বিল গেটস: ভবিষ্যৎ মহামারির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে যেভাবে

করোনা ভাইরাস চিকিৎসাক্ষেত্রের তিনটা বড় আবিষ্কারকে ত্বরান্বিত করবে, এটা তো মাত্র শুরু

যখন ইতিহাসবিদরা কভিড-১৯ মহামারি নিয়ে বই লিখবেন, এতদিন আমরা যে পরিস্থিতি পার করে আসলাম সেটা হয়ত ওই বইয়ের তিন ভাগের প্রথম এক ভাগে থাকবে। এরপর কী হতে যাচ্ছে সেটাই বরং থাকবে গল্পের বেশিরভাগ জুড়ে।

ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার বেশিরভাগ জায়গাতেই হয়তো এ মাসের মধ্যেই এই মহামারির চূড়ান্ত স্টেজ পার হয়ে যাবে। অনেকে আশা করেছিলেন আর কয়েক সপ্তাহের মাঝেই আমরা আগের জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে পারব, যেমনটা ডিসেম্বরে ছিলাম। দুঃখের বিষয়, তা আর হচ্ছে না।


বিল গেটস
দ্য ইকোনমিস্ট, ২৩ এপ্রিল ২০২০


আমি বিশ্বাস করি মানবজাতি এই মহামারি কাটিয়ে উঠবে ঠিকই, কিন্তু কেবল তখনই যখন বেশিরভাগ মানুষকে প্রতিষেধক দিয়ে দেওয়া হয়ে গেছে। তার আগ পর্যন্ত আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হবে না। সরকার যদি লকডাউনে থাকার নির্দেশ তুলে দেয় এবং ব্যবসা বাণিজ্যের দরজা যদি খুলেও যায়, তারপরও মানুষের মধ্যে রোগবালাই থেকে দূরে থাকার সহজাত প্রবণতা আছে। এয়ারপোর্ট ভর্তি লোকজন থাকবে না। ফাঁকা স্টেডিয়ামে খেলা হবে৷ আর বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা লেগেই থাকবে কারণ মানুষের চাহিদা থাকবে কম, আর তারা খরচও করবে রক্ষণশীলভাবে।

একদিকে উন্নত দেশগুলিতে মহামারির গতি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে তা উপরের দিকে যাবে। অথচ তাদের অভিজ্ঞতা হবে আরো বেশি কষ্টকর। গরিব দেশে, যেখানে উন্নত দেশের তুলনায় দূর থেকে খুব বেশি কাজ করা যায় না, সেসব দেশে সামাজিক দূরত্বের জন্য গৃহীত সব পদক্ষেপ অত ভালো করে কাজ করবে না। ফলে ভাইরাস ছড়াবে দ্রুত, আর তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আক্রান্তদের দেখভালও করতে পারবে না ঠিকমতো। কভিড-১৯ এর কারণে নিউ ইয়র্কের মতো শহরগুলিকেও হিমশিম খেতে হয়েছিল, কিন্তু ড্যাটা বলছে, ম্যানহ্যাটানের মাত্র একটা হাসপাতালেও বেশিরভাগ আফ্রিকান দেশের চাইতে বেশি আইসিইউ বেড আছে। লাখ লাখ মানুষ মারা যেতে পারে।

দরকারি রসদগুলি যেন শুধু চড়া দাম হাঁকানোদের কাছেই না যায়, ধনী রাষ্ট্রগুলি সেদিকে খেয়াল রেখে তাদের মতো করে সাহায্য করতে পারে চাইলে৷ কিন্তু ধনী-গরীব যেকোনো অঞ্চলের জনগণই হোক না কেন, তারা কেবল তখনই নিরাপদ হতে পারবে যখন তাদের কাছে এই অবস্থার কার্যকর কোনো স্বাস্থ্যগত সমাধান থাকবে—তার মানে আমি বলছি প্রতিষেধকের কথা।

