বই পড়া

ছোটবেলায় আমি বই পড়ায় খুব আগ্রহী ছিলাম। যখন ক্লাস টু’তে পড়ি, তখন আমার বড় ভাইয়ের ক্লাস সেভেনের কৃষিবিজ্ঞান বই পড়ে শেষ করে ফেলি। বড় হয়ে এটা নিয়ে মজা করেছি। আমাদের মুরুব্বীরা রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড চিন্তাভাবনা থেকে শাসাতেন—পরীক্ষার পড়া বাদ দিয়ে খালি বাইরের বই পড়ো, না!

কিন্তু, আমার শুরু হয়েছিল, বাইরের নয়, অগ্রিম বই পড়ে!

মহল্লার বড় ভাইরা মিলে লাইব্রেরি করেছিলেন। শুনে ছুটে গেলে, শুরুতে আরেকটু বড় হও ভাইয়া, তোমার পড়ার মতো বই তো নেই টাইপ আচরণ করতে গিয়ে উনারা ধরাশায়ী হয়ে যান। দেখা গেল, আমি উনাদের চেয়ে কম গোঁয়ার ও কম পড়ুয়া নই। কিছুদিনের মধ্যেই আমার পড়ার আগ্রহের চেয়েও আমাকে বই পড়তে দিতে উনাদের আগ্রহ যেন বেশি হয়ে দাঁড়ালো।

কিছু বড় ভাই ছিলেন লাইব্রেরিতে অনিয়মিত, কিন্তু আমার খুব সুনাম শুনে আগ্রহ তৈরি হতো বোধহয়, লাইব্রেরিতে বা রাস্তায় দেখা হলে জিজ্ঞাসা করতেন—কোন বই ফেরত দিলে, কীসের উপর এই বই, পড়ে কী বুঝলে?

আমি জবাব দিতাম। উনাদের অবাক হওয়া দেখে আমার উৎসাহ বেড়ে যেত, আরো আরো বলতে থাকতাম।

এই ব্যাপারটায় বড় ভাইদের কারো কারো অবিশ্বাস মিশ্রিত পরীক্ষা করে দেখার ক্ষুদ্রতা কিছুটা ছিল, সেই বয়সেও আমার কাছে সেটা ধরা পড়তো। তবে প্রক্রিয়াটি বেশ হেল্পফুল ছিল—কী পড়লাম, কতটুকু পড়া হলো, নিজেই টের পেতাম। কখনো কোনো ওয়াইজ বড় ভাইয়ের পরামর্শে, কখনো সন্দেহ জাগায় নিজেই ফেরত দিতে আসা বই আবারো পড়তে নিয়ে এসেছি।

বড় ভাইদের সেই পাঠাগারটি উনাদের কোন্দলে একসময় স্থবির হয়ে যায়। মূল উদ্যোক্তা একগাদা অভিযোগ কাঁধে নিয়ে আমেরিকার বোস্টনে পড়তে চলে যান। অবশ্য ততদিনে আমি হাইস্কুলে পড়তে বাড়ির বাইরে একা যাওয়া-আসা করার মতো বড় হয়ে উঠেছি।

যখন হাইস্কুলে ভর্তি হলাম, বাসা থেকে একা একা অন্য মহল্লায় আসা যাওয়ার যে সুযোগ আসলো, তা অচিরেই কাজে লাগাতে শুরু করলাম। স্কুল পার হয়ে কিছুদূর এগুলে এক বড় ভাই সুলভে বই ভাড়া দিতেন। মূলত সেবা প্রকাশনীর বই। আমি ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি, প্রতিদিন দুটো করে কুয়াশা ক্লাসে টেক্সট বইয়ের নিচে চাপা দিয়ে শেষ করেছি। সে সময় মুড়ির ঠোঙ্গাও পড়তাম।

কুয়াশা ১, কাজী আনোয়ার হোসেন
কুয়াশা ১, লেখক, কাজী আনোয়ার হোসেন (বিদ্যুৎ মিত্র ছদ্মনামে লেখা); প্রচ্ছদ, রমেন কুমার সাহা, প্রকাশক, ফরিদা ইয়াসমিন, সেগুনবাগান প্রকাশনী; প্রথম প্রকাশ, জুন, ১৯৬৪; মূল্য, এক টাকা (প্রথম সংস্করণ)

আমাদের স্কুলের লাইব্রেরি ছিল দেখার মতো! পাকিস্তানিদেরকে অনেকে গালি দেয়, কিন্তু কাজে-চেতনায় তাদের সমান হতে দেখলাম না তো! আইয়ুব খান যে স্কুল বানিয়েছিলেন, স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেছে, বাঙ্গাল মুলুকে ঐ রকম স্কুল আর হয় নাই। আমার ধারণা আর পারবেও না। যাই হোক বিশাল লাইব্রেরি রুমে সারি সারি কাঠের আলমারিতে থরে থরে সাজানো বই। পুরো রুম একবার ঘুরে আসতে কোনো স্কুল বয়ের জন্যে অনেক সময় প্রয়োজন।

সবই ঠিক ছিল, শুধু বই পড়াটাই নিয়মে বাঁধা। লাইব্রেরিয়ান স্যার লাইব্রেরি রুমে বসে বই পড়তে দিবেন না। সপ্তাহে একদিন লাইব্রেরি ক্লাস, সেদিন আলমারি থেকে স্যার নিজের পছন্দে কিছু বই বের করে টেবিলে সাজিয়ে রাখবেন, সেগুলো থেকে বেছে নিয়ে স্যারের খাতায় এন্ট্রি করে বাসায় এনে পড়া যাবে।

