ধরা যাক, ছমিরন গৃহশ্রমিকের কাজ করতে যান সামির সাহেবের বাড়ি। কিংবা সালাম গাড়ি চালাতে যান তরিকুল সাহেবের বাড়িতে।

সামাজিক শ্রেণীর শিক্ষক হিসেবে বহুকাল সব থেকে কার্যকরী থেকে এসেছিল ঢাকার এফডিসি উৎপাদিত ছায়াছবিসমূহ। সাধারণ বুদ্ধিতে মনে হতে পারে যে হয়তোবা ‘আর্ট-ফিল্মের’ কাজবাজ ছিল এগুলো। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। বরং এফডিসির প্রেমমূলক কাহিনিগুলোই শ্রেণী প্রশিক্ষণে দারুণ দক্ষতা দেখিয়েছিল। সাধারণভাবে বলা চলে, সাদাকালো জমানার ছায়াছবি মুখ্যত ফিউডাল বা সামন্ত শ্রেণীকে চেনাতে আর রঙিন জমানার ছবিগুলো বুর্জোয়া বা পুঁজিপতি শ্রেণীকে চেনাতে ভূয়সী অবদান রেখেছে।

তো কী হতো এসব ছবিতে? যদি রঙিন ধরেই আগাই, দেখা যেতো প্রেমিক-প্রেমিকার একজনের পিতা(মাতা) এই শ্রেণীর হবেন। আর অবধারিত ভাবেই অন্যজন হবেন তুলনামূলক গরিব। এই যে তুলনামূলকতা এটা কিন্তু অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। পরে এই বিষয়টা যে কী পরিমাণ অসুবিধা করে তা দেখতে পাবো আমরা। যাহোক, তো সেই ‘বড়লোক’ পিতা প্রায়শই একটা গাউন পরে হার্ডবোর্ডের সিঁড়ি দিয়ে দোতলা থেকে নামবেন, তাঁর মুখে একটা পাইপ থাকবে বা থাকতে পারে, তিনি অনেক ইংরাজি বলবেন, যদিও প্রায়শই সাথে সাথে বাংলা তর্জমাটাও করে দেবেন (মনে করার জন্য মুস্তাফা সাহেব বা খলিল সাহেবের করা চরিত্রগুলো ভাবতে পারেন, রাজীব সাহেবেরও)। অত্যন্ত চড়া মেজাজেরও হবেন তাঁরা। সব থেকে বড় কথা, সন্তানের প্রেমের কথা জেনে, বিশেষত ‘গরিব ঘরে’ প্রেমের কথা জেনে যারপরনাই অগ্নিশর্মা হয়ে যাবেন। তারপর তাঁর ক্ষমতা, দক্ষতা ও নেটওয়ার্কের সকল কিছু বিনিয়োগ করবেন যাতে ওই প্রেম (মানে হবুবিয়ে) ছোটানো যায়।

বাস্তবে, হার্ডবোর্ড বা পাইপ বা গাউন মেলাতে গেলে ঝামেলায় পড়তে পারেন আপনি (হার্ডবোর্ডের ওই সিঁড়ি এমনিতেও ক্যামেরার সুবিধার জন্য বানানো ছিল); কিন্তু এর বাইরে এই শ্রেণীর অন্যান্য ভূমিকা একদম পাই পাই করে বাস্তব জীবনে মিলিয়ে নিতে পারবেন। এজন্যই বললাম যে শিক্ষক হিসেবে খুবই কার্যকরী ছিল এই চলচ্চিত্রগুলো। এখন এত সুলভ শিক্ষাদান থাকার পরও কেন চারপাশের মানুষজন শ্রেণী বুঝতে পারেন না, বা কম পারেন? (কম চাইতে পারেন, সেটা আরেক আলাপ হবে)। এর নানান কারণ নিশ্চয়ই আছে। তবে এখানে আজ আমরা একটি অত্যন্ত মৌলিক গূঢ় কারণকে অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করব। বা, বলা চলে দেড়খানা কারণ। একটা হলো তুলনামূলকতার চক্কর, কিছুক্ষণ আগে যেটার বিষয়ে আপনাদের সতর্ক করেছি। অন্য আধখানা কারণ হলো জেনেরিক বা গড়গড়া বিশেষণ ব্যবহারের অভ্যাসের কারণ— ‘বড়লোক’। আসলে আধখানা ওই কারণটাও তুলনার মধ্যেই পেঁচিয়ে আছে। ছায়াছবির ‘বড়লোক’ নায়কপিতা (বা নায়িকাপিতা) আর ‘গরিব মানুষ’ নায়িকাপিতার (বা নায়কপিতা) মতো সহজেই ফারাক করতে পারার মতো পরিস্থিতি বাস্তবে থাকে না।

