আমার নানুবাড়ি পারশাওল, নাটোরের সিংড়া থানার ভিতরের একটা গ্রাম।… এখানে মানুষ আমপাতা, জামপাতা কিংবা তেঁতুল বনের মতো সবুজ, গা এর রঙ মাটি মাটি।

পর্যটন এরিয়ায় ঘুরতে তেমন ভালো লাগে না , মনে হয় প্রকৃতি সাজানো গোছানো। তাই কক্সবাজার , সেন্ট মারটিন, সাজেক বা জাফলং আমাকে যতটা না টানে, তার চেয়ে বেশি টান লাগে গ্রামে গ্রামে ঘুরতে। ওখানে যা দেখি বা দেখি না, বেশি বা কম দেখি না, যা আছে তাই দেখি।

আমার নানুবাড়ি পারশাওল, নাটোরের সিংড়া থানার ভিতরের একটা গ্রাম। ইন্টারনেটের দাপট না থাকলেও প্রভাব আছে। তথাপি শাওল গ্রামকে গ্রাম বলা যায়। বলা যায় না মফঃস্বলের অপভ্রংশ বা শহুরে আদলে গড়া, গা ছমছমে ভুতুরে অমাবস্যা টাইপ গল্প গল্প গ্রাম। এখানে মানুষ আমপাতা, জামপাতা কিংবা তেঁতুল বনের মতো সবুজ, গা এর রঙ মাটি মাটি। আমি ছোটকালে প্রতিবছর এক সপ্তাহ করে এসে থাকতাম। ঐ সাতদিনকে মনে হত সাতটা রঙিন বেলুন যা হাত ফসকে উড়ে যায় দ্রুত আর আমি মন খারাপ করে ঢুকতে থাকি ঢাকায়।

প্রায় চার বছর নানুর বাড়ি যাই না। তাছাড়া কোথাও না যেতে যেতে কোথাও আর যেতে ইচ্ছা করে না। তাই আমাকে একরকম জোর করে নিয়ে যাওয়া হল। এক্ষেত্রে অরিত্রীর (ছোট বোন) ভূমিকা ছিল বেশি। আমি যখন সিদ্ধান্ত নিই যাব, শিফাকেও (খালাতো বোন) বললাম যেতে। সে আমাদের যাওয়ার কথা শুনে এক পায়ে রাজি। আমরা সকাল সকাল রওনা হই, পান্না খালামনির প্রাইভেট কারে করে। যেতে যেতে মনে হচ্ছিল অকারণে যাচ্ছি। কিন্তু অরিত্রী আর নাজলী আপুর (কাজিন) ধারণা আমি একা থাকলে ভূতের ভয়ে নিচ তলা থেকে ছয় তলা ঘুরে ফিরে নয় ছয় হয়ে নিজেই ভূত হয়ে যাব। নাজলী আপু বলল যদি আমি গ্রামে না যাই, তাহলে সে এসে আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে যাবে। অর্থাৎ আমাকে একা থাকতে দিতে কেউ চায় না। তাই ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় হোক যেতেই হল।

রোডে ট্র্যাফিক জ্যাম না থাকায় পৌঁছাতে বেশি সময় লাগেনি। তবে পৌঁছে আমার চক্ষু চড়ক গাছ; যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে, দৌড়ে বেড়াতাম সে রাস্তা পানির নিচে। গাছপালার মাথা দেখা যাচ্ছে কেবল। তাল গাছ, ডাব গাছ অথবা বট গাছ সব জলজ উদ্ভিদ হয়ে গেছে। কলা গাছের মাথা দোল খাচ্ছে পানির ওপর। এরকম দৃশ্য আগে দেখিনি, কল্পনাও করিনি। ছোট্ট ছোট্ট নৌকা আমাদের নিতে আসছে। কী অদ্ভুত! এ নৌকায় মাঝিসহ মোট ৩/৪ জন যেতে পারে। এতে এমন ভাবে বসে থাকতে হয় যেন নৌকার ব্যালান্স ঠিক থাকে। একটু উনিশ হলে নৌকাডুবি। দেখছিলাম পানির ভিতর গাছ, গাছের ফাঁক দিয়ে নৌকা যাচ্ছে এঁকেবেঁকে।

