঁকি দেয়ার একটি উপায় আইনি সহায়তায় বাতিল করেন। ‘ক্যারিড ইন্টারেস্ট’ এর মাধ্যমে অসংখ্য ফিনানশিয়াল ম্যানেজার তাদের করের পরিমাণ কমিয়ে ফেলত। আরেক উদাহরণ হলেন ‘চবানি ইয়োগার্ট’ এর প্রতিষ্ঠাতা হামদি উলুকায়া। তিনি তার কোম্পানিটি বিক্রি করে দেয়ার আগে সব এমপ্লয়িদেরকে কোম্পানিটির একটি ওউনারশিপ স্টেইক দিয়ে দেন। অথচ এটি না করলে তিনি একা অনেক লাভ করতে পারতেন।

আয়নায় তাকানো

এই অল্পসংখ্যক মানুষদের আরেক উদারণ টি. জে. জ্লোৎনিৎস্কি। সবার প্রথমে তিনি নিজে একটি টেক কোম্পানি গড়ে তুলে নিজেকে ধনীদের কাতারে তোলেন। এরপর তিনি দাবি তোলেন যেন কোম্পানিগুলি কর্মীদের বেতন বাড়ায় এবং সরকার যেন ধনীদের ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। জ্লোৎনিৎস্কি নিজে অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার চেষ্টায় থাকা ধনীদের একটি সংস্থা ‘পেট্রিওটিক মিলিওনেয়ার’ এর সদস্য। একটি ব্লগ পোস্টে তিনি বলেন:
“আমার পরিবার যে সমস্ত সুযোগ ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাদি পেয়েছে সেগুলি কেবল আমেরিকাতেই সম্ভব, আর এইগুলি ছাড়া আমার এই গল্প ছিল অসম্ভব।”

তার মতো আরও ধনী ব্যক্তিদের সম্পর্কে জানার জন্য কিছু সাক্ষাৎকারের আয়োজন করা হয়েছিল। এই সাক্ষাৎকারগুলি নেয়া হয়েছিল সারা দেশের ২০ জন ব্যক্তির যারা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার চেষ্টায় নিয়োজিত অলাভজনক কিছু প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। প্রতিষ্ঠানগুলির নাম তারা প্রকাশ করতে চান নি। এই ২০ জনের প্রত্যেকেই নিজেদেরকে ‘ধনী বন্ধু’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। তাদের দাবী, তারা অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে স্বল্প আয়ের মানুষদের সাথে কাজ করে যাচ্ছেন। এই ২০ জন ব্যক্তি আমেরিকার ধনী ব্যক্তিদের উজ্জ্বলতম উদাহরণ। তাদের বেশিরভাগই সাদা চামড়ার এবং পুরুষ। বয়সের দিক থেকে তারা সব প্রজন্মকেই প্রতিনিধিত্ব করেন। কেউ কেউ উত্তরাধিকারসূত্রেই ধনী। আবার কেউ কেউ স্বল্প আয়ের পরিবারে জন্ম নিলেও সময়ের সাথে সাথে নিজেই গড়ে নিয়েছেন নিজের ভাগ্য।
জ্লোৎনিৎস্কির মতো বাকিরাও বলেছেন যে এই ব্যাপারে কাজ করতে গিয়ে তারা সবার আগে এক ধরণের গভীর উপলব্ধির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য ছিল আর্থিক বৈষম্য দূর করতে গিয়ে নিজেদের মর্যাদা ও অবস্থানের কারণে তারা যে বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন তা চিহ্নিত করা।

