প্লাস্টিক প্যাকেজিং এর সমস্যা মোকাবেলায় যুগান্তকারী ৫টি প্রকল্প

প্রতিবছর প্রায় ১৩ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে গিয়ে মিশে। এর ফলে সামুদ্রিক প্রাণিরা মরা যায়, গোটা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয় এই বর্জ্যের কারণে। এমনকি মানুষও এই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায় না।

বেশিরভাগ প্লাস্টিকই প্রকৃতিতে মিশে না, বছরের পর বছরের এমনি প্লাস্টিক আকারেই মাটিতে থেকে যায় এবং প্রকৃতির ক্ষতি করে।

প্লাস্টিক যেহেতু দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সবক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হচ্ছে, চাইলেও এর ব্যবহার অতি দ্রুত কমানো যাচ্ছে না।

আগে এ বিষয়ে গা না করলেও সচেতন ক্রেতা এবং ভোক্তারা এখন প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠছেন, তারা অনেকেই প্লাস্টিকের ব্যবহার কম দেখতে চান এবং বিকল্প চান। প্লাস্টিক বিরোধী বিভিন্ন মতামত, জরিপে তারা নিচ্ছেন, সমাধান চাচ্ছেন, দিতে চেষ্টা করছেন। জরিপে দেখা গেছে, ৪৮% ভোক্তা মনে করেন উৎপাদনকারী কারখানাগুলিই প্লাস্টিকের এই সমস্যার জন্যে দায়ী।

জবাবে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলি প্লাস্টিকের বিকল্প না থাকার অজুহাত দিয়েছে। তাদের কথা, এই যে এত জায়গায় প্লাস্টিক যে ভূমিকা পালন করে সেটা বাদ দিলে এই ক্ষেত্রগুলিতে তারা কী ব্যবহার করবেন আসলে? কিছুই তো নেই।

এই সমস্যা সমাধানে কিছু প্রতিষ্ঠান আর উদ্যোক্তারা অনেকগুলি সৃজনশীল প্রকল্প নিয়ে এসেছেন। যা একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব এবং প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। প্রস্তবের সঙ্গে সঙ্গে সমালোচকরা এই সমাধানগুলির ব্যাপারে বেশ ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। তারা মনে করছেন প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে এগুলি খুব ভালো কাজ করবে। এমন ৫টি জনপ্রিয় উদ্যোগ নিচে থাকছে।

১. সাবান দিয়ে বানানো বোতল


লন্ডনের সেন্ট্রাল সেন্টমার্টিন কলেজের মাস্টার্সের ছাত্র মি ঝোউ ‘সোপ্যাক’ নামে একধরনের বোতল তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। অসাধারণ দেখতে এই বোতলগুলি মূলত সাবান দিয়ে তৈরি। এমনকি সাবানগুলিও গাছগাছালি থেকে বানানো হয়েছে। বোতলের চারপাশে মোমের পাতলা আস্তরণ দেয়া হয়, যাতে ভেতরে থাকা তরল বাষ্প না হয়।

পণ্য ব্যবহার করার পর বোতলগুলি যদি কোথাও ফেলে দেন, অল্প সময়েই তা খুব সহজে প্রকৃতিতে মিশে যাবে। পরিবেশ বা মাটির কোনো ক্ষতি হবে না এতে। আর আবর্জনা নিয়েও চিন্তা করতে হবে না।

প্রাথমিকভাবে পারফিউমের জন্যে এই বোতলগুলি ডিজাইন করেছেন মি ঝোউ। বাজারের অন্যান্য পারফিউম বোতলের চাইতে এই বোতলগুলি দেখতে অনেক আকর্ষণীয়।

ঝোউ এর অন্যান্য প্রোজেক্টগুলিও বেশ রিসাইকেল-মূলক ও পরিবেশবান্ধব। যেমন পুরনো বই থেকে তৈরি করা ফার্নিচার, গাছের পাতা, ফুলের পাপড়ি ইত্যাদি থেকে তৈরি করা কাগজ ইত্যাদি। চোলাই কারখানায় ব্যবহার হয়ে যাওয়া শস্য থেকে কৃত্রিম চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনের কৌশলও তিনি আবিষ্কার করেছেন।