ঘরে ঢুকে সবার হাসিমুখ দেখে ভালো লাগে। তবে আবহাওয়া গরম আর ভ্যাপসা। চারপাশ পানিবন্ধ, বাতাসের আসা-যাওয়া কম। আশপাশের সব ঘর ডুবে গেছে। নানুর বাড়িকে দেখতে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো দেখাচ্ছে। কয়েকটি বানভাসি পরিবার আছে আমাদের সাথে। ছোট মামা টিটু বলল আমাদের বিলের ভিতর নিয়ে যাবে। আমি তো পুকুরে তখনই যেতে চাচ্ছিলাম। মেজো মামা বলল “পুকুর ডুবে গেছে, ওখানে সাঁতার কাটা এখন বিপদজনক।” আমি বুঝলাম না, যে সাঁতার পারে তার জন্য পানির গভীরতায় কী সমস্যা? যাই হোক, আমার অন্যান্য মামারা বলছিল সবাইকে না নিতে, রিস্ক আছে। কিন্তু যেখানে রিস্ক না থেকে সেখানে আনন্দ কোথায়?

আমার ছয় মামা আর তিন খালা; আম্মু সহ তারা দশ ভাই বোন। তাদের মধ্যে বড় মামা, নানু, বড় মামার পরিবার ও ছোট খলার পরিবার গ্রামে থাকে, সেজো মামা থাকে নাটোরে আর বাকিরা ঢাকায়। রিফাত, আরাফাত বড় মামার ছেলে; একজন কলেজে অন্যজন ক্লাস নাইনে পড়ে। ইতোমধ্যে সেজো মামার ছেলে মাহী নাটোর থেকে চলে আসছে, আমরা সবাই আসছি দেখে। সে ক্লাস সিক্সে পড়ে। ছোট মানুষ হওয়ায় একবার ভাবলাম তাকে নৌকায় না নেই। এতে মাহীর মন খারাপ হয়ে যায়, সেই সাথে নিজেকে বড় মানুষ প্রমাণ করতে সে স্ব-আবিষ্কৃত বহু পরীক্ষা দিতে থাকে।

ছোট মামা টিটু সন্ধ্যায় বিলে ঘুরার জন্য কোথা থেকে একটা নৌকা নিয়ে হাজির। আমরা যাবার জন্য প্রস্তুত; এমন সময় মেজো মামা এসে বাঁধালো ঝামেলা। শুরু হল তার ভয় দেখানোর মহড়া। বিলের পানিতে কে কীভাবে ডুবে যেতে পারি, সে নিয়ে বিশাল লেকচার। টিটু মামা তখন কারো কথা না শুনে আমাদের নিয়ে টপ করে উঠে পড়ল নৌকায়। আর উঠেই বৈঠা দিয়ে দিল পেছন দিকে একটা ধাক্কা, নৌকা ধীরে সামনের দিকে এগুতে শুরু করল।

এই নৌকা বিলের জন্য তৈরি, আকারে বড়সর, কমপক্ষে ১৫ জন যেতে পারে। আমরা সন্ধ্যা সন্ধ্যা পৌঁছে যাই বিলের মধ্যে। মামা বিলে এসে নৌকার বৈঠা আর হাল ছেড়ে দেয়, এতে বাতাসে নিজের মতো ভাসতে থাকে নৌকা। আমরা তখন নৌকার উপর শুয়ে বসে যে যার মতো রাত দেখছি, যেন আগে কেউ কোনোদিন রাত দেখিনি, জ্যোৎস্না দেখিনি।

টিটু মামা বলছিল, “আমি চাচ্ছিলাম নিজেদের মতো করে ঘুরতে, তাই নৌকার মাঝি নেইনি, এর চেয়ে নিজেরাই নৌকার মাঝি হয়ে যাই।”