প্রথমত, তারা এটা মেনে নেন যে তাদের সম্পদের জন্য তারা অংশত ঋণী এমন এক সিস্টেমের কাছে যে সিস্টেম তাদের যোগ্যতা ও চেষ্টার বাইরেও তাদেরই অনুকূলে ছিল। বিশাল সম্পদের জন্য সিস্টেমের এই সহায়ক ভূমিকা বা ভাগ্যের কাছে ঋণী থাকার এই উপলব্ধি সহজ কোনো কাজ নয়। কারণ ‘যেটা যার প্রাপ্য সেটাই সবাই পায়’ এমন একটা প্রচলিত ধারণা সবার মনেই গেঁথে আছে। ‘বর্ন অন থার্ড বেইজ’ নামক স্মৃতিকথায় চাক কলিন্স এমনই এক আত্মোপলব্ধির গল্প বলেছেন। অস্কার মায়ের এর সম্পত্তির উত্তরাধিকার হয়েছিলেন চাক কলিন্স যা তিনি গ্রহণ না করে দান করে দিয়েছিলেন। মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি বণ্টনের আগে আরোপিত কর ‘এস্টেট ট্যাক্স’ সংরক্ষণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন এখন কলিন্স। একই সাথে তিনি অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যাপারে আরো গবেষণা করে যাচ্ছেন।

পরের ধাপটি হচ্ছে লজ্জ্বাকে দূর করা। বাড়তি সুবিধা পাওয়ার ব্যাপারটা উপলব্ধি করার ফলে ২০ জন ধনী ব্যক্তির অনেকেই লজ্জ্বিত হয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় একজন বাইসেক্সুয়াল নারীর কথা যিনি ২১ বছর বয়সেই প্রায় ১ মিলিয়ন ডলারের মালিক হয়েছিলেন। তিনি বলেন, তার বন্ধুদের কাছে একজন লেসবিয়ান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করাটা তার কাছে বরং সহজই ছিল। সে তুলনায় নিজেকে মিলিয়নেয়ার হিসেবে পরিচয় দেয়াটা তার জন্য বেশি কঠিন ছিল। ধনী হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেয়ার ব্যাপারটা অস্বস্তিকর — সাক্ষাৎকার দেয়া ২০ জনের মধ্যে অনেকের কাছ থেকেই এই রকম প্রতিক্রিয়া পাওয়াটা বেশ অবাক করা ব্যাপার ছিল। কারণ বেশিরভাগ আমেরিকানদের কাছেই তাদের সম্পদের পরিমাণ তাদের যোগ্যতার পরিচয়।
অপরাধবোধ আর লজ্জ্বা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি এই ‘ধনী বন্ধু’দের একটি ভয় ছিল তাদের প্রতি অন্য ধনী ব্যক্তিদের প্রতিহিংসা। ধনীদের উপর কর আরোপের পক্ষে কাজ করা জাতীয় তাদের কর্মকাণ্ডগুলি অন্য ধনীদের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠছিল। ফলে তা ছিল অন্য ধনীদের জন্য উদ্বেগের।

তবে সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি হওয়া ২০ জনের মধ্যে সবাই এই বিষয়ে একমত যে ‘ধনী বন্ধু’ হওয়ার জন্য এই কাজগুলি কঠিন হলেও জরুরি ছিল। অনেকেই বলেছেন নৈতিক সমর্থনের জন্য তারা একই মানসিকতার মানুষদের উপর ভরসা করেছেন।

জনসেবা বা ফিলানথ্রোপির সমস্যা

অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কিছু করতে চায় এমন বেশিরভাগ ধনী ব্যক্তিই তাদের কিছু টাকা দান করে দেন। তবে অর্থনীতিবিদ ইন্দ্রনীল দাসগুপ্ত ও রবী কানবুর এর গবেষণা অনুযায়ী, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য ফিলানথ্রোপি আদর্শ উপায় নয়।
ফিলানথ্রোপির ব্যাপারে অন্যান্য ধনী ব্যক্তির তুলনায় সাক্ষাৎকারের ২০ জন ধনী ব্যক্তির ছিল ভিন্ন ধারণা। সবাই তাদের সম্পদের অন্তত কিছু অংশ দান করেছেন। কেউ কেউ এমনকি তাদের অর্জিত পুরো সম্পদই দান করেছেন। কিন্তু বেশিরভাগই তাতেই থেমে না থেকে আরো কিছু কাজ করেছেন। যেমন, ধনীদের উপর কর বাড়ানোর জন্য লবি করা বা কর্মীদের বেতন বাড়ানোর জন্য কর্পোরেট বোর্ডগুলিকে চাপ দেয়া ইত্যাদি। অর্থনৈতিক সাম্যের জন্য যা সম্ভাব্য ২টি সমাধান।

