Author

আয়মান আসিব স্বাধীন

Browsing

করোনা ভাইরাস চিকিৎসাক্ষেত্রের তিনটা বড় আবিষ্কারকে ত্বরান্বিত করবে, এটা তো মাত্র শুরু

যখন ইতিহাসবিদরা কভিড-১৯ মহামারি নিয়ে বই লিখবেন, এতদিন আমরা যে পরিস্থিতি পার করে আসলাম সেটা হয়ত ওই বইয়ের তিন ভাগের প্রথম এক ভাগে থাকবে। এরপর কী হতে যাচ্ছে সেটাই বরং থাকবে গল্পের বেশিরভাগ জুড়ে।

ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার বেশিরভাগ জায়গাতেই হয়তো এ মাসের মধ্যেই এই মহামারির চূড়ান্ত স্টেজ পার হয়ে যাবে। অনেকে আশা করেছিলেন আর কয়েক সপ্তাহের মাঝেই আমরা আগের জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারব, যেমনটা ডিসেম্বরে ছিলাম। দুঃখের বিষয়, তা আর হচ্ছে না।


বিল গেটস
দ্য ইকোনমিস্ট, ২৩ এপ্রিল ২০২০


আমি বিশ্বাস করি মানবজাতি এই মহামারি কাটিয়ে উঠবে ঠিকই, কিন্তু কেবল তখনই যখন বেশিরভাগ মানুষকে প্রতিষেধক দিয়ে দেওয়া হয়ে গেছে। তার আগ পর্যন্ত আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হবে না। সরকার যদি লকডাউনে থাকার নির্দেশ তুলে দেয় এবং ব্যবসা বাণিজ্যের দরজা যদি খুলেও যায়, তারপরও মানুষের মধ্যে রোগবালাই থেকে দূরে থাকার সহজাত প্রবণতা আছে। এয়ারপোর্ট ভর্তি লোকজন থাকবে না। ফাঁকা স্টেডিয়ামে খেলা হবে৷ আর বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা লেগেই থাকবে কারণ মানুষের চাহিদা থাকবে কম, আর তারা খরচও করবে রক্ষণশীলভাবে।

একদিকে উন্নত দেশগুলিতে মহামারির গতি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে তা উপরের দিকে যাবে। অথচ তাদের অভিজ্ঞতা হবে আরো বেশি কষ্টকর। গরিব দেশে, যেখানে উন্নত দেশের তুলনায় দূর থেকে খুব বেশি কাজ করা যায় না, সেসব দেশে সামাজিক দূরত্বের জন্য গৃহীত সব পদক্ষেপ অত ভালো করে কাজ করবে না। ফলে ভাইরাস ছড়াবে দ্রুত, আর তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আক্রান্তদের দেখভালও করতে পারবে না ঠিকমতো। কভিড-১৯ এর কারণে নিউ ইয়র্কের মতো শহরগুলিকেও হিমশিম খেতে হয়েছিল, কিন্তু ড্যাটা বলছে, ম্যানহ্যাটানের মাত্র একটা হাসপাতালেও বেশিরভাগ আফ্রিকান দেশের চাইতে বেশি আইসিইউ বেড আছে। লাখ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে।

দরকারি রসদগুলি যেন শুধু চড়া দাম হাঁকানোদের কাছেই না যায়, ধনী রাষ্ট্রগুলি সেদিকে খেয়াল রেখে তাদের মতো করে সাহায্য করতে পারে চাইলে৷ কিন্তু ধনী-গরীব যেকোনো অঞ্চলের জনগণই হোক না কেন, তারা কেবল তখনই নিরাপদ হতে পারবে যখন তাদের কাছে এই অবস্থার কার্যকর কোনো স্বাস্থ্যগত সমাধান থাকবে—তার মানে আমি বলছি প্রতিষেধকের কথা।

আগামি বছর মেডিকেল গবেষকরাই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে থাকবেন। ভাগ্য ভালো যে, এই মহামারির আগেও তারা প্রতিষেধকবিদ্যায় বহু দূর এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সাধারণত একটা প্রতিষেধক আপনার শরীরকে কোনো রোগসংক্রামক জীবাণুর ধরণের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য প্রথমে আপনার দেহে দুর্বল বা মৃত ভাইরাস প্রবেশ করানো হয়। কিন্তু ইমিউনিটি বা শরীরকে ভবিষ্যত রোগবালাই থেকে নিরাপদ করার জন্য আরেকটা নতুন পদ্ধতি আছে—এ পদ্ধতিতে গবেষকদেরকে বেশি করে রোগসংক্রামক জীবাণু তৈরি করার পেছনে সময় দিতে হয় না। এই নতুন প্রক্রিয়ায় তৈরি এম-আরএনএ প্রতিষেধক জেনেটিক কোড ব্যবহার করে আপনার শরীরের কোষগুলিকে নির্দেশনা দিয়ে দেয় যে কীভাবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে নিরাপত্তার জন্য উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। আর এসব প্রতিষেধক হয়তো সাধারণ প্রতিষেধকগুলির চাইতে দ্রুত উৎপাদন করা যাবে।

আমার আশা এই যে ২০২১ সালের দ্বিতীয় ভাগের মধ্যে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রতিষেধক বানানো শুরু হয়ে যাবে। যদি আসলেই তা হয়, তাহলে সেটা হবে নতুন ইতিহাস সৃষ্টির মতো এক অর্জন: নতুন একটা রোগ চিহ্নিত করা থেকে তার বিরুদ্ধে শারীরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করার দ্রুততম ঘটনা হবে এটা।

প্রতিষেধকের ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছাড়াও এই মহামারির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে আরো দুইটা সাফল্য অর্জন করতে পারব আমরা। একটা হলো রোগনির্ণয়ের ক্ষেত্রে। এরপরে যদি কোনো নতুন ভাইরাস উদয় হয়, তাহলে মানুষ হয়ত প্রেগনেন্সি টেস্টের মতো করে ঘরে বসেই ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে কিনা সেই টেস্ট করতে পারবে। অবশ্য প্রস্রাবের বদলে সেই টেস্ট হয়ত নাক থেকে নেয়া শ্লেষ্মা ব্যবহার করা লাগবে। নতুন কোনো ব্যাধি চিহ্নিত করার কয়েক মাসের মধ্যেই গবেষকরা এধরনের টেস্ট প্রস্তুত করে ফেলতে পারবেন।

প্রতিষেধকের ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছাড়াও এই মহামারির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে আরো দুইটা সাফল্য অর্জন করতে পারব আমরা। একটা হলো রোগনির্ণয়ের ক্ষেত্রে। এরপরে যদি কোনো নতুন ভাইরাস উদয় হয়, তাহলে মানুষ হয়ত প্রেগনেন্সি টেস্টের মতো করে ঘরে বসেই ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে কিনা সেই টেস্ট করতে পারবে।

আর তৃতীয় সাফল্য আসবে অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধের ক্ষেত্রে। বিজ্ঞানের এই শাখায় আমাদের বিনিয়োগ হয়েছে কম। ব্যাকটেরিয়া মোকাবেলা করার জন্য আমরা যেমনটা পেরেছি, ভাইরাসের বিরুদ্ধে অতটা কার্যকর ওষুধ বানাতে পারি নাই আমরা। এরকম আর থাকবে না। গবেষকরা অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধের বিশদ ও বৈচিত্র্যময় লাইব্রেরি তৈরি করে রাখবেন, ফলে নতুন ভাইরাসের আগমন হলে সেই লাইব্রেরি ঘেঁটে তাড়াতাড়ি কার্যকর চিকিৎসাপদ্ধতি বের করে ফেলতে পারবেন তারা।

এই তিন প্রযুক্তির প্রত্যেকটাই আমাদেরকে পরবর্তী মহামারির জন্য প্রস্তুত করবে, যাতে আমরা আক্রান্তদের সংখ্যা অল্প থাকা অবস্থাতেই আগেভাগে ব্যবস্থা নিতে পারি। কিন্তু এসবের মধ্যে চলমান গবেষণাও এখনকার অনেক সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করবে আমাদেরকে৷ এমনকি ক্যান্সারের চিকিৎসার উন্নতিতেও তা কাজে আসবে। (বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই ভেবে এসেছেন যে এম-আরএনএ প্রতিষেধক থেকে শেষ পর্যন্ত ক্যান্সারের প্রতিষেধক আবিষ্কারের দিকে যেতে পারব আমরা। যদিও মোটামুটি সুলভ দামেও এরকম প্রতিষেধক কীভাবে গণহারে উৎপাদন করা সম্ভব তা নিয়ে কভিড-১৯ এর আগে তেমন গবেষণা হয় নাই।)

(বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই ভেবে এসেছেন যে এম-আরএনএ প্রতিষেধক থেকে শেষ পর্যন্ত ক্যান্সারের প্রতিষেধক আবিষ্কারের দিকে যেতে পারব আমরা। যদিও মোটামুটি সুলভ দামেও এরকম প্রতিষেধক কীভাবে গণহারে উৎপাদন করা সম্ভব তা নিয়ে কভিড-১৯ এর আগে তেমন গবেষণা হয় নাই।)

আমাদের অগ্রগতি যে শুধু বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই হবে তা না। সেই বিজ্ঞান থেকে সবাই যেন লাভবান হতে পারে সেটা নিশ্চিত করার সক্ষমতা অর্জনেও অগ্রগতি হবে আমাদের। আমার মনে হয় ২০২১ এর পরের বছরগুলিতে ১৯৪৫ পরবর্তী বছরগুলি থেকে শিক্ষা নিব আমরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর সেসময় লিডাররা ভবিষ্যতের আরো দ্বন্দ্ব আটাকানোর জন্য জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন। আর কভিড-১৯ এর পর লিডাররা এমন সব প্রতিষ্ঠান তৈরি করবেন যা ভবিষ্যতের অন্যান্য মহামারি আটকানো নিয়ে কাজ করবে৷

জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের মিশ্রণ থাকবে সেখানে। সামরিক বাহিনি এখন যেমন নানারকম ‘যুদ্ধখেলা’য় অংশ নেয়, তেমনি সেখানে নিয়মিত ‘জীবাণুখেলা’য় অংশগ্রহণের ব্যবস্থা থাকবে। এরপর যখন কোনো ভাইরাস বাদুড় বা পাখি পার হয়ে মানুষদের মাঝে এসে ঢুকবে, সেই সময়ের জন্য এসব ব্যবস্থা প্রস্তুত করে রাখবে আমাদেরকে। তাছাড়া কোনো দুষ্কৃতিকারী যদি ঘরোয়া ল্যাবের মধ্যে ভাইরাস বানিয়ে সেটাকে অস্ত্র হিসাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে—সেক্ষেত্রেও প্রস্তুত থাকতে পারব আমরা। মহামারির জন্য প্র‍্যাকটিস করার মাধ্যমে পৃথিবী বায়ো-টেরোরিজমের ঘটনা থেকেও রক্ষা করতে পারবে নিজেকে।

ব্যাপারটাকে গ্লোবাল রাখা
আশা করি ধনী রাষ্ট্রগুলি এসব প্রস্তুতিতে গরিব রাষ্ট্রগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করবে—বিশেষ করে তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গঠনের জন্য আরো বেশি বিদেশী অনুদান দেওয়ার মাধ্যমে। এমনকি সবচেয়ে আত্মমগ্ন ব্যক্তি বা একেবারে ‘একলা চলো’ নীতির সরকারেরও এখন একমত হওয়া উচিত এতে। এই মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে যে একে তো ভাইরাস সীমান্তের আইন একেবারেই পাত্তা দেয় না, তার ওপর আণুবীক্ষণিক জীবাণুদের একটা নেটওয়ার্ক দ্বারা আমরা সবাই জৈবিকভাবে একজন আরেকজনের সাথে যুক্ত—তা আপনি এটাকে যেভাবেই দেখেন না কেন। কোনো নভেল ভাইরাস যদি গরিব একটা দেশেও আবির্ভূত হয়, আমরা চাইব সেখানকার ডাক্তারদের যেন তা চিহ্নিত করা ও আবদ্ধ করে রাখার সামর্থ্য থাকে।

এসবের কোনোকিছুই অপরিহার্য না। ইতিহাস কখনো পূর্বিনির্ধারিত কোনো গতিপথ অনুসরণ করে না। মানুষই ঠিক করে কোন দিকে যেতে হবে, হয়তো একটা ভুল মোড়ও নিতে পারে তারা। ২০২১ পরবর্তী সময়ের সাথে ১৯৪৫ পরবর্তী বছরগুলির মিল থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু এখনকার জন্যে সবচেয়ে সদৃশ উদাহরণ ১৯৪২ সালের ১০ নভেম্বর। প্রথমবারের মতো স্থলযুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে ব্রিটেন, আর উইনস্টন চার্চিল একটি ভাষণে ঘোষণা দিলেন: “এটাই শেষ নয়, এমনকি শেষের শুরুও নয়। তবে এটাকে হয়তো শুরুর শেষ বলা যেতে পারে।”

অনুবাদ. আয়মান আসিব স্বাধীন

এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার জন্য অসুস্থ কারো কিংবা তাদের টাচ করা কোনওকিছুর সংস্পর্শে আসতে হবে আপনার। আর এই ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার জন্য কোনও একটা গুজবের সংস্পর্শে আসলেই চলবে।

সিনেমা: “কন্টেজিয়ন” [২০১১];
চিত্রনাট্য: স্কট জি বার্নস

স্টিভেন সোডারবার্গ পরিচালিত ২০১১ সালের সিনেমা ‘কন্টেজিয়ন’ (অর্থ: রোগ সংক্রমণ), ওই সালে দেখে সারপ্রাইজড হয়েছিলাম। সারপ্রাইজড হবার কারণগুলিতে স্কট জি বার্নস এর লেখা স্ক্রিপ্টটা সবচেয়ে বেশি প্রকট ছিল। তবে ২০২০ সালের লোকজন এই সিনেমা দেখে সারপ্রাইজড হবেন অন্য কারণে; যে কারণের প্রাসঙ্গিকতা একদমই আলাদা, যে কারণ হয়তো আরো একটু সিরিয়াস এবং একটু বেশিই “স্পর্শকাতর”।

২০২০ সালের মার্চ মাসে এসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসকে “মহামারী” ঘোষণা করেছে। এর প্রায় দেড়-দুই মাস আগে থেকেই অবশ্য মানুষজন এটাকে মহামারী গণ্য করে আসছে, বিশেষ করে পশ্চিমারা, অন্তত যে হারে তারা আবার নতুন করে ‘কন্টেজিয়ন’ দেখা শুরু করেছে তাতে সেরকমই মনে হয়। এসময়ে মুভিটা আইটিউনসের মুভি রেন্টাল চার্টের টপ-টেনে ও গুগল প্লে’তে টপ টুয়েন্টিতে ঢুকে যায়। টরেন্ট সাইটগুলিতে গেলেও ওখানে ‘ট্রেন্ডিং’ সিনেমার তালিকায় সদ্য-রিলিজড সব মুভির সাথে ‘কন্টেজিয়ন’ আছে। ফিল্ম ক্রিটিক আর অন্যান্য লেখকও তাদের মতো করে এই সিনেমা নিয়ে অপ-এড জাতীয় লেখা লিখছেন।

করোনা ভাইরাস বিস্তার কালে এই সিনেমা এখন সারা বিশ্বের বাস্তব ঘটনাচক্রের স্তরগুলির সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাকর্মীদের থেকে শুরু করে আপাতদৃষ্টিতে ইনোসেন্ট লোকদের ভূমিকা এসব প্যানডেমিক রোগবালাই (ও সাথে আতঙ্ক) ছড়ানোর সময় কীরকম অভূতপূর্ব হতে পারে তা নিয়ে চিন্তা করতে করতে মুভিটা দেখা যায়।

‘কন্টেজিয়ন’ সিনেমার প্লটটা যেভাবে সাজানো, সেটার একটা নাম আছে—নেটওয়ার্ক ন্যারেটিভ। এরকম সিনেমায় অনেকগুলি ক্যারেক্টার থাকে। মুভিতে তাদের জীবনের ঘটনা চলে তাদের মতো করে। তারপর সেই ঘটনাগুলি কোনও না কোনওভাবে একটা আরেকটার সাথে জোড়া লাগতে থাকে এবং মুভি যতই সামনের দিকে আগায়, ততই গল্পের বড় পরিসরে প্রতিটা ঘটনার সংলগ্নতা বা ‘নেটওয়ার্ক’ দর্শকের কাছে স্পষ্ট হয়। এরকম সিনেমার পপুলার একটা নমুনা রোম্যান্টিক কমেডি ‘লাভ অ্যাকচুয়ালি’ (২০০৪)। এছাড়া আলেহান্দ্রো গনজালেজ ইনারিতু’র ‘ডেথ ট্রিলজি’র তিনটা সিনেমাও (আমোরেস পেরোস, টুয়েন্টি ওয়ান গ্রামস ও বাবেল) সিনেফাইল/সিনেফিলিয়াকদের কাছে যথেষ্ট পপুলার।

‘কন্টেজিয়ন’ শুরু হয় কালো স্ক্রিন থেকে। কে যেন কাশছে খুক খুক করে। শুকনা কাশি। তারপরেই অভিনেত্রী গুইনেথ প্যাল্ট্রোকে দেখা যায়। তার চরিত্রটাকে দেখে অসুস্থ-অসুস্থ লাগে; মোবাইলে তার গত রাতের প্রেমিকের সাথে কথা বলছে সে। কাজের বরাতে হংকংয়ে ছিল, সেই প্রেমিকের সাথে ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড হয়েছে বোঝা যাচ্ছে।

অ্যামেরিকায় ফেরত এসে একদিনের মাথায়ই মরে যায় সে। ততক্ষণে তার ছেলের মধ্যেও রোগ ছড়িয়ে গেছে, তাকে হাসপাতালে নিতে না নিতে ছেলেও মরে গেল৷ এদিকে ম্যাট ডেমনের যে ক্যারেক্টার, মানে গুইনেথ প্যাল্ট্রোর স্বামী, সে দিশাহারা। তার আগের ঘরের মেয়েকে কোনওমতে নিজের কাছে ডেকে এনে দু’জনে মিলে বন্দি জীবন কাটানো শুরু করে ওরা।

এদিকে সারাবিশ্বেই মানুষ মরছে ধুপধাপ করে।

এসবের মধ্যে চলতে থাকে অ্যামেরিকার ‘সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ বা সিডিসি’র এই নতুন ভাইরাসের কাজকারবার বোঝার প্রক্রিয়া। খুব অল্প সময়েই তারা অনেক কিছু জানতে পারে এবং পাবলিককে জানাতে থাকে—

সাবধানে থাকতে হলে মানুষদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে; জনসমাবেশ এড়িয়ে চলা লাগবে। সাবান দিয়ে বার বার ভালো করে হাত ধুতে হবে। পাবলিক প্লেসে হাঁচি-কাশি দেয়া যাবে না, মাস্ক পরে থাকতে হবে সবাইকে। তাছাড়া অযথা কুশল বিনিময়ের উপলক্ষে হ্যান্ডশেক, কোলাকুলি, ঘেষাঘেষি তো করাই যাবে না।

ভয় পাওয়া লোকজন হ্যান্ড স্যানিটাইজার সাথে করে চলাফেরা শুরু করে। শারীরিক অবস্থা না-জানা কাউকে কাছে আসতে দেয় না সহজে। উন্মাদনার চোটে অনেকে সুপার শপে আক্রমণ চালায়। লুটপাট চলে। সরকারের তরফ থেকে সংক্রমণ ঠেকাতে অনেকগুলি এলাকার ও শহরের বাসিন্দাদেরকে জবরদস্তি কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়। ফাঁকা আর জনশশূন্য হতে থাকে রাস্তা, এলাকা, দোকানপাট, শপিং মল, স্টেশন, এয়ারপোর্ট সবকিছুই। স্টুডেন্টরা কেউ স্কুল-কলেজে যায় না, চাকরিতেও অনুপস্থিতি অনেক বেশি।

কন্টেজিয়ন (২০১১) সিনেমায় কাল্পনিক একটি ভাইরাসের মহামারী নিয়ে কথা বলছেন ডাক্তার সঞ্জয় গুপ্ত (ডানে)

এসব ঘটনার সবগুলিই আমাদের করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ও পরবর্তী মড়কের সাথে মিলে। যদিও রোগের তীব্রতা ও সংক্রমণের দ্রুততায় প্রচুর তফাৎ আছে। তবে হ্যাঁ, আরেক জায়গায় তেমন তফাৎ নাই—পাবলিকের উৎকণ্ঠা, বিকৃতি, প্যারানয়া ও গাফিলতির জায়গাটাতে।

বাস্তবের সাথে আরও কিছু শিরশিরে সমান্তরাল আছে। যেমন, সিনেমাতে অতিথি শিল্পী হিসাবে (ক্যামিও) দেখা যায়, অ্যামেরিকান বিখ্যাত এক নিউরোসার্জন ও মেডিকেল রিপোর্টার ডাক্তার সঞ্জয় গুপ্ত টক-শোতে কথা বলছেন। ২০২০ সালে এসে করোনা ভাইরাস নিয়ে অনেক কিছু খোলাসা করতে তাকে আসলেও সিএনএনে আসতে হয়েছিল।

