প্রতিদিন নতুন দিনের শুরু হয় নানা পরিকল্পনা নিয়ে, কিন্তু সময়ের চাপে অনেক কাজই থেকে যায় অসম্পূর্ণ। ফলে দিনের শেষে আসে অগোছালো ভাব আর চাপের অনুভূতি। এই সমস্যা কাটাতে টু-ডু লিস্ট হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার—যদি তা সঠিকভাবে তৈরি করা যায়।
নতুন দিনের তালিকা বানানোর আগে জেনে নিন, আপনি কি অজান্তেই এই ৭টি সাধারণ ভুল করে ফেলছেন?
১. সকাল বেলায় লিস্ট তৈরি
আমাদের অনেকেরই অভ্যাস—দিন শুরু করেই টু-ডু লিস্ট বানাতে বসা। সকালে এক কাপ চা বা কফির সঙ্গে ভাবি, আজ কী কী কাজ করা দরকার। শুনতে বেশ গোছানো মনে হলেও, এই অভ্যাসটাই কিন্তু অনেক সময় কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ধরুন সকাল ৮টায় আপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। এখন যদি আপনি সেই সকালেই টু-ডু লিস্ট বানাতে বসেন, তাহলে তালিকা অনুযায়ী কাজ শুরু করার আগেই দিনের অনেকটা সময় চলে যাবে।
টু-ডু লিস্ট বানান আগের দিন রাতে। দিনের শেষে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে কাজের তালিকা লিখে ফেললে, আপনি মানসিকভাবে দিনটাকে শেষ করতে পারেন। তখন কাজগুলি মাথায় ঘুরপাক খায় না।
২. অনেক বেশি কাজ যোগ করা
টু-ডু লিস্টে অতিরিক্ত কাজ যোগ করা অনেক সময়ই উল্টা ফল দেয়। এমন কাজ যদি তালিকায় থাকে, যেগুলি শেষ করতে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস লেগে যেতে পারে, তাহলে শুরু করার আগেই ব্যর্থতার অনুভূতি চলে আসে।
বাস্তবতা হল, একটি দিনে খুব বেশি কাজ শেষ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। বরং তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বেছে নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। মানুষের মস্তিষ্কও স্বাভাবিকভাবে অল্প কিছু বিষয়ের ওপর মনোযোগ দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। তাই টু-ডু লিস্টের শুরুতেই ‘শীর্ষ তিন’টি কাজ নির্ধারণ করা হলে কাজের গতি ও মনোযোগ—দুটিই বাড়ে।
লম্বা টু-ডু লিস্ট সমস্যা তৈরি করে আরেকটি কারণে। বেশিরভাগ মানুষই আসলে বুঝতে পারে না, একটি দিনে তারা বাস্তবে কতটুকু উৎপাদনক্ষম সময় পায়। সময় যতই থাকুক, মানসিক শক্তি কিন্তু সীমিত। দিনের পুরো সময় কাজের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব নয়। বাস্তবে প্রতিদিন কার্যকরভাবে কাজ করার মত সময় থাকে মাত্র কয়েক ঘণ্টা।
টু-ডু লিস্ট বানানোর সময় প্রতিটি কাজের পাশে আনুমানিক সময় লিখে রাখা বেশ কাজে দেয়। পরে সেই কাজ শেষ করতে বাস্তবে কত সময় লাগছে, তা লক্ষ্য করলে ভবিষ্যতে সময় ব্যবস্থাপনা আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর হয়ে ওঠে।
৩. কোনো একদিনের সব কাজ অন্তর্ভুক্ত করা
টু-ডু লিস্ট মূলত দিনের কাজের জন্য। কিন্তু অনেক সময় আমরা সেখানে এমন সব কাজ ঢুকিয়ে দিই, যেগুলি একদিনে বা কাছাকাছি সময়ে শেষ করার কথা নয়। যেমন—বই লেখা, নতুন কোনো বড় প্রজেক্ট শুরু করা বা অনেক দিনের স্বপ্নের কাজ। এতে করে তালিকাটা বাস্তবতার সঙ্গে আর মেলে না।
এ ধরনের বড় কাজ আলাদা করে রাখা ভাল। দৈনন্দিন টু-ডু লিস্ট হওয়া উচিত ছোট, নির্দিষ্ট এবং অর্জনযোগ্য কাজ নিয়ে। বড় কোনো কাজ করতে চাইলে সেটিকে ভেঙে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করে তবেই তালিকায় রাখা উচিত। এতে কাজ শুরু করাও সহজ হয়, শেষ করাও বাস্তবসম্মত লাগে।