ধরা যাক, ছমিরন গৃহশ্রমিকের কাজ করতে যান সামির সাহেবের বাড়ি। কিংবা সালাম গাড়ি চালাতে যান তরিকুল সাহেবের বাড়িতে। তো, সামির সাহেব হয়তো গৃহশ্রমিক-ট্রমিকদের সঙ্গে কম কথা বলেন। সামির সাহেবের স্ত্রী কিন্তু ততটা না-কথা বলার দলে নাও থাকতে পারেন। ঠিক যেমনটা তরিকুল সাহেব হয়তো গাড়িতে বসে সালাম ড্রাইভারের সঙ্গে গালগল্প করে থাকতে পারেন। এখন এদিকে, ছমিরন গৃহশ্রমিক আর সালাম গৃহড্রাইভার মেলাদিন থেকে জেনে আসছেন যে সামির সাহেবেরা আর তরিকুল সাহেবেরা বড়লোক, আর তাঁরা নিজেরা গরিব মানুষ। কিন্তু ওদিকে হলো কী, সামির সাহেবের স্ত্রী কথা বলতে-বলতে ছমিরনকে কোনো এক আত্মীয় বা প্রতিবেশীর নিন্দা করার জন্য বলে বসলেন, “আর কইও না, আমাদের তো আর হ্যাগো মতো অবস্থা না, আমরা ঢাকা শহরে গরিবের মতো এক বাসায় পইড়া আছি; হ্যারা বড়লোক মানুষ, হ্যাগো কথাই আলাদা।” ছমিরনের তো মাথা আউলানো অবস্থা হলো শ্রেণী বিষয়ক এই জ্ঞানে। তরিকুল সাহেবও গাড়িতে বসে সালামকে কোনো এক দুঃখভারাক্রান্ত দিনে বলে বসতে পারেন যে “ব্যবসাপাতির অবস্থা তো বুঝতেছোই, আমাদের মতো মানুষজনের আর বাঁইচা থাকার উপায় নাই।” যদিও নিজেকে গরিব সরাসরি বললেন না তিনি, কিন্তু তাতেও সালাম ড্রাইভারের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। শ্রেণী ট্রেনী বোঝার পুরাই বারোটা বাজল তাঁর।

এখন আপনারা ভাবতেই পারেন ছমিরন কিংবা সালামের শ্রেণী বিষয়ক জ্ঞানগম্যি যেমনই হোক তাতে কিছু আসে যায় না, তাঁদের আউলানো দশা হলেই বা কী! কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই পরিস্থিতিটা এর থেকে গুরুতর। যাঁদের শ্রেণী বুঝতে হবে বলে আমরা ভাবছি, তাঁদেরও এই জেনেরিক বর্গ ‘বড়লোক’ আর তুলনামূলকতা মাথা আউলে দিয়ে থাকে। তরিকুল সাহেব সামির সাহেবের স্ত্রী হয়তো সেদিন একটু অতিরঞ্জন করেছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁরা সত্যি সত্যি অমুক বা তমুককে ‘বড়লোক’ ভাবেন, এবং তুলনায় নিজেদের ‘গরিব’ ভাবেন। এভাবে আস্ত নতুন গাড়ির সঙ্গে রিকন্ডিশন গাড়ির, সেডানের সঙ্গে জীপের, ইন্দোনেশিয়ার গাড়ির সঙ্গে জাপানের, জাপানের মিৎসুবিশির সঙ্গে মাজদার, মাজদার সঙ্গে বিএমডব্লিউর, বাড্ডা ফ্ল্যাটের সঙ্গে বনানীর, ১২০০ স্কয়ার ফিটের সঙ্গে ৩২০০ স্কয়ার ফিটের, ৭০ হাজার বেতনের সঙ্গে পৌনে তিন লাখের—তামাম ভোগ্যপণ্য আর দশার মধ্যেই তুলনামূলকতা চলতে থাকে। শ্রেণীর অনুধাবন তাই পিছলা পারদের মতো ইদিক-উদিক ছিটকে চলে যায়।

এর সঙ্গে নয়া ভোগ্যপণ্যের চরিত্রের বিষয়টাও আছে যেখানে ধরুন আপনি দেড়লাখের স্মার্টফোনের ফিচারের “কাছাকাছি” এগারো হাজারী কোনো একটা স্মার্টফোন কিনতে পেলেন। তবে এই আলাপ আমরা বরং আরেক দিন করি।

আদাবর, ২৪ আগস্ট ২০২০