বিড়াল

আমার আম্মা আর মামারা আগে খাঁচায় রাইখা টিয়া পাখি পুষতেন, সেই পাখি কোনোভাবে পালায় গেলে মন খারাপ করতেন আর শুকনা মরিচ হাতে নিয়া পাখির নাম ডাইকা ডাইকা খুঁজতেন।

আমার নাম নিয়া ম্যালা সময় ম্যালা রকমের কথাবার্তা শুনছি। জাহাঙ্গীরনগর ভর্তি হইতে গেছি সময় বান্ধবী শিখার এক বড় ভাই ছিলেন, উনারে একটা খবর নেওয়ার ব্যাপারে নাম মনে থাকবে কিনা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, “থাকবে থাকবে, উম্মে কুলসুম, উম্মে ফারহানা”, বইলাই হাসি দিলেন।

এক্সপ্রেশন দেইখা মনে হইল উম্মে ফারহানা একটা হাস্যকর নাম, উম্মে কুলসুমের সঙ্গে মিলে বইলাই হয়ত। আরব বিশ্বে এক জনপ্রিয় গায়িকা আছেন যার নাম উম কুলথুম, ইংরেজি বানানে তাই মনে হয়, আসলে আমরা যেটাকে উম্মে কুলসুম বলি সেটাই উনার নাম।

ভার্সিটিতে মাষ্টারি করা শুরু করার পর একবার এক উপাচার্য বলছিলেন, “এটা কেমন নাম, উম্মে মানে তো মা। উম্মে ফারহানা মানে তাহলে ফারহানার মা।” আমি স্যারকে বলি নাই যে আবু বকর শব্দের অর্থ গাভীর পিতা, সেই নাম তো লোকে হরহামেশা রাখে, কেউ তাদেরে জিগায় না, গাভীর পিতা কেন নাম রাখা হইছে। বিনয়ের সঙ্গে বললাম, “স্যার এটা বায়োলজিক্যাল মা অর্থে না, উৎস অর্থে, ফারহান শব্দের অর্থ আনন্দ, উম্মে ফারহানার অর্থ আনন্দের উৎস।” আরবী ভাষায় উৎস বুঝাইতে মা শব্দটা ব্যবহার করা হয় সেটা মোটামুটি কমন নলেজ। যে কারণে হাদিসে বলে, “মিথ্যা সকল পাপের মা।” এই হাদিস শুইনা কেউ কিন্তু জিগায় না তাইলে পাপের পিতা কে।

আমার বিবাহিত সঙ্গী কাজী রুবায়েত ইসলামরে আমার আম্মা ডাকেন আবু হুরায়রা। উনার অত্যধিক বিড়ালপ্রীতির জন্য এই নাম দিছেন আম্মা। মহানবী (দ:) তাঁর এক সাহাবিরে বিড়ালপ্রীতির জন্য এই নামে ডাকতেন বইলা আম্মার কাছে শুনছি। উনার আসল নাম ছিল আবদ আল রাহমান ইবনে শাখর আদ দাউসি আল জাহরানি—এইটা গুগল কইরা জানতে পারছি।

বিড়াল
কাজী রুবায়েত ইসলাম তন্ময় ওরফে আবু হুরায়রা

এশিয়ান এইজ পত্রিকায় একটা গল্প লিখছিলাম, ইংরেজিতে ‘আবু হুরায়রা’নামে। বলা বাহুল্য, সেই গল্প আমার পতিদেব রুবায়েত ওরফে তন্ময় ওরফে আবু হুরায়রাকে নিয়া না। সম্প্রতি বিড়াল কোলে আমার ছবি দেইখা মুনির আংকেল মন্তব্য করলেন, “তুমি দেখি উম্মে হুরায়রা”, আংকেল আনন্দমোহন কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ছিলেন দীর্ঘদিন, আগে স্যার বলতাম, ফেসবুকে যুক্ত হওয়ার সময় তাঁর এই পরিচয়টাই জানতাম। আব্বাকে নিয়া একটা পোস্ট দেওয়ার পর জানতে পারলাম আব্বা আংকেলের বন্ধুস্থানীয় ছিলেন। তারপর থাইকা আংকেল বলি।

