বৈশ্বিক কনগ্লোমারেট আল হাবতুর গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান খালাফ আহমাদ আল হাবতুর মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী হিসাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে সমগ্র অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলার জন্য তিনি ট্রাম্পকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। ওই অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হন। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালায়—এই পাঁচটি দেশেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
সাম্প্রতিক ডেস্ক
আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান মোট ১৮৯টি ব্যালিস্টিক মিসাইল, ৯৪১টি ড্রোন এবং ৩টি ক্রুজ মিসাইল ছুড়েছিল—অধিকাংশই আকাশে ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ভূপাতিত মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ আবুধাবি ও দুবাইয়ে আছড়ে পড়ে ৩ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন।
এই হামলার পাঁচদিন পর, ৫ মার্চ, দুবাইয়ের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী খালাফ আহমাদ আল হাবতুর ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে সরাসরি ট্রাম্পের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি পোস্ট করেন। উপসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ যেখানে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত, সেখানে একজন শীর্ষ ব্যবসায়ীর এই মাত্রার সরাসরি সমালোচনা—মিডল ইস্ট আই-এর ভাষায়—’অভূতপূর্ব’।
হাবতুরের চিঠি: কী বললেন, কীভাবে
চিঠির শুরুতেই হাবতুর প্রশ্ন ছুড়ে দেন—”আপনাকে কে অনুমতি দিয়েছে আমাদের অঞ্চলকে ইরানের সাথে যুদ্ধের ময়দানে পরিণত করতে? এবং কোন ভিত্তিতে আপনি এই বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নিলেন?” আল-মনিটর জানাচ্ছে, চিঠিতে তিনি আরও লেখেন, “ট্রিগার টানার আগে কি আপনি হিসাব করেছিলেন, নিরীহ মানুষের কত প্রাণ যাবে? ভেবেছিলেন কি, এই উত্তেজনায় সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই অঞ্চলের দেশগুলিই?”

চিঠিতে হাবতুর স্পষ্ট করেন, তিনি আমিরাতের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কিত নন। তার ক্ষোভ অন্যত্র—”আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ, আমরা শক্তিশালী, আমাদের সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা আছে, আমাদের মাতৃভূমি রক্ষা করার সক্ষমতা আছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়: আপনাকে কে অনুমতি দিয়েছে আমাদের অঞ্চলকে যুদ্ধের ময়দানে পরিণত করতে?”
প্রতিক্রিয়া: আরব বিশ্ব ও যুক্তরাষ্ট্রে
চিঠিটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আরব সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। উপসাগরীয় সোশ্যাল মিডিয়া ইউজাররা পোস্টটি হাজার হাজার বার শেয়ার করেন। অনেকে লেখেন, হাবতুর যা বলেছেন তা তাদের মনের কথা—কিন্তু বলার সাহস ছিল না। আরব মিডিয়ায়, বিশেষত মিডল ইস্ট আই ও আল-মনিটরে, চিঠিটিকে বর্ণনা করা হয় ‘অভূতপূর্ব’ হিসাবে—কারণ উপসাগরীয় একজন শীর্ষ ব্যবসায়ী এই মাত্রায় প্রকাশ্যে ওয়াশিংটনের সমালোচনা করেছেন, এটা আগে দেখা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রেও চিঠিটি নজর এড়ায়নি। সিএনএন তাদের আন্তর্জাতিক সম্প্রচারে চিঠিটি নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন করে, যেখানে হোয়াইট হাউসের সিনিয়র রিপোর্টার কেভিন লিপটাক বিশ্লেষণ করেন, উপসাগরীয় মিত্ররা এই যুদ্ধকে কীভাবে দেখছে। সিএনএন এও জানায়, ট্রাম্প ইরান অভিযান নিয়ে আমেরিকান জনগণকে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য ক্রমবর্ধমান চাপে পড়ছেন। হোয়াইট হাউস অবশ্য হাবতুরের চিঠির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
মূল অভিযোগসমূহ
হাবতুরের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ট্রাম্পের ‘বোর্ড অফ পিস’ তহবিল নিয়ে। উপসাগরীয় দেশগুলি ‘স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের’ প্রতিশ্রুতিতে এই উদ্যোগে কোটি কোটি ডলার ঢেলেছিল। হাবতুর জানতে চান, সেই টাকার গন্তব্য কোথায়—শান্তির উদ্যোগে, নাকি এই যুদ্ধের অর্থায়নে?
