“শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যিনি।” অর্থাৎ, যিনি শাসন করার অধিকার রাখেন, তিনি সেই অধিকার আসলে সোহাগ করে করে আদায় করে নেন।

আইনের শাসন কথাটা সারাবেলা আপনারা ব্যবহার করে থাকেন। অন্তত বাংলাদেশে, ব্যবহার করেন না তা জোর দিয়ে বলতে পারবেন না। পত্রপত্রিকা থেকে শুরু করে পাবলিক আলাপে সারাক্ষণই এই কথামালাটির প্রয়োগ চলে। ইংরাজিতেও ল-অ্যান্ড-অর্ডার দিয়ে একই ধরনের ইঙ্গিত সাধিত থাকে। কিন্তু যত নিয়মিত আপনারা এটা ব্যবহার করেন ততটা যে এটার অর্থ পরিষ্কার বোঝেন তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন। ফলে আজকে আমাদের আলোচ্য বিষয় হওয়া দরকার ‘আইনের শাসন’।

আইনের শাসন বুঝতে গেলে প্রথমেই আইন বুঝতে হবে। আইন মানে অবশ্যই নিয়ম। মেলা মেলা নিয়ম। এমন সব নিয়ম যা দিস্তা দিস্তা বস্তা বস্তা কাগজে লেখা থাকে। আপনারা ছায়াছবিতে দেখেছেন যে গাদা গাদা চামড়ার বাঁধাই করা বই থাকে আইনজীবীর ঘরে। হলিউড থেকে মুম্বাই, কোলকাতা থেকে ঢাকা সকল জায়গাতেই তা দেখা যায়। এমনকি ছায়াছবির বাইরে যদি বাস্তবেও কোনো মোটামুটি পসারওয়ালা আইনজীবীর অফিসে গিয়ে উঁকি দেন, তো দেখতে পাবেন যে আইন বলতে কী বোঝায়। গাদা গাদা বই। তাকের পর তাক। আলমারির পর আলমারি। ফলে আইন মানে হলো অনেক অজস্র নিয়ম।

এখন আইনের শাসন বোঝার ক্ষেত্রে গোড়াতেই শাসন বিষয়ক গ্রামীণ শ্লোক বুঝে নিলে খুব কাজের হবে আমাদের। “শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যিনি।” অর্থাৎ, যিনি শাসন করার অধিকার রাখেন, তিনি সেই অধিকার আসলে সোহাগ করে করে আদায় করে নেন। এখানে সোহাগকে খুব একটা মনোযৌনজ হিসাবে দেখার আবশ্যকতা নেই আপনাদের। এটাকে বড়জোর বাৎসল্যজনিত আদর হিসাবেই দেখা উচিত হবে। মানে হলো গিয়ে, আইনের যে সোহাগ তা পর্যাপ্তভাবে সমাজে থাকলেই বরং আইনের শাসন কথাটি আরো অর্থবহ আরো বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। এখন আপনারা জানতে চাইতেই পারেন যে আইনের সোহাগটাই বা কীভাবে বুঝবেন!

উঁহু, এটা সকলেরই বোঝার দরকার পড়বে না। ঠিক এইখানে গ্রামীণ শ্লোকের সঙ্গে অবিকল মেলে না। ওখানে শাসন ও সোহাগ একই ব্যক্তিতে প্রযুক্ত বোঝায়, কিন্তু এখানে ঠিক এভাবে আমরা বুঝব না। আইন অত্যন্ত ব্যাপক ও সামষ্টিক বিষয়, গ্রামীণ শ্লোকের উদাহরণে তাই আপনাদের পুরোটা বুঝতে চাওয়া এমনিতেও ঠিক হবে না। তাছাড়া সোহাগ সততই খুব কাস্টমাইজড ধরনের জিনিস। ব্যক্তিভেদে তারতম্য সোহাগের ক্ষেত্রে খুবই প্রাচীন প্রথা। ফলে আইনের সোহাগ যাঁর বা যাঁদের উপর প্রযুক্ত হয়, তা তাঁরা নিজ নিজ দায়িত্বে বুঝে নেন। অন্যদের আইনের শাসন নিয়ে আগ্রহ বা হাহুতাশ থাকাই বরং সব থেকে সমীচিন।