আমরা সেভাবে প্রায় ২/৩ ঘণ্টা ভেসে থাকলাম । রাত বাড়ছে, তথাপি বিলের পানি উষ্ণ, বাতাসের গতি ছিল প্রায় স্থির আর গরম। মনে হচ্ছিল দুই একে বৃষ্টি হবে। তবে আকাশ মেঘমুক্ত থাকায় জ্যোৎস্নার বিক্ষেপণ ছিল না। স্থির হয়ে ছিল তার আলো। দূরে ডুবে থাকা পাটক্ষেত, ছাই রঙের অন্ধকার আর বিলের পানিতে প্রতিফলিত দুই একটা তারা দেখতে দেখতে আমরা একসময় ফিরে আসি। স্রোত না থাকায় নৌকা বাইতে মামা, আরাফাত আর রিফাতের তেমন কষ্ট হয়নি।

বাসায় ঢুকতে অন্য পরিবেশ। মামা, খালা এবং আম্মু সবাই মিলে সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে কথা বলছে, ঝগড়া করছে। কে কত অংশ পাবে, বা পাবে না এসব। তবে আনন্দের সাথে ফিরতে দেখে বাড়ির বাকিদের আমাদের সাথে বেড়াতে যাবার ইচ্ছা হয়।

দ্বিতীয় দিন আম্মু, খালামনি আর মামী আমাদের সাথে বিলে ঘুরতে নৌকায় বসলো। তাদের জন্য পাটি, মোড়া সব সরঞ্জাম নিলাম। সে সাথে ‘আমরা যা খুশি তাই করবো না’ এরকম সিদ্ধান্ত নিলাম। নৌকায় মানুষ বেশি, বাতাসের বেগ বেশি, আবহাওয়া ঠাণ্ডা। মামা আর আরাফাত বিলের ভিতরে নিয়ে বাতাসের বেগের দিক করে নৌকা আগের দিনের মতো ছেড়ে দেয়। এইদিন সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত। গতদিনের নির্জনতা নাই। বিলের মাঝখানে ডুবে যাওয়া গাছের মাথা দেখা যাচ্ছে, পাশ দিয়ে দুইটা বক উড়ে গেল । মাহী অবশ্য সাদা বক দেখে খেতে চাচ্ছিল। ও যা কিছু দেখে সব খেতে চায়, যেমন শাপলা ফুল, মাছের পোনা, বক। এইটা নিয়ে মাহীর সাথে আমার তর্ক শুরু হল, বিষয় ছিল কেন মানুষ সবকিছুকে তার খাবার মনে করে। এই তর্কে মামা, আরাফাত, অরিত্রী, শিফা সবাই যে যার মতামত দিতে থাকলো। আমরা গল্প করতে করতে কখন বিলের মাঝখানে চলে আসছি, জানি না। একটা তেতুল আর বেল গাছের মাথা দেখা যাচ্ছিল পানির ভিতর। খুব সুন্দর লাগছিল, আরাফাতকে সেখানে নৌকা ভিড়াতে বলি। বাকিরা যেতে চাচ্ছিল না, বলছিল ওখানে বন্যার কারণে সাপ থাকতে পারে।

কিন্তু আমার খুব ইচ্ছা করছিল বেল গাছের ডালে বসতে। আরাফাত আমার ইচ্ছা পূরণ করতে সবার “না” উপেক্ষা করে নৌকা, পাশাপাশি বেলগাছ আর তেতুল গাছের ফাঁকের ভিতর গিয়ে রাখল। আমি তখন লাফ দিয়ে বেল গাছে ওঠার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বেল গাছের কাঁটা আর পিঁপড়ার কারণে উঠতে পারলাম না। তবে পাশের তেতুল গাছ একদম অন্যরকম, ওখানে কোনো পিঁপড়া নাই, কোনো কাঁটা নাই, অনায়াসে বসা যায় ডালে। আমি, মাহী, অরিত্রী আর আরাফাত চারজন চার ডালে আরামে বসে পড়লাম। আম্মু ভয় পাচ্ছিল সাপ নিয়ে। মামা ভয় পাচ্ছিল মৌচাক নিয়ে। মুহূর্তে শান্ত স্থির পরিবেশটা আমাদের চেচামেচিতে চৌচির হয়ে গেল। আমার মনে হল সাপ যদি থাকে, তাহলে আমাদের উৎপাতেই আসবে।

