এখন এইখানে প্রশ্ন আসে যে, সোশ্যাল মিডিয়া বা ফেসবুক কি মানুষের আচরণ মডিফাই করতে পারে কিনা বা করে কিনা!

প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আমার মনে আছে—যদিও কিছুটা ঝাপসা। তখন বাংলাদেশে ইন্টারনেট একটু একটু শুরু হচ্ছিল। কারো বাসায় ইন্টারনেট পাওয়া যেত না। পোর্টেবল মডেম আর সরকারি/ বেসরকারী কোম্পানির ল্যান্ডলাইনের মাধ্যমে ইন্টারনেট কানেকশন—যে সময়ের কথা বলছি তা আরো অনেক পরের ঘটনা। ইন্টারনেট পাওয়া যেত বা শোনা যেত আছে কারো কারো অফিসে। আর ঢাকায় দূরে দূরে একটা-দুইটা সাইবার ক্যাফেতে।

আর ঢাকার বাইরের জেলা শহরগুলিতে যখন ইন্টারনেট পৌঁছাইছে, এটা তারও বেশ আগের ঘটনা। আমার টিনেজ শুরু হতে কিছুটা সময় বাকি আছে তখনো। আমি ঢাকার বাইরে একটা জেলা শহরে থাকতাম। যেমন, এখনো সুযোগ পাইলে তা-ই থাকি, আর যখন সেই সুযোগ না হয়, তখনো সেখানেই থাকি, সাইকোলজিক্যালি। 

তখন সেলেরনের যুগ, আর পেন্টিয়াম থ্রি তখন সবচেয়ে আধুনিক জিনিস হিসাবে বাজারে আসছে। আমি আমার এক কাজিন (ভাই), আমার চেয়ে বয়সে একটু বড়, তার সাথে একদিন সকালে কম্পিউটারে নিড ফর স্পিড খেলতে খেলতে ইন্টারনেট ব্রাউজ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। আর পরে দুপুরবেলায় একটা সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে ঢুকি। আমার মনে আছে, তখন অনেক রোদের মধ্যে আমরা হাঁটতে হাঁটতে সেখানে গিয়ে ঢুকলাম। মনে আছে, দুপুর একটার আগে আগে, সূর্য তখন মাথার উপর।

আমরা ইন্টারনেটে তখন ক্রিকেট নিয়ে হাবিজাবি ব্রাউজ করেছিলাম। তখন গুগল আসছে, কিন্তু গুগলের ব্যবহার ও পরিচিতি বিস্তার লাভ করে নাই। তখন ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারে sex.com লিখে হিট করার পর সেটা sexlaunch.com বা এরকম কাছাকাছি নামের কোনো একটা অ্যাড্রেসে চলে গেছিল।

আর এখন বাংলাদেশে এমন কোনো প্রত্যন্ত গ্রামও পাওয়া যাবে না যেখান থেকে ইন্টারনেট কানেকশন পাওয়া যাবে না বা যেখানকার সমাজের একজন ব্যক্তিও ইন্টারনেট ব্যবহার করে না। এটা শুধু বাংলাদেশের ব্যাপার না, সারা পৃথিবীর ক্ষেত্রেই তাই।

২.
আমাদের বর্তমান সিভিলাইজেশন বা ওয়ার্ল্ড সিস্টেম ব্যাপক ভাবে এখন ইন্টারনেট নির্ভর। এটা শুধু মানুষের মধ্যকার যোগাযোগ সহজ হওয়ার ব্যাপার না, তার থেকেও বেশি কিছু। আগে যেটা সম্ভব ছিল না, যেভাবে সম্ভব ছিল না, এখন সেগুলি সম্ভব, এবং একমাত্র ইন্টারনেটের কারণেই সম্ভব। ফলে আমাদের এই সভ্যতা এমন একটা জায়গায় চলে আসছে যে, অনেকাংশেই তা ইন্টারনেটের উপর নির্ভর করছে। সারা পৃথিবীর ইলেক্ট্রিসিটি সিস্টেম কলাপস করলে যেমন হয়ত এই সভ্যতা বা আমাদের এই বিশ্ব ব্যবস্থা ধসে পড়বে, পৃথিবীর ইন্টারনেট সিস্টেম হঠাৎ কলাপস করলেও সেরকম কিছুই হওয়ার কথা। সভ্যতা আর মানব সমাজ এভাবেই কাজ করে, শুধু সামনের দিকেই যায়, কোনো এস্কেপ রুট থাকে না, বা পিছনে যাওয়ার রাস্তাও থাকে না।