যে কাজগুলি “একদিন করব” বলে ভাবা হয়, সেগুলির জন্য আলাদা একটি মাস্টার লিস্ট রাখা যেতে পারে। সেখান থেকে প্রতিদিন বা প্রতিসপ্তাহ প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি কাজ বেছে নিয়ে মূল টু-ডু লিস্টে যোগ করাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
৪. সব কাজকে সমান গুরুত্ব দেওয়া
টু-ডু লিস্টে সব কাজ সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়—কিন্তু আমরা অনেক সময় সেগুলিকে একইভাবে দেখি। ফলে যেগুলি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলির গুরুত্ব হারিয়ে যায় ভিড়ের মধ্যে।
একটি ভালি টু-ডু লিস্টে অগ্রাধিকার পরিষ্কার থাকতে হবে। যে কাজগুলি ব্যক্তিগত বা পেশাগতভাবে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে, সেগুলিকেই সামনে রাখা দরকার। যেগুলি জরুরি নয় বা তেমন প্রভাব ফেলে না, সেগুলি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া ভাল।
এ ক্ষেত্রে একটি সহজ নিয়ম কাজে দিতে পারে—অপ্রয়োজনীয় কাজ বাদ দেওয়া, নিজের সময় ও দক্ষতার বাইরে থাকা কাজ অন্যের কাছে ছেড়ে দেওয়া, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কাজেই মনোযোগ দেওয়া। এতে তালিকাও হালকা থাকে, কাজও এগোয়।
৫. কাজগুলো স্পষ্ট করে না লেখা
টু-ডু লিস্টে অনেক সময়ই অস্পষ্টভাবে কাজ লেখা হয়। তখন কাজ শুরু করার সময় বোঝাই যায় না—আসলে কী করতে হবে। ফলে কাজ এগোনোর বদলে ভাবনায় সময় নষ্ট হয়।
টু-ডু লিস্ট বানানোর সময় কাজগুলি এমনভাবে লেখা উচিত, যেন দেখামাত্রই বোঝা যায়—কী করতে হবে এবং কীভাবে করতে হবে। অস্পষ্ট শব্দ বা বড় ধারণা দিয়ে লেখা কাজগুলি এড়িয়ে চলাই ভাল।
ছোট সময়ের মধ্যে যেসব কাজ শেষ করা সম্ভব, সেগুলির জন্য পরিষ্কার নির্দেশনা থাকলে কাজ করা সহজ হয়। এতে দ্বিধা কমে, কাজ শুরু করার বাধাটাও কম লাগে।
৬. একই টু-ডু লিস্ট বার বার ব্যবহার করা
অনেকে একটি টু-ডু লিস্ট তৈরি করে সেটাই দিনের পর দিন ব্যবহার করেন। কিন্তু প্রতিদিনের পরিস্থিতি এক রকম থাকে না। আজ যে কাজটি গুরুত্বপূর্ণ, কাল সেটি অগ্রাধিকার নাও পেতে পারে।
তাই প্রতিদিনের জন্য আলাদা টু-ডু লিস্ট তৈরি করাই ভাল। এতে প্রতিদিনের বাস্তবতা অনুযায়ী কাজ ঠিক করা যায়। এমনকি কেউ যদি সপ্তাহব্যাপী কোনো কাজ করেন, সেখানেও প্রতিদিন সামান্য পরিবর্তন এনে তালিকা আপডেট করা জরুরি।
নতুন দিন মানেই নতুন পরিকল্পনা—এই মানসিকতা টু-ডু লিস্টকেও আরও কার্যকর করে তোলে।
৭. ক্যালেন্ডারের সঙ্গে কাজ মিলিয়ে না দেখা
শুধু টু-ডু লিস্ট থাকলেই কাজ শেষ হয় না। সেটাকে ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, কাজের তালিকা আছে—কিন্তু কখন সেই কাজ করা হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই।
আরো পড়ুন: ফেসবুক টু-ডু লিস্ট তৈরি করবেন যেভাবে
এর ফলে দিনের সময় অন্য কাজে ভরে যায়, আর টু-ডু লিস্টের কাজগুলি পিছিয়ে পড়ে। তখন সময় বের করতে গিয়ে ঘুম, বিশ্রাম বা ব্যক্তিগত সময় কাটছাঁট করতে হয়।
তাই টু-ডু লিস্টের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য ক্যালেন্ডারে নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ করে রাখা ভাল। এতে কাজও সময়ে শেষ হয়, আর দিনের ছন্দও ঠিক থাকে।