ফেরার পথে নদীর স্রোত আমাদের বিপরীতে। যত সহজে আসছিলাম, তত সহজে ফিরতে পারছি না সেটা বোঝা যাচ্ছে। এবার নৌকা আর সামনে এগুতে চায় না। মামা আর আরাফাত মিলে একরকম যুদ্ধ করছে বাতাস, স্রোত, ঢেউ আর নৌকার সাথে। আমি নৌকার জমা পানি একটা গামলা দিয়ে তুলে বাইরে ফেলছিলাম। দেখছিলাম মামা আর আরাফাত খুব কষ্ট করে নৌকা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। এক পর্যায়ে বিলের ঐ অংশটুকু পার হলাম। তখন স্বস্তি লাগছিল। বিলের ঠিক মাঝখানে এরকম আটকে যাওয়া, এতগুলো মানুষ নিয়ে, তাও সন্ধ্যা সন্ধ্যা সময়ে—একটু ভয় হচ্ছিল হয়ত।

বাসায় ফিরে মামা ঘুমায় যায়, সে ক্লান্ত নৌকা চালিয়ে। এসময় আমার খুব চা খেতে ইচ্ছা হচ্ছিল। মামীকে বললাম, চা খাবো। মামী বলল, সিলিন্ডারের গ্যাস ফুরিয়ে গেছে। কী আর করা । চা পান ছাড়াই আমরা নৌভ্রমণ—দ্বিতীয় দিনের অনুভূতি বলা শুরু করলাম। এরকম সময় বড় মামী বলছিল যে আমরা যে তেঁতুল গাছে উঠেছিলাম সেটা নাকি ভাল না। এই তেঁতুল গাছ নিয়ে অনেক ধরনের ভৌতিক গল্প আছে। এবং মামীর মতে নৌকা আটকে যাবার পেছনের কারণ তেতুল গাছের সাথে জড়িত। কিন্তু ভৌতিক ঘটনা কেন কেবল তেঁতুল গাছ আর বট গাছের সাথে থাকে, সেটা বুঝলাম না।

আমরা এসব নিয়ে কথা বলছিলাম আর আরাফাত মাটির চুলায় চা বানাতে ব্যস্ত। সে মাটির চুলায় পানি গরম করছে। সহজে আগুন জ্বলছিল না, মাটি ভেজা ভেজা ছিল জন্য। কিন্তু শীঘ্র চুলায় আগুন জ্বলল, আর পানি গরম হতে থাকল। একসময় চা হয়ে গেল। অরিত্রী চা খায় না তেমন। কিন্তু আরাফাত বানিয়েছে জন্য সেও চা খেল। এবং আমি দেখলাম মাটির চুলায় তৈরি চা, আমার এত বছরের চা-অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সেটা আরাফাতের উৎসাহ, না মাটির চুলার গুণর—এখন বলা খুব কঠিন।

পরের দিন আম্মু আর খালামনি সকাল সকাল অন্য আত্মীয়দের বাড়ি গেল। বাসায় বড় মানুষ বিশেষ করে “নিষেধ করা বড় মানুষ” বলতে তখন আর কেউ থাকলো না। আমি, টিটু মামা, আরাফাত, রিফাত, মাহী, শিফা আর অরিত্রী আবার বিলের দিকে গেলাম। গত রাতে বৃষ্টি হয়েছিল, তাই মেঘ সাদা আর ঘন। পানির রঙ নীলচে কালো। তবে বাতাস স্রোত ভালই আছে। আমরা এইজন্য খুব দূরে না যাবার সিদ্ধান্ত নেই। ভাবলাম আজকে কেবল গোসল করবো।

