দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণ পার্ককে ক্ষমার প্রশ্নে এখনো বিভক্ত অবস্থানে রয়েছে… ৪৭.৭% মানুষ ক্ষমা করার পক্ষে এবং ৪৮% ক্ষমার বিপক্ষে

গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপতি পার্ক জিউন-হে’র ২০ বছরের কারাদণ্ডের সাজা বহাল রেখেছে দেশটির শীর্ষ আদালত।

২০১৩ সালে দেশটির প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন পার্ক। একইসঙ্গে জনগণের ভোটে নির্বাচিত পূর্ব-এশিয়ার প্রথম নারী রাষ্ট্রপ্রধানও ছিলেন তিনি। পার্ক জিউন-হে’র বাবা পার্ক চুং-হি ছিলেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট। তার অধীনে দীর্ঘ ১৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে সামরিক শাসন পরিচালিত হয় দক্ষিণ কোরিয়ায়।

তবে ২০১৬ সালের শেষের দিকে পার্ক এবং তার সহকারী চোই সুন-সিল এর দুর্নীতির কীর্তি ফাঁস হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রপতির সহকারি হলেও চোই সুন-সিল সরকারি কোনো পদে কাজ করতেন না। তবুও চোই তার সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে স্যামসাং, হিউন্দাই, এসকে গ্রুপ এবং লটে কর্পোরেশনের মতো বেশ কিছু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিজের সংস্থায় অর্থসাহায্য গ্রহণ করেন।

গণমাধ্যম কর্মীদের অনুসন্ধানে পরবর্তীতে পার্ক-এর আরো কয়েকজন সহকারীর নাম প্রকাশ হয়ে পড়ে। অভিযোগ অনুসারে পার্ক এবং তার সহকারীরা মিলে বহুজাতিক বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৭৭ বিলিয়নেরও বেশি কোরিয়ান উওন লেনদেন করেন।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৭ সালের মার্চ মাসে দুর্নীতির অভিযোগে পার্ক জিউন-হে’কে আটক করা হয়। আটকের কয়েক মাস আগে দক্ষিণ কোরিয়ার সাংবিধানিক আদালত দেশটির জাতীয় সংসদে পার্কের অভিশংসনের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটের আয়োজন করে। সেই ভোট অনুসারে দুর্নীতির দায়ে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারণ করা হয় তাকে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত শীর্ষ কোনো নেতাকে প্রথম বারের মতো পদচ্যুত করার ঘটনা ঘটে। ততদিনে দুর্নীতির এই কেলেঙ্কারিতে পার্কের পাশাপাশি বহুজাতিক দুটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারাও অভিযুক্ত হয়ে কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন।

২০১৮ সালে আদালতের প্রাথমিক রায়ে পার্কের ২৪ বছরের সাজা ঘোষণা করা হয়। তবে গত বছরের জুলাইয়ে বিচারিক আদালত এই সাজা কমিয়ে ২০ বছরে নামিয়ে আনে। এবং গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ে পূর্বের সাজা হিসেবে পার্কের ২০ বছরের জেল ও ১৮ বিলিয়ন কোরিয়ান উওন জরিমানা (১৬.৩৮ মিলিয়ন ডলার মার্কিন ডলার) বহাল রাখা হয়।

আদালতের এই সিদ্ধান্তের ফলে অবশেষে পার্ক-এর মামলাটির দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তে সাজা মওকুফের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরেই পার্কের সমর্থকরা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার দাবি করে আসছিলেন।

এদিকে ৬৮ বছর বয়সী পার্ক এ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই অস্বীকার করেছেন। গত বৃহস্পতিবার শুনানির সময় তিনি আদালতেও উপস্থিত ছিলেন না। দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ রাজনৈতিক দল ‘আওয়ার রিপাবলিকান পার্টি’র পক্ষ থেকেও পার্ককে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

ক্ষমতাসীন দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রধান লি নাক-ইয়ন জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে পার্কের পাশাপাশি সাবেক আরেক রাষ্ট্রপতি লি মিয়উং-বাকের জন্যেও ক্ষমা প্রার্থনার সুপারিশ করেছেন। লি মিয়উং-বাকও বর্তমানে দুর্নীতির দায়ে কারাভোগ করছেন।

কয়েক দশক আগের শীতল যুদ্ধের সময় দক্ষিণ কোরিয়ায় ডান এবং বামপন্থীদের মধ্যে যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব শুরু হয়, তা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে অভিযুক্ত পার্কও এখন বিতর্কিত একজন চরিত্র হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন।

সম্ভাব্য ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি ভবন ব্লু হাউজের এক কর্মকর্তা জানান, আদালতের রায়ের পর পরই এই বিষয়ে আলোচনা করাটা শোভন দেখায় না। তবে, পার্কের এই মামলা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে বলে জানান সেই কর্মকর্তা।

বর্তমান রাষ্ট্রপতি মুন জায়ে-ইন এর একজন শীর্ষ একজন সহকারী জানান, পার্কের ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি সেই সিদ্ধান্তই নেবেন, যা জনগণের ইচ্ছাকে প্রতিফলিত করে।

তবে দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণ পার্ককে ক্ষমার প্রশ্নে এখনো বিভক্ত অবস্থানে রয়েছে। এ নিয়ে জরিপ পরিচালনাকারী সংস্থা রিয়েলমিটার গত সপ্তাহে এক জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে দেখা যায় ৪৭.৭% মানুষ ক্ষমা করার পক্ষে এবং ৪৮% ক্ষমার বিপক্ষে।

এদিকে পার্কের সহযোগীকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগে স্যামসাং ইলেকট্রনিকস কোম্পানি লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান জে ওয়াই লি কারাগারে রয়েছেন। আগামি সোমবার তার মামলার একটি শুনানিতে তাকে আদালতে পাঠানো হবে কিনা, সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়া হবে।

সূত্র. ইউএস নিউজ