বর্তমানের বিবেচনায় ভবিষ্যৎ অনুমানের সমস্যা—সাইকোলজিস্ট ড্যানিয়েল গিলবার্টের সাক্ষাৎকার

ভবিষ্যতের কোনো ঘটনায়  আপনি কীরকম অনুভব করবেন তা এখনই বোঝার চেষ্টাকে সাইকোলজিস্টরা বলেন ‘এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং ‘বা ‘অনুভূতিমূলক পূর্বাভাস’। তারা মনে করেন, আমরা এই কাজ খুব একটা ভাল পারি না।  ‘বর্তমান’ এর ফিল্টার দিয়ে ‘ভবিষ্যৎ’ দেখতে সমস্যা হয় আমাদের। ফলে  কী আমাদের ভবিষ্যতে সুখের যোগান দিতে পারবে, সে হিসাবে প্রায়ই গড়বড় হয়ে যায়।

এ বিষয়ক গবেষণা ও আবিষ্কার নিয়ে ২০০৬ সালে নিউ ইয়র্কের আলফ্রেড এ. কা’নফ প্রকাশনী থেকে বের হয় আমেরিকান সোশ্যাল সাইকোলজিস্ট ড্যানিয়েল গিলবার্টের বই  স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’। 

১৯৯৬ সাল থেকে আমেরিকার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টে প্রফেসর হিসাবে কাজ করছেন গিলবার্ট। আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস প্রদেশের ক্যামব্রিজ শহরে থাকেন তিনি।

নিচে থাকছে পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউজ ওয়েবসাইটের প্রশ্নোত্তর সেকশনে  প্রকাশিত ‘স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’ বই সম্পর্কিত সাক্ষাৎকারের বাংলা অনুবাদ।

সাইকোলজিস্ট ড্যানিয়েল গিলবার্টের সাক্ষাৎকার

অনুবাদ : আয়মান আসিব স্বাধীন

আপনার কাছে ‘অনুভূতিমূলক পূর্বাভাস’ (এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং) এর সংজ্ঞা কী? বেশ কিছু জায়গায় আপনি বলেছেন, আপনি নাকি সুখ নিয়ে গবেষণা করেন—এ দুইটা বিষয় ঠিক কীভাবে যুক্ত?

মানুষজন যখন এমন আন্দাজ করার চেষ্টা করে, ভবিষ্যতে ঠিক কোন জিনিসগুলি তাদেরকে সুখী করে তুলতে পারবে, তখন তাদের হিসাবে ভুল হয়। এ প্রক্রিয়াকেই টিম উইলসন এবং আমি ‘এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং’ বলেছি। “আমার মনে হয় আমি ভ্যানিলার চাইতে বরং চকলেট বেশি প্রেফার করব” অথবা “ব্যাঞ্জোবাদক হওয়ার চাইতে আইনজীবী হওয়ার ইচ্ছা বেশি আমার”—যিনি জীবনে কখনো এমন কিছু বলেছেন, তিনি আসলে ‘এফেক্টিভ ফোরকাস্ট’ই করেছেন। এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং করার পর তাদেরকে কখনো কখনো কষ্ট করে বুঝে নিতে হয় যে তাদের ভুল হয়েছিল। ‘স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’ বইয়ে এটাই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে যে কেন এবং কীভাবে আমাদের মস্তিষ্কের কাঠামো এধরনের ভুল করার জন্যই গঠিত, আর এক্ষেত্রে কী কী করার আছে আমাদের।

এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন কীভাবে? এ বিষয়ে কোন জিনিসটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী করে?

দশ বা পনেরো বছর আগে যখন আমার ডিভোর্সের কাজ চলছিল, তখন হুট করেই আমার গুরু মারা গেলেন। আমার টিনএজ ছেলেটাও ভাল সমস্যায় পড়েছে তখন, আর আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে সম্পর্কও বেশ খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু আমার অবস্থা… খুব একটা খারাপ ছিল না আসলে। এসব ঘটনার এক বছর আগে যদি আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন, এর মধ্য থেকে যেকোনো একটা ঘটনার মুখোমুখি হলেও আমার কী হাল হবে, আমি হয়ত বলতাম খুবই লম্বা সময়ের জন্য একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ব আমি। তেমনটা কিন্তু হয় নাই। আমি অবশ্যই খুব উচ্ছ্বসিত ছিলাম না, তবে যতটা বিচলিত হয়ে পড়ব বলে মনে করতাম তার ধারেকাছেও কিছু হয় নি। আর তখনই আমি চিন্তা করা শুরু করলাম যে, এ ধরনের দুর্ঘটনার আবেগজাত ফলাফল নিয়ে আমার আগের ধারণায় যে ভুল হত, তা কি কেবল আমারই হয় নাকি অন্যরাও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। এরপর আমি আর মনোবিদ টিম উইলসন একসাথে কাজ করা শুরু করি।

বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা করলাম দু’জনে মিলে। যা জানতে পারলাম তা রীতিমত হতবুদ্ধি করে দিল আমাদের। ভবিষ্যতের ঘটনাবলির প্রতি তাদের আবেগী অবস্থান কী রকম হবে, সে সম্বন্ধে নিয়মিতই মানুষ নাটকীয় সব ভুল ধারণা করে থাকে। এসব ফলাফল থেকে একটা নির্দিষ্ট ধারার অনুসন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়ি আমি, যা এখনো শেষ হয় নাই। আর ‘স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’ হল এ ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত যা জানতে পেরেছি তার রিপোর্ট। আমি যে প্রশ্নটা নিজের কাছে করেছিলাম, তার উত্তর খুঁজে পেতে আমার পনেরো বছর লেগেছে। সামনে যে লোকটা এই প্রশ্ন করবেন, তিনি যেন একটু তাড়াতাড়ি এর উত্তর খুঁজে পান সেজন্যেই বইটা লিখেছি আমি।

এই ফিল্ডে আপনার গবেষণা দিয়ে ঠিক কী ধরনের অর্জন আশা করছেন আপনি? আপনি কি মনে করেন এ বিষয়ে উত্তরোত্তর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগুলি মানুষের ওপর কীরকম প্রভাব রাখবে তা নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা যাবে?

আমি বরং বলব যে, আমরা এফেক্টিভ ফোরকাস্টিংয়ের ভুলগুলিকে বোঝার চেষ্টা করছি। যাতে এসব ভ্রান্তি দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় খুঁজে বের করা সম্ভব হয়। কিন্তু সমস্যা হল ফোরকাস্টিং বা পূর্বাভাসজনিত ভ্রান্তি ঠিক কোনো ‘অসুস্থতা’ না যার ‘নিরাময়’ খুঁজে বের করতে হবে। অনেকে মনে করেন, আন্দাজে এসব ভুল হওয়া হয়ত আমাদের জীবনে দরকারি ভূমিকা রাখে। সবকিছু ঠিকঠাক মত হলে আমাদের কতটা ভাল লাগবে অথবা বিপদের সময় আমরা কতটা খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাব—তার মাত্রা যদি আমরা বাস্তবের চাইতে বেশি ধরে রাখি, তাহলে দুর্ঘটনা এড়িয়ে সবকিছু ঠিকমত করার জন্য আরো বেশি জোর দিব আমরা।

উদ্বেগ ও ভয় খুবই প্রয়োজনীয় দু’টি অনুভূতি, যা আমাদেরকে গরম চুলায় হাত দেওয়া, পরকীয়া করা বা আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে খোলা রাস্তায় খেলতে দেওয়া থেকে বিরত রাখে। সন্তানসন্ততি ও টাকা-পয়সা যে শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে প্রচন্ড রকমের খুশি করতে পারে না কিংবা ডিভোর্স আর রোগবালাই যে আমাদেরকে দুঃখের চোটে একেবারে বেপরোয়া করে তোলে না, সে খবর আগে থেকেই পেয়ে গেলে কী আমাদের জন্য ভাল হবে? হতে পারে… আবার নাও হতে পারে।

তবে আমার দৃঢ় ধারণা, সবকিছু বিবেচনা করে দেখলে, ভবিষ্যতের কোনো বিব্রতকর ও পীড়াদায়ক পরিস্থিতি আর ট্র‍্যাজেডি আমাদের আবেগে কীরকম প্রভাব ফেলবে তা আগে থেকে সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হলে আমাদের উপকারই হবে বেশি। ধরেন, আপনি পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন; আকাশে প্রচন্ড বিদ্যুৎ চমক আর ঝড় হচ্ছে চারিদিকে। এখন আপনার যাত্রী জানতে চাইলেন, এ অবস্থায় গাড়ির ওয়াইপার ঘোরানো বন্ধ করে দিলে কোনো লাভ হবে কিনা। এটা কিন্তু ঠিক, ওয়াইপার বন্ধ করলে কিছু সুবিধা অবশ্যই পাওয়া যাবে। যেমন, ওয়াইপারের বিরক্তিকর ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটা তো অন্তত আর হবে না। তবে এটাও জোর গলায় বলা যায় যে, ওয়াইপার বন্ধ করায় সুবিধার চাইতে বরং ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ গাড়ি চালানোর সময় আপনি ঠিক কোথায় যাচ্ছেন সেটা দেখে নেওয়া সাধারণত ভাল একটা আইডিয়া—আর ওয়াইপার চালু থাকার এ সুবিধাটা তো আমাদের কাছে খুবই পরিষ্কার।

যাই হোক, গাড়ি চালানোর মত করে আমরা সবাই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। তাই আমার মাথায়ও একই যুক্তি কাজ করে। এফেক্টিভ ফোরকাস্টিংয়ের যদি কোনো গুপ্ত সুবিধা থেকেও থাকে, তার সাথে সংশ্লিষ্ট সব ঝুঁকির পরিমাণ সেসব সুবিধাকে সহজেই বাতিল করে দিবে।

আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, আমার গবেষণাকাজ দিয়ে ঠিক কী অর্জন করার আশা করছি আমি। এর একটা বাস্তবিক পরিণতির কথা তো বললামই। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, ভিতরে ভিতরে আমি এমন একজন লোক যে কিনা হিউম্যান নেচার নিয়ে অনেক বেশি কৌতূহলী। আমার রিসার্চ থেকে আমি আসলে আরো গভীরভাবে বুঝতে চাই, আমরা কারা এবং আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী। এই গবেষণা থেকে যদি ব্যবহারিক কোনো সুফল পাওয়া যায়, আমি খুশি। না পাওয়া গেলেও বিন্দুমাত্র দুঃশ্চিন্তা নাই আমার। আচ্ছা, ইউনিভার্স কীভাবে শুরু হয়েছিল তা জানতে পারা বা কোনো শূককীটের বিবর্তন বুঝতে পারার প্রায়োগিক উপকারিতা কী? আমার মনে হয় আমাদের একটা ভুল ধারণা আছে যে, কোনো জ্ঞান কতটুকু মূল্যবান তা নির্ভর করে আমাদের জীবনে তাৎক্ষণিক কোনো বাস্তবিক উন্নয়ন ঘটাতে সেই জ্ঞান কতটা কাজে আসছে তার উপর। অথচ জ্ঞানই হল চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, উদ্দেশ্য হাসিলের পন্থা না।

এই গবেষণা ক্ষেত্র আগামী দশ বছরে কোথায় পৌঁছাতে পারে বলে ভাবছেন আপনি? এমন সাম্প্রতিক বা নতুন কোনো আবিষ্কার আছে কি যা আমাদের সাথে শেয়ার করতে চান?

