ওপেন ইউনিভার্সিটি ‘ancient Palestine’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে প্রো-ইসরায়েল লবি সংগঠনের কাছে নতি স্বীকার করেছে। এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করা অসম্ভব।

পশ্চিমা বিশ্ব এখন গত সাত দশকের মধ্যে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও একাডেমিক স্বাধীনতার ওপর সবচেয়ে গুরুতর আক্রমণের মুখে। ম্যাকার্থিজমের সময়ের পর এমন পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি। বহু বছর ধরে আমাদের বলা হয়েছে, বিপদ আসে বামপন্থীদের কাছ থেকে—অতিরিক্ত সংবেদনশীল শিক্ষার্থী, সেন্সরপ্রবণ কর্মী, ‘নো-প্ল্যাটফর্মিং’ সমর্থকরা নাকি বিতর্ক বন্ধ করে দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জনপরিসরের প্রতিষ্ঠানে বক্তব্য নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে জোরালো ও কার্যকর প্রচার চালাচ্ছে এমন একটি রাষ্ট্রের সমর্থকেরা, যে রাষ্ট্র বর্তমানে গণহত্যা চালাচ্ছে।


ওরিড অ্যাবাউট ফ্রিডম অব স্পিচ? দেন হোয়াটস হ্যাপেনিং অ্যাট দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটি শুড টেরিফাই ইউ

ওয়েন জোনস
দ্য গার্ডিয়ান, মার্চ ২, ২০২৬


একটি সাম্প্রতিক ঘটনার দিকে তাকাই। গত ডিসেম্বরে প্রো-ইসরায়েল লবি সংগঠন ইউকে লয়ার্স ফর ইসরায়েল (UKLFI) একটি নতুন সাফল্য উদ্‌যাপন করে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য হল—যুক্তরাজ্যে ইসরায়েলের পক্ষে সহায়ক জনমত গড়ে তোলা। তারা আইনজীবী হিসাবে সেই পরিবেশ তৈরি করতে চায়। বাস্তবে তারা আইনকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে। শুধু প্রো-প্যালেস্টাইন আন্দোলনের বিরুদ্ধে নয়, বরং ফিলিস্তিনি পরিচয়ের প্রকাশ্য অস্তিত্বের বিরুদ্ধেও তারা পদক্ষেপ নিয়েছে।

এইবার ‘অপরাধ’ ছিল একটি শব্দ। দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটি ভার্জিন মেরির জন্মস্থান বোঝাতে “প্রাচীন প্যালেস্টাইন” শব্দটি ব্যবহার করেছিল। UKLFI দাবি করে, এটি “ঐতিহাসিকভাবে ভুল”। তারা আরও বলে, এই শব্দ ব্যবহার করলে “ইহুদি ঐতিহাসিক পরিচয়” মুছে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এমনকি তারা যুক্তি দেয়, এটি ২০১০ সালের ইকুয়ালিটি অ্যাক্ট লঙ্ঘন করতে পারে। কারণ এতে ইহুদি ও ইসরায়েলি শিক্ষার্থীদের জন্য “শত্রুতাপূর্ণ বা অপমানজনক পরিবেশ” তৈরি হতে পারে।


দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটি (OU) যুক্তরাজ্যের একটি সরকারি গবেষণাধর্মী বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীসংখ্যার দিক থেকে এটি দেশটির সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ স্নাতক শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যেই থাকেন এবং মূলত ক্যাম্পাসে না গিয়েই পড়াশোনা করেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর—দুই স্তরের বহু কোর্সই বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে করা যায়।

তবে মিল্টন কেইন্সের বাকিংহামশায়ারে অবস্থিত ওয়ালটন হলের ৪৫ হেক্টর (১১০ একর) ক্যাম্পাসে কিছু পূর্ণকালীন স্নাতকোত্তর গবেষক সরাসরি অবস্থান করে গবেষণা করেন। সেখানে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-সংক্রান্ত সুবিধা ব্যবহার করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এক হাজারের বেশি একাডেমিক ও গবেষণা-সংশ্লিষ্ট কর্মী এবং আড়াই হাজারেরও বেশি প্রশাসনিক ও সহায়ক কর্মী কাজ করেন।


ওপেন ইউনিভার্সিটির প্যালেস্টাইন সলিডারিটি গ্রুপ একটি তথ্য অধিকার আবেদন করে জানতে চায়, বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে অভিযোগটি সামলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জবাব ছিল পরিষ্কার। তারা জানায়, “প্রাচীন প্যালেস্টাইন” শব্দটি একাডেমিকভাবে সঠিক। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাসও ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। তিনি যে অঞ্চল বোঝাতেন, তা UKLFI স্বীকার করা এলাকার চেয়েও বড় ছিল। লবি সংগঠনটি বলেছিল, মেরির জন্ম “প্রধানত ইহুদি অধ্যুষিত” (predominantly Jewish region) গালিলিতে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, মেরি আদৌ ছিলেন কিনা—এ নিয়েই একাডেমিক ঐকমত্য নেই। তিনি কোথায় জন্মেছিলেন, তা তো আরও অনিশ্চিত।

