টাইম ব্লকিং

টাইম-ব্লকিং উৎপাদনশীলতার একমাত্র কার্যকর কৌশল নয় তা আগেই বলা হয়েছে। কৌশলটি অনেকের জন্যই বেশ কাজ দেয়। তবে অনেকেই আবার এই কৌশল ব্যবহার করে সফলতা পায় নি।

ব্যক্তিগত উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর একটা জনপ্রিয় কৌশল টাইম ব্লকিং। আপনি যদি আপনার কাজের সময়টাকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নিয়ে একেকটা ভাগ একেকটা কাজ করার জন্য নির্ধারণ করে তারপর কাজ করেন সেটাই হল টাইম ব্লকিং।

এর মাধ্যমে আপনি গড়িমসি এড়িয়ে অল্প সময়েই অনেক কাজ করতে পারবেন। এবং আপনার কোনো সময় অপচয় হবে না।

তবে সবার জন্য নয় টাইম ব্লকিং কৌশল। কেননা অনেকের পক্ষেই প্রতি মিনিটেই পরিকল্পনা করে চলাটা একটু বেশিই মানসিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে। আবার এমন অনেক কাজই আছে যেগুলি আসলে বাঁধাধরা সময়ের মধ্যে করা সম্ভবও হয় না। এছাড়া ইন্টারনেট ডাউন বা স্লো হয়ে যাওয়ার মতো অপ্রত্যাশিত ঘটনাও ঘটতে পারে।

আপনার যদি মনে হয়ে যে, টাইম ব্লকিং কৌশল আপনার ক্ষেত্রে কাজ করবে না তাহলে এখানে আপনার জন্য রইলো আরো ৮টি কৌশল।

 

১. পোমোদোরো টেকনিক ব্যবহার করুন
পোমোদোরো কৌশল তুলনামূলক নতুন ধারণা। ১৯৮০-র দশকে ফ্রান্সিসকো সিরিলো উদ্ভাবন করেন এটি। পমোদোরো টেকনিকে সাধারণত প্রতি ২৫ মিনিট পর পর একটা সংক্ষিপ্ত বিরতি দিয়ে কাজ করা হয়। এই পদ্ধতিতে কাজ করার সময় টাইমার ব্যবহার করা হয়।

নিয়মিত বিরতি নিয়ে আপনি আসলে আপনার মস্তিষ্ককে তথ্য প্রসেস করার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিচ্ছেন এবং মস্তিষ্কের ওপর অতিরিক্ত চাপ এড়ানোর চেষ্টা করছেন। এভাবে বিরতি নিয়ে কাজ করলে দেখতে পাবেন, অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক কাজ সেরে ফেলতে পারছেন। একটানা কাজ করলে যতটুকু কাজ শেষ করতে পারবেন নিয়মিত বিরতি নিয়ে কাজ করলে বরং ওই একই সময়ে আরো বেশি কাজ করতে পারবেন।

আপনার যদি মনে হয় ২৫ মিনিট খুব অল্প সময় তাহলে ৬০-৯০ মিনিট পর পর বিরতি নিন। পোমোদোরো টেকনিক নিয়ে কাজ করার জন্য অনেক ভালো অ্যাপ ‌আছে ইন্টারনেটে। তা থেকে আপনার পছন্দেরটি খুঁজে নিতে পারেন।

২. কাজের শীর্ষ ২০ শতাংশ ভালোভাবে মনোযোগ দিয়ে করুন
৮০/২০ নিয়মটি উৎপাদনশীলতা সহ নানা ধরনের অনুশীলনেই আছে। এই নিয়ম পারেটো প্রিন্সিপাল (Pareto Principle) নামে পরিচিত। এর পেছনের তত্ত্বটি হল আপনার কাজের আউটপুট বা ফলাফলের ৮০ শতাংশ আপনার কর্মপ্রবাহের মূল ২০ শতাংশের ওপর নির্ভরশীল।

সুতরাং কোনো কাজ বা অধ্যয়নকালে আপনি আপনার কর্মপ্রবাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ২০ শতাংশ শনাক্ত করতে এবং তার ওপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মনোযোগ নিবদ্ধ করতে পারেটো নীতি ব্যবহার করতে পারেন।

৩. সন্ধ্যাবেলাটা আরামদায়ক রাখুন
সোশ্যাল মিডিয়াতে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই আপনি কোনো প্রখ্যাত উদ্যোক্তা বা সিইওর সকালের রুটিন সম্পর্কে জানতে পারবেন। অথবা তারা ঘুম থেকে উঠে কী করেন এ সম্পর্কিত কোনো না কোনো লেখার লিংক পেয়ে যাবেন। আপনার দিনটি সঠিক ভাবে শুরু করাটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সন্ধ্যাবেলাটাও ভালো মুডে শেষ করাও সমান জরুরি।