২. কিটক্যাট অরিগ্যামি
কিটক্যাট জাপানে অনেক জনপ্রিয়। নেসলে কোম্পানি সেখানে কিটক্যাটের অনেকগুলি নতুন ফ্লেভারও নিয়ে এসেছে। যেমন জাপানে কিটক্যাট স্ট্রবেরি বা ওয়াসাবি ফ্লেভারেও পাবেন।

এই কিটক্যাটের যা চাহিদা সারা জাপান জুড়ে, তার প্যাকেজিংয়ে প্রচুর পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে প্রতিদিন। এই সমস্যা সমাধানে নেসলে জাপান একটা নতুন প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। তারা প্লাস্টিকের বদলে কাগজ দিয়ে কিটক্যাট প্যাকেজিং করতে যাচ্ছে। এই প্রোজেক্টের তারা নাম দিয়েছে কিটক্যাট অরিগ্যামি।

অরিগ্যামি কাগজ ভাঁজ করে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করার একটা জাপানি পদ্ধতি। তারা কিটক্যাটের গায়ে কিভাবে নির্দেশনাও দিয়ে দিবেন কীভাবে ওই কাগজটা দিয়ে সারস পাখি বানাতে হবে। জাপানে সারস পাখি হলো আনন্দের প্রতীক। অরিগ্যামি বেশ মজার, ফলে বাচ্চারা বিশেষত, যারা এর মূল ভোক্তা বেশ উৎসাহিত হবে এই ব্যাপারে।

৩. প্যাকেট থেকে জৈব সার

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ২০১৯ সালে প্রযুক্তির সৃজনশীল ব্যবহারে শীর্ষে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলির নাম ঘোষণা করেছে। বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের জন্যে যারা উদ্ভাবনমূলক ধারণা এনেছে, তারাই এই লিস্টে প্রাধান্য পেয়েছ।

এর মধ্যে ইজরাইলের কোম্পানি টি.আই.পি.এ রয়েছে। টি.আই.পি.এ প্রাকৃতিক বিভিন্ন জিনিস দিয়ে প্যাকেট বানানোর পদ্ধতি বাজারে নিয়ে এসেছে। তাদের তৈরি প্যাকেট দেখতে একেবারেই প্লাস্টিকের মত। কিন্তু একবার ব্যবহৃত হয়ে যাওয়ার পর প্যাকেটের গায়ে থাকা রঙ থেকে শুরু করে পুরো প্যাকেটটাই ১৮০ দিনের মধ্যে জৈবসারে পরিণত হবে। তাজা ও শুকনা খাবার আর পোষাকের জন্যে প্রাথমিকভাবে তাদের প্যাকেটগুলি বাজারজাত হবে।

যুক্তরাজ্যের খাদ্য বাজারজাতকারী একটা প্রতিষ্ঠান এরমধ্যেই এই ব্যাগগুলি দিয়ে ফলমূল বাজারজাত করা শুরু করে দিয়েছে। এই প্যাকেটগুলি ব্যবহার করার মাধ্যমে বছরে ১৮ টনের মত প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন এড়ানো যাবে।

৪. বারবার ব্যবহার

চলতি বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক মিটিংয়ে ‘দ্য লুপ অ্যালায়েন্স’ নামে বিভিন্ন নিয়ে একটা জোট গঠন হয়। রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠান ‘টেরা-সাইকেল’ এর সাথে পৃথিবীর বড় বড় ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলি এই জোটে অংশ নেয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল, প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ কমানো এবং এই বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা।

লুপ অ্যালায়েন্স প্রাথমিকভাবে একটা প্রজেক্টও হাতে নেয়। তা ছির মূলত প্লাস্টিকের বদলে টেকসই প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার বাড়ানো। প্যাকেজিং টেকসই হলে একই পাত্র বারবার ব্যবহার করা যাবে। কিছু ক্ষেত্রে ১০০ বারেরও বেশি ব্যবহার করা যাবে।