আমি আলমারি থেকে বেছে বই নিতে চাইলে স্যার শুরুতে আপত্তি, পরে বিরক্ত ও শেষে ধমক পর্যন্ত দিয়েছিলেন।

স্যারের ধমকের জবাবে ভয়ে কাঁদো কাঁদো আমি বলেছিলাম বই পড়তে চাওয়ায় আপনি হেড স্যারের কাছে কমপ্লেইন করতে চান, তা করুন—আমি বেছে নিয়ে বই পড়তে চাই, এটাই তো আমার দোষ? অথচ এসব বই তো আমাদের পড়ার জন্যেই রাখা আছে।

স্যারের সাথে শুরুতে এই অপ্রিয় ঘটনা সত্ত্বেও কিছুদিনের মধ্যেই যেন স্যার আমাকে কিছুটা প্রশ্রয় দিতে শুরু করেন। নিয়ম ছিল লাইব্রেরি থেকে একবারে একটার বেশি বই নেয়া যাবে না, কিন্তু স্যার আমাকে বাড়তি সুযোগ দিয়েছেন, বই বেছে নেয়ার সুযোগও দিয়েছে। তবে মোটা বই যেগুলো বাসায় এনে পড়া কষ্ট, সেগুলো লাইব্রেরি রুমে বসে পড়তে চেয়েছিলাম, সে সুযোগ দেন নাই। পরে স্কাউটিংয়ের সুবাদেও স্যারের সাথে সম্পর্ক গাঢ় হয়েছিল, স্যার এখন আছেন কি না, কেমন আছেন, কে জানে। স্কুল লাইব্রেরি থেকে আমার নেয়া প্রথম বই, ‘ছোটদের নেপোলিয়ন বোনাপার্ট’, পড়ে নেপোলিয়নের খুব ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু বড় হয়ে আসল নেপোলিয়নকে জেনে সেই ভক্তি উবে গেছে।

আমাদের মহল্লার বড়ভাইদের লাইব্রেরিটি স্থবির হয়ে একসময় বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু প্রকৃতি শূন্যতা বরদাশত করে না, বা প্রকৃত আহবানে সাড়া না দিয়ে প্রকৃতি স্থবির থাকতে পারে না। বা, যা-ই বলুন, আমাদের মহল্লার এক বড় ভাই, স্কুলে আমাদের এক বা দুই ক্লাস উপরে পড়তেন, নিজে থেকে ডেকে নিয়ে তার সংগ্রহের বই পড়ার সুযোগ দিলেন।

ছা-পোষা সরকারি চাকুরিজীবীর সন্তান আমি তার বইয়ের সংগ্রহ দেখে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম। উনার কাছ থেকে আনা প্রথম বই ছিল ‘উভচর মানুষ’।

ছা-পোষা সরকারি চাকুরিজীবীর সন্তান আমি তার বইয়ের সংগ্রহ দেখে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলাম। উনার কাছ থেকে আনা প্রথম বই ছিল ‘উভচর মানুষ’। উনার কালেকশন ছিল ভাল, এবং, ততদিনে আমি বোধহয় আসলে পড়তে শিখছি, তাই এই সহৃদয় স্নেহাত্মক আচরণে খুব উপকার হয়েছে।

উনারা একসময় কোনো অভিজাত এলাকায় চলে যান, সেই থেকে যোগাযোগ আর থাকে নাই। সে বড় ভাই এখন নৌ বাহিনীর বড় কর্মকর্তা, কিন্তু দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে সিএমএইচেই দিন কাটে, এরকম শুনেছি।

এসময় আমদের বাসায় এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলির এক সদস্য থাকতেন। আশ্চর্য এক চিজ। ভীষণ পড়ুয়া, তবে সব আনন্দবাজারের মাল হতে হবে। যাক এই সুবাদে পাঁচ ছয় বছর টানা তাজা ‘দেশ’ পত্রিকা পড়া হয়েছে। আমার আগ্রহ দেখে উনি ‘আনন্দমেলা’ বা আর কী ছিল সেগুলো মাঝে এনেছেন, তেমন জমে নাই।

আমার সবচেয়ে বড় ভাই তার এইচএসসির পর অস্ট্রেলিয়া চলে যান পড়তে। তবে, স্কলারশিপ কোয়ান্টাসের হওয়ায় উনাদের আসা-যাওয়া ছিল নিয়মিত, এবং উনিও পড়ুয়া হওয়ায় এবং লাগেজের ওয়েইট নিয়ে মাথা ঘামাতে না হওয়ায় সিডনিতে বসে যত বই পড়তেন বাসায় আসার সময় সব নিয়ে আসতেন।

বারো রকমের যত বই! সেই সুবাদে কার্ল সেগানের ‘কসমস’ বের হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই আমার পড়ার সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু স্কুল পড়ুয়া আমার বুঝতে অসুবিধা হয়েছিল, এবং সলজ্জভাবে ইদানীং স্বীকার করি, অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্টরা ধাপ্পাবাজ—এই টাইপের ধারণা কীভাবে যেন জন্মে গিয়েছিল। সেই ধারণা কাটতে আমার হাবলের ইমেজ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