কিন্তু সেটা আমার আলাপের উদ্দেশ্য না। ওয়ার্ল্ড সিস্টেম গত অল্প কয়েক বছরেই ইন্টারনেটের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে—এইটুকু বললে আসলে পুরা সিনারিওটা বোঝা যায় না। মানুষের প্রয়োজন বা কাজকর্ম ইন্টারনেটের মাধ্যমে হচ্ছে—এর বাইরেও মানুষের জীবনের যে মাল্টিপ্লিসিটি—মানুষের বিনোদন, লাইফস্টাইল, সামাজিকতা সবকিছুই ইন্টারনেট কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।

ফলে, মানুষের এই যে সবসময় ইন্টারনেটে কানেক্টেড থাকা, মানবজীবনের ইন্টারনেট কেন্দ্রিকতা—সেটা হচ্ছে প্রধানত তিনটা জিনিসকে ঘিরে—সোশ্যাল মিডিয়া, মানে ফেসবুক, টুইটার এর ভিতরে থাকলেও সেভাবে অতটা নাই, ইউটিউব এবং গুগল। আবার ইউটিউবের প্যারেন্ট কোম্পানি যেহেতু গুগল—তাহলে, আসলে এই দুইটা জিনিসই এখন ইন্টারনেটের পাওয়ার হাউস—গুগল এবং ফেসবুক। এই দুই কোম্পানি বা কর্পোরেশনের বিজনেস মডেলই এখন সারা বিশ্বে আস্তে আস্তে মানব সমাজের রাজনীতি, অর্থনীতি, ভবিষ্যৎ এসব নির্ধারণ করে দিচ্ছে। ইতিহাসের এই সময়ে এসে মানবসভ্যতার অভিমুখ ও ভবিষ্যৎ কী হবে সেটা ঠিক করার ক্ষমতার মালিক হয়ে উঠছে টেকনোলজিক্যাল কর্পোরেশনগুলি।

যেমন, ফেসবুকের বিজনেস মডেলের ব্যাপারে একটা ইন্টারেস্টিং জিনিস হল, ফেসবুক কিন্তু কোনো নরমাল কোম্পানি না। ২০১২ সালে ফেসবুক যখন পাবলিক কোম্পানিতে পরিণত হল, তখন ফেসবুকের ভ্যালুয়েশন এটা ভিত্তি করে হয় নাই যে ফেসবুক কী পরিমাণ টাকা আয় করছে। ফেসবুক তখন যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ ডিপার্টমেন্টের সাথে কথা বলে নতুন একটা ক্যাটেগরি তৈরি করছে—যে ফেসবুকের মূল্যায়ন হবে শুধুমাত্র এটা কী পরিমাণ ব্যবহার হয়েছে বা কী পরিমাণ ইউজার এনগেইজমেন্ট হয়েছে তার ভিত্তিতে। তার মানে, ফেসবুকের বিজনেস মডেলের অফিসিয়াল ম্যান্ডেট আর এটা নাই যে তারা কাস্টমারদের সেবা প্রদান করবে এবং টাকা আয় করবে। এই বিজনেস মডেলের ম্যান্ডেট এটা যে—এই কোম্পানি একটা অ্যাডিকশন বা আসক্তিতে পরিণত হবে এবং ব্যবহারকারীদের বিহেভিয়র মডিফাই করবে বা আচরণ পরিবর্তন করবে।

এখন এইখানে প্রশ্ন আসে যে, সোশ্যাল মিডিয়া বা ফেসবুক কি মানুষের আচরণ মডিফাই করতে পারে কিনা বা করে কিনা!

৩.
অনেক যুক্তি ও প্রচুর উদাহারণ দেওয়া সম্ভব যে, ফেসবুককে গণতন্ত্রের পক্ষে ব্যবহার করা যায়, ফেসবুকে অ্যাকটিভিজম করা যায়, সামাজিক অনেক ন্যায়-অন্যায় ইস্যুতে কথা বলা যায়—এরকম হাজারটা ইতিবাচক বিষয় সামনে হাজির করা সম্ভব। এবং সেগুলি অ্যাবসুলিউটলি কারেক্ট। কিন্তু এইগুলি সবগুলিই রিয়াল ইভেন্ট—যেগুলি সোশ্যাল মিডিয়াতে বা ফেসবুকে আনা হয় এবং তার একটা ইমিডিয়েট ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়।