কেউ কেউ বলেন, তাদের মনে হয়েছে তারা যেন আরো কার্যকর ভাবে ফিলানথ্রোপি করার অন্য আরেক পথ খুঁজে পেয়েছেন। যেমন, একজনের মনে হয়েছিল তার টাকা কোথায় খরচ হওয়া উচিত সেটা ঠিক করার জন্য তিনি সঠিক ব্যক্তি নন। প্রথমে তিনি তারই মতো উচ্চমধ্যবিত্তদের সৃষ্ট ও পরিচালিত বিভিন্ন চ্যারিটি সংস্থাসমূহে দান করতেন। তারপর তিনি এমন সংস্থাসমূহে দান করা শুরু করলেন যেগুলির পরিচালনায় রয়েছে গরীবরা নিজেরাই। এইভাবে তিনি তার এলিট ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন গরীবদের কাছে। কারণ তার মনে হয়েছিল নিজেদের উন্নতি কীভাবে করতে হয় সেটা তারা তার চেয়ে ভালো জানে।

এই উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করতে ‘ধনী বন্ধু’ হতে গেলে এমন প্যারাডাইম শিফট এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সাক্ষাৎকারের ২০ জন ‘ধনী বন্ধু’ বলেন, তাদের কাছে অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় মনে হয়েছে গরীবদের কাছে নিজেদের ক্ষমতা স্বেচ্ছায় হস্তান্তর করা। এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া অনেক ধনীদের জন্যই অস্বস্তিকর ও কঠিন একটা ব্যাপার হবে। কিন্তু তাদের এই চেষ্টা যদি আমেরিকার অর্থনীতি আর গণতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়, তবে তা কঠিন হলেও জরুরি ।

বাই নাথিং ডে—কিছুই না কেনার দিন

বাই নাথিং ডে
  • প্রায় ৬৫টি দেশে এই দিবস পালন করা হয়
  • প্রথম পালিত হয় কানাডায়, ১৯৯২ সালে
  • জনপ্রিয় রীতি কাঁচি দিয়ে ক্রেডিট কার্ড কেটে ফেলা
কেনাকাটা না করার দিন

বাই নাথিং ডে হল কিছুই না কেনার দিন। কনজ্যুমারিজমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি পদক্ষেপ হিসেবে আমেরিকাসহ বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬৫টি দেশে এই দিবস পালন করা হয়।

আমেরিকা, ব্রিটেন, ফিনল্যান্ড এবং সুইডেনে সাধারণত থ্যাংসগিভিং ডে’র পরের দিন অর্থাৎ নভেম্বরের শেষ শুক্রবারে বাই নাথিং ডে পালন করা হয়। নভেম্বরের শেষ শুক্রবারটি আবার ব্ল্যাক ফ্রাইডে হিসেবে পালিত হয়। কিন্তু অন্যান্য দেশগুলিতে এটি পালিত হয় তার পরের দিন, অর্থাৎ নভেম্বরের শেষ শনিবারে।

পশ্চিমা দেশগুলিতে ওভার-কনজাম্পশন বা অতিরিক্ত খরচ করার প্রবণতা থেকে ক্রেতাদের সরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে কানাডিয়ান শিল্পী টেড ডেইভ ‘বাই নাথিং ডে’ চালু করেন। পরবর্তীতে কানাডা ভিত্তিক এডবাস্টার্স ম্যাগাজিন বাই নাথিং ডে-কে খুব অল্প দিনের মধ্যেই জনপ্রিয় করে তোলে। এডবাস্টার্স ম্যাগাজিন আরো অনেক জনপ্রিয় প্রথা বিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রচারণার জন্যে বিখ্যাত, যেমন ‘টিভি টার্ন অফ ডে’ এবং ‘অক্যুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ ইত্যাদি।

