মানস চৌধুরী

আপনাদের লিঙ্গ-অনুধাবন ১

মাঝে মধ্যে আমার তাঁদের জন্য খুবই মায়া হয় যাঁরা একদা বাংলা ব্যাকরণ বইগুলো নিচের ক্লাসের জন্য লিখেছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে, এমনকি পরাধীন পূর্ব পাকিস্তানে, তারও আগে পরাধীন ভারতের পূর্ব বাংলায় বাংলা ব্যাকরণের প্রথম দিকের প্রণেতা কারা ছিলেন তা আমার জানা নেই। মানে কৌতূহল আছে, আগেও ছিল। আগে কৌতূহলের নিবারণকল্পে কিছু কাজবাজ করে হয়তো কোনো কোনো নাম জেনেও ছিলাম। কিন্তু তা তো এখন মনে নেই।

আর তখন স্মার্টফোন না থাকাতে নোটে লিখে রাখাও হতো না। বা কাগজে লিখে রাখলে সেই কাগজই বা এখন কই পাই! কেবল উইলিয়াম কেরী সাহেবের কথা ছাড়া কারোর কথাই আমার মনে নাই। কিন্তু কেরী সাহেব কিছুতেই ক্লাস থ্রি-ফোরের ব্যাকরণ বই লেখেন নাই। একেই তো বিলাতী, তার উপর কত্ত বড় মানুষ! তিনি নিশ্চয়ই বড়দের ব্যাকরণ লিখেছেন। যাহোক, ওই পরাধীন বা স্বাধীন বাংলার টেক্সট বুক বোর্ডের ব্যাকরণ পুস্তককাররা আজকে বেঁচে থাকলে কতই না লজ্জা পেতেন! ব্যাকরণ বইয়ে লিঙ্গ কথাটা লিখে যে নির্লজ্জ এবং/বা যৌনাত্মক আচরণ করেছিলেন তার জন্য আজকে যদি তাঁদের বিচারও হতো তাতেও আশ্চর্যের কিছু নাই।

মানস চৌধুরী

আমরা এমন এক সময়ে আছি যখন পুরুষ বাংলাদেশী ক্রিকেট দলকেই ট্রান্সলেট করে ‘টাইগার’ বলা হয় না কেবল, বরং লিঙ্গকেও ট্রান্সলেট করে ‘জেন্ডার’ বলা হয়ে থাকে। এনজিও-মেনজিওরা তো বলেনই, খোদ সরকারের মন্ত্রী-সাংসদ মায় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত।

তেমন গুরুতর গবেষণা না করেই যে সিদ্ধান্তে আমি আসতে পেরেছি, আপনারাও স্বতন্ত্রভাবে আবিষ্কার করতে পারেন এবং তাতে আমি কোনোই কৃতিত্ব দাবি করব না, তা হলো এই শব্দোচ্চারণে পর্যাপ্ত শরম বোধ করতে থাকেন মানুষেরা। আর সেটা এড়াতেই ‘জেন্ডার’। তাজ্জব ব্যাপার! শিশুকাল থেকেই শিখে-আসা একটা শব্দ, বইয়ে মুদ্রিত একটা বস্তু, হঠাৎ এত লোকের এতখানি শরমের বিষয়বস্তু হয়ে পড়ল কীভাবে সেটাই আসলে জেন্ডার-অনুধাবনের মূলকথা হয়ে উঠতে পারে।

বইয়ে মুদ্রিত কথাটা খেয়াল করবেন কিন্তু! সেই ছোটবেলা থেকেই তর্কাতর্কির সময় শিশুরা “কোন বইয়ে পাইছিস” আর “আমার বাবায় বলছে” এই দুই দিয়ে প্রতিপক্ষ শিশুদের ঘায়েল করে আসতেন। ফলে বই আর বাবা কর্তৃত্ববাচকতার একদম শিরোমণি। এহেন বইয়ে-ছাপা জিনিসকে মুখে ধারণ করতে আচমকা সমস্যা উদ্ভব নিয়ে মাথা না ঘুরিয়ে থাকতে পারে না। লক্ষ্য করবেন, আমরা এমনকি মোঘল আমলের বাংলার কথা বলছি না।