বিজ্ঞানের মজার ব্যাপার হল, কেউ জানে না সামনে তা কোথায় নিয়ে যাবে আমাদেরকে। বিজ্ঞান হল এমন এক ববস্লেজ গাড়ি যার স্টিয়ারিংয়ে কেউ বসে নেই। আমরা যদি বলতেই পারতাম যে আগামী দশকে আমরা কী আবিষ্কার করতে পারব, তাহলে অলরেডি তা আবিষ্কার করে ফেলতাম আমরা। তবে শুধু একটা ব্যাপার আমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি যে, আপনি বা আমি কেউই এই গবেষণাক্ষেত্রের গতিবিধির ব্যাপারে আপনার প্রশ্নের জবাব একদম সঠিকভাবে দিতে পারব না। বিজ্ঞানের গল্প সবসময় অতীতের দিকে তাকিয়েই বলা হয়।

তবে সাম্প্রতিক আবিষ্কারের কথা বললে… খুবই প্রতিভাবান একজন সহকর্মী আছেন আমার (ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়া’র টিমোথি উইলসন)। আমাদের দু’জনেরই ল্যাবরেটরি ভর্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রছাত্রী আছেন। তার মানে প্রতি মাসেই আমরা এমন নতুন কিছু আবিষ্কার করি যা দেখে খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে যাই আমরা (অবশ্য যতটা উচ্ছ্বাস কাজ করবে বলে ভেবে রাখি, ততটা না হলেও প্রত্যাশিত পরিমাণের খুব কাছাকাছি যায়)। উদাহরণ হিসাবে কয়েকদিন আগে করা আমাদের একটা গবেষণার কথা বলা যায়।

সেখান থেকে জানা গেল যে, অতীতে ঘটে যাওয়া প্রায় যেকোনো কিছুর চাইতে বরং ভবিষ্যতে ঘটতে যাওয়া ঘটনাকেই বেশি দাম দেয় মানুষ। ধরেন, দুর্ঘটনায় আক্রান্ত একজন মহিলা ৬ মাস ধরে যন্ত্রণা ও কষ্টের মাঝে ছিলেন। এরকম কারো চাইতে বরং যে ভিক্টিম ‘আগামী’ ৬ মাস কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাবেন— তাকেই কিন্তু বেশি পরিমাণে ইন্স্যুরেন্সের টাকা দেওয়ার রায় দিবেন জুরিবোর্ডের সদস্যরা। একইভাবে, ধরেন আপনি কোনো বন্ধুর ভ্যাকেশন হোমে ছুটি কাটানোর জন্য তাকে এক বোতল ওয়াইন গিফট করতে চান। গিফটটা ছুটি কাটানোর আগেও দিতে পারেন, পরেও দিতে পারেন। কিন্তু তার ভ্যাকেশন হোমে ছুটি কাটানোর আগে যে ওয়াইন দিবেন, ছুটি কাটানোর পরে দেওয়া ওয়াইনের তুলনায় সেটার দাম হবে বেশি। আবার, করা হয়ে গেছে এমন কাজের চাইতে ভবিষ্যতে যে কাজ করতে হবে তার জন্য বেশি পারিশ্রমিক চায় মানুষ। এরকম আরো উদাহরণ আছে। এটা বেশ শক্তিশালী ও অস্বাভাবিক এক ধরনের ‘টেম্পোরাল অ্যাসিমেট্রি’। এরকম হবার কারণ কী তা এখনো কেউ ঠিকমত বুঝে উঠতে পারেন নি। তবে এ ব্যাপারে আমাদের বেশকিছু হাইপোথিসিস আছে। সেগুলি ঘেঁটে দেখছি আমরা। চোখ-কান খোলা রেখে তাই অপেক্ষা করতে থাকেন।

আপনাদের গবেষণাপত্রের ধরণ শুধু বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভরযোগ্যই না, একরকম মজাও পাওয়া যায় সেগুলি থেকে—বেশ ভাল এক সেন্স অফ হিউমার নিয়ে বিষয়গুলি অ্যাপ্রোচ করা হয়েছে। আপনাদের এসব পরীক্ষার ডিজাইন তৈরি করেন কীভাবে? ‘গিলবার্ট পদ্ধতি’ বা এ জাতীয় বিশেষ কোনো তরিকা আছে নাকি এর জন্য?

বিজ্ঞান আপনাকে এক মুহূর্তের ভাললাগা বা আবিষ্কারের আনন্দ দেওয়ার আগে কয়েক হাজার ঘন্টা খাটিয়ে নেয়। কাজেই কোনো আইডিয়া নিয়ে গবেষণা করার আগে তাকে মন দিয়ে ভালবাসতে হবে। কোনো জিনিসের কথা শুধু চিন্তা করলেই যদি একটা তৃপ্তির সুড়সুড়ি না পাই, দমবন্ধ না লাগে আমার—তাহলে ওই বিষয়ে কোনো গবেষণা করি না আমি। এটাই আমার গবেষণার পদ্ধতিগত প্রথম নিয়ম। যখন এমন কিছু খুঁজে পাই যা নিয়ে আমার সত্যিই গবেষণা করার আগ্রহ আছে, তখন মাথা খাটিয়ে এক ইন্টারেস্টিং পরীক্ষার আয়োজন করি আমি, যেখানে একই সাথে বিশ্লেষণী কঠোরতা ও বুদ্ধিদীপ্ত রেটোরিক আছে। এর জন্য অবশ্য পদ্ধতিগত দ্বিতীয় নিয়মটি অনুসরণ করতে হয় আমার। আর তা হল টিম উইলসনকে খবর দেওয়া।

আচ্ছা, এবার তাহলে ট্রিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেনটা করেই ফেলি : ঠিক কী করলে সুখ খুঁজে পাব আমি?

এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আশা দেখিয়ে প্রায় দুই হাজার বছর ধরে বই লিখে আসছে মানুষ। তাতে শুধু অসুখী লোকজন এবং মরা গাছের সংখ্যা বাড়া ছাড়া আর কিছু হয় নাই। আমার বইটা একদিক থেকে আলাদা কারণ এখানে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টাও করা হয় নি। ‘স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’ কোনো নির্দেশনামূলক লেখা না যেখানে “সুখী হবার চারটি সহজ ও একটি কঠিন উপায়” বর্ণনা করা আছে। সেলফ-হেল্প ঘরানার বই না এটা। এ বই পড়লে যে আপনি আরো সুন্দর চুলের স্টাইলসহ নতুন কোনো দালাই লামা হয়ে যাবেন তা না। বরং আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিতে মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক কীভাবে ও কতটা সফলতার সাথে তার ভবিষ্যত সম্ভাবনাগুলির কথা চিন্তা করতে পারে তা নিয়ে আমার বই কিছু বলার চেষ্টা করেছে। একই সাথে, এসব সম্ভাবনা থেকে কোনগুলি তাকে সবচেয়ে সুখী করতে পারবে তা সঠিকভাবে অনুমান করার প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।

বইটার মূল উদ্দেশ্য হল আমাদের দুর্বলতা দেখানো, ভবিষ্যতে কোন জিনিসটা আমাদেরকে সুখী করতে পারবে তা অনুমান করায় আমরা কতটা অদক্ষ সেটা বোঝানো।… আধুনিক মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা হিসাব করার ক্ষমতাকে চিরাচরিত বলে ধরে নিয়েছে। অথচ এই ক্ষমতা কিন্তু আমাদের প্রজাতি একেবারে সম্প্রতি পেয়েছে, মাত্র তিন মিলিয়ন বছরের মত হল। কাজেই আমাদের ব্রেইনের যে অংশ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তা প্রকৃতির একদম নতুন উদ্ভাবনগুলির মাঝে একটা। এত নতুন একটা ক্ষমতা ব্যবহার করে ভবিষ্যত গণনা করতে গেলে কিছু আনাড়ি ভুল হওয়াটা তো স্বাভাবিক। তবে এসব ভুলের তিনটা প্রাথমিক ধরন আছে। আর এ বইয়ে সেগুলি নিয়েই কথা বলা হয়েছে। বইটা শেষ হয় সুখের উৎস সম্বন্ধে পূর্বাভাস পাওয়ার একটা বিকল্প পদ্ধতি দিয়ে। কিন্তু আয়রনি হল, গবেষণা থেকে জানা গেছে, এই বিকল্প পন্থা অনেক বেশি নিখুঁত পূর্বাভাস দিলেও বেশিরভাগ মানুষ পদ্ধতিটা ব্যবহার করতে চান না।

যমজদের উদাহরণ দিয়ে আপনি দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে সুখের অভিজ্ঞতা একেবারে ভিন্ন ভিন্ন—কিন্তু আবার গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, সুখের ব্যাপারে সব মানুষের ভ্রান্তধারণাগুলি একই। ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত এক প্যারাডক্স মনে হয় না?

বইয়ে যেমনটা বলেছি, সুখের সংজ্ঞা দেওয়া বা সুখ পরিমাপ করা বেশ দুরূহ ব্যাপার। এই কাজ করতে গেলে যেসব সমস্যা, বিপদ-আপদ আর প্যারাডক্সের মুখোমুখি হতে হবে সেগুলি নিয়ে পাঠকদেরকে ধারণা দেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু সমস্যা তো রীতিমত মাথা খারাপ করে দেওয়ার মত। ওগুলি সহজে ব্যাখ্যা করার জন্য সায়েন্স ফিকশন গল্প থেকে শুরু করে তাসের যাদু দিয়েও বোঝানোর চেষ্টা করেছি আমি। শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্তে এসেছি যে, একদম নির্ভুলভাবে সুখ সংজ্ঞায়িত করা বা মাপা সম্ভব না হলেও অতটুকু অন্তত করা যায় যার সাহায্যে আপনি বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতে পারবেন। ফলে অনেক কিছু জানার সুযোগ পাচ্ছেন আপনি। সবাই যে খালি বলে, অনুভূতি পরিমাপ করা সম্ভব না, এ ধারণা একদমই ভুল। আপনি যখন আপনার সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করেন, “আমি এই কাজটা করলে তোমার কেমন লাগে?” তখনই তো আপনি আসলে তার অনুভূতির মাত্রা বোঝার চেষ্টা করছেন। বিজ্ঞানীরা অবশ্য আরো সূক্ষ্ম ও জটিল প্রক্রিয়ায় এই কাজ করেন। কিন্তু মূলভাব একই। মানুষ সাধারণত জানে কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে সে কতটা সুখে আছে, কেউ জিজ্ঞেস করলে তাই সহজে বলে দিতে পারে সে। আপনি যদি তার উত্তর পরিমাপ করতে পারেন, তাহলে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সুখ নিয়ে অনুসন্ধানও করতে পারবেন (আমরা এই দু’ধরনের কাজই করে থাকি)।

আজকালকার বেশিরভাগ লোকের মত আমিও হতাশাবাদী। আমি মনে করি, একটা পরিস্থিতিতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকলে তা ঘটবেই। এই যে এত এত মানুষ এভাবে দীর্ঘকালীন উদ্বেগে ভুগেন, তাদেরকে নিয়ে আপনার বই কী বলে?

