কী সুন্দর একটা নাম—’চিকলির বিল’। যেন জ্যোৎস্না রাত্রে একটা রুপার সরু গয়না।

চিকলির বিলের কথা বলতে গেলে হনুমানতলার কথাও একটু বলা দরকার হবে। হনুমানতলাতেই যেহেতু চিকলির বিল অবস্থিত।

রংপুর শহরের মাঝামাঝি এক জায়গায়, চিড়িয়াখানাটা পার হয়ে একটু আগায়ে গেলে, ছোট্ট একটা হনুমান মন্দির পাওয়া যাবে। মন্দির মানে সামান্য একটু মণ্ডপ মাত্র। মোটামুটি পুরানা একটা জোড়া-বটপাকুড় গাছের তলায়।

মণ্ডপে রঙিন একটা বড়সড় হনুমানের বিগ্রহ। আর এই মন্দিরের পরে থেকেই শুরু হবে হনুমানতলা। ঐ চিকলির বিল পর্যন্ত।


ছবির গল্প
মনজুরুল আহসান ওলী


ছোটবেলায় আমরা যখন আব্বুর চাকরিসূত্রে নওগাঁয় থাকতাম, তখনও বছরে দুয়েকবার রংপুরের এই হনুমানতলায় আসা হইত। আমার একমাত্র খালামনির বাসায়, যিনি মাত্র কিছুদিন আগে হঠাৎ মারা গেলেন।

তবে তখনকার কোনো চিকলির বিল-বিষয়ক স্মৃতি আমার নাই। নিশ্চয়ই এক-আধবার যাওয়া হইছিল, যেহেতু খালামনিদের তখনকার বাসার একদম কাছেই ছিল এই বিলটা। তবু প্রথম কবে গেলাম কবে দেখলাম কিছু মনে নাই। তখনকার স্মৃতিতে শুধু রাত্রিবেলার অন্ধকার হনুমানতলাই থেকে গেছে।

গা ছমছম করা হনুমানতলা, রাত্রি নয়টার পরেই শিয়াল ঘুরে বেড়াইত আর চলন্ত রিকশা-টিকশা দেখলে ঝোপের আড়াল থেকে ফলো করা শুরু করত ওরা। ক্লাস থ্রি ফোরে পড়া আমি ওদের সরে-যেতে-থাকা আর জ্বলতে-থাকা সবুজ সবুজ চোখগুলি দেখে বড়দের কোলে বসে বসেই রোমাঞ্চিত হইতাম।

চিকলির বিলের সাথে আমার ঠিকঠাক পরিচয় ঘটল ক্লাস সিক্সে যখন পড়ি। আমার ফ্যামিলি তখনও নওগাঁতেই, কিন্তু আমাকে ভর্তি করায়ে দেওয়া হইল রংপুরে। যেন ক্যাডেট কোচিং করতে পারি ঠিকমত। খালামনির বাসাতেই থাকতাম। আদর আহ্লাদের কমতি ছিল না, খালামনি সহজ মানুষ, পর্যাপ্ত স্বাধীনতাও উনি বরাদ্দ দিতেন। তাই মাঝেমাঝেই তখন চিকলির বিলে ঘুরতে যাওয়া শুরু করলাম। এবং এইভাবে যাইতে-যাইতেই একসময় আবিষ্কার করলাম যে এই চিকলির বিল জায়গাটা আমারও অত্যন্ত পছন্দের জায়গা হয়ে গেছে।

মূল জলাশয়টা যে খুব একটা বড়, এমন না। তবে কমও না, অনেকখানিই। একদিক থেকে আস্তে-আস্তে হাঁটতে শুরু করলে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছাইতে অন্তত আধাঘণ্টা সময় লাগবে। আয়তাকার। দুইদিকে ঘন গাছপালা ছিল তখন, বড়-বড় গাছ। একটা দুইটা বটের গাছ পাকুড়ের গাছও আছে। বিলের পানির গভীরতা কেমন তা তখন জানতামও না, বুঝতামও না৷ যে যা বলত তা-ই বিশ্বাস করতাম। (এখন অবশ্য জানা হইছে যে গভীরতা তেমন বেশি না।)