ব্যাকরণ বইয়ের কারণে হলেও লিঙ্গ শব্দটির আরামদায়ক উচ্চারণের অনুশীলন মাত্র তিন দশকের আগের বাংলাদেশেও ছিল। কিন্তু বিষয়টি নিছক ব্যাকরণ বইয়েই সীমিত ছিল না। এমনকি ঢাকা শহরের নারীবাদীরাও একটা প্রত্যয়/বর্গ হিসাবে লিঙ্গকে গ্রহণ করেছিলেন ৭০-এর দশকের শেষভাগেই। নারীসংহতির নারীবাদীগণ, নারীপক্ষের নারীবাদীগণ, মহিলা পরিষদের নারী নেতৃবৃন্দ, উত্তরকালে নারীগ্রন্থ প্রবর্তনা সমেত অন্যরাও, আকছার সেসব প্রয়োগ করেছেন। তা মেঘনা গুহঠাকুরতা হোন বা রেহনুমা আহমেদ, ফরিদা আখতার বা মালেকা বেগম। লিঙ্গকে পুস্তকের মলাটে রাখতেও নারীবাদীদের কোনো সংকোচ-শরম হয়নি; যেমন মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘স্ত্রী লিঙ্গনির্মাণ’। এতকিছু ঘটল, এত লোকের কাজকর্ম থাকল, অথচ কিছু প্রশাসক আর প্রতিষ্ঠানের মানুষের কল্পনাশক্তি পরিসীমিত হয়ে নির্দিষ্ট কোনো একটা (বা দুইটা) বস্তু বা প্রত্যঙ্গে আবদ্ধ হয়ে পড়ল যে সেটা নিয়ে মনভার করতে গিয়ে উপকারও পেলাম। লোকে লিঙ্গ/জেন্ডার অনুধাবনে ভেজাল বাঁধানও এসব কারণেই।

চলেন আমরা একটু ভাবি এই শরমের ব্যাকরণ রচনার দায়দায়িত্ব কাকে দেয়া যাবে? পত্রপত্রিকা বা সংবাদমাধ্যম? শিক্ষাব্যবস্থা? মন্ত্রী-সাংসদ বা রাজনীতি? পত্রিকা তো ধর্ষণকে “শ্লীলতাহানি” বলে চালালো বহু বছর। আবারো শায়েস্তা খাঁয়ের আমলে নয়, নিকট অতীতেই। ১৯৯৭ সালে আমার শিক্ষক ও সহকর্মী রেহনুমা আহমেদ ও আমি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অফিস-আদালতে নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন-হয়রানিমূলক পরিস্থিতি বিষয়ে একটা সাধারণ পত্রিকা-নিবন্ধ রচনা করি। এই রচনাটির শিরোনামে ‘যৌন’ কথাটি থাকাতে আমাদের ব্যাপক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। ভিতরের সারবস্তু প্রকাশে আগ্রহী এমন সম্পাদকই সুলভ ছিলেন না। প্রকাশে আগ্রহী সম্পাদকও অন্তত শিরোনামের শব্দ বদলের জন্য জোর দিতে থাকলেন। একাধিক বৈঠক করেই উভয়পক্ষ সম্মত হতে পারি এবং ‘প্রাতিষ্ঠানিক যৌন হয়রানি’ নামের নিবন্ধখানা প্রকাশিত হয়।

বাংলাদেশের মুখ্যধারার ‘সিরিয়াস’ সংবাদপত্রে একটা হামলামূলক ঘটনাকে লুকোছাপার নীতির বাইরে প্রথম পদক্ষেপ ছিল এটা। পত্রিকার এই নিকট-অতীতের ইতিহাস মনে করিয়ে দেবার পর পাঠকের মনে নিশ্চয়ই এই প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যে আমাদের নিজেদের কর্মক্ষেত্রে পরিস্থিতিটা কী হয়েছিল। সেখানে এই বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের জন্য আমাদেরকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল কিনা। হয়নি। আমাদের কর্মক্ষেত্রে, অর্থাৎ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, ধিক্কার বা ছিঃক্কারে ভরে গেছিল এই মর্মে যে আমরা ‘শিক্ষক’ হয়েও কীভাবে এইরকম ‘কুৎসিত’ কথাবার্তা লিখতে পারলাম! বলাই বাহুল্য, শিক্ষক না হলেই বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়রানিমূলক পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের বলা কঠিন হতো। সেসব ধিক্কারে আমরা যে দমে গেলাম না, সেটা পরিস্থিতির গুণ ছিল না, বরং সেটা আমাদেরই দমের দৌড়।