এতেই বিষয়টির শেষ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, “রোমান ঔপনিবেশিক শাসন” এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে এই শব্দটির যোগ আছে। তাই বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের কাছে এর অর্থ নিয়ে ভাবতে হবে। তারা আরও বলে, একাডেমিকরা চান না এই শব্দের ব্যবহারকে ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাত সম্পর্কে কোনো মন্তব্য হিসাবে ধরা হোক। UKLFI-এর অভিযোগের জবাবে কর্মীরা স্বীকার করেন, “শব্দটি এখন এমনভাবে সমস্যাজনক হয়ে উঠেছে, যেভাবে ২০১৮ সালে উপকরণ লেখা হয়েছিল তখন ছিল না।”

ফলে, ঐতিহাসিকভাবে শব্দটি সঠিক বলেও বিশ্ববিদ্যালয় সিদ্ধান্ত নেয়, ভবিষ্যতের কোনো কোর্সে “প্রাচীন প্যালেস্টাইন” শব্দটি ব্যবহার করা হবে না। বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যমান উপকরণে এর ব্যবহার ব্যাখ্যা ও প্রাসঙ্গিক করে দেওয়া হবে। গত মাসে কর্মীরা একটি অভ্যন্তরীণ নোটিশ পান। সেখানে জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয় “প্রাচীন প্যালেস্টাইন”-এর উল্লেখ পরিবর্তনে সম্মত হয়েছে। সঙ্গে UKLFI-এর একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির লিংকও ছিল, যেখানে তারা নিজেদের হস্তক্ষেপের সাফল্য ঘোষণা করেছে।

সরল ভাষায় বললে, ঘটনা পরিষ্কার। একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্বীকার করেছে যে ঐতিহাসিকভাবে সঠিক একটি শব্দ তারা ভবিষ্যতে ব্যবহার করবে না। কারণ একটি পক্ষপাতদুষ্ট লবি সংগঠন এর রাজনৈতিক অর্থ নিয়ে আপত্তি তুলেছে। ইতিহাসবিদ রশিদ খালিদি বলেন, “এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লোকদের দ্বারা একাডেমিক পরিভাষা নিয়ন্ত্রণের নিন্দনীয় চেষ্টা।” তিনি উল্লেখ করেন, প্রাচীন ইতিহাস থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রায় সব সম্মানজনক ইতিহাসগ্রন্থেই ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এমনকি বহু বিশিষ্ট ইসরায়েলি গবেষকও এই শব্দ ব্যবহার করেছেন।

ইতিহাসবিদ রশিদ খালিদি বলেন, “এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লোকদের দ্বারা একাডেমিক পরিভাষা নিয়ন্ত্রণের নিন্দনীয় চেষ্টা।” তিনি উল্লেখ করেন, প্রাচীন ইতিহাস থেকে বর্তমান পর্যন্ত প্রায় সব সম্মানজনক ইতিহাসগ্রন্থেই ‘প্যালেস্টাইন’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।

এখানে আসে ২০২৩ সালের হায়ার এডুকেশন (ফ্রিডম অব স্পিচ) অ্যাক্ট। আগের কনজারভেটিভ সরকার এটি চালু করেছিল। তখন বলা হয়েছিল, বামপন্থী কর্মীরা নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্ত বিতর্ক দমিয়ে দিচ্ছে। এই আইন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে বৈধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেয়। এমনকি সেই বক্তব্য কারও কাছে “অপমানজনক বা কষ্টদায়ক” হলেও।

ওপেন ইউনিভার্সিটি তখন জটিল পরিস্থিতিতে পড়ে। প্যালেস্টাইন সলিডারিটি গ্রুপ যুক্তি দেয়, একাডেমিকভাবে সঠিক একটি শব্দকে রাজনৈতিকভাবে “সমস্যাজনক” বলে বাদ দেওয়া ২০২৩ সালের আইনের বিরুদ্ধে যায়। এরপর উপাচার্য একটি ব্যাখ্যামূলক নোট দেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক স্বাধীনতার পক্ষেই আছে। শব্দটি ব্যবহার চালু থাকবে। তবে শিক্ষার্থীদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বোঝাতে একটি অতিরিক্ত প্রাসঙ্গিক নোট যোগ করা হবে। তিনি বলেননি, এই পরিবর্তন কোনো লবি সংগঠনের চাপের কারণে হয়েছে কিনা।

আমার প্রশ্নের জবাবে বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, বিতর্কটি কেবল একটি নির্দিষ্ট মডিউলকে ঘিরে। একাডেমিক দল পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, “প্রাচীন প্যালেস্টাইন” শব্দটি একাডেমিকভাবে সঠিক। তাই মূল শব্দে পরিবর্তন আনা হবে না, শুধু একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যামূলক নোট যোগ করা হবে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা বলে, UKLFI–এর কাছে দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করা হয়নি। সেখানে “ভবিষ্যতের যেকোনো কোর্স উপকরণ”-এর কথা বলা ছিল। তারা আরও দাবি করে, “কোনো বাহ্যিক সংগঠন আমাদের পাঠ্যবস্তুর বিষয়বস্তু ঠিক করে না।” তাদের এই বক্তব্য ও আগের প্রতিশ্রুতির মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন।