যাই হোক, কোয়ান্টাসের ফ্রী ফ্রেইটের সুবাদে আমার মওদুদীর ইসলামের দৃষ্টিতে জন্ম নিয়ন্ত্রণ, গাদ্দাফীর গ্রীন বুক, আফ্রো এশিয়ান কালচার স্টাডিজ নামক এক সিরিজের কিছু বই, মেইকিং অব ম্যানকাইন্ড, ক্লিনিক্যাল হিপনো থেরাপির অনেক বই, হাউ ট্যু চুজ ইয়্যোর পিপল এরকম কত কত বই যে হাতে আসে।

অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্টরা ধাপ্পাবাজ—এই টাইপের ধারণা কীভাবে যেন জন্মে গিয়েছিল। সেই ধারণা কাটতে আমার হাবলের ইমেজ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

পড়েছি, পড়েছি এবং পড়েছি। যদিও সেই সময় প্রায় বইই বুঝি নাই। কিন্তু সেই পড়ে না বোঝাও কাজে লেগেছে। এবং এক সময় বাসায় কলাম্বিয়া এনসাইক্লোপেডিয়া ২৪ খণ্ডের পুরো সেট হাজির হয়! আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে।

যে কোনো কিশোরের জীবনের সেই প্রথম অভিজ্ঞতাটি, আমার বেলায় ঘটে স্কুলের বড় কোনো ক্লাসে পড়ার সময়। পড়ুয়া হিসেব সুনাম থাকায় অন্য স্কুলে পড়া মহল্লার পাগলা দাশু টাইপের বন্ধুটি একদিন কী বলবে বলে খুব আগ্রহ ভরে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলতে গিয়ে দেখি উত্তেজনায় থর থর কাঁপছে। ঘটনা জেনে, আমি আগ্রহী হওয়ার চাইতে নার্ভাস হয়ে গেলাম বেশি। কিন্তু সেটা চেপে রেখে পরামর্শ দিলাম, নিরাপত্তার স্বার্থে মহল্লা থেকে যথেষ্ট দূরে, যথেষ্ট নিরিবিলিতে ফার্মগেটের পার্কে গিয়ে দেখা ও পড়া যাক।

ফার্মগেটের পার্কটিকে নিরিবিলি বলায় আমাকে পাগল মনে করার কোনো কারণ নাই। সেই যুগে আমাদের এই ঢাকা শহর খুবই সুন্দর ও বসবাসযোগ্য একটি শহর ছিল। যাই হোক, ফার্মগেট পার্কে যা দেখা গেল, তা প্রথম অভিজ্ঞতার এক্সাইটমেন্টের কারণে পার পেয়ে গেলেও আমার মনে খচখচ করতে লাগল। একটি ছিল পেন্টহাউস ম্যাগাজিন, কিন্তু ইংরেজি নয়, ইউরোপীয় কোনো ভাষা হবে, তার রঙিন ছবিগুলো দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো, টেক্সট পড়া গেল না। আর ছিল, কলিকাতার সেই বিখ্যাত (!) কুৎসিত ছাপার, কুৎসিততম ভাষার চটি!

আমি এর আগ পর্যন্ত নন ফিকশনের পাঁড় মাতাল পাঠক ছিলাম, কিন্তু ফিকশন পড়ি নাই, এমন তো নয়। প্রণয়ের বর্ণনা এত কুৎসিত হবে কেন, এত অশ্লীল খিস্তি করলে সেটা তো স্রেফ চ’বর্গীয় ব্যাপার হয়ে গেল, তাহলে সুন্দর সঙ্গমের বর্ণনা কোথায় পাওয়া যায়, এই ব্যাপারটা মাথায় ঢোকে।

ইতোমধ্যে কলেজে ভর্তি হয়েছি, দেখি পোলাপান সব চটিতে মেতে আছে। কীভাবে কীভাবে যেন আমি উচ্চ মাধ্যমিক চটি সংকলনের প্রধান সম্পাদক হয়ে গেলাম। সবাই চটি সংগ্রহ করত, আমরা গ্রেডিং করতাম, কিন্তু দিন শেষে আমার হতাশা কাটে না। সেই হতাশার কারণেই, তা জয় করতে নটরডেম কলেজের ক্যান্টিনের বারান্দায় বসে সুউচ্চ কৃষ্ণচূড়া গাছ আর বিশাল মাঠের দিকে তাকিয়ে মুখে মুখে যৌথ উদ্যোগে রচিত হয়েছিল বাংলা সাহিত্যে বিস্ময়কর কিছু অমর চটি। হায়, কালের গর্ভে কত অমূল্য মহাকাব্যই না হারিয়ে যায়!