অবশ্য চিত্রনাট্যকার স্কট বার্নসের বেদাগ-চকচকে কল্পনাশক্তিতে আমাদের করোনাভাইরাস ঘিরে চলতে থাকা রেসিজম চর্চার কোনো নামনিশানা নাই। এছাড়া নিউ ইয়র্ক টাইমসের ফিল্ম ক্রিটিক ওয়েসলি মরিসের সাম্প্রতিক এক লেখা পড়ে আরো টের পেলাম, বিদেশীদের নিয়ে জেনোফোবিয়ার ব্যাপারেও এ মুভিতে কোনো ঘাটাঘাটি নাই। এগুলির বদলে আছে বরং কিছু মরিয়া হংকংবাসীর তাড়াতাড়ি ভ্যাক্সিন পাওয়ার আশায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক কর্মকর্তাকে কিডন্যাপ করে রাখার মতো ফৌজদারি ঘটনা।

২০২০ সালে সিএনএন’র একটি প্রোগ্রামে করোনা ভাইরাস নিয়ে কথা বলছেন সঞ্জয় গুপ্ত

তারপরেও, ‘কন্টেজিয়ন’ এর ভবিষ্যদ্বাণীর গুলি মানবজাতির কান এত ঘেষে গেল কীভাবে? কারণ দুইটা। এক, হলিউড ইডাস্ট্রিতে সফল সিনেমা বানানোর হদিস হিসাবে শিখিয়ে দেয়া হয়, আপনার মুভির প্লটে বাস্তবতার অনেক কাছাকাছি একটা হাবভাব থাকতে হবে। এ জন্য স্কট বার্নস প্রায় আড়াই-তিন বছর কাটিয়েছেন সিডিসি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মীদের কাছ থেকে ড্যাটা, অভিজ্ঞতা ও মতামত কালেক্ট করে। তার ভাষ্য, ওখানকার মেডিকেল কর্মীরা এটা ভাবে না যে “যদি” এরকম হয় তখন তাদের তৎপরতা কেমন হবে। বরং তাদের চিন্তা—”যখন” এরকম কোনো মড়ক লাগবে তখনকার জন্য তাদের যথেষ্ট জানাশোনা আছে কিনা।

আমাদের করোনা কালের সাথে তাই এ মুভির সাদৃশ্যের বড় কারণ এটাই যে রিয়েল ওয়ার্ল্ডের নীতিনির্ধারকদের কাজ করার ধরনের সাথে সিনেমাটার চরিত্রদের কাজের সঙ্গতি অভূতপূর্ব।

দুই, ‘কন্টেজিয়ন’ একটা রিভিশনিস্ট ডিজাস্টার মুভি। ডিজাস্টার একটা ফিল্ম জঁনরা, এ জঁনরায় প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ থেকে বাঁচার জন্য মুভির চরিত্ররা পালিয়ে বেড়ায়। উদাহরণ, ২০০৯ সালের মুভি ‘২০১২’, ১৯৯৭ সালের মুভি ‘ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে’ ইত্যাদি। এমনকি টাইটানিককেও জাহাজডুবির দিক থেকে দেখলে ডিজাস্টার মুভি ধরতে হয়। একসময় হলিউডে ডিজাস্টার মুভি প্রচুর টাকাপয়সা কামাই করত। সত্তরের দশকে ‘দ্য পোসাইডন অ্যাডভেঞ্চার’ ও ‘দ্য টাওয়ারিং ইনফার্নো’ সহ আরো কিছু সিনেমা এই জঁনরায় বানিয়ে ‘মাস্টার অফ ডিজাস্টার’ নাম পেয়েছিলেন প্রযোজক আরউইন অ্যালেন। সোডারবার্গ ও বার্নস চাচ্ছিলেন সেরকমই কিন্তু বাস্তবসম্মত একটা ডিজাস্টার মুভি বানাবেন, যেখানে পৃথিবীতে কিয়ামত নেমে আসার মতো অতিরঞ্জন থাকবে না।

কারণ মহাপ্রলয়ের চাইতে গুপ্তহত্যার আশঙ্কা দিয়ে আতঙ্কের হাওয়া আরো জোরেশোরে তৈরি করা যায়, অনেকটা হরর বা স্ল্যাশার মুভির মতো। করোনা ভাইরাসের আলাপ ছাড়াও, কন্টেজিয়নে’র কাল্পনিক ভাইরাসটা তো স্ল্যাশার মুভির মুখোশপরা খুনির মতোই সন্তর্পণে কাজ সেরে চলে যায়; পার্থক্য কেবল এই, এখানকার আততায়ীর টার্গেট-জোন জঙ্গলের মধ্যকার কোনো ক্যাবিন না, গোটা পৃথিবী।

যাই হোক, অন্য কোনও ডিজাস্টার মুভি এর আগে মনে হয় না নেটওয়ার্ক ন্যারেটিভ দিয়ে তার গল্প বলার চেষ্টা করেছে। অবশ্য হলিউড মূলধারায় এই ন্যারেটিভ ঢুকেছেই নব্বইয়ের দশকে। নেটওয়ার্ক ন্যারেটিভওয়ালা মুভিগুলির আরেকটা নাম ‘হাইপারলিংক সিনেমা’। ফিল্ম ক্রিটিক রজার ইবার্ট এই টার্মটাকে বিখ্যাত করেন। তো, রজার ইবার্টের বিবেচনায় ‘কন্টেজিয়ন’ একটা রিয়েলিস্টিক ও অচাঞ্চল্যকর সিনেমা।

রিয়েলিস্টিক হয়তো এই অর্থে যে, মুভির সাবজেক্ট ম্যাটারের সাথে দর্শকদের সম্পর্ক রক্ষার জন্য এখানে একেবারে বর্তমান পৃথিবীর আর সাধারণ জনতার ধারেকাছের অনুষঙ্গ ব্যবহার করা হয়েছে। আর অচাঞ্চল্যকর কারণ, চাইলে গল্পটা নিয়ে ফিল্মমেকাররা আরো তাগবাগ করতে পারতেন—যেমন অতিসংক্রামক ভাইরাসটার উপসর্গগুলিকে আরো ভয়ঙ্কর রূপ দিয়ে—কিন্তু উনারা সেটা করেন নাই।

তাদের সিনেমার প্রযোজক হিসাবে কোনো বড় স্টুডিও ছিল না, তবে সোডারবার্গের পরিচিতি ও পরিমণ্ডলের জন্য ইন্ডিপেনডেন্ট সিনেমা হয়েও বেশ ভালো বাজেট পেয়েছিলেন তারা। অনসম্বল কাস্টের সিনেমা এটা; অনেক সেলেব্রেটি আছেন এখানে। নামিদামি অভিনেতারা সাধারণ মানুষের চরিত্রে অভিনয় করলেও, তারা যখন সিনেমার শুরুতে বা মাঝামাঝিতেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মরে যান, তখন আসলে তারকাদেরকেই মরে যেতে দেখি আমরা।

চিত্রনাট্যকার স্কট জি বার্নস [বামে] এর সাথে পরিচালক স্টিভেন সোডারবার্গ
অনেক সময় এমন হয় যে কোনো ডিরেক্টর একবার বিশেষ কোন ন্যারেটিভ ফর্মে বিমোহিত হয়ে গেলে সেখান থেকে সহজে বের হতে চান না বা বার বার সেখানেই ফিরে যান, কিংবা তাদের ক্যারিয়ারের সবগুলি সিনেমা মিলিয়ে যে গ্র‍্যান্ড ন্যারেটিভ তারা দাঁড়া করাতে চান তার জন্য গল্প বলার ঢঙ ওইরকম হলেই সবচেয়ে ভালো হয় বলে ধরে নেন উনারা। হাইপারলিংক বা নেটওয়ার্ক ন্যারেটিভও সেরকম আসক্তিকর।

আলেহান্দ্রো ইনারিতু ক্যারিয়ারের শুরুতে একে একে তিনটা সিনেমাই ওই মডেলে বানিয়ে ফেলেছিলেন। সোডারবার্গও আগে ‘ট্রাফিক’ নামে এই ধরনের সিনেমা বানিয়েছিলেন একটা, যেটার চিত্রনাট্যকার স্টিভেন গ্যাগান পরে নিজেও নেটওয়ার্ক ন্যারেটিভে ‘সিরিয়ানা’ নামের পলিটিকাল থ্রিলার বানান। সোডারবার্গের সিনেমার নিয়মিত এডিটর স্টিফেন মিরিয়নও আগে হাইপারলিংক সিনেমায় কাজ করেছেন। ইনারিতুর প্রায় সব সিনেমাই তার এডিট করা।

‘কন্টেজিয়ন’ সিনেমায় জন্ডিস রোগীর মতো হলুদাভ কালার টোন আর এক জায়গায় বেশিক্ষণ সময় না দেয়া অথচ ধীরস্থির এডিটিংয়ের সাথে ক্লিফ মার্টিনেজের করা ইলেক্ট্রনিক মিউজিকের হাই-পিচড ধড়ফড়ানি যেভাবে শামিল হয়েছে—তাতে এই মেডিকেল ড্রামাকে একটু পর পর থ্রিলার বলেই মনে হয়। তবে অন্যান্য হাইপারলিংক সিনেমাকে যেখানে লেখকের থিম প্রচার করার জন্য ইচ্ছা করে হাইপারলিংক বানানো হয়—সেখানে ‘কন্টেজিয়নে’র কাহিনি লেখকের জোরাজুরিতে না, আপনাতেই নেটওয়ার্ক ন্যারেটিভ তৈরি করে ফেলেছে।

কিছু গৎবাঁধা ন্যারেটিভ লাইন ও হলিউডের চটক সহই (বা সেকারণেই) ‘কন্টেজিয়ন’ আমার কাছে দুর্দান্ত একটা সিনেম্যাটিক অভিজ্ঞতা। কাহিনির মূল ইস্যু যা, তার সাথে কাহিনি বলার নির্ধারিত আঙ্গিক এভাবে অবিচ্ছেদ্য হয়ে গেলে নিজের ফেভারিটিজম আমি আটকায়ে রাখতে পারি না আসলে।

ফিল্মমেকার রবের ব্রেসোঁ বিখ্যাত তার অগতানুগতিক সব ফিল্মমেকিং অ্যাপ্রোচের জন্য। এসব অ্যাপ্রোচের মধ্যে সবচাইতে প্রকট তার সিনেমাগুলিতে অভিনয়ের নমুনা। থিয়েটার থেকে ধার নেয়া অভিনেতাদের অতিরঞ্জিত সব এক্সপ্রেশনকে ‘ভাঁড়ামি’ মনে করতেন তিনি; নিজের প্রথম দুই সিনেমার পর প্রয়োজন ছাড়া আর পেশাদার অভিনেতাদের সাথে কাজ করেননি তাই।

ক্রিটিক রজার ইবার্ট ব্রেসোঁকে নিয়ে লিখেছিলেন, “উনার সিনেমায় রবার্ট ডি নিরো বা শন পেন এর মতো নায়কদের কোনো জায়গা নাই। আপনাদের মনে হতে পারে যে একারণে হয়তো তার মুভি জুড়ে আমরা কেবল জম্বিদেরকে ঘুরে বেড়াতে দেখব, কিন্তু আসলে হয়েছে এর উলটা। অভিনেতাদের কথা বলার সময় স্বরের ওঠানামা বা বিশেষ কোনো স্টাইল ফলো করতে না দিয়ে আর তাদের পারফরমেন্সকে শুধু সরল কিছু অ্যাকশনে রূপান্তরিত করে তিনি এক ধরনের বিশুদ্ধতা খুঁজে পান, যাতে তার সিনেমাগুলি দুর্দান্ত রকমের ইমোশনাল হয়।”


অনুবাদ ও ভূমিকা: আয়মান আসিব স্বাধীন


আমি ২০১৬ সালে প্রথম তার সিনেমা দেখি। ওই বছরই তাকে নিয়ে আমার একদম শুরুর প্রতিক্রিয়া হিসাবে লিখেছিলাম, “ব্রেসোঁ’র এই অনম্য পদ্ধতির লক্ষ্য মনে হয় তার ছবিতে নিজের পরিচালনা ও শৈলীর নিয়ন্ত্রণকে ছাপিয়ে অভিনয় বা কাহিনিধারাকে উঠে দাঁড়াতে না দেওয়া।”

ব্রেসোঁর তৃতীয় সিনেমা ‘ডায়েরি অফ আ কান্ট্রি প্রিস্ট’ মুক্তি পাবার পর তার এই সাক্ষাৎকারটি নেন ফ্রেঞ্চ সাংবাদিক রবের বাঁহা। ‘ক্যাথোলিক সেন্টার ফর ফ্রেঞ্চ ইন্টেলেকচুয়ালস’ প্রকাশিত ম্যাগাজিনে এটা ছাপা হয় ১৯৫১ সালের ১২ই মার্চ।

‘অঁ অ্যাজাঁ বালথাজার’ (১৯৬৬) সিনেমার শুটিংয়ের সময় অভিনেত্রী অ্যান ভিয়াজেমস্কিকে ডিরেকশন দিচ্ছেন ব্রেসোঁ

 

রবের বাহাঁ

আজকের এই আলাপের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য আমরা যখন প্রথম দেখা করেছিলাম, আমার মনে আছে, আপনি সিনেমা বানানোর ক্ষেত্রে আপনার অ্যাপ্রোচ নিয়ে বলতে গিয়ে বলেছিলেন: “আমি এমনভাবে সিনেমা বানাই যেন আমি কোনো কবিতা লিখছি। আমি আসলে একটা নির্দিষ্ট টোনের সন্ধানে থাকি।” তারপর আপনি বললেন যে শ্যুটিংয়ের সময় আপনার মাথায় কেবল সেই টোনই ঘুরতে থাকে। তার মানে ক্যামেরা অপারেটের, টেকনিশিয়ান ও বাকি সহকারীদের জন্য ব্যাপারটা বেশ “বিরক্তিকর” হয়ে যায়। এডিটিংয়ের কাজ শেষ হবার পর পুরা সিনেমাটা না দেখা পর্যন্ত তারা এর ভেতরের কাব্যিক সৌন্দর্যটা আসলে বুঝে উঠতে পারেন না।

রবের ব্রেসোঁ

আমার নামে একটা অপবাদ প্রচলিত আছে, আজকের এই প্ল্যাটফর্মের সুযোগ নিয়ে আমি প্রথমে সেই অপবাদের বিপরীতে নিজের সমর্থনে পাবলিকলি কিছু কথা বলতে চাই। অভিযোগটা হলো, পেশাদার অভিনেতাদের প্রতি আমার নাকি এক ধরনের তাচ্ছিল্য ও অবিশ্বাস কাজ করে। অথচ আমি অভিনেতাদের এই চমৎকার ক্রাফটকে পুরাদমে অ্যাপ্রিশিয়েট করি।

এ ক্রাফট চর্চা করার জন্য তাদেরকে এমন সব প্রতিভার সম্মিলন ঘটাতে হয় যেগুলিকে সহজে খাপ খাওয়ানো যায় না। মাইন্ডের ধারণক্ষমতা যেমন বাড়াতে হয়, তেমনি আত্মসমর্পণেরও দরকার আছে। আন্তরিক হবার সাথে সাথে কৌশলীও হতে হয়; আবার আত্মনিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেপরোয়া হওয়াও জানতে হয় তাদের। আমি স্বীকার করছি, এ গোটা ব্যাপারটাই আমার কাছে অনেক সময় অভাবনীয় লাগে।

রবের ব্রেসোঁ, সাথে ইতালিয়ান ফিল্মমেকার লুকিনো ভিসকোন্তি (মাঝখানে) ও অ্যামেরিকান ফিল্মমেকার অরসন ওয়েলস (ডানে)

কিন্তু আমি যখন একেবারেই অপরিচিত, অপেশাদার বা নবিশ অভিনেতাদের নিয়ে ছবি বানাই, আমি যখন আমার সিনেমায় নাটকীয় বিষয়বস্তু ও পূর্বনির্ধারিত প্লটওয়ালা কাহিনি এড়িয়ে চলি—আমি যখন একটা ল্যান্ডস্কেপকে এমন একটা ফ্রেমে সংকুচিত করে ফেলি যা কোনো মানুষের চেহারা আসার সাথে সাথেই সরে পড়ে বা গায়েব হয়ে যায়—এর কারণ, আমি অ্যাকশন বা ইভেন্ট না, বরং অনুভূতিকে তুলে ধরার চেষ্টায় আছি।

পেশাদার কোনো অভিনেতা যখন এই অনুভূতির চৌহদ্দিতে থাকেন, তখন তার ওপর আমার ক্যামেরা তাক করলেই কেমন জানি অদ্ভুত এক অস্বস্তি বোধ করেন উনি। উনি বুঝতে পারেন যে, থিয়েটার বা অন্যান্য মুভি করার সময় তার যে অভ্যাসগুলি গড়ে উঠেছে, সেসব অভ্যাস তাকে আটকে দিচ্ছে। তার বাস্তবতার কিছু নির্দিষ্ট ধরন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা—তার মেজাজ ও বিশেষ সব স্বভাব; এর সকল কিছু তাকে আটকে দেয়। বলতে গেলে তার প্রতিভাই আমার কাঙ্ক্ষিত জায়গা থেকে তাকে দূরে রাখছে ও বাধা দিচ্ছে। আর তারপর অদ্ভূতভাবে আমি নিজেও সেসব বাধার মুখোমুখি হয়ে যাই। এগুলি আমাদের দুজনের মাঝে এসে তাকে আমার কাছ থেকে একরকম লুকিয়েই ফেলে, যেন কোনো মুখোশ পরে আছেন উনি।

আমি আসলে বোঝাতে চাচ্ছি যে, আমাদের হাতে থাকা অসামান্য এই ক্যামেরা—যেখান থেকে সিনেমার সৃষ্টি—যা কিনা আমাদের প্রধান হাতিয়ার, সেই ক্যামেরাই আবার একই সাথে আমাদের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে ভয়ানক দুশমন। কারণ ক্যামেরা সব কিছু রেকর্ড করে ফেলে, নির্বোধ যন্ত্রের মতো উদাস ভঙ্গিতে যা পায় তা-ই ধারণ করে।

যুদ্ধের কয়েক বছর আগে প্যারিস দিয়ে যাওয়ার সময় চার্লি চ্যাপলিন আমাকে এই গল্পটা শুনিয়েছিলেন: “ধরেন দুর্দান্ত এক অভিনেত্রী, ধরেন গ্রেটা গার্বো একদম নিখুঁতভাবে কোনো দৃশ্যে অভিনয় করছেন,” এটা কিন্তু চ্যাপলিনের কথা, আমার না—“মনে করেন শুটিংয়ের সময় অনেক গরম পড়লো। পুরা স্টুডিও জুড়ে মাছি উড়ছে ভন ভন করে। এখন ওই সিনে পারফেকশনের সাথে অভিনয় করার এক ফাঁকে গার্বো চিন্তায় পড়ে গেলেন, আরে, আমার নাকের ওপর এখন যদি একটা মাছি এসে বসে? ক্যামেরা কিন্তু সাথে সাথে তার সেই চিন্তাটা রেকর্ড করে ফেলবে।”

ক্যামেরায় একটা ‘টেক’ নেওয়া আর ‘ধারণ’ করাকে সমার্থক ধরা হয়। এই ‘ধারণ’ করা বলতে আমরা অভিনেতাকে ধারণ করা বুঝি। তবে সেটা কিন্তু তার অভিনেতাসুলভ মেজাজকে ধারণ করা না; বরং একটা জীবিত সত্তা হিসাবে সেই অভিনেতাকে অপ্রস্তুত করে দিয়ে তার বিশেষ কোনো মুখভঙ্গি থকে বের হয়ে আসা গোপন, মহামূল্য ও বিরল এক ঝলককে ধারণ করা। এ ঝলকটাই আমাকে সব ধাঁধার জবাব এনে দিতে পারে।

‘ডায়েরি অফ আ কান্ট্রি প্রিস্ট’ এর কোন একটা প্রদর্শনীতে ব্রেসোঁ

অপেশাদার বা আনাড়ি যে অভিনেতা, তিনি তো আর অতটা আত্মসচেতন না। উনি অনেক বেশি সাদাসিধা আর স্ট্রেইট-ফরোয়ার্ড। তার ধৈর্য্যও বেশি। এই অপেশাদার অভিনেতাই একটা টেক নেওয়ার সময় নিজেকে সম্পূর্ণরূপে উজাড় করে দেন। খেয়াল করলে দেখবেন যে, সিনেমার অভিনেতাদের নিয়ে আমার এই বিশেষ কনসেপ্ট অভিনেতাদের সম্বন্ধে আমাদের প্রথাগত ধারণা থেকে একেবারেই আলাদা। কোনো পেইন্টার বা ভাস্কর তার কাজের জন্য যে মডেল ব্যবহার করেন তার সাথে এই কনসেপ্টের মিল আছে।

তো মি. বাহাঁ, এবার আপনার কথায় ফিরে যাই। এটা সত্যি যে, শুটিং চলাকালীন আমি বেশিরভাগ সময়ই শুনতে পাই, অপারেটর বা ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রীদের পুরা দলটাই চোখের কোণা দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে নিজেরা বলাবলি করছে—”এই সিনেমাটা খুব বিরক্তিকর রে ভাই!” অথবা “এই মুভি ভালোই বিরক্তিকর হবে যা বুঝছি।”

এক্ষেত্রে আমার প্রথম ব্যাখ্যা এরকম যে, সিনেমাটা হয়ত আসলেই বিরক্তিকর বা শেষ পর্যন্ত বিরক্তিকরই হবে। আবার এর আরেকটা ব্যাখ্যা এমনও হতে পারে, এই ইলেক্ট্রিশিয়ান বা অপারেটর যারা সারা বছর জুড়ে অগুনতি সিনেমার শুটিংয়ে কাজ করেন, তারা ব্যাপারটাকে এমনভাবে দেখেন যেন উনারা থিয়েটারে আছেন। এমন সব দৃশ্য দেখে তারা অভ্যস্ত যেখানে অভিনেতাদের নানারকম অঙ্গভঙ্গি, ইশারা, কথা বলার ধরন আর অতিরঞ্জিত অভিব্যক্তিগুলিকে একেবারে চরম মাত্রা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। কাজেই তাদের দৃষ্টিতে আমার পরিচালনায় সবকিছু কেমন নীরস আর অভিব্যক্তিশূন্য লাগে।

