তাইওয়ানের আকাশছোঁয়া গর্ব তাইপেই ১০১। ৫০৮ মিটার উঁচু, ১০১ তলা এক দানবাকৃতির ভবন। সাধারণ মানুষের চোখে এটি আধুনিক প্রকৌশলের বিস্ময়, আর অ্যালেক্স হনোল্ডের কাছে এটি ছিল আরেকটি অসম্ভবকে সম্ভব করার চ্যালেঞ্জ।
২৫ জানুয়ারি ২০২৬, রোববার সকাল ৯টা। কোনো রশি নেই, কোনো হারনেস নেই, কোনো নিরাপত্তা জাল নেই। শুধুমাত্র নিজের শরীর, অভিজ্ঞতা আর মানসিক দৃঢ়তা ভর করে মার্কিন রক ক্লাইম্বার অ্যালেক্স হনোল্ড শুরু করলেন তাইপেই ১০১ বেয়ে ওপরে ওঠার দুঃসাহসিক যাত্রা।
৫০৮ মিটার (১,৬৬৭ ফুট) উচ্চতার এই আরোহণ শেষ করতে তার সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা।
এই অভিযানের মধ্য দিয়ে হনোল্ড পূরণ করলেন এক দশকেরও বেশি আগে নিজের কাছে করা একটি প্রতিশ্রুতি। তার লক্ষ্য ছিল শুধু রেকর্ড গড়া নয়—মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়া যে, জীবন ছোট, সময় সীমিত, আর ভয়কে পাশ কাটিয়ে নিজের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়াই সত্যিকারের বেঁচে থাকা।
এমন ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে নামার আগে অবশ্যই তাকে তাইপেই ১০১ কর্তৃপক্ষ ও শহর সরকারের পূর্ণ অনুমতি ও সহযোগিতা নিতে হয়েছে। সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই শুরু হয় এই শ্বাসরুদ্ধকর আরোহণ—যা ইতিমধ্যেই তাইওয়ানসহ সারা বিশ্বের মানুষকে বিস্মিত করেছে।
আরোহণের দিন
অ্যালেক্স হনোল্ডের এই দুঃসাহসিক আরোহণটি মূলত ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, শনিবার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকৃতি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বৃষ্টির কারণে নিরাপত্তার কথা ভেবে শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বদলাতে হয়। একদিন পিছিয়ে, ২৫ জানুয়ারি রোববারই শুরু হয় সেই প্রতীক্ষিত অভিযান।
সাম্প্রতিক ডেস্ক
ভবনটির পাদদেশে তখন ভিড়। ক্যামেরা, দর্শক, উল্লাস—সব মিলিয়ে এক উৎসবের আবহ। ৪০ বছর বয়সী হনোল্ড যখন আরোহণ শুরু করেন, চারপাশ থেকে করতালির শব্দ উঠতে থাকে। এক পর্যায়ে তিনি কিছুক্ষণ থেমে নিচের দিকে তাকান। মুহূর্তের মধ্যেই দর্শকরা আবারও উল্লাসে ফেটে পড়ে—নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলির জন্য সেটি ছিল শ্বাস আটকে রাখার মত দৃশ্য।
পুরো ৫০৮ মিটার উচ্চতার তাইপেই ১০১ ভবনটি তিনি আরোহণ করেন মোট ৪ ঘণ্টা ১৮ মিনিটে। হিসাব করলে দেখা যায়, ১০১টি তলা পার হতে তিনি প্রতি তলায় গড়ে প্রায় ২.৫৫ মিনিট সময় নিয়েছেন।