তবে উদ্বিগ্ন হবেন না। সন্ধ্যার রুটিনে ভোজনবিলাসী কোনো খাবার রান্না করার কাজ রাখা বা ৫টা বাজতেই বিছানার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার দরকার নেই। সবকিছু সহজ-স্বাভাবিক রাখুন। আপনার প্রিয় টিভি শো দেখুন, কোনো বই পড়ুন, বা বেড়াতে যান। যা কিছু আপনাকে রিল্যাক্স করে তাই করুন।

ঘুমাতে যাওয়ার কিছু সময় আগে থেকেই টিভি, মোবাইল বা কম্পিউটার স্ক্রিন বন্ধ করে দিন। এসব থেকে যে নীল আলো বের হয় তা আপনার মস্তিষ্ককে এখনো রাত হয়নি এমন অনুভূতির যোগান দেয়। যা আপনার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়।

বিছানায় যাওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে থেকেই আপনার ফোনটি না দেখার চেষ্টা করুন এবং ঘুমের সময় ঘরের অন্যদিকে ডিভাইসটি চার্জ করুন যাতে কোনো সমস্যা না হয়।

৪. ছোট ছোট কাজগুলি একসাথে করুন
তুচ্ছ কাজে খুব বেশি সময় ব্যয় করার কারণে দিনে আপনার হাতে হয়তো পর্যাপ্ত সময় থাকে না। ফোন কল চেক এবং মেইলের ইনবক্সেই যদি দিনের অর্ধেক সময় ব্যয় করে ফেলেন তাহলে আপনি বাকি কাজ করবেন কখন?

এ থেকে বাঁচার জন্য ছোট ছোট কাজগুলি একসাথে করুন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি ইমেইল এবং মিসকলগুলির জবাব দেওয়ার জন্য দিনের মধ্যভাগে এবং সন্ধ্যায় ২০ মিনিট করে সময় বরাদ্দ করতে পারেন।

এতে আপনার সময়ও বাঁচবে এবং কাজের তালিকা হালকা হওয়ার অনুভূতিও হবে। এর জন্য আপনি যেকোনো টুডু লিস্ট অ্যাপ ব্যবহার করে সাবটাস্ক এবং কাজের ক্যাটেগরি করে রুটিন তৈরি করতে পারেন।

৫. অবসর সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করুন
আপনার ব্যস্ততম দিনেও এমনকি আপনি ছোট ছোট টুকরো সময় পাবেন যখন বড় কোনো কাজ থাকবে না। ওই সময়গুলিতে আপনি কম গুরুত্বপূর্ণ এবং কম মাথা খাটাতে হয় এমন কাজ সেরে নিতে পারেন। যেমন, টেক্সট মেসেজের উত্তর দেওয়া, স্যোশাল মিডিয়ার অ্যাকাউন্ট চেক করা এবং কম গুরুত্বপূর্ণ ইমেইলের জবাব দেয়া।

ব্যস্ততম সময়ের যে ছোট ছোট পকেটগুলিতে আপনি সাধারণত এই কাজগুলি সম্পন্ন করতে পারেন তার মধ্যে রয়েছে, আপনি যখন শপিংয়ের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকবেন, বাসায় ফেরার বাস বা ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন বা আপনি যখন রাতের খাবার রান্না হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন তখন।

টুকরো টুকরো অবসর সময়ের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে আপনি আপনার ছোট ছোট কাজগুলি করে ফেলতে পারলে গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় ছোট কাজগুলি আর ডিস্টার্ব করতে পারবে না।

৬. একাধিক কাজ একসঙ্গে করবেন না
একাধিক কাজ একসঙ্গে করতে পারার দক্ষতার প্রশংসা করে বাজার। তাই কেউ হয়তো আপনাকে বলতে সাহস পায় না যে, আপনার মস্তিষ্ক আসলে একবারে কেবলমাত্র একটি কাজেই ভালোভাবে মনোনিবেশ করতে সক্ষম।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, মাল্টিটাস্কিং বা একসঙ্গে একাধিক কাজ করার ফল প্রায়শই হিতে বিপরীত হয়। এটি আপনার উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বদলে কমিয়ে দিতে পারে।

এই সমস্যার সহজ সমাধান হল একবারে মাত্র একটি কাজই করা। প্রতিদিন, আপনাকে কী করতে হবে তার একটি তালিকা তৈরি করুন। কোনো কাজ করার সময় এমন আর কোনো কিছুর প্রতি মনোযোগ দেবেন না যেগুলির প্রতি মনোযোগ পরে দিলেও চলবে।