আমরা হয়ত এমন মনে করি যে জীবনের প্রতি মুহূর্তে পারফেক্টলি সুখী থাকতে পারলে সবচেয়ে ভাল হত। কিন্তু যেসব প্রাণি কোনো যন্ত্রণা, উদ্বেগ, ভীতি বা কষ্ট অনুভব করে না, তাদের একটা আলাদা নাম আছে— বিলুপ্ত। নেগেটিভ চিন্তা ও অনুভূতি আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ মানুষ যখন চিন্তা করে দেখে কোনো জিনিস কতটা তীব্রভাবে তাদের বিপক্ষে যেতে পারে, তখন তারা এমন সব কাজ করার চেষ্টা করে যাতে জিনিসটা তীব্রভাবে তাদের পক্ষে যায়।

আমাদের ছেলেমেয়ে কিংবা কর্মচারীদেরকে আমরা কোনো নির্দিষ্ট কাজের জন্য শোচনীয় ফল ভোগ করার ভয় দেখিয়ে যেমন সতর্ক করে দেই, তেমনি শোচনীয় পরিণতির কথা কল্পনা করে নিজেদেরকেও নিয়ন্ত্রণ করি আমরা। হ্যাঁ, মাঝে মাঝে উদ্বেগ বেশি হয়ে গেলে মানুষকে তা দুর্বল করে দিতে পারে। সেটা একেবারে এক্সট্রিম কেস। কিন্তু বেশিরভাগ লোকের জন্যই উদ্বেগ অনেক কাজে আসে।… কেউ যদি আপনাকে এরকম কোনো ওষুধ দেয় যেটা খাওয়ার পর আপনি সারাজীবনের জন্য সুখী থাকতে পারবেন, তাহলে আপনার প্রতি আমার পরামর্শ হবে সাথে সাথে দৌঁড় দিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যাওয়া। আবেগ একটা কম্পাস, যা আমাদেরকে বলে দেয় কখন কী করতে হবে। কিন্তু যে কম্পাসের কাঁটা শুধু উত্তর দিকে মুখ করে থাকে, সেই কম্পাসের কোনো দাম নাই।

এমন কী কী জিনিস আছে যেগুলি আমাদেরকে সুখী করতে পারবে বলে আমরা মনে করি, কিন্তু আসলে তা হয় না? কেন আমাদের এখনো মনে হয় যে এই জিনিসগুলিই আমাদের সুখী হবার মূলে?

সমাজের সদস্য যারা, তাদেরকে সুখের উৎসের ব্যাপারে ভুল ধারণা দেওয়ার পেছনে সমাজের একটা কায়েমি স্বার্থ আছে। আমার বইয়ে যেসব আইডিয়া নিয়ে কিছু দূর পর্যন্ত আলোচনা করা হয়েছে তার মধ্যে এটা একটা। চলমান ও সক্রিয় থাকার জন্য সমাজের অনেক কিছু নিশ্চিত করা লাগে। যেমন: মানুষদেরকে একে অন্যের পণ্য ও সেবা কিনতে হয়, বাচ্চা জন্ম দিয়ে তাদেরকে লালনপালন করতে হয়; এরকম আরো অনেক কিছু। আমরা নিশ্চয়ই এসব কাজ সমাজের ভালর জন্য করব না, কারণ মানুষের বৈশিষ্ট্য হল শুধু নিজের ভালর জন্যই কাজ করতে আগ্রহী হওয়া। এজন্য একেকটা সমাজ দরকারি কিছু মিথ তৈরি করে— “টাকা-পয়সা আপনাকে সুখ এনে দিবে” বা “আপনার সন্তানসন্ততি আপনাকে সুখী করে তুলবে”। এসব মিথ সমাজের সদস্যদেরকে সেই কাজগুলি করতে প্রণোদিত করে যেগুলি আদতে সমাজের জন্য প্রয়োজনীয়। গবেষণার ফলাফল বলছে, এ দুইটার একটাও মানুষকে বিশেষ সুখী করতে পারে না। সুখের ওপর টাকা-পয়সার প্রভাব নিতান্তই গৌণ; এ প্রভাব সহজেই ফুরিয়ে যায়। আর বাবা-মা’রাও সাধারণত বাচ্চাদের সাথে সময় কাটানোর চাইতে টিভি দেখতে বা ঘরের কাজ করতেই পছন্দ করেন বেশি (সরি, বাচ্চারা, কিন্তু তথ্য-উপাত্ত সেরকমই বলে!)।

যাই হোক, এটা আপনার প্রশ্নের একটা উত্তর। তবে এর আরো উত্তর আছে। বইয়ে একটা গবেষণার কথা বলেছি যেখান থেকে জানা যায়, অতীতে একজন মানুষ কতটা সুখী ছিল সেই স্মৃতি প্রায়ই সে গুলিয়ে ফেলে। যেমন ডেমোক্র‍্যাটরা একবার এরকম মনে করলেন যে, বুশ  ইলেকশন জিতলে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়বেন তারা। কিন্তু বুশ জেতার পর তার ধারেকাছেও কিছু হয় নাই তাদের (আমি জানি, কারণ আমি নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি তারা মানসিকভাবে কতটা বিধ্বস্ত হয়েছিলেন)। অথচ এর কয়েক মাস পর তারা আবার মনে করা শুরু করলেন, তাদের আন্দাজ ঠিকই ছিল—নিজেদের মানসিক দুর্দশার ব্যাপারে তারা যেমনটা ভেবে রেখেছিলেন ঠিক তেমনটাই নাকি হয়েছিল। জানা গেল, মানুষের স্মৃতিজনিত বিভ্রান্তির খুবই সাধারণ প্যাটার্ন এটা। যদি মনেই না থাকে, তাহলে নিজেদের ভুল ভবিষ্যদ্বাণী থেকে আমরা শিক্ষা নিব কীভাবে?

আপনার বইটা পড়ার আগে মনে করতাম, জীবনের প্রধান আকর্ষণ হল বৈচিত্র‍্য। কিন্তু প্রতিবার ডোনাট শপে গিয়ে শুধু গ্লেজড ডোনাট খাওয়াই কি ঠিক হবে? গ্লেজড আমার প্রিয় ডোনাট হলেও— কেবল একই রকম ডোনাট খেতে গিয়ে আরো ভাল কিছু থেকে যদি বঞ্চিত হই?

…যতটুকু উচিত তার চাইতে বেশিই বৈচিত্র‍্য খুঁজতে যায় মানুষ— গবেষণা তাই বলছে। আমাদের মনে হতে পারে, প্রতিবার ডোনাট শপে গিয়ে হয়ত আলাদা আলাদা টাইপের ডোনাট খেয়ে দেখা উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হল, ডোনাট শপে গিয়ে বারবার নিজের পছন্দের ডোনাট খেতে পারলেই বরং মানুষ সুখী থাকে বেশি, যদি প্রতিবার যাওয়ার মাঝে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিরতি থাকে। এই বিরতির সময়টা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। খুব কম সময়ের মধ্যে চারটা ডোনাট খাওয়া হলে একেকবার একেকরকম ডোনাট নিলেই আপনার ভাল লাগবে বেশি। এক্ষেত্রে বৈচিত্র‍্য আসলেই আপনার অভিজ্ঞতাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। কিন্তু আবার চার দিনে চারটা ডোনাট খাওয়ার বেলায় বৈচিত্র‍্য আপনার উপভোগের মাত্রা কমিয়ে আনবে। সময়কালের ব্যাপারে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করা মানুষের ব্রেইনের জন্য প্রচণ্ড সমস্যাজনক। তাই কয়েক মাস বা কয়েক মিনিট—বিরতি যতটুকুই হোক, ডোনাট খেতে গিয়ে আমরা অযথাই ভ্যারাইটি খুঁজি।

আপনার বইয়ে এত শেকসপিয়ারের উদ্ধৃতি কেন? আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন যে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করার চাইতে বরং শিল্প থেকেই আমরা নিজেদের সম্বন্ধে আরো বেশি জানতে পারব?

আমি প্রতি অধ্যায় একটা করে শেকসপিয়ারের উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করেছি। এর কারণ দুইটা। প্রথমত, ইতিহাসজুড়ে এমন অনেক চমৎকার অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন যারা আমাদের চিন্তাভঙ্গি সম্পর্কে তুখোড় সব অনুমান করে গেছেন। আধুনিক বিজ্ঞান আমাদেরকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে যাতে আমরা বাছাই করতে পারি, সেই অনুমানগুলির মাঝে কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল ছিল। সঠিক অনুমানের ক্ষেত্রে শেকসপিয়ারের রেকর্ড ভাল। তাই তার হাতেই প্রতি চ্যাপ্টার শুরু করার দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলাম। আর দ্বিতীয় কারণ হল, আমি খুবই সাধারণ রুচির মানুষ, যে কিনা সনেট পড়ার চাইতে অ্যাকশন মুভি দেখতে বা প্যাটের চাইতে টেটার টটস খেতেই বেশি পছন্দ করে। কিন্তু আমাকে প্রতিদিন একজন হার্ভার্ড প্রফেসরের ভান করে থাকতে হয়। আমার শুধু খুঁতখুঁত লাগে আর ভাবি, এই ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য আমাকে হয়ত একজন সুশীল নাক-উঁচা ব্যক্তি সাজতে হবে, যিনি ক্রাস্ট ছাড়া মিনি স্যান্ডউইচ খেতে খেতে শেকসপিয়ার পড়েন। কিন্তু আমি তো আসলে এরকম না। তবে আপনি যদি এই তথ্য ফাঁস না করেন, তাহলে ওইসব উদ্ধৃতি দিয়ে সবাইকে বোকা বানানো যাবে।

এখন কি তাহলে চারিদিকের বহু সম্ভাবনার কারণে আমাদের জীবন এতটাই জটিল হয়ে গেছে যে আমরা আদিম এক অজ্ঞতা হারিয়ে ফেলেছি, যে অজ্ঞতার কারণে অনেক জিনিস আমাদের অজানাই থাকত, ফলে সুখে থাকতে পারতাম আমরা? তাহলে কি কিছু জিনিস শেষ পর্যন্ত না জানলেই বরং সুখী থাকা যাবে? তাই যদি হয়, তাহলে গভীর বনের কোনো কুঠুরিতে গিয়ে বসবাস শুরু করলে লাভ হবে কি?