তুলনার জন্য বলা যায়, ২০০৪ সালে ফরাসি ক্লাইম্বার অ্যালাঁ রবার্ট একই ভবন রশির সহায়তায় আরোহণ করেছিলেন প্রায় চার ঘণ্টায়। তবে তখন আবহাওয়া ছিল আরও প্রতিকূল। সেই তুলনায় হনোল্ডের আরোহণটি ছিল রশিহীন—ফ্রি-সলো—যা ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই পুরো অভিযাত্রা বিশ্বজুড়ে সরাসরি সম্প্রচার করা হয় Skyscraper Live with Alex Honnold অনুষ্ঠানে। এটি নেটফ্লিক্সের লাইভ স্পোর্টস প্রোগ্রামিংয়ের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলির একটি। বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে এই সম্প্রচার দেখেছেন দুই কোটিরও বেশি দর্শক।
যদিও হনোল্ড সম্পূর্ণভাবে ফ্রি-সলো শৈলীতে আরোহণ করেছেন, তবু নিরাপত্তার জন্য ভবনের নিচে রাখা ছিল রেসকিউ টিম ও বড় সেফটি নেট—যেকোনো জরুরি পরিস্থিতির জন্য।
ইয়োসেমাইট ন্যাশনাল পার্কের এল ক্যাপিটান পর্বত—৯১৪ মিটার উঁচু—মাত্র ৩ ঘণ্টা ৫৬ মিনিটে রশি ছাড়া আরোহণ করার জন্য যিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত, সেই হনোল্ড তাইপেই ১০১ সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। তিনি বলেন, “দৃশ্যটা এমন ছিল—ওয়াও! কী দৃশ্য! অবিশ্বাস্য। কী সুন্দর একটা দিন।”
তবে পথটা মোটেও সহজ ছিল না। তিনি জানান, ওপরের দিকে বাতাসের গতি ছিল প্রায় ৩০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা।
তার ভাষায়, “খুব বাতাস ছিল। নিজেকে বার বার বলছিলাম—স্পায়ার থেকে পড়ে যেও না। ভারসাম্য ঠিক রাখার চেষ্টা করছিলাম।”
সবচেয়ে কঠিন অংশ ছিল মাঝামাঝি অংশের ৬৪ তলা। এই অংশটি ‘বাঁশের বাক্স’ নামে পরিচিত—ভবনের আটটি ভাগের মধ্যে এটি সবচেয়ে খাড়া, বাইরে ঝুলে থাকা এবং মানসিকভাবে চাপ তৈরি করা একটি পথ। এখানেই তিনি একটি বারান্দায় কিছুক্ষণ থেমে বিশ্রাম নেন।
কিন্তু সব কষ্টের পর যখন তিনি ওপরে পৌঁছান, তখন তার কণ্ঠে শুধু বিস্ময়, “এটা সত্যিই অসাধারণ একটা অবস্থান। এমনভাবে তাইপেই শহরকে দেখার সুযোগ—এর চেয়ে সুন্দর কিছু হতে পারে না।”
সমালোচনা ও বিতর্ক
এই দুঃসাহসিক আরোহণটি যেমন বিশ্বজুড়ে বিস্ময় তৈরি করেছে, তেমনি জন্ম দিয়েছে তীব্র বিতর্কের। বিশেষ করে এটি লাইভ সম্প্রচারে দেখানোর কারণে সমালোচনার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। নেটফ্লিক্স এবং অ্যালেক্স হনোল্ড—দুজনকেই পর্বতারোহী ও রক ক্লাইম্বার সোসাইটির একটি অংশ প্রকাশ্যে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
এই সমালোচকদের মতে, ফ্রি-সলো ক্লাইম্বিং এমনিতেই বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ খেলাগুলির একটি। রশি, হারনেস বা কোনো সুরক্ষা ছাড়া কয়েক শ’ মিটার উঁচু দেয়াল বা পাহাড়ে ওঠা মানেই—একটি ছোট ভুল সরাসরি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাদের দাবি অনুযায়ী, গত এক দশকে ফ্রি-সলো ক্লাইম্বিংয়ে ৫০ জনেরও বেশি আরোহীর মৃত্যু হয়েছে, যা এই খেলাটির মারাত্মক ঝুঁকির দিকটি স্পষ্ট করে। এই প্রেক্ষাপটে সমালোচকেরা প্রশ্ন তোলেন, এমন একটি কার্যক্রম লাইভ সম্প্রচারে দেখানো কতটা দায়িত্বশীল?