আমরা একটা নিরাপদ জায়গায় নৌকা বেঁধে পানিতে যে যার মতো নেমে যাই। তবে শিফা নৌকায় বসে ছিল, সে পানিতে নামেনি। অরিত্রী আর মাহীকে সাঁতার শেখানোর চেষ্টা চলছিল। বলা যায় পানি আর পানিতে ভাসমান আমরা খুব আনন্দে ছিলাম। মনে হচ্ছিল পানিতে কারো কোনো ওজন থাকে না, বয়স থাকে না, সময় ধারণাও থাকে না। স্পঞ্জের ভিতর আঙুল ঢুকাতে থাকলে যেরকম হয় সেরকম লাগে পানিতে ডুবতে থাকার অনুভূতি। আচমকা পানির রঙ কালো লাগতে থাকে, ঢেউগুলোতে আলাদা গতি। আমার দারুণ লাগছিল। সেই সাথে খুব ঠাণ্ডা একটা আবেশ। আমি পানি থেকে উঠতে চাচ্ছিলাম না। অরিত্রী রেগে বলল, “তুমি মেঘ দেখতে পাচ্ছ না, বৃষ্টি হবে এখন, বাতাস ঠাণ্ডা—এটা বৃষ্টির লক্ষণ।”

দেখি আকাশের এক কোনে সামান্য কিছু মেঘ কালো। এরকম মেঘে বৃষ্টি হলেও, অল্প সময়ের জন্য হয়। তথাপি নৌকায় উঠলাম। মামা যতই চেষ্টা করছিল তীরের দিকে পৌঁছাতে, নৌকা ততই যেতে চাচ্ছে বিলের মাঝখানে, এদিকে বাতাসের বেগ বাড়ছে। নৌকা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না মামা, আরাফাত আর রিফাত। এরকম সময় শুরু হল ভয়ঙ্কর বৃষ্টি আর বাতাস। খোলা বিলে বৃষ্টির ছাঁট তখন সূচের মতো শরীরে বিঁধতে থাকে।

নৌকায় যদি এবার পানি উঠতে শুরু করে—সেই ভয়ে আমি পানি সেঁচতে শুরু করলাম। আমাদের নৌকায় যদিও পানি ওঠে না কিন্তু বৃষ্টির পানি সামলানোর মতো ক্ষমতা নৌকার নেই। এদিকে অরিত্রী ভয়ে চিৎকার করছে আর আমাকে বকছে, “তোমার জন্য সব হচ্ছে, কী দরকার ছিল এতক্ষণ পানিতে থাকার।”

অরিত্রী সাঁতার কিছুটা জানলেও, ভয় পায় খুব। মাহী ভয় পাচ্ছিল কিন্তু আমরা ভয় পাবো ভেবে চুপ করে ছিল আর আমাকে বলছিল, “কিচ্ছু হবে না, যদি নৌকা ডুবে তাহলে আমরা গাছ ধরে বসে থাকবো।”

আমি বুঝতে পারছিলাম না এ পরিস্থিতিতে আমার কী করা উচিত। আরাফাত দোয়া পড়ছিল মনে মনে, আর মামা চেষ্টা করছিল নৌকা নিয়ন্ত্রণে আনতে। একটু সামনে কয়েকটা কলা গাছের সারি দেখে, মামা ঐ দিকে নৌকা ভিড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু বাতাস আর স্রোতের কারণে সেখানে পৌঁছানো সহজ ছিল না। এদিকে আমরা সবাই যে ভয় পাচ্ছি সেটা চাইলেও দূর করতে পারছিলাম না। তবে আমি অবাক হই, শিফাকে দেখে। সে সাঁতার একদম না জানলেও আমাদের মধ্যে সবচেয়ে স্থির হয়ে ছিল আর আমাকে বলছিল অরিত্রীকে সামলাতে। আমি কেবল শিফার দিকে তাকালেই শান্তি পাচ্ছিলাম, কী স্থির! কোনো ভয় নাই ওর মধ্যে, যেন এসব রোজ হয়েই থাকে। সে বলল, “কী হল এটা, আমি তো ভিজতে চাইনি, তবু ভিজেই যাচ্ছি।”