আমার উম্মে হুরায়রা হইবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। পশুপাখির প্রতি নির্দয় আচরণ না করলেও তাদেরে বাসায় রাইখা পালার ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ কোনো কালে ছিল না। বরং আম্মারে আরো ভর্ৎসনা করতাম এই বইলা যে খাঁচায় আটকায়া পাখি পোষা একটা অমানবিক আচরণ। আমার আম্মা আর মামারা আগে খাঁচায় রাইখা টিয়া পাখি পুষতেন, সেই পাখি কোনোভাবে পালায় গেলে মন খারাপ করতেন আর শুকনা মরিচ হাতে নিয়া পাখির নাম ডাইকা ডাইকা খুঁজতেন।

অনেক আগে আমাদের বাসার ছাদে কবুতর ছিল। কিন্তু কোনো কবুতর কখনো জোড়া বান্ধে নাই, ডিম ফুটায় নাই। প্রতিবারই উইড়া চইলা যাইত এইদিক সেইদিক। শেষবার একটা কালা কবুতররে বিড়াল আক্রমণ করছিল। আহত কবুতরটা মারা যায় পরে। সেই থাইকা বিড়ালের প্রতি আমার একটু রাগই ছিল বরং।

ম্যাক্স আর চিকনি আমাদের বাসায় আসছে ঘটনা ক্রমে। তাদের মা বৃষ্টির মধ্যে তাদেরে ফালায় চইলা গেছিল। হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে ফালায় যায় নাই, উদ্ধার কইরা নেওয়া সম্ভব হয় নাই বইলা ফালায় গেছে। তারা সারারাত এত কানছে যে তিনতলা থাইকাও শোনা যাইতেছিল। সেই রাতে রুবায়েত বাসায় ছিল না। পরদিন সে আসলে আমি তারে বললাম যে বাচ্চাগুলি হয়তো মারা যাবে, ওঠায়া নিয়া আসো, একটু বড় হইলে ছাইড়া দেওয়া যাবেনে। রুবায়েত গিয়া দেখল তারা আমাদের বাসার কম্পাউন্ডের বাইরে। সে দেওয়াল টপকায়া পাশের বাসা থাইকা দুইজনরে ওঠায়া আনল।

নিউমোনিয়া হইয়া তারা তখন চিঁ চিঁ করতেছে। ভেট দেখায়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হইল। সিরিঞ্জে কইরা পানি মিশানো গরুর দুধ, কাঁটা বাইছা ভাতের লগে মিশায়া ভাত, মুরগির মাংস, ক্যাটফুড—নানা কিছু খাওয়াইয়া তাদেরে বড় করা হইল।

রুবায়েত তাদের নাম রাখল ম্যাক্স আর শার্লি। শাহরুখ খান আর ঐশ্বর্য রাইয়ের ছবি ‘জোশ’-এ তারা এই নামের দুই যমজ ভাইবোনের চরিত্রে অভিনয় করছিলেন, সেই থাইকা এই নাম রাখা। রুবায়েত অতি বড় বিড়ালপ্রেমী হইবার পরেও পিচ্চি বিড়াল দেইখা বুঝতে পারে নাই কোনটা মেয়ে কোনটা ছেলে। তারা আরেকটু বড় হইলে দেখা গেল ম্যাক্স আসলে মেয়ে আর শার্লি ছেলে। ততদিনে আমার পুত্র পৃথিবী আলোকময় তারে চিতনি ডাকা শুরু করছে, আমরাও শার্লি নামের জেন্ডার পাল্টায়া শার্ল বা চার্লস বানায় না নিয়া চিকনি নামটাই নিয়া নিলাম।

চিকনিরে রুবায়েত শুরুতে মেয়ে ধইরা নিয়া বলতেছিল যে এ নিশ্চয়ই ফেমিনিস্ট, কেননা খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে সে এগ্রেসিভ, খাবার দেওয়া হইলেই কাইড়া খায়া নেয়। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হইলে মেয়েদেরে ফেমিনিস্ট বইলা গালি দেওয়া খুব কমন টেনডেন্সি। কিন্তু রুবায়েতের ধারণা ভুল প্রমাণ কইরা দিয়া চিকনির পিছনের দুই পায়ের ফাঁকে স্ক্রোটাম স্পষ্ট হইতে থাকল আর কাইড়া খাওয়ার ফলে তার স্বাস্থ্যের উন্নতিও হইল দ্রুত। কিন্তু বেচারার নাম চিকনিই রইয়া গেল। চিকনা হইলেও কিছুটা মানাইত। হিন্দি ভাষায় চেকনাই ওয়ালা পুরুষপোলাদেরে চিকনা বলে, বলিউডের ছবিতে দেখছি।