তাদের আশঙ্কা, এতে করে তরুণ বা অনভিজ্ঞ ক্লাইম্বাররা অনুপ্রাণিত হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, নিজেদের সক্ষমতা না বুঝেই ফ্রি-সলোতে নামতে পারেন।
The Wall Street Journal-এর কলামিস্ট ড্যানিয়েল ওয়াল্ট শুধু খেলাটির ঝুঁকির কথাই বলেননি, বরং হনোল্ডের ব্যক্তিগত দায়িত্বের দিকটিও সামনে এনেছেন।
ড্যানিয়েল ওয়াল্ট মনে করিয়ে দেন, অ্যালেক্স হনোল্ড এখন শুধু একজন ক্লাইম্বার নন, তিনি একজন স্বামী এবং একজন বাবা। তার স্ত্রী সানি এবং মাত্র দুই বছরের ছেলে অ্যালেক্স জুনিয়র আছেন। সমালোচকদের যুক্তি হল, একজন পারিবারিক মানুষ হিসাবে এমন চরম ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া কি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য?
এই সমালোচকদের ভাষা ছিল আরও কঠোর। তাদের মতে, এই আয়োজনটি ছিল, “ভয়ানক কৌতূহলনির্ভর, বিকৃত আনন্দদায়ক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন।”
তাদের অভিযোগ, নেটফ্লিক্সের মত একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম এই লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে ঝুঁকিকে রোমান্টিক করে তুলেছে, মৃত্যুকে এক ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ বিনোদনে পরিণত করেছে। তাদের মতে, এটি খেলাটির সৌন্দর্য বা শৃঙ্খলার উদযাপন নয়, বরং দর্শকের শিহরণ আর রেটিং বাড়ানোর একটি প্রচেষ্টা।
তবে একই সঙ্গে রক ক্লাইম্বারদের ভেতরেই একটি ভিন্ন মতও রয়েছে। এই অংশটি মনে করে—ফ্রি-সলো নতুন কিছু নয়, আর হনোল্ড এমন কেউ নন যিনি হঠাৎ আবেগে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তার প্রতিটি আরোহণ বছরের পর বছর প্রস্তুতি, অনুশীলন ও মানসিক শৃঙ্খলার ফল। তবুও, সমালোচকেরা জোর দিয়ে বলেন—ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত আর বৈশ্বিক সম্প্রচার এক জিনিস নয়।
এই বিতর্ক আসলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—ব্যক্তিগত সাহস আর সামাজিক দায়িত্বের সীমা কোথায়?
আর সবচেয়ে বড় কথা, চরম ঝুঁকিকে কি বিনোদন হিসাবে দেখানো উচিত?
এই প্রশ্নগুলির কোনো সহজ উত্তর নেই। কিন্তু তাইপেই ১০১-এ হনোল্ডের আরোহণের পর এটা স্পষ্ট—এই অভিযান শুধু একটি শারীরিক কীর্তি নয়, এটি আধুনিক সময়ে ঝুঁকি, নৈতিকতা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে একটি গভীর বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।
সমালোচনার জবাবে হনোল্ডের অবস্থান
লাইভ সম্প্রচার, চরম ঝুঁকি এবং পারিবারিক দায়িত্ব—এই তিনটি বিষয় ঘিরে ওঠা সমালোচনার জবাবে অ্যালেক্স হনোল্ড আত্মপক্ষ সমর্থনে আবেগ নয়, বরং যুক্তিকেই সামনে এনেছেন। তার বক্তব্যের মূল সুর ছিল একটাই—ফ্রি-সলো তার কাছে হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এটি দীর্ঘ প্রস্তুতি, সীমা বোঝা এবং সচেতন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ফল।