না, না, না। প্রতিটা প্রজন্ম এই ভ্রমের মধ্যে থাকে যে অতীতে হয়ত সবকিছু সহজ, সরল আর অনেক ভাল ছিল। পুরাদমে ভুল ধারণা। ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানেই আমরা সবচাইতে ভাল আছি। আমরা যে একে অন্যের মাথায় লাঠি দিয়ে ঠুকাঠুকি করি, তা আমাদের আদিম অজ্ঞতার কারণেই। এই অজ্ঞতা আমাদেরকে মোনালিসা আঁকতে বা স্পেস শাটল বানাতে কোনো সাহায্য করে না। আমাদের সুবিশাল ও উন্নত এক মস্তিষ্ক আছে যা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখতে পায়। অন্য কোনো প্রাণি তা পারে না। এমনকি আমাদের প্রজাতিও মাত্র কয়েক মিলিয়ন বছর আগ পর্যন্ত তা পারত না। হ্যাঁ, আমাদের ভবিষ্যতের দৃষ্টি তেমন স্পষ্ট না, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে হয়ত একেবারে অন্ধকার। তবে এই দূরদৃষ্টি আমাদের যেকোনো সিদ্ধান্তের দীর্ঘকালীন পরিণতি সম্বন্ধে আভাস দিতে পারে। ফলে আমরা প্রয়োজনমাফিক ব্যবস্থা নিয়ে খারাপ ফলাফল এড়িয়ে ভাল গন্তব্যগুলিকে তুলে ধরতে পারি।“যে আদিম অজ্ঞতার কারণে আমরা সুখে থাকতে পারতাম” সেই অজ্ঞতাই স্থূল স্বাস্থ্য আর গ্লোবাল ওয়ার্মিং বাড়ার কারণ। মাইলস ডেভিসের মত প্রতিভা বা ম্যাগনা কার্টার মত চুক্তি এই অজ্ঞতা থেকে আসত না কখনো। আগামী কয়েক হাজার বছরে মানবজাতি যদি উন্নয়নে ফুলেফেঁপে উঠে, তাহলে তা যুক্তি ও জ্ঞান অর্জন দিয়েই সম্ভব হবে। যে জগত কখনো ছিলই না সে জগতে ফিরে যাওয়ার ফ্যান্টাসিতে বুঁদ হয়ে থাকলে তা আর কখনো হবে না।

বিল গেটস ও ওয়ারেন বাফেটের সঙ্গে আলাপ

আমেরিকার কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি বিজনেস স্কুল এ বছর (২০১৭) জানুয়ারির ২৭ তারিখে বিজনেস ম্যাগনেট বিল গেটস এবং ওয়ারেন বাফেটের সঙ্গে একটা প্রশ্নোত্তর ইভেন্টের আয়োজন করে। সাংবাদিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব চার্লি রোজ ছিলেন আয়োজনের সঞ্চালক। নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরাসরি প্রশ্ন করেন দুই অতিথিকে। একই প্রশ্নের উত্তরে দু’জন নিজ নিজ অবস্থান থেকে কথা বলেন। কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর শুধু একজনই দিয়েছেন। 

গেটস ও বাফেট তাদের ২৫ বছরের বন্ধুত্ব, ব্যবসা, দানশীলতা, বিশ্বস্বাস্থ্য, উদ্ভাবন ও নেতৃত্ব ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন।

অনুবাদ: আয়মান আসিব স্বাধীন

বন্ধুত্ব, ব্যর্থতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি কথোপকথন

প্রশ্ন: একজন আরেকজনের ব্যাপারে কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি অবাক করে আপনাদের?

ওয়ারেন বাফেট

ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন। আমাদের দুইজনের যে অনেক ব্যাপারেই মিল আছে—শুরুতে এটা বুঝতে পারার পর বেশ অবাক হয়েছিলাম। বিল অবশ্য একটা কম্পিউটার বিক্রি করার চেষ্টা করেছিলেন আমার কাছে। ওই একবারই হয়ত তিনি কোনো জিনিস বিক্রি করতে পারেন নাই। যদিও কম্পিউটার আমার জীবনকে আপাদমস্তক পালটে দেয়। কিন্তু বিলের কৌতূহলে বিন্দুমাত্র কমতি আসত না।

বিল গেটস

আমার খুবই আশ্চর্য লাগত যে, একজন ইনভেস্টর হিসাবে পৃথিবী সম্পর্কে এতটা ব্যাপক ধারণা রাখেন ওয়ারেন। তিনি শুরুতেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হেই, আইবিএম এত বড় একটা কোম্পানি! মাইক্রোসফট তো কোম্পানি হিসাবে অনেক ছোট; তাহলে আপনারা বেশি ভাল করবেন কী হিসাবে? আইবিএম-ই বা আপনাদেরকে সফটওয়্যারের এই খেলায় হারাতে পারবে না কেন?” আমি কিন্তু প্রতিদিনই চিন্তা করতাম, আমাদের কী কী বাড়তি সুযোগ-সুবিধা আছে? সেগুলি দিয়ে কী করা উচিৎ আমাদের? অথচ কেউ আমাকে এই প্রশ্নটা আগে জিজ্ঞেস করে নাই।

তারপর আমরা সফটওয়্যারের অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলাপ করলাম। এই অর্থনীতির জায়গাটা খুবই ভিন্নধর্মী ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার—ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এসবের সাথে তিনি নিজেকে মেলাতে পারতেন। আর আমি ব্যাংকিং বুঝতে পারতাম না। কীভাবে একজন আরেকজনের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যায় তা মাথায় ঢুকত না। তিনি খুব পরিষ্কারভাবে সেসব বোঝাতে পারতেন। ফলে আমি এমন একজনকে খুঁজে পেলাম যার চিন্তাভাবনার অবকাঠামো এতটা সমৃদ্ধ যে—যেসব জিনিস আমি জানার জন্য মুখিয়ে থাকতাম—সেগুলি তিনি সহজেই বুঝিয়ে দিতে পারতেন আমাকে। আবার যে জিনিসগুলি আমাদের কাছে নতুন লাগত, সেগুলি নিয়ে হাসাহাসিও করতাম আমরা।

তার বিনয় এবং রসবোধই তাকে এতটা অবিশ্বাস্যভাবে তুলে ধরেছিল আমার কাছে। উনি নিজের কাজ অনেক উপভোগ করেন ও সেই আনন্দ অন্যদের সাথে ভাগাভাগিও করে নেন। আর আমি যখন বোকার মত কোনো প্রশ্ন করি, যে প্রশ্ন হয়ত আগে আরো ৫০ বার তাকে করা হয়েছে, তখনও তিনি সুন্দর করে উত্তর দেন।

প্রশ্ন: বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোন ব্যাপারগুলি নিয়ে আপনারা সবচাইতে চিন্তিত এবং আশাবাদী?

বাফেট

আমেরিকা এগিয়ে যাবে। আপনি যদি এই দেশের গত ২৪০ বছরের ইতিহাস দেখেন তাহলে বুঝতে পারবেন এখানে কত রকমের মিরাকল ঘটেছে। আমি তো বলব যে, বিশ্বের ইতিহাসে সবচাইতে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি সেই শিশু, যে আজকে এই দেশে জন্ম নিচ্ছে। ১৯৪২ সালের এপ্রিলে ১১ বছর বয়সে আমি নিজের প্রথম স্টক কিনেছিলাম। তখন ওটার ডাউ ছিল ১০০। অল্প সময় পরেই তা ২০,০০০ হয়ে গেল। সেই সময়টুকুতে নিশ্চয়ই ভাল কিছু হয়েছিল; আর সামনেও সে রকম আরো অনেক কিছু হবে।

গেটস

আমার আশাবাদ অনেকটা এই কারণে যে, আমেরিকার উদ্ভাবনী শক্তি ভাল এবং গবেষণার কাজে মোটামুটিভাবে দুই দলেরই সমর্থন আছে। আর তাই স্বাস্থ্য খাত বা অন্য যে খাতই হোক, আমি মনে করি প্রত্যেক বছরেই আমরা এইসব ক্ষেত্রে নতুন অনেক সাফল্যের দেখা পাব।

এখন এই প্রশাসন বেশ নতুন হওয়ায় তাদের বাজেটে কী কী জিনিস প্রাধান্য পাবে, তা আমরা ঠিক জানি না। যেমন বিদেশী ত্রাণ আমাদের বাজেটের অনেক ছোট একটা অংশ, প্রতি বছর ৩০ বিলিয়ন ডলারের মত। কিন্তু তার মানে প্রতিবার যখন নতুন নেতৃত্ব আসে, আমাদেরকে লাভের ক্ষেত্রগুলি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে দেখাতে হয় যে—সবকিছু ঠিক জায়গাতেই ব্যয় করা হয়েছে।

আমি মনে করি, এই রকম একটা বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে প্রচুর জোর দিতে হবে আমাদের। এইচআইভি সচেতনতার জন্য প্রেসিডেন্টের ‘পেপফার’ এবং সেই সাথে ‘ম্যালেরিয়া ইনিশিয়েটিভ’ এর মত চমৎকার সব কর্মকাণ্ড ধরে রাখার জন্য এক্সিকিউটিভ ব্র‍াঞ্চ ও কংগ্রেসের বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। এসব কিন্তু প্রেসিডেন্ট বুশের সময়ে শুরু হয়েছিল। কাজেই কর্মক্ষেত্রে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় প্রশাসনের সাথেই ভাল সম্পর্ক আছে আমাদের ফাউন্ডেশনের।

প্রশ্ন: ব্যর্থ হবার ভয় ঠিক কীভাবে কাটিয়ে উঠেছিলেন আপনারা?