কিন্তু আমার পথ আসলে একদম আলাদা। আমি তো ডায়লগ, ইশারা, মিমিক্রি বা অঙ্গভঙ্গি নকল করার মাধ্যমে অভিব্যক্তি খুঁজি না—বরং নানা রকম ছন্দ ও ইমেজের সমন্বয় এবং সেসব ইমেজের নিজস্ব অবস্থান, সংখ্যা ও একে অপরের সাথে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যে অভিব্যক্তির সৃষ্টি হয় তারই সন্ধানে থাকি আমি।

একটা ইমেজের প্রকৃত মূল্য হলো এর বিনিময় মূল্য। কিন্তু এ বিনিময় তখনই সম্ভব হয় যখন আপনার সিনেমার ইমেজগুলির মধ্যে একটা কমন ব্যাপার থাকে, যাতে করে একটা ঐক্যের অংশ হতে পারে তারা। একারণে আমার মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে আমার তৈরি চরিত্রদের মাঝে একটা স্বভাবগত সাযুজ্য নিয়ে আসা। আর এজন্যেই আমার অভিনেতাদেরকে একটা নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে কথা বলতে বলি আমি।

বাক্যের ভেতরে থাকা কোনো শব্দের সাথে চাইলে একটা ইমেজের তুলনা করা যায়। কবিরা তো শব্দভাণ্ডার নির্মাণ করেন; তবে অনেক সময় উনারা ইচ্ছা করেই একদম সাদামাটা শব্দগুলি বেছে নেন তাদের কবিতার জন্য। আর বার বার ব্যবহার হওয়া সবচেয়ে জীর্ণ, সাধারণ শব্দটাও ঠিক জায়গায় বসাতে পারলে ব্রিলিয়ান্সের ছোঁয়া পেয়ে যেতে পারে।

আমি ৬ মাসে ৩০ কেজি ওজন কমানো  আয়মান আসিব স্বাধীন। গত কয়েক মাস যাবত এটাই আমার সবচাইতে ‘লক্ষণীয়’ পরিচয়। এ লেবেল লেগে যাওয়ার পর থেকে পরিচিত, আধাপরিচিত ও স্ট্রেঞ্জাররা আমার কাছে খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চান, ঠিক কী উপায়ে আমি এত এত লোকের চোখের সামনে আক্ষরিক অর্থেই আপাদমস্তক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলাম।

আমার বরাবরের উত্তরটা একঘেঁয়ে আর খুবই অপ্রযোজ্য: ডায়েট ও জিম। কেউ আসলে এই জানা উত্তর চান না। গন্ডগোলটা প্রশ্নের ধরনে।  সবাই যে কথাটা জানতে চান, কিন্তু ঠিকমতো আর্টিকুলেট করতে পারেন না, সেটা হলো— নিজেকে ঠিক কী ধরনের দিকনির্দেশনা দিতে পারলে সহজেই খাবারদাবার ও কায়িক শ্রমের ব্যাপারে আপোস করায় অভ্যস্ত হওয়া যায়।

আপনি ঠিক কোন কোন খাবার খাবেন, সেজন্য নিউট্রিশনিস্ট আছেন। জিমে গেলে জিমের ইন্সট্রাক্টরই আপনার চাহিদামাফিক দেখিয়ে দিতে পারবেন, আপনার কোন ধরনের এক্সারসাইজগুলি করা দরকার। কিন্তু আমি সেসব নিয়ে না, আলাপ করতে চাই আপনার মাইন্ডসেট শিফট করা নিয়ে।

জিম করতে ভালোই লাগে; আয়নার মধ্যে ঘিরে থেকে যন্ত্রপাতি উঠানামা করিয়ে দারুণ একটা ম্যাস্কুলিন আবেশে সময় পার করা যায়। ঠিকমতো খাবার না খেয়ে থাকার মধ্যেও আত্মতৃপ্তি আছে, বিশেষ করে আশেপাশের সবাই যখন জানবে আপনি কতটা সচেতনতার সাথে এই ব্যাপারে এফোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন।

কিন্তু সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো ডিসাইড করা। আজকে জিমে যাবেন, নাকি ডে অফ রাখবেন? আজ চিট মিল খাবেন, নাকি কালকে? বন্ধুর জন্মদিনের দাওয়াত বা বিয়ে বাড়িগুলি কি একের পর এক এড়িয়ে যেতে থাকবেন, নাকি একটায় গিয়ে একবার ভরপেট খেয়েই দেখবেন?— কয়েক সেকেন্ডের এরকম দোদুল্যমানতার পর গৃহীত সিদ্ধান্তই আসলে আপনার মাইন্ডসেটের নির্ণায়ক।

এই সিচুয়েশনগুলিতে, এবং সব মিলিয়েই আপনাকে সাহায্য করতে পারে এমন কিছু মাইন্ডসেট ও টিপস নিয়ে নিচে আলোচনা করলাম। কিন্তু পূর্বশর্ত হলো, আমি ধরে নিতেছি আপনার ব্লাড প্রেশারের সমস্যা, ডায়াবেটিস কিংবা কিডনি, হার্ট, ফুসফুস ও  অন্যান্য অঙ্গজনিত কোনো ক্রনিক রোগবালাই নাই। এসবের কোনওটা থাকলে অবশ্যই আগে আপনার রেগুলার ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তার পর নিচের টোটকাগুলি ফলো করবেন।

বাইরের কোনো কিছু খাবেন না প্লিজ

রুল অফ থাম্ব: যেসব খাবারের স্বাদ মুখে লেগে থাকে, ধরে নিবেন সেসব খাবার বাই ডিফল্ট আপনার জন্য অস্বাস্থ্যকর। তাই ভাত, রুটি, আলু কম খাবেন। আরো ভেঙে বললে, কার্বোহাইড্রেট ও ফ্যাট খাওয়া একদম কমিয়ে দিবেন। আর এই পরম্পরা মানতে হলে একদম শুরু থেকেই বাইরের খাবার খাওয়া বাদ দিতে হবে।

দোকান থেকে কিনে কোনো খাবার খাবেন না। সেটা প্যাকেটজাত কিছু হোক, কিংবা কোনো ফুড কোর্টের প্ল্যাটারই। বন্ধুদেরকে জানিয়ে দেন আপনি ডায়েটে আছেন। তাদের সাথে আড্ডা দেয়ার সময় বিচ্ছিন্ন না থাকার জন্য দরকার হলে পানি কিনে খান। কোক, পেপসি, স্প্রাইট বা এধরনের সব রকম সফট ও এনার্জি ড্রিংক—কার্বোনেটেড বেভারেজ আপনার জন্য পুরাপুরি নিষিদ্ধ। মনে করে নেন, ২৫০ মি.লি. সফট ড্রিংক আপনার ৭ দিনের ডায়েট নষ্ট করে দিতে পারে।

বাড়তি চিনি ও মিষ্টি খাবার খাওয়া একদম বাদ দিয়ে দেন

চা খাওয়ার অভ্যাস থাকলে একটু কষ্ট হবে এক্ষেত্রে। তবে চা যদি আপনার নিয়মিত কাজে মনোযোগের জন্য একান্তই অনিবার্য হয়, তাহলে লেবু চা খাইতে পারেন। লেবু আপনার এম্নিতেও খাইতে হবে। প্রতিদিন অন্তত এক গ্লাস লেবুর শরবত খাবেন; তবে এর সবই চিনি ছাড়া। এছাড়া দিনে অন্তত এক কাপ গ্রিন টি খাওয়া দরকার।

কিন্তু চিনি ছাড়া চা যতটা না উপভোগ্য, তার চাইতে শুগার-ফ্রি কফি কিন্তু বেশ চলনসই। কফি খাওয়ার অভ্যাস (না থাকলে) করতে পারেন। সবাই কফির কথা বললে নেসক্যাফে ছাড়া কিছু দেখতে পান না, তবে চিনি ছাড়া খাওয়ার জন্য নেসক্যাফের চাইতে ম্যাক কফি (Mac Coffee) রেকমেন্ড করব আমি।

ফ্যাশন সচেতন হোন

পরের এই দুইটা পয়েন্ট শুধু তাদের জন্য যারা “দেখতে” মোটা ও শারীরিক গড়ন পাল্টাতে চান। উনারা নিজেদের কাপড়চোপড়ের পছন্দে পরিবর্তন আনতে পারেন। দেহের আকারের জন্য যেসব কাপড় পরে খুব একটা স্বস্তি পান না, ওজন কমিয়ে সেসব পরতে পারাকে আপনার উদ্দেশ্য হিসাবে নিতে পারেন আপনি।

তাছাড়া নিজের পোশাক রীতি নিয়ে সচেতন হওয়া অন্তত একদিক দিয়ে নিজের শরীরের প্রতিই আপনার পর্যবেক্ষণ বাড়ায়। কেতাসচেতন বন্ধু বা কলিগদের সাথে আলাপ বাড়ান। তাদের কাছ থেকে সাজেশন নেন।

মোটিভেশনাল ভিডিও ও লোকদেরকে দেখেন, মোটিভেটেড হন

ওকে, বডি ট্রান্সফরমেশনের ভিডিও দেখাটা কার্যকরী। কেউ শুধু ওজন কমানোর মাধ্যমেই দেখতে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যাচ্ছে, এই ধারণাটা সহজাতভাবেই চমৎকারিক। যারা সাকসেসফুলি ওজন কমিয়েছেন, তাদের ইন্টারভিউ দেখেন। যেমন, প্রাথমিক অবস্থায় অভিনেতা ক্রিস প্র‍্যাটের এক্সারসাইজ নিয়ে বলা কথাগুলি আমার কাছে অনেক ইনসাইটফুল মনে হয়েছিল:

“পেছনে তাকালে ৮ মাস বা ৬ মাস কিছুই মনে হয় না। অথচ সামনের কথা চিন্তা করলে ৮ ঘন্টাও অনেক লম্বা সময় লাগে৷ আপনি ফিট হওয়ার চেষ্টা করেন বা না-ই করেন, সময় কিন্তু একই গতিতে আগাতে থাকবে। এখন তাহলে ভেবে দেখেন, ৮ মাস পর নিজেকে কীরকম দেখতে চান আপনি?”

আমার ধারণা ছিল, এমন কিছু লোক আছেন যাদের দেহের গড়নটাই এমন যে তারা যতই ওজন কমান না কেন, তাদের দেখতে সবসময় “মোটা” গোত্রেরই লাগতে থাকবে; যেমন অভিনেতা জোনাহ হিল। অথচ ২০১৭ তে এসে মিস্টার হিল নিজেই আমার ধারণার ভুল ধরিয়ে দিলেন।

ওজন কমানো
অভিনেতা জোনাহ হিল এর বডি ট্রান্সফরমেশন

এছাড়া আরও কিছু ভাবনাগত সুবিধা আমি পেয়েছিলাম। আমার প্রিয় লেখক ও ফিল্ম ক্রিটিক রজার ইবার্টকে একবার ডিরেক্টর ভিনসেন্ট গালো “মোটা শুওর” বলে গালি দেন, কারণ গালো’র সিনেমা “দ্য ব্রাউন বানি” নিয়ে ইবার্ট তার রিভিউতে নেগেটিভ মন্তব্য করেছিলেন। এর জবাবে ইবার্ট বলেন, “একদিন আমি চিকন হয়ে যাব, কিন্তু ভিনসেন্ট গালো তো সবসময়ই ‘দ্য ব্রাউন বানি’ সিনেমার ডিরেক্টর থেকে যাবেন।”

ওজন কমানো
৮৬ পাউন্ড কমানোর আগে-পরে রজার ইবার্ট

ওই ঘটনার দেড় বছর পর ইবার্ট জানান, “কথাটা বলার পর থেকে ৮৬ পাউন্ড ওজন কমিয়ে ফেলেছি আমি। কিন্তু ভিনসেন্ট গালো দেখা যাচ্ছে এখনো ‘ব্রাউন বানি’র ডিরেক্টরই রয়ে গেছেন।”

যাই হোক, শুধু আমার পরিবর্তন দেখেই এখনো পর্যন্ত জিমে ভর্তি হয়েছেন চারজন, আর খাবারের ব্যাপারে সচেতন হওয়াদের সংখ্যা তো তার থেকেও বেশি। তাই সেলেব্রিটিই হতে হবে এমন কোনও আবশ্যকতা নাই; নিজের পছন্দের ব্যক্তিত্বদের ছাড়াও আশেপাশে থাকা বন্ধু, আত্মীয় এবং কলিগদের মধ্যে এই প্রকারের অ্যানেকডোট খুঁজে দেখেন পান কিনা। কাজে দিবে।

পানি খান, অনেকবার করে

প্রতিদিন আপনার শরীরে সবচেয়ে বেশিবার প্রবেশ করা উপাদানটি হতে হবে পানি। দিনে অন্তত ৩ থেকে ৪ লিটার পানি খান। এত পানি কীভাবে খাবেন? বাসায়  ও অফিসে এমন সব গ্লাস সংগ্রহ করে রাখুন, যেগুলিতে একবারে অন্তত ২৫০ মি.লি. পানি ভরা যায়। এভাবে করে প্রতি দুই গ্লাসে আপনি হাফ লিটার পানি খেয়ে নিতে পারবেন।

খুব বেশি ঠান্ডা পানি খাবেন না। আর কখনোই শুধু এক গ্লাস পানিতে ক্ষান্ত দিবেন না। যখনই পিপাসা পাবে, অন্তত দুই গ্লাস পানি খান। প্রতি বেলায় খেতে বসার দশ-পনেরো মিনিট আগে দুই গ্লাস করে পানি খেয়ে নিবেন। হ্যাঁ, এত পানি খেলে টয়লেটে আসা-যাওয়া বাড়বে অবশ্যই; সেদিকটা মাথায় রাখবেন।

নো চিট মিল

যারা ডায়েট ও জিম করেন, তাদের কাছে “চিট মিল” টার্মটা অনেক বেশি পরিচিত। রুটিনের একঘেয়েমি থেকে নিবৃত্ত হবার জন্য সপ্তাহের বা মাসের কয়েকটা নির্দিষ্ট দিনে তারা পেট ভরে পছন্দের খাবার খান। ইন্টারেস্টিং তরিকা যদিও, কিন্তু আপনার মূল উদ্দেশ্যের জন্য সমস্যাজনক।

চিট মিল যদি খেতেই হয়, তাহলে সময়ের হিসাবে না, লক্ষ্যের হিসাবে খান। সপ্তাহে একদিন না খেয়ে আপনার ছোট ছোট টার্গেটগুলি পূরণের পর খাবেন। ধরেন, শুরুতেই ঠিক করে নিলেন, আপনার ওজন ৩ কেজি না কমা পর্যন্ত চিট মিল খাচ্ছেন না। এভাবে করে একেকটা টার্গেট সেট করে নিন; একেকটাতে পৌঁছাবেন, আর চিট মিল খেয়ে নিজেকে পুরষ্কৃত করবেন। তবে চিট মিলকে আবার ‘চিট ডে’তে পরিণত করে ফেলবেন না প্লিজ। যা খাবেন, ওই একবেলাতেই। বাকি দুই বেলা ডায়েট অনুযায়ী চলার চেষ্টা করেন।

পরিবারের সহায়তা নেন

নিজের খাদ্যাভ্যাস ও শরীরচর্চার ব্যাপারে যে সিদ্ধান্তই নেন না কেন, পরিবারের সদস্যদেরকে এর সাথে জড়িত করে ফেলেন। প্রতিদিনকার খাবার নির্বাচনে পরিবর্তন আনা মানে কিন্তু আপনার সম্পূর্ণ লাইফস্টাইলই পালটে ফেলা। কাজেই আপনার যাপন রীতি পাল্টাবেন, অথচ ফ্যামিলির লোকরা লক্ষ করবে না, এই দুরাশায় থাকাটা নিষ্প্রয়োজন।

সকালে, বিকাল, রাত ও দুপুরে ভিন্ন ভিন্ন রকমের খাবার খাওয়া এবং দিনের নির্দিষ্ট সময় ব্যয়াম করা— এর তাৎপর্যই হলো আপনি একটা রুটিনের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছেন। সেই রুটিন থেকে ছোট ছোট বিচ্ছিন্নতাও আপনার মুড সুইং করাবে। সেটা সামাল দেওয়ার জন্য হলেও তো সাপোর্ট দরকার আপনার।

সব ধরনের মুদ্রাদোষ থেকে বের হয়ে আসার ট্রাই করেন

আপনার মাঝে যে রকমের কম্পালসিভ আচরণই থাকুক না কেন, সেটা বদলানোর চেষ্টা করতে হবে। সবকিছু গুছিয়ে রাখা বা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আশেপাশের জিনিসপাতি পরিষ্কার করা—  এরকম শুচিবায়ূ জনিত সমস্যা থাকলেও সেদিকে বাড়তি মনোযোগ দিয়ে তা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেন।

এমনকি দাঁত দিয়ে নখ কাটা বা আলাপের সময় একই শব্দ বারবার ব্যবহার করার মতো সাধারণ বদভ্যাসগুলি দূর করাটাও আপনার লাইফস্টাইলে প্রভাব ফেলবে। কারণ আত্মনিয়ন্ত্রণ ছাড়া ওজন কমানো সম্ভব না আসলে, আর এসব গৌণ পরিবর্তনই শেষ পর্যন্ত আপনার মেজাজকে মজবুত করে।

ভবিষ্যতের কোনো ঘটনায়  আপনি কীরকম অনুভব করবেন তা এখনই বোঝার চেষ্টাকে সাইকোলজিস্টরা বলেন ‘এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং ‘বা ‘অনুভূতিমূলক পূর্বাভাস’। তারা মনে করেন, আমরা এই কাজ খুব একটা ভাল পারি না।  ‘বর্তমান’ এর ফিল্টার দিয়ে ‘ভবিষ্যৎ’ দেখতে সমস্যা হয় আমাদের। ফলে  কী আমাদের ভবিষ্যতে সুখের যোগান দিতে পারবে, সে হিসাবে প্রায়ই গড়বড় হয়ে যায়।

এ বিষয়ক গবেষণা ও আবিষ্কার নিয়ে ২০০৬ সালে নিউ ইয়র্কের আলফ্রেড এ. কা’নফ প্রকাশনী থেকে বের হয় আমেরিকান সোশ্যাল সাইকোলজিস্ট ড্যানিয়েল গিলবার্টের বই  স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’। 

১৯৯৬ সাল থেকে আমেরিকার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সাইকোলজি ডিপার্টমেন্টে প্রফেসর হিসাবে কাজ করছেন গিলবার্ট। আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস প্রদেশের ক্যামব্রিজ শহরে থাকেন তিনি।

নিচে থাকছে পেঙ্গুইন র‍্যানডম হাউজ ওয়েবসাইটের প্রশ্নোত্তর সেকশনে  প্রকাশিত ‘স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’ বই সম্পর্কিত সাক্ষাৎকারের বাংলা অনুবাদ।

সাইকোলজিস্ট ড্যানিয়েল গিলবার্টের সাক্ষাৎকার

অনুবাদ : আয়মান আসিব স্বাধীন

আপনার কাছে ‘অনুভূতিমূলক পূর্বাভাস’ (এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং) এর সংজ্ঞা কী? বেশ কিছু জায়গায় আপনি বলেছেন, আপনি নাকি সুখ নিয়ে গবেষণা করেন—এ দুইটা বিষয় ঠিক কীভাবে যুক্ত?

মানুষজন যখন এমন আন্দাজ করার চেষ্টা করে, ভবিষ্যতে ঠিক কোন জিনিসগুলি তাদেরকে সুখী করে তুলতে পারবে, তখন তাদের হিসাবে ভুল হয়। এ প্রক্রিয়াকেই টিম উইলসন এবং আমি ‘এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং’ বলেছি। “আমার মনে হয় আমি ভ্যানিলার চাইতে বরং চকলেট বেশি প্রেফার করব” অথবা “ব্যাঞ্জোবাদক হওয়ার চাইতে আইনজীবী হওয়ার ইচ্ছা বেশি আমার”—যিনি জীবনে কখনো এমন কিছু বলেছেন, তিনি আসলে ‘এফেক্টিভ ফোরকাস্ট’ই করেছেন। এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং করার পর তাদেরকে কখনো কখনো কষ্ট করে বুঝে নিতে হয় যে তাদের ভুল হয়েছিল। ‘স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’ বইয়ে এটাই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে যে কেন এবং কীভাবে আমাদের মস্তিষ্কের কাঠামো এধরনের ভুল করার জন্যই গঠিত, আর এক্ষেত্রে কী কী করার আছে আমাদের।

এফেক্টিভ ফোরকাস্টিং নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন কীভাবে? এ বিষয়ে কোন জিনিসটা আপনাকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী করে?