একবারে একটি কাজে আরও বেশি শক্তি খরচ করলে আপনি দেখতে পাবেন যে, স্বল্প সময়ের মধ্যেই আপনি অনেক কাজ করে ফেলতে পারছেন।

একবারে একটি কাজেই ফোকাস ধরে রাখতে নিজেকে সহায়তা করতে আপনি হয়তো সব ম্যানুয়ালি ব্লক করতে চাইতে পারেন। এক্ষেত্রে আপনি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো ওয়েবসাইটে অ্যাক্সেস আটকাতে ‘রেসকিউটাইম’ এবং ‘কোল্ড টার্কি’র মতো অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।

৭. ৫ মিনিটের নিয়ম মনে রাখবেন
আপনি যদি এমন কোনও কাজের মুখোমুখি হন যা আপনার করতে ভালো লাগবে না বলে মনে হচ্ছে, তাহলে ৫ মিনিটের নিয়মটি ব্যবহার করে দেখুন। সহজভাবে বলতে গেলে, ৫ মিনিটের নিয়মে বলা হয়েছে যে আপনাকে কেবল ৫ মিনিটের জন্য কোনো কাজে মনোনিবেশ করতে হবে।

এই কৌশলটির পেছনের ধারণাটি হল একবার শুরু করার পর আপনার হয়তো কাজটি করতে ভালোও লাগতে পারে এবং আপনি হয়তো মনে করতে পারেন যে কাজটি আপনি পুরোপুরি শেষও করতে পারবেন।

এই কৌশলটি আপনি তখনই ব্যবহার করবেন যখন আপনার মনে কোনো কিছু করার জন্য কোনো আগ্রহ ফুরিয়ে যাবে এবং জিমে যাওয়ার মতো কিছু করার প্রয়োজন রয়েছে।

৫ মিনিট পার হয়ে যাওয়ার পরও যদি কাজটি অসহনীয় লাগে তবে আপনি কাজটি বন্ধ করতে পারেন। তবে ইতোমধ্যেই কৌশলগতভাবে আপনি আপনার উদ্দেশ্য অর্জন করে ফেলেছেন। এবং কোনো কাজ হয়নি বলে মন খারাপ করারও দরকারও থাকবে না আর।

৮. একেকটি দিন একেক কাজের জন্য উপভোগ করুন
এই তালিকার সবচেয়ে আনন্দদায়ক উৎপাদনশীলতার কৌশল এটি। আপনাকে যা করতে হবে তা হল সপ্তাহের প্রতিটি দিন আলাদা ধরনের কাজের জন্য উৎসর্গ করা। উদাহরণস্বরূপ, সোমবার অ্যাকাউন্টিংয়ের জন্য হতে পারে এবং শুক্রবার হতে পারে মার্কেটিংয়ের জন্য।

আপনি যদি অধ্যয়নরত হন তবে আপনি এই কৌশলটি ব্যবহার করতে পারেন। প্রতিটি দিনকে একটি আলাদা বিষয় বা অ্যাসাইনমেন্টের ধরনের জন্য উৎসর্গ করতে পারেন।

আপনি যখন আপনার দিনগুলিকে এভাবে ভাগ করে কাজ করবেন তখন আসলে আপনার যা কিছু করা দরকার সেসবের অন্তন্ত কিছুটা করে হলেও করা হয়ে যাবে। এর ফলে আপনি ক্লান্তি এবং অবসাদ এড়াতে পারবেন। এজন্য আপনি গুগল ক্যালেন্ডার বা আউটলুক ক্যালেন্ডারের মতো অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।

 

টাইম-ব্লকিং উৎপাদনশীলতার একমাত্র কার্যকর কৌশল নয় তা আগেই বলা হয়েছে। কৌশলটি অনেকের জন্যই বেশ কাজ দেয়। তবে অনেকেই আবার এই কৌশল ব্যবহার করে সফলতা পায় নি। আপনি যদি তাদেরই একজন হন তবে আপনার উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই। প্রচুর বিকল্প রয়েছে। যার মধ্যে অনেকগুলি আমরা কেবলই আপনাকে জানালাম।

এই তালিকার কয়েকটি কৌশল নিয়ে পরীক্ষা করুন। কিছু আপনার জন্য কাজ করবে। অন্যগুলি হয়তো কাজ করবে না। তবে শেষ পর্যন্ত, আপনি আপনার জন্য উপযোগী কৌশলটি পেয়ে যাবেন।