গেটস

আমি আসলে সৌভাগ্যবান, কারণ আমি হাই স্কুলে ওঠার সাথে সাথেই ওখানে কম্পিউটার নিয়ে আসা হয়। কম্পিউটারে পুরোপুরি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি আমি। আমার মুগ্ধতার জন্যে ব্যাপারটাকে কখনোই ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয় নাই আমার কাছে। বরং কম্পিউটারের প্রতি আমার পাগলামিকে আমি শখ হিসাবে দেখতে থাকি। ঝুঁকি নেওয়াকে সবসময়ই দারুণ একটা কাজ মনে হয় আমার; বিশেষ করে যুবক বয়সে—বিভিন্ন জিনিস পরখ করে দেখা, তেমন জনপ্রিয় না এমন কাজে শুধু নিজের আগ্রহের জন্য হাত দেওয়া—এ রকম ঝুঁকিই তো নিতে হয়।

বাফেট

ব্যর্থতাকে ভয় পাওয়ার দরকার নাই। আমি হার্ভার্ডে ভর্তি হতে পারি নি, ওরা নেয় নাই আমাকে। আমার জীবনের সবচাইতে সেরা ঘটনা ওইটাই ছিল। অনেক ভাল জিনিসই আমাদের সাথে ঘটে যা শুরুতে ভাল বলে মনে হয় না। ঘাবড়ায় যাওয়ার কিছু নাই।

আর বার বার পেছনে তাকিয়ে কোনো জিনিস নিয়ে আফসোস করবেন না। এগিয়ে যেতে থাকেন, কারণ সামনে এমন অনেক কিছুই পাবেন যাতে ব্যর্থতাগুলির কথা আর মনে থাকবে না। শুধু এগোতে থাকেন আপনি।

প্রশ্ন: যদি নতুন করে সবকিছু শুরু করার সুযোগ দেওয়া হত, তাহলে আপনারা কোন ইন্ডাস্ট্রিতে থাকতেন? এখনকার সময়ে কোথায় নিজেদের ব্যবসা শুরু করতেন আপনারা?

বাফেট

আমি একই কাজই করতাম। কারণ অন্য কিছু করতে গেলে আমার ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বিশ-ত্রিশ বছর বয়স থাকতে অনেক মজা করেছি আমি। এখন আমার বয়স ৮৬ আর আমি এখনো মজাই করে যাচ্ছি। তাই ছাত্রদেরকে সবসময় বলি—আপনার যদি কোনো চাকরির প্রয়োজন না থাকত, তাহলে আপনি যে কাজটা করতেন, সে রকমই একটা চাকরির সন্ধান করেন।

ঘুমের মধ্যে হাঁটার মত করে নির্লিপ্তভাবে জীবন কাটাবেন না। “আমি এইটা করব, ওইটা করব, শুধু বয়স বাড়ার অপেক্ষা করছি”—এ ধরনের কথা বলবেন না একদমই। ব্যাপারটা এমন যেন আপনি বুড়ো বয়সে সেক্স করার আশায় অপেক্ষা করে যাচ্ছেন। নেহাতই পাগলামি। এ রকম চিন্তাভাবনা একদমই ভাল না।

গেটস

আমার হার্ডকোর সায়েন্স খুবই পছন্দের। এই জায়গাটায় অনেক অসাধারণ ক্ষেত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ আছে। আমি এখনো কম্পিউটার সায়েন্সই বেছে নিতাম, কারণ বর্তমান সময়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে অনেক গভীরভাবে কাজ করা হচ্ছে।

প্রশ্ন: বর্তমান সরকার যদি ইমিগ্রেশনের ব্যাপারে আপনাদের কাছে পরামর্শ নিতে আসতেন, আপনাদের জবাব কী রকম হত?

বাফেট

এই দেশের ভিত্তিই ইমিগ্রেশন। আমরা আজকে এখানে বসে আছি কারণ, ১৯৩৯ সালের আগস্ট মাসে সম্ভবত আমেরিকার ইতিহাসের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ চিঠিতে দুইজন ইহুদী ইমিগ্র্যান্ট সই করেছিলেন। লিও জিলার্ড এবং আলবার্ট আইন্সটাইন—এই দুই ইমিগ্র্যান্ট সরাসরি জার্মানি থেকে এসে (জিলার্ড তার আগে এসেছিলেন হাঙ্গেরি থেকে) প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে জানান, জার্মানরা একটা পারমাণবিক বোমা বানাতে যাচ্ছে। কাজেই আমাদের খুব দ্রুত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এর ফলেই শুরু হল ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’।

ওই দুই ইমিগ্র্যান্ট না থাকলে আমরা আজকে এই রুমে বসে থাকতে পারতাম কিনা কে জানে। অভিবাসীরা এই দেশে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। আপনি যে কোনো দেশের দিকেই তাকান না কেন, সব দেশ থেকেই আমেরিকায় অভিবাসীরা এসে তাদের সম্ভাবনাগুলিকে প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছেন; যা তারা নিজেদের দেশে থেকে করতে পারেন নি। আর আজকের আমরা তারই প্রোডাক্ট।

প্রশ্ন: স্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের ব্যাপারে আপনাদের পরামর্শ?

গেটস

এতে কোনো সন্দেহ নাই যে, ভাল মানের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে জিডিপি থেকে স্বাস্থ্য খাতে নির্ধারিত অংশ দিন দিন বাড়াতে হবে। বর্তমানে তা এমনিতেও যথেষ্ট বেশি। তবে এখনো ১৮ শতাংশের মত কার্যকারিতার ঘাটতি আছে। যতই দিন যাচ্ছে, আমরা জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট আর অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মত পদ্ধতি উদ্ভাবন করছি। ফলে নানান দিকে থেকে মানুষের উপকার হচ্ছে। কাজেই সব মিলিয়ে আমাদের আরো বেশি সম্পদের প্রয়োজন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবার জন্যে সরকারি সম্পদ থাকতে হবে আরো বেশি।

এই সমস্যাগুলি সমাধান করা বেশ কঠিন কারণ আমাদের সামর্থ্যেও যেমন ঘাটতি আছে, তেমনি খরচের দিকেও লক্ষ রাখতে হয় আমাদের। আমি সবসময়ই কোনো সমস্যাকে সরল একটা লেন্স দিয়ে দেখার চেষ্টা করি এভাবে যে—উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে এর সমাধান সম্ভব। এখানেও নতুন নতুন ওষুধ উদ্ভাবন করে খরচ বাঁচানো সম্ভব হবে। অথবা আলজাইমার’সের মতো রোগের চিকিৎসা আবিষ্কার করা সম্ভব হলে—যা আমরা এখনো করতে পারি নাই—দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার বাড়তি খরচ অনেকাংশে কমে যাবে।

কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগব্যাধি নির্মূলের ব্যাপারে আমাদের অগ্রগতি অন্যান্য ব্যাধির তুলনায় কম। কৌশলগত ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব ওষুধ তৈরি করা এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণার কাজে মার্কেটকে ঠিকমত ব্যবহার করতে পারলে আমি মোটামুটি আশাবাদী যে, আমরা উন্নতি করতে পারব। কিন্তু সেই জন্যে আমাদের অনেক দামি জিনিসের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে আমাদের খরচ বাড়বেই।

আমি আসলেই আশা করি যেন কোনো এক পর্যায়ে দেশের সেরা প্রতিভাদেরকে তাদের সাফল্যের বিপরীতে যথাযথ সম্মাননা ও উদ্দীপনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্বাস্থ্যসেবা ঠিকমত সুযোগ-সুবিধা দিতে না পারায় দেশের মানুষের মাঝে প্রচণ্ড অসন্তোষ কাজ করছে। কিন্তু তারপরও তারা বলেই যাচ্ছে “লেস গভর্নেন্স, মোর গভর্নমেন্ট”। আমার মনে হয় না দেশের জনগণকে এই জটিলতার ব্যাপারে যথেষ্ট ধারণা ও শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যাতে করে তারা এখনো সঠিক সমাধানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

প্রশ্ন : আপনারা দু’জনই বিদেশে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু আমেরিকার ভেতরেই তো অনেক সমস্যা রয়েছে। এখানেও গরিব মানুষ আছে, অসুস্থ লোকজন আছে। বাইরের দেশের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামানোর আগে আমাদের নিজেদের সমস্যাগুলি নিয়ে কাজ করা উচিৎ। এটা নিয়ে আপনাদের চিন্তাভাবনা কী রকম?

বাফেট

আমার নিজের ব্যক্তিগত ভাবনা এইরকম যে—প্রতিটা প্রাণের মূল্য সমান। আপনার কাছে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার থাকলে আপনি কিন্তু আমেরিকার চাইতে বরং তার বাইরের অনেক মানুষের জন্য আরো অনেক কিছু করার সুযোগ পাবেন। বিশ্বের ৭০০ কোটিরও বেশি মানুষের চেয়ে এদেশের ৩২ কোটি মানুষের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ আছে। কাজেই আপনি আমেরিকার বদলে বিশ্বের অন্য জায়গাগুলিতে বুদ্ধিমানের মত ডলার বিনিয়োগ করতে পারলে তাতে মানুষের উপকার হবে বেশি।

আমি যেহেতু ওমাহা থেকে এসেছি, তাই মানুষজন জানতে চায়, আমি ওমাহার জন্য বেশি বেশি খরচ করি না কেন। আমি ওইখানে বড় হয়েছি; ওমাহা আমার জন্য সবকিছু করেছে। হ্যাঁ, আমি এসব স্বীকার করি ঠিকই।

তবে শেষ পর্যন্ত যদি আপনার কাছে খরচ করার মত ডলার থাকেই, তাহলে সেই অর্থ আমেরিকার বদলে বিশ্বের অন্যান্য স্থানে বুদ্ধিমানের মত বিনিয়োগ করতে পারলে মানুষের জীবনকে আরো বেশি স্বচ্ছন্দ করে তোলা যাবে। এজন্য মানুষ আমার সমালোচনা করলেও তাতে সমস্যা নাই, কারণ এটাই আমার বিশ্বাস।

গেটস

বাইরের দেশের মানুষদের সাহায্য করার ব্যাপারে নজর দিলে দেখা যায়, আমেরিকার বাজেটের ০.৮ শতাংশ বিদেশী ত্রাণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এটা আসলেই উপযুক্ত ও করণীয় কিনা তা নিয়ে সামনের বছরগুলিতে আরো আলোচনা করা হবে। তবে স্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বনির্ভর হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এর যথেষ্ট উপযোগিতা আছে।

বাজেটের ২০ বা ৩০ শতাংশ বিদেশে ব্যয় করা উচিত কিনা তা নিয়ে আলোচনা করতে পারলে অনেক ইন্টারেস্টিং হত। আমাদের ফাউন্ডেশন সবসময় একই রকম উদ্যোগের ব্যাপারে ইনভেস্ট ও কো-ইনভেস্ট করে এসেছে, যেমন পোলিও। আর এ রকম সিদ্ধান্তের জন্যই আমাদের এই প্রক্রিয়া দিন দিন আরো স্মার্ট এবং লাভজনক প্রমাণিত হচ্ছে। আমরা এটাই ধরে রাখতে চাই এবং আশা করছি নতুন বিশ্বে তা আরো প্রাধান্য পেতে থাকবে।

প্রশ্ন: ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে আপনারা শিক্ষণীয় কিছু জানতে পেরেছেন কী? কোনো লাইফ লেসন?

