২০১৯ সালে যখন ‘দি গ্রেট হ্যাক’ মুক্তি পাইল তখন নেটফ্লিক্সের মোটিভেশনকে সিনিক্যাল ভাবি নাই। এর একটা কারণ হইতে পারে একটু অবাক ভাবেই দেখতেছিলাম কী প্রক্রিয়ায় এই শতাব্দীতে একটা প্রতিষ্ঠান দেশ কিংবা দেশেসমূহের  চাইতে প্রকাশ্যে শক্তিশালী হয়ে ওঠে!

যারা ‘দি গ্রেট হ্যাক’ দেখেন নাই তাদের জন্য সংক্ষিপ্ত শানে নুযুল হইল কীভাবে আর্মিকে ওয়ার সাইকোলজিতে ট্রেনিং দেয়া একটা কোম্পানি (ক্যাম্ব্রিজ অ্যানালেটিকা) সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে দেশে দেশে ইলেকশনের ফলকে প্রভাবিত করছে। এখানে বড় উদাহরণ হিসেবে ট্রাম্পের নির্বাচনে জেতা সহ আরো বিভিন্ন দেশের উদাহরণকে নিয়ে আসা হয়েছে। আরো দেখানো হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়াতে কীভাবে আপনার-আমার প্রোফাইলিং করা হয় এবং তার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং আপনি চাইলেই সেই তথ্যের ম্যাপিংয়ে এক্সেস পাবেন না।

এই ডকুমেন্টারির শুরুতে দেখায়, একজন বিজনেসের প্রফেসর কীভাবে তাকে টার্গেট করে ফেসবুকে দেওয়া বিজ্ঞাপনগুলিকে সন্দেহ করতে থাকেন।

দি গ্রেট হ্যাক (২০১৯)

তিনি মনে করতে থাকেন, এত নির্দিষ্ট ভাবে বিজ্ঞাপন দেওয়া তখনই সম্ভব হয় যখন আপনি যেই ইনফরমেশনগুলি জ্ঞাতসারে দিয়েছেন তার বাইরেও আরো ইনফরমেশন বিজ্ঞাপনদাতা কোম্পানিগুলির কাছে আছে, কিংবা তারা সংগ্রহ করতেছে। তার সন্দেহ ঠিক আছে কিনা জানতে তিনি অনুসন্ধান শুরু করেন। সেই সময় তার সাথে ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার অন্যতম হুইসেল ব্লোয়ার ব্রিটনি কাইজার-এর সাথে পরিচয় হয়। এরপর তিনি মোটামুটি নিশ্চিত হন, ফেসবুক ব্যবহারকারীর অজ্ঞাতসারে অনেক ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবহারকারীর প্রোফাইলিং করার জন্য। এরমধ্যে ইউরোপিয়ান আদালত ফেসবুককে ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকাকে তথ্যের এক্সেস দেয়ার কারণে দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা করে। ঠিক একই সময়ে প্রফেসর তার কী কী তথ্য ফেসবুকের কাছে আছে তা জানতে চেয়ে মামলা করেন। কিন্তু আদালত ফেসবুককে জরিমানা করলেও প্রফেসরকে তার ব্যক্তিগত তথ্যের অ্যাকসেস দেয় না।

‘দি সোশ্যাল ডিলেমা’ (২০২০) মূলত ডকুমেন্টারি এবং ড্রামার মিশেল। গুগল- ফেসবুক-টুইটারে কাজ করা সাবেক কর্তাব্যক্তিদের কনফেশন এবং ‘অভিযোগ’ একত্র কইরা দেখানো হয়েছে কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম আমাকে-আপনাকে সোশ্যাল মিডিয়াতে আটকায় রাখে, যেটাকে উনারা ‘এডিকশন’ বলতেছেন। তাছাড়া কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া সমাজ-রাষ্ট্রের বিভেদ টিকাইয়া রাইখা টিকা আছে এবং সেখান থেকে বড় হইতেছে।