যেভাবে শুরু হয়েছিল

প্রথম বারের মত ‘বাই নাথিং ডে’ পালিত হয় কানাডায়, ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বরে। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সাল থেকে ‘বাই নাথিং ডে’ উদযাপন করা হয় ব্ল্যাক ফ্রাইডে’র সাথে একই দিনে। ব্ল্যাক ফ্রাইডে হল আমেরিকার সবচেয়ে বড় কেনাকাটার দিন। এই একই দিনে বাই নাথিং ডে উদযাপন করার মাধ্যমে কনজ্যুমারিজম বিরোধীরা ক্রেতাদেরকে ক্রমশ ভোগবাদী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়া সম্পর্কে সতর্ক করে দিতে চান।

ব্ল্যাক ফ্রাইডে হল আমেরিকার সবচেয়ে বড় কেনাকাটার দিন
কাঁচি দিয়ে ক্রেডিট কার্ড কেটে ফেলা

বিশ্বজুড়ে নানান ধরনে ও রীতিতে ‘বাই নাথিং ডে’ উদযাপন করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল ক্রেডিট কার্ড কেটে ফেলা। অংশগ্রহণকারীরা শপিং মল বা শপিং সেন্টারে কাঁচি আর একটি পোস্টার নিয়ে উপস্থিত হন। পোস্টারের বিষয়বস্তু হল সেইসব মানুষকে সাহায্য করা যারা পাহাড় সমান ঋণের বোঝা কিংবা ইন্টারেস্ট রেট এর থাবা থেকে মুক্তি চান। সোজা কথায় অংশগ্রহণকারীরা এইসব মানুষকে সাহয্য করেন কাঁচি দিয়ে তাদের ক্রেডিট কার্ড কেটে দিয়ে।

জম্বি ওয়াক ও হুইর্ল মার্ট

আরেকটি জনপ্রিয় রীতি হল ‘জম্বি ওয়াক’। উদযাপনকারীরা শপিং সেন্টারের ভিতরে ‘ওয়াকিং ডেড’ মুভির জম্বিদের মত চোখেমুখে শূন্যতা নিয়ে ঘুরে বেড়ান। তাদেরকে এমন অদ্ভুত ভঙ্গি নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা ‘বাই নাথিং ডে’র উদ্দেশ্য ও গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন।

২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরের রাস্তায় ব্ল্যাক ফ্রাইডের বিরোধিতায় জম্বি ওয়াক

জম্বি ওয়াকের মতই আরেকটি আজব রীতি হল ‘হুইর্ল মার্ট’। ‘বাই নাথিং ডে’ উদযাপনকারীরা মার্কেটের ভিতরে খালি ট্রলি নিয়ে ঘুরাঘুরি করেন কোনো কিছু না কিনেই। সাধারণত এতে অংশগ্রহণকারীরা লম্বা একটা সারিতে দলবদ্ধভাবে খালি ট্রলি নিয়ে মার্কেটের ভিতরে ঘুরতে থাকেন।

২০০৯ সালে ‘বাই নাথিং ডে’তে অংশগ্রহণকারীরা ব্যতিক্রমী একটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এ দিন ২৪ ঘণ্টা ধরে কোনোকিছু না কেনার পাশাপাশি তারা বাসার লাইট, টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ইত্যাদি বন্ধ করে রেখেছিলেন। এমনকি অনেকে এদিন গাড়ি নিয়েও বের হন নি।

কনজ্যুমারিজমের বিপক্ষে সমাজতাত্ত্বিকদের অবস্থান

কনজ্যুমারিজম বিরোধিতার ইতিহাস বেশ পুরনো। বিশেষ করে উনিশ ও বিশ শতকের বামপন্থী সমাজতত্ত্বে কনজ্যুমারিজমের বিরোধিতার মূল খুঁজে পাওয়া যায়। এই ধারার সমাজতাত্ত্বিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন নরওয়েজিয়ান-আমেরিকান সমাজতাত্ত্বিক থরস্টেইন ভেবলেন। তার ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত ‘এ থিওরি অব লিজার ক্লাস: অ্যান ইকনোমিক স্টাডি অব ইন্সটিটিউশনস’ বইয়ে তিনি দাবি করেন অবকাশ ও বিলাসিতা নিয়ে আধুনিক ধ্যান-ধারণা হল ‘সামন্ততান্ত্রিক অবশেষ’ বা ‘ফিউডাল হোল্ডওভারস’।

