Subscribe Now
Trending News

Blog Post

দুপুরবেলার হাজারিবাগ
ছবির গল্প

দুপুরবেলার হাজারিবাগ 

তখন গরমের সময়। এবং তখন আমি চিরতরে চাকরিবাকরিকে আসসালামু আলাইকুম বইলা দিয়া কামরাঙ্গির চরে ভাড়া থাকা শুরু করছিলাম। একটা টিনের ঘরে। প্রচণ্ড গরম হইত সেইখানে। বিশেষত ঠিক দুপুরবেলায় ওর ভিতরে মানুষ বসবাস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। তার থেকে বাইরে ঘুইরা বেড়ানোই বেটার ছিল। আর আমিও তা-ই করতাম।

ঘোরা তো এমনিতেও অবশ্য আমি ঘুরতেই থাকতাম তখন। তাছাড়া গরমের মধ্যাহ্নগুলিতে এমন এক মূহ্যমানতা তৈরি হয় রাস্তাঘাট বা বাজার-টাজারে, যারা এর ভক্ত তারা এই সম্মোহনী ক্ষমতা সম্বন্ধে জানেন। দিবানিদ্রার ভিতরে দেখা স্বপ্নের মত একটা অবস্থা। দশদিক খাঁ খাঁ করতেছে। কাক পক্ষীরাও যেন ডাকাডাকির জন্যে শ্রম খরচ করতে চায় না। সম্ভব হইলে সবাই একদম চুপ কইরা থাকে যতক্ষণ বিকালটা না হচ্ছে।

অর্ধ জীবন্ত অর্ধ ঘুমন্ত এইরকমই এক দুর্ধর্ষ গরম দুপুরবেলায় আমি ঘটনাক্রমে এই ছবিটা তুলছিলাম। সেইদিন তদুপরি শুক্রবার, আমার যা মনে পড়ে। জুম্মার নামাজ শেষ কইরা লোকজন হুড়মুড়ায়ে বাড়িঘরে ঢুকে গেছে। আমি ঘুরতেছিলাম চর টু হাজারিবাগ টু জিগাতলা। এবং ঐখান থেকে আবার উল্টাপথে।


ছবির গল্প
মনজুরুল আহসান ওলী


ফেরার সময় হাজারিবাগের মাজার বটতলা থেকে ঢালু গলিপথে একটা বালুর মাঠ পর্যন্ত আসা লাগতো। এরপরে ছোট্ট একটা ব্রিজ। ব্রিজ পার হইলে হালকা একটুকরা মহল্লা, তারপরেই বাঁধের রাস্তা। এই চরম আবহাওয়াতেও ঐ জায়গাটুকুতে বাচ্চা পোলাপানেরা ছড়ায়ে ছিটায়ে কিছু থাকেই। ওদেরকে দেইখা পরে সম্ভবত একটু তাজা ফিল করতে শুরু করছিলাম আমি। নতুবা পুরাটা রাস্তা হাঁটার সময় এক ইলাস্টিক ঘোরচক্করের ভিতরে আমি মানসিক ভাবে ডুবন্ত ছিলাম।

বেহুদা দিনকাল যাইতেছিল তখন আমার। হাঁ কইরা চতুর্দিকে তাকায়ে থাকা ছাড়া অন্য কোনো কাজ নাই। ভাবছিলাম চাকরি ছাড়ার পরে ছবি আঁইকা ফাটায়ে ফেলব। বাস্তবে দেখা গেল তা হচ্ছে না। ছবি আঁকাই বরং আমারে ফাটায়ে ফেলতেছে। ঐ দিনগুলিতে ব্যক্তিজীবন আর শিল্পকলা সম্বন্ধে দুনিয়ার যত পেচিদা চিন্তা আমারে অক্টোপাসের মত প্যাঁচ দিয়া ধরতেছিল খালি। কিছুটা আরাম পাওয়ার জন্যে তাই দিবারাত্রি নির্বিশেষে হাঁটতেই থাকতাম আমি, কিন্তু বিশেষ কোনো সুবিধা বোধহয় তাতে হইতেছিল না।

যেইদিকে তাকাই মনে হয় শুধু একই জিনিস দেখি। জীবনানন্দ তার কোনো কবিতায় যেমন ব্যবহৃত হইতে হইতে সবকিছুকে শুয়োরের মাংস হয়ে যাইতে দেখতেছিলেন, আমারও কিছুটা ঐরকম মনে হইত, যেন চতুর্দিকের যত দৃশ্যাবলী সব রিসাইকল হইতে হইতে একরকম ফাউল কিছু একটাতে পরিণত হইছে। সব সেইম শিট। কোটি কোটিবার আইবলিং করা হইছে সবকিছুকেই। রেটিনার মধ্যে এগুলা মুখস্থ পাঠ্যপুস্তকের অপ্রয়োজনীয় কবিতার মত ব্লা ব্লা করতেছে। কাঠ মাঠ গরিব ধনী সেক্স প্রতিহিংসা শিশু সবজি ঝগড়া গলাগলি এগুলা সবই যেন দেখতে থাকাটা প্রায় শেষ হইছে। সব হইল কপির কপি। সব পোস্টার। একটা ছিঁড়বেন তো একই রকম দেখতে আরো হাজারটা থাইকাই যাবে।