এই লগ্ন বেশিদিন স্থায়ী হয় নাই। কলেজের লাইব্রেরিটা ভাল ছিল, কিন্তু বেশি ভালো, মানে ভালো ভালো বই শুধু, সব রকম বই নাই। এছাড়া গারো-চাকমা পোলাপান কলেজ হোস্টেলে মাগনা খায়-থাকে, কলেজে মাগনা পড়ে, আবার ডগ (ডিরেক্টর অব গাইডেন্স)এর টিকটিকি হিসেবে কাজ করে, কীভাবে যেন ওদের কুনজরে পড়ে গিয়েছিলাম। আমার নামে মিথ্যা (বা অতিরঞ্জিত) অভিযোগও গেছে। আর আমরা ছাত্র ইউনিয়নের কমিটি করছিলাম (আসলে কয়েকটি ডেডিকেইটেড ছেলে করেছিল, আমাকে সাথে ডেকে নিয়েছিল), এসব মিলিয়ে কলেজ লাইব্রেরিতে আমার বেশি সময় দেয়া আর হয়ে উঠল না।

নটরডেম কলেজ ক্যান্টিন
নটরডেম কলেজ ক্যান্টিন

ইংরেজি ক্লাসে একদিন সুশীল স্যার শেক্সপিয়ারের কবিতা পড়াতে গিয়ে বললেন, তোমাদের রবীন্দ্রনাথসহ বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত রচনাগুলো পড়া ফেলা উচিৎ।

আমি ক্লাসের নিয়ম অনুযায়ী কিছু বলার জন্যে অস্থিরভাবে হাত তুললাম, স্যার বললেন, কী হলো?

আমি বললাম, স্যার আমি রবীন্দ্রনাথ পড়েছি, কিন্তু কিছু বুঝি নাই, অযথা প্যাঁচানো একঘেয়েমিতায় পূর্ণ লেখা মনে হয়েছে।

স্যার মৃদু হেসে জানতে চাইলেন কবে, কোনটি?

আমি বললাম নাইনে থাকার সময়, ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসটি।

স্যার বললেন, এখন পড়ো, বুঝবে। কয়েক বছর পরে পড়ে দেখো, আরো নতুন অর্থ বুঝবে। লিটারারি ক্লাসিকগুলোর বৈশিষ্ট এই, জীবনে অভিজ্ঞতায়-জ্ঞানে আমরা যত সমৃদ্ধ হতে থাকি, সেগুলো থেকে তত বেশি অর্থ উদ্ধার করতে পারি।

স্যারের কথাটি খুবই খাঁটি বলে প্রমাণ পেয়েছি। তবে স্যারের বোধহয় রবীন্দ্রনাথে অতিভক্তি ছিল, আমি কিছু ইউরোপীয় সাহিত্যকর্ম নতুন করে পড়লে এর প্রমাণ পাই।

বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরির লোকজন খুব অমায়িক। এক সময় এমন হয়েছে যে আমি কোনো বিষয়ে জানতে চাই, সেটা কোনো বইয়ে পাচ্ছি না, বা পর্যাপ্ত পাচ্ছি না, সাপোর্ট চাইলে উনারা এতটা ব্যাস্ত হয়ে পড়তেন যে বিব্রত হয়ে যেতাম।

এ সময় আমি বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে যেতে শুরু করি। সেটা আমার খুবই পছন্দ হয়ে যায়। এবং একসময় কলেজের ক্লাস বাদ দিয়ে ফুলার রোডে পড়ে থেকেছি।

ক্লাসমেটরা আমাকে ভালবাসতো, ক্লাস ফাঁকি দেয়া আটকাতে টেনে ধরে রাখতে গিয়ে এমনকি একবার আমার শার্ট ছিঁড়ে যায়।

বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরির লোকজন খুব অমায়িক। এক সময় এমন হয়েছে যে আমি কোনো বিষয়ে জানতে চাই, সেটা কোনো বইয়ে পাচ্ছি না, বা পর্যাপ্ত পাচ্ছি না, সাপোর্ট চাইলে উনারা এতটা ব্যাস্ত হয়ে পড়তেন যে বিব্রত হয়ে যেতাম। এমন হয়েছে, জানতে চাওয়ার সপ্তাহ দশদিন পরে কেউ জানিয়েছেন, একটি ম্যাগাজিন এসেছে, সেখানে আমার জানতে চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে একটি লেখা আছে!

তার এই মনে রাখাতেই আমি অভিভূত!

এরপরে আসে, পাবলিক লাইব্রেরির যুগ। তখনও আপুরা এদিক-ওদিক বসে থাকতেন, অবশ্য এখনকার মত অশ্লীল মনে হতো না। তবে অবাক লাগতো, লাইব্রেরিতেই যদি এলেন, ভিতরে গিয়ে বই না পড়ে সিঁড়িতে বসে গল্প করছেন কেন!

এই পাবলিক লাইব্রেরি আমার পছন্দ হতে সময় লেগেছে। তবে, অভ্যাস হয়ে যাওয়ার পর, প্রায় ভাতের মতো গিলেছি।

এই পাবলিক লাইব্রেরি আমার পছন্দ হতে সময় লেগেছে। তবে, অভ্যাস হয়ে যাওয়ার পর, প্রায় ভাতের মতো গিলেছি। একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলে রাখি, এসবের অনেক পরের ঘটনা হলেও, এই পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তন দুটো কারণে আমার স্মৃতিতে ভাস্বর—’মুক্তির গান’ এর প্রিমিয়ার দেখেছিলাম, সেদিন ভীষণ উদ্দীপনা, দেশের বড় বড় নক্ষত্ররা এসেছিলেন, এমনকি রেহমান সোবহান স্যারও এলেন, এবং, লাইনে দাঁড়ালেন। আয়োজকরা এসে তাকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে যেতে চাইলেও উনি লাইনেই থাকলেন! দ্বিতীয়টি ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ এর বিশেষ কোনো এক প্রদর্শনী  দেখা। ঢাকায় তখনও সেই কোরিওগ্র্যাফির উপযোগী অন্য কোনো মঞ্চ ছিল না।