কী হলো তারপর? ঘটনাচক্রে পরের বছরই একটা তুলকালাম করা ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন হলো জাহাঙ্গীরনগরে। দেশের সংবাদ-মাধ্যমে কমবেশি দেড়মাস এই আন্দোলন খবর সরবরাহ করেছে। এই আন্দোলনের দোলা লাগল এমনকি আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও। এর মধ্যে সাংবাদিকতা চর্চার বহু কর্মী যৌন হয়রানি ও লিঙ্গীয় সম্পর্ক বিষয়ে নিজেদের বোঝাবুঝি স্পষ্ট করলেন। তাঁদের নিবন্ধগুলো সেগুলোর দলিল। সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গির একটা রূপরেখা তৈরি হলো, যে কোনো পাঠক সেটা মনোযোগ দিলেই টের পাবেন। দেশের ‘বরেণ্য’ চিন্তকগণ লিঙ্গ প্রসঙ্গে যে আখাম্বা, সাহিত্যক্লিষ্ট, রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ ঘটিয়ে চলতেন সেগুলোর অনেক রকমের সংস্কার হতে থাকল।

প্রকাশ্যে হাস্যতামাশা করে উড়িয়ে দেয়ার বিষয়েও অনেকে সংযত হতে বাধ্য হলেন। কিন্তু সবই হতে থাকল ধীরে ধীরে। অতি ধীরে। এসবের ১০ বছর বাদে আদালত স্ব-উদ্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অপরাপর প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি নিরসনের (ও লিঙ্গীয় বৈষম্য অবলোপের) লক্ষ্যে ফরমান জারি করলেন। তাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রশাসকেরা একটু চাপ বোধ করলেও সেসব হুকুম পালনের সময় তাঁরা লক্ষ্য রাখলেন যাতে কিছুতেই লিঙ্গীয় বৈষম্য নিয়ে মুখর লোকজন হাইকোর্টের হুকুমে বানানো সেলগুলোর দায়িত্বে না থাকেন। হাইকোর্টের সেই ফরমানের পরও দেশে এক যুগ কেটে গেছে। কিন্তু লিঙ্গ বিষয়ে বোঝাবুঝিও নড়ে না; বিধিবিধানও সহজে বদলায় না। অফিসে অফিসে ঠিক কী ধরনের হিংসাত্মক পরিবেশে (কেবল যৌনাত্মকই হয় না হিংসামূলক পরিবেশ) নারীরা কাজ করছেন, তা বোঝার জন্য পুরুষজাতির নিজ-নিজ ‘গার্লফ্রেন্ড’ বা ‘বউয়ের’ গল্প কম বিশ্বাস হলেও, বোন কিংবা ফুপু-খালাদের গল্পগুলোতে মনোযোগ দিতে পারেন।

বাংলায় ‘গন্ডার’ একটা ব্যাপক বিশেষণ। এমনিতে জন্তু-জানোয়ারের নামকে মনুষ্য-বিশেষণ হিসাবে ব্যবহার করা আমার অতীব অপছন্দের কাজ। ক্রুদ্ধ হয়ে করলে তো বটেই, কৌতুকময়তার মধ্যে করলেও। আমার বিবেচনায় এতে পশুকুলের ব্যক্তিত্বনাশ করা হয়; সেটাও দুইবার করা হয়। প্রথমে মানুষদের বৈশিষ্ট্যের কিছু কিছু অংশ একটা জন্তুর কাঁধে চাপানো হয়ে থাকে। তারপর সেই জন্তুর সকল সদস্যকে সেই বৈশিষ্ট্যবাহী হিসাবে আন্দাজ করে সেটার বিশেষণ (বা গালি) মানুষের কারো কারো উপর চাপানো হয়ে থাকে। সব মিলে নিন্দনীয় অনুশীলন মনে করি আমি।