এটি UKLFI–এর কার্যকলাপের মাত্র একটি উদাহরণ। ইসরায়েলের গণহত্যা শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে, চেলসি অ্যান্ড ওয়েস্টমিনস্টার হাসপাতাল ফিলিস্তিনি শিশুদের আঁকা ছবি সরিয়ে দেয়। UKLFI অভিযোগ করেছিল, এগুলি ইহুদি রোগীদের “অরক্ষিত, হয়রানির শিকার ও ভিক্টিম” মনে করাতে পারে। ২০২৪ সালে লন্ডনের মরলি কলেজে একটি প্রো-প্যালেস্টাইন কনসার্ট তাদের অভিযোগের পর বাতিল হয়। তারা স্কটল্যান্ডে ‘ফালাস্তিন’ চলচ্চিত্র উৎসব বন্ধ করার চেষ্টাও করে।

ইসরায়েলের গণহত্যা শুরু হওয়ার কয়েক মাস আগে, চেলসি অ্যান্ড ওয়েস্টমিনস্টার হাসপাতাল ফিলিস্তিনি শিশুদের আঁকা ছবি সরিয়ে দেয়। UKLFI অভিযোগ করেছিল, এগুলি ইহুদি রোগীদের “অরক্ষিত, হয়রানির শিকার ও ভিক্টিম” মনে করাতে পারে।

এখন সলিসিটরস রেগুলেশন অথরিটি একটি অভিযোগ তদন্ত করছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, UKLFI–এর আটটি চিঠি ছিল “বিরক্তিকর ও আইনগতভাবে ভিত্তিহীন”। এগুলির উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনপন্থী সংহতির প্রচেষ্টাকে চুপ করানো ও ভয় দেখানো। তদন্তের ফল যাই হোক, বড় প্রেক্ষাপট স্পষ্ট।

আটলান্টিকের ওপারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বিরুদ্ধে মামলা করছেন। তিনি তাদের তহবিল কমিয়ে দিচ্ছেন। তার দাবি, তারা ক্যাম্পাসে ইহুদিবিদ্বেষ ছড়াতে দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর সূত্রপাত হয়েছে প্রো-প্যালেস্টাইন আন্দোলন থেকে। অনেক ইহুদি শিক্ষার্থীও এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন বা সমর্থন করেছেন। তার প্রশাসন গণহত্যার বিরোধিতা করা শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের চেষ্টাও করেছে।

পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশকারীদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ চাকরি হারিয়েছেন। কেউ পুলিশি প্রহারে আহত হয়েছেন। কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। ব্রিটেনে সরকার সরাসরি অ্যাকশন গ্রুপ প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। পরে হাইকোর্ট সেই নিষেধাজ্ঞা বেআইনি বলে রায় দেয়। এর মধ্যে প্রায় ৩,০০০ মানুষ সমর্থনসূচক প্ল্যাকার্ড ধরার কারণে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

এটাই পশ্চিমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রকৃত সংকট। এখানে শুধু প্রতিবাদ দমন করা হচ্ছে না। একটি জনগোষ্ঠীকেই লক্ষ্য করা হচ্ছে। ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের একটি সমাজ হিসাবে মুছে ফেলতে চায়। আগে তাদের বর্তমান ধ্বংস করা হয়। তারপর তাদের অতীত থেকেও মুছে ফেলা হয়।

ওয়েন জোনস (জন্ম ১৯৮৪)

লেখক পরিচিতি
ওয়েন জোনস যুক্তরাজ্যের একজন বামপন্থী সাংবাদিক, লেখক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক কর্মী। তিনি শেফিল্ডে জন্মগ্রহণ করেন এবং স্টকপোর্টে বড় হন। ২০০৫ সালে তিনি অক্সফোর্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ থেকে ইতিহাস বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

গণমাধ্যমে কাজ শুরু করার আগে তিনি ট্রেড ইউনিয়ন ও সংসদীয় গবেষক হিসাবে কাজ করেন। সেই অভিজ্ঞতা তার লেখালেখি ও রাজনৈতিক অবস্থানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের সমস্যা, সমাজতন্ত্র এবং বামপন্থী রাজনীতির ওপর তার মনোযোগ গড়ে ওঠে এই সময় থেকেই।

তিনি দ্য গার্ডিয়ান-এ নিয়মিত কলাম লেখেন এবং নিউ স্টেটসম্যান, ট্রিবিউন ও দ্য ন্যাশনাল-এ লেখেন। এর আগে তিনি দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর কলামিস্ট ছিলেন।

সাম্প্রতিক ডেস্ক