এটা শুরু হয় একটা সাধারণ পরিবারকে দেখানোর মধ্য দিয়ে। কীভাবে স্মার্টফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পারিবারিক ডিনারে সবাই একসাথে বসেও বিচ্ছিন্ন থাকে এবং তারা পরস্পর থেকে ক্রমে দূরে সরে যেতে থাকে। 

বেন নামের ফিকশনাল চরিত্রটি কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম-এর ফাঁদে পরে আস্তে আস্তে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রপাগান্ডা বিশ্বাস করতে শুরু করে। শেষ পর্যন্ত কাল্টের সদস্য হবার মাধ্যমে বিপদগামী হয় এবং পুলিশ তাকে আটক করে।

২.
এই লেখায় আমি  আলাপ করার চেষ্টা করব কেন নেটফ্লিক্স সোশ্যাল মিডিয়ার পিছনে লেগেছে বা আদৌ লেগেছে কিনা? ‘দি গ্রেট হ্যাক’ এবং ‘দি সোশ্যাল ডিলেমা’ উত্তর পৃথিবীতে কীভাবে নেটফ্লিক্স গুগল, ফেসবুক, টুইটার সহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইন্টারেক্ট করে? ‘দি গ্রেট হ্যাক’ কিংবা ‘দি সোশ্যাল ডিলেমা’ সিনেমা বানাইলে কী হয় বা আদৌ কিছু হয় কিনা?

চলেন আগে বুঝি গুগল, ইউটিউব, ফেসবুক, নেটফ্লিক্স একই জাতের কোম্পানি কিনা? রেভিনিউ মডেলের ভিন্নতার কারণে আপনি গুগল, ইউটিউব, ফেসবুক, নেটফ্লিক্সকে আলাদা আলাদা ভাবে দেখতে পারবেন না। চিন্তা করে দেখেন, কোম্পানিগুলি কী নিয়ে কম্পিটিশন করে? মৌলিক ভাবে তারা কম্পিটিশন করে আপনার-আমার ‘অ্যাটেনশন’ পাওয়ার জন্যে, আরো সহজ ভাবে বললে আমাদের ‘সময়’-এর জন্যে।

আমার কথার গুরুত্ব না দিলেও হ্যালিজন-এর সিইও বিল গ্রসকে আপনার গুরুত্ব দিতে হবে। তাকে বলা হয় টেক বিজনেসের অন্যতম ক্রিয়েটিভ লিডার। গুগল করতে পারেন। এই ভদ্রলোক ২০১৬ সালের অক্টোবরে একটা স্ট্যাটাস দিছিলেন টুইটারে, “নেটফ্লিক্সে আমরা প্রতিযোগিতা করি কাস্টমারের সময়-এর জন্যে তাই স্ন্যাপচ্যাট, ইউটিউব, ঘুম সবাই আমাদের প্রতিযোগী”। (At Netflix we are competing for our customer’s time, so our competitors includes snapchat, YouTube, sleep etc.”)

গত বছরের কোনো এক সময় নেটফ্লিক্স সিইও রিড হ্যাস্টিংকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এই যে অ্যামাজন প্রাইম, ডিজনি তাদের স্ট্রিমিং সার্ভিস তৈরি করছে আপনি এই কম্পিটিশনকে কীভাবে দেখেন? তার উত্তরে তিনি বলেন, “মার্কেট অনেক বড়। সবার বড় হবার সুযোগ আছে।” তিনি বলেন, ওইভাবে যদি বলতে হয় তাহলে আমাদের কম্পিটিশন হইল ‘ঘুম’!

তিনি বলছিলেন, ‘ঘুম’ প্রতিদিনের একটা লম্বা সময়। নেটফ্লিক্স নিজেও তার অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়াতে ২০১৭ সালের এপ্রিলে স্ট্যাটাস দিছে, “ঘুম আমাদের সবচেয়ে বড় শ্ত্রু।” 

তাইলে বোঝা গেল ঘুম ঘুম না, সময় মাত্র। তাই যা-ই ‘সময়’ নিয়ে ব্যবসা করবে তার সঙ্গেই কম্পিটিশন হবে। যেমন  ভিডিও গেম নিয়েও ডকুমেন্টারির আশা করতে পারেন।