দশ বা পনেরো বছর আগে যখন আমার ডিভোর্সের কাজ চলছিল, তখন হুট করেই আমার গুরু মারা গেলেন। আমার টিনএজ ছেলেটাও ভাল সমস্যায় পড়েছে তখন, আর আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে সম্পর্কও বেশ খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু আমার অবস্থা… খুব একটা খারাপ ছিল না আসলে। এসব ঘটনার এক বছর আগে যদি আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন, এর মধ্য থেকে যেকোনো একটা ঘটনার মুখোমুখি হলেও আমার কী হাল হবে, আমি হয়ত বলতাম খুবই লম্বা সময়ের জন্য একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ব আমি। তেমনটা কিন্তু হয় নাই। আমি অবশ্যই খুব উচ্ছ্বসিত ছিলাম না, তবে যতটা বিচলিত হয়ে পড়ব বলে মনে করতাম তার ধারেকাছেও কিছু হয় নি। আর তখনই আমি চিন্তা করা শুরু করলাম যে, এ ধরনের দুর্ঘটনার আবেগজাত ফলাফল নিয়ে আমার আগের ধারণায় যে ভুল হত, তা কি কেবল আমারই হয় নাকি অন্যরাও একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। এরপর আমি আর মনোবিদ টিম উইলসন একসাথে কাজ করা শুরু করি।

বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা করলাম দু’জনে মিলে। যা জানতে পারলাম তা রীতিমত হতবুদ্ধি করে দিল আমাদের। ভবিষ্যতের ঘটনাবলির প্রতি তাদের আবেগী অবস্থান কী রকম হবে, সে সম্বন্ধে নিয়মিতই মানুষ নাটকীয় সব ভুল ধারণা করে থাকে। এসব ফলাফল থেকে একটা নির্দিষ্ট ধারার অনুসন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়ি আমি, যা এখনো শেষ হয় নাই। আর ‘স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’ হল এ ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত যা জানতে পেরেছি তার রিপোর্ট। আমি যে প্রশ্নটা নিজের কাছে করেছিলাম, তার উত্তর খুঁজে পেতে আমার পনেরো বছর লেগেছে। সামনে যে লোকটা এই প্রশ্ন করবেন, তিনি যেন একটু তাড়াতাড়ি এর উত্তর খুঁজে পান সেজন্যেই বইটা লিখেছি আমি।

এই ফিল্ডে আপনার গবেষণা দিয়ে ঠিক কী ধরনের অর্জন আশা করছেন আপনি? আপনি কি মনে করেন এ বিষয়ে উত্তরোত্তর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগুলি মানুষের ওপর কীরকম প্রভাব রাখবে তা নিখুঁতভাবে নির্ণয় করা যাবে?

আমি বরং বলব যে, আমরা এফেক্টিভ ফোরকাস্টিংয়ের ভুলগুলিকে বোঝার চেষ্টা করছি। যাতে এসব ভ্রান্তি দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় খুঁজে বের করা সম্ভব হয়। কিন্তু সমস্যা হল ফোরকাস্টিং বা পূর্বাভাসজনিত ভ্রান্তি ঠিক কোনো ‘অসুস্থতা’ না যার ‘নিরাময়’ খুঁজে বের করতে হবে। অনেকে মনে করেন, আন্দাজে এসব ভুল হওয়া হয়ত আমাদের জীবনে দরকারি ভূমিকা রাখে। সবকিছু ঠিকঠাক মত হলে আমাদের কতটা ভাল লাগবে অথবা বিপদের সময় আমরা কতটা খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাব—তার মাত্রা যদি আমরা বাস্তবের চাইতে বেশি ধরে রাখি, তাহলে দুর্ঘটনা এড়িয়ে সবকিছু ঠিকমত করার জন্য আরো বেশি জোর দিব আমরা।

উদ্বেগ ও ভয় খুবই প্রয়োজনীয় দু’টি অনুভূতি, যা আমাদেরকে গরম চুলায় হাত দেওয়া, পরকীয়া করা বা আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে খোলা রাস্তায় খেলতে দেওয়া থেকে বিরত রাখে। সন্তানসন্ততি ও টাকা-পয়সা যে শেষ পর্যন্ত আমাদেরকে প্রচন্ড রকমের খুশি করতে পারে না কিংবা ডিভোর্স আর রোগবালাই যে আমাদেরকে দুঃখের চোটে একেবারে বেপরোয়া করে তোলে না, সে খবর আগে থেকেই পেয়ে গেলে কী আমাদের জন্য ভাল হবে? হতে পারে… আবার নাও হতে পারে।

তবে আমার দৃঢ় ধারণা, সবকিছু বিবেচনা করে দেখলে, ভবিষ্যতের কোনো বিব্রতকর ও পীড়াদায়ক পরিস্থিতি আর ট্র‍্যাজেডি আমাদের আবেগে কীরকম প্রভাব ফেলবে তা আগে থেকে সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হলে আমাদের উপকারই হবে বেশি। ধরেন, আপনি পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন; আকাশে প্রচন্ড বিদ্যুৎ চমক আর ঝড় হচ্ছে চারিদিকে। এখন আপনার যাত্রী জানতে চাইলেন, এ অবস্থায় গাড়ির ওয়াইপার ঘোরানো বন্ধ করে দিলে কোনো লাভ হবে কিনা। এটা কিন্তু ঠিক, ওয়াইপার বন্ধ করলে কিছু সুবিধা অবশ্যই পাওয়া যাবে। যেমন, ওয়াইপারের বিরক্তিকর ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটা তো অন্তত আর হবে না। তবে এটাও জোর গলায় বলা যায় যে, ওয়াইপার বন্ধ করায় সুবিধার চাইতে বরং ঝুঁকি অনেক বেশি। কারণ গাড়ি চালানোর সময় আপনি ঠিক কোথায় যাচ্ছেন সেটা দেখে নেওয়া সাধারণত ভাল একটা আইডিয়া—আর ওয়াইপার চালু থাকার এ সুবিধাটা তো আমাদের কাছে খুবই পরিষ্কার।

যাই হোক, গাড়ি চালানোর মত করে আমরা সবাই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। তাই আমার মাথায়ও একই যুক্তি কাজ করে। এফেক্টিভ ফোরকাস্টিংয়ের যদি কোনো গুপ্ত সুবিধা থেকেও থাকে, তার সাথে সংশ্লিষ্ট সব ঝুঁকির পরিমাণ সেসব সুবিধাকে সহজেই বাতিল করে দিবে।

আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, আমার গবেষণাকাজ দিয়ে ঠিক কী অর্জন করার আশা করছি আমি। এর একটা বাস্তবিক পরিণতির কথা তো বললামই। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, ভিতরে ভিতরে আমি এমন একজন লোক যে কিনা হিউম্যান নেচার নিয়ে অনেক বেশি কৌতূহলী। আমার রিসার্চ থেকে আমি আসলে আরো গভীরভাবে বুঝতে চাই, আমরা কারা এবং আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কী। এই গবেষণা থেকে যদি ব্যবহারিক কোনো সুফল পাওয়া যায়, আমি খুশি। না পাওয়া গেলেও বিন্দুমাত্র দুঃশ্চিন্তা নাই আমার। আচ্ছা, ইউনিভার্স কীভাবে শুরু হয়েছিল তা জানতে পারা বা কোনো শূককীটের বিবর্তন বুঝতে পারার প্রায়োগিক উপকারিতা কী? আমার মনে হয় আমাদের একটা ভুল ধারণা আছে যে, কোনো জ্ঞান কতটুকু মূল্যবান তা নির্ভর করে আমাদের জীবনে তাৎক্ষণিক কোনো বাস্তবিক উন্নয়ন ঘটাতে সেই জ্ঞান কতটা কাজে আসছে তার উপর। অথচ জ্ঞানই হল চূড়ান্ত উদ্দেশ্য, উদ্দেশ্য হাসিলের পন্থা না।

এই গবেষণা ক্ষেত্র আগামী দশ বছরে কোথায় পৌঁছাতে পারে বলে ভাবছেন আপনি? এমন সাম্প্রতিক বা নতুন কোনো আবিষ্কার আছে কি যা আমাদের সাথে শেয়ার করতে চান?

বিজ্ঞানের মজার ব্যাপার হল, কেউ জানে না সামনে তা কোথায় নিয়ে যাবে আমাদেরকে। বিজ্ঞান হল এমন এক ববস্লেজ গাড়ি যার স্টিয়ারিংয়ে কেউ বসে নেই। আমরা যদি বলতেই পারতাম যে আগামী দশকে আমরা কী আবিষ্কার করতে পারব, তাহলে অলরেডি তা আবিষ্কার করে ফেলতাম আমরা। তবে শুধু একটা ব্যাপার আমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারি যে, আপনি বা আমি কেউই এই গবেষণাক্ষেত্রের গতিবিধির ব্যাপারে আপনার প্রশ্নের জবাব একদম সঠিকভাবে দিতে পারব না। বিজ্ঞানের গল্প সবসময় অতীতের দিকে তাকিয়েই বলা হয়।

তবে সাম্প্রতিক আবিষ্কারের কথা বললে… খুবই প্রতিভাবান একজন সহকর্মী আছেন আমার (ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়া’র টিমোথি উইলসন)। আমাদের দু’জনেরই ল্যাবরেটরি ভর্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রছাত্রী আছেন। তার মানে প্রতি মাসেই আমরা এমন নতুন কিছু আবিষ্কার করি যা দেখে খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে যাই আমরা (অবশ্য যতটা উচ্ছ্বাস কাজ করবে বলে ভেবে রাখি, ততটা না হলেও প্রত্যাশিত পরিমাণের খুব কাছাকাছি যায়)। উদাহরণ হিসাবে কয়েকদিন আগে করা আমাদের একটা গবেষণার কথা বলা যায়।

সেখান থেকে জানা গেল যে, অতীতে ঘটে যাওয়া প্রায় যেকোনো কিছুর চাইতে বরং ভবিষ্যতে ঘটতে যাওয়া ঘটনাকেই বেশি দাম দেয় মানুষ। ধরেন, দুর্ঘটনায় আক্রান্ত একজন মহিলা ৬ মাস ধরে যন্ত্রণা ও কষ্টের মাঝে ছিলেন। এরকম কারো চাইতে বরং যে ভিক্টিম ‘আগামী’ ৬ মাস কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাবেন— তাকেই কিন্তু বেশি পরিমাণে ইন্স্যুরেন্সের টাকা দেওয়ার রায় দিবেন জুরিবোর্ডের সদস্যরা। একইভাবে, ধরেন আপনি কোনো বন্ধুর ভ্যাকেশন হোমে ছুটি কাটানোর জন্য তাকে এক বোতল ওয়াইন গিফট করতে চান। গিফটটা ছুটি কাটানোর আগেও দিতে পারেন, পরেও দিতে পারেন। কিন্তু তার ভ্যাকেশন হোমে ছুটি কাটানোর আগে যে ওয়াইন দিবেন, ছুটি কাটানোর পরে দেওয়া ওয়াইনের তুলনায় সেটার দাম হবে বেশি। আবার, করা হয়ে গেছে এমন কাজের চাইতে ভবিষ্যতে যে কাজ করতে হবে তার জন্য বেশি পারিশ্রমিক চায় মানুষ। এরকম আরো উদাহরণ আছে। এটা বেশ শক্তিশালী ও অস্বাভাবিক এক ধরনের ‘টেম্পোরাল অ্যাসিমেট্রি’। এরকম হবার কারণ কী তা এখনো কেউ ঠিকমত বুঝে উঠতে পারেন নি। তবে এ ব্যাপারে আমাদের বেশকিছু হাইপোথিসিস আছে। সেগুলি ঘেঁটে দেখছি আমরা। চোখ-কান খোলা রেখে তাই অপেক্ষা করতে থাকেন।

আপনাদের গবেষণাপত্রের ধরণ শুধু বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভরযোগ্যই না, একরকম মজাও পাওয়া যায় সেগুলি থেকে—বেশ ভাল এক সেন্স অফ হিউমার নিয়ে বিষয়গুলি অ্যাপ্রোচ করা হয়েছে। আপনাদের এসব পরীক্ষার ডিজাইন তৈরি করেন কীভাবে? ‘গিলবার্ট পদ্ধতি’ বা এ জাতীয় বিশেষ কোনো তরিকা আছে নাকি এর জন্য?

বিজ্ঞান আপনাকে এক মুহূর্তের ভাললাগা বা আবিষ্কারের আনন্দ দেওয়ার আগে কয়েক হাজার ঘন্টা খাটিয়ে নেয়। কাজেই কোনো আইডিয়া নিয়ে গবেষণা করার আগে তাকে মন দিয়ে ভালবাসতে হবে। কোনো জিনিসের কথা শুধু চিন্তা করলেই যদি একটা তৃপ্তির সুড়সুড়ি না পাই, দমবন্ধ না লাগে আমার—তাহলে ওই বিষয়ে কোনো গবেষণা করি না আমি। এটাই আমার গবেষণার পদ্ধতিগত প্রথম নিয়ম। যখন এমন কিছু খুঁজে পাই যা নিয়ে আমার সত্যিই গবেষণা করার আগ্রহ আছে, তখন মাথা খাটিয়ে এক ইন্টারেস্টিং পরীক্ষার আয়োজন করি আমি, যেখানে একই সাথে বিশ্লেষণী কঠোরতা ও বুদ্ধিদীপ্ত রেটোরিক আছে। এর জন্য অবশ্য পদ্ধতিগত দ্বিতীয় নিয়মটি অনুসরণ করতে হয় আমার। আর তা হল টিম উইলসনকে খবর দেওয়া।

আচ্ছা, এবার তাহলে ট্রিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেনটা করেই ফেলি : ঠিক কী করলে সুখ খুঁজে পাব আমি?

এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আশা দেখিয়ে প্রায় দুই হাজার বছর ধরে বই লিখে আসছে মানুষ। তাতে শুধু অসুখী লোকজন এবং মরা গাছের সংখ্যা বাড়া ছাড়া আর কিছু হয় নাই। আমার বইটা একদিক থেকে আলাদা কারণ এখানে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টাও করা হয় নি। ‘স্টাম্বলিং অন হ্যাপিনেস’ কোনো নির্দেশনামূলক লেখা না যেখানে “সুখী হবার চারটি সহজ ও একটি কঠিন উপায়” বর্ণনা করা আছে। সেলফ-হেল্প ঘরানার বই না এটা। এ বই পড়লে যে আপনি আরো সুন্দর চুলের স্টাইলসহ নতুন কোনো দালাই লামা হয়ে যাবেন তা না। বরং আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তিতে মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক কীভাবে ও কতটা সফলতার সাথে তার ভবিষ্যত সম্ভাবনাগুলির কথা চিন্তা করতে পারে তা নিয়ে আমার বই কিছু বলার চেষ্টা করেছে। একই সাথে, এসব সম্ভাবনা থেকে কোনগুলি তাকে সবচেয়ে সুখী করতে পারবে তা সঠিকভাবে অনুমান করার প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।

বইটার মূল উদ্দেশ্য হল আমাদের দুর্বলতা দেখানো, ভবিষ্যতে কোন জিনিসটা আমাদেরকে সুখী করতে পারবে তা অনুমান করায় আমরা কতটা অদক্ষ সেটা বোঝানো।… আধুনিক মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা হিসাব করার ক্ষমতাকে চিরাচরিত বলে ধরে নিয়েছে। অথচ এই ক্ষমতা কিন্তু আমাদের প্রজাতি একেবারে সম্প্রতি পেয়েছে, মাত্র তিন মিলিয়ন বছরের মত হল। কাজেই আমাদের ব্রেইনের যে অংশ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তা প্রকৃতির একদম নতুন উদ্ভাবনগুলির মাঝে একটা। এত নতুন একটা ক্ষমতা ব্যবহার করে ভবিষ্যত গণনা করতে গেলে কিছু আনাড়ি ভুল হওয়াটা তো স্বাভাবিক। তবে এসব ভুলের তিনটা প্রাথমিক ধরন আছে। আর এ বইয়ে সেগুলি নিয়েই কথা বলা হয়েছে। বইটা শেষ হয় সুখের উৎস সম্বন্ধে পূর্বাভাস পাওয়ার একটা বিকল্প পদ্ধতি দিয়ে। কিন্তু আয়রনি হল, গবেষণা থেকে জানা গেছে, এই বিকল্প পন্থা অনেক বেশি নিখুঁত পূর্বাভাস দিলেও বেশিরভাগ মানুষ পদ্ধতিটা ব্যবহার করতে চান না।

যমজদের উদাহরণ দিয়ে আপনি দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে সুখের অভিজ্ঞতা একেবারে ভিন্ন ভিন্ন—কিন্তু আবার গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, সুখের ব্যাপারে সব মানুষের ভ্রান্তধারণাগুলি একই। ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত এক প্যারাডক্স মনে হয় না?

বইয়ে যেমনটা বলেছি, সুখের সংজ্ঞা দেওয়া বা সুখ পরিমাপ করা বেশ দুরূহ ব্যাপার। এই কাজ করতে গেলে যেসব সমস্যা, বিপদ-আপদ আর প্যারাডক্সের মুখোমুখি হতে হবে সেগুলি নিয়ে পাঠকদেরকে ধারণা দেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু সমস্যা তো রীতিমত মাথা খারাপ করে দেওয়ার মত। ওগুলি সহজে ব্যাখ্যা করার জন্য সায়েন্স ফিকশন গল্প থেকে শুরু করে তাসের যাদু দিয়েও বোঝানোর চেষ্টা করেছি আমি। শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্তে এসেছি যে, একদম নির্ভুলভাবে সুখ সংজ্ঞায়িত করা বা মাপা সম্ভব না হলেও অতটুকু অন্তত করা যায় যার সাহায্যে আপনি বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতে পারবেন। ফলে অনেক কিছু জানার সুযোগ পাচ্ছেন আপনি। সবাই যে খালি বলে, অনুভূতি পরিমাপ করা সম্ভব না, এ ধারণা একদমই ভুল। আপনি যখন আপনার সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করেন, “আমি এই কাজটা করলে তোমার কেমন লাগে?” তখনই তো আপনি আসলে তার অনুভূতির মাত্রা বোঝার চেষ্টা করছেন। বিজ্ঞানীরা অবশ্য আরো সূক্ষ্ম ও জটিল প্রক্রিয়ায় এই কাজ করেন। কিন্তু মূলভাব একই। মানুষ সাধারণত জানে কোনো নির্দিষ্ট মুহূর্তে সে কতটা সুখে আছে, কেউ জিজ্ঞেস করলে তাই সহজে বলে দিতে পারে সে। আপনি যদি তার উত্তর পরিমাপ করতে পারেন, তাহলে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সুখ নিয়ে অনুসন্ধানও করতে পারবেন (আমরা এই দু’ধরনের কাজই করে থাকি)।

আজকালকার বেশিরভাগ লোকের মত আমিও হতাশাবাদী। আমি মনে করি, একটা পরিস্থিতিতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকলে তা ঘটবেই। এই যে এত এত মানুষ এভাবে দীর্ঘকালীন উদ্বেগে ভুগেন, তাদেরকে নিয়ে আপনার বই কী বলে?

আমরা হয়ত এমন মনে করি যে জীবনের প্রতি মুহূর্তে পারফেক্টলি সুখী থাকতে পারলে সবচেয়ে ভাল হত। কিন্তু যেসব প্রাণি কোনো যন্ত্রণা, উদ্বেগ, ভীতি বা কষ্ট অনুভব করে না, তাদের একটা আলাদা নাম আছে— বিলুপ্ত। নেগেটিভ চিন্তা ও অনুভূতি আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ মানুষ যখন চিন্তা করে দেখে কোনো জিনিস কতটা তীব্রভাবে তাদের বিপক্ষে যেতে পারে, তখন তারা এমন সব কাজ করার চেষ্টা করে যাতে জিনিসটা তীব্রভাবে তাদের পক্ষে যায়।

আমাদের ছেলেমেয়ে কিংবা কর্মচারীদেরকে আমরা কোনো নির্দিষ্ট কাজের জন্য শোচনীয় ফল ভোগ করার ভয় দেখিয়ে যেমন সতর্ক করে দেই, তেমনি শোচনীয় পরিণতির কথা কল্পনা করে নিজেদেরকেও নিয়ন্ত্রণ করি আমরা। হ্যাঁ, মাঝে মাঝে উদ্বেগ বেশি হয়ে গেলে মানুষকে তা দুর্বল করে দিতে পারে। সেটা একেবারে এক্সট্রিম কেস। কিন্তু বেশিরভাগ লোকের জন্যই উদ্বেগ অনেক কাজে আসে।… কেউ যদি আপনাকে এরকম কোনো ওষুধ দেয় যেটা খাওয়ার পর আপনি সারাজীবনের জন্য সুখী থাকতে পারবেন, তাহলে আপনার প্রতি আমার পরামর্শ হবে সাথে সাথে দৌঁড় দিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যাওয়া। আবেগ একটা কম্পাস, যা আমাদেরকে বলে দেয় কখন কী করতে হবে। কিন্তু যে কম্পাসের কাঁটা শুধু উত্তর দিকে মুখ করে থাকে, সেই কম্পাসের কোনো দাম নাই।

এমন কী কী জিনিস আছে যেগুলি আমাদেরকে সুখী করতে পারবে বলে আমরা মনে করি, কিন্তু আসলে তা হয় না? কেন আমাদের এখনো মনে হয় যে এই জিনিসগুলিই আমাদের সুখী হবার মূলে?