প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগও কম নয়। হাবতুর মনে করিয়ে দেন, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে এরই মধ্যে সোমালিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, নাইজেরিয়া, সিরিয়া, ইরান ও ভেনিজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ করেছেন। নতুন যুদ্ধে না জড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন, সাতটি দেশ তার প্রমাণ দেয় না।
হাবতুর আরও প্রশ্ন তোলেন নেপথ্যের কারিগর নিয়ে—এই যুদ্ধ কি সত্যিই ট্রাম্পের একার সিদ্ধান্ত, নাকি এর পেছনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর চাপ কাজ করেছে? একই সঙ্গে তিনি জানান, ঘরেও ট্রাম্পের অবস্থান নড়বড়ে—৪০০ দিনে অ্যাপ্রুভাল রেটিং প্রায় ৯% কমেছে এবং ২০২৫ সালের মার্চের শেষ থেকে তা নেতিবাচক অবস্থানেই আছে।
আমিরাত সরকারের অবস্থান: হাবতুর বনাম রাষ্ট্র
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট করা দরকার। হাবতুর একজন ব্যক্তি ব্যবসায়ী—আমিরাত সরকারের মুখপাত্র নন। মিডল ইস্ট আই লিখেছে: আমিরাতে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। এই প্রেক্ষাপটে তার সমালোচনা অস্বাভাবিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ।
আমিরাতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিম বিনত ইব্রাহিম আল হাশিমি ইউরোনিউজকে বলেছেন, আমিরাত “সামরিক সমাধানে বিশ্বাস করে না।” তিনি সবাইকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ইরানের হামলাকে “জাতীয় সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন” বলে নিন্দা করেছেন। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমিরাত ইতিমধ্যে ইসরায়েল থেকে তার রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করেছে।
হোয়াইট হাউস হাবতুরের চিঠির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: উপসাগরীয় দ্বিধাদ্বন্দ্ব
উপসাগরীয় দেশগুলি একটি কঠিন অবস্থানে আটকা পড়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব—অন্যদিকে ইরানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা। এই যুদ্ধ তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সংঘাতে টেনে এনেছে।
কার্নেগি এন্ডাউমেন্টের মার্চ ২০২৬-এর বিশ্লেষণ বলছে—গালফ রাজতন্ত্রগুলি ইরানের প্রতিশোধ ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সিদ্ধান্তের মাঝে আটকে গেছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক এরিক আলটারের মতে, এই সংঘাত আমিরাতকে মার্কিন ও ইসরায়েলি অবস্থানের আরও কাছে ঠেলে দিচ্ছে—যা আবুধাবির কাম্য নয়।
কে এই হাবতুর?
খালাফ আহমাদ আল হাবতুর ১৯৪৯ সালে দুবাইয়ের শিন্দাঘা এলাকায় একটি সাধারণ পরিবারে জন্ম নেন। বাবা ছিলেন মুক্তা ও সোনার ব্যবসায়ী, কিন্তু জাপানি কৃত্রিম মুক্তার আগমনে সেই ব্যবসা ভেঙে পড়লে পরিবারটি চরম আর্থিক কষ্টে পড়ে। তিন থেকে সাত বছর বয়স পর্যন্ত তিনি পরিবারের সাথে শারজাহর বন্দর এলাকা আল-লাইয়াহ গ্রামে কাটান—সেখানে স্থানীয় জেলেরা উদ্বৃত্ত মাছ দিয়ে যেত, সেটাই ছিল খাবারের ভরসা। বাবা সেই কঠিন দিনগুলিতেও ছেলেকে ব্যবসার মূল বিষয়গুলি শেখাতেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে একটি নির্মাণ কোম্পানিতে যোগ দেন, দ্রুতই কোম্পানির সর্বকনিষ্ঠ ম্যানেজার হন। সপ্তম শ্রেণির বেশি পড়াশোনা হয়নি তার।