তাহলে দেখা যাচ্ছে সোহাগী আইনের যত্রতত্র সোহাগ যেহেতু চান না আপনারা, তাই কদাচিৎ ও কোথাও কোথাও তার শাসন আপনারা আকাঙ্ক্ষা করেন। ব্যাপারটা এতক্ষণে নিশ্চয়ই স্পষ্ট। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে জগতে কিছু দুর্ভাগা আছেন যাঁদের পক্ষে আইনের শাসন বোঝা ক্রমাগত কঠিন হয়ে ওঠে। অন্তত দুটো দুর্ভাগা পক্ষের কথা বলা জরুরি। এঁদের মধ্যে একপক্ষ ন্যায়বিচার আর আইনের শাসনকে অভিন্ন মনে করেন। জগতে ন্যায়বিচার আছে কিনা, কিংবা ন্যায়বিচারের জন্য আমাদের সকলের পরকাল পর্যন্তই অপেক্ষা করতে হবে কিনা, সেগুলো কিন্তু আরেক আলাপ। তবে আইনের শাসন আর ন্যায়বিচারকে গুলিয়ে ফেললে আর কোনো ভরসা নাই এটা বোঝার। অন্য পক্ষ আইনের শাসনকে নৈতিক উৎকর্ষ টুৎকর্ষ হিসাবে দেখে থাকেন। এটা আরেক মারাত্মক ভুল। এখানে উৎকর্ষ নিকর্ষ নিয়ে ভাবলে ভুলভাল গোলকধাঁধায় ঢুকবেন। নৈতিক তো প্রসঙ্গই নয়।

আইনের শাসন একভাবে ডাণ্ডামারার আহ্বানই হতে হবে। কিন্তু এমন নয় যে আপনি সত্যি একখান ডাণ্ডা মারতে যাচ্ছেন। ধরা যাক, আপনার প্রতিবেশীর সঙ্গে আপনার ক্যাচাল লেগে থাকে। আপনি আইনের শাসনের একজন নিষ্ঠাবান ভক্ত। আপনি তাঁকে শায়েস্তা করার কথাও ভাবেন। কিন্তু তার জন্য সত্যি কখনো ডাণ্ডা মেরে আপনি বসবেন না। আপনি যেটা করবেন, তা হলো কোনো একদিন আপনার গাছের টব ভাঙার অভিযোগে (প্লিজ সত্য মিথ্যা নিয়ে এখন ভাববেন না) কিংবা জানালা দিয়ে কাঁঠালের ভুঁতি ফেলার অভিযোগে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন। সেটা কোর্টকাচারি পর্যন্ত না হলেও, অন্তত বাড়ির মালিকদের অন্তরঙ্গ সমিতিতে। সেজন্যই দেখা যায়, বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নিন্দুক যাঁরা, তাঁরা হত্যাকাণ্ড নিয়ে যতটা কাতর হন, তার থেকে অনেক অস্বস্তি বোধ করেন বিচার-বহির্ভূততা নিয়ে। এটা দিয়েও আপনারা আইনের শাসন বুঝতে পারবেন।

আইনের শাসন পরিশেষে আইনের একটা ভাব ও ভঙ্গি কিংবা ভাবভঙ্গিকে দারোয়ানের মতো দাঁড় করিয়ে রাখা। যাঁরা আপনারা ক্রিকেট পছন্দ করেন নিশ্চয়ই করোনাতে পেটশক্ত করে অপেক্ষা করছিলেন। তারপর তো ওয়েস্ট ইন্ডিজ পুরুষ বাহিনী গেল ইংলন্ডে, পাকিস্তানও গেল, এখন আইপিএল আসবে। আপনারা পর্দায় কী দেখেন? দেখেন যে, খেলোয়াড়েরা দৌড়াদৌড়ি করেন, হাইফাইভও করেন, কোলাকুলি ধরনেরও করেন, উইকেট পেলে। আপনারা শুনতে পান তাঁরা করোনাকালে নিরাপদ বাবলে আছেন। আপনারা আরও দেখেন যে তিনজন ভাষ্যকার ম্যাচ শুরুর আগে অত্যন্ত অভিনব থিয়েট্রিক্যাল উপায়ে ‘সামাজিক দূরত্ব’ মেনে ম্যাচ পর্যালোচনা করছেন। আপনাদের চোখের অশান্তি তাঁরা পরোয়া করেন না। মাঠে কোলাকুলি থাকতে পারলে এঁদের এমন করার রহস্য আপনি ভাবতেই থাকবেন। কিন্তু এই ভাষ্যকারবৃন্দ আসলে মহত্তর ব্রতে আছেন। তাঁরা আইসিসির আইনের শাসন পর্দায় প্রতিষ্ঠা করে রাখেন।

আদাবর, ২৮ আগস্ট ২০২০