সমাজের সদস্য যারা, তাদেরকে সুখের উৎসের ব্যাপারে ভুল ধারণা দেওয়ার পেছনে সমাজের একটা কায়েমি স্বার্থ আছে। আমার বইয়ে যেসব আইডিয়া নিয়ে কিছু দূর পর্যন্ত আলোচনা করা হয়েছে তার মধ্যে এটা একটা। চলমান ও সক্রিয় থাকার জন্য সমাজের অনেক কিছু নিশ্চিত করা লাগে। যেমন: মানুষদেরকে একে অন্যের পণ্য ও সেবা কিনতে হয়, বাচ্চা জন্ম দিয়ে তাদেরকে লালনপালন করতে হয়; এরকম আরো অনেক কিছু। আমরা নিশ্চয়ই এসব কাজ সমাজের ভালর জন্য করব না, কারণ মানুষের বৈশিষ্ট্য হল শুধু নিজের ভালর জন্যই কাজ করতে আগ্রহী হওয়া। এজন্য একেকটা সমাজ দরকারি কিছু মিথ তৈরি করে— “টাকা-পয়সা আপনাকে সুখ এনে দিবে” বা “আপনার সন্তানসন্ততি আপনাকে সুখী করে তুলবে”। এসব মিথ সমাজের সদস্যদেরকে সেই কাজগুলি করতে প্রণোদিত করে যেগুলি আদতে সমাজের জন্য প্রয়োজনীয়। গবেষণার ফলাফল বলছে, এ দুইটার একটাও মানুষকে বিশেষ সুখী করতে পারে না। সুখের ওপর টাকা-পয়সার প্রভাব নিতান্তই গৌণ; এ প্রভাব সহজেই ফুরিয়ে যায়। আর বাবা-মা’রাও সাধারণত বাচ্চাদের সাথে সময় কাটানোর চাইতে টিভি দেখতে বা ঘরের কাজ করতেই পছন্দ করেন বেশি (সরি, বাচ্চারা, কিন্তু তথ্য-উপাত্ত সেরকমই বলে!)।

যাই হোক, এটা আপনার প্রশ্নের একটা উত্তর। তবে এর আরো উত্তর আছে। বইয়ে একটা গবেষণার কথা বলেছি যেখান থেকে জানা যায়, অতীতে একজন মানুষ কতটা সুখী ছিল সেই স্মৃতি প্রায়ই সে গুলিয়ে ফেলে। যেমন ডেমোক্র‍্যাটরা একবার এরকম মনে করলেন যে, বুশ  ইলেকশন জিতলে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়বেন তারা। কিন্তু বুশ জেতার পর তার ধারেকাছেও কিছু হয় নাই তাদের (আমি জানি, কারণ আমি নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি তারা মানসিকভাবে কতটা বিধ্বস্ত হয়েছিলেন)। অথচ এর কয়েক মাস পর তারা আবার মনে করা শুরু করলেন, তাদের আন্দাজ ঠিকই ছিল—নিজেদের মানসিক দুর্দশার ব্যাপারে তারা যেমনটা ভেবে রেখেছিলেন ঠিক তেমনটাই নাকি হয়েছিল। জানা গেল, মানুষের স্মৃতিজনিত বিভ্রান্তির খুবই সাধারণ প্যাটার্ন এটা। যদি মনেই না থাকে, তাহলে নিজেদের ভুল ভবিষ্যদ্বাণী থেকে আমরা শিক্ষা নিব কীভাবে?

আপনার বইটা পড়ার আগে মনে করতাম, জীবনের প্রধান আকর্ষণ হল বৈচিত্র‍্য। কিন্তু প্রতিবার ডোনাট শপে গিয়ে শুধু গ্লেজড ডোনাট খাওয়াই কি ঠিক হবে? গ্লেজড আমার প্রিয় ডোনাট হলেও— কেবল একই রকম ডোনাট খেতে গিয়ে আরো ভাল কিছু থেকে যদি বঞ্চিত হই?

…যতটুকু উচিত তার চাইতে বেশিই বৈচিত্র‍্য খুঁজতে যায় মানুষ— গবেষণা তাই বলছে। আমাদের মনে হতে পারে, প্রতিবার ডোনাট শপে গিয়ে হয়ত আলাদা আলাদা টাইপের ডোনাট খেয়ে দেখা উচিত। কিন্তু বাস্তবতা হল, ডোনাট শপে গিয়ে বারবার নিজের পছন্দের ডোনাট খেতে পারলেই বরং মানুষ সুখী থাকে বেশি, যদি প্রতিবার যাওয়ার মাঝে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিরতি থাকে। এই বিরতির সময়টা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। খুব কম সময়ের মধ্যে চারটা ডোনাট খাওয়া হলে একেকবার একেকরকম ডোনাট নিলেই আপনার ভাল লাগবে বেশি। এক্ষেত্রে বৈচিত্র‍্য আসলেই আপনার অভিজ্ঞতাকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। কিন্তু আবার চার দিনে চারটা ডোনাট খাওয়ার বেলায় বৈচিত্র‍্য আপনার উপভোগের মাত্রা কমিয়ে আনবে। সময়কালের ব্যাপারে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করা মানুষের ব্রেইনের জন্য প্রচণ্ড সমস্যাজনক। তাই কয়েক মাস বা কয়েক মিনিট—বিরতি যতটুকুই হোক, ডোনাট খেতে গিয়ে আমরা অযথাই ভ্যারাইটি খুঁজি।

আপনার বইয়ে এত শেকসপিয়ারের উদ্ধৃতি কেন? আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন যে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করার চাইতে বরং শিল্প থেকেই আমরা নিজেদের সম্বন্ধে আরো বেশি জানতে পারব?

আমি প্রতি অধ্যায় একটা করে শেকসপিয়ারের উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করেছি। এর কারণ দুইটা। প্রথমত, ইতিহাসজুড়ে এমন অনেক চমৎকার অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন যারা আমাদের চিন্তাভঙ্গি সম্পর্কে তুখোড় সব অনুমান করে গেছেন। আধুনিক বিজ্ঞান আমাদেরকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে যাতে আমরা বাছাই করতে পারি, সেই অনুমানগুলির মাঝে কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল ছিল। সঠিক অনুমানের ক্ষেত্রে শেকসপিয়ারের রেকর্ড ভাল। তাই তার হাতেই প্রতি চ্যাপ্টার শুরু করার দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলাম। আর দ্বিতীয় কারণ হল, আমি খুবই সাধারণ রুচির মানুষ, যে কিনা সনেট পড়ার চাইতে অ্যাকশন মুভি দেখতে বা প্যাটের চাইতে টেটার টটস খেতেই বেশি পছন্দ করে। কিন্তু আমাকে প্রতিদিন একজন হার্ভার্ড প্রফেসরের ভান করে থাকতে হয়। আমার শুধু খুঁতখুঁত লাগে আর ভাবি, এই ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য আমাকে হয়ত একজন সুশীল নাক-উঁচা ব্যক্তি সাজতে হবে, যিনি ক্রাস্ট ছাড়া মিনি স্যান্ডউইচ খেতে খেতে শেকসপিয়ার পড়েন। কিন্তু আমি তো আসলে এরকম না। তবে আপনি যদি এই তথ্য ফাঁস না করেন, তাহলে ওইসব উদ্ধৃতি দিয়ে সবাইকে বোকা বানানো যাবে।

এখন কি তাহলে চারিদিকের বহু সম্ভাবনার কারণে আমাদের জীবন এতটাই জটিল হয়ে গেছে যে আমরা আদিম এক অজ্ঞতা হারিয়ে ফেলেছি, যে অজ্ঞতার কারণে অনেক জিনিস আমাদের অজানাই থাকত, ফলে সুখে থাকতে পারতাম আমরা? তাহলে কি কিছু জিনিস শেষ পর্যন্ত না জানলেই বরং সুখী থাকা যাবে? তাই যদি হয়, তাহলে গভীর বনের কোনো কুঠুরিতে গিয়ে বসবাস শুরু করলে লাভ হবে কি?

না, না, না। প্রতিটা প্রজন্ম এই ভ্রমের মধ্যে থাকে যে অতীতে হয়ত সবকিছু সহজ, সরল আর অনেক ভাল ছিল। পুরাদমে ভুল ধারণা। ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানেই আমরা সবচাইতে ভাল আছি। আমরা যে একে অন্যের মাথায় লাঠি দিয়ে ঠুকাঠুকি করি, তা আমাদের আদিম অজ্ঞতার কারণেই। এই অজ্ঞতা আমাদেরকে মোনালিসা আঁকতে বা স্পেস শাটল বানাতে কোনো সাহায্য করে না। আমাদের সুবিশাল ও উন্নত এক মস্তিষ্ক আছে যা ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখতে পায়। অন্য কোনো প্রাণি তা পারে না। এমনকি আমাদের প্রজাতিও মাত্র কয়েক মিলিয়ন বছর আগ পর্যন্ত তা পারত না। হ্যাঁ, আমাদের ভবিষ্যতের দৃষ্টি তেমন স্পষ্ট না, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে হয়ত একেবারে অন্ধকার। তবে এই দূরদৃষ্টি আমাদের যেকোনো সিদ্ধান্তের দীর্ঘকালীন পরিণতি সম্বন্ধে আভাস দিতে পারে। ফলে আমরা প্রয়োজনমাফিক ব্যবস্থা নিয়ে খারাপ ফলাফল এড়িয়ে ভাল গন্তব্যগুলিকে তুলে ধরতে পারি।“যে আদিম অজ্ঞতার কারণে আমরা সুখে থাকতে পারতাম” সেই অজ্ঞতাই স্থূল স্বাস্থ্য আর গ্লোবাল ওয়ার্মিং বাড়ার কারণ। মাইলস ডেভিসের মত প্রতিভা বা ম্যাগনা কার্টার মত চুক্তি এই অজ্ঞতা থেকে আসত না কখনো। আগামী কয়েক হাজার বছরে মানবজাতি যদি উন্নয়নে ফুলেফেঁপে উঠে, তাহলে তা যুক্তি ও জ্ঞান অর্জন দিয়েই সম্ভব হবে। যে জগত কখনো ছিলই না সে জগতে ফিরে যাওয়ার ফ্যান্টাসিতে বুঁদ হয়ে থাকলে তা আর কখনো হবে না।

আমেরিকার কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি বিজনেস স্কুল এ বছর (২০১৭) জানুয়ারির ২৭ তারিখে বিজনেস ম্যাগনেট বিল গেটস এবং ওয়ারেন বাফেটের সঙ্গে একটা প্রশ্নোত্তর ইভেন্টের আয়োজন করে। সাংবাদিক ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব চার্লি রোজ ছিলেন আয়োজনের সঞ্চালক। নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরাসরি প্রশ্ন করেন দুই অতিথিকে। একই প্রশ্নের উত্তরে দু’জন নিজ নিজ অবস্থান থেকে কথা বলেন। কোনো কোনো প্রশ্নের উত্তর শুধু একজনই দিয়েছেন। 

গেটস ও বাফেট তাদের ২৫ বছরের বন্ধুত্ব, ব্যবসা, দানশীলতা, বিশ্বস্বাস্থ্য, উদ্ভাবন ও নেতৃত্ব ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন।

অনুবাদ: আয়মান আসিব স্বাধীন

বন্ধুত্ব, ব্যর্থতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি কথোপকথন

প্রশ্ন: একজন আরেকজনের ব্যাপারে কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি অবাক করে আপনাদের?

ওয়ারেন বাফেট

ইন্টারেস্টিং প্রশ্ন। আমাদের দুইজনের যে অনেক ব্যাপারেই মিল আছে—শুরুতে এটা বুঝতে পারার পর বেশ অবাক হয়েছিলাম। বিল অবশ্য একটা কম্পিউটার বিক্রি করার চেষ্টা করেছিলেন আমার কাছে। ওই একবারই হয়ত তিনি কোনো জিনিস বিক্রি করতে পারেন নাই। যদিও কম্পিউটার আমার জীবনকে আপাদমস্তক পালটে দেয়। কিন্তু বিলের কৌতূহলে বিন্দুমাত্র কমতি আসত না।

বিল গেটস

আমার খুবই আশ্চর্য লাগত যে, একজন ইনভেস্টর হিসাবে পৃথিবী সম্পর্কে এতটা ব্যাপক ধারণা রাখেন ওয়ারেন। তিনি শুরুতেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হেই, আইবিএম এত বড় একটা কোম্পানি! মাইক্রোসফট তো কোম্পানি হিসাবে অনেক ছোট; তাহলে আপনারা বেশি ভাল করবেন কী হিসাবে? আইবিএম-ই বা আপনাদেরকে সফটওয়্যারের এই খেলায় হারাতে পারবে না কেন?” আমি কিন্তু প্রতিদিনই চিন্তা করতাম, আমাদের কী কী বাড়তি সুযোগ-সুবিধা আছে? সেগুলি দিয়ে কী করা উচিৎ আমাদের? অথচ কেউ আমাকে এই প্রশ্নটা আগে জিজ্ঞেস করে নাই।

তারপর আমরা সফটওয়্যারের অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়ে আলাপ করলাম। এই অর্থনীতির জায়গাটা খুবই ভিন্নধর্মী ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার—ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে এসবের সাথে তিনি নিজেকে মেলাতে পারতেন। আর আমি ব্যাংকিং বুঝতে পারতাম না। কীভাবে একজন আরেকজনের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যায় তা মাথায় ঢুকত না। তিনি খুব পরিষ্কারভাবে সেসব বোঝাতে পারতেন। ফলে আমি এমন একজনকে খুঁজে পেলাম যার চিন্তাভাবনার অবকাঠামো এতটা সমৃদ্ধ যে—যেসব জিনিস আমি জানার জন্য মুখিয়ে থাকতাম—সেগুলি তিনি সহজেই বুঝিয়ে দিতে পারতেন আমাকে। আবার যে জিনিসগুলি আমাদের কাছে নতুন লাগত, সেগুলি নিয়ে হাসাহাসিও করতাম আমরা।

তার বিনয় এবং রসবোধই তাকে এতটা অবিশ্বাস্যভাবে তুলে ধরেছিল আমার কাছে। উনি নিজের কাজ অনেক উপভোগ করেন ও সেই আনন্দ অন্যদের সাথে ভাগাভাগিও করে নেন। আর আমি যখন বোকার মত কোনো প্রশ্ন করি, যে প্রশ্ন হয়ত আগে আরো ৫০ বার তাকে করা হয়েছে, তখনও তিনি সুন্দর করে উত্তর দেন।

প্রশ্ন: বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কোন ব্যাপারগুলি নিয়ে আপনারা সবচাইতে চিন্তিত এবং আশাবাদী?

বাফেট

আমেরিকা এগিয়ে যাবে। আপনি যদি এই দেশের গত ২৪০ বছরের ইতিহাস দেখেন তাহলে বুঝতে পারবেন এখানে কত রকমের মিরাকল ঘটেছে। আমি তো বলব যে, বিশ্বের ইতিহাসে সবচাইতে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি সেই শিশু, যে আজকে এই দেশে জন্ম নিচ্ছে। ১৯৪২ সালের এপ্রিলে ১১ বছর বয়সে আমি নিজের প্রথম স্টক কিনেছিলাম। তখন ওটার ডাউ ছিল ১০০। অল্প সময় পরেই তা ২০,০০০ হয়ে গেল। সেই সময়টুকুতে নিশ্চয়ই ভাল কিছু হয়েছিল; আর সামনেও সে রকম আরো অনেক কিছু হবে।

গেটস

আমার আশাবাদ অনেকটা এই কারণে যে, আমেরিকার উদ্ভাবনী শক্তি ভাল এবং গবেষণার কাজে মোটামুটিভাবে দুই দলেরই সমর্থন আছে। আর তাই স্বাস্থ্য খাত বা অন্য যে খাতই হোক, আমি মনে করি প্রত্যেক বছরেই আমরা এইসব ক্ষেত্রে নতুন অনেক সাফল্যের দেখা পাব।

এখন এই প্রশাসন বেশ নতুন হওয়ায় তাদের বাজেটে কী কী জিনিস প্রাধান্য পাবে, তা আমরা ঠিক জানি না। যেমন বিদেশী ত্রাণ আমাদের বাজেটের অনেক ছোট একটা অংশ, প্রতি বছর ৩০ বিলিয়ন ডলারের মত। কিন্তু তার মানে প্রতিবার যখন নতুন নেতৃত্ব আসে, আমাদেরকে লাভের ক্ষেত্রগুলি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে দেখাতে হয় যে—সবকিছু ঠিক জায়গাতেই ব্যয় করা হয়েছে।

আমি মনে করি, এই রকম একটা বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যাপারে প্রচুর জোর দিতে হবে আমাদের। এইচআইভি সচেতনতার জন্য প্রেসিডেন্টের ‘পেপফার’ এবং সেই সাথে ‘ম্যালেরিয়া ইনিশিয়েটিভ’ এর মত চমৎকার সব কর্মকাণ্ড ধরে রাখার জন্য এক্সিকিউটিভ ব্র‍াঞ্চ ও কংগ্রেসের বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। এসব কিন্তু প্রেসিডেন্ট বুশের সময়ে শুরু হয়েছিল। কাজেই কর্মক্ষেত্রে ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান—উভয় প্রশাসনের সাথেই ভাল সম্পর্ক আছে আমাদের ফাউন্ডেশনের।

প্রশ্ন: ব্যর্থ হবার ভয় ঠিক কীভাবে কাটিয়ে উঠেছিলেন আপনারা?

গেটস

আমি আসলে সৌভাগ্যবান, কারণ আমি হাই স্কুলে ওঠার সাথে সাথেই ওখানে কম্পিউটার নিয়ে আসা হয়। কম্পিউটারে পুরোপুরি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি আমি। আমার মুগ্ধতার জন্যে ব্যাপারটাকে কখনোই ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয় নাই আমার কাছে। বরং কম্পিউটারের প্রতি আমার পাগলামিকে আমি শখ হিসাবে দেখতে থাকি। ঝুঁকি নেওয়াকে সবসময়ই দারুণ একটা কাজ মনে হয় আমার; বিশেষ করে যুবক বয়সে—বিভিন্ন জিনিস পরখ করে দেখা, তেমন জনপ্রিয় না এমন কাজে শুধু নিজের আগ্রহের জন্য হাত দেওয়া—এ রকম ঝুঁকিই তো নিতে হয়।

বাফেট

ব্যর্থতাকে ভয় পাওয়ার দরকার নাই। আমি হার্ভার্ডে ভর্তি হতে পারি নি, ওরা নেয় নাই আমাকে। আমার জীবনের সবচাইতে সেরা ঘটনা ওইটাই ছিল। অনেক ভাল জিনিসই আমাদের সাথে ঘটে যা শুরুতে ভাল বলে মনে হয় না। ঘাবড়ায় যাওয়ার কিছু নাই।

আর বার বার পেছনে তাকিয়ে কোনো জিনিস নিয়ে আফসোস করবেন না। এগিয়ে যেতে থাকেন, কারণ সামনে এমন অনেক কিছুই পাবেন যাতে ব্যর্থতাগুলির কথা আর মনে থাকবে না। শুধু এগোতে থাকেন আপনি।

প্রশ্ন: যদি নতুন করে সবকিছু শুরু করার সুযোগ দেওয়া হত, তাহলে আপনারা কোন ইন্ডাস্ট্রিতে থাকতেন? এখনকার সময়ে কোথায় নিজেদের ব্যবসা শুরু করতেন আপনারা?

বাফেট

আমি একই কাজই করতাম। কারণ অন্য কিছু করতে গেলে আমার ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বিশ-ত্রিশ বছর বয়স থাকতে অনেক মজা করেছি আমি। এখন আমার বয়স ৮৬ আর আমি এখনো মজাই করে যাচ্ছি। তাই ছাত্রদেরকে সবসময় বলি—আপনার যদি কোনো চাকরির প্রয়োজন না থাকত, তাহলে আপনি যে কাজটা করতেন, সে রকমই একটা চাকরির সন্ধান করেন।

ঘুমের মধ্যে হাঁটার মত করে নির্লিপ্তভাবে জীবন কাটাবেন না। “আমি এইটা করব, ওইটা করব, শুধু বয়স বাড়ার অপেক্ষা করছি”—এ ধরনের কথা বলবেন না একদমই। ব্যাপারটা এমন যেন আপনি বুড়ো বয়সে সেক্স করার আশায় অপেক্ষা করে যাচ্ছেন। নেহাতই পাগলামি। এ রকম চিন্তাভাবনা একদমই ভাল না।

গেটস

আমার হার্ডকোর সায়েন্স খুবই পছন্দের। এই জায়গাটায় অনেক অসাধারণ ক্ষেত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ আছে। আমি এখনো কম্পিউটার সায়েন্সই বেছে নিতাম, কারণ বর্তমান সময়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে অনেক গভীরভাবে কাজ করা হচ্ছে।

প্রশ্ন: বর্তমান সরকার যদি ইমিগ্রেশনের ব্যাপারে আপনাদের কাছে পরামর্শ নিতে আসতেন, আপনাদের জবাব কী রকম হত?

বাফেট

এই দেশের ভিত্তিই ইমিগ্রেশন। আমরা আজকে এখানে বসে আছি কারণ, ১৯৩৯ সালের আগস্ট মাসে সম্ভবত আমেরিকার ইতিহাসের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ চিঠিতে দুইজন ইহুদী ইমিগ্র্যান্ট সই করেছিলেন। লিও জিলার্ড এবং আলবার্ট আইন্সটাইন—এই দুই ইমিগ্র্যান্ট সরাসরি জার্মানি থেকে এসে (জিলার্ড তার আগে এসেছিলেন হাঙ্গেরি থেকে) প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে জানান, জার্মানরা একটা পারমাণবিক বোমা বানাতে যাচ্ছে। কাজেই আমাদের খুব দ্রুত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এর ফলেই শুরু হল ‘ম্যানহাটন প্রজেক্ট’।

ওই দুই ইমিগ্র্যান্ট না থাকলে আমরা আজকে এই রুমে বসে থাকতে পারতাম কিনা কে জানে। অভিবাসীরা এই দেশে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। আপনি যে কোনো দেশের দিকেই তাকান না কেন, সব দেশ থেকেই আমেরিকায় অভিবাসীরা এসে তাদের সম্ভাবনাগুলিকে প্রকাশ করার সুযোগ পেয়েছেন; যা তারা নিজেদের দেশে থেকে করতে পারেন নি। আর আজকের আমরা তারই প্রোডাক্ট।

প্রশ্ন: স্বাস্থ্যসেবা পুনর্গঠনের ব্যাপারে আপনাদের পরামর্শ?