মাঝে আবদুল্লাহ  আবু সায়ীদ স্যারের সুনাম শুনে ঢাকা কলেজে উনার ক্লাস করে আসি। এত দূরে শুধু এই কাজে গিয়ে পোষায় নাই; কারণ, আমি মা’র কাছ থেকে শুধু নটরডেমে আসা-যাওয়ার ভাড়া এবং যেদিন প্র্যাকটিকাল আছে  সেদিন লাঞ্চের টাকা পেতাম।

ফুলার রোডে বা ঢাকা কলেজে হেঁটেই যেতে হতো, কারণ তখন সিগারেট ধরেছি, এবং রুচিশীল পারসন হিসেবে আমার ব্র্যান্ড ছিল বেনসন।

বাংলা মটরে স্যারের ওখানে গেলাম, গিয়ে দেখি সব পোলাপান সিরিয়াস, সবাই খুব বড় পণ্ডিত হবে বলে পণ করেছে। অথচ আমি পড়তে ভাল লাগে তাই বই পড়ি। বই খুঁজি, বই পড়ে কী হবে সেটা ভাবিও নাই বুঝিও নাই। এরা বই পড়াকে আরাধনা জ্ঞান করে। এত ভাল ছেলেদের ভিড় আমার ভালো লাগলো না।

এরপর আমার দেশ ছেড়ে যাওয়ার পালা। জাপান বইয়ের দেশ, পড়ুয়াদের দেশ। সেখানের দিনগুলো যেন জলের মাছ জলে ফিরে এলো টাইপ। বাসার কাছেই, একটু হাঁটলে কিনোকুনিয়া শিনজুকু শাখা। সেটার পাঁচ (নাকি ছয় তলায়, এখন আর মনে নাই), ছিল ম্যাগাজিন সেকশন। সেখানে না কিনেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ম্যাগাজিন পড়ার সুযোগ ছিল।

উনিশ বছর বয়সে শতবর্ষ অটুট থাকার নিশ্চয়তার পোলারয়েডে তোলা ছবি। কী ভাবছিলাম? আমি থাকবো না, কিন্তু ছবি টিকে যাবে…।

মজার ব্যাপার, এই সেদিন কথাপ্রসঙ্গে আমেরিকাবাসী এক বন্ধু বলছে, আমেরিকায় সোসাইটিতে-কর্পোরেটে মোরালিটি বলতে কিছু এখন আর নাই। আমি হেসে জবাব দিলাম, সেটা আমি তুই আমেরিকা যাওয়ার আগেই জানি। হ্যাঁ, দ্যা ইকোনোমিস্ট একবার কভার স্টোরি করেছিল, কর্পোরেট এগজিকিউটিভদের মধ্যে মরালিটির প্রশ্নটিই নাই হয়ে গেছে। ওদের সেই কাজটি খুব ভাল হয়েছিল, ওরা প্রিন্সটন, হার্ভার্ডের বিজনেস স্কুলে কী শিখানো হয়, এগজিকিউটিভদের মূল্যায়নে কীরকম প্রসেস প্র্যাকটিস করা হয়, এতে মরালিটি কীভাবে মারা না গিয়ে উপায় নাই, এসব খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছিল। এরকম অনেক কিছুই ঐ অল্প বয়সে আর্থিক সঙ্গতি না থাকা কালে পড়তে পেরেছি, জানতে পেরেছি—হয় লাইব্রেরি থাকায়, নয়তো বইয়ের দোকানে চোখ বুলানোর সুযোগ থাকায়।

বাংলা মটরে স্যারের ওখানে গেলাম, গিয়ে দেখি সব পোলাপান সিরিয়াস, সবাই খুব বড় পণ্ডিত হবে বলে পণ করেছে।

দেশে ফিরে এলে দেখি স্টেডিয়াম মার্কেটে বই এর দোকান একটাও আর নাই, গুলিস্তানের ফুটপাথে বই বিক্রি হয় না, আরো কী কী পরিবর্তন যেন দেখলাম, মন খারাপ হয়ে গেল। এবং বিদেশ ঘুরে আসায়, ঢাকা শহর যে কত নোংরা এবং মানুষ বসবাসের অনুপযুক্ত, এটা প্রতি পদে পদে টের পেতে থাকলাম। এর মধ্যে দেখা গেল বেইলি রোডে বইয়ের দোকান হয়েছে।

একদিন বৃষ্টিতে আটকে গিয়ে এক দোকানে ঢুকে মেজাজটাই খিচরে গেল। মনে হলো, শালা ঢাকা শহরে বইয়ের দোকান খুলেছিস, নাকি এটা কলিকাতার কোনো ভাঙা-নোংরা গলি পেয়েছিস। ঢুকেছি যেহেতু ভদ্রতা রক্ষার্থে নেহেরুর ‘গ্লিম্পসেস অব ওয়ার্ল্ড হিস্টোরি’র বাংলা অনুবাদ পেলে নিয়ে যাই ভেবে পাওয়া যাবে কি না জিজ্ঞাসা করায় মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেল। সেলসম্যান আমাকে কলিকাতা শহর চেনানো শুরু করে নন স্টপ লেকচার ঝাড়ছেন, আমি যা চেয়েছি সেটা নাই, তবে, সুনীলের ওমুক বইটি পড়েছি কি না, সমরেশ মজুমদারের ওমুক বই এখন ‘কালচার্ড’ লোকজন সবাই কিনে পড়ছে, শীর্ষেন্দুর ওমুক ওমুক বই না পড়লে বাংলা সাহিত্য পড়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি! আল্লাহ্‌র শোকর, হুমায়ূন আহমেদ আমাদের বইয়ের দোকানের তাকে আমাদের বইয়ের জায়গা উদ্ধার করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কলিকাতায় ছিলেন, সেই হ্যাংওভার কাটে নাই ভেবে, বলব না বলব না করেও, ক্যাশে বসা গলায় অস্বাভাবিক রকম মোটা স্বর্ণের চেইন পরা সেই বিখ্যাত আঙ্কেলকে মনের ক্ষোভ পুরোটা ঢেলে না দিলেও বললাম, আঙ্কেল, বইয়ের তাকের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে কলিকাতার কোনো গলিতে ঢুকে গেছি।