Alex Honnold বার বার বলেছেন, তিনি নিজেকে “ঝুঁকি-পাগল” হিসাবে দেখেন না। বরং উল্টাটা। তার ভাষায়, ফ্রি-সলো তখনই তিনি করেন, যখন কোনো রুট তার কাছে “পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে” আসে। তিনি জানান, তাইপেই ১০১-এ ওঠার আগে তিনি রুটটি বহুবার বিশ্লেষণ করেছেন—ভবনের গঠন, হাত-পা রাখার জায়গা, বাতাসের আচরণ, বিশ্রামের সম্ভাব্য পয়েন্ট—সবকিছু আগেভাগেই হিসাবের মধ্যে ছিল।
তার মতে, বাইরে থেকে যেটা মানুষের চোখে উন্মাদ ঝুঁকি বলে মনে হয়, ভেতর থেকে সেটি তার কাছে ছিল পরিকল্পিত ও মাপা সিদ্ধান্ত।
সমালোচকেরা যখন ফ্রি-সলোতে মৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরেন, হনোল্ড সেখানেও এক ধরনের পার্থক্য টানেন। তিনি বলেন, সব ফ্রি-সলো এক রকম নয়। বহু দুর্ঘটনা ঘটে এমন লোকদের ক্ষেত্রে, যারা যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়াই নিজেদের সীমা ছাড়িয়ে যেতে চায়। তার দাবি—নিজের ক্ষেত্রে তিনি কখনোই “এজ”-এ গিয়ে দাঁড়ান না। বরং তিনি এমন রুট বেছে নেন, যেখানে মানসিক চাপ কম, চলাচল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত।
পারিবারিক দায়িত্ব নিয়ে ওঠা প্রশ্নেও হনোল্ড সরাসরি কথা বলেন। স্ত্রী ও সন্তানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাবা হওয়ার পর তার ঝুঁকি নেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। এখন তিনি আগের চেয়ে বেশি হিসাবি, বেশি সতর্ক।

তার ভাষায়, “আমি যদি মনে করতাম এই আরোহণে সত্যিই অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকি আছে, আমি করতাম না। আমি আমার পরিবারকে ভালবাসি, আর ঠিক সেই কারণেই আমি এমন কিছু করি না যা আমি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না বলে বিশ্বাস করি।”
লাইভ সম্প্রচার নিয়ে সমালোচনার জবাবে হনোল্ডের অবস্থান আরও পরিষ্কার। তিনি বলেন, এই অনুষ্ঠানটির উদ্দেশ্য কখনোই মানুষকে ফ্রি-সলোতে ঝাঁপিয়ে পড়তে উসকানি দেওয়া নয়। বরং তিনি বার বার জোর দিয়েছেন—ফ্রি-সলো সবার জন্য নয় এবং এটি অনুকরণযোগ্য কিছু হিসাবে দেখানো উচিত নয়।
তার মতে, এই আরোহণ দেখানোর মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের সামনে মানবিক সীমা, মনোসংযম ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির গল্প তুলে ধরা—“আজই উঠে পড়ো আর ঝুঁকি নাও”—এই বার্তা নয়।
হনোল্ড আরও বলেন, ভয়ের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। তিনি ভয়কে অস্বীকার করেন না, আবার ভয়ের হাতে নিজেকে ছেড়েও দেন না। তার মতে, ভয়কে বুঝে নেওয়া, তাকে বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োজনে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই আসল দক্ষতা।
তিনি মনে করিয়ে দেন—ফ্রি-সলোতে তিনি বহুবার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন, মাঝপথে থেমেছেন, বা পুরাপুরি ফিরে এসেছেন। তাইপেই ১০১-এর ক্ষেত্রেও আবহাওয়ার কারণে একদিন পিছিয়ে যাওয়াই তার প্রমাণ।
সবশেষে হনোল্ডের অবস্থান দাঁড়ায় একটি স্পষ্ট লাইনে—এই আরোহণ কোনো বেপরোয়া প্রদর্শনী নয়, বরং নিজের সীমা জানা একজন মানুষের সচেতন সিদ্ধান্ত।
সমালোচকদের বক্তব্য তিনি অস্বীকার করেন না, কিন্তু তার যুক্তি হল—ঝুঁকি একেবারে শূন্য করা যায় না; প্রশ্ন হল, সেই ঝুঁকি কে কীভাবে বোঝে, মাপে এবং নিয়ন্ত্রণ করে।