ব্ল্যাক ফ্রাইডে কবে থেকে চালু হল তা নিয়ে মতবিরোধ আছে। কারো কারো মতে এটি শুরু হয়েছিল ১৯৫১ সালে, ফিলাডেলফিয়ায়। তবে ব্ল্যাক ফ্রাইডে উন্মাদনার তুঙ্গে ওঠে ২০১১ সালে। সে বছর অনেক বড় বড় দোকান যেমন টার্গেট, কোল’স ও ম্যাসি’স মধ্যরাতের দিকেই ক্রেতাদের জন্যে প্রবেশদ্বার খুলে দেয়। সে বছর ক্রেতাদের এত বেশি ভিড় ছিল যে মধ্যরাতে দ্বার খুলে না দিলে সবার পক্ষে কেনাকাটা করা অসম্ভব হত।

বাই নাথিং ডে সম্পর্কে ভিন্ন অভিমত

বাই নাথিং ডে নিয়ে অনেক সমালোচনাও রয়েছে। অনেকেই মনে করেন এটি একটি শূন্যগর্ভ কাজ। এদের মতে বাই নাথিং ডে একদিনের জন্যে কিছু সংখ্যক ক্রেতাকে কেনাকাটা থেকে দূরে রাখলেও আসলে এতে বাজারের ওপরে বড় মাপের কোনো প্রভাব পড়ে না। পণ্যের কেনাবেচা সম্পর্কে ক্রেতাদের মনোভাব পরিবর্তনেও বাই নাথিং ডে’র সাফল্য খুবই সীমিত।

আরো পড়ুন: মাইকেল পোলান এর ‘ইন ডিফেন্স অফ ফুড’ থেকে

আবার অনেকেই মনে করেন বাই নাথিং ডে উদযাপনে যারা অংশগ্রহণ করছেন তারাই আবার পরের দিন একই শপিং মলে শপিং করতে যাবেন। তাহলে আর একদিনের জন্যে কোনো কিছু না কিনে বসে থাকার মানেটা কী!

 

২৩ নভেম্বর, ২০১৮ সালের বাই নাথিং ডে
সমর্থকদের যুক্তি

তবে বাই নাথিং ডে’র সমর্থকদের যুক্তি হল, এটি উদযাপনের মাধ্যমে কিছুটা হলেও কনজ্যুমারিজমের লাগাম টেনে ধরা যায়। একদিনের জন্যে হলেও এটি বাজার কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ক্রেতা সম্প্রদায়কে তাদের সত্যিকার অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।

এডবাস্টার্স এর মতে, এটি শুধুমাত্র একদিনের জন্যে অভ্যাস পরিবর্তন নয়, বরং এটি হল সারাজীবনের জন্যে সীমিত ক্রয় করার ও অপব্যয় হ্রাস করার প্রতিজ্ঞা।

অক্যুপাই এক্সমাস

২০১১ সালে এডবাস্টার্স দিবসটির নাম পরিবর্তন করে রাখে ‘অক্যুপাই এক্সমাস’ যা ‘অক্যুপাই মুভমেন্ট’ এর সাথে দিবসটির সামঞ্জস্যকে নির্দেশ করে। এটি ‘বাই নাথিং ক্রিসমাস’ হিসেবেও পরিচিত।

বাই নাথিং ডে ২০১৮
চলতি বছরের বাই নাথিং ডে পালিত হতে যাচ্ছে ২৩ নভেম্বর।

২০২০ সালের নির্বাচনে মার্ক জুকারবার্গ কি ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় হুমকি?

ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক এলিয়ট জুকারবার্গ বর্তমানে আমেরিকায় দেশব্যাপী একটি সফরে ব্যস্ত আছেন।

তার ভাষ্যমতে, এই সফরের মুখ্য উদ্দেশ্য “অধিক মানুষের জীবনযাপন, কাজ এবং তাদের ভবিষ্যত ভাবনা সম্বন্ধে জানার ও শোনার চেষ্টা।”

অনেকেই মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসাবে তার আত্মপ্রকাশের উদ্দেশ্যে একটি পরীক্ষামূলক প্রচারণা।

২০১৭ সালের ৪ জানুয়ারি ফেসবুকে মার্ক জানান, “এ বছর আমার ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ হল—বছর শেষে প্রতিটা রাজ্যের মানুষের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ সম্পন্ন করা। ইতোমধ্যে অনেক রাজ্যেই বেশ কিছু সময় কাটানো হয়েছে। তো এই চ্যালেঞ্জ পূর্ণ করার জন্য আরো প্রায় ৩০টি রাজ্য ঘুরে দেখতে হবে।”

এর আগের বছর ডিসেম্বরে মার্ক ফেসবুকের একটি কমেন্টের জবাবে বলেন, একটা সময় পর্যন্ত নাস্তিক থাকলেও বর্তমানে তিনি মনে করেন ধর্ম অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তারও আগে তিনি বলেছিলেন, ফেসবুকের অবকাঠামো এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যে, তিনি সরাসরি অনুপস্থিত থাকলেও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে তাকে পদত্যাগ করতে হবে না। এসব কিছু তার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবার দিকেই ইঙ্গিত করে বলে মনে করছে ভেঞ্চার বীট পত্রিকা।

কিন্তু বাজফীড নিউজের একটি প্রশ্নের উত্তরে এ রকম সম্ভাবনার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন তিনি।

যদি এমনটা হয়েও থাকে, তবে একটা ব্যাপার অন্তত বেশ ভাল মত বোঝা যাচ্ছে যে—ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে কোনো প্রকার সহায়তা তিনি পাবেন না। কারণ সম্প্রতি মন্টানার গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্কে সফর করার আগে—যে পার্কটিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক বলে মনে করেন অনেকে—ট্রাম্প প্রশাসনের নির্দেশে সেই সফরে জুকারবার্গকে কোনো প্রকার সহায়তা করা থেকে বিরত থাকতে  বলা হয় পার্কের কর্মীদের। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর কোনো ছবি প্রকাশেও কর্মীদেরকে দেওয়া হয় নিষেধাজ্ঞা।

এর আগে জলবায়ু পরিবর্তনকে ভুয়া বলে দাবি করায় ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন জুকারবার্গ। মাত্র তৃতীয় দেশ হিসাবে প্যারিস চুক্তি থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করেন ট্রাম্প। একই সাথে কয়েকটি ডিপার্টমেন্টকে জলবায়ু পরবির্তন সম্পর্কিত কোনো প্রকার গবেষণা ও বিবৃতি প্রদান করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন তিনি।

প্যারিসের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক চুক্তি থেকে ট্রাম্পের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে জুকারবার্গ ‘পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্যে ক্ষতিকর’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

এ ব্যাপারে গত ২ জুন, ২০১৭ তারিখের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে মার্ক বলেন :

“প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করা পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর এবং তা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিবে।”

“আমাদের দিক থেকে, প্রত্যেকটা নতুন ডাটা সেন্টার যেন ১০০% নবায়নযোগ্য শক্তি দিয়ে চালিত হয়—সে ব্যাপারে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।”

“একটা বৈশ্বিক সঙ্ঘবদ্ধ কমিউনিটি হিসাবেই কেবল জলবায়ু পরিবর্তন রুখে দিতে পারব আমরা। বেশি দেরি হয়ে যাবার আগেই তাই আমাদেরকে কাজে নামতে হবে।”