বড় আমুদে, গাল্পিক সেই ব্যাক্তিত্ব কিছুক্ষণ আগ্রহ জমিয়ে গল্প করে ‘নকশালদের শেষ সূর্য’ আর ‘আমি বিজয় দেখেছি’ ধরিয়ে দিলেন! কিছু লোকের সাথে রাস্তায় ধাক্কা খেয়েও আপনি উপলদ্ধি করবেন, মার্কেটিং এক বিরাট আর্ট!

পত্রিকায় ‘দর্শন পাঠচক্রের’ বিজ্ঞাপন দেখে নতুন করে আবার বাংলা মটরে স্যারের ওখানে যাওয়ার প্ল্যান করলাম। ভাল লাগলো, স্যার প্রথম দিনই যখন জানালেন, ছাত্রাবস্থায় উনারা বন্ধুরা মিলে পাঠচক্র করতেন, এবং উনাদের প্রথম পাঠচক্র ছিল, দর্শন পাঠচক্র। কিন্তু আমাদের পাঠচক্র জমল না, এবং দিনে দিনে মেম্বার এক এক করে ঝরে যাওয়ায় বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলেন। শেষদিন, স্যার ডেকে নিয়ে গেলেন নিচে উন্মুক্ত স্থানে অন্য পাঠচক্রের লেকচারে। সেখানে দেশবিখ্যাত এক ব্যাক্তিত্ব লেকচার দিচ্ছেন, বিষয় ‘নন্দনতত্ত্ব’। উনার বানানো পাপেট এবং মিশুক দেখে খুব বিরক্ত ছিলাম; কিন্তু এই লেকচার শুনে আমার যেন নবজন্ম হলো! বিষয়টি প্রকাশ করা কঠিন, বাংলায় এসথেটিকস নিয়ে এই মানের লেকচার দেয়া সম্ভব, সেটা ততদিন পর্যন্ত আমার জানা ছিল না। আমি মুগ্ধ বিস্মিত হয়ে স্যারকে বললাম, পাঠচক্র ভেঙে গেছে কিছু করার নাই, কিন্তু এই এক লেকচারে আমার আফসোস দূর হয়ে গেছে। বিদায়ের সময় স্যার আমাকে বাংলা ক্লাসিক্যাল ফিকশনগুলো পড়ে ফেলতে বললেন।

পারিবারিকভাবে আমার জন্যে ঢাকার বাইরে সবচেয়ে কাছের শহর হচ্ছে লন্ডন। বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘অটোবায়োগ্রাফি’ আর ‘হিস্টোরি অব ওয়েস্টার্ন ফিলসফি’ আর কীসব বই লন্ডন থেকে আনানো।

আমি হাইস্কুলে পড়ার সময়, সদরঘাটে, মানে আসলে বাহাদুর শাহ্‌ পার্কের ওখানে খেলার জন্যে চুম্বক কিনতে যেতাম। দেশে ফিরে সেই পার্কের পাশে পুরোনো বইয়ের দোকান খুঁজে পেলাম। যথারীতি এক দোকানির সাথে খাতির হয়ে গেল। কত অদ্ভুত অদ্ভুত রকম বই যে কিনেছি, প্রায় বিনামূল্যে। এছাড়া ‘দেশ’ পত্রিকার কয়েক বছরের প্রায় সবগুলো সংখ্যা, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো কাভার করা Time ও Newsweek এর সংখ্যাগুলো, নবপরিণীতার জন্যে সানন্দার সংসার ও ক্যারিয়ার নিয়ে বিশেষ সংখ্যা, ঋতুচক্র বিষয়ে বিশেষ সংখ্যা, মা হওয়ার প্রস্তুতি বিষয়ে বিশেষ সংখ্যা, এমনকি ৫৫রকম ব্লাউজ, ৭৭রকম শাড়ি পরা, ৯৯ চুল বাঁধা, ১১০রকম ভর্তা, এসব বেছে বেছে মন ভরে কিনেছি ওখান থেকে।

সেই সময় আজিজ মার্কেট হয়েছে, জমেছে। হাঁটাহাঁটি করলেও ভাল লাগে। পাঠক সমাবেশ আসলেই খুব কাজের দোকান ছিল, আজ ওটা এমনি এমনি এত বড় হয় নি। একটি বই খোঁজ করলে তাদের কাছে থাকুক বা না থাকুক, যে রেসপন্সটা পাওয়া যেত, সেটা এই দেশে বিক্রেতাদের মধ্যে দুর্লভ; অতি স্বাভাবিকভাবেই সেই রেসপন্স আপনাকে পরের বইটি খোঁজ করতে সেখানে নিয়ে যাবে। কোনো বই ওপার থেকে এনে দেয়ার কথা দিলে বিজু সেটা রাখতেন, স্বল্পমূল্যের অপ্রচলিত বই হলেও। তার প্রফেশনালিজম অনুকরণীয়।