যা বলতেছিলাম, বালুর মাঠের ব্রিজ পার হয়ে বাঁধের রাস্তার কাছাকাছি তখন এসে পড়ছি। রাত্রে ঐজায়গাটা পার হওয়ার সময় কুত্তারা খুব ডিসটার্ব করতো মনে আছে। তাই দিনের বেলাতেও কেমন একটা অযাচিত উৎকর্ণতা অটোমেটিকালি এসে ভর করতো ঐখানে গেলে। আশেপাশে কি আছে না আছে সেইবিষয়ক একটা সেমি-নেগেটিভ সচেতনতা। তখনই খেয়াল করলাম একটু দূরে তিনটা গরুর পিছে পিছে এক চাচামিয়া হাঁটতে হাঁটতে বোধহয় চরের দিকে ফিরে যাচ্ছেন।

ভাবলাম হয়ত জুম্মার নামাজ পড়ে উনি সকালে বের হওয়া গরুগুলিকে একজোট কইরা নিয়া একত্রে বাড়ি ফিরতেছেন। বডি ল্যাংগুয়েজ দেখে মনে হয় ক্রয়সূত্রে এই গরুগুলার একচ্ছত্র মালিক সম্ভবত তিনিই। অন্য কারো কিছু বিনিয়োগ থাকতেও পারে আবার না-ও পারে। থাকলেও কিছু না, আবার না থাকলেও কিছু না। এই রকমই একটা আধা-দার্শনিকসুলভ নিমগ্নতা ছিল উনার হাঁটার ভঙ্গিতে। আর গরু তিনটা তো ফিজিক্যালিই আরো উদাসীন টাইপের। যেন ওরা মেটাফিজিক্যাল গরু। বাস্তব না।

তো, তিন গরু, এক মানুষ, এই চারজন মিলে স্লো প্যারেড কইরা তারা যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। এবং যাইতেই থাকবে এইরকম একটা ভাব।

কিছু একটা এটারনাল টোন ছিল বিষয়টার মধ্যে। বিষণ্ন একটা হাস্যকর জেশ্চার। পথের যেন কোনো সঠিক-বেঠিক নাই, একটা হইলেই হইল। সময়েরও কোনো সীমা নাই, একসময় গেলেই হইল। তবে গন্তব্য নামে কিছু একটা আছে বইলা আমার কাছে মনে হইতেছিল তাদের চলনভঙ্গি দেইখা। তবে যেন তা পায়ের উপরে নয়, নির্ভর করতেছে উনাদের নিমগ্নতার উপরে।

আমি ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিছি যে একটা স্ন্যাপশট নিব। ফ্রেম ধরতে গিয়া বুঝলাম ওরা আসলে একটু দূরে-দূরেই আছে। মুভ করতেছে জন্যে জুম নিলাম না, বরং হাঁটার গতি বাড়ায়ে দিয়ে কাছে যাইতে চাইলাম। এবং তখন বুঝলাম যে দূর থেকে দেইখা যা মনে হচ্ছে, বাস্তবে তার থেকে দ্রুতগতিতেই হাঁটতেছিল এই চারটি প্রাণী।

ছবিটা আমার এখনও ভাল লাগে। গরুগুলি যেন কপি কইরা বসানো।  ক্যারেক্টারগুলির মধ্যবর্তী দূরত্ব, পিছন থেকে ওদের একই রকম অ্যানাটমি, আর ঐ দুপুরবেলার দাউ দাউ করা আলো, সবই চমৎকার।

যেন আমরা সকলেই বেশ সুন্দর কইরা, অন্য সবকিছুর সাথে ছন্দে ছন্দ মিলায়ে, জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারেই অনন্তের উদ্দেশ্যে রওনা হইছি।

যথেষ্ট কনফিডেন্টলি।

ছবি.  মনজুরুল আহসান ওলী, হাজারিবাগ, ১৯/১/২০১৮

Related posts

সাম্প্রতিক © ২০২১ । সম্পাদক. ব্রাত্য রাইসু । ৮১১ পোস্ট অফিস রোড, বাড্ডা, ঢাকা ১২১২