শুধু জলবায়ু পরিবর্তনে মতপার্থক্য হওয়াতেই যে ট্রাম্প মন্টানার পার্কে জুকারবার্গের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন তা নয়। সম্প্রতি এ রকম কথা উঠেছে যে, ট্রাম্পের মত জুকারবার্গও হয়ত কোনো মধ্যপন্থায় না গিয়ে প্রধান নির্বাহীর অবস্থান থেকে সরাসরি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

এপ্রিল মাসের শেষের দিকে এক সপ্তাহে ৪ রাজ্য ঘুরে দেখেন জুকারবার্গ। আর এই ৪টিতেই ট্রাম্প ছিলেন বিজয়ী: ওহাইয়ো, মিশিগান, ইন্ডিয়ানা ও উইসকনসিন।

এখানকার যেসব মানুষ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সাথে ওতপ্রোত জড়িত নয়, তাদের সাথেই বেশি সময় কাটিয়েছেন তিনি। অবশ্য একই সময় এই ট্রাম্পের ৪ রাজ্য ঘোরার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ কাকতালীয়ও হতে পারে; যেহেতু জুকারবার্গের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবার ব্যাপারে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায় নাই।

নিউজউইক এর তথ্য মতে, ট্রাম্পের চাইতে জুকারবার্গের গ্রহনযোগ্যতা বেশি হলেও আমেরিকার মোট জনসংখ্যার ৪৭ শতাংশ তার ব্যাপারে অনিশ্চিত। শতকরা ২৯ ভাগ তার পক্ষে এবং ২৪ ভাগ মানুষ তার বিপক্ষে।

 

ছবি ও ক্যাপশন

 

১.

২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে উইসকনসিনের ব্ল্যানশার্ডভিলে গ্যান্ট পরিবারের খামার ঘুরে দেখেন জুকারবার্গ।

২.

“সামরিক বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার স্ত্রীদের সাথে মধাহ্নভোজের সময় অনেক কিছু শিখলাম আমি”—জুকারবার্গ

৩.

মাদার ইমানুয়েল এএমই চার্চে।

৪.

“Watching the rodeo with Fort Worth Mayor Betsy Price.”

৫.

“My next stop in Texas was meeting with officers from the Dallas Police Department. These officers do such important work, and it meant a lot to me to be able to thank them in person.”

৬.

“Chef Judy, a military veteran herself, started a small business and cooked us lunch at Fort Bragg.”

৭.

“বাছুরটা আমাকে বেশ পছন্দ করে এখন।”—জুকারবার্গ

৮.

৯.

১০.

১১.

১২.

১৩.

১৪.

১৫.

১৬.

১৭.

১৮.

১৯.

 

২০.

“মিশিগান-ডিয়ারবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন মুসলিম শিক্ষার্থীর সাথে আলাপ করলাম। আমেরিকার সবচাইতে বড় ও পুরাতন মুসলিম সম্প্রদায়ের মাঝে একটি হল ডিয়ারবর্ন। এর প্রায় ২০ শতাংশ অধিবাসী মুসলিম।”—জুকারবার্গ

২১.

“লুইজিয়ানাতে এসে পৌঁছালাম মাত্র। প্রথমেই ব্যাটন রুজে বার্বিকিউ খাব। আগামী দুইদিন আরো অনেক মানুষের সাথে দেখা করার আশা রাখি।”—জুকারবার্গ

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে জুকারবার্গ বছর শেষে সম্পূর্ণ আমেরিকা সফরের ব্যাপারে যে সঙ্কল্প ব্যক্ত করেছিলেন, তারই বিভিন্ন মুহূর্ত থেকে এই ছবিগুলি তোলা হয়েছে। প্রযুক্তি মহলে তার অবস্থান এবং  “বিশ্বকে সংযুক্ত করা ও সকলকে তাদের মত প্রকাশের সুযোগে করে দেওয়া”র ওপর ভিত্তি করে তার এই যাত্রা শুরু হয়।

কিন্তু কয়েক মাস পার হয়ে যাবার পর তার এই সফরকে কেবল একটি সামাজিক যাত্রার চাইতে বরং একটা পুরাদস্তুর ক্যাম্পেইন বলেই মনে হচ্ছে বেশি।