অনেক কসরতের পর নৌকা কলা গাছের সাথে শক্ত করে বেঁধে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করতে থাকলাম। বৃষ্টি আর বাতাস না থামলেও নৌকা কিছুটা নিরাপদে রাখতে পারায় একটু ভাল লাগছিল। এরপর বৃষ্টি থেমে গেল। এবার আমরা বিলের ভিতর দিয়ে না গিয়ে ডুবে যাওয়া গ্রামের ভিতর দিয়ে যেতে থাকি। এতে অন্তত ঝড় হোক বা বৃষ্টি, নৌকা নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আর নৌকায় বসে কে কতটা ভয় পাচ্ছিল তা নিয়ে গল্প করতে থাকি।

ঐদিন বিকালে আমরা আর বিলের দিকে গেলাম না। মনে হল অন্য কোথাও যাই। তাই আমরা বড় রাস্তার দিকে অন্য কোনো গ্রাম ঘুরতে বের হলাম। তো ঘরের উঠান থেকেই যেহেতু পানি, নৌকা নিয়ে যেতে হল, তবে বিলের দিকে না, বড় সড়কের দিকে।

রাস্তার উপরে পানি থই থই করছে। নৌকা থেকে নেমে গোড়ালি পানিতে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। ঠিক তখন একটা কালো পিঁপড়া পায়ের পাশ দিয়ে সাঁতার কেটে শুকনা কোনো জায়গায় যাচ্ছিল, মনে হয়। আমি পায়ের আঙুলে করে শুকনা ডালের উপর ওকে রেখে দেই। আরাফাত আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি একটা পিঁপড়াকে না মেরে বাঁচানোর চেষ্টা করলে?”

এরকম আমি এমনিই করে থাকি। কিন্তু তা যে কারো বিস্ময়ের বা প্রশ্নের কারণ হতে পারে—ভেবে দেখিনি। মনে হচ্ছিল, এখানে সবাই ভাবতে পারে বা ভাবতে চায়—যেরকম আমি ঢাকায় আমার শহুরে বা প্রবাসী কাজিনদের মধ্যে দেখি না। আরেকটু সামনে যেতে দেখি আমার পায়ের পাশ দিয়ে খুব সুন্দর হলুদ ফিতার মতো চিকন সাপ এঁকেবেঁকে চলে যাচ্ছিল। আমরা সবাই একসাথে বললাম “সাপ!” “সাপ” শব্দের সাথে সবাই “আতঙ্ক” শব্দকে মিলিয়ে মারমুখো অঙ্গভঙ্গি করে আছে। কিন্তু সাপ মানেই ক্ষতিকর এমন না, বরঞ্চ সাপ খুব ইন্টারেস্টিং একটা প্রাণী। আমার সবচেয়ে ভালো লাগে সাপের গলা, অনেকটা বিড়ালের গলার মতো। যাই হোক, মাহী যে আবার সাপ দেখে চেঁচিয়ে বলেনি “সাপ খেতে কেমন” এতেই আমি খুশি। কারণ সে সবকিছু জিব দিয়ে অনুভব করতে চায় বলে আমার ধারণা।

আমরা এরপর একটা তিন চাকার রিক্সা-ভ্যানে চড়ে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাচ্ছিলাম। ঠিক কোথায় থেকে কোথায় যাচ্ছিলাম—জানি না। গ্রামের মাটির এবড়োখেবড়ো রাস্তা দিয়ে, হেলতে-দুলতে যাচ্ছিলাম। দুই পাশে ঝোপঝাঁড়। সন্ধ্যা নামতেই বাড়ছিল ঝিঁ ঝিঁ পোকার আওয়াজ। আমরা গাছের ঝুঁকে থাকা পাতার সাথে বাড়ি খাচ্ছিলাম আর মাহী বলছিল, “মনে হচ্ছে জঙ্গলে আমার পা হারিয়ে যাবে।”