এইটা যে কেবলই সাধারণ আম-মানুষের কাজকর্ম, কিংবা গালমন্দ বা কৌতুকের কাজকর্ম তা মনে করা কিন্তু ভুল হবে আপনাদের। সাহিত্যের জগৎ এই বিষয়ে আরো এককাঠি তীব্র। গালি বা ক্রোধের বাইরে সাহিত্য জগত স্বতঃসিদ্ধ কিছু দৃশ্যকল্প বানিয়েছে। যেমন, “শৃগালের মতো ধূর্ত”, “কাকের মতো কুৎসিত”, “বাঘের মতো হিংস্র”, “কুমিরের মতো মায়াকাঁদুনে”, “সাপের মতো নিষ্ঠুর”, “বানরের মতো বান্দর” ইত্যাদি। এসব বলার কারণে ‘বিষণ্ন শৃগাল’ বা ‘দুখী কুমির’ বা ‘উৎকণ্ঠিত কাক’ অবলোকন-অনুধাবন করার সুযোগ থেকে আমৃত্যু বঞ্চিত থাকেন সাহিত্যচর্চাকারেরা। কেবল সেটুকুই নয়, শতকের পর শতক ধরে মনুষ্য কল্পনায় এসব সম্ভাবনা তিরোহিত করে রাখেন তাঁরা।

এতসব কিছুর পরও ‘গন্ডার’ শব্দটাকে রাখার কারণ এই যে গন্ডারের একটা-দুটো বৈশিষ্ট্যকে বস্তুনিষ্ঠভাবেই হয়তো আমরা পরিলক্ষণ করতে পারি। বস্তুত ‘গন্ডার’কে মনুষ্যগালি হিসাবে প্রয়োগ ঘটে থাকে এর শ্লথচরিত্রের কারণে। কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে এই শ্লথতাকে দৈহিক গতির হিসাবে দেখলে চলবে না। গন্ডার যখন তাড়া করে তখন তার সঙ্গে দৌড়ে আমার পক্ষে পারা সম্ভব নয়। আমি তাড়া খাইনি ঠিকই, তবে টিভিতে দেখেছি। এখানে বস্তুত গন্ডারের চিন্তাপ্রক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়ার গতি হিসাব কষে তাকে শ্লথ ভাবা হয়ে থাকে। এর একাংশ দৃশ্যত বাহ্যত দেখা যায়। টিভিতেই দেখা যায়। গন্ডার আর কই পাবেন! তাড়া করার আগেও ঘোঁৎ মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। আরেক অংশ আন্দাজ করে বলা। গন্ডারের চামড়া যেহেতু পুরু তাই তার নাকি চিমটি কাটলে অনেকক্ষণ পর টের পাবার কথা! এটা আন্দাজই হবার কথা। গন্ডারকে কেউ চিমটি মেরে পরীক্ষা করে দেখেছে এমনটা আমার মনে হয় না।

কিন্তু পরিশেষে গন্ডার জাতির টের পাবার দেরির আন্দাজটা ধরে আমি আগালাম। যেহেতু এই মুল্লুকের লোকজনের বড় একটা অংশই লিঙ্গ নিয়ে শরম বোধ করছেন; যেহেতু লিঙ্গীয়/জেন্ডার সম্পর্কের বিষয়ে কোনোমতেই লোকজন উপলব্ধি করে উঠতে পারছেন না, যথেষ্ট দেরি হচ্ছে, তাই জেন্ডার শব্দটার ভাষান্তর গন্ডার করলে ধ্বনিগত ও অনীহাগত উভয়ভাবেই কার্যকরী একটা প্রতিশব্দ আমরা পেতে পারি।

(আপনাদের লিঙ্গ-অনুধাবন ২)

আদাবর, ১২, ১৪ জুলাই ২০২১
কভারে মানস চৌধুরী; ছবি. ল্যাপটপ সেলফি, ২০২১