কিন্তু সমস্যাটা হল—বিহাইন্ড দ্য সিন, পর্দার পিছনে। বিহাইন্ড দ্য সিনে—ব্যবহারকারীর বিহেভিয়র মডিফিকেশন, ম্যানিপুলেশন ও অ্যাডিকশন বাড়ানোর জন্য ফেসবুকে কিছু অ্যালগরিদম সবসময় চলছে। এবং এই অ্যাডিকশন অ্যালগরিদমগুলি অন্ধ। এই অ্যালগরিদমগুলি ডাম্ব—আপনার আসক্তি বাড়ানোর জন্য একটা বিশেষ ম্যাথমেটিক্যাল স্কিম। এই অ্যালগরিদমগুলির উদ্দেশ্য একটাই—আপনি যা কিছু ফেসবুকে ইনপুট হিসাবে দেন, সেগুলির জন্য সর্বোচ্চ যতটা সম্ভব ইউজার এনগেইজমেন্ট তৈরি করা।

তাহলে, অ্যালগরিদম এখানে কীভাবে মানুষের আচরণ মডিফাই করে? এখানে ব্যাপারটা একটু সাইকিয়াট্রির বিষয়। মানুষের ইমোশন দুই ধরনের হয়—স্টার্টল ইমোশন বা তাৎক্ষণিক ইমোশন এবং স্লোয়ার ইমোশন বা ধীরগতির ইমোশন। এখন এই অ্যালগরিদমের উদ্দেশ্যই তো সর্বোচ্চ এনগেইজমেন্ট তৈরি করা—আর বেশি এনগেইজমেন্ট আসে এই স্টার্টল ইমোশন থেকে—যেমন ভয়, রাগ, হিংসা এই ধরনের ইমোশন থেকে। এই স্টার্টল ইমোশন মানুষের মধ্যে খুব দ্রুত তৈরি হয় এবং খুব দ্রুত ছড়ায়, কিন্তু এর প্রশমন ঘটে খুব ধীর গতিতে। ফেসবুকের অ্যালগরিদম যেটা করে, খুব দ্রুত মানুষের সংখ্যা গণনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এই অ্যালগরিদম স্টার্টল ইমোশনের পক্ষে কাজ করে। এই অ্যালগরিদম কাজই করে এমনভাবে যে—মানুষের মধ্যে আস্থা বা সম্প্রীতি বাড়ানোর মত স্লোয়ার ইমোশনের বদলে স্টার্টল ইমোশন বেছে নেয় এবং সেটা ছড়াতে থাকে।

এখন, মেইনলি ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়ার এই বিপদজনক দিকের পরেও, মানুষ কেন ফেসবুক ব্যবহার করছে, বা যারা এসব জানে ও বুঝতে পারে এবং যারা সমালোচনা করে তারাও কেন ফেসবুকে আছে? অ্যাডিকশনটা কেন ইউজারকে কন্ট্রোল করছে?

এখানে ‘নেটওয়ার্ক এফেক্ট’ বলে একটা ব্যাপার আছে। নেটওয়ার্ক এফেক্ট আইডিয়াটা হল, যেহেতু ফেসবুকে অনেক অনেক মানুষ আছে, বা প্রায় সবাই আছে এখন ফেসবুকে—সবাই একসাথে ফেসবুক ব্যবহার বন্ধ করে দিবে বা ফেসবুক থেকে চিরতরে বের হয়ে যাবে—এই ব্যাপারটা একটা সুপারন্যাচারাল ব্যাপার। মানে সম্ভব না। ফলে, কেউ যদি ইন্ডিভিজ্যুয়ালি নিজের থেকে সিদ্ধান্ত নেয় যে সে ফেসবুক বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করবে না—তাহলে তার দিক থেকে ব্যাপারটা সাইকোলজিক্যালি এরকম হবে যে সে নিজেকে সবকিছু থেকে আইসোলেট করছে। সে সমাজের সাথে বা সবার সাথে কানেকশন এভয়েড করছে। এটাই নেটওয়ার্ক ইফেক্ট। এবং এর ফলাফলই অ্যাডিকশন। যেকোনো নেটওয়ার্ক সিস্টেমের জন্যই এই ব্যাপারটা খুবই টিপিক্যাল একটা ব্যাপার। আর এটাকে ব্যবহার করেই ফেসবুক একটা মনোপলিতে পরিণত হয়েছে।

বি এফ স্কিনার (১৯০৪-১৯৯০)