বাফেট

অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন। আপনি যাদের সাথে চলাফেরা করেন, শেষ পর্যন্ত তাদের দেখানো পথেই আপনাকে হাঁটতে হয়। কাজেই আপনার চাইতে ভাল অবস্থানে আছেন—এমন মানুষদের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখা উচিৎ। আর আমাদের বেশিরভাগ মানুষের জন্যই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হল—আপনার স্বামী বা স্ত্রী হিসাবে কাকে বেছে নিচ্ছেন আপনি। অবশ্য এটা সবার জন্য প্রযোজ্য না।

আরো পড়ুন: ‘হাসি ও শেখার ২৫ বছর’: ওয়ারেন বাফেটকে নিয়ে বিল গেটস 

আপনি নিজেকে যেমনটা দেখতে চান, তেমন মানুষের সাথেই আপনার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তার দেখানো রাস্তায় আপনি হাঁটবেন। আর তাই এক্ষেত্রে সবচেয়ে মূল্যবান ব্যক্তি আপনার জীবনসঙ্গী। এই সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে আমি জোর দিয়ে শেষ করতে পারব না। আপনার কথাই ঠিক—জীবনে চলার পথে আপনার বন্ধুরাই আপনাকে গড়ে তোলে। তাই ভাল কিছু বন্ধু বানান আর সারাজীবনের জন্য তাদেরকে ধরে রাখেন। কিন্তু খেয়াল রাখবেন, যাদেরকে আপনি পছন্দের পাশাপাশি শ্রদ্ধাও করেন—এমন মানুষরাই যেন আপনার বন্ধু হয়।

গেটস

কিছু বন্ধু আসলেই আপনার ভেতর থেকে সেরাটা বের করে আনেন। সে রকম বন্ধুত্বের ব্যাপারে আমাদের সবারই মনোযোগী হওয়া উচিৎ। আবার কিছু বন্ধু এমন থাকে যারা আপনার প্রতিটা কাজে আপনাকে চ্যালেঞ্জ করবে। এ রকম অন্তরঙ্গতাও অনেক চমৎকার।

মেলিন্ডা ও অন্যান্য বন্ধুদের সাথে সময় কাটিয়ে আমি বুঝতে পেরেছি, তাদেরকে সময় দেওয়াটা আমার জন্য কতটা জরুরি। কেননা প্রয়োজনে তাদেরকে সাহায্য করার জন্য সবসময় আপনি তৈরি থাকেন এবং আপনার প্রয়োজনে থাকেন তারা।

উমবের্তো একো: “ড্যান ব্রাউনও আমার এক সৃষ্টি।”

২০০৭ সালের ২৫ নভেম্বর ইতালিয়ান লেখক ও দার্শনিক উমবের্তো একো’র এই সাক্ষাৎকার প্রকাশ হয় নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে। এখানে একো মিডিয়া পপুলিজম নিয়ে কথা বলেছেন এবং তিনি যে আশঙ্কা করেছিলেন তার এক প্রতিফলন হিসেবেও দেখা যেতে পারে ২০১৬ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সফল ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়কে।

উমবের্তো  একো জন্মেছিলেন ৫ জানুয়ারি ১৯৩২ সালে। তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্য সমালোচক, দার্শনিক, প্রতীকবিদ। তার সবচেয়ে বিখ্যাত বই ‘দ্য নেম অব দ্য রোজ’, একটি ঐতিহাসিক মার্ডার মিস্ট্রি উপন্যাস যার সময়কাল ১৩২৭ সাল। তার সংগ্রহে ছিল প্রায় ৫০ হাজারের বেশি বই। তিনি অধিক আগ্রহী ছিলেন অদ্ভুত, বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল প্রমাণিত জিনিসের প্রতি। ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সালে উমবের্তো একো মারা যান।

এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ডেবোরাহ সলোমন। তিনি একজন আমেরিকান শিল্প সমালোচক, সাংবাদিক এবং জীবনীকার। ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে সাপ্তাহিক ‘কোয়েশ্চনস ফর’ সাক্ষাৎকার সিরিজটি তিনি পরিচালনা করতেন।

উমবের্তো একোর সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: ডেবোরাহ সলোমন

অনুবাদ: মুরাদুল ইসলাম


ডেবোরাহ সলোমন

ইন্টেলেকচুয়াল মার্ডার মিস্ট্রি ‘দ্য নেইম অব দ্য রোজ’ এর লেখক হিসেবে যদিও আপনি বেশি পরিচিত, তথাপি আপনি একজন প্রচুর পরিমাণে সক্রিয় রাজনৈতিক ভাষ্যকার। আপনার প্রবন্ধগুলি টার্নিং ব্যাক দ্য ক্লক নামের বইতে সংকলিত হয়েছে। যাতে আপনি মিডিয়া পপুলিজমের বিপদ সম্পর্কে সাবধান করেছেন। এই শব্দবন্ধকে আপনি কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?

উমবের্তো একো

মিডিয়া পপুলিজম মানে হলো মিডিয়ার মাধ্যমে সরাসরি মানুষের কাছে আবেদন তৈরি করা। একজন যদি রাজনীতিবিদ মিডিয়ার কৌশলগুলি রপ্ত করতে পারেন, তাহলে রাজনৈতিক বিষয়গুলি সংসদের বাইরেই তিনি বন্দোবস্ত করে নিতে পারবেন, এমনকী সংসদের মধ্যস্থতা তিনি দূর করে দিতে পারেন।

ডেবোরাহ

আপনার বইয়ের অধিকাংশই ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বার্লুসকোনির বিরুদ্ধে প্রবল আক্রমণ, যিনি রাজনৈতিক স্বার্থে তার মিডিয়া সাম্রাজ্য ব্যবহার করেছেন।

একো

১৯৯৪ থেকে ১৯৯৫, আর ২০০১ থেকে ২০০৬, এই সময়কালে বার্লুসকোনি ছিল ইতালির সবচেয়ে ধনী লোক, প্রধানমন্ত্রী, তিনটি টিভি চ্যানেলের মালিক এবং তিনটি রাজ্য চ্যানেলের নিয়ন্ত্রক। আমি যেই ঘটনার (ফেনোমেনন) কথা বলেছি বার্লুসকোনি সেই ঘটনা, যা ঘটতে পারে এবং হয়ত পৃথিবীর অন্যত্র ঘটছেও। এবং এর প্রক্রিয়াটা হবে একই রকম।

ডেবোরাহ

মিডিয়ার উপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ, যা রাজনীতিবিদদের পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলগুলি নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ দেয় তা রোধ করার জন্য আমাদের এখানে এফসিসি (ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন) এবং অন্যান্য ফেডারেল এজেন্সিগুলা আছে।

একো

আমেরিকায় মিডিয়া এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে এখনো বড় দূরত্ব আছে, মূলনীতিতে হলেও।

ডেবোরাহ

তাহলে ইতালি ছাড়া অন্য দেশ কেন এই মিডিয়া কর্তৃক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে পড়ার ঝুঁকিতে আছে, যা আপনি উল্লেখ করেছেন?

উমবের্তো একো (১৯৩২ – ২০১৬)

 

একো

বিদেশীরা যেসব কারণে ইতালির ব্যাপারটি নিয়ে এত আগ্রহী, তার একটি হলো গত শতকে ইতালি ছিল এক ল্যাবরেটরি। ফিউচারিস্ট*দের দিয়ে এর শুরু। তাদের ইশতিহার ছিল ১৯০৯-এ। তারপরে এলো ফ্যাসিজম** – এটা ইতালিয়ান ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষিত হলো এবং তারপর গেল স্পেনে, বলকান অঞ্চলে, জার্মানিতে।

ডেবোরাহ

আপনি বলছেন জার্মানি ফ্যাসিজমের আইডিয়া ইতালি থেকে পেয়েছিল?

একো

অবশ্যই। ঐতিহাসিকদের মত এমনই।

ডেবোরাহ

হতে পারে কেবল ইতালিয়ান ঐতিহাসিকদের মত।

একো

আপনি পছন্দ না করলে, না বলেন। আমি নিরপেক্ষ।

ডেবোরাহ

আপনি বলতে চাচ্ছেন ইতালি  ফ্যাশন বা আর্ট এবং ফ্যাসিজম উভয় ক্ষেত্রেই অগ্রণী ভূমিকায় ছিল?

একো

হ্যাঁ। কেন নয়?

ডেবোরাহ

বার্লুসকোনির উত্তরসুরী হিসেবে এসেছেন রোমানো প্রদি। তিনি গত বছর নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসার পর সরকারকে বামাবর্তে নিয়ে গেছেন। তার সম্পর্কে আপনার মত কী?

একো

তিনি একজন বন্ধুমানুষ। আমি তাকে পছন্দ করি। কিন্তু আমার ধারণা নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠে র মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতায় নির্বাচনে জিতে তিনি আচ্ছন্ন হয়ে আছেন। বার্লুসকোনির সুবিধা তিনি একজন বড় অভিনেতা। প্রদি অভিনেতা নন, যা কোনো অপরাধ নয় কিন্তু দুর্বলতা।

ডেবোরাহ

প্রদি একজন বুদ্ধিজীবী, অপরদিকে আছে তার ব্যবসায়ী সত্তা?

একো

হ্যাঁ, তিনি অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৯০ এর শুরুর দিকে আমার একটি প্রোগ্রামে প্রদি শিক্ষক হিসেবেও ছিলেন। হঠাৎ করেই রাজনীতিতে চলে যান।

ডেবোরাহ

ইউনিভার্সিটি অব বলোগ্নার কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টের কথা বলছেন, সেখানে প্রতীকবিদ্যা’র (সেমিওটিক্স***)  অধ্যাপক আপনি?

একো

আমি এই মাসে অবসর নিয়েছি। আমার বয়স ৭৫।

ডেবোরাহ

আপনি কখনো রাজনীতিতে যেতে চেয়েছিলেন?

একো

না কারণ আমি মনে করি প্রত্যেকের অবশ্যই নিজের কাজ করা উচিত।

ডেবোরাহ

আপনি কি নিজেকে প্রধানত একজন ঔপন্যাসিক মনে করেন?