এই ধরনের কম্পিটিশন বিজনেসে নতুন না। উবার অনেক চিন্তাভাবনা কইরা অ্যাকনলেজ করছে উবারের মূল কম্পিটিশন ‘লিফট’ কিংবা অন্য রাইড শেয়ারিং অ্যাপ না। তাদের মূল কম্পিটিশন হল গুগলের  সেলফ ড্রাইভিং কার। তারা বুঝতে পারছে লং রানে টিকে থাকতে হইলে তাদের নিজস্ব সেলফ ড্রাইভিং কার থাকতে হবে। আরগুমেন্ট হইল, যারা আগে এই টেকনোলজি ইনোভেট করবে তারা নিজেদের রাইড শেয়ারিং মাঠে নামাইলে তাদের খরচ আরো কম হবে, রাইড শেয়ারিং-এর খরচ কম হবে এবং সার্ভিস কোয়ালিটি উবারের থেকে ভাল হবে। তখন উবার আসলে আর প্রতিযোগিতায় থাকবে না।

৩.
আপনারা যারা ‘দি সোশ্যাল ডিলেমা’ দেখছেন তারা হয়ত খেয়াল করছেন এই শোতে গুগল, ইউটিউব, ফেসবুক, টুইটার ছাড়া নেটফ্লিক্স একবারও অন্য কোনো ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের নাম বলে নাই বা নিজেদের নাম উল্লেখ করে নাই। 

‘দি সোশ্যাল ডিলেমা’ (২০২০)

যদিও ইউটিউব, ফেসবুক ওয়াচ, নেটফ্লিক্স  একই ধরনের রিকমেন্ডেশন মডেল ব্যবহার করে কাস্টমার ধরে রাখে। অফ টপিক বক্তব্য হইল, এই ধরনের ম্যাচিওর মার্কেটে আমার কাছে এইটা এক ধরনের লঘু  বিজনেস স্ট্রাটেজি মনে হইছে। তবে এই এড়াইয়া যাওয়া তাদেরকে এই শো-গুলার মাধ্যমে নৈতিক দায়মুক্তির সুযোগ দেয় না।

‘দি সোশ্যাল ডিলেমা’ নিয়ে আলোচনা করার আগে নেটফ্লিক্সের সিইও রিড হ্যাস্টিং সম্পর্কে জানা দরকার। যেই ইম্পর্টেন্ট ইনফরমেশন দিয়া এই ভদ্রলোককে পরিচয় করায় দেয়া দরকার সেইটা হইল উনি ২০১১ সাল থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিলে পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত ফেসবুকের একজন বোর্ড ডিরেক্টর ছিলেন। এখন প্রশ্ন হইল উনি কি পদত্যাগ করেছিলেন ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার স্ক্যান্ডালের কারণে? বা এআই (AI) আপনার উইলপাওয়ার থেকে বেশি শক্তিশালী হয়ে যাচ্ছে, সেই কারণে?

না! সোজাসাপ্টা কারণ হল, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট! ফেসবুক তার ভিডিও স্ট্রিমিং প্লাটফরম ফেসবুক ওয়াচ-এ কনটেন্ট তৈরির জন্য বিলিয়ন ডলার ইনভেস্ট করার ঘোষণা দেওয়ার পরেই তিনি পদত্যাগ করেন।

কম্পিটিশন কীভাবে কাজ করে সেটা যেহেতু আগেই বলছি তাই সেদিকে না গিয়ে বলা যাইতে পারে রেভেনিউ মডেল ভিন্ন হইলেও কিন্তু একজন আরেকজনের জন্য থ্রেট হইতে পারে। তার একটা সহজ কারণ হইল, নেলসন মিডিয়ার রিসার্চ অনুযায়ী নর্থ আমেরিকাতে যারা ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিস আনসাবস্ক্রাইব করছেন সেখানে ৪২ শতাংশ কাস্টমার বলছেন তারা আনসাবস্ক্রাইব করছেন কারণ তারা মনে করেন সাবস্ক্রিপশন খরচকে জাস্টিফাই করার মতো যথেষ্ট ব্যবহার তারা করেন না।  নেটফ্লিক্স যতগুলি ম্যাট্রিক্স ইউজ করে পারফরম্যান্স মেজার করার জন্যে তার মধ্যে একটা হল ‘ডেইলি কনটেন্ট ভিউয়িং টাইম’ যেইটার সাথে আনসাবস্ক্রাইব করার একটা সরাসরি কোরিলেশন আছে। তাই তারা মনে করে অন্য আনঅর্থডক্স কম্পিটিশনকে জাগতে দেওয়া অনুচিত।