১৯৭০ সালে ২১ বছর বয়সে নিজের উদ্যোগে ‘আল হাবতুর ইঞ্জিনিয়ারিং’ প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় দুবাইয়ে তেল আবিষ্কারের পর দেশ গড়ার উন্মাদনা শুরু হয়েছে, কিন্তু হাবতুরের হাতে পুঁজি নেই বললেই চলে। প্রথম বড় সুযোগ আসে ১৯৭৭ সালে—দুবাইয়ের শাসক শেখ রাশিদ তাকে দেশের দ্বিতীয় হাসপাতাল নির্মাণের কাজ দেন। সেটাই ভিত্তি। পরের দশকে একের পর এক সরকারি প্রকল্প—হাসপাতাল, বিমানবন্দর, শপিং মল। ১৯৭৯ সালে শেখ জায়েদ রোডের প্রায় নির্জন একটি প্রান্তে খুললেন প্রথম হোটেল, মেট্রোপলিটান। চারপাশের লোকেরা বলল, “মরুভূমিতে হোটেল করছো, কে আসবে?” হাবতুর বললেন, দুবাই এদিকেই আসবে। তিনি ঠিকই ছিলেন—সেই রাস্তা পরে হয়ে উঠল দুবাইয়ের প্রধান বাণিজ্যিক মেরুদণ্ড।
১৯৯৯ সালে তার কোম্পানি বানাল বিশ্বখ্যাত পালতোলা জাহাজের আকৃতির বুর্জ আল আরব। খালেজ টাইমস জানাচ্ছে, ২০০৭ সালে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৫% শেয়ার অস্ট্রেলিয়ার লেইটন হোল্ডিংসের কাছে প্রায় ৮৯৬ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করেন। ব্যক্তিগতভাবে তার পকেটে ঢোকে ৩৬৪ মিলিয়ন ডলার—এককালীন। সেই পুঁজি ঢালেন হোটেল ও রিয়েল এস্টেটে। আজ আল হাবতুর গ্রুপের বার্ষিক রাজস্ব প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার, কর্মী প্রায় ১০ হাজার। ফোর্বস ২০২৬ র্যাঙ্কিংয়ে তার নিট সম্পদ প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলার।
ব্যক্তিজীবনেও হাবতুর একটি আলাদা অধ্যায়। ১৬ বছর বয়সে চাচাতো বোন হামদাকে বিয়ে করেন, তাদের ছয় সন্তান। ছেলে মোহাম্মদের গল্পটা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—যুক্তরাষ্ট্রে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ে ফিরে বাবার হোটেলে পোর্টার হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন, এমনকি দুবার বরখাস্তও হয়েছিলেন। সেই মোহাম্মদই এখন গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান ও সিইও। দ্য ন্যাশনালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাবতুর বলেছিলেন, “আমার নাতি-নাতনিরাই আমার জ্বালানি, আমার অক্সিজেন।”
আল হাবতুর গ্রুপের অধীনে রয়েছে ১৪টি বিলাসবহুল হোটেল (ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টোরিয়া, সেন্ট রেজিস-সহ), শপিং মল, নির্মাণ, বেন্টলি-ম্যাকলারেন-বুগাটির মত বিলাসবহুল গাড়ির ডিলারশিপ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তার জনকল্যাণমূলক ফাউন্ডেশনে গ্রুপের ২০% শেয়ার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ব্যক্তিগত আগ্রহের দিক থেকে হাবতুর এবং তার পরিবার পোলোকে কেন্দ্র করে একটি আলাদা জগৎ তৈরি করেছেন। দ্য ন্যাশনাল জানাচ্ছে, ছেলে রাশিদের ভাষায় পোলো তাদের পরিবারের কাছে “খাওয়া বা ঘুমানোর মতই”—একটি নেশা। ২০১৬ সালে দুবাইল্যান্ডে ৬০ লাখ বর্গফুটের আল হাবতুর পোলো ক্লাব গড়ে তোলেন, যেখানে ৫২০টি ঘোড়ার আস্তাবল, চারটি পোলো মাঠ এবং একটি আন্তর্জাতিক মানের পোলো অ্যাকাডেমি রয়েছে।

রাজনীতি ও সংস্কৃতির বাইরেও তার একটি গভীর সামাজিক অবস্থান আছে। এই বছরের জানুয়ারিতে, অর্থাৎ ইরান যুদ্ধের মাত্র দেড় মাস আগে, তিনি দুবাইয়ে আল হাবতুর রিসার্চ সেন্টারের তৃতীয় বার্ষিকী অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, “আরবি ভাষা কোরআনের ভাষা, আমাদের পরিচয়ের মূল ভিত্তি।” গালফ নিউজ জানাচ্ছে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আরবি চর্চা বাড়ানো এবং গবেষণা ও একাডেমিক অঙ্গনে আরবির ব্যবহার নিশ্চিত করতে তিনি একটি বিশেষ পুরস্কার উদ্যোগও চালু করেছেন।