এখনো পর্যন্ত এই প্রজেক্ট থেকে বাজারে তিন ধরনের পণ্য এসেছে। অ্যালুমিনিয়ামের বোতলে শ্যাম্পু, গ্লাসের পাত্রে মাউথওয়াশ আর স্টিলের তৈরি কন্টেইনারে আইসক্রিম।

৫. মাশরুম প্যাকেজিং

‘অ্যাভোকেটিভ ডিজাইনস’ নামে নিউ ইয়র্কের একটা প্রতিষ্ঠান প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে ‘মাইসেলিয়াম’ ব্যবহার করতে যাচ্ছে। মাশরুম মূলত মাইসেলিয়াম দিয়েই তৈরি হয়।

ব্যবহার করার পরে এই প্যাকেটগুলি জৈব সারে রুপান্তরিত হয় এবং প্রকৃতিতে মিশে যায়। তাতে মনে হতে পারে প্যাকেট হিসেবে বোধহয় তা টেকসই না, কিন্তু সেগুলি খুবই টেকসই। এমনকি আগুনের তাপেও সহজে নষ্ট না।

সঙ্গে তারা যেটা করছে, নিজেদের ব্যবহারের জন্যে এই ধরনের প্যাকেট যাতে মনুষ ঘরে বসেই বানাতে পারে তার জন্যে তারা বিভিন্ন সরঝঞ্জাম বানাচ্ছে। এরমধ্যেই এর একটা পরিপূর্ণ সেট বাজারজাত করেছে তারা। মানুষ এখন ঘরে বসে নিজে নিজেই পরিবেশবান্ধব প্যাকেট বানাতে পারবে।

ক্যান্সার ধ্বংসকারী ভাইরাস উদ্ভাবন

নতুন ভাইরাসটিকে কেন্দ্র করে সাজানো ‘সিএফথ্রিথ্রি’ নামক চিকিৎসাপদ্ধতির মাধ্যমে ইঁদুরের দেহে থাকা টিউমার পুরাপুরিভাবে সংকুচিত করে ফেলা গেছে।
Continue reading

খাদ্য ঘাটতি পূরণে থাইল্যান্ড যা করছে

কিছু প্রতিষ্ঠান কৃষকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে তাদেরকে প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ফলে তাদের কৃষকরাও জৈবপ্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠছে।

Continue reading

নিজেদের পায়ের শব্দ কেন শুনতে পাই না আমরা

ফাঁকা একটা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আকস্মিক কোনো পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। ধরেই নিলেন কেউ আপনাকে ফলো করছে। এর কারণ, জায়গাটা নীরব হলেও আপনি সাধারণত নিজের পায়ের শব্দ আলাদা করে কখনো শুনতে পান না। তাই পায়ের শব্দ শুনলেই আপনার মনে হয় অন্য কেউ হেঁটে আসছে।

আমাদের ব্যক্তিগত শব্দগুলি মস্তিষ্ক সচরাচর আলাদা করে রেজিস্টার করে না। বিজ্ঞানীরা বরাবরই এই বিষয়টা জানতেন। কিন্তু মস্তিষ্ক ঠিক কীভাবে এই কাজটা করে থাকে তা সঠিকভাবে এখন পর্যন্ত অজানা ছিল। সম্প্রতি ‘নেচার’ পত্রিকার একটা গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়, যেখানে বিজ্ঞানীরা পায়ের শব্দের ওপর ভিত্তি করে মস্তিষ্কের শব্দ “ফিল্টার” করার প্রক্রিয়া সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করেন।