৪.
ইন্টারনেট চালু হওয়ারও অনেক আগেই, এই ধরনের নেটওয়ার্ক নিয়ে আমেরিকান সাইকোলজিস্ট ও বিহেভিয়রিস্ট বি এফ স্কিনার (Burrhus Frederic Skinner) এই ধরনের নেটওয়ার্ক সিস্টেমের বিপদ সম্পর্কে  বলছিলেন যে, এই ধরনের নেটওয়ার্কে মানুষ খুব বেশি স্বাধীন, খুব বেশি ক্রিয়েটিভ ও খুব বেশি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠে।

সোশ্যাল মিডিয়া বা ফেসবুক বা টুইটার তাদের শুরুর দিকেও এরকম ছিল না এখন যেরকম হয়ে উঠেছে। বিপদটা তৈরি হয়েছে—পরবর্তীতে, নেটওয়ার্ক এফেক্ট বা মানুষের আসক্তিকে পুঁজি করে তারা যে বিজনেস মডেল গ্রহণ করেছে তার পর থেকে। বিজনেস মডেলটা হল যে, তারা শুধু টাকা আয় করতে পারবে যখন কোনো একটা তৃতীয় পক্ষ ফেসবুকে বা সিস্টেমে টাকা ঢালবে, এবং সেই তৃতীয় পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য বা লাভবান করার জন্য সিস্টেম বা ফেসবুক তার ইউজারদের প্রতি ম্যানিপুলেটিভ হয়ে উঠবে, তাদেরকে ম্যানিপুলেট করা শুরু করবে।

সোশ্যাল মিডিয়ার তার ইউজারদের আচরণ মডিফাই করা ও ইউজারদের ম্যানিপুলেট করার ব্যাপারটা—আমি যতটা বলতে পারলাম বা বললাম, তার চেয়েও অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও ভয়াবহ।

এখন টেকনোলজির জগতে, ক্ষমতা ও বাকি অন্যান্য দিক দিয়ে দুইটা কর্পোরেশন একে অন্যের প্রতিদ্বন্দী হয়ে উঠছে—ফেসবুক এবং গুগল। যদিও দুই কোম্পানির কাজ এবং উদ্দেশ্য আলাদা আলাদা। ভবিষ্যতে এদের মধ্যে কেউ কাউকে হত্যা করবে কিনা তা হয়ত বলা সম্ভব না তবে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীতা আরো বাড়বে নিশ্চিত। এবং সেটার উপর পৃথিবী ও মানুষের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করবে। ফেসবুক ও গুগল আরো আরো বেশি ক্ষমতার মালিক হয়ে উঠবে।

৫.
গুগল শুরু হওয়ার পরে, গুগলের ফাউন্ডারদের একজন সের্গেই ব্রিন (Sergey Mikhaylovich Brin) গুগলের বিজনেসের ব্যাপারে একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যে সিদ্ধান্তটা পরবর্তীতে পৃথিবীর রিয়ালিটি অনেকাংশেই বদলে দিছে। সের্গেই ব্রিন চিন্তা করছিলেন যে, আমরা যদি ইনফরমেশন সার্ভিস ব্যাপারটাকে ফ্রি করে দেই, এবং বিজ্ঞাপন থেকে টাকা আয় করি, তাহলে ইনফরমেশন জিনিসটাকে আমরা ফ্রি করে দিতে পারব এবং তারপরেও ক্যাপিটালিজম আমাদেরই হাতে থাকবে।

সের্গেই ব্রিন (জন্ম. ১৯৭৩)

ফর্মাল ইকোনমির জন্য এই সিদ্ধান্তটা ছিল মারাত্মক বিপদজনক। ইনফরমেশন ফ্রি করে দিয়ে বিজ্ঞাপন থেকে টাকা আয় করার সের্গেই ব্রিনের এই আইডিয়াতে যে বাস্তবতা তৈরি হয়েছে সেটাও এক ধরনের ক্যাপিটালিজম ঠিক আছে, কিন্তু এটা খুবই আত্ম-বিধ্বংসী ক্যাপিটালিজম। খুবই সংকীর্ণ ক্যাপিটালিজম। কারণ, এইখানে বিষয়টা ঘটে—উইনারস টেইক অল—বিজ্ঞাপনদাতা সুবিধা পায় এবং বিজ্ঞাপনগ্রহীতা গুগল বিনিময়ে টাকাটা নিয়ে যায়, ইনফরমেশনের মালিকের লাভ হয় না! ফলে এটা ক্যাপিটালিজম হলেও তা সংকীর্ণ এবং সাসটেইনেবল না।