বিড়াল
চিকনি জানালা দিয়া বান্ধবী খোঁজে

এইদিকে ম্যাক্স শুটকা পটকাই রইয়া গেল। আম্মার বাসার ছাদে তাদেরে খাইতে দিলে আরও একটা বাচ্চা বিড়াল জুইটা গেল, কমলা রঙের সেই বিড়ালের নাম বব কে রাখছিল এখন আর মনে নাই। একদিন আমার মেয়ে প্রকৃতি আর আমার বোন মুমুর ছেলে প্রভু চিকনি মনে কইরা আরেকটা বিড়ালকে রাস্তা থাইকা বাসায় নিয়া আসল। তার নাম রাখা হইল সুন্দর। সব মিলায়া চারটা বিড়াল আমাদের বাসার ছাদে ঘুরাঘুরি করত। ছাদ মানে ঠিক ছাদ না, উঠানের মতন। যে ফ্ল্যাটে আমরা থাকতাম তার পাশের ইউনিটটা ইনকমপ্লিট থাকার কারণে বাসার দরজা খুললেই সেই ছাদ ছিল।

২০২০-এর ফেব্রুয়ারিতে আমরা বাসা পাল্টায়া জিলা ইশকুলের সামনে একটা বারো তলা দালানের নয় তলায় উঠলাম। সুন্দরকে দিয়া দিলাম আমার ছাত্রী আশরাফুন নাহার রুনার কাছে, বব ব্রাহ্মপল্লীতেই রইয়া গেল।
মার্চ মাসের ২৮ তারিখে দুইটা মৃত আর একটা অর্ধ মৃত সন্তান জন্ম দেওয়ার পরে ম্যাক্স বেশ মনমরা হইয়া থাকত। দুই একবার সে বাসার দরজা খোলা পায়া বের হইয়া গেল। চিকনির এমোরাস ইনভাইটেশনে সাড়া দিতে তার হয়তো ভাল লাগতেছিল না। শেষবার তাকে স্টাডি রুমের জানালা দিয়া পাশের বাসার উঠানে দেইখা খুব মন খারাপ লাগলে আমি গেলাম আবার তারে ফিরায়া আনতে, কিন্তু পাইলাম না। শেষে আশা ছাইড়া দিলাম, দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে ছবির অমরেশ পুরির মতন বললাম, “যা সিমরান যা, জি লে আপনি জিন্দেগি।”

বিড়াল
আকিলা রোদ পোহায়

এর কিছুদিন পর আমার বোন মুমু আর প্রভু আম্মার বাসার গ্যারাজের উপরের টেরাস থাইকা আরেকটা বিড়ালের বাচ্চা উদ্ধার করল। আম্মা বিড়ালদেরে খাইতে দিতে রাজি আছেন কিন্তু বাসায় থাকতে দিতে রাজি না। তাই তারে জিলা ইশকুলের বাসায় নিয়া আসা হইল। এর নাম প্রভু দিছে আকিলা। মুগলি কার্টুন থাইকা পাওয়া নাম। প্রভুর মনে হইছে আকিলা আসলে ফাইটার। তার মা তার অন্য ভাইবোনদেরে নিয়া গেছে কিন্তু তারে ফালায়া গেছে। সে কয়েক দিন কিছুই খায় নাই, কাইন্দা কাইন্দা মায়েরে ডাকছে। তার পাষাণী মা তারে আমাদের বাসা থাইকা দেওয়া খাবার নিয়া গিয়া অন্য বাচ্চাদেরে খাওয়াইছে কিন্তু তারে নেয় নাই। সে এতই ছোট যে টেরাসের সাথে লাগোয়া আসলামদের বাসার চালে লাফ দিয়া উঠতে পারতেছিল না।