আগামি বছর মেডিকেল গবেষকরাই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে থাকবেন। ভাগ্য ভালো যে, এই মহামারির আগেও তারা প্রতিষেধকবিদ্যায় বহু দূর এগিয়ে যাচ্ছিলেন। সাধারণত একটা প্রতিষেধক আপনার শরীরকে কোনো রোগসংক্রামক জীবাণুর ধরণের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য প্রথমে আপনার দেহে দুর্বল বা মৃত ভাইরাস প্রবেশ করানো হয়। কিন্তু ইমিউনিটি বা শরীরকে ভবিষ্যত রোগবালাই থেকে নিরাপদ করার জন্য আরেকটা নতুন পদ্ধতি আছে—এ পদ্ধতিতে গবেষকদেরকে বেশি করে রোগসংক্রামক জীবাণু তৈরি করার পেছনে সময় দিতে হয় না। এই নতুন প্রক্রিয়ায় তৈরি এম-আরএনএ প্রতিষেধক জেনেটিক কোড ব্যবহার করে আপনার শরীরের কোষগুলিকে নির্দেশনা দিয়ে দেয় যে কীভাবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে নিরাপত্তার জন্য উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। আর এসব প্রতিষেধক হয়তো সাধারণ প্রতিষেধকগুলির চাইতে দ্রুত উৎপাদন করা যাবে।

আমার আশা এই যে ২০২১ সালের দ্বিতীয় ভাগের মধ্যে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রতিষেধক বানানো শুরু হয়ে যাবে। যদি আসলেই তা হয়, তাহলে সেটা হবে নতুন ইতিহাস সৃষ্টির মতো এক অর্জন: নতুন একটা রোগ চিহ্নিত করা থেকে তার বিরুদ্ধে শারীরিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করার দ্রুততম ঘটনা হবে এটা।

প্রতিষেধকের ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছাড়াও এই মহামারির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে আরো দুইটা সাফল্য অর্জন করতে পারব আমরা। একটা হলো রোগনির্ণয়ের ক্ষেত্রে। এরপরে যদি কোনো নতুন ভাইরাস উদয় হয়, তাহলে মানুষ হয়ত প্রেগনেন্সি টেস্টের মতো করে ঘরে বসেই ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে কিনা সেই টেস্ট করতে পারবে। অবশ্য প্রস্রাবের বদলে সেই টেস্ট হয়ত নাক থেকে নেয়া শ্লেষ্মা ব্যবহার করা লাগবে। নতুন কোনো ব্যাধি চিহ্নিত করার কয়েক মাসের মধ্যেই গবেষকরা এধরনের টেস্ট প্রস্তুত করে ফেলতে পারবেন।

প্রতিষেধকের ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছাড়াও এই মহামারির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে আরো দুইটা সাফল্য অর্জন করতে পারব আমরা। একটা হলো রোগনির্ণয়ের ক্ষেত্রে। এরপরে যদি কোনো নতুন ভাইরাস উদয় হয়, তাহলে মানুষ হয়ত প্রেগনেন্সি টেস্টের মতো করে ঘরে বসেই ওই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে কিনা সেই টেস্ট করতে পারবে।

আর তৃতীয় সাফল্য আসবে অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধের ক্ষেত্রে। বিজ্ঞানের এই শাখায় আমাদের বিনিয়োগ হয়েছে কম। ব্যাকটেরিয়া মোকাবেলা করার জন্য আমরা যেমনটা পেরেছি, ভাইরাসের বিরুদ্ধে অতটা কার্যকর ওষুধ বানাতে পারি নাই আমরা। এরকম আর থাকবে না। গবেষকরা অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধের বিশদ ও বৈচিত্র্যময় লাইব্রেরি তৈরি করে রাখবেন, ফলে নতুন ভাইরাসের আগমন হলে সেই লাইব্রেরি ঘেঁটে তাড়াতাড়ি কার্যকর চিকিৎসাপদ্ধতি বের করে ফেলতে পারবেন তারা।

এই তিন প্রযুক্তির প্রত্যেকটাই আমাদেরকে পরবর্তী মহামারির জন্য প্রস্তুত করবে, যাতে আমরা আক্রান্তদের সংখ্যা অল্প থাকা অবস্থাতেই আগেভাগে ব্যবস্থা নিতে পারি। কিন্তু এসবের মধ্যে চলমান গবেষণাও এখনকার অনেক সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করবে আমাদেরকে৷ এমনকি ক্যান্সারের চিকিৎসার উন্নতিতেও তা কাজে আসবে। (বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই ভেবে এসেছেন যে এম-আরএনএ প্রতিষেধক থেকে শেষ পর্যন্ত ক্যান্সারের প্রতিষেধক আবিষ্কারের দিকে যেতে পারব আমরা। যদিও মোটামুটি সুলভ দামেও এরকম প্রতিষেধক কীভাবে গণহারে উৎপাদন করা সম্ভব তা নিয়ে কভিড-১৯ এর আগে তেমন গবেষণা হয় নাই।)

(বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই ভেবে এসেছেন যে এম-আরএনএ প্রতিষেধক থেকে শেষ পর্যন্ত ক্যান্সারের প্রতিষেধক আবিষ্কারের দিকে যেতে পারব আমরা। যদিও মোটামুটি সুলভ দামেও এরকম প্রতিষেধক কীভাবে গণহারে উৎপাদন করা সম্ভব তা নিয়ে কভিড-১৯ এর আগে তেমন গবেষণা হয় নাই।)

আমাদের অগ্রগতি যে শুধু বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেই হবে তা না। সেই বিজ্ঞান থেকে সবাই যেন লাভবান হতে পারে সেটা নিশ্চিত করার সক্ষমতা অর্জনেও অগ্রগতি হবে আমাদের। আমার মনে হয় ২০২১ এর পরের বছরগুলিতে ১৯৪৫ পরবর্তী বছরগুলি থেকে শিক্ষা নিব আমরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর সেসময় লিডাররা ভবিষ্যতের আরো দ্বন্দ্ব আটাকানোর জন্য জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন। আর কভিড-১৯ এর পর লিডাররা এমন সব প্রতিষ্ঠান তৈরি করবেন যা ভবিষ্যতের অন্যান্য মহামারি আটকানো নিয়ে কাজ করবে৷

জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের মিশ্রণ থাকবে সেখানে। সামরিক বাহিনি এখন যেমন নানারকম ‘যুদ্ধখেলা’য় অংশ নেয়, তেমনি সেখানে নিয়মিত ‘জীবাণুখেলা’য় অংশগ্রহণের ব্যবস্থা থাকবে। এরপর যখন কোনো ভাইরাস বাদুড় বা পাখি পার হয়ে মানুষদের মাঝে এসে ঢুকবে, সেই সময়ের জন্য এসব ব্যবস্থা প্রস্তুত করে রাখবে আমাদেরকে। তাছাড়া কোনো দুষ্কৃতিকারী যদি ঘরোয়া ল্যাবের মধ্যে ভাইরাস বানিয়ে সেটাকে অস্ত্র হিসাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে—সেক্ষেত্রেও প্রস্তুত থাকতে পারব আমরা। মহামারির জন্য প্র‍্যাকটিস করার মাধ্যমে পৃথিবী বায়ো-টেরোরিজমের ঘটনা থেকেও রক্ষা করতে পারবে নিজেকে।

ব্যাপারটাকে গ্লোবাল রাখা
আশা করি ধনী রাষ্ট্রগুলি এসব প্রস্তুতিতে গরিব রাষ্ট্রগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করবে—বিশেষ করে তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গঠনের জন্য আরো বেশি বিদেশী অনুদান দেওয়ার মাধ্যমে। এমনকি সবচেয়ে আত্মমগ্ন ব্যক্তি বা একেবারে ‘একলা চলো’ নীতির সরকারেরও এখন একমত হওয়া উচিত এতে। এই মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে যে একে তো ভাইরাস সীমান্তের আইন একেবারেই পাত্তা দেয় না, তার ওপর আণুবীক্ষণিক জীবাণুদের একটা নেটওয়ার্ক দ্বারা আমরা সবাই জৈবিকভাবে একজন আরেকজনের সাথে যুক্ত—তা আপনি এটাকে যেভাবেই দেখেন না কেন। কোনো নভেল ভাইরাস যদি গরিব একটা দেশেও আবির্ভূত হয়, আমরা চাইব সেখানকার ডাক্তারদের যেন তা চিহ্নিত করা ও আবদ্ধ করে রাখার সামর্থ্য থাকে।

এসবের কোনোকিছুই অপরিহার্য না। ইতিহাস কখনো পূর্বিনির্ধারিত কোনো গতিপথ অনুসরণ করে না। মানুষই ঠিক করে কোন দিকে যেতে হবে, হয়তো একটা ভুল মোড়ও নিতে পারে তারা। ২০২১ পরবর্তী সময়ের সাথে ১৯৪৫ পরবর্তী বছরগুলির মিল থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু এখনকার জন্যে সবচেয়ে সদৃশ উদাহরণ ১৯৪২ সালের ১০ নভেম্বর। প্রথমবারের মতো স্থলযুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে ব্রিটেন, আর উইনস্টন চার্চিল একটি ভাষণে ঘোষণা দিলেন: “এটাই শেষ নয়, এমনকি শেষের শুরুও নয়। তবে এটাকে হয়তো শুরুর শেষ বলা যেতে পারে।”

অনুবাদ. আয়মান আসিব স্বাধীন