দ্য ন্যাশনাল তাকে বর্ণনা করেছে “স্পষ্টভাষী, কখনও বিতর্কিত”। ২০১৮ সালে প্রকাশিত তার আত্মজীবনীর ভূমিকা লিখেছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার—যা তার আন্তর্জাতিক প্রভাবের প্রমাণ। তবে বিতর্কও তার পিছু ছাড়েনি। ২০১৫ সালে তিনি দ্য ন্যাশনালে কলাম লিখে ট্রাম্পকে “নির্ভীক কর্মী” বলে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প মুসলিমদের প্রবেশ নিষেধের কথা বলতেই এনবিসি নিউজকে জানান, সমর্থন দিয়ে তিনি অনুতাপ করছেন—এবং সব ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করেন। ২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ডের পরপর ইসরায়েলি চ্যানেল ১৩-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “পৃথিবী থেকে সব সন্ত্রাসী মুছে ফেলার পক্ষে আমি।” হিজবুল্লাহকে সরাসরি নিশানা করা এই মন্তব্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছিল।
তারপর এলো ২০২৫ সালের অক্টোবর। গাজা যুদ্ধবিরতির পরপরই হাবতুর ট্রাম্পকে আরেকটি খোলা চিঠি লেখেন—এবার সমালোচনা নয়, প্রস্তাব নিয়ে। খালেজ টাইমস জানাচ্ছে, চিঠিতে তিনি ট্রাম্পকে “শান্তির কৌশলগত পছন্দে বিশ্বাসী” বলে প্রশংসা করেন এবং গাজা পুনর্নির্মাণে আল হাবতুর গ্রুপকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ চান। তিনদফা পরিকল্পনায় তিন বছরে দেড় লাখ আবাসন ইউনিট, শিল্প অঞ্চল এবং কর্মসংস্থান তৈরির রূপরেখা ছিল। চিঠির শেষে লিখেছিলেন, “নির্মাণই শান্তির সবচেয়ে মহৎ রূপ।” মাত্র পাঁচ মাস পরে সেই একই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে তার এই যুদ্ধবিরোধী চিঠি—দুটি মিলিয়ে পড়লে হাবতুরের হতাশার গভীরতাটা স্পষ্ট হয়। মিডল ইস্ট আই জানাচ্ছে, এর আগে তিনি কখনও ট্রাম্পের নীতির এই মাত্রায় সরাসরি সমালোচনা করেননি।
কেন তিনি এই চিঠি লিখলেন?
চিঠিটি প্রকাশের পর থেকে কূটনৈতিক মহল ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—একজন ব্যবসায়ী, যিনি দশকের পর দশক ধরে ক্ষমতার সাথে সতর্ক দূরত্ব বজায় রেখেছেন, তিনি হঠাৎ এত সরাসরি কেন? এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই। তিনটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা আছে, এবং তিনটিই একসাথে সত্য হতে পারে।

প্রথম ব্যাখ্যা: ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ। হাবতুরের আবুধাবি ও দুবাইয়ে কোটি কোটি ডলারের হোটেল ও রিয়েল এস্টেট আছে। ইরানের মিসাইল হামলা তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে সরাসরি হুমকিতে ফেলেছে। একই সঙ্গে, মাত্র পাঁচ মাস আগে গাজা পুনর্নির্মাণে তিনি ট্রাম্পের দরজায় কড়া নেড়েছিলেন—সেই বিনিয়োগের আশা এখন ধূলিসাৎ। এই দুটি ব্যক্তিগত ক্ষতির প্রেক্ষাপটে চিঠিটিকে নিছক রাগের বহিঃপ্রকাশ বলে পড়া যায়।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা: পুরোনো ট্রাম্প-সম্পর্কের ভার লাঘব। হাবতুর এর ট্রাম্প-যোগাযোগের ইতিহাসটা দীর্ঘ এবং বিতর্কিত। ২০০৮ সালে পাম জুমেইরাহতে ট্রাম্প টাওয়ার বানানোর চুক্তি, ২০১৫ সালে কলাম লিখে ট্রাম্পকে “নির্ভীক কর্মী” বলে সমর্থন—এই পরিচয় আরব বিশ্বে তার ভাবমূর্তিতে দাগ ফেলেছে। ২০১৫ সালে সম্পর্ক ছিন্ন করলেও অনেকের মনে প্রশ্ন থেকে গেছে: হাবতুর কি আসলেই ট্রাম্পের চরিত্র বুঝতে পারেননি, নাকি ব্যবসায়িক স্বার্থে জেনেশুনে সমর্থন দিয়েছিলেন?