গেটস

এতে কোনো সন্দেহ নাই যে, ভাল মানের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে জিডিপি থেকে স্বাস্থ্য খাতে নির্ধারিত অংশ দিন দিন বাড়াতে হবে। বর্তমানে তা এমনিতেও যথেষ্ট বেশি। তবে এখনো ১৮ শতাংশের মত কার্যকারিতার ঘাটতি আছে। যতই দিন যাচ্ছে, আমরা জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট আর অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মত পদ্ধতি উদ্ভাবন করছি। ফলে নানান দিকে থেকে মানুষের উপকার হচ্ছে। কাজেই সব মিলিয়ে আমাদের আরো বেশি সম্পদের প্রয়োজন। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবার জন্যে সরকারি সম্পদ থাকতে হবে আরো বেশি।

এই সমস্যাগুলি সমাধান করা বেশ কঠিন কারণ আমাদের সামর্থ্যেও যেমন ঘাটতি আছে, তেমনি খরচের দিকেও লক্ষ রাখতে হয় আমাদের। আমি সবসময়ই কোনো সমস্যাকে সরল একটা লেন্স দিয়ে দেখার চেষ্টা করি এভাবে যে—উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে এর সমাধান সম্ভব। এখানেও নতুন নতুন ওষুধ উদ্ভাবন করে খরচ বাঁচানো সম্ভব হবে। অথবা আলজাইমার’সের মতো রোগের চিকিৎসা আবিষ্কার করা সম্ভব হলে—যা আমরা এখনো করতে পারি নাই—দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার বাড়তি খরচ অনেকাংশে কমে যাবে।

কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগব্যাধি নির্মূলের ব্যাপারে আমাদের অগ্রগতি অন্যান্য ব্যাধির তুলনায় কম। কৌশলগত ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব ওষুধ তৈরি করা এবং সংশ্লিষ্ট গবেষণার কাজে মার্কেটকে ঠিকমত ব্যবহার করতে পারলে আমি মোটামুটি আশাবাদী যে, আমরা উন্নতি করতে পারব। কিন্তু সেই জন্যে আমাদের অনেক দামি জিনিসের প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে আমাদের খরচ বাড়বেই।

আমি আসলেই আশা করি যেন কোনো এক পর্যায়ে দেশের সেরা প্রতিভাদেরকে তাদের সাফল্যের বিপরীতে যথাযথ সম্মাননা ও উদ্দীপনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্বাস্থ্যসেবা ঠিকমত সুযোগ-সুবিধা দিতে না পারায় দেশের মানুষের মাঝে প্রচণ্ড অসন্তোষ কাজ করছে। কিন্তু তারপরও তারা বলেই যাচ্ছে “লেস গভর্নেন্স, মোর গভর্নমেন্ট”। আমার মনে হয় না দেশের জনগণকে এই জটিলতার ব্যাপারে যথেষ্ট ধারণা ও শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যাতে করে তারা এখনো সঠিক সমাধানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

প্রশ্ন : আপনারা দু’জনই বিদেশে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু আমেরিকার ভেতরেই তো অনেক সমস্যা রয়েছে। এখানেও গরিব মানুষ আছে, অসুস্থ লোকজন আছে। বাইরের দেশের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামানোর আগে আমাদের নিজেদের সমস্যাগুলি নিয়ে কাজ করা উচিৎ। এটা নিয়ে আপনাদের চিন্তাভাবনা কী রকম?

বাফেট

আমার নিজের ব্যক্তিগত ভাবনা এইরকম যে—প্রতিটা প্রাণের মূল্য সমান। আপনার কাছে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ডলার থাকলে আপনি কিন্তু আমেরিকার চাইতে বরং তার বাইরের অনেক মানুষের জন্য আরো অনেক কিছু করার সুযোগ পাবেন। বিশ্বের ৭০০ কোটিরও বেশি মানুষের চেয়ে এদেশের ৩২ কোটি মানুষের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ আছে। কাজেই আপনি আমেরিকার বদলে বিশ্বের অন্য জায়গাগুলিতে বুদ্ধিমানের মত ডলার বিনিয়োগ করতে পারলে তাতে মানুষের উপকার হবে বেশি।

আমি যেহেতু ওমাহা থেকে এসেছি, তাই মানুষজন জানতে চায়, আমি ওমাহার জন্য বেশি বেশি খরচ করি না কেন। আমি ওইখানে বড় হয়েছি; ওমাহা আমার জন্য সবকিছু করেছে। হ্যাঁ, আমি এসব স্বীকার করি ঠিকই।

তবে শেষ পর্যন্ত যদি আপনার কাছে খরচ করার মত ডলার থাকেই, তাহলে সেই অর্থ আমেরিকার বদলে বিশ্বের অন্যান্য স্থানে বুদ্ধিমানের মত বিনিয়োগ করতে পারলে মানুষের জীবনকে আরো বেশি স্বচ্ছন্দ করে তোলা যাবে। এজন্য মানুষ আমার সমালোচনা করলেও তাতে সমস্যা নাই, কারণ এটাই আমার বিশ্বাস।

গেটস

বাইরের দেশের মানুষদের সাহায্য করার ব্যাপারে নজর দিলে দেখা যায়, আমেরিকার বাজেটের ০.৮ শতাংশ বিদেশী ত্রাণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এটা আসলেই উপযুক্ত ও করণীয় কিনা তা নিয়ে সামনের বছরগুলিতে আরো আলোচনা করা হবে। তবে স্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বনির্ভর হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এর যথেষ্ট উপযোগিতা আছে।

বাজেটের ২০ বা ৩০ শতাংশ বিদেশে ব্যয় করা উচিত কিনা তা নিয়ে আলোচনা করতে পারলে অনেক ইন্টারেস্টিং হত। আমাদের ফাউন্ডেশন সবসময় একই রকম উদ্যোগের ব্যাপারে ইনভেস্ট ও কো-ইনভেস্ট করে এসেছে, যেমন পোলিও। আর এ রকম সিদ্ধান্তের জন্যই আমাদের এই প্রক্রিয়া দিন দিন আরো স্মার্ট এবং লাভজনক প্রমাণিত হচ্ছে। আমরা এটাই ধরে রাখতে চাই এবং আশা করছি নতুন বিশ্বে তা আরো প্রাধান্য পেতে থাকবে।

প্রশ্ন: ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে মানুষের সাথে সম্পর্কের ব্যাপারে আপনারা শিক্ষণীয় কিছু জানতে পেরেছেন কী? কোনো লাইফ লেসন?

বাফেট

অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন। আপনি যাদের সাথে চলাফেরা করেন, শেষ পর্যন্ত তাদের দেখানো পথেই আপনাকে হাঁটতে হয়। কাজেই আপনার চাইতে ভাল অবস্থানে আছেন—এমন মানুষদের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখা উচিৎ। আর আমাদের বেশিরভাগ মানুষের জন্যই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হল—আপনার স্বামী বা স্ত্রী হিসাবে কাকে বেছে নিচ্ছেন আপনি। অবশ্য এটা সবার জন্য প্রযোজ্য না।

আরো পড়ুন: ‘হাসি ও শেখার ২৫ বছর’: ওয়ারেন বাফেটকে নিয়ে বিল গেটস 

আপনি নিজেকে যেমনটা দেখতে চান, তেমন মানুষের সাথেই আপনার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তার দেখানো রাস্তায় আপনি হাঁটবেন। আর তাই এক্ষেত্রে সবচেয়ে মূল্যবান ব্যক্তি আপনার জীবনসঙ্গী। এই সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে আমি জোর দিয়ে শেষ করতে পারব না। আপনার কথাই ঠিক—জীবনে চলার পথে আপনার বন্ধুরাই আপনাকে গড়ে তোলে। তাই ভাল কিছু বন্ধু বানান আর সারাজীবনের জন্য তাদেরকে ধরে রাখেন। কিন্তু খেয়াল রাখবেন, যাদেরকে আপনি পছন্দের পাশাপাশি শ্রদ্ধাও করেন—এমন মানুষরাই যেন আপনার বন্ধু হয়।

গেটস

কিছু বন্ধু আসলেই আপনার ভেতর থেকে সেরাটা বের করে আনেন। সে রকম বন্ধুত্বের ব্যাপারে আমাদের সবারই মনোযোগী হওয়া উচিৎ। আবার কিছু বন্ধু এমন থাকে যারা আপনার প্রতিটা কাজে আপনাকে চ্যালেঞ্জ করবে। এ রকম অন্তরঙ্গতাও অনেক চমৎকার।

মেলিন্ডা ও অন্যান্য বন্ধুদের সাথে সময় কাটিয়ে আমি বুঝতে পেরেছি, তাদেরকে সময় দেওয়াটা আমার জন্য কতটা জরুরি। কেননা প্রয়োজনে তাদেরকে সাহায্য করার জন্য সবসময় আপনি তৈরি থাকেন এবং আপনার প্রয়োজনে থাকেন তারা।

২৯ আগস্ট, ২০১৭ তারিখে পরিচালক জেমস ক্যামেরনের বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন সিনেমা ‘টার্মিনেটর টু : জাজমেন্ট ডে’ থ্রিডিতে মুক্তি দেওয়া হবে। এর প্রচারণায় ২৪ আগস্ট ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সাংবাদিক হেডলি ফ্রীম্যানকে এই সাক্ষাৎকারটি দিয়েছেন তিনি। এতে হলিউডের বর্তমান সব বড় বাজেটের সিনেমা আর সহকর্মীদের প্রতি তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিজের চিন্তাভাবনা শেয়ার করেছেন ক্যামেরন।

জেমস ক্যামেরনের সাক্ষাৎকার (২০১৭)

সাক্ষাৎকার: হেডলি ফ্রিম্যান

অনুবাদ: আয়মান আসিব স্বাধীন


জেমস ক্যামেরন। ব্যবসায়িকভাবে বিশ্বের সবচাইতে সফল পরিচালক। ভদ্রলোক নিজের অনুকরণ নিজেই করতে পছন্দ করেন। এর আগের বার যখন আমি তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম তখন শেষের অভিজ্ঞতাটা তেমন সুখকর হয় নাই। ২০১২ সাল, থ্রিডি ব্লুরে-তে টাইটানিক সিনেমা মুক্তির প্রচারণা চালাতে নিউজিল্যান্ডের খামারবাড়ি থেকে বেলফাস্টের টাইটানিক মিউজিয়ামে এসেছিলেন ক্যামেরন। তার ১৪ বছর আগে বানানো এই ছবি নতুন করে এমন একটা ফরম্যাটে (থ্রিডি) মুক্তি দেওয়া হচ্ছিল যা নিয়ে খুব কম মানুষেরই সত্যিকার মাথাব্যথা আছে। কিন্তু তাই বলে যদি আপনি মনে করেন এজন্যে অর্ধেক পৃথিবী পাড়ি দিয়ে কথা বলতে আসার মত আগ্রহ তার নাই—তাহলে আপনি জেমস ক্যামেরন সম্বন্ধে কিছুই জানেন না।

‘টার্মিনেটর টু : জাজমেন্ট ডে’ সিনেমার সেটে আর্নোল্ড শোয়ার্জনেগারের (বাঁয়ে) সাথে জেমস ক্যামেরন

আত্মম্মন্য দানবদের দিয়ে ভরা এই শহরেও ক্যামেরনের একগুঁয়েমিতার গল্পগুলি রীতিমত হলিউড কিংবদন্তির অংশ। ‘অ্যাভাটার’ সিনেমার শুটিংয়ে কর্মীদের মোবাইল বেজে উঠলে তিনি এতটাই রেগে যেতেন যে, নেইলগান দিয়ে একদম গেঁথে দিতেন দেয়ালের সাথে (কর্মীদেরকে না, ওই মোবাইল ফোনগুলি গেঁথে দিতেন; যদিও উল্টাটা হওয়ার ভাল সম্ভাবনা ছিল)। ‘দি অ্যাবিস’ (১৯৮৯) সিনেমার শুটিংয়ের সময় তো ক্রু মেম্বাররা এক বিশেষ টি-শার্ট পরে ঘুরে বেড়াতেন, যাতে লেখা থাকত—”আমাকে ভয় দেখাতে পারবা না। আমি জেমস ক্যামেরনের হয়ে কাজ করি।”

সেই সাক্ষাৎকারে জেমস তার ১২ বছর পুরানো সিনেমার থ্রিডি করা নিয়ে এমনভাবে কথা বলছিলেন যেন তা চলচ্চিত্রের উন্নয়নে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংযোজন। ওইদিন তার মেজাজ বেশ ঠিকঠাক মনে হয়েছিল আমার কাছে। তাই টাইটানিকের যে বিষয়টা আমাকে অনেক ভাবিয়েছে, সে ব্যাপারে একটা প্রশ্ন করে ফেলা নিরাপদই মনে হচ্ছিল : “আচ্ছা, বেচারা জ্যাককে সমুদ্রে জমে দিতে না দিয়ে বরং রোজ তার বিশাল কাঠের বোর্ডটা ওর সাথে শেয়ার করল না কেন?” প্রশ্ন শুনে রাগের চোটে তার চেহারা যেন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠল। “আচ্ছা এক মিনিট। আমি শেক্সপিয়ারকে ডেকে জিজ্ঞেস করতেছি কেন রোমিও আর জুলিয়েটকে মরতে হয়েছিল!” আপনারাও আমাকে ভয় দেখাতে পারবেন না। আমি জেমস ক্যামেরনের সাক্ষাৎকার নিয়েছি।

এবার তার বাসা থেকে একটু সামনে ম্যালিবু’তে একটা হোটেল রুমে দেখা করলাম আমরা। এবারও আমরা তার পুরানো একটা সিনেমা নিয়ে আলাপ করছি, যা নতুন করে থ্রিডি করা হয়েছে: টার্মিনেটর টু জাজমেন্ট ডে। যদিও দেখতে তিনি আগের মতই আছেন—সেই ৬ ফুট ছাড়ানো লম্বা, একগাছি সাদা চুল আর উজ্জ্বল নীল চোখ—কিন্তু এবার কিছু একটা যেন অন্যরকম। রুমের ভেতর ঘুর ঘুর করার বদলে চেয়ারের ওপর আরাম করে বসে আছেন। হ্যান্ডশেকও বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ, আগের মত হাড়ভাঙা না। গত কয়েক বছরে কি তিনি বদলে গেছেন তাহলে?

আরো পড়ুন—মিখায়েল হানেকে: ‘প্রত্যেকটা চলচ্চিত্রই তার দর্শককে ধর্ষণ করে’

“হ্যাঁ, কাজের ক্ষেত্রে আমার আচরণ এখন অনেকটাই বন্ধুসুলভ হয়ে গেছে,” সাথে সাথে জবাব দিলেন তিনি, “আমি এটা শিখে নিয়েছি আসলে। ঠিক আছে, সিনেমাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সেই সাথে জীবনের অবস্থানগত বৈশিষ্ট্যগুলিও দরকারি। কিন্তু এই শিল্পটা আমাকে শিখতে হয়েছে। আমার মনে হয় রন হাওয়ার্ডের এটা ভেতর থেকেই আসে—তিনি একজন সহজাত ভাল মানুষ। আমিও সহজাত ভাল লোক, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে ওই দিকটা নিয়ে আসতে আমাকে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে অনেক।”

দাম্পত্য জীবনে স্থিরতা তাকে এরকম বন্ধুত্বপূর্ণ হতে সাহায্য করেছে কিনা ভাবছি। তার বর্তমান স্ত্রী সুজি এমিস টাইটানিক সিনেমায় নাতনির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তাদের সংসার টিকে আছে আজ ১৭ বছর ধরে—ক্যামেরনের বিবাহিত জীবনে এখনো পর্যন্ত যা কিনা সবচেয়ে লম্বা সময়। কিন্তু এরকম কোনো সংযোগ আসলে জেমস ক্যামেরনের মত মানুষের জন্য একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের। বরং মানসিক স্থিতির জন্য তিনি একান্তই ক্যামেরনীয় এক কারণ দেখালেন—গভীর সমুদ্র অভিযান। কারণ দুনিয়ার সবচাইতে উচ্চাভিলাষী সিনেমা বানাতে গেলেও ক্যামেরনের শক্তিমাত্রা তেমন উদ্দীপিত হয় না। তাই অবসর সময়ে মিনি সাবমেরিনে চড়ে সমুদ্রের নিচে ঘুরে বেড়ান তিনি। ২০১২ সালে প্রথম ব্যক্তি হিসাবে একক অভিযানে সমুদ্রতলের সবচেয়ে গভীর অংশ ‘মারিয়ানা ট্রেঞ্চ’ ঘুরে এসেছিলেন। যে সাবমেরিনে চড়ে গিয়েছিলেন, সেটার নকশাও তার করা; এঞ্জিনিয়ারদের একটা গ্রুপের সাহায্যে বানানো।

“আমি এ রকম আটটা গভীর সমুদ্র অভিযানে গিয়েছি। এ অভিযানগুলিতে দিন শেষে বড় কোনো সিনেমার আয়োজন থাকে না, কোনো রেড কার্পেট থাকে না। থাকে শুধু গুটিকয়েক মানুষ, যারা জানেন এটা কত কষ্টকর এক কাজ। এই আবহের সাথেই আপনার বন্ধন তৈরি হয়। তাই আমি অনুধাবন করলাম, কাজ শেষে একটা ভাল সিনেমা নিশ্চিত করা ঠিক আছে—কিন্তু এটাই সবচেয়ে জরুরি জিনিস না। বরং কাজ করার পরিবেশটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

এ ছাড়া ক্যামেরন সাগরের তলায় টাইটানিক জাহাজের ধ্বংসাবশেষ বেশ কয়েকবার ঘুরে দেখে এসেছেন (‘অন্য যে কারো চাইতে আমিই ওখানে বেশি গিয়েছি’—জোর দিয়ে বললেন তিনি)। আবার সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে যাওয়ার পরিকল্পনায় নাসা’র সাথেও কাজ করছেন। মঙ্গলগ্রহে মানুষ পাঠানোর মিশন রেকর্ড করবেন তিনি।

তার সবকিছুই কি এত বড় পরিসরে হতে হবে? একটা ছোটখাটো ইন্ডি রোমান্টিক কমেডি বানানো যায় না? বা ডিঙিতে করে মাছ ধরতে যাওয়া?