আমারও এরকম মনে হচ্ছিল, যদি আমাদের পা হুট করে হারিয়ে যায় বা আমরা হুট করে উড়ে যাই, কারণ রিক্সা ভ্যান এত জোড়ে ছুটছিল যেন একটা বিমান টেক অফের আগে রানওয়েতে ছুটছে। আমাদের বাসার দিকে ফিরতে ফিরতে প্রায় ৯টা মতো বেজে যাচ্ছে। ফেরার পথে কয়েকটা জোনাকি দেখলাম, তবে সংখ্যায় কম।

ঘাটে এসে দেখি আমাদের জন্য কোনো নৌকা নাই। তবে ঘাটে নৌকার জন্য অপেক্ষা করছিল আমাদের চতুর্থ মামা কামাল। সাথে ছোট খালামনি, তার দুই বাচ্চা। ওরাও যাবে। এত মানুষ নিয়ে বিলে যাবার বড় নৌকা ছাড়া সম্ভব না, কিন্তু নৌকা তখন জেলেরা নিয়ে গেছে। আমাদের ভরসা কেবল ছোট ছোট নৌকা। আর এসব নৌকায় আমারা একবারে না, পাঁচ ছয় বারে যাবো।

আমরা তখন ছোট নৌকা আসার অপেক্ষায় ছিলাম। দুইটা ছোট নৌকা এলে সবার আগে খালামনি তার দুই বাচ্চাকে নিয়ে উঠল। এর মধ্যে কামাল মামা গোল বাঁধাল সেও উঠবে। খালামনি তো অস্থির, বাচ্চারও কান্নাকাটি। “কামাল ভাই উঠলে নৌকা ডুবে যাবে” বাচ্চারা বলছে, “আমাদের ভয় লাগিচ্ছে।” এই পরিস্থিতে চেঁচামেচি আর হট্টগোল শুরু হয়ে গেল।

“ভাই, আপনি পরের নৌকায় আসেন, ভাই” এক পর্যায়ে খালামনি তার বাচ্চাসহ লাফ দিয়ে নেমে আসে নৌকা থেকে। আর মামা নৌকার গলুইয়ে বসতে গিয়ে, ঠিক একটা ফুটবলের মতো আলতো ভাবে গড়িয়ে পানির মধ্যে পড়ে যায়, আর তখন অপর দিক থেকে মাঝি ঝপাং করে বড় সড় একটা লাফ দেয়। খালামনি তখন বলছিল, “বলছিলাম না, কামাল ভাই উঠলেই নৌকা ডুববে।” আর মামা বলছিল, “তোর লাফালাফির জন্য এই হল!”

যাই হোক এমনিতে ছোট নৌকা, তার মধ্যে নৌকায় পানি উঠে আর এত হাঙ্গামা ও ওজন বেচারা নৌকা সহ্য করতে না পেরে হাঁটু পানিতেই তলিয়ে গেল। এদিকে আরেকটা ছোট নৌকা চলে আসায় আমারা ভিজে যাওয়া মামাকে প্রথম পাঠালাম। মনে হচ্ছিল, মাঝপথে আবার না নৌকা ডুবে।

এদিকে ডুবে যাওয়া নৌকা টেনে তুলে, পানি সেঁচে যাবার জন্য প্রস্তুত করা হলেও খালামনি আর এই নৌকায় উঠবে না। আমারা তাকে বোঝানোর পর সে রওনা দিল । আমরা দেখলাম , টর্চের আলো সহ দুলতে দুলতে নৌকা চলে যাচ্ছে, দূর দেখে দেখতে পাতায় ভেসে যাচ্ছে জোনাকি—এরকম।

