লোকটার নাম মানো, সম্ভবত মনোয়ার হোসেন মানো। আসলে তার ডাকনাম মানো নামটা সব মনযোগ দখল করে নেয়ায়, অন্য নামটার দিকে তেমন খেয়াল ছিল না। তিনিও বলার সময় মানো নামটায় জোর দিচ্ছিলেন। মাথা ঝাঁকিয়ে মূল নামের পর মানো বলে আবার আমার চোখে তাকায়ে হাসিও দিলেন। তার অভিজ্ঞতায় বোধহয় এটা জানা হয়ে গেছে যে, ঢাকা থেকে আসা লোকেরা তার মানো নামটাকেই পছন্দ করে। আর বলে যে, বাহ, মানো নামটা তো বেশ সুন্দর। আমিও তাকে বললাম কথাটা।

মানোর সঙ্গে আমার দেখা চৌড়হাস, উপজেলা রোডে। আমি তখন মিষ্টি কিনতে বের হয়েছি। গহনের জন্য ছানার চপ মিষ্টি। বের হয়ে দেখলাম ঢাকার মতোই জ্যাম। কিছুক্ষণ হাঁটার পর মনে হল কতটা হাঁটতে হবে তা আমি জানি না। আর ঢাকায়ও ফিরতে হবে। সে জন্য রিকশা খুঁজছিলাম। একটা খালি রিকশা পেলে তাকে বললাম এনএস রোড যাবে কিনা। তিনি রাজি হওয়াতে দাম-দর না করে উঠে বসলাম। রিকশায় উঠতে দাম-দর তেমন করি না আমি। রিকশা ভাড়ার একটা আন্দাজ আছে আমার কাছে। আমি সাধারণত সময় হিসাব করে ভাড়া দিই। ন্যূনতম ভাড়া বিশ টাকা। আধা ঘণ্টা রিকশায় ঘুরলে পঞ্চাশ টাকা। আরেকটা পদ্ধতি হলো রিকশাওয়ালার চেহারার দিকে তাকিয়ে দাম জিজ্ঞেস করা। তার মুখ-চোখের এক্সপ্রেশনের ভিত্তিতে আমি ভাড়া ঠিক করি। যাই হোক। মানোর রিকশায় উঠলাম যথারীতি দরদাম না করেই। তাকে বুঝিয়ে বললাম কোথায় নামতে হবে।


ছবির গল্প
সালাহ উদ্দিন শুভ্র


কিন্তু এনএস রোডের মৌবনে গিয়ে ছানার চপ পেলাম না। বারোটার আগেই তা শেষ হয়ে যায়। তখন বাজে বারোটা পঁচিশ। আমার বাস সাড়ে তিনটায়। কিছুটা সময় হাতে আছে দেখে আগেই কুষ্টিয়া শহরটা ঘুরে দেখব ভাবলাম। সেটাই বললাম মানোকে। তিনি আমাকে বললেন, লালন সাঁইকে চেনেন?

আমি বললাম, না…।

মানো বললেন, লালন সাঁই, অনেক বড় মানুষ, তার আখড়া আছে। যাবেন?

আমি অনিচ্ছা নিয়েই যেতে রাজি হলাম। লালন আখড়ায় আমি গিয়েছি আগেও। মাগুরা, ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়ার লালন আখড়ায় একবার ঘুরে গিয়েছিলাম। আখড়া মানে মাজার আরকি। সুনসান নীরবতা থাকে। ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশ। এসব আমার ভালো লাগে না। আমি নদী দেখতে চাইছিলাম আর শহর। রিকশায় লালন মাজারের দিকে যেতে যেতে তাকে বললামও কথাটা। লালনের মাজারের পাশে গড়াই নদী আছে। এ নদী ধরেই লালন কুষ্টিয়ায় আসেন। মানোর কথা শুনে আমার মনে হয়েছে, কুষ্টিয়ায় লালন একটা সেন্টিমেন্টের নাম, এটা তাদের ইগো। এই লালন হেজিমনির একটা প্রভাব গোটা কুষ্টিয়া শহরজুড়েই যেন আছে। মানোর মধ্যে তো আছেই। তিনি বাবরি চুল রাখেন। গানও করেন জানালেন। আমাকে দাওয়াত দিলেন গান শোনার, কার্তিক মাসে।