তক্ষশীলা নামে এক দোকান ছিল। দুয়েকদিন ঢুকে ভয় পেয়েছি, আরে, এরা তো ভীষণ কুলীন পণ্ডিত, বই বিক্রি করে এই গণ্ডমূর্খের দেশকে উদ্ধার করে ফেলছে! আর জীবনে ঢুকি নি। পরে এক বন্ধু বলেছে আয় তোকে পরিচয় করিয়ে দেই, আমাদের ওমুকের তমুক; আমি মাফ চেয়েছি।

আমি সবচাইতে বেশি সময় কাটিয়েছি, এবং সবচাইতে বেশি বই কিনেছি বিদিত থেকে। যতটুকুই হোক স্পেস আছে, এবং সময় নিয়ে তাক থেকে একটির পর একটি বই দেখতে থাকলে কেউ জ্ঞান দিতে এসে বিরক্ত করবে না, কিন্তু প্রশ্ন করলে ভাল রেসপন্স পাওয়া যাবে। বিদিত থেকে আমি বাংলা ইংরেজি দুই ভাষার বইই কিনেছি। আমার মেয়েরা মোট তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ল, প্রত্যেকটির প্রধানকে আমি বার্ট্রান্ড রাসেলের “On Education” উপহার দিয়েছি। এছাড়া, এক সময় বিভিন্নজনকে বিভিন্ন উপলক্ষে বার্ট্রান্ড রাসেলের “Conquest of Happiness” উপহার দিয়ে এসেছি। ইদানীং বিদিতের ব্যবসা আগের মতো নাই। শেষবার Happiness কিনতে হয়েছে প্রথমা থেকে, এদেরকে আমি এড়িয়ে চলতে চাই।

আজিজে আমি থিতু হয়েছিলাম এক আঙ্কেলের দোকানে। উনাকে কথাবার্তায় আচরণে ঠিক দোকানি মনে হতো না, উনার তাকও এলোমেলো থাকতো, পরে ঘনিষ্ঠতা হবার পর আমি গেলে তার তাক ঠিকঠাক করে দিতাম। আজিজের অনেক গল্প শুনেছি উনার কাছ থেকে। অনেকদিন পরে, আলাপে জানা গেল, উনি আমার এক স্কুলবন্ধুর ভগ্নীপতি, বন্ধু যেমন খুব ঘনিষ্ঠ, উনার সাথেও সম্পর্ক তখন এমন পর্যায়ে যে সেটাকে ঝেড়ে ফেলা সহজ না। আমি জানিয়ে দিলাম, আপনাকে আমি ভাই ডাকতে পারবো না।

তবে, আজিজেই প্রথম দেখা গেল, বই পড়া বা পড়ার ভান করাও একটি ফ্যাশন।

তবে, আজিজেই প্রথম দেখা গেল, বই পড়া বা পড়ার ভান করাও একটি ফ্যাশন। এই ফ্যাশন করতে কিছু উল্লুক টাইপ আজিজে এদিক-ওদিক আড্ডা বসাতো, গাঁজা টানতো, সন্ধ্যার সময় জিন আর টি শার্ট পরে অহেতুক মাথা ঝাঁকিয়ে চুল যে তার বয়কাট সেটা দেখিয়ে সিগারেট টানতো। কেউ বাংলা মদ খাক, কিংবা কোন্যিয়াক, গাঁজা টানুক, কিংবা সিগারেট—কোনোটাতেই আমার আসলে আপত্তি নাই, যতক্ষণ পাবলিক ন্যুইসেন্স না ছড়াচ্ছে। তবে, কোনো কাজ করাতে আপত্তি না থাকলেও, সেটা করার ভান করায় প্রায়ই আপত্তি তৈরি হয়ে যায়। মাঝে মাঝে সিঁড়িতে গাঁজাখোরদেরকে, বা সন্ধ্যায় পাছা দোলাতে দোলাতে পাঠক সমাবেশের সামনের ফুটপাথে সিগারেট টানা ‘আধুনিকা’দেরকে বেখেয়ালে পায়ে পাড়া-টারা দিয়ে থাকতে পারি!

কবি নজরুল যখন পিজি হাসপাতালে, তখন আমাদের এক আত্মীয় পিজিতে চিকিৎসাধীন, তাকে দেখতে গেলে আত্মীয় বা পরিচিত কে একজন যেন পিজিরই লোক নজরুলকে দেখার সুযোগ করে দিলো। সুযোগ মানে বিশ্রী এক উপায়, ভুল করে দরজা খুলে ফেলেছি ভঙ্গিতে নজরুলের কেবিনের দরজা খুলে ধরে রাখলে, আমরা প্রাণীটিকে দেখলাম! ছোটবেলায় জানতাম উনি বিদ্রোহী কবি, সেই ইমেজটাই মাথায় ছিল, কিন্তু হায়, আমার বাস্তবে দেখা নজরুল ভয়ার্ত বিপন্ন এক প্রাণীর মতো, যেন ভুল করে লোকালয়ে এসে ধরা পড়ে খাঁচায় বন্দি আছে, নিজ জগৎ ছেড়ে অন্য অচেনা জগতে আটকে পড়ে যথেষ্ট দুর্বলও হয়ে গেছে!