আবার কনটেন্ট ক্রিয়েশনের ক্ষেত্রে ফেসবুক এবং ইউটিউব-এর সাথে নেটফ্লিক্সের কম্পিটিশন অসম। রিসেন্টলি নতুন কনটেন্ট তৈরি করার জন্য নেটফ্লিক্স ১৬ বিলিয়ন ডলার ইনভেস্ট করার ঘোষণা দিয়েছে যেখানে ফেসবুক ইনভেস্ট করবে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলার! কারণটা সহজ, ইউটিউব এবং ফেসবুকের প্রাইম কনটেন্ট আসে তার ইউজারের কাছ থেকে, ফ্রিতে।

এবার আসি এইটা সরাসরি বিজনেস রাইভালরির পয়েন্ট থেকে বানানো হইল কিনা? উত্তর হল, না। নাম্বার দিয়ে আলোচনা করলে বোঝা সহজ হবে। ২০১৮ সালে ফেসবুকের মোট রেভিনিউ ছিল ৫৫ বিলিয়ন ডলার। সেটা ২০১৯ সালে যেই বছর ‘দি গ্রেট হ্যাক’ মুক্তি পাইল সেই বছর হইছে ৭০ বিলিয়ন ডলার। তবে নেট প্রফিটে একটা ধাক্কা আছে ২০১৯ সালে। ওই বছর নেট প্রফিট হয় ১৮ বিলিয়ন ডলার যেটা ২০১৮ সালে ছিল ২২ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এই কমে যাওয়াটা ‘দি গ্রেট হ্যাক’ ডকুমেন্টারির কারণে না। এর কারণ হলো ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার স্ক্যান্ডালের কারণে ২০১৯-এ ফেসবুককে ৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা দিতে হইছে!

আরেকটা বিষয় হল, ২০১৯ এর প্রথম ৩ মাসে অ্যাভারেজ ডেইলি ইউজার ছিল ১.৫ বিলিয়ন, ২১০৯-এ শেষ ৩ মাসে এসে সেটা হয়েছে ১.৬ বিলিয়ন, ২০২০-এর প্রথম ৩ মাসে সেটা বেড়ে হয়েছে ১.৭ বিলিয়ন। মান্থলি ডেইলি ইউজার-এর ক্ষেত্রেও একই রকম। তাই আমি মনে করি, এই ধরনের টিভি শো সরাসরি ব্যবসায় প্রভাব ফেলে না।

সিলিকন ভ্যালির টেক এক্সপার্টরা এই ধরনের প্রোগ্রামকে পাত্তা দেয় না, ওয়ালস্ট্রিটও দেয় না। সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ার মার্কেটে ফেসবুকের ভ্যালুয়েশন দেখলেও সেইটা বুঝতে পারবেন। 

তাইলে কেন তারা ‘দি সোশ্যাল ডিলেমা’ বানায়? আমার সহজ উত্তর হইছে, ফেসবুক বিরোধিতার কনটেন্টের ভাল ভিউয়ারশিপ ভ্যালু আছে। সাথে ‘দি গ্রেট হ্যাক’-এর সাফল্যের প্রিভিয়াস ডেটা আসে যেইটা ইন্সপায়ারিং। মানে নেটফ্লিক্স পেরাসাইটের মত আচরণ করে এই ক্ষেত্রে। তাই সামনে এই ধরনের আরো প্রোগ্রাম নেটফ্লিক্স-এর কাছ থেকে আসবে মনে করি।