এই অবস্থান অনেককে সন্তুষ্ট করেছে, আবার অনেকের প্রশ্ন রয়ে গেছে। কিন্তু এটুকু পরিষ্কার—হনোল্ড এই বিতর্ক থেকে পালাননি। বরং তিনি দেখাতে চেয়েছেন, সাহস মানে অন্ধ লাফ নয়; সাহস মানে কখন এগোতে হবে, আর কখন থামতে হবে—সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব
অ্যালেক্স হনোল্ডের এই দুঃসাহসিক আরোহণ শুধু ক্রীড়া বা বিনোদনের ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি তাইওয়ানের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতেও স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে। দেশটির শীর্ষ রাজনীতিকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে হনোল্ড ও নেটফ্লিক্সকে ধন্যবাদ জানান—তাইওয়ানকে বিশ্বমঞ্চে নতুনভাবে তুলে ধরার জন্য।
সাধারণত আন্তর্জাতিক সংবাদে তাইওয়ানের নাম আসে দুটি প্রসঙ্গে—একদিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ক্ষমতা, অন্যদিকে চীনের পক্ষ থেকে আসা সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ।
এই দুটি বিষয়ই তাইওয়ানকে বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে, কিন্তু একই সঙ্গে দেশটির পরিচয়কে সংকীর্ণ করে ফেলে—যেন তাইওয়ান মানেই শুধু প্রযুক্তি আর ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা।
হনোল্ডের তাইপেই ১০১ আরোহণ সেই চেনা বৃত্ত ভেঙে দেয়। হঠাৎ করেই বিশ্ব তাইওয়ানকে দেখে সাহস, মানবিকতা, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির দেশ হিসাবে।
এই প্রেক্ষাপটে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে নিজের ফেসবুক পেজে লেখেন, “চ্যালেঞ্জটি সম্পন্ন করার জন্য সাহসী ও নির্ভীক অ্যালেক্সকে অভিনন্দন।”
এই ছোট বাক্যের মধ্যেই রাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে যায়। এটি শুধু একজন ক্রীড়াবিদের প্রশংসা নয়; এটি ছিল তাইওয়ানের পক্ষ থেকে একটি কৌশলগত বার্তা—তাইওয়ান নিজেকে একটি উন্মুক্ত, ইতিবাচক ও বিশ্বমুখী দেশ হিসেবে দেখতে চায়।
প্রেসিডেন্ট লাই আরও উল্লেখ করেন, নেটফ্লিক্সের লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে বিশ্ব শুধু একটি সুউচ্চ ভবন দেখেনি। তার ভাষায়—“নেটফ্লিক্সের লাইভ সম্প্রচার ক্যামেরার মাধ্যমে বিশ্ব শুধু তাইপেই ১০১ দেখেনি—তারা তাইওয়ানের মানুষের উষ্ণতা ও আবেগও দেখেছে, এবং এই ভূখণ্ডের সুন্দর পাহাড় ও প্রাকৃতিক দৃশ্যও দেখেছে।”
এই মন্তব্যের মধ্যে একটি গভীর সাংস্কৃতিক বার্তা লুকিয়ে আছে। আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি কেবল কূটনীতি বা অর্থনীতির মাধ্যমে তৈরি হয় না—সংস্কৃতি, গল্প আর দৃশ্যও সেখানে বড় ভূমিকা রাখে। হনোল্ডের আরোহণ তাইওয়ানকে এমন এক গল্প বলার সুযোগ দিয়েছে, যেখানে ভয় বা সংঘাত নয়, বরং মানবিক সাহস ও সৌন্দর্য সামনে এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক তাইওয়ানিজ নাগরিকও এই ঘটনাকে “সফট পাওয়ার মুহূর্ত” হিসাবে বর্ণনা করেন। তাদের মতে, এই সম্প্রচার তাইওয়ানকে এমন মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, যারা হয়ত আগে কখনও দেশটি সম্পর্কে আগ্রহী ছিলেন না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, তাইপেই ১০১-এ হনোল্ডের আরোহণ তাইওয়ানের জন্য শুধু একটি আলোচিত ইভেন্ট নয়—এটি ছিল এক ধরনের ইমেজ রি-ফ্রেমিং।