শান্ত ঢেউ, বিশেষ করে মেঘলা বাতাস লাগা দিনে, ঢেউগুলিকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকলে মনটা একদম পূর্ণ হয়ে আসত। চতুর্দিক দিয়ে মাটির হাঁটাপথ। বাকি জায়গাগুলি ঘন ঘাস। তারপর জলাজমি।

মোটামুটি পরিমাণ লোক প্রায় আড্ডা দিতে যাইত চিকলির বিলে। তাস খেলত। সন্ধ্যারাত্রের দিকে বিভিন্ন আকাম-কুকাম করত। আর সারাদিনই মোটামুটি প্রেমিক-প্রেমিকারা আসত যার যেমন রুচি তেমন ভাবে প্রেম করত। ছিনতাই-টিনতাই নিয়মিতই চলত। এর থেকেও খারাপ ঘটনা ঘটত মাঝে মাঝে। ভাল ঘটনাও ঘটত। পরিবার নিয়ে লোকজন মিনি পিকনিক টাইপের করতে আসত। তবে আমাকে এইসব কিছুই স্পর্শ করত না প্রথম দিকে, নিজের মনে আমি বিলের ধারে-ধারে শান্তশিষ্ট ঘুরে বেড়াতাম। এমনকি গভীর রাত্রিবেলাতেও।

ক্লাস সিক্সের কথাই এখনো বলতেছি। আমি যে ঘরটাতে থাকতাম ঐটাকে আমরা ডাকতাম ‘চালাঘর’। উপরে টিন, বাকিটা পাকা। মূল বাসার সাথেই লাগানো, তবে দরজা আলাদা। আর একটা জানালা ছিল, পুরানা রীতি অনুযায়ী সোজা সোজা লোহার শিক লাগানো। এর মধ্যে দুইটা শিক আমি খুলে ফেলা এবং আবার লাগায়ে ফেলার পদ্ধতি আবিষ্কার করলাম। এতে যতটুকু ফাঁকা স্পেইস পাওয়া যাইত, অনায়াসে সেইটা দিয়ে আমার বালক শরীরের পক্ষে চালাঘরে ঢোকা এবং বের হওয়া সম্ভব। তো আমি করতাম কী, বারোটার পরে একটু রাত্রি হইলে, সবাই নিশ্চিত ভাবে ঘুমায়ে পড়ামাত্র দরজাটা ভিতর দিকে থেকে বন্ধ ক’রে রেখে, জানালার শিক সরায়ে বাহিরে বের হয়ে আসতাম। তারপর জানালার পাল্লা দুইটা চাপায়ে দিয়ে, প্রাচীর টপকায়ে বিলের দিকে রওনা দিতাম।

প্রথম প্রথম অনেকটা ভয়ও লাগত। শুনশান বিল। চতুর্দিক নিশুতি। অনেক সময় কোথাও কাউকেই দেখা যাইত না। একদম জনমনুষ্যহীন। অন্ধকার গাছপালা ঘন ঝোপঝাড়। চাঁদের আলো থাকলে অবশ্য বিলের পানিতে প্রতিফলিত হয়ে মাটির রাস্তাটাও ফুটে ফুটে উঠত। আর কপালে বাতাস থাকলে তো কথাই নাই।

সারাটা বিল এলাকা যেন ফুরফুর ঝিনঝিন করে উঠত। গাছে-বাতাসে মিলে কত রকমের যে শব্দ, শুনতে শুনতে যেন আমার বাস্তবতা বোধ লোপ পাইত একসময়। মনে হইত আমি অলৌকিক কোনো কিছুর সাক্ষী হচ্ছি, সম্মুখের অফুরন্ত জীবন ধরে যা বহন করব। ছোট ছোট ঢেউগুলির হালকা হালকা আওয়াজ। একটা মাত্র পাতলা নৌকা ঐ দূরে বাঁধা। সেইখানে কিছু নড়ে উঠল কি?