৪.
আমার ব্যক্তিগত মতামত হইল, আপনি মানেন আর না মানেন ফেসবুক-এর অর্থনীতির আধিপত্যের কারণে কোনো রাষ্ট্রীয় কিংবা গ্লোবাল পলিসি বা প্রকল্প দিয়ে ফেসবুক’কে আটকানো যাবে না। গত বছর ইউরোপিয়ান ইকোনমিতে ফেসবুক-এর কন্ট্রিবিউশন ২০৮ বিলিয়ন ডলার, যেটা চাকুরির হিসেবে ট্রান্সলেট করলে ৩.৯ মিলিয়ন জবস! ফেসবুক-এর মাধ্যমে ইউরোপ এবং ইউরোপের বাইরে এক্সপোর্টের কন্ট্রিবিউশন প্রায় ৯৮ বিলিয়ন ডলার।

ফেসবুকের মাধ্যমে যেই জিনিসটা সহজ হইছে সেইটা হইল, গ্লোবালি বিজনেস করা মানে এইটা ট্রড ব্যারিয়ার লোয়ার করতে সাহায্য করতেছে। ইউরোপে প্রতি ১০টা বিজনেসের ৬টা বলছে ফেসবুক তাদের নতুন মার্কেট খুইজা পাইতে সাহায্য করছে। প্রতি ১০টা বিজনেসের ৬টা বলছে, তাদের মার্কেটিং কস্ট কমাতে সাহায্য করছে।

এত কিছুর পরও একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হইল, পৃথিবীতে এখনো ৩.৫ বিলিয়ন মানুষ মোটামুটি ভাবে রিলায়েবল ইন্টারনেট কিংবা একেবারেই ইন্টারনেট কানেকশন-এর বাইরে আছে। প্রডাক্ট বেচার জন্য তাদেরকে ইন্টারনেটের আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অবকাঠামো তৈরির জন্য ফেসবুক, গুগল বিভিন্ন ধরনের ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরিতে ইনভেস্ট করতেছে। যেমন এর মধ্যে আছে সাবমেরিন কেবল, Edge Networks, Open Transport Networks (OTN)। এই ইনভেসমেন্টগুলা হইতেছে ল্যাটিন আমেরিকা, সাব সাহারান আফ্রিকা এবং সাউথইস্ট এশিয়াতে। এই প্রজেক্টগুলির ইকোনোমিক ইমপ্যাক্ট ধরা হইছে ২০০ বিলিয়ন ডলার। তারা আশা করতেছে এর মাধ্যমে প্রায় ১৭৮,০০০ চাকুরি তৈরি হবে। এই ইনভেস্টমেন্টের রাজনীতি বুঝতে পারলে বুঝতে পারবেন কেন এই ধরনের ডকুমেন্টারি কাজের জিনিস না।

আবারো বলতেছি ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল, টুইটারকে আপনি এখন আর মোরালেটি, দর্শন, নৈতিকতা কিংবা রাষ্ট্রীয় পলিসি দিয়া আটকাইতে পারবেন না। যেমনটা পারেন নাই ব্যাংক, তেল কম্পানিকে আটকাইতে। ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল যেই ইকোসিস্টেম তৈরি করছে সেইটা ব্যাংক এবং তেলের রাজনীতির থেকে জটিল। এই ইকোসিস্টেম শাসক, শোষিত কিংবা আম আদমিকে ‘সমান ক্ষমতার’ ধারণা দেয় ।

৫.
ব্যক্তিগত মতামত হইল, শেষ পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া বয়কট করা একটা এলিটিস্ট প্রকল্প হয়ে থাকবে। এরা অনেকটা ‘কাল্ট’-এর মত আচরণ করবে। এখন পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব ছোট করতে যে বা যারা সবচেয়ে সফল হয়েছেন তারা প্রত্যেকেই টেক এলিট। সিলিকন ভ্যালির স্কুলগুলিতে টেক সবচেয়ে কম ব্যবহার কইরা হাতে-কলমে শেখানোর ওপর জোর দেয়া হয়। ‘অতি সচেতন’ মধ্যবিত্তের বাচ্চারা কিছু সময় দূরে থাকবে এর বেশি কিছু ‘দি সোশ্যাল ডিলেমা’ বা ‘দি গ্রেট হ্যাক’ অ্যাচিভ করতে পারবে না। যারা এই শোগুলা বানাইছে তারাও জানে এই ধরনের শো’র কোনো অ্যাকটিজম ভ্যালু নাই তবে ওই যে সোশ্যাল মিডিয়াকে ‘খারাপ’ বলার একটা ব্যবসায়িক সিনেমাটিক ভ্যালু আছে, নেটফ্লিক্স সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাইছে মাত্র।