“আমি এমন সব জিনিস খুঁজে বেড়াই যা আগে কখনো করা হয় নাই। যেসব আমি করতে পারব বলে আমার মনে হয় এবং যে জিনিসগুলি এখনো করা হয় নি—এ দু’য়ের মাঝে ফাঁকটা খুঁজে বের করতে পছন্দ করি আমি। এখন পর্যন্ত আমি যা কিছু করেছি, তার সবই ওই ছোট শূন্যস্থানকে অবলম্বন করে: প্রতিটা অভিযান, আমাদের বানানো রোবোটিকসের প্রতিটা অংশ, প্রত্যেকটা ক্যামেরা সিস্টেম, সমুদ্রতলের যন্ত্রপাতি—সবকিছু ওই এক প্যাটার্নের ভেতর।”

এবার আসি টার্মিনেটর টু এর প্রসঙ্গে—আমার সবচেয়ে প্রিয় ক্যামেরন মুভি। প্রিয় হবার একটা প্রধান কারণ, টার্মিনেটর টু ক্যামেরনের প্রথম ছবি যেটা আমি বড় পর্দায় দেখেছিলাম। আর তিনি এমন একজন নির্মাতা যার চলচ্চিত্র বড় পর্দাতেই উপভোগ করতে হয়। টি-১০০০ (রবার্ট প্যাট্রিক) কে তরল ধাতু থেকে মানুষে রূপ নিতে দেখে আমার মুখ হা হয়ে যায়। এই ইফেক্টের জন্য ক্যামেরন নিজেই নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা এখনো পর্যন্ত আমার চলচ্চিত্র দর্শনের সবচাইতে স্মরণীয়গুলির একটি।

টাইটানিক সিনেমার সেই বিখ্যাত দৃশ্যের শুটিংয়ে (বাঁ থেকে) জেমস ক্যামেরন, লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও ও কেট উইন্সলেট

“দ্যাট ইজ সো কুল,” হাসতে হাসতে বললেন তিনি, “আসলে সে সময়ে নতুনত্ব দিয়ে সিনেমাটা যে চমক সৃষ্টি করেছিল, ওইটা এখন আমাদের পক্ষে করা সম্ভবই না। তবে আপনাদেরকে বেশ জাঁকালো ও সমৃদ্ধ এক অভিজ্ঞতা দেওয়া যেতে পারে।”

এই ‘অভিজ্ঞতা’ সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা থেকেই ক্যামেরন তার পূর্ববর্তী কাজগুলি থ্রিডিতে রূপান্তর করার জন্য এত সময় ব্যয় করছেন। জেমস ক্যামেরনের কোনো সিনেমা আপনাকে তাক লাগাতে ব্যর্থ হবে, এমনটা হতে পারে না—এমনকি মুক্তির তিন দশক পরেও। কিন্তু স্পেশাল ইফেক্টের ওপর যতই মনোযোগ দেওয়া হোক না কেন, দর্শকদের মাঝে তার সিনেমার এতটা দীর্ঘস্থায়ী আবেদনের আসল কারণ তিনি একজন প্রকৃত গল্পকার। এ জন্যেই তার ছবিগুলি থেকে এক ধরনের মজা পাওয়া যায় যা মাইকেল বে’র ছবিতে পাওয়া যায় না।

টার্মিনেটরের প্রথম খণ্ড যে এত বিশাল হিট হবে তা কেউ প্রত্যাশা করে নাই। তাই ডার্টি হ্যারি’র মত বেশ একটা রুক্ষ নৈরাশ্যবাদী আবহ ছিল ছবিটাতে। কিন্তু টার্মিনেটর টু লেখার সময় ক্যামেরন জানতেন, এবারের খণ্ড যতটা সম্ভব জনসাধারণের উপযোগী হতে হবে। তাই শোয়ার্জনেগারের ভয়ঙ্কর খুনী রোবটের চরিত্রকে পাল্টে এক ধরনের কমেডি এক্সচেঞ্জ স্টুডেন্ট বানিয়ে দেওয়া হল; যেন কোনো এলিয়েন ভিনগ্রহে এসে একই সাথে মুগ্ধ ও হতভম্ব হচ্ছে।

আরো পড়ুন—জেরি লুইস: ‘ফরাসিরা আমাকে কেন ভালবাসে? আমেরিকান সমালোচকরা মনে করে, এর কারণ ফরাসিরা সবাই গাধা।’

“আর্নল্ডের তো প্রথমে গল্পটা একদমই পছন্দ হয় নাই। তিনি আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যাতে এই প্রজেক্ট নিয়ে আর না আগাই আমরা। কিন্তু আমি বললাম: ‘না, আমরা এটাই করব। দিস ইজ রিয়েলি কুল।’ তারপর ধীরে ধীরে তিনি গল্পের গভীরতা দেখা শুরু করলেন,” স্বয়ং কোনানও তাকে রুখতে পারেন নাই বলে হয়ত কিছুটা গর্ব নিয়েই কথাগুলি বললেন জেমস।

সে সময়কার সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেমাগুলির মাঝে অন্যতম ছিল টার্মিনেটর টু, যার নির্মাণে খরচ হয়েছিল প্রায় ২০ কোটি ডলার। আবার আয়ের দিক থেকেও ছিল শীর্ষ তালিকাভুক্ত—প্রায় ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি। অবশ্য এ দুই বৈশিষ্ট্যই এরপর ক্যামেরনের প্রায় সব ছবির নিয়মিত অনুষঙ্গ হয়ে যায়। তবে একজন প্রযোজক একটু উল্টাপাল্টা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে এর সবকিছুই হয়তো ভেস্তে যেতে পারত।

“ওরিয়ন পিকচার্সের মাইক মেডেভয় এক রাতে আমাকে ফোন দিয়ে বললেন, ‘এই মাত্র একটা পার্টির সাথে কথা বলে তোমার সিনেমার জন্য অভিনেতা নির্বাচিত করে ফেললাম!’ যে কোনো নির্মাতারই এ খবর শুনে খুশি হওয়ার কথা যে, হোমড়া চোমড়া এক প্রযোজক তার সিনেমার কাস্টিং করে ফেলেছেন। কিন্তু তিনি বললেন, ‘ওকে, টার্মিনেটরের চরিত্রে থাকবেন ওজে সিম্পসন।’ আমি বললাম: ‘হেই মাইক, খুবই বাজে আইডিয়া। আপনি সিনেমাতে দেখাতে চান, একজন কালো অ্যাথলিট হাতে ছুরি ও বন্দুক নিয়ে সাদা চামড়ার এক মহিলাকে লস অ্যাঞ্জেলেসের রাস্তায় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছেন? না, এ রকম কিছু করা যাবে না।’ ভাগ্য ভাল সে রকম কিছু হয় নাই। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার, শিল্পের বশবর্তী হয়ে শেষ পর্যন্ত বাস্তবেই যেন এ রকম ঘটনা ঘটে গেল।”

তবে ওজে সিম্পসনের বদলে শোয়ার্জনেগারকে নেওয়ার ব্যাপারে ক্যামেরনের সিদ্ধান্ত যতটা বুদ্ধিমান হোক না কেন, সারাহ কনোরের ভূমিকায় লিন্ডা হ্যামিলটনের জন্যই ছবিটা এত আলাদা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে। পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গিকে তোয়াক্কা করার তো প্রশ্নই আসে না, বরং কাউকেই তুষ্ট করতে আগ্রহী না এই বলিষ্ঠ নারী চরিত্র ১৯৯১ সালে যদি বিরল হয়ে থাকে—তবে আশ্চর্যজনকভাবে তা আজকেও অনন্য। এলিয়েন সিনেমার রিপলি এই চরিত্রের একমাত্র পূর্বসূরি। এর ঠিক পাঁচ বছর আগেই রিডলে স্কটের কাছ থেকে এলিয়েনের দ্বিতীয় খণ্ড এলিয়েন্স নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন জেমস ক্যামেরন। আর যথারীতি তিনি রিপলিকে পার্শ্বভূমিকা থেকে নিয়ে আসেন একেবারে কেন্দ্রে।

সারাহ কনোরের ভূমিকায় লিন্ডা হ্যামিলটন

তাই যতই পৌরুষ থাকুক না কেন, ক্যামেরন প্রায় সব সময় সত্যিকার দৃঢ় নারী চরিত্রদেরকে তার সিনেমাগুলির কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে থাকেন। দি অ্যাবিস এর ড. লিন্ডসে ব্রিগম্যান থেকে শুরু করে টাইটানিক এর রোজ—সব ক্ষেত্রেই তেমনটা দেখা যায়। তো সম্প্রতি ওয়ান্ডার ওম্যান নিয়ে যে উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল, সে ব্যাপারে তার মন্তব্য কী?

“ওয়ান্ডার ওম্যানকে নিয়ে আত্মতুষ্ট হয়ে হলিউড নিজেই যেভাবে নিজের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে—তাতে গোটা ব্যাপারটা অনেক বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠছে সবার জন্য। ওয়ান্ডার ওম্যান একটা অবজেক্টিফাইড আইকন। ফলে তাকে পুরুষশাসিত হলিউড সেই আগের মতই নিয়ন্ত্রণ করছে। আমি বলছি না যে সিনেমাটা আমার পছন্দ হয় নাই, কিন্তু এই ছবি দিয়ে আমরা উল্টো পিছিয়ে গেলাম। সারাহ কনোর কোনো সৌন্দর্যের আইকন ছিল না। সে শক্তিশালী হলেও মানসিকভাবে ছিল জর্জরিত। আর মা হিসাবে তার অবস্থা একেবারেই শোচনীয়, কিন্তু তারপরও সে সম্পূর্ণ দৃঢ়তা দিয়ে দর্শকদের শ্রদ্ধা আদায় করে নিয়েছে। আর আমার কাছে সারা কনোরের মত চরিত্র থাকার সুবিধা একদম স্পষ্ট—কারণ দর্শকদের অর্ধেক নারী।”

তাহলে প্রকৃত শক্তিশালী নারী চরিত্র প্রদর্শনে সিনেমাগুলি এখনো কেন ভাল করতে পারছে না?

প্রথম বারের মত ক্যামেরন যেন কথা বলার শব্দ হারিয়ে ফেললেন। “আমি—আমি জানি না। হলিউডে ক্ষমতাসীন অনেক নারী আছেন। কী ধরনের সিনেমা নির্মিত হবে তার নকশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তারা। আমার মনে হয়… না, এর কৈফিয়ত আমি দিতে পারব না। কারণ আর কতবার একই জিনিস করে দেখাতে হবে আমাকে? মনে হচ্ছে আমি যেন কোনো উইন্ড টানেলের মুখে চিৎকার করছি।”

ক্যামেরন দৃঢ় নারী চরিত্র লিখতেই শুধু পছন্দ করেন না, দৃঢ় চরিত্রের নারীদেরকে বিয়ে করার অভ্যাসও তার আছে। এখনো পর্যন্ত পাঁচবার বিয়ে করেছেন তিনি। এদের মাঝে আছেন পরিচালক ক্যাথরিন বিগেলো। এছাড়া আছেন টার্মিনেটর সিরিজের সাথে যুক্ত আরো দুইজন: প্রযোজক গেইল অ্যান হার্ড, তারপর লিন্ডা হ্যামিলটন।

আরো পড়ুন—আব্বাস কিয়ারোস্তামি: ‘সব ছবিরই কোনো না কোনো ধরনের গল্প থাকা উচিত’

“শক্তিশালী স্বাধীন নারীতে আকৃষ্ট হবার অসুবিধাটা হলো, তারা স্বনির্ভর ও শক্তিশালী নারী—আপনাকে তাদের দরকারই নাই!” হেসে হেসে বললেন তিনি। “সৌভাগ্যক্রমে এমন এক স্বাধীন শক্তিশালী নারী এখন আমার স্ত্রী যিনি আসলেই বিশ্বাস করেন আমাকে তার দরকার আছে।” (তাদের বিচ্ছেদের ব্যাপারে লিন্ডা হ্যামিলটন অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণ দেখিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে তিনি বলেন, “তার বাসায় গিয়ে ওঠার সাথে সাথেই আমি বুঝে ফেলেছিলাম, আমার ভুল হয়েছে। সে তখন কর্তৃত্ববান পরিচালকের ভূমিকায়। সিনেমার সেটে যে লোকটাকে আমি দেখতাম, তিনি যেন ব্যক্তিগত জীবনেও চলে আসলেন। পুরো পরিবেশ ছিল তার নিয়ন্ত্রণে, আমার কথার তেমন দামই ছিল না।”)

টার্মিনেটর টু এর শুটিংয়ের সময়ই কি লিন্ডা ও ক্যামেরনের প্রেম শুরু হয়?

“না। অবশ্যই না। শুটিং শেষ হবার পর পরই আমরা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। কিন্তু শুটিং চলাকালীন কোনো অভিনেত্রীর সাথে প্রেম না করা এমন একটা নিয়ম যা আমি কখনোই ভাঙব না। বিবাহিত জীবন নিয়ে এখন বেশ সুখী আমি। বাকি জীবনও তেমনটাই থাকবে। একজন পরিচালক হিসাবে এই নিয়ম আপনি ভঙ্গ করতে পারেন না। এমনকি টাইটানিকের সময় যখন সুজি আর আমার প্রথম দেখা হয়, আমরা… আমরা কিন্তু—” আবারো কিছুটা থেমে গেলেন তিনি, যেন শব্দ হারিয়ে ফেলেছেন। “আমার মনে হয়, শুটিং শেষ হবার দশ সেকেন্ডের মাথায়ই…”

স্ত্রী সুজি এমিসের সাথে জেমস ক্যামেরন

হ্যামিল্টন আর ক্যামেরনের একটি মেয়ে আছে আর এমিসের সাথে তার সন্তান আছে তিনজন। তারা নিউজিল্যান্ড ও ম্যালিবুতে ভাগাভাগি করে সময় কাটান। জায়গাটা নিশ্চয়ই খুব মনোরম, কিন্তু আমার মনে হয় না ক্যামেরনের সাথে থাকা তেমন স্বস্তিদায়ক কোনো অভিজ্ঞতা। “বিশ্রাম করার ক্ষেত্রে আমি তেমন সুবিধার না, এটা সত্যি।” বললেন তিনি, “আমার কাছে ছুটি কাটানো হল পুরা পরিবারকে নিয়ে তাহিতিতে গিয়ে জলযানে করে পানির নিচে ছবি তুলে গোটা সপ্তাহ পার করা।”

আগামী আট বছর তিনি অ্যাভাটারের আরো চারটা—চারটা!—সিনেমা বানানো নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন, এটা চিন্তা করলে তো তাকে বেশ শান্ত বলেই মনে হয়। তাছাড়া পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়েও তেমন একটা আশাবাদী না তিনি। নিরামিষাশী ও পরিবেশবাদী এই ভদ্রলোক ট্রাম্পের ভক্তও নন। ব্যাপারটা বিস্ময়কর।

অ্যাভাটার (২০০৯)—আরো চারটি খণ্ড আসছে এই ছবির

“দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এমন কিছু তিনি করেন নাই যা কাউকে অবাক করে দিতে পারে; কিন্তু যা যা করেছেন তার সবই ভয়াবহ। ইতিহাসের এই সঙ্কটপূর্ণ সময়ে যখন আমাদের সামনে এগোনোর কথা, সেখানে আমরা ভুল দিকে হাঁটছি। ভবিষ্যতে মানুষের দুর্দশা এমনিতেও বাড়ত, এখন তা আরো বেশি হতে যাচ্ছে,” বললেন তিনি।

আর এই উচ্ছ্বসিত মুহূর্তে এসেই আমাদের সময় শেষ হয়ে গেল। কিন্তু ক্যামেরনের মাঝে আসলেই পরিবর্তন এসেছে কিনা তা এখনো নিশ্চিত হতে পারি নাই আমি। তাকে পরীক্ষা করে দেখার একটা উপায় আছে শুধু।

“আচ্ছা,” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “একটা জিনিস নিয়ে আমি সবসময়ই চিন্তা করে এসেছি। টাইটানিকের শেষে পানিতে ভাসার সময় রোজ তার ওই বোর্ড জ্যাকের সাথে শেয়ার করতে পারল না কেন?”

হুট করে যেন অশুভ এক নীরবতা নেমে এলো চারিদিকে।

“ঠিক আছে, ঠিক আছে। এই কথা প্রায়ই শুনতে হয় আমাকে,” শেষ পর্যন্ত মুখ খুললেন তিনি, “এখন মনে হচ্ছে, বোর্ডটা আরো ছোট বানানো উচিৎ ছিল আমার,” তার মুখে হাসি।

ওহ জেমস ক্যামেরন, আসলেই আপনার উন্নতি হয়েছে।

অনেক সময়ই এমন হয়। কোনো পরিচিত লোকের সাথে কথা বলার সময় আপনি খেয়াল করেন, তিনি আপাত সব ভাল কথা বললেও তার মুখভঙ্গিতে স্পষ্ট বিদ্রূপ। আপনি মোটা; আপনি জানেন আপনার স্বাস্থ্যের অবনতি হয় নাই; তারপরও সেই লোক আপনার কাঁধে হাত রেখে হাসিমুখে বললেন, “আরে, তুমি তো অনেক শুকায় গেছ!” এইরকম ঘটনায় আপনার তাৎক্ষণিক অনুভূতি প্রসঙ্গভেদে একেক রকম হতে পারে—বিরক্তি, রাগ বা ঘৃণা।

তবে প্রতি ক্ষেত্রে একটা প্রতিক্রিয়া আপনার মাঝে কাজ করবেই—তা হলো অস্বস্তি। এমনই কিছু অস্বস্তিকর কথোপকথন দিয়ে ভরা ‘গেট আউট’ সিনেমার অনেকগুলি সিক্যুয়েন্স। আর এর প্রতিটাতেই মূল চরিত্রের প্রতি খুব সহজে সহানুভূতিশীল হতে পারেন দর্শকরা।

সিনেমার কাহিনির মূলে আমেরিকান সোসাইটির বর্ণবৈষম্য। আমি বিশেষ করে স্বস্তি পেয়েছি এই নিয়ে, যে গল্পে এই ব্যাপারে কোনো প্রতীকের ব্যবহার করা হয় নাই। সরাসরি বলেই দেওয়া হয়েছে ছবির যাত্রা ঠিক কোথায়।

নায়ক ‘ক্রিস’, একজন আফ্রিকান-আমেরিকান মধ্যবয়সী যার গার্লফ্রেন্ড ‘রোজ’ সাদা চামড়ার এলিট পরিবারের মেয়ে। রোজ প্রথমবারের মত বাবা-মায়ের সাথে তার বয়ফ্রেন্ডকে দেখা করাতে নিয়ে যাচ্ছে। সমাজবাস্তবতা সম্বন্ধে সচেতন ক্রিস তার কাছে জানতে চায়—তার বাবা-মা কি আদৌ জানে যে ক্রিস কালো চামড়ার কিনা? রোজ তা নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন না। কারণ তার পরিবার নাকি লিবারেল। সম্ভব হলে তারা তৃতীয়বারের মতোও বারাক ওবামাকে ভোট দিত।

প্রথম দেখায় রোজের বাবা-মার মাঝে সে রকম প্রতিক্রিয়াই দেখা যায়। তারা ক্রিসকে সাদরে গ্রহণ করে। বাবা ‘ডীন আর্মিটাজ’ একজন নিউরোসার্জন; আর তার স্ত্রী ‘মিসি’ হিপনোথেরাপিস্ট। তাদের কথাবার্তা আন্তরিকতায় ভরপুর না হলেও অস্বাভাবিক না। হয়ত বেশিই মার্জিত। তবে আস্তে আস্তে ক্রিস কিছু অসংলগ্নতা টের পেতে থাকে।

পরিচালক জর্ডান পীল (জন্ম. নিউ ইয়র্ক, ইউনাইটেড স্টেটস, ১৯৭৯)

বাড়ির প্রধান পরিচারক-পরিচারিকা দুইজনই কৃষ্ণাঙ্গ। তার ওপর দু’জনের ভঙ্গিমা বেশ অদ্ভুতুড়ে। তাদের অভিব্যক্তিহীন চেহারায় ক্রিস তার জন্য যেন বিদ্রুপের আভাস দেখে। এক ফাঁকে ক্রিস আলাপ করতে যায় ওদের সাথে। তাতে অস্বস্তি আরো বাড়ে।

পরদিন আবার আর্মিটাজদের বাড়িতে তাদের বন্ধুদের আমন্ত্রণ। বার্ষিক এই আয়োজনে অংশ নিতে গিয়ে ক্রিস বেশ বিপাকে পড়ে। সবার ব্যবহার অনেক বেশি পরিশীলিত। এতজনের মাঝে ক্রিস ছাড়া শুধু আর একজনই কৃষ্ণাঙ্গ আছেন। তাকে পরিচিত মনে হওয়ায় তার সাথে কথা বলতে গিয়ে আরো অনাকাঙ্ক্ষিত সব পরিস্থিতির উদ্ভব হতে থাকে। সেসবের কেন্দ্রে ক্রিস নিজেই।

পরিচালক জর্ডান পীল (যিনি একজন আফ্রিকান-আমেরিকান) এর এই সিনেমাটা আমি দেখেছি সুবিধাজনক অবস্থান থেকে। ছবিতে মানুষের নিয়মিত কার্যকলাপের অসঙ্গতিগুলিকে সম্প্রসারিত করে দেখানোয় তেমনটা সম্ভব হয়েছে। কালো-সাদাময় রেসিজম আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রকট আর প্রত্যক্ষ না। যদিও সূক্ষ্ম আর ঢিলাঢালাভাবে এইরকম রেসিজম আমাদের ভাবনাতেও আসে। তাই রেসিজমকে পাশ কাটিয়ে এই ছবি আমাদের আচারিক টিটকারি দিয়ে ধরার চেষ্টা করেছি আমি; যা প্রথম প্যারাতে স্পষ্ট।

জর্ডান পীল এই সিনেমার জন্য রেফারেন্স নিয়েছেন আইরা লেভিন এর উপন্যাস ‘দ্য স্টেপফোর্ড ওয়াইভস’ (১৯৭২) থেকে—সেখানে সায়েন্স ফিকশন আর হররের আদলে দেওয়া হয়েছিল নারীবাদী বক্তব্য।

আসলে স্যাটায়ারের বহিঃপ্রকাশ যদি কমেডি দিয়ে হতে পারে, তাহলে বক্তব্যের গাম্ভীর্য হররের উপযোগী আবহ তৈরি করে দিলেও অবাক হওয়ার কিছু নাই। এমনিতে হলিউডে হরর আর কমেডি ঘরানার মিশ্রণ নতুন কিছু না। সাহিত্যের আদলে একশ’ বছর আগে থেকেই ধারাটা চলছে। কিন্তু সিনেমায় বেশিরভাগ সময় দুই জঁনরার সম্মিলন ঘটে শুধু। যাতে পুরোভাগে থাকে কমেডি, আর হরর হয়ে যায় অতিরঞ্জন এবং ভায়োলেন্সের দৃশ্যায়ন। স্যাম রেইমি’র ‘ইভিল ডেড’কে (১৯৮১) এই ঘরানার সবচাইতে আধুনিক সংস্করণ বলা যায়।

তবে ‘গেট আউট’ যেন পরিমিতভাবে এই দুই জঁনরাকে তার চিত্রনাট্যের দু’প্রান্তে সন্তর্পণে ঝুলিয়ে রেখেছে—যার মাঝখানে উপকরণ হিসাবে আছে ড্রামা ও থ্রিলার। ফলে সমন্বয়টা ছিল সুচারু। আর এই সবকিছুর ভারসাম্য ধরে রেখেছিলেন পরিচালক পীল।

“হরর ও কমেডি জঁনরায় অনেক মিল আছে। এই দুই জঁনরাতে চিত্রনাট্যের গতি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর দু’টাই চাইলে আমাদের সামনে অব্যক্ত অনেক কিছু প্রকাশ করে দিতে পারে।”—পরিচালকের এই মন্তব্যের প্রতিফলন সিনেমাতেও স্পষ্ট।