গুগল বা ফেসবুক যতই বলুক “এভরিবডি’স অ্যান ইকুয়াল, এভরিবডি’স এমপাওয়ারড”, এখন আমরা এমন এক সময়ে আছি যখন সম্পদ এবং ক্ষমতার মারাত্মক কনসেনট্রেশন চলছে, কোনো একটা জায়গায় সম্পদ আর ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। সম্পদ এবং ক্ষমতার মারাত্মক বৈষম্য চলছে।  আর এই ক্ষেত্রে এই টেকনোলজিক্যাল কর্পোরেশনগুলি অনেক বড় ভূমিকা পালন করছে।

সমস্যা আরো আছে। ফিলোসফিক্যাল সাইডেও। এই টেকনোলজিক্যাল কর্পোরেশনেরা তাদের নিজেদের ফিলোসফিক্যাল বিশ্বাস ও স্পিরিচুয়াল সিস্টেম পৃথিবীর উপর আর মানুষের উপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে, নতুন এক ধরনের ধর্ম তৈরি করতে চাচ্ছে—সেটা খুবই বিপদজনক। যেমন, ফেসবুক বলতে চায়, এবং আপনাকে বিশ্বাস করাতে চায়, যেটা অনেকটাই ফেসবুকের জন্য এক ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাস—জীবন হচ্ছে এক ধরনের অপটিমাইজেশন, আপনাকে আরো বেশি বন্ধু, আরো বেশি ফলোয়ার ও আরো বেশি মনোযোগ পাওয়ার জন্য স্ট্রাগল করতে হবে। আর এই সংখ্যাগুলির মাধ্যমেই নাকি নির্ধারিত হচ্ছে আপনার যোগ্যতা ও কৃতিত্ব। জাকারবার্গ কিছুদিন আগে একবার বলছিলেন, ফেসবুকের নতুন লক্ষ্য হল সবাইকে একটা অর্থপূর্ণ জীবন দেওয়া। কতটা ভয়ানক ও সমস্যাজনক এই কথাটা। যেন কার জীবনের অর্থ কোথায় আছে সেটা খুঁজে বের করাই ফেসবুকের কাজ!

গুগলেরও এই সমস্যা আছে এবং আরো বেশি ও ভয়ানক ভাবেই আছে। গুগল তাদের একটা বিশাল প্রজেক্টের কথা জানিয়েছে যে, তারা বিশাল একটা গ্লোবাল ব্রেইন তৈরি করতেছে, যেটা আসলে পৃথিবীর উত্তরাধিকার হবে। তারা, মানে গুগল, সেই ব্রেইনে আপনাদের সবাইকে আপলোড করবে, ভার্চুয়ালি, ফলে আপনাদেরকে আর কোনোদিন মরতে হবে না। এটা খুবই এবং খুবই সমস্যাজনক একটা ধর্মীয় প্রস্তাবনা এবং এটা আসলে একটা রেটোরিক। এই বক্তব্যের মাধ্যমে গুগল কী চাইতেছে, নতুন একটা ধর্ম হয়ে উঠতে চাইতেছে। এবং এটা এমন একটা ধর্ম হয়ে উঠতে চাইতেছে যার আপনার প্রতি কোনোই সহমর্মিতা নাই, আপনাকে কোনো ব্যক্তিগত স্বীকৃতি দিতে চাইতেছে-না। একটা ভুল আইডিয়া-ভিত্তিক ধর্ম এবং বাজে ধর্ম। কাল্ট এবং ধর্মের একটা মিশ্রণ এটা—গুগলের এই প্রজেক্ট ও এই প্রস্তাবনা। এমন একটা ধর্ম যেখানে আপনার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে এই একটা সিস্টেমকে সার্ভ করা।

টেক কর্পোরেশন মানুষের রিয়ালিটিকে বিপদজনক ও সমস্যাগ্রস্ত করে তুলছে—এতে কোনো সন্দেহ নাই।

মানুষ ইন্টারনেটকে টুল হিসাবে ব্যবহার শুরু করলেও, এখন, ইতিহাসের এই পয়েন্টে এসে মানুষ নিজেই টেক কর্পোরেশনের ক্ষমতা, ম্যানিপুলেশন ও ইচ্ছা-অনিচ্ছার শিকলের প্যাঁচে আটকা পড়েছে।

২৬ মে, ২০২১

কভারে আশরাফুল আলম শাওনকলাগাছিয়া ওয়াচ টাওয়ার, সুন্দরবন, সাতক্ষীরাছবি. অয়ন চন্দ্র মণ্ডল, ফেব্রুয়ারি ২০২১