আর একটা তথ্য দেই, প্যানডেমিক শুরু হওয়ার পরে নেটফ্লিক্স তার ডিজিটাল মার্কেটিং-এর বাজেট ৩ গুণ করছে, যার অধিকাংশ খরচ হইছে ফেসবুক এবং ইউটিউব-এ। বর্তমানে এই ডেইলি মার্কেটিং বাজেট কোনো কোনো দিন প্রায় ৫ লাখ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশী টাকায় প্রায় চার কোটি টাকার বেশি।

ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল, নেটফ্লিক্স পরস্পরের সাথে কম্পিটিশন করলেও আমাদের বুঝতে হবে তারা ‘দি সোশ্যাল ডিলেমা’ কিংবা ‘দি গ্রেট হ্যাক’ বানাইয়া পরস্পরের সাথে কম্পিটিশন করে না। তাই ‘দি সোশ্যাল ডিলেমা’ বানানো এবং একইসাথে সোশ্যাল মিডিয়াতে অ্যাড দেয়াকে ‘নৈতিকতা’ দিয়ে মাপলে হবে না। এর মধ্যে আরও জটিল ভাবনা কাজ করে।

৬.
আমেরিকা থেকে দাসপ্রথা উঠে যাওয়ার অনেক পর পর্যন্ত কিউবাতে দাসপ্রথা ছিল, এর কারণ ছিল চিনির উৎপাদন টিকাইয়া রাখা। এইখানে দাসমুক্তি দাসের বিদ্রোহের কারণে হয় নাই। স্পেনের কলোনি থাকা অবস্থায় কিউবার চিনি ব্যবসায়ীদেরকে বহু টাকা ট্যাক্স দিতে হইত স্প্যানিয়ার্ডদের। ফলে তাদের হাতে বেশি লাভ থাকত না। সেই সময় এক সাদা আখ ক্ষেতের মালিক Carlos Manuel De Cespedes এই কম লাভে বিরক্ত হইয়া কিউবার স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসলেন এবং তার পরের দিনই তিনি তার দাসদের মুক্তি দিয়া দেন। তিনি পরে বলছিলেন, “আমি দাসদের মুক্তি দিলে তারা আমার অনুগত থাকবে এবং আমি আমার যুদ্ধের জন্য সৈনিক পাবো।”

তাই এই ধরনের ফ্লু শট জাতীয় ডকুমেন্টারিকে শুধুমাত্র অর্থনীতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা আমার জন্য সাশ্রয়ী। ফ্লু শট বানানোর সময় আগের বছরের ভাইরাস ব্যবহার করা হয় এবং আশা করা হয় এটা কাজ করবে; যদিও ভাইরাস প্রতি বছর অভিযোজন করে তার স্বাস্থ্য পরিবর্তন করে। আর আমরা আশা করি মাত্র।

এরপর এই ধরনের শো দেখার আগে মনে রাইখেন তারা পরস্পরের প্রতিযোগী কিন্তু এই শো দিয়া তারা প্রতিযোগীকে মোকাবেলা করে না, এইটা একটা রুটিন মুনাফাধর্মী কাজ মাত্র, সিরিয়াস হওয়ার কিছু নাই!

অন্টারিও, অক্টোবর ২০২০

(কভারে দ্রাবিড় হাসান খান; অন্টারিওর ওয়েলিংটনে, ন্যাশনাল হিস্টরিক্যাল সাইটে, পিছনে সেইন্ট লরেন্স নদী, ২০২০)