একো

আমি মনে করি আমি একজন স্কলার যিনি কেবলমাত্র বাম হাত দিয়ে উপন্যাস লিখে থাকেন।

ডেবোরাহ

ডেবোরাহ: কিছু ক্রিটিক মনে করেন ওটা আপনার ‘নেইম অব দ্য রোজে’র পপ ভার্শন।

আপনি কি ড্যান ব্রাউনের ‘দা ভিন্চি কোড’ পড়েছেন, কিছু ক্রিটিক মনে করেন ওটা আপনার ‘নেইম অব দ্য রোজে’র পপ ভার্শন।

একো

আমি এটি পড়তে বাধ্য হয়েছি কারণ সবাই এর ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞেস করছিল। আমার উত্তর হল, ড্যান ব্রাউন আমার উপন্যাস ‘ফুকো’জ পেন্ডুলামে’র চরিত্রগুলির মধ্যে একটি চরিত্র। এই বইটি সেই সমস্ত লোকদের নিয়ে যারা অকাল্টের**** বিষয়গুলি বিশ্বাস করতে শুরু করে।

ডেবোরাহ

কিন্তু আপনি নিজেও কাব্বালাহ, আলকেমি এবং অন্যান্য অকাল্ট বিষয় নিয়ে আগ্রহী, যার কথা উপন্যাসে আছে।

একো

না, ‘ফুকো’জ পেন্ডুলামে’ আমি ওই সমস্ত লোকদের একটা গ্রথেস্ক উপস্থাপন করেছি। তাই, ড্যান ব্রাউনও আমার এক সৃষ্টি।

ডেবোরাহ

একশো বছর পরে আপনার বই লোকে পড়বে কি পড়বে না, এই নিয়ে আপনার মনোভাব কেমন?

একো

কেউ যদি একটা বই লেখে, এবং তা টিকবে কি টিকবে না এই নিয়ে তার কোনো চিন্তা বা মাথাব্যথা না থাকে, তাহলে সে নির্বোধ।

—-

*ফিউচারিজম – বিশ শতকের শুরুর দিকে ইতালিতে শুরু হওয়া একটি শিল্প ও সামাজিক আন্দোলন। গতি, প্রযুক্তি, তারুণ্য, হিংস্রতা, গাড়ি, এরোপ্লেন, শিল্পনগরী এসবকে তারা প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

**ফ্যাসিজম – ফ্যাসিস্ট মতাদর্শ যা ইতালির বেনিতো মুসোলিনির ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত। ১৯২২ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত যা কিংডম অব ইতালির শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। ইতালির ফ্যাসিজমের মূলে ছিল ইতালিয়ান জাতীয়তাবাদ।

***সেমিওটিক্স – প্রতীক, চিহ্ন বিষয়ক দর্শনবিদ্যা। ভাষাতত্ত্বের খুব কাছের বিষয়। কীভাবে অর্থ তৈরি হয় এবং কীভাবে অর্থের যোগাযোগ হয় তার এক ধরনের তদন্তই বলা যায়। কীভাবে প্রতীক বা চিহ্ন অর্থ তৈরি করে এই বিষয়ের একাডেমিক কিছু কাজকে এই শাখার মূল ধরা হয়।

****অকাল্ট – এর মূল ল্যাটিন শব্দের অর্থ গুপ্ত জ্ঞান বা লুক্কায়িত জ্ঞান। অতিপ্রাকৃতিক বা বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয়-স্পিরিচুয়াল, অযৌক্তিক যাদু বিদ্যা বিষয়ক গুপ্ত সংঘ, তাদের বিশ্বাস ও কার্যকলাপ ইত্যাদি বোঝায় সাধারণত।

লিওনেল মেসি: “আমার উচ্চতা নিয়ে কখনোই কোনো সমস্যা হয় নাই।”

লিওনেল আন্দ্রেস মেসি সংক্ষেপে লিও মেসি (জন্ম ২৪ জুন, ১৯৮৭) আর্জেন্টাইন পেশাদার ফুটবলার। স্পেনিশ ফুটবল ক্লাব এফসি বার্সেলোনাতে ফরওয়ার্ড হিসেবে খেলেন। বর্তমানে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় মনে করা হয় তাকে এবং কেউ কেউ তাকে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় মনে করেন। সেন্ট্রাল আর্জেন্টিনাতে জন্মগ্রহণ করেন মেসি এবং ছোটবেলা থেকেই শারীরিক বৃদ্ধি সংক্রান্ত হরমোনের অভাবে ভুগেছেন। ১৩ বছর বয়সে স্পেনে চলে আসেন। বার্সেলোনা তার চিকিৎসার খরচ বহন করতে সম্মত হয়।

সাক্ষাৎকারগ্রহীতা ব্রিটিশ কলামিস্ট ও সাংবাদিক সাইমন ‘সিড’ লোউ (জন্ম. লন্ডন, ইংল্যান্ড ১৯৭৬) স্পেনের মাদ্রিদে থাকেন। প্রকাশনা, টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও স্টেশন ও ফুটবল সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে স্পেনিশ ফুটবল নিয়ে লিখে থাকেন তিনি। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ওয়ার্ল্ড সকার এর জন্যে এই সাক্ষাৎকারটি নেন সিড লোউ।


লিওনেল মেসি’র সাক্ষাৎকার

সাইমন ‘সিড’ লোউ

অনুবাদ: সাবিদিন ইব্রাহিম


সিড লোউ

ফুটবল নিয়ে আপনার প্রথম স্মৃতি কোনটা?

লিওনেল মেসি

আমার প্রথম স্মৃতি একেবারে ছোটবেলার। সেটা হয়তো তিন-চার বছর বয়সের দিকে হবে। বাসার পাশেই খেলছিলাম। খুব ছোট বয়স থেকে আমার পায়ে ফুটবল, এমন দৃশ্য আমি মনে করতে পারি।

সিড

আপনি কি তখন থেকেই প্রতিপক্ষের ফাউল ও হামলা থেকে বাঁচার পদ্ধতি শিখে ফেলেছিলেন?

মেসি

আমি আসলে একই স্টাইলের খেলা খেলে এসেছি। আমাকে কেউ আঘাত করছে এটা নিয়ে চিন্তিত নই।

messi-3
লিওনেল মেসি, জুন ২২, ২০১৬

সিড

বার্সেলোনার প্রথম দিনগুলোতে সুখের স্মৃতি বা দুঃখের স্মৃতি কেমন?

মেসি

আসলে দুইটাই আছে। বার্সেলোনাতে এসে আমি খুব খুশির মধ্যে থাকতাম। নতুন নতুন সব অভিজ্ঞতা হতো।  নিজের লোকদের ছেড়ে এত দূরে থাকাটা বেশ কষ্টদায়ক ছিল। নতুন করে সব কিছু শুরু করতে হচ্ছিল; দলে নতুন সদস্য, নতুন বন্ধু। প্রথম দিকে আবার ইনজুরি আর আইনি ঝামেলার কারণে খেলতে পারছিলাম না। শুরুটা আসলেই খুব কঠিন ছিল।

সিড

তখন আপনার আইডল কারা ছিলেন ?

মেসি

আইমারকে (পাবলো আইমার) আমার সবসময় ভালো লাগতো। সে আসছিল রিভার থেকে, আমি তাকে বেশ ফলো করতাম।

সিড

আপনি যে ছোট সে কারণে মানুষের সাথে কি কোনো সমস্যা হতো?

মেসি

না, আমার উচ্চতা নিয়ে কখনোই কোনো সমস্যা হয় নাই। আমার দলে বা স্কুলে সব জায়গাতেই আমি ছিলাম সবচেয়ে ছোট বাচ্চা।

সিড

টিটো ভিলানোভা বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার আগে, আপনার ১৩-১৪ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত তো দলে নিয়মিত জায়গা পেতেন না। আপনার কি ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছে হয় নাই?

মেসি

না, কখনোই হয় নাই। সবসময় আমি আমার ট্রেনিং আর পরিশ্রম চালু রাখতে চাইতাম। আমার দৌড় ছিল স্বপ্নের পেছনে। আমি ভাগ্যবান যে টিটো আসার পরে আমি প্রচুর খেলার সুযোগ পেতাম। তরুণদের দলে আমার ক্যারিয়ার পাল্টে যেতে লাগল।

সিড

টিটো কি আপনার কাছে আগের মতোই?

মেসি

ক্যাডেট টিমে তিনি আগে যেমন ছিলেন এখনও তেমনই আছেন। আমি তখন অনেক ছোট ছিলাম তাই সবকিছু এখন আর মনে নাই। তবে তিনি আছেন আগের মতোই। আগে আমাদের সাথে যেমন ব্যবহার করতেন এখনো সেটাই করেন।

সিড

আপনি কি আগের মতোই খেলেন যেমনটা খেলতেন ফলস নাম্বার নাইন হিসেবে?

মেসি

না, সিস্টেমটা আলাদা আসলে। আমরা একজন স্ট্রাইকার নিয়ে খেলতাম এবং আমি তার পেছনে খেলতাম। পাশে থাকতো দুজন উইংগার। আমি ছিলামমিডিয়াপান্তা বা প্লেমেকার। দলে এখন ফলস্ নাইন হিসেবে খেলার সুযোগ নাই কারণ এখন সিস্টেমটা পাল্টে গেছে।

সিড

আপনার এই খেলার স্টাইল কি বার্সেলোনার শিক্ষার ফল?

মেসি

এফ সি বার্সেলোনার ইয়ুথ একাডেমি। ১৩ বছর বয়সে বাপমা ছেড়ে একাডেমিতে ভর্তি হন মেসি।
এফ সি বার্সেলোনার ইয়ুথ একাডেমি। ১৩ বছর বয়সে বাপমা ছেড়ে একাডেমিতে ভর্তি হন মেসি।

আমার খেলার স্টাইল সবসময় এক রকমই ছিল। কোনো নির্দিষ্ট স্টাইল আমি নিয়ে আসার চেষ্টা করি নাই। খুবই অল্প বয়স থেকেই এভাবে খেলছি। এটা অবশ্যই সত্য যে যুব বিভাগ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। এখানে যেভাবে খেলেছি সেটা ভিন্ন। বল অনেকক্ষণ ধরে রাখার বিষয় ছিল এবং কৌশলের ব্যাপারটাতে অনেক কাজ করতে হতো। আমি যেখান থেকে এসেছি সেই আর্জেন্টিনায় আমরা তেমনটা করতাম না। সেখানে বিষয় ছিল খালি দৌড়ানোর, তার বাইরে আর কিছু না।

সিড

সেস ফেব্রিগাসের সাথে আবার খেলছেন। সে তো যুববিভাগে আপনার সাথে খেলেছিল। আপনাদের মাঝে কি ভালো বোঝাপড়া আছে?