একটি ছোট দ্বীপদেশ কীভাবে সাহস, সৌন্দর্য আর উন্মুক্ততার গল্প দিয়ে বিশ্বকে নিজের দিকে তাকাতে বাধ্য করতে পারে—এই ঘটনা তার একটি শক্ত উদাহরণ হয়ে থাকবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি সম্প্রচারিত দুঃসাহসিক কীর্তির দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে—১৯৭০-এর দশকে ইভেল নিভেলের মোটরসাইকেল জাম্প থেকে শুরু করে আধুনিক কালে রেড বুলের রেকর্ড ভাঙার প্রচেষ্টা পর্যন্ত।
হনোল্ড তাইপেই ১০১ ভবন আরোহণ করা প্রথম ব্যক্তি নন, তবে রশি ছাড়া এটি করার ক্ষেত্রে তিনি প্রথম। ফ্রান্সের অ্যালাঁ রবার্ট ২০০৪ সালের বড়দিনে ভবনটির গ্র্যান্ড ওপেনিং উপলক্ষে এটি আরোহণ করেছিলেন। সে সময় ভবনটি ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন।
রবার্ট, যিনি সিএনএনের জন্য হনোল্ডের আরোহণ কভার করছিলেন, রোববার তাকে অভিনন্দন জানান এবং বলেন, তিনি বুঝতে পারছেন হনোল্ড কী অনুভব করছেন। “আমার জন্য এটা ছিল অবিশ্বাস্য অনুভূতি। যদিও আমি নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলিনি, কারণ আমার সঙ্গে রশি ছিল, তবু আবহাওয়ার অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে আমার চার ঘণ্টা লেগেছিল।”
তিনি আরও বলেন, “আমি অ্যালেক্সকে চিনি, পুরো সময় জুড়ে আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম… আমি একেবারেই চিন্তিত হইনি।”
ভবনের বিশেষত্ব
তাইপেই শহরের আকাশরেখায় আধিপত্য বিস্তার করা এবং একটি প্রধান পর্যটন আকর্ষণ হিসাবে পরিচিত তাইপেই ১০১ ভবনটি ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন ছিল, পরে দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা সেটিকে ছাড়িয়ে যায়।
দর্শকদের করতালির মধ্যে আরোহণ করা হনোল্ডের জন্য কিছুটা অস্বাভাবিক এবং শুরুতে একটু অস্বস্তিকরও ছিল, কারণ তার বেশিরভাগ আরোহণই সাধারণত নির্জন এলাকায় হয়ে থাকে।
তিনি বলেন, “যখন আমি মাটি ছাড়ছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল—’ওহ, ব্যাপারটা একটু তীব্র, এত মানুষ দেখছে’।”
তিনি আরও বলেন, “কিন্তু সত্যি বলতে, ওরা সবাই আমার মঙ্গলই কামনা করছিল। আসলে এতে পুরো অভিজ্ঞতাটাই প্রায় উৎসবের মত মনে হচ্ছিল—এত ভাল মানুষ সমর্থন দিচ্ছে, আনন্দ করছে।”
ভবনটিতে মোট ১০১টি তলা রয়েছে। সবচেয়ে কঠিন অংশ ছিল মাঝখানের ৬৪ তলা—যেগুলি ‘বাঁশের বাক্স’ নামে পরিচিত এবং ভবনটির স্বতন্ত্র নকশার জন্য দায়ী। আটটি ভাগে বিভক্ত এই অংশে প্রতিটি ভাগে রয়েছে আট তলা খাড়া ও বাইরে ঝুলে থাকা আরোহণ পথ, যার পর রয়েছে বারান্দা—যেখানে উপরে ওঠার পথে তিনি অল্প সময়ের জন্য বিশ্রাম নেন।
হনোল্ডের এই অর্জন শুধুমাত্র একটি ক্রীড়া কীর্তি নয়, বরং মানুষের সাহস, প্রস্তুতি এবং স্বপ্ন অনুসরণের একটি জীবন্ত উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে—যা লক্ষ লক্ষ মানুষকে তাদের নিজেদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অনুপ্রাণিত করবে।