ঢাকা থেকে বের হয়েছি প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় পর। কুষ্টিয়ায় নেমে অবশ্য সেটা মনে হল না। ঢাকার মতো বড় বড় ভবন নাই যদিও, তবে একই ব্র্যান্ডেড শপ, নিয়ন সাইন, রাস্তায় জ্যাম—এসব ঠিকই আছে। পার্থক্যটা দুলকি চালে। ঢাকায় যেমন তাড়াহুড়া, এখানে তেমন নাই। তবে মিল বাজার, মোহিনী মিল এলাকা দিয়ে যেতে যেতে মফস্বলের দেখা পেলাম। অনেক পুরোনো মিল ঘর, থাকার জায়গা পড়ে আছে। তাতে গাছ লতাপাতা উঠে আছে। কুষ্টিয়ার শহর দিয়ে বয়ে যাওয়া রেললাইন, পাইকারি বাজারের হল্লা, এসব দেখতেও ভাল লাগছিল। তারপর লালনের মাজারে স্রেফ একটা চক্কর দিয়েই আমি আবার রিকশায় উঠি। আমার উদ্দেশ্য গড়াই দেখা।

লালনের মাজারের পেছন দিয়ে রিকশা বাঁক ঘুরতেই দুই পাড়ে ধু ধু বালির মাঝখানে রৌদ্র ঝলকানো গড়াই দেখে চোখ দুটো কচ কচ করে উঠল। আমি ভেবেছিলাম একটু নামব, বটগাছ থাকবে, তার ছায়ায় কিছুটা বসে নদী দেখব।

এসবের কোনো সুযোগই ছিল না গড়াই নদীর তীরে। তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। অনেকেই গোসল করতে নেমেছেন। আমাকে নদীর কাছে যেতে হলে বিস্তীর্ণ বালু পাড়ি দিতে হত। তারপর টুক করে নদীর পাড়ে গিয়ে গোসলরত মানুষ দেখা ছাড়া উপায় ছিল না। তার চেয়ে নদীর সমান্তরালে রিকশায় বসে যেতে যেত নদী আর তার কূল দেখাই শ্রেয় মনে করলাম।

নদীর কূলেও তখন দুপুর। ঘুঁটে শুকাতে দিয়েছে মানুষ। সঙ্গে শীতের কাপড়। ধীর লয়ে ফিরছে কোনো গৃহবধূ, কোলে তার বাচ্চাটি। একটা কিশোর, কিশোরী তারাও ফিরছে কোথাও। ঘরের সামনেই রাস্তায় বসে এক বুড়ো ধীর, মন্থর নদী দেখছে। লুডু খেলছে কৈশোরোত্তীর্ণ চার যুবক, তাদের ঘিরে হল্লা। একটা ভ্যান বিকট শব্দে গান বাজিয়ে চলে গেল কিছু একটা বিক্রি করতে করতে। কেমন নিরুপদ্রব দুপুর পার হচ্ছে গড়াইয়ের তীরে।

টেনে টেনে যেন দুপুরটাকে যত লম্বা করা যায়। কোনো তাড়া নাই। আমি এর সবই দেখছিলাম। নৌকায় মানুষের পার হওয়াও। গড়াই পার হলে নাকি পদ্মা—যেতে যেতে মানো বললেন।

গড়াইয়ের পাশ দিয়ে বয়ে যেতে যেতে কিছু ছবি তুললাম মোবাইলে। এর মধ্যে দাওয়ায় শুকাতে দেওয়া রঙিন কাপড়, একটা হাঁস বা মুরগির খোঁয়াড়, লাউয়ের মাচা, টিনের চালার নিচে শুকাতে দেওয়া ঘুঁটে—মোটামুটি তাজা—দুপুর বেলায় গড়াই পাড়ের সব চিত্রই এ ছবিতে ধরা পড়েছে।

তারপর গড়াইকে পেছনে রেখে আবার শহরের দিকে ঢুকে পড়লাম। কত সময় পর এত কাছ থেকে নদী ও তার মানুষেদের, এত দীর্ঘ সময় নিয়ে দেখলাম—মনেও করতে পারছি না।