২০১২ সালে বন্ধু কীগান-মাইকেল কী এর সাথে ‘কী এন্ড পীল’ নামের বিখ্যাত কমেডি টিভি সিরিজ নির্মাণ করেছিলেন জর্ডান পীল। সেখানে তিন বছরেরও বেশি সময় কাজ করেছেন। তাই কমেডিতে তিনি ধাতস্থ। তবে এই সিনেমাতে কমেডির বেশিরভাগ যোগান দিয়েছে অভিনেতা লিল রেল হাওরি’র চরিত্রটি। ক্রিসের এই বন্ধু তার সব রকম কাজেই নাক সিঁটকায়। আর হাউরির কথা বলার ভঙ্গিমা তার প্রতিটা স্বাভাবিক সংলাপকেও করে দেয় হাস্যরসাত্মক। অথচ সাউন্ড ডিজাইন আর সম্পাদনার কৌশলে এই হাস্যরসের মাঝেও হররের প্রভাব কমে নাই। তাছাড়া গল্পের অধিকাংশ বদ্ধ পরিসরে হওয়ায় অতিপ্রাকৃতের আগমন ছিল অনেক বেশি কার্যকর।

৪৫ লাখ ডলার বাজেটের এই সিনেমার বক্স অফিসে আয় প্রায় ২৬ কোটি ডলার। স্বল্প বাজেটের সিনেমাগুলির আয়ের দিক থেকে এই ছবি বেশ কিছু রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে। মৌলিক চিত্রনাট্য হতে নির্মিত কোনো পরিচালকের প্রথম ছবি হিসাবে এর আয় হলিউডের ইতিহাসে সবচাইতে বেশি।

এছাড়া সমালোচক মহলে এর আবেদন ছিল অভূতপূর্ব। এরকম জঁনরায় বর্ণবৈষম্যকে কটাক্ষ করা নিয়ে হয়েছে বিস্তর আলোচনা। আমেরিকার বর্তমান যুগের ভাবধারা ঠিকঠাক ধরতে পারায় সমালোচকরা আপ্লুত। ‘দ্য র‍্যাপ’ এর ফিল্ম ক্রিটিক আলনসো ডুরাল্ডি’র ভাষায়, “ছবিটি ‘কালোদের প্রতি সাদাদের ভীতির প্রতি কালোদের ভীতি’কে সফলভাবে তুলে ধরেছে।”

আমার ছোট রুমের বড় কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে ছবিটা দেখে তা ‘যুগের ভাবধারা’ কতটা ধরতে পারল কি পারল না সেটা ধরতে পারা আমার কাজ না মনে হয়। আমি এইটুকু বলতে পারি, রবের ব্রেঁসোর ভাষায়—ছবিটাতে ‘ন্যাচারালনেস’ আছে, কিন্তু ‘ন্যাচার’ কতটা আছে জানি না।

দুইজন মানুষ শুধু নিজেদের মাঝে কথা বলে যাচ্ছে। কথার বিষয় তাদের সুবিধামত পাল্টাচ্ছে। মানুষরা কথা বললে যা হয়—বাকবিতণ্ডাও হচ্ছে মাঝে মাঝে। সময় কাটছে।

এ রকম পরিস্থিতি নিয়ে নাটক খুব ভালো হয়। কিন্তু চলচ্চিত্রে যেহেতু মঞ্চের চেয়ে সুযোগ অনেক বেশি, তাই এরকম কোনো প্লট নিয়ে বানানো মুভি দেখলে অনেকের হাসফাঁস লাগে। স্বাভাবিক। ক্যামেরার ঘুরে বেড়ানোর জায়গার তো অভাব থাকার কথা না। তাহলে দুইজন মানুষের আলাপের মধ্যেই আটকে থাকতে হবে কেন!

end-t1
ছবির পোস্টার

স্বীকার করি, এরকম ছবির প্রতি আমার দুর্বলতা আছে। চরিত্র যত কমতে থাকে, সৃজনশীলতার চাহিদা ততই বাড়ে। তাই এই ধরনের ছবিগুলিতে নির্মাতাদের ভঙ্গুর অবস্থায় পাওয়া যায়। যারা শক্তিশালী, তারাই শুধু বেরিয়ে আসে। বা এমনভাবেও বলা যায়, শক্তিশালীরা ছাড়া এ রকম ছবি বানাতেই যায় না কেউ।

movie-review-logo

২০১৫ সালের দ্যা এন্ড অফ দ্যা ট্যুর জীবনীমূলক ছবি। আসলে জীবনীমূলক বলতে যেমনটা ধারণা হয়, তাও না। বলা যায়, বাস্তব জীবনের কতগুলি বাস্তব ব্যক্তির কয়েকদিনের কিছু ঘটনা। আর ঘটনাগুলির ফোকাস দুইজন মানুষের উপর।

david-foster-w-2
ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস এর উপন্যাস ‘ইনফিনিট জেস্ট’।

একজন ডেভিড লিপস্কি। ১৯৯৬ সালে রোলিং স্টোন ম্যাগাজিনের হয়ে কাজ করতেন এই লেখক। আরেক লেখক ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস এর উপন্যাস ইনফিনিট জেস্ট তখন পুরো আমেরিকায় সাড়া ফেলে দেয়। লিপস্কি এই জনপ্রিয় লেখকের সাক্ষাৎকার নেওয়ার তাগাদা দিতে থাকেন তার সম্পাদককে। সন্দিহান সম্পাদক এক সময় রাজি হন, আর লিপস্কি এসে যোগ দেন ওয়ালেসের ‘বুক ট্যুর’-এ।

ওয়ালেস এবং লিপস্কি’র একসঙ্গে কাটানো সেই পাঁচ দিন থেকে লিপস্কি তার আর্টিকেল লিখে ফেলার আশায় থাকেন। যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত ম্যাগাজিনে আর্টিকেলটি ছাপাতে দেন নি। প্রায় পনেরো বছর পর ডেভিড ওয়ালেস আত্মহত্যা করলে তাদের দু’জনের সেই কথোপকথন নিয়ে একটি বই লেখেন লিপস্কি। এবার তার এই ‘নন-ফিকশন’ বই সাড়া ফেলে দেয় চারিদিকে।

লিপস্কি’র লেখা বইটি থেকে চিত্রনাট্য লিখেছেন পুলিৎজার জয়ী নাট্যকার ডনাল্ড মারগিউলিস। ডনাল্ডের একসময়ের ছাত্র পরিচালক জেমস পনসোল্ডকে চিত্রনাট্যটি থেকে ছবি বানাবার দায়িত্ব দেওয়া হয়। জেমস পনসোল্ড সহজ সুন্দর ছবি বানাতে পছন্দ করেন। তার দ্যা স্পেক্ট্যাকুলার নাউ (২০১৩) রোমান্টিক কমেডিগুলির মধ্যে সবচাইতে তৃপ্তি দিয়েছিল। এইবার রোমান্টিক কিছু নেই, যদিও সহজ সুন্দর বলা যায় আবারও। কমেডি আছে—তবে সচেতন কিছু না—দুই মূল চরিত্রের নাম ‘ডেভিড’ হওয়া পর্যন্তই কমেডির দৌড়।


The End of the Tour Official Trailer

ছবিতে ওয়ালেস তার জীবনের ঘটনার সাথে সাথে নিজের ভাবনা-চিন্তা-ধারণা-দুঃশ্চিন্তা নিয়ে যতটা সম্ভব খোলামেলা আলাপ করে গেছেন।

লিপস্কি কখনো পেশাদার রিপোর্টার, কখনো বন্ধুর মত প্রশ্ন করে করে কিংবা নিজের বক্তব্য দিয়ে ওয়ালেসের কাছ থেকে তার কথাগুলি বাড়িয়ে নিয়েছেন। তাদের মাঝে সবসময়ই দুই প্রান্তের দুই লেখকের চাপা সংঘাত ছিল—একজন, যাকে মিডিয়া তারকা তকমা দিতে উঠে পড়ে লেগেছে। আরেকজন, যে লেখালেখির সামান্য অনুপ্রেরণা পেতেও হিমশিম খাচ্ছে ।

end-of-t543
ছবির দৃশ্য।

লিপস্কির এই হীনম্মন্যতা স্পষ্ট হয় তার গার্লফ্রেন্ড দিয়ে। ওয়ালেস এর ইনফিনিট জেস্ট বইটি যখন সব জনপ্রিয়তা কেড়ে নেওয়া শুরু করে, তখন লিপস্কির নিজেরও একটি বই বেরিয়েছিল। নিজের গার্লফ্রেন্ড এর মুখ থেকে ওয়ালেস এর গুণগান শুনেই তিনি এই সাক্ষাৎকার নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

অন্তত ছবিতে ঘটনাগুলি এভাবেই সাজানো হয়েছে, যদিও বাস্তবের ব্যাপারগুলিতে নাকি নাটকীয়তার কিছুই ছিল না।

ছবির একেবারে শেষ পর্যন্ত গেলে অবশ্য বোঝা যায়, এটা আর যাই হোক—কোনও বাস্তব লেখকের জীবনী হিসেবে বানানো না। বরং যে কোনো মানুষের জীবনী নিয়ে অন্য একজনের মন্তব্য ধরে নিতে পারেন; নিগূঢ় সব মন্তব্য।

lipsky-2
লেখক ডেভিড লিপস্কি (জন্ম ১৯৬৫)

লিপস্কি যখন সাক্ষাৎকারটিকে স্মৃতিকথা ধরে লিখেছিলেন, তখনই হয়ত এই পরিবর্তনটা এসেছিল। চিত্রনাট্যকার আর পরিচালকের ভিন্ন ভিন্ন দর্শনে সেই পরিবর্তনটা শুধুই গভীর হয়েছে।

জেসি আইজেনবার্গ লিপস্কি’র মত চরিত্রে আদর্শ। খিটখিটে, চাপা স্বভাব। রিপোর্টারের পেশাদারি ভাব ধরে রাখা, আবার একই সাথে ওয়ালেসের আড়ষ্টতা কাটানোর চেষ্টায় সহানুভূতি দেখানো—সবকিছু ভালো একটা আর্টিকেল পাওয়ার আশাতেই। নিজেও একজন লেখক, তাই বড় মাপের লেখকের সান্নিধ্যে নিজেকে যাচাই করে নেওয়া।

জ্যাসন সিগেল এখন পর্যন্ত শুধু কমেডি ছবিই করে এসেছেন। সেসব ছবিতে তাকে মানায়ও চমৎকার। এখানে প্রথমবারের মত গম্ভীর কোনো চরিত্রে; তাও একেবারে আমেরিকার গত বিশ বছরের অন্যতম জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকের ভূমিকায়। সিগেল এর লুকানো অভিনয়-প্রতিভা দেখাটা তাই অবাক করেছে বেশি। যদিও এক মুহূর্তের জন্যেও তাকে অযাচিত মনে হয় নি। বরং রকস্টারদের মত বড় চুলের মাথায় ব্যান্ডেনা বেঁধে ঘুরে বেড়ানো সাহিত্যিক হিসেবে সিগেলের চেয়ে উপযোগী কাউকে খুঁজে পাওয়াই কঠিন।

david-walace
লেখক ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস (১৯৬২ – ২০০৮)

পাঠকদের সাথে অকপট থাকতে সাক্ষাৎকারের কোনো কোনো সময় নিজের অতীতের কথা বলেছিলেন ওয়ালেস। ছোট বেলায় টিভি দেখতেন সারাদিন। তাই এখন যেখানে থাকেন, সেই বাসায় টিভি রাখেন নি। নিজের রুক্ষ অভিজ্ঞতার সূত্র ধরেই মানুষের প্রযুক্তির প্রতি অগাধ বিশ্বাস নিয়ে রূঢ় কিছু মন্তব্য করেন। তিনি ভয় পান, টেকনোলজির দেওয়া কৃত্রিম সুখের আধিপত্যে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগগুলি ইচ্ছা করেই দূর করে দেওয়া শুরু হবে। তার কাছে টেকনোলজি অনেকটা জাংক ফুডের মত। সপ্তাহে এক দুইবার সবাই মিলে খাওয়া যেতে পারে, কিন্তু সারাদিন শুধু জাংক ফুড খাওয়ায় যেমনটা হয়—টেকনোলজি ধরে সারাক্ষণ পড়ে থাকাও ততটাই ক্ষতি করে।

শেষমেশ আমি তার এই কথাগুলি আমার কম্পিউটার দিয়েই শুনেছি, আর আপনিও আমার এই লেখা মোবাইল বা কম্পিউটারে শুয়ে বসে পড়ছেন।

ইতালীয় থিয়েটার অভিনেতা লিওপোলদো ফ্রিগোলি (১৮৬৭-১৯৩৬) তার সময়ে ছদ্মবেশের সম্রাট ছিলেন। তার ত্বরিত বহুরূপী ক্ষমতা এতটাই কার্যকরী ছিল অনেকে ভাবতেন হয়ত তার জমজ কোনো ভাই আছে, যে তাকে মঞ্চের তাৎক্ষণিক চাহিদার সময় সাহায্য করে।

ফ্রিগোলি সোজাসাপটা মানুষ, নিজের সূত্র গোপন রাখেন নি। জমজ ভাইয়ের রটনা দূর করতে নিজেই সবাইকে হাতে ধরে শিখিয়ে দিতেন ছদ্মবেশের সব প্রণালী। তবে এই লোকের নাম নিয়ে পরবর্তীতে বেরসিক মনোবিদেরা অদ্ভুতুড়ে এক ব্যাধির নামে জুড়ে দেন। ‘ফ্রিগোলি ডিল্যুশন’ নামের মানসিক এই রোগে আক্রান্ত লোকজন চারপাশে শুধু ফ্রিগোলি সাহেবকে দেখে। না, আক্ষরিক অর্থে না—এই ব্যাধিগ্রস্ত মানুষের কাছে আশেপাশের সবাইকে একই লোক বলে মনে হয়, যেন ছদ্মবেশ নিয়ে চেহারা পাল্টে একজন লোকই বার বার তার সাথে সাক্ষাৎ করছে।

movie-review-logo

‘অ্যানোমালিসা’ ছবির মূল চরিত্র—ব্যবসায়ী ও সুবক্তা ‘মাইকেল’ যে এই বিশেষ রোগের শিকার সে রকম কোনো ঘোষণা অবশ্য কখনোই দেওয়া হয় না। তবে মাইকেল ওহাইয়ো’তে এসে যে হোটেলে রাত কাটায়, সেটার নাম দিয়ে ব্যাপারটা ধরিয়ে দিতে নির্মাতারা অযথা কারচুপি করেন নি।

annomalisa 1
অ্যানোমালিসা (২০১৫)

আর তাছাড়া আপনাকে আরো ভালোভাবে সবকিছু ধরিয়ে দিতে আছে শ্রুতিকটু এক সংযোজন। হ্যাঁ, এখানে তা আক্ষরিক অর্থেই—মাইকেল যতজন মানুষের সাথে এমনকি এক মুহূর্তের জন্যও কথোপকথনে জড়ায়, তাদের সবার কণ্ঠ একই; অন্তত তার কাছে একই শোনায়। কষ্টের ব্যাপার, সেই কণ্ঠ আবার পুরোদমে গুরুগম্ভীর এক পুরুষের। ফলে পানশালার তন্বী ওয়েট্রেস থেকে বদমেজাজি ট্যাক্সি ড্রাইভার, সবার গলার স্বর আপনার আঠারো বছরে শোনা বাবার বকুনির মতই লাগে।

নব্য ব্যবসায়ীদের এক সম্মেলনে উৎসাহমূলক ভাষণ দিতে মাইকেলের একদিনের জন্য ওহাইয়োতে আসা। বাসায় ফেলে আসা স্ত্রী তাদের একমাত্র ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত, ছেলেটিও নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত; অন্তত হোটেল রুমের ভ্যাপসা আবেশে বসে স্ত্রীর সাথে তার টেলিফোনে কথা বলা দেখে তেমনটাই মনে হয়।

কাজেই ছবির একেবারে প্রথম দৃশ্যেই যখন আমরা মাইকেলকে উড়োজাহাজে বসে তার পুরনো প্রেমিকার চিঠি পড়তে দেখি। তা যেন পনেরো মিনিট পর যথার্থতা পায়। ওহাইয়োর বাসিন্দা ‘বেলা’র সাথে তার সম্পর্ক ছিল বেশ ক’বছর আগে। হয়তো সময়ের প্রয়োজনে তাকে ছেড়ে যেতে হয়েছিল, তবু বেলার ঘা শুকোনোর মৌসুম আর আসে নি। মাইকেল তার সংসারে নতুন জীবন পেলেও বেলার যাত্রা আটকে গেছে। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে সাবেক ভালোবাসার পুনর্জাগরণ আশা করা বোকামি। এরপরও মাইকেলের ব্যর্থ চেষ্টা তাকে ভঙ্গুর করে দেয় আরও।

annomalisa-6
“নুয়ে পড়া মাইকেল হোটেল রুমে ফিরতেই তার জীবনধারাকে ছিন্ন করতে আসে এক অপরিচিতা।”

নুয়ে পড়া মাইকেল হোটেল রুমে ফিরতেই তার জীবনধারাকে ছিন্ন করতে আসে এক অপরিচিতা। ঠিক বজ্রপাতের মত মেয়েটি তার চেতনাকে বিদ্যুৎ ঝলকে আলোকিত করে, অনুরণিত হয় প্রতিটি অঙ্গ। এই তরুণীর কথাগুলি তার কানে সেই চিরায়ত ঝন ঝন হয়েই বাজে। হ্যাঁ, এ যে তারই গলা। তাদেরই কণ্ঠ।

নাম ‘লিসা’। মাঝবয়সী এই রমণীর সাথে মাইকেলের কাটানো সময়টুকু নিয়েই ছবিটির বাকিটুকু ভরা। তবে চুপিসারে ঢুকেছে আরো অনেক কিছু।

“স্টপ মোশন” অ্যানিমেশন দিয়ে ছবিটি বানানো। মানে চরিত্রমাফিক পুতুল বানিয়ে সেগুলির প্রতিটি অঙ্গভঙ্গির প্রথমে আলাদা আলাদা ছবি তোলা হয়। পরে সেগুলি একের পর এক চালিয়ে দিলেই পাওয়া যায় চলচ্চিত্রের ভ্রম।

annomalisa 2
“মাঝবয়সী এই রমণীর সাথে মাইকেলের কাটানো সময়টুকু নিয়েই ছবিটির বাকিটুকু ভরা।”

এখন অবশ্য কম্পিউটার দিয়ে সেই ভ্রমকে আরো জোরালো করা হয়। এছাড়া মুখভঙ্গির জন্য আছে থ্রিডি প্রিন্টিং। পরিচালক চার্লি কফম্যান, অ্যানিমেটর ডিউক জনসনের সহযোগিতায় প্রথমবারের মত অ্যানিমেশন পদ্ধতিতে নিজেকে জানান দিলেন। এই চিত্রনাট্যে তার একটি বিশেষ “শব্দনাটক” বানাবার ইচ্ছা ছিল, যাতে শ্রোতারা চরিত্রগুলির মিথষ্ক্রিয়ার কেবল শব্দ শুনতে পাবে, বাকিটুকু হবে নিজেদের কল্পনায়। অনেকটা রেডিওতে শোনা নাটকের মত। শেষমেশ পুতুলদের দিয়ে ঠিক অনুরূপ কিছু অর্জিত না হলেও একটি অনুপম অভিজ্ঞতার জন্ম হয়েছে তা নিশ্চিত।


অ্যানোমালিসা: অফিসিয়াল ট্রেইলার (২০১৫)

ছবির কাঠামো থেকে শুরু করে অদৃশ্য প্রতিটি গড়নে কাঁচামাল হিসেবে ছিল ‘বৈপরীত্য’। পুতুলদের মাঝে একেবারেই মানবিক সব অনুভূতির চর্চা দিয়ে এর শুরু। অ্যানিমেশনের ক্ষেত্রে সাধারণত যে অতিরঞ্জিত ও বিচিত্র মানবদেহের প্রদর্শন দেখা যায়, এখানে তা এড়ানো হয়েছে। প্রতিটি দৃশ্যে চরিত্রদের শারীরিক ভাষা যেন বাস্তবতার সূক্ষ্ম অনুকরণে একটু বেশিই সচেতন। আত্মিক ও জাগতিক নানা আদিম বাসনা দেখাতে এই পুতুলরা হয়তো মানুষের চেয়েও তৎপর।

ছবির একপর্যায়ে একটি ‘লং টেকের’ শেষদিকে লিসা ও মাইকেল দৈহিক লেনদেন শুরু করে। এই দীর্ঘ টেক-এর পুরোটা সময়েই আমাদের অবচেতন কিছুটা অস্বস্তিতে থাকে, যা ধীরে ধীরে দেহে ছড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে অভিজ্ঞতাটির কথা মনে করলে অস্বস্তিটাকে লজ্জা বলে ভুল হয়। দু’টো পুতুল কামবোধ মিটিয়ে নিচ্ছে, আর আমরা কিনা সুড়সুড়ি খাচ্ছি!

annomalisa 3
চার্লি কফম্যান ও ডিউক জনসন

আখেরে ফল পাব না জেনেও নিতান্ত দায়িত্ববোধ থেকে করা কাজের যে অভিজ্ঞতা তার সাথে এই ছবি দেখার মিল আছে। মাইকেলের সাথে সাথে আমরাও জানি সবকিছু কতটা নগ্ন, সময়ের সাথে বহু কষ্টে জমানো আস্তরণটুকু কতটা সহজে স্বচ্ছ হয়ে যায়। কফম্যান সাহেব শুরু থেকেই আমাদের মনস্তত্ত্বে গর্ত খুঁড়ে আসছেন। ‘বিং জন ম্যালকোভিচ’ (১৯৯৯), ‘অ্যাডাপ্টেশন’ (২০০২), ‘ইটারনাল সানশাইন অফ দ্য স্পটলেস মাইন্ড’ (২০০৪)—সবগুলি ছবিতেই তিনি অল্প অল্প করে গর্তটা আরো গভীর করেছেন। এবার তা আরো কিছুদূর।