মিনিট কুড়ি পর প্রথম নৌকা ফিরে এলে আমরা প্রথম নৌকায় অরিত্রী আর রিফাতকে পাঠাই। এমনিতে দুপুরের নৌ-অভিজ্ঞতা আর মামার অভিজ্ঞতার পর অরিত্রীর নৌকায় আর কাউকে বসালাম না। খালি ওকে বলি মাঝখানে এমন ভাবে বসতে যেন ব্যালান্স ঠিক থাকে। ওর চলে যাবার কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় নৌকা ফিরে আসলে আমি, শিফা, মাহী, একজন আঙ্কেল আর মাঝি মোট পাঁচজন চড়ে বসি। এ পর্যায়ে আমাদের বেশ রিস্ক থাকে নৌকাডুবির। কিন্তু কেন কীভাবে আমরা এতজন উঠলাম, ঠিক জানি না। কিন্তু নৌকা চলতে শুরু করল। আমি আবার পানি সেঁচতে শুরু করলাম। আঙ্কেল আর মাঝি দুইজনের হাতে বৈঠা। আর মাহী টর্চ ধরে আছে যেন গাছের সাথে ধাক্কা না লাগে।

নৌকা দুলতে দুলতে যাচ্ছে। ছোট্ট কাগজের নৌকায় উঠলে যেরকম অনুভুতি হয় সেরকম। নৌকা যখন তখন যেদিক খুশি কাঁৎ হয়ে পড়ছে । কিন্তু আমার খুব ভাল লাগছিল। মনে হচ্ছিল পাতার উপর আমরা ক’জন পিঁপড়া ভেসে যাচ্ছি কোথাও। তবে আমরা জোরে হাসতেও পারছিলাম না, কারণ এতেও নৌকাডুবির আশঙ্কা থেকে যায়। বার বার পানি সেঁচার কারণে নৌকা আমদের পাঁচজনের ভর নিতে পারছিল। শিফা বলছিল আমাকে, “এই তোমার সাথে আসলেই যত ধরনের অদ্ভুত অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়।” আমরা ১৫/২০ মিনিট ডুবে যাবো ডুবে যাবো অনুভব নিয়ে দারুণ উত্তেজনায় বাড়ির উঠান-জলে চলে আসি। আমাদের নৌকা আর পানি এমন সমতলে ছিল যদি কোন জলজ জীব অতিথি হতে চাইত, অনায়াসে পারত।

ঘরে ফিরতে সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ছিল কামাল মামার নৌকা-ডুবির গল্প। সবশেষে আরাফাত আর টিটি মামা ফিরে এলে আমরা আমাদের এ কদিনের অনুভূতি নিয়ে গল্প শুরু করলাম। সবাই সবার ভাল লাগা, ভয়, শিহরণ, আনন্দ বলল। কেবল মাহী বলল, “আচ্ছা, আমাদের আব্বু চাচ্চুরা যদি এভাবে সম্পত্তি নিয়ে ঝগড়া করে আর ওদের কারণে যদি কখনো আমাদের আর দেখা না হয়, তাহলে?”

এ কথায় আমি, অরিত্রী আর শিফা এক যোগে বললাম, “ওদের জেনারেশনকে ওদের মতো যুদ্ধ করতে দাও, আমাদের এসবে কিছু আসে যায় না। বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে আকাশে দেখি চাঁদের চারপাশে গোল হয়ে আছে রঙধনু। শহরের টুকরা টুকরা আকাশে এ দৃশ্য দেখা যায় না।

পরদিন ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম আর লকডাউন পরবর্তী সময়ে তেমন যানজট না থাকায় পৌঁছেও গেলাম দ্রুত। আমরা যে যার বাসায় কবুতরের খোপের মতো ঘরে ঢুকতে থাকলাম । তবে গোসল করতে গিয়ে মনে হচ্ছিল আমি মাটি হয়ে ফিরে আসছি, আর আমার শরীর থেকে কাঁদা গলে গলে যাচ্ছে। দারুণ অনুভব ছিল। নিজের প্রিয় ঘর আর প্রিয় লাগছিল না। মনে হচ্ছিল এখানে আকাশ খণ্ড খণ্ড, দৃষ্টি বেশি দূর যাচ্ছে না, দিগন্ত সুন্দর! দিগন্তে সব চোখ প্রজাপতি।