বইয়ের আলাপে অসুস্থ নজরুল আসলেন, আসলে ছফা ভাইয়ের কারণে। দোতলায় তার উত্থানপর্বে প্রথম একদিন তাকে বসে থাকতে দেখে আমার পিজিতে দেখা কাজী নজরুল ইসলামের কথা মনে পড়ে যায়। যে সুঠাম সুপুরুষ আমার মানসে আঁকা ছিলেন, তার স্থলে দেখি এক শীর্ণ, ক্লান্ত, বিষণ্ণ অবয়ব!

আমার বই পড়া এখন খুব কমে গেছে। সময় কম, নেশাও কেটে গেছে। বাসায় রাখার জায়গাও নাই। তিনবছর আগে মেলা থেকে কেনা বই এখনও পড়ে দেখা হয় নাই। এখন ইন্টারনেট আলাদিনের চেরাগ হাতে প্রস্তুত। আগে জানার সোর্স ছিল কম, এখন নেটে এত বেশি সোর্স যে সমুদ্র মন্থনে অমৃত সিঞ্চনের কৌশল রপ্ত রাখতে হয়। তারপরেও, নেট ঘাঁটা মানে যেন জিস্ট টুকে নেয়া, সারাংশ জেনে সন্তুষ্ট থেকে যাওয়া!

এক সময় টাকা ছিল না, নটরডেম কলেজ থেকে হেঁটে বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়তাম। তোকিও মেট্রোপলিসের কত রকম মনোহারি ডাক উপেক্ষা করে বইয়ের দোকানে ঢু মারতাম। নতুন বিয়ে করেছি, ঘরে বাজার নাই, কারো কাছ থেকে পাওনা টাকা উদ্ধার করেছি, না যেন ধার করেছি—কিন্তু পকেটে টাকা এসেছে, নিজের অজান্তে আজিজে গিয়ে বইয়ের জগতে ঘুরে-ফিরে বই কিনে টাকা খরচ করে হুঁশ হয়েছে, আরে বাসায় বাজার না নিয়ে গেলে না সমস্যা!

আমার বই পড়ার গল্প আপাতত শেষ।

দেশে এখন বই পড়া নিয়ে অনেক কথা চালাচালি হচ্ছে, বেশ মজাদার ব্যাপার। আমরা অনেকেই খেয়াল করি না, আমরা যা বলি, তাতে কিন্তু আমাদের ভেতরের অনেক কিছু স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়ে যায়!

আমি বরং, পড়ুয়াদের সম্পর্কে কিছু বলি। একদল পড়ুয়া, এবং পড়ুয়াদের প্রায় সবাই এরাই, তারা ট্রেনের ড্রাইভারের মতন। ছুটতে পারেন, স্টেশনের পর স্টেশন পার হয়ে যান, কিন্তু ট্র্যাকের বাইরে যাওয়ার সামর্থ্য তাদের একটুও নেই। বইয়ের লেখক জগৎ যেটুকু দেখিয়েছেন, পড়ুয়া সেটুকুই বড়জোর দেখেন। এর একটুও এদিক-ওদিক দেখার সামর্থ্য তাদের নাই, বরং এদিক-ওদিক করতে চাইলেও তাদের সিস্টেম কলাপ্স করবে। এদের জ্ঞান—জ্ঞান কথাটি আসলে এক্ষেত্রে খাটে না—বিদ্যার দৌড় কাগজে কালির ছোপে যেটুকু হরফ, সেটুকু পর্যন্তই।

আরেকদল সংখ্যায় অতি স্বল্পসংখ্যক পড়ুয়া আছেন, যারা অনেকটা সাইকেল চালকের মতো। তারা যাত্রাপথে সামনে পিছনে ডাইনে বাঁয়ে দেখতে পারেন, থামতে পারেন, প্রয়োজনে ট্র্যাক বদলাতে পারেন, শর্টকাট মারতে পারেন, এমনকি প্রয়োজনে বাহন কাঁধে তুলে যেখানে পথ নেই সেটুকু সাঁতরে পাড়ি দিতে পারেন। এরা কোনো বইয়ের দুই মলাটের মাঝে যেটুকু কালির ছাপ, তার চাইতে অনেক বেশি নির্যাস আয়ত্ত করতে পারেন। খর্ববুদ্ধির বাঙ্গাল এদেরকে প্রশংসা করতে পারে নাই, তাই ব্যাঙ্গ করে বলে, এরা ক বললে কলিকাতা বুঝেন, আমি বলি এরা ক শুনলেই যদি কিংকর্তব্যবিমূঢ়ও বুঝে ফেলতে পারেন, তাতে ঈর্ষা করার কী হলো?

আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে, পড়ুয়া যদি ট্রেনের ড্রাইভার প্রকৃতির হয়ে থাকেন, তবে তাকে সারা জীবন বই পড়ে যেতেই হবে, এবং বই পড়া তাদের জন্য অতি মূল্যবান।

আর যদি পড়ুয়া নির্যাস ছাঁকতে জানেন, সেটার সুরভি ছড়াতে জানেন, তবে বই পড়া ইটসেলফ তার জন্যে উঠতে বসতে জপ করার অতি জরুরি কোনো বিষয় নয়, সেটা এদের অনায়াসেই হচ্ছে!