এই প্রেক্ষাপটে মার্চের চিঠি তার জন্য একটি জনসম্পর্ক পুনরুদ্ধারের সুযোগ। এখন তিনি বলতে পারছেন—আমি একসময় চেষ্টা করেছিলাম শান্তির পথে কাজ করতে, গাজা পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছিলাম, কিন্তু ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বেছে নিলেন। আমি তার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছি। এই আখ্যানটি তাকে আরব জনমতে আবার বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে—এবং একই সঙ্গে পুরোনো সমালোচনার জবাবও দেয়। সহজ কথায়: এই চিঠি তার রাজনৈতিক পুনর্বাসনের হাতিয়ারও হতে পারে।
তৃতীয় ব্যাখ্যা: সরকারি বার্তাবাহক। এটি সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন। নিউ লাইনস ম্যাগাজিন জানাচ্ছে, চিঠিটি প্রকাশের পর সরাসরি প্রশ্ন উঠেছে যে এটি আমিরাত সরকার-অনুমোদিত কিনা। মিডল ইস্ট আই উল্লেখ করেছে, হাবতুর দুবাইয়ের শাসক মহলের ঘনিষ্ঠ, এবং আমিরাতে এই মাত্রার প্রকাশ্য সমালোচনা সরকারের অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়। যদি তাই হয়, তাহলে এই চিঠি আসলে আমিরাত সরকারের একটি কূটনৈতিক বার্তা—ওয়াশিংটনকে বলা হচ্ছে যে উপসাগরীয় মিত্ররা ক্ষুব্ধ, কিন্তু সরাসরি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বলা হচ্ছে না, যাতে সম্পর্ক ঠিক থাকে। ইরানের সাথে শত্রুতায় না জড়ানোর বার্তাও এতে নিহিত।
তিনটি ব্যাখ্যার মধ্যে সত্যটা সম্ভবত এই যে—হাবতুরের ব্যক্তিগত ক্ষোভ এবং সরকারের কৌশলগত স্বার্থ এবার একই দিকে মিলে গেছে। যা-ই হোক, চিঠিটির রাজনৈতিক ওজন অস্বীকার করার উপায় নেই।
মধ্যপ্রাচ্যে কি আমেরিকার যুগ শেষ হচ্ছে?
হাবতুরের চিঠিটিকে কি শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষোভ বলে পড়া যায়? সম্ভবত না। ফরেন পলিসি লিখেছে, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলি এই যুদ্ধ চায়নি, এতে জড়াতেও চায়নি—অথচ আমেরিকার সাথে মিত্রতাই তাদের ইরানের আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত করেছে। ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটর জানাচ্ছে, উপসাগরীয় দেশগুলি তুমুল চেষ্টা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সাথে আলোচনায় রাখতে। কিন্তু ওয়াশিংটন সেই পরামর্শ উপেক্ষা করেছে।
ফরেন পলিসির শিরোনাম সরাসরি বলছে: “ইরানের হামলা প্রমাণ করে দিল, আমেরিকা তার মিত্রদের রক্ষা করতে পারে না”। এই বাস্তবতায় হাবতুরের চিঠি একটি বড় প্রশ্ন তোলে—মধ্যপ্রাচ্যে সাত দশকের মার্কিন প্রভাব কি এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভাঙতে শুরু করেছে? যে অঞ্চলের নেতারা একসময় ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতেন না, সেখানে একজন শীর্ষ ব্যবসায়ী আজ সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করছেন—এই দৃশ্য আগে কেউ কল্পনাও করেননি।
দুবাইয়ের বিলিয়নিয়ার হাবতুরের ট্রাম্প-সমালোচনা — কে এই হাবতুর? কেন এই সমালোচনা?