ব্রেইনের প্রতিটা আলাদা আলাদা স্নায়ুকোষ অর্থাৎ নিউরনগুলি এই উদ্দেশ্যে কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে তা জানার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটার সিমুলেশন ব্যবহার করে একটা “অগমেন্টেড রিয়্যালিটি” নির্মাণ করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে ইঁদুরদের ওপর পরীক্ষা চালানো হয় এবং হাঁটার সময় ইঁদুররা কীরকম শব্দ শুনতে পাবে সেটা তারা পরীক্ষামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন।

দেখা যায়, ইঁদুরগুলি নিজেদের হাঁটার শব্দে অভ্যস্ত হয়ে যাবার পর তাদের মস্তিষ্কের অডিটরি কর্টেক্সের সব নিউরন সে শব্দে প্রতিক্রিয়া জানানো বন্ধ করে দেয়। আর অডিটরি কর্টেক্সই হলো আমাদের মস্তিষ্কের অন্যতম প্রধান শ্রবণ কেন্দ্র।

কোনো ইঁদুর যখন তার পায়ের শব্দ শুনে, তখন অডিটরি কর্টেক্সের ‘ইনহিবিটরি নিউরন’গুলি সক্রিয় হয়ে ওঠে। নিজের পায়ের শব্দে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া ইঁদুরের ধারণা অনুযায়ী এসব নিউরনের একটা গ্রুপ সেই শব্দের একটা ফটো-নেগেটিভ তৈরি করে রাখে। ফলে হাঁটার সময় আসলেই যখন ইঁদুরটি সেই শব্দ শুনতে পায়, ফটো-নেগেটিভ শব্দটিকে তখন বাতিল করে দেয়।

অন্যদিকে, কোনো অপ্রত্যাশিত শব্দ শুনতে পেলে অডিটরি কর্টেক্সের নিউরনে খুবই জোরালো প্রতিক্রিয়া হয়। শারীরবৃত্তিক এ প্রবণতা কেবল পায়ের শব্দেই সীমাবদ্ধ না। আমরা যখন কীবোর্ডে টাইপ করি, কীস্ট্রোকের শব্দ আমাদের কানে এলেও আমরা বিরক্ত হই না। কিন্তু পাশে বসে থাকা অন্য কারো টাইপ করার শব্দ সহজেই আমাদের বিরক্তি উদ্রেক করে।

যেসকল প্রাণি নিয়মিত শিকারের হাত থেকে নিজদের রক্ষা করে চলে, যেমন ইঁদুর, তাদের জন্য এই প্রক্রিয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজেস্ব স্বতঃস্ফূর্ত শব্দ থেকে পারিপার্শ্বিক শব্দ আলাদা করার তাৎক্ষণিক ক্ষমতা তাদেরকে সমূহ বিপদের হাত থেকে বাঁচায়।

তাছাড়া আমরা যখন কথা বলি, গান গাই কিংবা কোনো যন্ত্রে সুর তুলি– তখনও এটা কাজে আসে। যেমন, গিটার বাজাতে বসলে আমাদের একটা পূর্বধারণা থাকে– ঠিক কোন ধরনের সুর তুলব আমরা। কিন্তু প্র্যাক্টিস করার সময় অনেক ভুল হয় আমাদের। ব্রেইনের সেই মেকানিজম একটা ভুল নোট শুনলেই সাথে সাথে আমাদেরকে তা জানান দিয়ে দেয়। ফলে আমরা ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পাই।

বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে বোঝার চেষ্টা করবেন কীভাবে এসকল “এরর সিগনাল” আমাদের ভাষা শিক্ষা ও সঙ্গীতচর্চায় ভূমিকা রাখে। তাছাড়া এ গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করে গবেষকরা স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ব্যাপারে আরো অনেক কিছু জানতে পারবেন বলে আশা করছেন। কারণ স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগীরা প্রায়ই স্পষ্টভাবে কিছু কাল্পনিক শব্দ শুনতে পান। হতে পারে, ব্রেইনের যেসকল সার্কিট শব্দ উপেক্ষা ও শনাক্ত করে থাকে, সেগুলি এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

সূত্র. হাও স্টাফ ওয়ার্কস/সায়েন্স