Category

ছবি

Category

আটআনি জমিদার বাড়ি — সবাই চিনে ‘মুক্তাগাছা রাজবাড়ি’ নামে। মুক্তাগাছা নামকরণেরও একটা গল্প আছে।

মুক্তাগাছার পুরানো নাম ছিল বিনোদবাড়ি। এখানে যে জমিদার বাস করতেন আচার্য্য চৌধুরী, তারা এখানকার স্থানীয় ছিলেন না। বগুড়া থেকে নৌকায় ব্রহ্মপুত্র নদ পাড়ি দিয়ে ময়মনসিংহ আসেন তারা। এলাকার লোকজন তখন জমিদারদের নানা উপহার দিয়ে খুশি করার চেষ্টা করেন। একজন ছিলেন মুক্তারাম কর্মকার। তিনি জমিদার আচার্য্য চৌধুরীকে মুক্তার তৈরি একটি মূল্যবান গাছা উপহার দেন। এতে জমিদার খুশি হয়ে এলাকার নাম রাখেন মুক্তাগাছা।

আচার্য্য চৌধুরীর বংশের মাধ্যমেই মুক্তাগাছা শহরের গোড়াপত্তন হয়। তারা ময়মনসিংহ জুড়ে ১৬ হিস্যার জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। তার মধ্যে আটআনি জমিদার বাড়ি ছিল মুক্তাগাছার এই জমিদার বাড়ি।

ময়মনসিংহে থেকেও অনেক পরেই গেছি মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি দেখতে। ছোট থেকে শুনে আসছি সেখানে একটা জমিদার বাড়ি আছে। তার আগে অবশ্য আব্বার কাছ থেকে মুক্তাগাছার নাম শুনেছি। মুক্তাগাছায় হাট বসে বিকেলে। গরু ছাগলের হাট। প্রত্যেক বছর বাপ-চাচারা সেই হাট থেকে কোরবানির গরু কিনে আনেন। গরু দেখেশুনে কিনতে কিনতে রাত হইয়া যায়। ছোটবেলায় আম্মা ঘুম থেকে ডেকে তুলত গরু দেখার জন্য।

একদিন জমিদার বাড়ি দেখার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সাথে আমার ফুপাত ভাই ছামাদ ও তার বান্ধবী আর আমার বান্ধবী ও তার বোন।

টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে করে মুক্তাগাছা নামলাম আমরা। ময়মনসিংহ সদর থেকে ১৫/১৬ কিমি দূর। টাঙ্গাইল ও জামালপুর যাওয়ার রাস্তা ওইটা। মুক্তাগাছা নেমে বাজারের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। মেইনরোড থেকে ১ কিলোমিটার ভেতরে।

দুইটা জিনিসের টানে লোকজন ওখানে যায়। এক মণ্ডা, দুই জমিদার বাড়ি।

মণ্ডা কী জিনিস বুঝতাম না। আব্বা একদিন কিনে আনলেন। চারকোনা সাদা ছানার মত দানাদার। আমি স্বাভাবিক একটা খেতে পারি। জোর করে হলে দুইটা। মিষ্টির চেয়েও মিষ্টি লাগে আমার কাছে। এখানকার মণ্ডা ওই আমলে নাকি জমিদাররাই খেতো।

জমিদার বাড়ির কাছে আসতেই বড় একটা গেট দেখতে পেলাম। গেটে লোক দাঁড়ানো ছিলো। আশপাশে দেখলাম কিছু টং দোকান, একটা মন্দির ও মাঠ। মূল ফটকের সামনেই সাত ঘাটের পুকুর। প্রতিটা ঘাটই বাঁধানো। তাছাড়া অনেক জায়গায় মঠ ও মন্দির আছে। সিংহ দরজা মানে প্রধান গেট পার হয়ে সামনে অাগালেই কিছু খোলা জায়গা, বাড়ির আঙিনার মত।

সিংহ দরজা বলার কারণ আছে। যেই করিডোর দিয়ে ঢুকতে হয় তার দুই পাশে নিচের খোপে ছিল হাতির ছয়টি মাথার মূর্তি, আর ওপরে থাকত শিকার করা বাঘের নমুনা।

জমিদার বাড়িটি ১০০ একর জায়গা নিয়ে। চুনসুরকি উঠে গিয়ে স্থাপনাগুলির করুণ অবস্থা। ইটের গায়ে ঘাস জন্মাচ্ছে। ভেঙে পড়ছে ছাদ।

যা অবশিষ্ট আছে তাতে বোঝা যায় আগে অনেক সুন্দর ছিল বাড়িটি। জমিদার বাড়ির কিছু স্থাপনায় এখন শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বসানো হয়েছে। এমনকি মন্দিরের পাশের একটা ছোট স্থাপনাকে এটিএম বুথ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

আটআনি জমিদার বাড়িটি এখন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আন্ডারে। এর সংস্কার কাজ চলছে। ভেতরে বড় ক্যামেরা নিয়া ঢুকতে দেওয়া হয় না। তবে মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় ছবি তুলতে দেওয়া হয়।

বাজবাড়িতে এসে আমার কাছে ভাল লেগেছে টিন ও কাঠ দিয়ে তৈরি একটি দোতলা বাড়ি।

ভেতরে বড় বড় আম গাছ, লিচু গাছ আছে। কিছু দরজায় তালা দেওয়া। জমিদার বাড়িটি দেখাশোনার জন্যে আছে ৪ জন কর্মচারী। একজন জানালেন ভেতরে একটা রেস্ট হাউজ নাকি বানানো হবে। দূর থেকে লোকজন গেলে বিশ্রাম নিতে পারবে, এবং থাকতেও পারবে।

প্রধান গেইট
মন্দির
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প এর গলি, ওইটাও জমিদার বাড়ির একটা অংশ ছিল।
মঠ
করিডোরের দুই পাশের খোপগুলিতে ছিল বড় বড় ছয়টা হাতির মাথা।
৪ জন কর্মচারী বসে গল্প করছে
বিভিন্ন ঘর
রাজেশ্বরী মন্দির, এখানে শুধু রাজা-রাণী পূজা করত
জমিদার বাড়ির ভেতরের অংশ
আটআনি জমিদার বাড়ির ভিতরের অংশ
সবুজ ঘাসের অংশটুকু অন্ধকুপ ছিল, বিচারে সাজাপ্রাপ্তদের মেরে এর ভেতরে ফেলা হত। ব্রহ্মপুত্র নদের সাথে এর সংযোগ ছিল।
মন্দিরের ভেতরে পারিবারিক পূজার আসন
মূল স্থাপনা নষ্ট হয়ে গেছে, আছে শুধু কাঠামো
লিচু গাছ
জমিদার বাড়ির ভিতরের অংশ
গোল পিলার
জমিদার বাড়ির ভিতরের অংশ
আমগাছ
পেছনের দিকে
ঘরের ছাদ নাই, আছে লোহার বিম
কুয়া এবং একটি স্থাপনা
এটা নতুন ভাবে তৈরি করা মণ্ডার দোকান, পুরনোটা ভেঙে ফেলা হয়েছে