মেসি

আমরা একে অন্যকে ভালো বুঝি এবং ভালো চিনি। যে স্টাইলে সেস খেলে সে কারণে তার সাথে খেলা খুবই সহজ। খেলার মাঠে বা ট্রেনিং-এ আমাদের মধ্যে দারুণ বোঝাপড়া।

সিড

বার্সেলোনার প্রথম দলে প্রথমবারের মতো খেলেছিলেন সিজনের আগে সেই জোয়ান গ্যাম্পার ট্রফিতে। ফ্যাবিও কাপেলো আপনাকে নিয়ে বলেছিলেন—‘একটা ক্ষুদে শয়তান’…

মেসি

তার কাছ থেকে এমন কথা শোনা ছিল সত্যিই অসাধারণ। কোচ হিসাবে তিনি অনেক ম্যাচ জেতেন। আমাকে নিয়ে তার সে কথাটি আসলেই খুব সুন্দর ছিল।

সিড

লীগে যখন আপনার অভিষেক হচ্ছিল তখনই পাসপোর্ট ঝামেলায় পড়েছিলেন…

মেসি

সেটা খুব কঠিন সময় ছিল। ভাগ্যক্রমে দ্রুত চলে গেছে সেই সময়। আমি আসলে খেলতে চাচ্ছিলাম। আমাকে দলে নেওয়া হলো কিন্তু তারা বললো নেওয়া যাবে না। আমি বুঝতে পারছিলাম না কেন আমি খেলতে পারবো না।

সিড

কেন ডেকো ও রোনালদিনহো আপনাকে তাদের উইংয়ে নিলো বলে মনে করেন?

মেসি

আমি জানি না। শুরু থেকেই তাদেরকে আমার পাশে পাওয়া ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। আমি সারাজীবন তাদেরসহ থিয়াগো মোত্তা ও সিলভিনহোর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো।

সিড

তখন দলটার কী হয়েছিল? এটা এত দ্রুত ভেঙে পড়েছিল কেন?

মেসি

আমি আসলে জানি না ঘটনাটা কী ছিল। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর সাথে চ্যাম্পিয়নস লীগের সেমিফাইনালে হারলাম, তারপর রিয়াল মাদ্রিদের কাছে গোল ব্যবধানে লীগটা হারলাম। আমি সত্যিই জানি না কী ঘটেছিল। কিন্তু এটা আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছিল যেন এমনটা আর না ঘটে।

সিড

এখন আপনি আপনার ডায়েটের ব্যাপারে খুব সচেতন। এমন কোনো খাবার আছে যেটা মিস করেন কিন্তু খেতে পারছেন না?

মেসি

আমার ডায়েট নিয়ে খুব কথাবার্তা হয়। লোকে যেমন বলে আসলে ততটা চেন্জ আমি আনি নাই। আগে যেমনটা খেতাম এখনো অনেকটা তেমনই খাই। অবশ্য আমি এখন এমন জিনিস খাচ্ছি যেটা আগে খেতাম না, যেমন মাছ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সব এক রকমই আছে।

সিড

ইদানিং আপনি বেশি গোল করাচ্ছেন, নিজেও করেন। আপনার খেলা কি পাল্টেছে? আপনি কি আগে একটু বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিলেন, অনেকটাচুপন বা বল পাগলা?

মেসি

আমি নিজেকে কখনো লোভী বা বল পাগলা মনে করি নাই। যদিও কিছু লোক সেটা ভাবে। আমি খেলোয়াড় হিসেবে বড় হয়েছি এবং তাদের কাছ থেকে শিখেছি যারা আমার উন্নতির জন্য সাহায্য করেছে।

সিড

আপনার এই অবস্থানের চাপ কীভাবে নেন, এই যে খ্যাতি আর প্রশংসার বন্যা? আপনি কি আত্মসমালোচনা করেন?

মেসি

হা, অনেক। আমি আমার নিজের সমালোচনা করি অন্য অনেকের চেয়ে বেশি। আমি জানি আমি কখন ভালো এবং কখন খারাপ। আমাকে আসলে কারো বলার দরকার পড়ে না। আমি মাঠে কী করি সেটা দেখলেই বুঝতে পারি। আমাকে কিছু্ই বলার দারকার নাই।

সিড

আপনি বলটা পেলে কী কী করা যায় তার অপশন ঠিক করে নেন নাকি খেলাটা স্বতঃস্ফূর্তই থাকে?

মেসি

প্রতিপক্ষের গোলবারে যেতে যেই সেরা জিনিসটা দিতে হবে আমি সবসময় সেটা দেওয়ার চেষ্টা করি। স্বাভাবিকভাবে সেখান থেকেই সবকিছু চলে আসে।

সিড

খেলাতে ফুটবল এর বিভিন্ন দিকের সাথে সাথে আপনি কি শারীরিক চেষ্টাও চালান। জিমে কি বেশি সময় কাটান?

মেসি

আমি আমার দুর্বল জায়গা নিয়ে কাজ করি, ইনজুরি ঠেকানোর চেষ্টা করি এবং নিজের সেরাটাতে থাকতে চাই। আমি আমার দেখাশুনা করি কিন্তু তার মানে এই না যে আমি আমার সারা জীবন জিমে কাটাতে চাই। আমি আসলে এই জিনিসের ভক্ত না।

সিড

নিজ দলের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে কী শিখেছেন? তাদের এমন কোনো স্কিল যেটার জন্যে আপনার ঈর্ষা হয়? যেমন জাভি…

স্ত্রী ও দুই ছেলে সহ মেসি।
স্ত্রী ও দুই ছেলে সহ মেসি।

মেসি

সে অনেক বড় খেলোয়াড়। সে কখনো বল হারায় না। তার দূরদৃষ্টি আছে এবং ম্যাচটা পড়তে পারে ভালো। সে খেলার গতি ও ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে..

সিড

এবং আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা?

মেসি

সে ও তেমন। আন্দ্রেসের গোল করার সক্ষমতা হয়তো বেশি। ভেতর থেকে এসে অনেক দূর পর্যন্ত দৌড়ায়। তবে দুজনের মধ্যে অনেক মিল। আন্দ্রেসেরও দূরদৃষ্টি প্রখর এবং সে যখন ফর্মে থাকে পুরো দল তাকে কেন্দ্র করে ঘোরে। সে আর জাভি মাঠে থাকলে দলের আর কেউ সহজে বল পায় না।

সিড

শুধু যে পেনাল্টি এরিয়া এমনটা না, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি আরও গভীরে থেকে খেলেন এবং খেলাটার অগ্রগতিতে যুক্ত হয়ে পড়ছেন। এটা কি সচেতন পরিবর্তন?

মেসি

এটা আসলে খেলার উপর নির্ভর করে। আমি একটু গভীরে চলে আসি যাতে বলটা পাই। এবং সেখান থেকে মাঝ মাঠের খেলোয়াড়দের সাথে মিলে খেলার চাল দিতে চাই। আমি আসলে আর সব মিডফিল্ডারদের মতো না। প্রতি মুহূর্তে দলের কী লাগবে সে অনুসারে আমি কাজ করি।

সিড

লোকে এই রকম বলে যে আপনি যদি কখনো ম্যাচে হারেন, সেটা যদি ট্রেনিং ম্যাচও হয়, ভালো হচ্ছে আপনার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা না করা। হারলে কি আসলেই এতটা ক্ষেপে থাকেন?

মেসি

সাক্ষাৎকারগ্রহীতা ব্রিটিশ কলামিস্ট ও সাংবাদিক সাইমন ‘সিড’ লোউ (জন্ম. লন্ডন, ইংল্যান্ড ১৯৭৬) স্পেনের মাদ্রিদে থাকেন। প্রকাশনা, টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও স্টেশন ও ফুটবল সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে স্পেনিশ ফুটবল নিয়ে লিখে থাকেন তিনি।
সাক্ষাৎকারগ্রহীতা ব্রিটিশ কলামিস্ট ও সাংবাদিক সাইমন ‘সিড’ লোউ (জন্ম. লন্ডন, ইংল্যান্ড ১৯৭৬) স্পেনের মাদ্রিদে থাকেন। প্রকাশনা, টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও স্টেশন ও ফুটবল সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে স্পেনিশ ফুটবল নিয়ে লিখে থাকেন তিনি।

এটা আসলে ড্রেসিংরুমের আর সব খেলোয়াড়দের জন্যেও একই। আপনি যখন হারবেন তখন আহত থাকবেন। এটা একটা ভালো দিক। কারণ আমরা সবাই জিততে চাই, হউক না সেটা ট্রেনিং ম্যাচ। তার মানে আমাদের জেতার ক্ষুধা কমে না।

সিড

পেপ গোয়ার্দিওয়ালা চলে যাওয়ার পর আপনি কি দলে নেতার ভূমিকা নিচ্ছেন?

মেসি

আমি আগের মতই আছি। প্রত্যেকেই তার নিজের ভূমিকা সম্পর্কে জানে। ড্রেসিংরুমে এমন লোকেরা আছে আসলে যাদের কোনো নেতা লাগে না। আমি এখনো আগের মতই ভূমিকা রাখছি।

সিড

আপনার পরবর্তী চ্যালেন্জ তাহলে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ…

মেসি

হা। বিশ্বকাপ জেতা হচ্ছে সর্বোচ্চ উপহার। এবং ব্রাজিলে জেতাটা আরও বড় ব্যাপার।

সিড

পেলে, দিয়েগো ম্যারাডোনা। লোকেরা বলাবলি করছে আপনি হয়তো সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়…

মেসি

আমি প্রতিদিন উন্নতি করার চেষ্টা করি। আসলে সত্যিই এটা মুগ্ধতার যে আমাকে তাদের মতো খেলোয়াড়দের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। অবসরে চলে যাওয়ার অনেক পরেও মানুষ তাদেরকে নিয়ে কথা বলে। নিজেকে নিয়ে আমি আসলে সেভাবে ভাবি না। নিজেকে আরও ভালো করা যায় কীভাবে সেটা নিয়ে সবসময় ভাবি। ক্যারিয়ার শেষ হলে আমি ভাববো কী করতে পেরেছি তা নিয়ে। তারপর লোকে মূল্যায়ন করুক।

ভালেনসিয়াকে সুযোগ না দিয়ে অ্যাক্রোবেটিক ভাবে ফুটবলে কিক করছেন মেসি। ছবি. ১৫ এপ্রিল ২০১৫
ভালেনসিয়াকে সুযোগ না দিয়ে অ্যাক্রোবেটিক ভাবে ফুটবলে কিক করছেন মেসি। ছবি. ১৫ এপ্রিল ২০১৫

সিড

আপনি মাত্র প্রথমবারের মতো বাবা হলেন। আপনার ছেলে থিয়াগো যদি রিভার প্লেট বা রোজারিও সেন্ট্রাল এর ফ্যান হয়ে পরে?

মেসি

আমার মনে হয় না এমনটা হবে।

সিড

আপনি কি চান সে একজন ফুটবলার হোক?

মেসি

আমি চাই সে যেটা হতে চায় সেটা হউক। সে যখন বড় হবে তখন নিজেই বুঝতে পারবে সে কী হতে চায়। আমি সেটাতেই খুশি হবো, এমনকি তার মাও সেটাতেই খুশি হবে।