সার সার গাছেদের মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা হয়ে হাঁটতে হাঁটতে এই বিলকে দেখতে হয়। কী সুন্দর একটা নাম—’চিকলির বিল’। যেন জ্যোৎস্না রাত্রে একটা রুপার সরু গয়না। কখনো কখনো যৌনচেতনা উত্থিত হইতে থাকত ধীরে ধীরে। আশেপাশে কেউ নাই, প্যান্টের ভিতরে হাত ঢুকায়ে দিয়ে আমি হাঁটতাম আর ক্রমশ কল্পনার জগতে প্রবেশ করতাম। এই চিকলির বিলেই আমি প্রথম আল্লাহর সাথে শব্দ ক’রে কথা বলা শুরু করি। মসজিদে যেই রকম বান্দাসুলভ কথা হয়, সে রকম না। বোনের সাথে বোন যেইরকম অন্তরঙ্গ কথা বলতে থাকে ঐরকম।

তো তারপর থেকে বৎসরের পর বৎসর ধরে ক্রমাগত এই বিলের ধারে আমার যাওয়া হইছে। ভরদুপুরের সৌন্দর্য্য, বাতাস-দেয়া বিকাল, মেজাজ-খারাপ সন্ধ্যা। আর রাত্রির কথা তো বললামই। এবং সব থেকে চমৎকার সময় যেইটা, সূর্যোদয়ের একটু আগেই, একদম ভোরের বেলায়।

এখন মাঝে মাঝে রংপুরে গেলে, চিকলির বিলে যাওয়াটা মাত্র একবার দুইবারই ঘটে, এবং সেইটা সাধারণত ভোরবেলাতেই। এই ছবিটাও শীতকালের এক ভোরেই তুলছিলাম, অল্প কয় বছর আগে। এখন আর পূর্বের মত অত গাছপালা নাই, কেটে ফেলা হইছে। এমনকি সামনের দিকে একটা অ্যামিউজমেন্ট পার্ক বানানো চলতেছে, বিশাল এক ইলেকট্রিক নাগরদোলা বহু দূর থেকে দেখা যায়। স্পিডবোট, রেস্টুরেন্ট, ফ্লোটিং রেস্টুরেন্ট, বহু কিছু। আরো বহু কিছু পরিকল্পনাধীন আছে যেগুলি নাকি অচিরেই বাস্তবায়িত হবে। তা হোক। প্রথম প্রথম মেনে নিতে কিছু সমস্যা হইলেও এখন আমি এই নতুন চিকলির বিলকেও মন থেকে অ্যাকসেপ্ট করে নিছি। এখনও এইটা চিকলির বিলই তো বটে।

ভোরবেলা হাঁটতে হাঁটতে একটু ভিতরের দিকে গেলে, পাকুড় গাছটার আগে-আগেই কোথাও, কম-কম ঘাসের উপর দাঁড়ায়ে আপনি যখন বিলের মোলায়েম ঢেউগুলির দিকে তাকাবেন। তখন মৎসচাষজনিত ঘোলাত্ব থাকা সত্ত্বেও এই জলভাগ আপনাকে তিক্ত মধুর একটা শান্তির ভাব দিবে, আপনার তখনকার মেজাজ অনুযায়ী। তেমন চওড়া না হওয়াতে ঐ পারের টুকটাক গাছপালাগুলিও মোটামুটি স্পষ্ট দেখতে পাবেন। শীতকালীন উজ্জ্বল ধূসরতা ঝোপগুলির ফাঁকে ফাঁকে। পাকুড় গাছটা দাঁড়ায়ে আছে। সতেজ। চুপচাপ। তবে সুরেলা।

আপনার ভাল লাগবে। আপনার মনে হবে আপনি ঠিক আছেন। সব ঠিক আছে।