আকিলা আসার পর দেখা গেল চিকনি তারে বেশ আদর যত্ন কইরাই রাখে, গা চাইটা দেয়, খাওয়া নিয়াও কাড়াকাড়ি করে না। উলটা আকিলাই চিকনির লেজ ধইরা টানে। আজাইরা কামে খুঁচাখুঁচি করে। মাসখানেক পরে আকিলা আর চিকনি দুইজনেই বাসার দরজা খোলা পায়া পালায় গেল। চিকনিরে ফেরত পাইলেও আকিলারে আর পাইলাম না।

জিলা ইশকুলের সামনের বাসা থাইকা ক্যান্টনমেন্ট মোড়ের বাসায় আসার সময় শুধু চিকনিরে নিয়া আমরা আসছি। সে এইখানে আইসাও বেশ কয়েক বার বাইরে গেছিল, আশেপাশে বেশ কিছু মেয়ে বিড়ালের সঙ্গে তার চেনা পরিচয় হইছিল সম্ভবত। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে সে গিয়া আর ফেরত আসল না। চিকনি গায়েগতরে বেশ বড়সড় হইলেও আদতে ভীতু প্রকৃতির। জিলা ইশকুলের সামনের বাসায় থাকার সময় বেশ কয়েকবার বাইরে গিয়া সে অন্য হুলো বিড়ালদের কাছে মাইর খায়া আসছিল। ডিসেম্বরে আমরা সেইন্ট মারটিন্স গেছিলাম। তখন শোয়েব নামের এক বিড়ালপ্রেমী প্রতিবেশী তাদের দুইজনরে রাখছিল। শোয়েবদের বাসা থাইকা পালায়া গিয়াও সে মাইর খাইছে।

বিড়াল
স্নোবল এতই পিচ্চি ছিল যে সুতার গোলায় ডুইবা যাইত

চিকনিরে হারায়া আমাদের সবার খুব মন খারাপ হইছে। আমার ব্যক্তিগত ধারণা সে আমাদের উপর অভিমান কইরা চইলা গেছে। জানুয়ারির শেষ দিকে আমরা কয়েক দিনের জন্য বান্দরবান বেড়াইতে গেছিলাম। সেই সময় সে বাসায় একা ছিল, মমতা নামে আমাদের গৃহকর্মিনী ছিল, তার কাছে চাবি দিয়া গেছিলাম, সে দুইবেলা খাবার আর পানি দিয়া যাইত। এই বন্দি এবং একা থাকার ব্যাপারে হয়তো তার আমাদের উপরে রাগ ক্ষোভ জমা হইয়া থাকতে পারে।

চিকনি যাওয়ার পরে আমার বাচ্চারা বাসার সামনের পেট শপ থাইকা একটা খরগোশের বাচ্চা কিন্যা আনল, তার নাম দিল গাজর। কিন্তু খরগোশের প্রতি আমার তেমন কোনো মায়া জন্মায় নাই। ঘরদুয়ার ময়লা করে এই অজুহাতে তারে আমি অন্য জায়গায় এডপশনে দিয়া দিলাম। ততদিনে ময়মনসিংহ ক্যাট সোসাইটির ফেসবুক পেইজে দেইখা আরও দুইজন বিড়ালের বাচ্চারে বাসায় নিয়া আসলাম আমরা। তাদের নাম কিউপিড আর স্নোবল। আমার পুত্র তাদের ছবি দেইখাই ঘোষণা দিছে যে সাদা বিড়ালের নাম রাখবে স্নোবল। কিউপিড নামটা আমার দেওয়া।

ইদানিং ব্রাত্য রাইসুর একটা পোস্টে দেখছি কে নাকি রাইসুর নামে কুকুর পুষছে। কিন্তু এই ব্যাপারটা আমি বুঝলাম না, কাউরে অপমান করার জন্য কুত্তাবিলাইয়ের নাম সেই ব্যক্তির নামে রাখার মানে কী। পোষা প্রাণী প্রায় নিজের সন্তানের মতনই প্রিয় হয়, অপ্রিয় মানুষের নামে তাদের নাম রাখার মানে কী? কুকুর পোষার মতন বড় জায়গাওয়ালা কোনো বাড়িতে যদি আমি থাকতে পারি তাইলে আমি কুকুর পুষবো এবং তার নাম দিব দিয়েগো কিংবা লিওনার্দো। ম্যারাডোনা আর ডিক্যাপ্রিও দুইজনেই আমার খুব প্রিয় তাই।